Home Blog Page 3

স্পিতি-এককথায় ভয়ঙ্কর সুন্দর………Part : 3

তাবো থেকে কাজা, কাজা থেকে চন্দ্রতাল স্পিতির নৈস্বর্গিক দৃশ্যপটের সাক্ষী থাকতে গোটা ভারতবর্ষে এই যাত্রাপথের জুড়ি মেলা ভার। তাবো অবধি রাস্তায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে গাছপালা নজরে আসে। কিন্তু কাজা ঢুকলে সবুজের সংখ্যা আরও কমতে থাকে বা নেই বললেই চলে। তাবোতে একরাত্রি কাটানোর পর পরবর্তী গন্তব্য কাজা। ভারতের এই প্রত্যন্ত অঞ্চলের সবচেয়ে বড় শহর কাজা। যাওয়ার পথেই দেখে নিতে হবে ধানকর  মনাস্ট্রি। 

ধানকর  মনাস্ট্রি 

বরফের চাদরে মোড়া হিমালয় পর্বতমালা এবং স্পিতি ও পিন নদীর আঁকাবাঁকা মিলনস্থলকে ওপর থেকে সেই হাজার হাজার বছর ধরে নজরে রাখছে ধানকর  মনাস্ট্রি। পাথুরে পাহাড়ের মাথায় অবস্থিত এই মনাস্ট্রি স্পিতি ভ্রমণের অন্যতম সেরা আকর্ষণ। মনাস্ট্রি থেকে দেখা যায় ধানকর  গ্রাম। 

ধানকর  গোম্পা ভারতের হিমাচল প্রদেশের লাহৌল-স্পিতি জেলার একটি ঐতিহাসিক বৌদ্ধ মঠ এবং একই সঙ্গে একটি ছোট গ্রাম। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩,৮৯৪ মিটার  বা ১২,৭৭৪ ফুট উচ্চতায় স্পিতি উপত্যকায়, কাজা ও টাবোর মাঝামাঝি ধানকর  গ্রামের একেবারে উপরে এই মনাস্ট্রি অবস্থিত।  ‘ধাং’ শব্দের অর্থ খাড়া পাহাড় বা খাড়াই, আর ‘কার’ শব্দের অর্থ দুর্গ। তাই ‘ধানকার’ শব্দের অর্থ দাঁড়ায় ‘খাড়া পাহাড়ের ওপর নির্মিত দুর্গ’। স্পিতির কীই  ও টাঙ্গ্যুদ মনাস্ট্রি এবং লাদাখের থিকসে, লিকীইর ও রাংদুম মনাস্ট্রির মতোই মধ্য তিব্বতের দুর্গ-শৈলী অনুসরণ করে নির্মিত হয়েছিল এই ধানকর মনাস্ট্রি।

হিমালয়ের মাঝে একা দাঁড়িয়ে ধানকর গোম্পা | ফটো- বিশ্বয়নী দত্ত

মনাস্ট্রির ভেতরের অন্ধকার, সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হয় উপরে, পুরো অন্ধকার। ওপরে আরাধনা করার ঘর রয়েছে। মনাস্ট্রিতে ব্যালকনির মতো জায়গা রয়েছে সেখান থেকে দুপাশের জনমানবহীন উচ্চভূমির মরুভূমি, আকাশছোঁয়া হিমালয় এবং নিচে ছড়িয়ে থাকা স্পিতি ও পিন নদী মিলনের সেই মনোমুগ্ধকর দৃশ্য দেখা যায়। গোম্পার আশেপাশে উড়তে থাকা রঙিন প্রেয়ার্স ফ্ল্যাগ যেন জায়গার সৌন্দর্য্য আরও বাড়িয়ে দেয়।। 

গোম্পার নিচেই রয়েছে ছোট্ট গ্রাম। সেখানেই অবস্থিত নতুন ধানকর মনাস্ট্রি, যেখানে বর্তমানে তিব্বতি বৌদ্ধধর্মের গেলুগপা সম্প্রদায়ের সন্ন্যাসীরা থাকেন।

পাথুরে পাহাড়ের মাথায় অবস্থিত এই মনাস্ট্রি স্পিতি ভ্রমণের অন্যতম আকর্ষণ। ধানকার ঘুরে রাত্রিবাস কাজাতে। কাজা স্পিতির অন্যতম প্রশাসনিক শহর। পরের দিন দেখা হবে লাংজা ,কমিক, হিক্কিম, ছিছাম ব্রিজ আর কীই মনাস্ট্রি।

লাংজা 

লাংজা গ্রাম মূলত দুটি কারণে বিশেষভাবে পরিচিত। প্রথমত, এখানে প্রচুর প্রাচীন সামুদ্রিক জীবাশ্ম পাওয়া যায় তাই “ভারতের ফসিল গ্রাম” নামে পরিচিত স্পিতির এই গ্রাম। দ্বিতীয়ত, গ্রামের ওপর থেকে সমগ্র উপত্যকার দিকে দৃষ্টি রেখে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল ও মনোরম লাংজা বুদ্ধ মূর্তি এই গ্রামের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। এই ছোট্ট গ্রামে মাত্র ১৩৬ জন মানুষের বসবাস। 

লাংজা গ্রাম থেকে দৃশ্যমান সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ হল চাউ চাউ কাং নিল্ডা । প্রায় সারা বছরই বরফে আচ্ছাদিত এই মনোমুগ্ধকর শৃঙ্গটির উচ্চতা ৬,৩০০ মিটার (২০,৬৭০ ফুট)-এরও বেশি। মনে হয় যেন পাহাড়টি গ্রামের নীরব প্রহরী হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে এই শৃঙ্গ। 

কমিক, বিশ্বের সর্বোচ্চ মোটরেবল গ্রাম 

স্থানীয় ভাষায় কমিক শব্দটির অর্থ, ‘তুষার মোরগের চোখ’।  ‘কো’ শব্দের অর্থ তুষার মোরগ, ‘মিক’ শব্দের অর্থ চোখ।  যানবাহনের মাধ্যমে পৌঁছানো যায় বিশ্বের সর্বোচ্চ গ্রামগুলির মধ্যে অন্যতম কমিক। কমিক গ্রামে প্রায় ৫০০ বছর প্রাচীন লুন্দুপ সেমো গোম্পা অবস্থিত। এখানে রয়েছে বিশ্বের সর্বোচ্চ রেস্টুরেন্ট।

হিক্কিম, বিশ্বের উচ্চতম পোস্ট অফিস

লাংজার মতো কমিক ও হিক্কিমও খুঁজলে প্রচুর জীবাশ্ম পাওয়া যায়। জানা যায়, কোটি কোটি বছর আগে স্পিতি উপত্যকা টেথিস সাগরের নিচে ছিল। সেই কারণেই আজও এখানে প্রাচীন সামুদ্রিক জীবের অসাধারণ ও বিরল জীবাশ্ম পাওয়া যায়, যা এই অঞ্চলের প্রাচীন ভূতাত্ত্বিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ।

১৪,৪০০ ফিট উচ্চতায় অবস্থিত পৃথিবীর সর্বোচ্চ ডাকঘর | ফটো- বিশ্বয়নী দত্ত

সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৪,৪৪০ মিটার (১৪,৫৬৭ ফুট) উচ্চতায় হিক্কিম গ্রামেই অবস্থিত বিশ্বের সর্বোচ্চ পোস্ট অফিস বা ডাকঘর। এই পোস্ট অফিস শুধু ডাক পরিষেবাই প্রদান করে  এমনটা নয়, বরং প্রতিকূল ভৌগোলিক পরিস্থিতির মধ্যেও মানুষের অধ্যবসায়, সাহস এবং যোগাযোগ রক্ষার অদম্য প্রচেষ্টার প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত। এই পোস্ট অফিস থেকে চিঠি পাঠাতে পারেন আপনিও। প্রতি বছর অসংখ্য পর্যটক এখান থেকে তাঁদের বন্ধু ও পরিবারের সদস্যদের উদ্দেশে পোস্টকার্ড পাঠান। সেই পোস্টকার্ডে হিক্কিম পোস্ট অফিসের বিশেষ স্ট্যাম্প মারা হয়। বিশ্বের অন্যতম দুর্গম অথচ মনোমুগ্ধকর অঞ্চলে অবস্থিত এই ডাকঘর ভ্রমণকারীদের এমন এক অভিজ্ঞতার স্বাদ দেয়, যা আজীবন স্মৃতিতে অমলিন হয়ে থাকে।

ছিছাম ব্রিজ- এশিয়ার সর্বোচ্চ সাসপেনশন ব্রিজ 

সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৪,০৩৭ মিটার (১৩,৫৯৬ ফুট) উচ্চতায় অবস্থিত বিশ্বের অন্যতম দর্শনীয় সেতুগুলির একটি  ছিছাম ব্রিজ। এটি এশিয়ার সর্বোচ্চ সাসপেনশন বা ঝুলন্ত সেতু, যা স্পিতি উপত্যকার চিচাম এবং কিব্বের দুটি প্রত্যন্ত গ্রামকে সংযুক্ত করেছে যাতে স্পিতির যোগাযোগ ব্যবস্থা হয়েছে আরও উন্নত । স্পিতি উপত্যকার প্রধান শহর কাজা থেকে ছিছাম ব্রিজের দূরত্ব প্রায় ২০ কীইলোমিটার।

২০১৭ সালে ছিছাম ব্রিজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। প্রায় ১৪ বছর ধরে এই সেতু নির্মাণ করা হয়। খরচ করা হয়েছে আনুমানিক ৪৮৫.৫০ লক্ষ টাকা। উদ্বোধনের পর থেকেই এটি পর্যটকদের কাছে অন্যতম আকর্ষণীয় দর্শনীয় স্থানে পরিণত হয়েছে।

সাম্বা লাম্বা নাল্লা গিরিখাতের উপর নির্মিত এশিয়ার বৃহত্তম ঝুলন্ত ব্রিজ | ফটো- বিশ্বয়নী দত্ত

প্রায় ১১৪ মিটার দীর্ঘ এই সেতুটি সাম্বা লাম্বা নাল্লা নামে পরিচিত প্রায় ১,০০০ ফুট গভীর এক গিরিখাতের উপর নির্মিত। সেতুটি নির্মাণের আগে চিচাম ও কিব্বের গ্রামের বাসিন্দারা এই গভীর খাদ পার হতে অত্যন্ত ঝুঁকিইপূর্ণ দড়ির ট্রলি ব্যবহার করতেন। ফলে ছিছাম ব্রিজ নির্মিত হওয়ার পর স্থানীয় মানুষের যাতায়াত অনেক বেশি নিরাপদ ও সহজ হয়ে ওঠে।

কীই মনাস্ট্রি- স্পিতি উপত্যকার বৃহত্তম বৌদ্ধ মনাস্ট্রি

হিমাচল প্রদেশের লাহৌল ও স্পিতি জেলার স্পিতি উপত্যকায়, স্পিতি নদীর তীরবর্তী একটি পাহাড়ের চূড়ায় সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৪,১৬৬ মিটার (১৩,৬৬৮ ফুট) উচ্চতায় অবস্থিত কীই গোম্পা। কাজা শহর থেকে কীই মনাস্ট্রির দূরত্ব প্রায় ১২ কিলোমিটার, আর সড়কপথে মানালি থেকে প্রায় ২১০ কিলোমিটার। পাহাড়ের ঢালে ধাপে ধাপে নির্মিত এই মনাস্ট্রিটি দূর থেকে একটি দুর্গের মতো দেখতে লাগে। এর স্থাপত্যে ১৪শ শতকের তিব্বতি বৌদ্ধ শিল্পকলার পাশাপাশি চীনা স্থাপত্যশৈলীরও প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।

কীই মনাস্ট্রি, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য আর প্রাচীন ইতিহাসের মেলবন্ধন | ফটো- বিশ্বয়নী দত্ত

কীই গোম্পা শুধু একটি ধর্মীয় উপাসনালয় নয়, এটি দীর্ঘদিন ধরে লামাদের ধর্মীয় শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। 

এই মনাস্ট্রিটি উৎসর্গ করা হয়েছে লোচেন তুলকু-কে, যাঁকে মহান অনুবাদক লোতসাওয়া রিনচেন জাংপো-র ২৪তম পুনর্জন্ম বলে মনে করা হয়।

জনশ্রুতি অনুযায়ী, একাদশ শতকে বিখ্যাত বৌদ্ধ গুরু অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানের শিষ্য দ্রোমতোন কীই গোম্পার প্রতিষ্ঠা করেন। তবে ইতিহাসবিদদের মতে, এই তথ্যটি সম্ভবত নিকটবর্তী রাংরিক গ্রামের একটি প্রাচীন কাদাম্পা মনাস্ট্রির সঙ্গে সম্পর্কিত, যা পরে ধ্বংস হয়ে যায়।Raise Your Concern About this Content

১৭শ শতকের মাঝামাঝি, পঞ্চম দলাই লামার শাসনকালে মঙ্গলদের আক্রমণে মনাস্ট্রি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরবর্তীকালে এই মনাস্ট্রি গেলুগপা সম্প্রদায়ের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পুনর্গঠিত হয়। ১৮২১ সালে, লাদাখ ও কুলুর যুদ্ধের সময় আবারও  এই মনাস্ট্রিতে লুটপাট করা হয়। ১৮৪১ সালে, ডোগরা-তিব্বত যুদ্ধের সময় গুলাম খান ও রহিম খানের নেতৃত্বাধীন ডোগরা বাহিনী মনাস্ট্রিটির বড় ধরনের ক্ষতি করে। ১৮৪০-এর দশকে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে মনাস্ট্রির অনেক অংশ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। পরে ১৯৭৫ সালের বিধ্বংসী ভূমিকম্পেও এটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

পরবর্তীকালে ভারতের প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগ ASI এবং রাজ্য সরকারের পাবলিক ওয়ার্কস ডিপার্টমেন্ট (PWD)-এর উদ্যোগে মনাস্ট্রিটি সংস্কার করা হয়।

মনাস্ট্রির দেয়ালজুড়ে রয়েছে অসংখ্য প্রাচীন ভাস্কর্য, রঙিন দেওয়ালচিত্র (মুরাল) এবং ধর্মীয় চিত্রাঙ্কন। এছাড়াও এখানে সংরক্ষিত রয়েছে বহু প্রাচীন পুঁথি, ধর্মগ্রন্থ এবং বুদ্ধমূর্তি যা ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের অমূল্য সম্পদ।

চন্দ্রতাল-পরীরা স্নান করে যেখানে 

‘এক বার মরনে সে পেহলে চন্দ্রতাল দেখনা চাহনা হু’ রনবীর সিং অভিনীত লুটেরা সিনেমার অন্যতম ডায়লগ যা এখনও সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল। 

পাহাড়ের মাঝে নিজেকে লুকিয়ে থাকা চন্দ্রতাল, যেখানে হারিয়ে যেতে চায় মন | ফটো- বিশ্বয়নী দত্ত

হিমালয়ের বুকে চাঁদের মতো সুন্দর লেক। যদিও ভৌগোলিকভাবে চন্দ্রতাল লাহৌল এলাকার চন্দ্রা নদীর অববাহিকায় অবস্থিত। কুনজুম লা পাস লাহৌল ও স্পিতি উপত্যকার মধ্যে প্রাকৃতিক সীমানা তৈরি করেছে। পুরো এলাকাটি চন্দ্রতাল বন্যপ্রাণ অভয়ারণ্যের অন্তর্গত, যা নানা প্রজাতির বন্যপ্রাণী ও উচ্চভূমির উদ্ভিদের নিরাপদ আবাসস্থল। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৪,৩০০ মিটার (১৪,১০০ ফুট) উচ্চতায় অবস্থিত চন্দ্রতাল হ্রদটি সামুদ্রা টাপু মালভূমিতে অবস্থিত। হ্রদটির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল এর অর্ধচন্দ্রের মতো আকৃতি। এই আকৃতির কারণেই এর নাম রাখা হয়েছে চন্দ্রতাল। স্থানীয় লোকেরা বিশ্বাস করেন এই লেকে পরীরা স্নান করতে আসেন। তাই এই লেকে স্নান করা ও কাপড় কাচা নিষিদ্ধ। 

একবার স্পিতির সৌন্দর্য নিজের চোখে দেখলে, সেই স্মৃতি আজীবন হৃদয়ে অমলিন হয়ে থাকবে। তাই সুযোগ পেলে জীবনে অন্তত একবার স্পিতি ভ্যালি ঘুরে আসুন। 

 তথ্যসূত্র-

১. উইকিপিডিয়া 
২. নিজস্ব অভিজ্ঞতা


স্পিতি-এককথায় ভয়ঙ্কর সুন্দর………Part : 2

হিমাচলের শিমলা থেকে স্পিতির পুরো রাস্তার দৃশ্যপট, প্রকৃতি, পরিবেশ নতুন করে হাতছানি দেয়।
শিমলা থেকে চিটকুল পর্যন্ত সবুজের দেখা মেলে। চিটকুল থেকে কল্পা পর্যন্ত সবুজ হাতছানি দিয়ে আমন্ত্রণ জানায়। কিন্তু কল্পা থেকে খাব সঙ্গম পেরনোর পর ক্রমেই সবুজ গাছপালার সংখ্যা কমতে থাকে। এই পাহাড় রুক্ষ, শুষ্ক, মাঝেমাঝে মরুভূমিতে মরিচীকার মতো ছিটেফোটা গাছপালা ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। কল্পা থেকেই শুরু স্পিতি ভ্যালির রাস্তা। কল্পা পেরনোর পর গগনচুম্বী পাহাড়গুলির উপর সূর্যের ছটা পড়লে ‘সোনার পাহাড়’ বলে ভ্রম হয়।

কল্পা-মহাদেবের আবাসের কাছাকাছি

ভারতের শেষ গ্রাম চিটকুল থেকে গাড়ি ছুটল কল্পার উদ্দেশ্যে। কারছাম থেকে রেকংপিং পর্যন্ত রাস্তা কিছুটা খারাপ। আকাশ পরিষ্কার থাকলে রেকংপিং থেকে কল্পা পর্যন্ত পুরোটাই কিন্নর-কৈলাস রেঞ্জ দেখা যায়। আবহাওয়া ভালো থাকলে দেখা যেতে পারে কিন্নর-কৈলাস পর্বতও। পুরান মতে কৈলাসেই বাস দেবাদিদেব মহাদেবের। কল্পার হোটেল রুম থেকে কিন্নর কৈলাসের দর্শন মিললে মহাদেবকে অনেকটা কাছ থেকে অনুভব করা যায়।

কল্পার ঐতিহাসিক মন্দির -নারায়ণ নাগিনী মন্দির

চোখ খুললেই কৈলাসের হাতছানি | ফটো- বিশ্বয়নী দত্ত

কল্পায় অবস্থিত প্রাচীন ও পূজিত নারায়ণ-নাগিনী মন্দিরটি ঐতিহ্যবাহী তিব্বতি প্যাগোডা স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত। এই মন্দিরটি কিন্নরি শিল্প ও কারুকাজের এক অসাধারণ নিদর্শন।  কল্পার কাছেই রয়েছে রোগি গ্রাম, যা খুবই জনপ্রিয়। এই গ্রাম ছাড়িয়ে কিছুটা গেলে দেখা মিলবে অন্যতম দর্শনীয় স্থান ‘সুইসাইড পয়েন্টের’। এই জায়গাটিতে খাড়া ঢাল এবং বিপজ্জনক খাদ রয়েছে। ওইদিন কল্পায় রাত্রিবাস। তবে কল্পায় না থেকে রেকংপিও মার্কেট ছাড়িয়ে রেকংপিওর নীচের দিকে রাত্রিযাপন করতে পারেন। রেকংপিওতে ভিড়টা কম, পরেরদিন স্পিতি ভ্যালি পৌঁছতেও অনেকটা সময় কম লাগবে। রেকংপিও থেকেই শুরু হবে স্পিতি ভ্যালির যাত্রা। পরবর্তী গন্তব্য তাবো। তাবো যাওয়ার রাস্তায় দেখে নিতে হবে খাব সঙ্গম, নাকো লেক, নাকো মনাস্ট্রি আর গিউ মনাস্ট্রি। তারপর তাবোতে রাত্রিবাস।

কল্পার ঐতিহ্যবাহী নারায়ণ-নাগিনী মন্দির | ফটো- বিশ্বয়নী দত্ত

খাব সঙ্গম-স্বপ্নের শুরু 

স্পিতি ভ্যালির উদ্দেশ্যে পাড়ি দিলে রাস্তায় ২,৪৩৮ মিটার থেকে ২,৬০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত খাব সঙ্গম ব্রিজ পার করতেই হবে।এখানেই কিন্নর এবং স্পিতির শীতল মরুভূমির সীমানা নির্ধারিত হয়। সেতুর নিচ দিয়ে কুনজুম পর্বতমালা থেকে আসা স্বচ্ছ ও ঠান্ডা স্পিতি নদী, তিব্বত থেকে আসা প্রশস্ত ও কাদামাটিযুক্ত শতদ্রু (সুতলেজ) নদীর সঙ্গে মিশেছে। দুটি নদীর জলের রং স্পষ্টভাবে আলাদা দেখা যায়, মিশে যাওয়ার আগে পর্যন্ত।

শতদ্রু ও স্পিতি, দুই নদী মিশে একাকার | ফটো- বিশ্বয়নী দত্ত

উপরে পাহাড়ের ঢাল বরাবর পুরনো সিল্ক রুটের পথ চলে গেছে। আকাশ পরিষ্কার থাকলে এখান থেকে হিমাচল প্রদেশের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ রেও পুরগিয়িল (৬,৮১৬ মিটার) দেখা যায়। পাশাপাশি এখান থেকেই স্পিতির দিকে উঠে যাওয়া আঁকাবাঁকা পাহাড়ি রাস্তার মনোমুগ্ধকর দৃশ্য চোখে পড়ে। সেতুটি পার করলেই দৃশ্যপট সম্পূর্ণ বদলে যায়। সবুজে ভরা কিন্নর পিছনে ফেলে, সামনে খুলে যায় হিমালয়ের ধূসর-বাদামি, রুক্ষ কিন্তু মোহনীয় এক নতুন জগৎ।এই পরিবর্তনটাই খাব সঙ্গমকে অবিস্মরণীয় করে তোলে। এটি এমন এক সীমারেখা, যেখানে এক পৃথিবীর শেষ আর স্বপ্নের স্পিতির শুরু।

নাকো লেক ও নাকো মনাস্ট্রি

স্পিতি নদী উপত্যকায় অবস্থিত নাকো উত্তর ভারতের হিমালয়ের একটি ছোট গ্রাম, যা হিমাচল প্রদেশের কিন্নর জেলার ট্রান্স-হিমালয় অঞ্চলে, ভারত-চীন সীমান্তের খুব কাছাকাছি অবস্থিত। 

নাকো হল হ্যাংরাং ভ্যালির সবচেয়ে বড় গ্রাম, যা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩,৬২৫ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত। এই গ্রামটি মনোরম রেও পুরগিয়িল পর্বতের পটভূমিতে অবস্থিত, যার উচ্চতা ৬,৮১৬ মিটার । ২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী, এই গ্রামে মোট জনসংখ্যা ছিল ৫৭২ জন এবং মোট ১২৮টি পরিবার বসবাস করত।

এখানে নাকো লেক অন্যতম প্রধান আকর্ষণ, যা নাকো গ্রামের সীমানার অংশ । নাকো লেক একটি উচ্চভূমির হ্রদ, যা হিমাচল প্রদেশের কিন্নর জেলার পুহ উপবিভাগে অবস্থিত। এবং গ্রামের নামেই এই লেকের নামকরণ করা হয়েছে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এই হ্রদের উচ্চতা প্রায় ৩,৬৬২ মিটার। হ্রদটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৫০০ মিটার এবং প্রস্থ ২০০ মিটার, আর গভীরতা আনুমানিক ৬০ মিটার। হ্রদটি চারপাশে উইলো ও পপলার গাছ দিয়ে ঘেরা। হ্রদের কাছে চারটি বৌদ্ধ মন্দির রয়েছে। এছাড়াও এখানে সাধু পদ্মসম্ভবের পদচিহ্ন রয়েছে বলে বিশ্বাস করা হয়।

১০২৫ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত নাকো মনাস্ট্রি গ্রামেই অবস্থিত, পাশাপাশি রয়েছে আরও কয়েকটি বৌদ্ধ স্তূপ। গ্রামের ওপরের দিকে অবস্থিত নাকো মনাস্ট্রি এবং নাকো লেক, দুটিই এই গ্রামের গুরুত্বপূর্ণ দর্শনীয় স্থান।

গিউ মনাস্ট্রি 

গিউ যাকে গুই (Gue) বা গুয়েন (Ghuen) নামেও ডাকা হয়। গিউ হিমাচল প্রদেশের স্পিতি ভ্যালির একটি ছোট্ট গ্রাম, যা প্রায় ১০,০০০ ফুট উচ্চতায় সুমদো  ও তাবোর মাঝামাঝি অবস্থিত। এই গ্রামে মোট ৫০-৬০টি পরিবার বসবাস করে।NH05-এর কাছেই অবস্থিত। স্পিতি ভ্রমণের সময় তাবো এবং কাজা যাওয়ার পথে এই এলাকা ঘুরে নিতে হয়। NH05 থেকে মাত্র ৮ কিলোমিটার ঘুরপথে গিউ পৌঁছানো যায়, তবুও তাবো বা কিই মনাস্ট্রির তুলনায় এখানে খুব কম পর্যটকই আসেন। অথচ এই জায়গার ইতিহাস সত্যিই অসাধারণ।

গিউ গ্রামে রয়েছে প্রায় ৫০০ বছরের পুরনো এক বৌদ্ধ সন্ন্যাসীর প্রাকৃতিকভাবে সংরক্ষিত মমি। তিব্বত এবং জাপানের বাইরে এমন প্রাকৃতিকভাবে সংরক্ষিত সন্ন্যাসীর মমি অত্যন্ত বিরল। ভারতে এমন উদাহরণ হাতে গোনা কয়েকটি রয়েছে, তার মধ্যে গিউয়ের মমিটি সম্ভবত সবচেয়ে ভালোভাবে সংরক্ষিত।

বৌদ্ধ সন্নাসী সাঙ্ঘা তেনজিনের মমি | ফটো- বিশ্বয়নী দত্ত

স্থানীয় লোককথায় অনুযায়ী যদিও এই ঘটনার বৈজ্ঞানিক প্রমাণও মেলে, প্রায় ৫০০ বছর আগে তিব্বতি বৌদ্ধ সন্ন্যাসী সাঙ্ঘা তেনজিন গিউ গ্রামে আসেন। তিনি গেলুগপা সম্প্রদায়ের একজন সন্ন্যাসী ছিলেন। লোকমুখে প্রচলিত গিউ গ্রামে বিছের উপদ্রব শুরু হয়েছিল, যা গ্রামবাসীদের জীবন ও জীবিকাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছিল। সম্প্রদায়ের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত সাঙ্ঘা তেনজিন গ্রামের মঙ্গলের জন্য মাত্র চল্লিশ বছর বয়সে নিজের জীবন উৎসর্গ করার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি পদ্মাসনে বসে নিজেকে একটি সমাধির মধ্যে সিল করে দিতে বলেন তাঁর শিষ্যদের এবং প্রার্থনায় লিপ্ত হন। বলা হয়, তাঁর আত্মা শরীর ত্যাগ করার সময় আকাশে একটি রামধনু দেখা গিয়েছিল। সেই দিন থেকে নাকি গিউ গ্রামে আর কোনো বিছের উপদ্রব হয়নি। গ্রামবাসীরা তাঁকে স্নেহভরে “মমি লামা” বলে ডাকেন।Raise Your Concern About this Content

গিউ মমিটিকে প্রথমবার দেখলে যে জিনিসটি সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে, তা হল এর অবয়ব। 

মমিটি ধ্যানমুদ্রায় বসানো অবস্থায় রয়েছে, একটি হাত কোলে, অন্যটি থুতনির নিচে।দীর্ঘ পাঁচ শতাব্দী ধরে দেহটি অনেকটাই সঙ্কুচিত হয়ে গেছে, ফলে এটি একটি ছোট, কুঁজো হয়ে থাকা অবয়বের মতো দেখায় প্রায় যেন ভেতরের সবকিছু শুষে নেওয়া হয়েছে। ত্বক গাঢ় বাদামি রঙ ধারণ করেছে এবং দেহটি বহু বছরের মধ্যে সম্পূর্ণ শুকিয়ে গেছে বলে মনে হয়। তবুও এত ভালোভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে যে ত্বক বেশিরভাগটাই অক্ষত, সামান্য ফাঁক হওয়া ঠোঁটের মধ্যে থেকে দাঁত দেখা যায়। তাঁর শরীরে এখনও বাঁধা রয়েছে ‘গোমথাক’ নামে একটি বেল্ট, যা দীর্ঘ ধ্যানের সময় মেরুদণ্ড সোজা রাখতে ব্যবহৃত হয়। মমিটি ঐতিহ্যবাহী হলুদ-সাদা সন্ন্যাসীর পোশাক পরিহিত এবং একটি কাচের বাক্সের মধ্যে সংরক্ষিত, যেকোনও ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে এই ব্যবস্থা।

এই সমাধি বহু শতাব্দী পর্যন্ত লোকচক্ষুর আড়ালে ছিল। ১৯৭৫ সালের ভূমিকম্পে সেই কাঠামো ধ্বংস হয়ে গেলে, রাস্তা নির্মাণ ও খননকাজের সময় ইন্দো-তিব্বত বর্ডার পুলিশ (ITBP) আকস্মিকভাবে মমিটি আবিষ্কার করে। তাঁরা দেখেন, দেহটি ঠিক সেই ধ্যানের অবস্থাতেই রয়েছে, হাতে জপমালা এবং মেরুদণ্ডে গোমথাক বেল্ট বাঁধা অবস্থায়।

এরপর থেকে হিমাচল প্রদেশ সরকার এই স্থানটির রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তার দায়িত্ব গ্রহণ করে। 

যদি লোককথায় বিশ্বাস না হয় তাহলেও এই ঘটনার বৈজ্ঞানিক প্রমাণও রয়েছে।  ভিয়েনার একদল গবেষক কার্বন ডেটিং করে দেখেছেন যে মমিটির সময়কাল প্রায় ১৪৭৫ সালের কাছাকাছি অর্থাৎ এই মমি প্রায় ৫৫০ বছরেরও বেশি পুরনো। তাঁরা আরও জানান, মৃত্যুর সময় ওই ব্যক্তির বয়স ছিল চল্লিশের ঘরে, যা স্থানীয় কাহিনির সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। 

গিউ মনাস্ট্রি দেখে সেইদিন রাত্রিবাস করুন তাবোতে। তাবো মনাস্ট্রির কাছে JBN TROJAN HOTEL (কন্ট্যাক্ট নম্বর- 94188-87549)-এর মতো একাধিক হোটেল রয়েছে সেখানে থাকতে পারেন। রুমভাড়া ১০০০ থেকে ১৫০০ টাকার মধ্যে। এই হোটেলের প্রায় পায়ে হাঁটা দূরত্বে তাবো মনাস্ট্রি ও তাবো কেভ। সকালে পায়ে হেঁটে ঘুরে নিতে পারেন ভারত তথা বিশ্বের প্রাচীন এই মনাস্ট্রি। 

তাবো মনাস্ট্রি  

রেকংপিও থেকে কাজা যাওয়ার মধ্যবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত তাবো গ্রাম। এই গ্রামে তাবো মনাস্ট্রি ভারত এবং সমগ্র হিমালয়ে সবচেয়ে প্রাচীন ধারাবাহিকভাবে কর্মরত বৌদ্ধধর্মের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। মনাস্ট্রির দেওয়ালে আঁকা অসংখ্য ফ্রেস্কোতে বৌদ্ধ ধর্মের নানা কাহিনি ও দেবদেবীর 

চিত্র ফুটে উঠেছে।  মনাস্ট্রির প্রাঙ্গণে অনেকগুলি স্তূপ রয়েছে, যার মধ্যে চারটির অভ্যন্তরে চিত্রকর্ম দেখা যায়। এই স্তূপগুলির মধ্যে দুটি চিত্র প্রায় ১৩শ শতাব্দীর বলে জানা যায়।এখানে অমূল্য থাঙ্কা (স্ক্রল পেইন্টিং), সুসংরক্ষিত মূর্তি,দেওয়ালচিত্রের এক বিশাল সংগ্রহ রয়েছে, যা প্রায় প্রতিটি দেওয়ালে বিরাজমান। 

হিমালয়ের অন্যতম প্রাচীন মনাস্ট্রি | ফটো- বিশ্বয়নী দত্ত

  ১৯৭৫ সালের ভূমিকম্পের পর মনাস্ট্রিটিকে পুনর্নির্মাণ করা হয় এবং ১৯৮৩ সালে একটি নতুন ‘দু-কাং’ বা সমাবেশ হল তৈরি করা হয়। এখানেই ১৪তম দলাই লামা ১৯৮৩ এবং ১৯৯৬ সালে কালচক্র অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন। উল্লেখযোগ্যভাবে তাবো মনাস্ট্রিটি ভারতের প্রত্নতাত্ত্বিক সংস্থা ASI কর্তৃক জাতীয় ঐতিহ্যবাহী সম্পদ হিসেবে সংরক্ষিত।

তাবো কেভ

তাবোর গুহাগুলিকে “হিমালয়ের অজন্তা” বলা যায়।  হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে দাঁড়িয়ে রয়েছে এই গুহা যার আনাচেকানাচে লেগে রয়েছে তিব্বতি বৌদ্ধধর্মের প্রাচীন ইতিহাস।  তাবো মনাস্ট্রি থেকেই এই গুহাগুলি সহজেই দেখা যায় এবং দূর থেকেও এদের সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। তাবোর গুহাগুলির ভিতরে পাথরের দেয়াল। কিছু গুহা আবার একাধিক তলা বিশিষ্ট এবং সেখানে সমাবেশ কক্ষও রয়েছে। অনেক গুহার একাধিক ঘর পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত। এখানে বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা ধ্যান করতেন।  ভিতরে গুহাগুলি শান্ত, শীতল এবং প্রায় ফাঁকা, যেখানে এক বা দুইজন বসে ধ্যান করার মতো জায়গা রয়েছে। কিছু গুহা সরু পথ দিয়ে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত, আবার কিছু গুহায় ছোট ছোট জানালা রয়েছে, যেখান দিয়ে প্রাকৃতিক আলো ঢুকে এক শান্ত, কোমল পরিবেশ সৃষ্টি করে। সহজেই কল্পনা করা যায়, শত শত বছর আগে সন্ন্যাসীরা এই নীরবতার মধ্যে বসে অন্তরের শান্তি খুঁজে পেতেন।  শহরের ব্যস্ততা, যান্ত্রিকতা থেকে বহুদূর মনের শান্তি খুঁজতে স্পিতির তাবো গ্রামে অনায়াসে কাটিয়ে আসা যায় দু’দিন। গায়ে মেখে আসা যায় বৌদ্ধ ধর্মের প্রাচীন ইতিহাসকেও। 

চলবে……………..

তথ্যসূত্র

উইকিপিডিয়া
নিজস্ব অভিজ্ঞতা







স্পিতি-এককথায় ভয়ঙ্কর সুন্দর………Part : 1

কেউ বলে মুন ল্যান্ড, কেউ বলে স্পিতি…তবে যেখানে গেলে একটাই শব্দ মুখ থেকে বেরোয় তা হল ভয়ঙ্কর সুন্দর। ভয়ঙ্কর আর সুন্দর দুটো বিপরীতার্থক শব্দ কিন্তু স্পিতি এই দুটোর অর্থই বহন করে।

কল্পা পেরনোর পর যে রাস্তা ধরে গাড়ি আস্তেআস্তে স্পিতির উদ্দেশ্যে এগোয় ,চোখে না দেখলে সেই রাস্তার ভয়াবহতা বর্ণণা করা প্রায় অসম্ভব। আবার সেই রাস্তার সৌন্দর্য্য প্রকাশ করার মতো ভাষাও শব্দভাণ্ডারে আছে বলে আমার জানা নেই। সুবিশাল পাথর কেটে রাস্তা তৈরি হয়েছে, তার ঠিক গা ঘেষে 

চলে যাচ্ছে সর্পিল রাস্তা, আরেকপাশে চড়া খাড়াই। যেদিকে চোখ যাবে সেদিকেই পাহাড়, কোথাও পাহাড়ের রঙ হালকা সবুজ, কোথাও পাহাড়ের রঙ হালকা বাদামি, কোথাও বা পাহাড় পাথুড়ে রঙের। আবার কোথাও দৃশ্যপটে  প্রত্যেক রূপের পাহাড় চোখে ধরা দেয়। মাঝে মাঝে উঁকি দেবে বরফে মোড়া বিশাল পাহাড়। স্পিতি যাওয়ার গোটা রাস্তাই ক্ষণে ক্ষণে বদলে যায় পুরো ল্যান্ডস্কেপ। সঙ্গে বদলে যায় আকাশের রূপ।

হিমালয়ের মাঝে একফালি প্রিয় ‘স্পিতি’

ফটো- বিশ্বয়নী দত্ত

কীভাবে যাবেন স্পিতি উপত্যকা?

হাওড়া বা শালিমার থেকে চণ্ডীগড়, চণ্ডীগড় থেকে স্করপিও বা সেডান বা ট্রাভেলার নিয়ে শিমলা হয়ে নারকান্ডা।নারকান্দা থেকে সারাহান, সারাহান থেকে সাংলা, সাংলা থেকে কল্পা, কল্পা থেকেই শুরু হয় স্পিতি ভ্যালির রাস্তা। গাড়ি ভাড়া দিন প্রতি ৬ হাজার থেকে ৭ হাজার টাকা, ট্রাভেলারের ক্ষেত্রে প্রায় ১২০০০টাকা পড়ে। নারকান্দা, সারাহান, সাংলা, কল্পা প্রত্যেক জায়গায় একদিন করে থাকা বাধ্যতামূলক। কারণ মানবদেহে আবহাওয়া পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার জন্য কিছু সময় প্রয়োজন। প্রত্যেক জায়গায় রাত্রিবাস করে আপনাদের শরীরকেও সময় দেওয়া হয় ওই জায়গার আবহাওয়া ও পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার জন্য। 

সারাহান-ভীমাকালি মন্দির ৫১ শক্তিপীঠের অন্যতম

প্রথম দিন চণ্ডীগড় থেকে শিমলা-কুফরি হয়ে চলে যান সারাহান। শিমলা থেকে প্রায় ১৮০ কিমি দূরে অবস্থিত সারাহান। সারাহানে ভীমাকালি মন্দির রয়েছে যা ৫১ শক্তিপীঠের অন্যতম। পুরাণ মতে এই স্থানে

দেবী দূর্গার বাম কান পড়েছিল। এটি প্রায় ৮০০ বছরের পুরনো মন্দির। দেবী দূর্গা স্থানীয়দের কাছে ভীমাকালী রূপে পূজিত হন।  দেবী ভীমাকালী প্রাক্তন বুশাহর রাজ্যের শাসকদের কুলদেবী ছিলেন। হিমাচল প্রদেশে এই মন্দিরটি একটি জনপ্রিয় তীর্থস্থান। ১৯২০-এর দশকে রাজা পদম সিং মন্দিরটির পুনর্নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

ভীমাকালি মন্দিরের বাইরের ফটক । ফটো – বিশ্বয়নী দত্ত

১৯০৫ সালের কাংড়া ভূমিকম্পের সময় মন্দিরের প্রধান স্থাপত্যটি কিছুটা হেলে পড়েছিল, কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে পরবর্তী কম্পনের পর তা আবার সোজা হয়ে যায়। এই মন্দির রানউইন গ্রাম পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার দীর্ঘ একটি পরিত্যক্ত গোপন সুড়ঙ্গের সঙ্গে যুক্ত। বরফ পড়লে যেহেতু যাতায়াত করতে অসুবিধা হত তাই প্রাচীনকালে পুরোহিতরা এই গোপন পথ ব্যবহার করে মন্দিরে যাতায়াত করতেন।

মন্দিরটি তার অনন্য স্থাপত্য, ধর্মীয় গুরুত্ব এবং হিমালয়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য বিখ্যাত। মন্দিরটির স্থাপত্য হিমালীয় ধাঁচের, যেখানে মন্দির নির্মাণে কাঠ ও পাথরের যুগ্ম ব্যবহার চোখে পড়ার মতো। উপরের তলায় দেবী ভীমাকালীর মূর্তি রয়েছে। আর নীচের তলায় তাঁর প্রাচীন রূপের মূর্তিতে পূজা করা হয়।  মন্দির প্রাঙ্গণে আরও বিভিন্ন দেবদেবীর মন্দির রয়েছে, যেমন রঘুনাথজি, নরসিংহ, গণেশ প্রভৃতি।

অন্য লোককথা অনুযায়ী,  ভীম নামক এক অসুরকে বধ করেন দেবী দূর্গা। তাই ভীমাকালী রূপে এই মন্দিরে পূজিত হন দেবী। মূল মন্দিরে ক্য়ামেরা বা মোবাইল ফোন নিয়ে প্রবেশ নিষেধ। মন্দিরের বাইরে কাউন্টারে জমা দিতে হয় মোবাইল বা ক্যামেরা। খালি পায়েই মন্দির প্রবেশ করা বাধ্যতামূলক, জুতো বা মোজা পরে থাকলে সেগুলো খুলে প্রবেশ করতে হয়। স্থানীয় নিয়ম অনুযায়ী মহিলা বা পুরুষ উভয়কেই হিমাচলী টুপি বা মাথা ঢেকে মন্দির প্রবেশ করতে হয়। 

সারাহানে মন্দিরের আশেপাশে হোটেল শ্রীখণ্ড, স্নো ভিউ-র মতো বেশ কিছু হোটেল রয়েছে, ১২০০ থেকে ২০০০-এর মধ্যে রুম ভাড়া পড়বে। সেখানে করবেন রাত্রিবাস। সকালে পায়ে হেঁটে ঘুরে দেখুন মন্দির। Raise Your Concern About this Content

মন্দিরের ঠিক বিপরীত দিকে একটা রাস্তা চলে যাচ্ছে, সেই রাস্তায় ৫ মিনিট হাঁটলেই দেখতে পারেন সারাহান রাজবাড়ি রয়্যাল প্যালেস। যদিও রাজবাড়িতে সাধারণের অনুপ্রবেশ নিষেধ। হিমালীয় ধাঁচের ও নকশা দেখতে রাজবাড়িটি চোখে দেখা আবশ্যক। নাই বা ঢুকতে পারেন। বাইরে থেকে দেখেও তো চক্ষু-কর্ণের বিবাদভঞ্জন করা যায় নাকি।  রাজবাড়ি যাওয়ার রাস্তায় সারি সারি আপেল গাছ, থোকা থোকা আপেল ঝুলছে । জুনের দিকে গেলে সেই আপেল পুরো সবুজ হয়ে গাছ থেকে ঝুলতে দেখবেন। 

তারান্ডা দেবীর মন্দির । ফটো- বিশ্বয়নী দত্ত

কিন্নর গেট ও তারান্ডা দেবীর মন্দির 

পরের দিনের গন্তব্য সাংলা। সাংলা যাওয়ার রাস্তায় আপনারা দেখতে পাবেন সেই বিখ্যাত কিন্নর গেট।  পাথর কেটে বানানো সেই রাস্তা দিয়ে গাড়ি চলাচল দেখলে এখনও অবিশ্বাস্য বলে মনে হয়। যাওয়ার রাস্তায় একটা নাম জানা পাহাড়ি ঝর্ণা দেখা মিলবে। জলের তোড় এত বেশি, ঝর্ণার জল যেখানে পড়ছে ঠিক সেখানে দেখা মিলতে পারে সাতরঙা রামধনুর। কিন্নর গেট পেরিয়ে কিছুটা পথ যাওয়ার পর দর্শন করে নেবেন তারান্ডা দেবীর মন্দির।  

হিমাচল প্রদেশের কিন্নর জেলার নিগুলসারি এলাকায়, NH-5 সড়কের একেবারে খাদ ঘেষে মা তারান্ডা দেবীর একটি মন্দির রয়েছে। কিন্নরের দিকে যাওয়া এবং কিন্নরের দিক থেকে ফেরা প্রায় সব যানবাহনই এই মন্দিরে থামে। স্থানীয়দের বিশ্বাস, এই দুর্গম ও বিপজ্জনক পাহাড়ি রাস্তায় মা তারান্ডা দেবী সবাইকে রক্ষা করেন। গ্রামের মানুষদের কাছ থেকে এই এলাকায় ঘটে যাওয়া বহু দুর্ঘটনার গল্প শোনা যায়। তাই নিয়ম মেনেই এখানে থেমে প্রার্থনা করার প্রচলন রয়েছে।

১৯৬২ সালের ভারত-চীন যুদ্ধের পর, সীমান্তে সহজে অস্ত্র ও সরঞ্জাম পৌঁছে দেওয়ার জন্য সেনাবাহিনী এই অঞ্চলে একটি রাস্তা নির্মাণের পরিকল্পনা করে। ১৯৬৩ সালে সেনাবাহিনীর BRO-র গ্রাফ উইং এখানে রাস্তা নির্মাণ শুরু করে। কিন্তু নির্মাণকাজ চলাকালীন প্রায় প্রতিদিনই পাথর ধসে কোনও না কোনও শ্রমিকের মৃত্যু হত। এতে সেনাবাহিনী খুবই চিন্তিত হয়ে পড়ে। পরে তারান্ডা গ্রামের মানুষরা সেনাবাহিনীকে গ্রামের মা চন্দ্রলেখা দেবীর মন্দিরে যাওয়ার পরামর্শ দেয়। ওই মন্দিরের পুরোহিত যেখানে রাস্তা তৈরি করা হচ্ছে, সেখানে দেবীকে প্রতিষ্ঠা করতে বলেন । পুরোহিতের কথা মতো সেনাবাহিনী সেখানে একটি মন্দির নির্মাণ করে এবং তারান্ডা গ্রাম থেকে দেবীর মূর্তি এনে প্রতিষ্ঠা করে। ১৯৬৫ সালে মন্দির নির্মাণ সম্পন্ন হওয়ার পর রাস্তার কাজও শেষ হয় এবং এরপর আর কোনও দুর্ঘটনা ঘটেনি। তখন থেকেই বিশ্বাস করা হয়, যে কেউ এই মন্দিরে মাথা নত করে প্রার্থনা করে, তার কোনো অমঙ্গল হয় না।

নিগুলসারির তারান্ডা গ্রামে এখনও দেবী চন্দ্রলেখার রথ সংরক্ষিত রয়েছে। এখানে দেবীর একটি প্রাচীন মন্দিরও আছে। উৎসবের সময় দেবীর রথযাত্রা হয় এবং বিশ্বাস করা হয়, এতে এলাকার মানুষের দুঃখ-কষ্ট দূর হয়। মন্দিরের দর্শন সেরে পরের গন্তব্য কারছাম ড্যাম। বাসপা নদীর উপর এই ড্যাম অবস্থিত। বাসপা নদীর উপর জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র রয়েছে। চারিদিকে সৌন্দর্য্য নৈস্বর্গীক। বাসপা নদী পেরিয়ে আমাদের পরের গন্তব্য সাংলার কামরু ফোর্ট।  

কামরু ফোর্ট- সাংলা

কামরু হল ভারতের হিমাচল প্রদেশ-এর কিন্নর জেলার সাংলা উপত্যকায় অবস্থিত একটি গ্রাম। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২,৯০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত এই গ্রামটি পর্যটন কেন্দ্র সাংলা থেকে প্রায় ২ কিলোমিটার দূরে, কিন্নর কৈলাশ পর্বতের পাদদেশে অবস্থিত।

পাণ্ডবদের নির্মিত কামরু ফোর্ট, হাজার হাজার বছর ধরে গল্প বলা ইতিহাস | ফটো- বিশ্বয়নী দত্ত




কামরু গ্রামটি প্রাচীন বুশাহর রাজ্যের রাজধানী ছিল। গ্রামের সর্বোচ্চ স্থানে টাওয়ার-আকৃতির কামরু ফোর্ট অবস্থিত। মনে করা হয়, এই দূর্গ  হাজার হাজার বছর আগে পাণ্ডবরা নির্মাণ করেছিলেন। এই দুর্গের ভেতরে প্রায় ৩৩ প্রকার দেবদেবীর অবস্থান রয়েছে বলে লোককথায় উল্লেখ আছে। দুর্গের প্রাঙ্গণে কামাখ্যা দেবীর একটি মন্দিরও রয়েছে। বহু বছর আগে অসম থেকে কামাখ্যা দেবীর মূর্তি এখানে আনা হয়েছিল। কামরু দুর্গটি সাততলা। নিচের দুটি তলা পাথর দিয়ে তৈরি, আর উপরের পাঁচটি তলা সম্পূর্ণ কাঠ দিয়ে নির্মিত। মূল দুর্গের ভেতরে পুরোহিত ছাড়া অন্য কারও প্রবেশের অনুমতি নেই। দুর্গের ভেতরে প্রাক্তন রাজাদের ব্যবহৃত অনেক অস্ত্রশস্ত্র ও সামগ্রী সংরক্ষিত রয়েছে। এই দুর্গে প্রবেশ করতে মহিলা ও পুরুষ উভয়কেই মাথায় হিমাচলী চুপি বা শাল বা ওড়না জাতীয় কাপড় দিয়ে মাথা ঢাকা দিয়ে, জুতো-মোজা খুলে, কোমড়ে দড়ি বেঁধে মন্দিরে প্রবেশ করতে হয়। মন্দির কর্তৃপক্ষের তরফেই ওই টুপি ও কোমড়ে বাঁধার ফিতে দেওয়া হয়। সেদিন রাত্রিবাস সাংলায়। কামরু ফোর্টের কাছাকাছি সাংলা ম্যানশন,  সাংলা রিট্রিট  একাধিক হোটেল রয়েছে, সেখানে থাকতে পারেন। কামরু ফোর্ট থেকে নীচেও নেমে আসতে পারেন সেখানে ভিড় একটু কম। কামরু ফোর্টের নীচের দিকে হোটেল গীতাঞ্জলি রয়েছে সেখানেও রাত্রিবাস করতে পারেন।

বাসপা নদীর তীরে ভারতের শেষ গ্রাম চিটকুল । ফটো- বিশ্বয়নী দত্ত

 

ভারতের শেষ গ্রাম- চিটকুল

সাংলা থেকেই ঘুরে আসতে হবে ভারতের শেষ গ্রাম চিটকুল। ভারত-তিব্বত বর্ডার পুলিশ ফোর্স 2ND BN NAGATI POST, সেনাবাহিনী সুরক্ষিত এলাকায় পারমিট করিয়ে ঘুরে আসুন। চিটকুলের পাহাড়ের পিছনের অঞ্চল হচ্ছে তিব্বত।  চিটকুলের গ্রামের মধ্যে দিয়ে বয়ে চলেছে বাসপা নদী। বাসপা নদীর তীরে অনেকে ক্যাম্প রয়েছে। সেখানে রাত্রিযাপন করা যেতে পারে। জস্টেল চিটকুল বা বাসপা রিভার ক্যাম্পে থাকতে পারেন। ১৫০০ থেকে ৩০০০-এর মধ্যে হোটেল ভাড়া পড়বে। তবে রাতে প্রচন্ড ঠান্ডা পড়ে। তাই চিটকুল ঘুরে কল্পা বা সাংলা রাত্রিবাস করা ভালো। 

গাড়ি- ট্রাভেলর- রানাপ্রতাপ সিং 9805354377 (ওনার কাছ স্করপিও বা সেডানের গাড়িj বুক করার  কন্ট্যাক্ট নম্বরও পেয়ে যেতে পারেন )

চলবে………………

তথ্যসূত্র-

১. উইকিপিডিয়া 
২. নিজস্ব অভিজ্ঞতা

বিশ্বের সবচেয়ে বহুসাংস্কৃতিক শহর টরন্টো এক শহরে যেন গোটা পৃথিবীর মিলনমেলা

কেন টরন্টোকে বিশ্বের সবচেয়ে বহুসাংস্কৃতিক শহর বলা হয়?

১) জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই বিদেশে জন্মগ্রহণকারী

টরন্টোর সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো এর অভিবাসী জনসংখ্যা। সাম্প্রতিক জনগণনা অনুযায়ী, টরন্টো শহরের প্রায় ৪৬ শতাংশ বাসিন্দা বিদেশে জন্মগ্রহণ করেছেন। বৃহত্তর টরন্টো অঞ্চলেও (Greater Toronto Area) এই হার অত্যন্ত বেশি। বিশ্বের বড় শহরগুলোর মধ্যে এত বড় পরিসরে বিদেশে জন্ম নেওয়া মানুষের বসবাস খুবই বিরল। ফলে শহরটি কার্যত বিশ্বের নানা দেশের মানুষের মিলনস্থলে পরিণত হয়েছে।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

২) ২০০-রও বেশি জাতিগোষ্ঠীর সহাবস্থান

টরন্টোতে শুধু বিভিন্ন দেশের মানুষই নয়, ২০০-রও বেশি জাতিগত ও নৃতাত্ত্বিক সম্প্রদায় বসবাস করে। ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, চীন, ফিলিপাইন, ইতালি, গ্রিস, জ্যামাইকা, ইরান, ইউক্রেন, নাইজেরিয়া, শ্রীলঙ্কা, আফগানিস্তান, সোমালিয়া—তালিকা দীর্ঘ। এই বৈচিত্র্য শহরের অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও সামাজিক জীবনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

৩) ১৮০-রও বেশি ভাষা ও উপভাষার ব্যবহার

ইংরেজি অবশ্যই প্রধান ভাষা। তবে দৈনন্দিন জীবনে শোনা যায় বাংলা, হিন্দি, পাঞ্জাবি, উর্দু , আরবি , মান্দারিন , ক্যান্টনিজ , স্প্যানিশ তামিল,  ফার্সি , রুশ , পর্তুগিজ , কোরিয়ান- সহ ১৮০-রও বেশি ভাষা ও উপভাষা। টরন্টোর অনেক সরকারি অফিস, হাসপাতাল, স্কুল এবং জনসেবামূলক সংস্থা বহু ভাষায় পরিষেবা দেয়।

৪) কানাডার বহুসংস্কৃতিবাদ নীতির বড় প্রভাব

১৯৭১ সালে কানাডা বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে Multiculturalism Policy গ্রহণ করে। পরবর্তীতে Canadian Multiculturalism Act (1988) এই নীতিকে আইনি স্বীকৃতি দেয়।এই নীতির মূল উদ্দেশ্য হল সব সংস্কৃতিকে সমান মর্যাদা দেওয়া , বৈষম্য কমানো , নতুন অভিবাসীদের সমাজে অন্তর্ভুক্ত করা , নিজস্ব সংস্কৃতি ধরে রাখার অধিকার নিশ্চিত করা । টরন্টো এই নীতির সবচেয়ে সফল উদাহরণগুলোর একটি।

৫) অভিবাসীদের স্বপ্নের শহর

প্রতি বছর বিশ্বের নানা দেশ থেকে হাজার হাজার মানুষ কাজ, পড়াশোনা ও স্থায়ী বসবাসের জন্য টরন্টোতে আসেন।এর প্রধান কারণ হল- উন্নত চাকরির বাজার , বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয়,  উন্নত স্বাস্থ্যব্যবস্থা, নিরাপদ নগরজীবন , বহুসাংস্কৃতিক পরিবেশ। অনেক নতুন অভিবাসীর কাছে টরন্টোই কানাডায় প্রথম ঠিকানা।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

৬) বিশ্বের প্রায় সব দেশের মানুষের বসবাস

টরন্টোকে অনেক সময় “The World Within a City” বলা হয়।কারণ, বিশ্বের প্রায় প্রতিটি অঞ্চলের মানুষ এখানে বসবাস করেন। জাতিসংঘের সদস্যভুক্ত অধিকাংশ দেশের প্রতিনিধিত্ব কোনো না কোনোভাবে টরন্টোর জনসংখ্যায় দেখা যায়।

৭) ধর্মীয় বৈচিত্র্যের অনন্য উদাহরণ

টরন্টো এমন একটি শহর, যেখানে— গির্জা , মসজিদ , হিন্দু মন্দির , শিখ গুরুদ্বার,  বৌদ্ধ বিহার , সিনাগগ সবই পাশাপাশি দেখা যায়।

শহরে বড়দিন, ঈদ, দীপাবলি, বৈশাখ, বৈশাখী, হনুক্কা, নওরোজ, লুনার নিউ ইয়ার—সব উৎসবই উদ্‌যাপিত হয়। ধর্মীয় সহনশীলতা টরন্টোর অন্যতম বড় শক্তি।

বিশ্বের নানা দেশের খাবারের রাজধানী

টরন্টোকে উত্তর আমেরিকার অন্যতম সেরা Food Capital বলা হয়। এখানে পাওয়া যায়-  বাংলাদেশি বিরিয়ানি, ভারতীয় থালি , জাপানি সুশি,  কোরিয়ান বারবিকিউ , ইতালিয়ান, গ্রিক সুভলাকি , মেক্সিকান টাকো , ইথিওপিয়ান খাবার, মধ্যপ্রাচ্যের শাওয়ারমা সহশহরে হাজার হাজার আন্তর্জাতিক রেস্তোরাঁ রয়েছে।

এক শহরে বহু সংস্কৃতির পাড়া

টরন্টোর অন্যতম আকর্ষণ এর সাংস্কৃতিক অঞ্চলগুলো। সবচেয়ে পরিচিত কয়েকটি—Chinatown , Little Italy , Greektown , Koreatown , Little India , Kensington Market , Roncesvalles (পোলিশ সম্প্রদায়) , Little Portugal  প্রতিটি এলাকাই নিজস্ব সংস্কৃতি, খাবার ও উৎসবের জন্য বিখ্যাত।

আন্তর্জাতিক উৎসবের শহর

বছরজুড়ে টরন্টোতে অনুষ্ঠিত হয় অসংখ্য আন্তর্জাতিক উৎসব। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—Toronto Caribbean Carnival (Caribana) , Toronto International Film Festival (TIFF) , Taste of the Danforth , Pride Toronto , Cavalcade of Lights , Toronto Fringe Festival এই উৎসবগুলো প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ দর্শককে আকর্ষণ করে।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

শিল্প, সঙ্গীত ও ফ্যাশনে বহুসংস্কৃতির প্রভাব

টরন্টোর সংগীতজগতে হিপ-হপ, জ্যাজ, ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীত, আফ্রিকান বিট, কোরিয়ান পপ—সবকিছুর প্রভাব রয়েছে। ফ্যাশনেও দেখা যায় নানা সংস্কৃতির সংমিশ্রণ। শহরের আর্ট গ্যালারি ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রগুলোতেও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিল্পকর্ম প্রদর্শিত হয়।

খেলাধুলাতেও সংস্কৃতির মিলন

টরন্টোতে ফুটবল, ক্রিকেট , বাস্কেটবল , আইস হকি এবং বেসবল সব খেলাই জনপ্রিয়।বিশেষ করে দক্ষিণ এশীয় অভিবাসীদের কারণে ক্রিকেট দ্রুত জনপ্রিয়তা পাচ্ছে।অন্যদিকে বাস্কেটবল ও ফুটবলও বহুজাতিক জনগোষ্ঠীকে একত্রিত করেছে।

প্রযুক্তি ও ব্যবসায় বহুজাতিক কর্মপরিবেশ

টরন্টো এখন উত্তর আমেরিকার অন্যতম দ্রুত বিকাশমান প্রযুক্তি কেন্দ্র। Google, Microsoft, Amazon, Shopify, IBM-সহ বহু আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের অফিস এখানে রয়েছে। বিশ্বের নানা দেশের দক্ষ কর্মীরা একসঙ্গে কাজ করেন। এই বৈচিত্র্য নতুন উদ্ভাবন ও স্টার্টআপ সংস্কৃতিকে শক্তিশালী করেছে।

বৈচিত্র্যের মধ্যেও সামাজিক সম্প্রীতি

বহুসংস্কৃতি থাকা মানেই যে সংঘাত হবে, টরন্টো সেই ধারণাকে অনেকটাই ভুল প্রমাণ করেছে।এখানে বৈষম্যবিরোধী আইন , অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা,  কমিউনিটি প্রোগ্রাম,  সরকারি সহায়তা, বহুভাষিক পরিষেবা সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যদিও বর্ণবাদ বা বৈষম্যের বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটে, তবুও সামগ্রিকভাবে শহরটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ার ক্ষেত্রে বিশ্বে উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়।Raise Your Concern About this Content

পর্যটকদের কাছে সাংস্কৃতিক আকর্ষণ

পর্যটকেরা শুধু CN Tower বা Niagara Falls-এর জন্যই টরন্টোতে আসেন না। তারা আসেন—আন্তর্জাতিক খাবারের স্বাদ নিতে,  বিভিন্ন সংস্কৃতির উৎসব দেখতে , ঐতিহাসিক অভিবাসী পাড়া ঘুরতে , বহুসাংস্কৃতিক জীবনযাত্রার অভিজ্ঞতা অর্জন করতে।  এ কারণেই টরন্টোকে অনেকেই “বিশ্বের সংস্কৃতির মিলনমেলা” বলে অভিহিত করেন।

ভবিষ্যতের টরন্টো—বৈচিত্র্য কি আরও বাড়বে?

বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী কয়েক দশকে কানাডার জনসংখ্যা বৃদ্ধির প্রধান উৎস হবে অভিবাসন। সেই কারণে টরন্টোতে নতুন ভাষা, নতুন সংস্কৃতি ও নতুন জনগোষ্ঠীর উপস্থিতি আরও বাড়বে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, প্রযুক্তি, গবেষণা ও আন্তর্জাতিক ব্যবসার কেন্দ্র হিসেবে শহরটির গুরুত্ব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর বহুসাংস্কৃতিক চরিত্রও আরও শক্তিশালী হবে।

পরিশেষে বলা যায়,  টরন্টোকে অনেক সময় “The World in One City“ বলেও উল্লেখ করা হয়।   শহরে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ দক্ষিণ এশীয়, চীনা ও ক্যারিবীয় অভিবাসী সম্প্রদায় রয়েছে। টরন্টো পাবলিক লাইব্রেরি বহু ভাষায় বই সরবরাহ করে।  শহরের বিভিন্ন স্কুলে শতাধিক মাতৃভাষার শিক্ষার্থীরা একসঙ্গে পড়াশোনা করে। টরন্টো বিশ্বের অন্যতম নিরাপদ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক মহানগর হিসেবে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূচকে নিয়মিত স্থান পায়। তাই টরন্টোর পরিচয় শুধু একটি আধুনিক মহানগর হিসেবে নয় এটি এমন একটি শহর যেখানে পৃথিবীর নানা প্রান্তের মানুষ নিজেদের সংস্কৃতি, ভাষা ও পরিচয় বজায় রেখেও একই সমাজের অংশ হয়ে উঠেছেন। বৈচিত্র্যকে বিভাজনের নয়, বরং শক্তির উৎস হিসেবে গ্রহণ করার যে উদাহরণ টরন্টো তৈরি করেছে, তা আজ বিশ্বের বহু শহরের কাছেই অনুকরণীয়। দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বে টরন্টো তাই কেবল কানাডার অর্থনৈতিক কেন্দ্র নয়, বহুসংস্কৃতির সফল সহাবস্থানেরও এক উজ্জ্বল প্রতীক।

তথ্যসূত্র :

১. টরন্টোর জনসংখ্যায় বিদেশে জন্মগ্রহণকারীর হার, জাতিগোষ্ঠী ও ভাষার তথ্য
২. কানাডার বহুসংস্কৃতিবাদ নীতি ও Canadian Multiculturalism Act (1988)
৩.  টরন্টোর আন্তর্জাতিক উৎসব
৪. প্রযুক্তি, স্টার্টআপ ও বহুজাতিক কর্মপরিবেশ
৫. বহুভাষিক পরিষেবা ও সামাজিক বৈচিত্র্য

লুকা মদ্রিচের যুদ্ধ বিপর্যস্ত শৈশব

জীবন যুদ্ধ থেকে ফুটবল মহাযুদ্ধ যিনি জীবনের প্রত্যেক জয়ের খেতাব বারবার অর্জন করেছেন নিজ দক্ষতায় তিনি লুকা মদ্রিদ। নাম তো শুনা হি হোগা। 

কৃতজ্ঞতা স্বীকার-গুগল

লুকা মদ্রিচ

ক্রোয়েশিয়ার ফুটবলের জাদুকর লুকা মদ্রিচ। স্টিপে মদ্রিচ ও রাদোইকা দোপুড় দম্পতির প্রথম সন্তান। তাঁর বাবা স্টিপের বাড়ি ছিল মোদ্রিচি গ্রামে, আর মা রাদোইকার জন্ম ওব্রোভাচের কাছাকাছি ক্রুশেভো গ্রামে। প্রথম জীবনে একটি নিটওয়্যার কারখানায় কাজ করতেন তাঁর বাবা-মা।

পিতামহের বাড়িতে শৈশব কেটেছিল লুকার।

যুদ্ধে দগ্ধ শৈশব, শরনার্থী শিবিরের যন্ত্রণা, শারীরিক প্রতিবন্ধকতা বলে বলে গোল দিয়ে ফুটবলের বিশ্বমঞ্চে জ্বলজ্বল করছে তাঁর নাম। আজ বিশ্বের অন্যতম সেরা মিডফিল্ডার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছেন লুকা। ক্রোয়েশিয়ার জাতীয় নায়কেরও খেতাব অর্জন করেছেন ব্যালন ডি’অর বিজয়ী।

লুকার কৃতীত্ব 

রিয়েল মাদ্রিদের হয়ে খেলে জিনে আনেন ৬টি চ্যাম্পিয়ন লিগ, ৪টি লা লিগা-সহ অসংখ্য শিরোপা। ২০১৮ সালে বিশ্বকাপের ফাইনালে তুলে দেন নিজের দেশ ক্রোয়েশিয়াকে।   লিওনেল মেসি ও ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর আধিপত্য ভেঙে জয় করেন ফুটবলের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত সম্মান ব্যালন ডি’অরের খেতাব। ৪০ বছর বয়সেও ফুটবল মাঠে ঝড় তোলেন তিনি। 

স্বজন হারানোর যন্ত্রণা

১৯৯১ সালের ক্রোয়েশিয়ার স্বাধীনতার যুদ্ধ ধ্বংস করে দিয়েছিল তাঁর শৈশব। খুব কাছ থেকে দেখেছেন যুদ্ধের ভয়াবহতা। দীর্ঘদিন উদ্বাস্তু জীবন কাটাতে হয়েছিল তাঁর পরিবারকে। স্বাধীনতার যুদ্ধের সময় সার্বিয়ান বিপ্লবীরা দখল করে নেয় তাঁদের গ্রাম। ৬ বছরের ছোট্ট লুকার সামনে গুলি করে হত্যা করা হয় তাঁর পিতামহকে। শৈশবের যাঁর সঙ্গে কাটিয়েছিলেন অনেকটা সময়। চোখের সামনে তাঁর মৃত্যু লুকার জীবনে গভীরভাবে প্রভাব ফেলে।স্বজন হারানোর তীব্র যন্ত্রণা শিশু বয়স থেকেই বয়ে নিয়ে চলেছেন।  

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

শরনার্থী শিবিরের হাহাকার

ঘরবাড়ি হারিয়ে জাদারের শরনার্থী শিবিরে আশ্রয় নেয় তাঁর পরিবার। শরনার্থী শিবিরে তীব্র জলকষ্টে জীবন কাটাতে হত লুকার পরিবারকে।  ক্রোয়েশিয়ান সেনাবাহিনীতে অ্যারোমেকানিক হিসেবে যোগ দেন তাঁর বাবা। ফুটফুটে শৈশবের বদলে যুদ্ধ বিপর্যস্ত শৈশবই ছিল লুকার সঙ্গী। 

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

যন্ত্রণার মলম ফুটবল

মাত্র ৬ বছর বয়সে খুব কাছ থেকে যুদ্ধের বিভীষিকাকে দেখেছেন। প্রতিনিয়ত বোমা পড়ত জাদার শহরে। যুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে মুক্তি পেতে ফুটবলকে আঁকড়ে ধরেন লুকা। যুদ্ধ বিপর্যস্ত ক্রোয়েশিয়ার ভূমিতে হয় তাঁর ফুটবল খেলার হাতেখড়ি। হোটেলের পার্কিং লটেই শরনার্থী শিবিরের আরও শিশুদের সঙ্গে ফুটবল খেলতেন। ১৯৯২ সালে প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ফুটবল একাডেমিতে ভর্তি করা হয় তাঁকে।

আর্থিকভাবে খুব একটা সচ্ছল না হলেও,তাঁর পড়াশোনা ও ফুটবল প্রশিক্ষণের কোনরকম ত্রুটি রাখেনি তাঁর পরিবার। আর্থিক সহায়তা করেছেন তাঁর কাকাও।

লুকার অনুপ্রেরণা

ছোটবেলায় ক্রোয়েশিয়ার কিংবদন্তি ফুটবলার জ্ভোনিমির বোবান এবং ইতালির তারকা ফ্রানচেস্কো তত্তির খেলা দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন লুকা মদ্রিচ। তাঁদের আদর্শ মেনেই একদিন বিশ্বের অন্যতম সেরা মিডফিল্ডার হয়ে ওঠার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন তিনি।Raise Your Concern About this Content

লুকার ফুটবল জীবন

যুদ্ধ জয়ের হাসি | কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

পরিবারের সমর্থনে বিভিন্ন প্রতিনিধি প্রশিক্ষণ শিবিরে অংশগ্রহণ করেন লুকা। এনকে জাদার (NK Zadar) ক্লাবে অনুশীলন শুরু করেন। কোচ ছিলেন ডোমাগয় বাশিচ। ডৌমাগয় ও যুব একাডেমির প্রধান তোমিস্লাভ বাশিচের তত্ত্বাবধানে প্রশিক্ষণ শুরু হয় তাঁর। 

সেইসময় মদ্রিচ ছিল বয়সে অনেক ছোট, শারীরিকভাবে অনেক রোগা এবং দুর্বল। তাই ডালমেশিয়া অঞ্চলের অন্যতম জনপ্রিয় ও শক্তিশালী ক্লাব হাজদুক স্প্লিট তাঁকে দলে নিতে চায়নি।  পরে ইতালিতে অনুষ্ঠিত একটি যুব টুর্নামেন্টসহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় নিজের প্রতিভার ঝলক দেখিয়ে তিনি সবার নজর কেড়ে নেন।

২০০১ সালের শেষ দিকে, লুকার বয়স মাত্র ১৬ বছর, তাঁর প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে দিনামো জাগরেবে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করেন তোমিস্লাভ বাশিচ। জাগরেবের যুব দলে কিছুটা সময় কাটানোর পর ২০০৩ সালে বসনিয়ান প্রিমিয়ার লিগের ক্লাবে পাঠানো হয় তাঁকে। মাত্র ১৮ বছর বয়সে বসনিয়ান প্রিমিয়ার লিগের ‘বর্ষসেরা খেলোয়াড়’ নির্বাচিত হন লুকা। ব্যস আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।

উপসংহার

ফুটবল ইতিহাসে উজ্জ্বল ধ্রুবতারা লুকা।  যুদ্ধের কাদামাটিতেই নিজের জীবনে সাফল্যের পদ্ম ফুটিয়েছেন ক্রোয়েশিয়ার এই সংগ্রামী ফুটবলার। যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের মধ্যেই নিজের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন লুকা। শরণার্থী জীবন, স্বজন হারানোর বেদনা আর প্রতিনিয়ত মৃত্যুভয়ের মাঝেও তাঁর অদম্য ইচ্ছাশক্তি ,অধ্যাবসায় গোটা বিশ্বকে তাঁর হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে। 

তথ্যসূত্র

উইকিপিডিয়া

বিশ্বকাপের সবচেয়ে অভিশপ্ত স্টেডিয়াম: কেন আজও মারাকানাকে ঘিরে রহস্য ও আতঙ্ক?

মারাকানা স্টেডিয়ামকে কেন ‘অভিশপ্ত’ বলা হয়?

১৯৫০ বিশ্বকাপের জন্য নির্মিত মারাকানা স্টেডিয়াম ছিল ব্রাজিলের জাতীয় গর্বের প্রতীক। কিন্তু এই স্টেডিয়ামেই বারবার স্বাগতিক বা ফেভারিট দলের অপ্রত্যাশিত হার ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে ‘অভিশপ্ত’ তত্ত্বকে জনপ্রিয় করে তোলে। বিশেষ করে ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় ফুটবল ট্র্যাজেডির সাক্ষী হওয়ার পর থেকেই মারাকানার সঙ্গে ‘অভিশাপ’ শব্দটি জুড়ে যায়।

১৯৫০-এর সেই কালো দিন

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

১৯৫০ সালের ১৬ জুলাই। বিশ্বকাপ জিততে ব্রাজিলের প্রয়োজন ছিল শুধুমাত্র একটি ড্র। কিন্তু সকলকে স্তব্ধ করে দিয়ে উরুগুয়ে ২-১ গোলে হারিয়ে দেয় স্বাগতিকদের। ইতিহাসে এই ম্যাচ ‘মারাকানাজো’ নামে পরিচিত। এই হার শুধু একটি ফুটবল ম্যাচের পরাজয় ছিল না, বরং গোটা ব্রাজিল জাতির আত্মসম্মানে বড় আঘাত হিসেবে বিবেচিত হয়। 

প্রায় দুই লাখ দর্শকের সামনে ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি

সরকারি হিসাবে ওই ম্যাচে উপস্থিত ছিলেন ১,৭৩,৮৫০ জন দর্শক। তবে বহু গবেষকের মতে, প্রকৃত সংখ্যা ছিল প্রায় দুই লক্ষ বা তারও বেশি। আজও এটি বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম দর্শকসমাগম হিসেবে বিবেচিত হয়। উরুগুয়ের জয়সূচক গোলের পর পুরো স্টেডিয়াম স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল—যা ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত। 

মারাকানা কীভাবে বদলে দিয়েছিল ব্রাজিলের ফুটবল দর্শন

১৯৫০ সালের সেই হারের পর ব্রাজিল নিজেদের ঐতিহ্যবাহী সাদা জার্সি পরিত্যাগ করে বর্তমান হলুদ-সবুজ জার্সি গ্রহণ করে। পাশাপাশি আক্রমণাত্মক ফুটবলের পাশাপাশি মানসিক দৃঢ়তা ও কৌশলগত শৃঙ্খলার উপরও জোর দিতে শুরু করে ব্রাজিল। অনেক ফুটবল বিশ্লেষক মনে করেন, মারাকানাজোর ধাক্কাই পরবর্তীতে ব্রাজিলকে আরও শক্তিশালী দল হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করে। 

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

অঘটনের পর অঘটন: বিশ্বকাপের বদলে দেওয়া ম্যাচগুলি

মারাকানা শুধু ১৯৫০ নয়, পরবর্তী সময়েও বহু নাটকীয় ম্যাচের সাক্ষী থেকেছে। ২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনাল, কোপা আমেরিকার একাধিক অঘটন এবং ব্রাজিলের ঘরের মাঠে বড় ম্যাচে ব্যর্থতা বারবার এই স্টেডিয়ামকে আলোচনায় এনেছে। অনেকের মতে, ফেভারিট দলগুলির উপর অতিরিক্ত চাপই এমন ফলের অন্যতম কারণ। Raise Your Concern About this Content

সমর্থকদের বিশ্বাস নাকি নিছক কাকতালীয়?

বহু ব্রাজিলীয় সমর্থক এখনও বিশ্বাস করেন, মারাকানার সঙ্গে দুর্ভাগ্যের এক অদ্ভুত সম্পর্ক রয়েছে। আবার অনেকে মনে করেন, বড় মঞ্চে অতিরিক্ত প্রত্যাশা ও মানসিক চাপই এসব ঘটনার আসল কারণ। ফুটবল বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘অভিশাপ’ মূলত সমর্থকদের আবেগ থেকেই তৈরি হয়েছে।

পরিসংখ্যান কী বলছে—অভিশপ্তের কোনও বাস্তব ভিত্তি আছে?

পরিসংখ্যান বলছে, মারাকানায় ব্রাজিল অসংখ্য ঐতিহাসিক জয়ও পেয়েছে। বহু আন্তর্জাতিক ট্রফি জয়ের সাক্ষী এই স্টেডিয়াম। ফলে শুধুমাত্র কয়েকটি স্মরণীয় পরাজয়ের ভিত্তিতে স্টেডিয়ামকে ‘অভিশপ্ত’ বলা বৈজ্ঞানিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। তবে বড় ম্যাচে নাটকীয় ফলাফলের কারণে এই ধারণা আজও জনপ্রিয়। 

কেন আজও আলোচনায় মারাকানা স্টেডিয়াম?

মারাকানা শুধুমাত্র একটি স্টেডিয়াম নয়; এটি ফুটবল সংস্কৃতির এক জীবন্ত ইতিহাস। পেলের হাজারতম গোল থেকে শুরু করে বিশ্বকাপের ট্র্যাজেডি—সবকিছুর সাক্ষী এই মাঠ। তাই ফুটবল ইতিহাসে মারাকানার গুরুত্ব কখনও কমবে না। 

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

পরিশেষে বলা যায়, মারাকানা আজও দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু তার দেয়ালে শুধু কংক্রিট নয়—লেখা আছে কান্না, আনন্দ, আশা আর ভাঙনের ইতিহাস। এখানে গোল হয়েছিল…এখানে স্বপ্ন ভেঙেছিল… এখানে একটি দেশ শিখেছিল হার কীভাবে মানুষকে বদলে দেয়…মারাকানা তাই শুধু একটি স্টেডিয়াম নয়— এটা ফুটবলের সবচেয়ে সুন্দর এবং সবচেয়ে ভয়ংকর স্মৃতি। তবে মারাকানা আদৌ অভিশপ্ত কি না, তার নির্দিষ্ট উত্তর হয়তো নেই। তবে এটুকু নিশ্চিত, বিশ্বের খুব কম স্টেডিয়ামই এত আবেগ, ইতিহাস এবং নাটকীয়তার সাক্ষী হয়েছে। তাই ফুটবলপ্রেমীদের কাছে মারাকানা আজও এক রহস্যময়, আবেগঘন এবং কিংবদন্তির নাম।

তথ্যসূত্র

১. মারাকানা স্টেডিয়ামের পরিচিতি ও ইতিহাস
২. ১৯৫০ বিশ্বকাপ ফাইনাল
৩. উইকিপিডিয়া
৪. ২০১৪ বিশ্বকাপ ফাইনাল

দারিদ্র্যকে হারিয়ে রোনাল্ডো বিশ্বজয়

রোনাল্ডোর জীবনসংগ্রাম:

পর্তুগালের মাদেইরা দ্বীপের এক অতি সাধারণ ও দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়া ছেলেটি একদিন সারা বিশ্ব নাম করবে, তা হয়তো কেউ কল্পনাও করেনি। কিন্তু অদম্য ইচ্ছা, কঠোর পরিশ্রম আর কখনও হার না মানার মানসিকতা থাকলে যে ভাগ্যের লেখাকেও বদলে দেওয়া যায়, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। শূন্য থেকে শুরু করে আজ তিনি ফুটবলের চূড়ায় আসীন। পাঁচবারের ব্যালন ডি’অর বিজয়ী এই তারকার সাফল্যের পেছনের মূল কারণ হয়তো তাঁর শৈশবের অবর্ণনীয় কষ্ট ও লড়াই।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

শৈশবের চরম দারিদ্র্য ও সংগ্রাম:

রোনালদোর শৈশব কেটেছে চরম অভাব-অনটনের মধ্য দিয়ে। তাঁর মা মারিয়া ডোলোরেস ছিলেন একজন রাঁধুনি এবং বাবা ডিনিস অ্যাভেইরো ছিলেন একজন মালি। চার ভাইবোনের মধ্যে রোনালদো ছিলেন সবার ছোট। এত বড় পরিবারের থাকার জায়গা ছিল ছোট্ট একটি টিনের চালার ঘর। রোনালদোকে তার ভাইবোনের সঙ্গে একই ঘর শেয়ার করতে হতো। অনেক সময় দুবেলা ঠিকমতো খাবারও জুটত না। রোনালদো এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, শৈশবে তাঁরা ম্যাকডোনাল্ডসের দোকানের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকতেন ফেলে দেওয়া বার্গারের জন্য। তাঁর বাবা অতিরিক্ত মদ্যপানে আসক্ত ছিলেন, যা পরিবারের কষ্ট আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। ২০০৫ সালে রোনালদো যখন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে নিজের ক্যারিয়ার গড়ছেন, তখনই লিভার বিকল হয়ে তাঁর বাবা মারা যান।Raise Your Concern About this Content

হৃদরোগ এবং স্বপ্নভঙ্গের উপক্রম:

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

ফুটবল যখন রোনালদোর জীবনের একমাত্র আলো, ঠিক তখনই তাঁর জীবনে নেমে আসে এক কালো কায়া। মাত্র ১৫ বছর বয়সে মারাত্মক শারীরিক সমস্যা ধরা পড়ে রোনালদোর। চিকিৎসকরা জানান, রোনালদোর হৃদস্পন্দনের গতি স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি। সাধারণ মানুষের জন্য এটি বিপজ্জনক না হলেও একজন ফুটবলারের জন্য এটি ছিল একটি ভয়াবহ দুসংবাদ। ফুটবল খেললে তাঁর হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি ছিল প্রবল। তাঁর ফুটবল ক্যারিয়ার যখন প্রায় ধ্বংসের মুখে দাঁড়িয়ে, তখন তাঁর মা একটি বড় ঝুঁকি নেন। রোনালদোর হার্টে একটি লেজার সার্জারি করা হয়। অস্ত্রোপচারটি সফল হয়। যার মাত্র কয়েকদিন পরেই অদম্য শক্তি নিয়ে আবারও ফুটবল মাঠে ফিরে আসেন রোনালদো।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

এক জীবন্ত অনুপ্রেরণা: 

রোনালদো আজ শুধু একজন ফুটবলার নন, তিনি বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি তরুণের জন্য এক জীবন্ত অনুপ্রেরণা। তার জীবন থেকে অনেক কিছুই শেখার আছে। রোনালদোর সতীর্থরা সবসময় বলেন, তিনি অনুশীলনে সবার আগে আসতেন এবং সবার শেষে মাঠ ছাড়তেন। ৪০ ছুঁইছুঁই বয়সেও তার ফিটনেস তরুণদের টেক্কা দেয়। শৈশবের দারিদ্র্য ভুলে যাননি বলেই রোনালদো নিয়মিত রক্ত ও বোন ম্যারো দান করেন। সে কারণে তিনি তাঁর শরীরে কোনও ট্যাটু করাননি। এছাড়া ফিলিস্তিনের যুদ্ধবিধ্বস্ত শিশু, ক্যানসার আক্রান্ত রোগী এবং বিভিন্ন দুর্যোগে তিনি কোটি কোটি টাকা অনুদান দিয়ে থাকেন। মাঠ ও মাঠের বাইরে হাজারো সমালোচনা আর ট্রোলিংকে তিনি সবসময় বুড়ো আঙুল দেখিয়েছেন এবং নিজের পারফর্ম্যান্স দিয়ে সমালোচকদের মুখও বন্ধ করেছেন।

তথ্যসূত্র:

১. উইকিপিডিয়া
২. কিংবদন্তি রোনাল্ডো
৩. ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো
৪. ফুটবল জীবনে রোনাল্ডো নানা চ্যালেঞ্জ
৫. ১৫ বছর বয়সে ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো হার্ট সার্জারি হয়েছিল

নিউ ইয়র্কের ফুটবলের গল্প: পেলের কসমস থেকে ২০২৬ বিশ্বকাপের মহামঞ্চ

অভিবাসীদের হাত ধরে গোড়াপত্তন:

নিউ ইয়র্কে ফুটবলের গল্পটা কোনও আধুনিক কৃত্রিম হুজুগ নয়, এর শিকড় বেশ গভীরে এবং পুরনো। উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে যখন ইউরোপীয় অভিবাসীরা নিজেদের সঙ্গে এই শহরে নিয়ে এসেছিলেন তাঁদের প্রিয় ফুটবল সংস্কৃতিও। ইতালি, আয়ারল্যান্ড, জার্মানি এবং পূর্ব ইউরোপের খেটে খাওয়া মানুষগুলো ব্রুকলিন, কুইন্স এবং নিউ জার্সির আনাচে-কানাচে গড়ে তোলেন ছোট ছোট স্থানীয় ক্লাব। অভিবাসীদের সেই চেনা আবেগ আর পায়ের ছোঁয়াতেই নিউ ইয়র্ক ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে মার্কিন ফুটবলের এক অলিখিত প্রবেশদ্বার।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

নিউ ইয়র্ক কসমস ও পেলের সেই ‘বিগ ব্যাং’ যুগ:

শহরের ফুটবল ইতিহাসে ১৯৭১ সালটি ছিল একটি মাইলফলক। কারণ এই বছরই প্রতিষ্ঠিত হয় ‘নিউ ইয়র্ক কসমস’। এই মাইলফলকের ওপর আরও একটি নতুন পালক জুড়ে যায় ১৯৭৫ সালে। যখন বিশ্ব ফুটবলের অবিসংবাদিত সম্রাট ও ব্রাজিলের রত্ন পেলে সান্তোস ছেড়ে কসমসে যোগ দেন তখন। তারপর বদলে গেল পুরো দৃশ্যপট।

আমেরিকার মূলধারার গণমাধ্যম ও ক্রীড়া আলোচনায় ফুটবল প্রথমবারের মতো প্রথম পাতায় জায়গা করে নিল। পেলেকে একনজর দেখতে স্টেডিয়ামে হাজার হাজার দর্শকের ঢল নামতে শুরু করল। পেলের পর জার্মানির ফ্রাঞ্জ বেকেনবাউয়ার কিংবা কার্লোস আলবার্তো তোরেসের মতো বিশ্বসেরা তারকারা যখন কসমসের জার্সি গায়ে জড়িয়েছেন। ক্রীড়া গবেষকদের মতে, আমেরিকার মাটিতে আধুনিক ফুটবল সংস্কৃতির আসল ভিত্তিপ্রস্তরটি স্থাপন করে দিয়েছিল পেলের সেই কসমস যুগই। পেলের আগমন বিশ্বকে দেখিয়েছিল যে যুক্তরাষ্ট্রও ফুটবলের বড় বাজার হতে পারে।

এমএলএস যুগ: পেশাদারিত্ব ও আধুনিক রূপান্তর:

নব্বইয়ের দশকে এসে সেই জোয়ার আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। ১৯৯৪ সালের সফল বিশ্বকাপ আয়োজনের পর যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেয় নতুন পেশাদার লিগ- ‘মেজর লিগ সকার'(MLS)। নিউ ইয়র্ক অঞ্চল এবারও পিছিয়ে থাকেনি। ‘নিউ ইয়র্ক রেড বুলস’ এবং পরবর্তীতে ‘নিউ ইয়র্ক সিটি এফসি’ (NYCFC)-র মতো আধুনিক ক্লাবগুলো শহরের ফুটবলকে নিয়ে যায় এক নতুন উচ্চতায়। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ফুটবলপ্রেমী অভিবাসীদের কারণে এই ক্লাবগুলো দ্রুতই এক বিশাল এবং অনুগত সমর্থকগোষ্ঠী পেয়ে যায়, যা আমেরিকার অন্য কোনও শহরে মেলা ভার।Raise Your Concern About this Content

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

কেন ২০২৬-এ দাঁড়িয়ে নিউ ইয়র্ক-ই বিশ্ব ফুটবলের “শেষ গন্তব্য”?

১৯৯৪ সালের পর দীর্ঘ তিন দশক পেরিয়ে আবারও বিশ্বকাপের ফাইনাল ফিরেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। আর এবার, ৪৮টি দলের অংশগ্রহণে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ও জাঁকজমকপূর্ণ বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচটি (১৯ জুলাই, ২০২৬) অনুষ্ঠিত হতে চলেছে নিউ ইয়র্ক–নিউ জার্সির ঐতিহ্যবাহী মেটলাইফ স্টেডিয়ামে।

এই টুর্নামেন্টে এই অঞ্চলটি কেবল ফাইনালই নয়, সর্বমোট ৮টি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ আয়োজন করছে। ফুটবল বিশ্লেষকরা তাই যথার্থই নিউ ইয়র্ককে বিশ্ব ফুটবলের “শেষ গন্তব্য” বলে অভিহিত করছেন। কারণ এখানেই নির্ধারিত হবে ২০২৬ সালের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন, এখানেই উড়বে জয়ের শেষ পতাকা।

বহুসাংস্কৃতিক সমাজ, অর্থনীতি ও ফুটবলের উৎসব:

নিউ ইয়র্কের সবচেয়ে বড় শক্তি হল তার বৈচিত্র্য। এই শহরে ব্রাজিলিয়ান, আর্জেন্টাইন, ইংলিশ, ফ্রেঞ্চ, মেক্সিকান কিংবা মরক্কোন, সব দেশের মানুষেরই এক বিশাল বসতি রয়েছে। ফলে বিশ্বকাপ চলাকালীন পুরো নিউ ইয়র্ক কোনও একক দেশের শহর থাকে না, বরং এটি হয়ে ওঠে এক ‘মিনি ওয়ার্ল্ড কাপ’। বিভিন্ন ফ্যান জোন, পাবলিক ভিউয়িং স্পট এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পুরো শহর হয়ে ওঠে এক উৎসবের নগরী।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

এই ফুটবল উন্মাদনার একটি বিশাল অর্থনৈতিক ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবও রয়েছে। লক্ষাধিক আন্তর্জাতিক পর্যটকের আগমন, হোটেল, পরিবহন, রেস্তোরাঁ ও স্থানীয় ব্যবসার অভূতপূর্ব প্রবৃদ্ধি বিশ্বমঞ্চে নিউ ইয়র্কের ব্র্যান্ড মূল্যকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। কিন্তু সবকিছুর ঊর্ধ্বে, এই আসর আমেরিকার নতুন প্রজন্মের মনের ভেতর ফুটবলের প্রতি যে ভালবাসার জন্ম দিচ্ছে, তা অমূল্য।

উপসংহার: 

পেলের কসমস থেকে শুরু করে আজকের আধুনিক এমএলএস, আর সেখান থেকে ২০২৬ বিশ্বকাপের এই মহামঞ্চ অর্থ্যাৎ নিউ ইয়র্কের এই ফুটবল যাত্রা কেবল ইতিহাস নয়, এটি একটি শহরের আত্মপ্রকাশ ও রূপান্তরের গল্প। সত্তরের দশকে যে ফুটবলের বীজ বুনেছিলেন পেলে, মেটলাইফ স্টেডিয়ামের ফাইনালের মধ্য দিয়ে তা আজ এক বিশাল মহীরূহে পরিণত। ২০২৬ সালের এই বিশ্বকাপ ফাইনাল নিউ ইয়র্ককে বিশ্ব ফুটবল ইতিহাসের পাতায় এই শহরের নাম চিরদিনের জন্য স্বর্ণাক্ষরে লিখে রাখবে।

তথ্যসূত্র :

১. নিউ ইয়র্কে ফুটবলের ইতিহাস
২. মেজর লিগ সকার
৩. ফুটবল সম্রাট পেলে
৪. নিউ ইয়র্ক কসমস (২০২৬)
৫. নিউ ইয়র্ক কসমস (১৯৭১–১৯৮৫)
৬. নিউ ইয়র্ক কসমস
৭. ফিফা বিশ্বকাপ কিংবদন্তিরা
৮. পেলে
৯. অন্যান্য

সিয়াটেলের বৃষ্টির শহর 

সিয়াটেলকে কেন বলা হয় বৃষ্টির শহর?

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য  শহরের তুলনায় সিয়াটেলে বৃষ্টির দিনের সংখ্যা অনেক বেশি তাই দীর্ঘদিন ধরেই ‘বৃষ্টির শহর’ হিসেবে গোটা বিশ্বের কাছে আত্মপ্রকাশ করেছে সিয়াটেল । সিয়াটেলকে যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডের সবচেয়ে মেঘাচ্ছন্ন অঞ্চলগুলির মধ্যে একটি হিসেবে ধরা হয়। গড় হিসাবে বছরে প্রায় ২০১ দিন আকাশ পুরোপুরি মেঘে ঢাকা থাকে এবং আরও ৯৩ দিন আংশিক মেঘলা থাকে। বছরে গড়ে প্রায় ১৫০ দিন  অন্তত ০.২৫ মিলিমিটার (০.০১ ইঞ্চি) বৃষ্টিপাত হয়। রকি পর্বতমালার পূর্বাঞ্চলের প্রায় সব বড় মার্কিন শহরের তুলনায় এই সংখ্যা বেশি।

তবে মজার বিষয় হল, সিয়াটেলে প্রায়ই দিনের পর দিন কেবল হালকা গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি বা ঝিরিঝিরি বৃষ্টি হয়। বছরের বেশিরভাগ দিনই আকাশ থাকে কুয়াশাচ্ছন্ন এবং মেঘলা। Raise Your Concern About this Content

তাই বৃষ্টির দিনের সংখ্যা বেশি হলেও মোট বার্ষিক বৃষ্টিপাতের পরিমাণ নিউইয়র্ক, মায়ামি বা হিউস্টনের মতো অনেক মার্কিন শহরগুলোর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। দীর্ঘস্থায়ী মেঘলা আবহাওয়াই সিয়াটেলকে আরও বৃষ্টিবহুল বলে মনে করায়।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

 সমুদ্রঘেঁষা আবহাওয়ার কারণে বছরের বেশিরভাগ সময় আকাশে স্থায়ী মেঘের স্তর বিরাজ করে । গ্রীষ্মকালে আবহাওয়া কিছুটা  উজ্জ্বল হলেও, শরৎ, শীত এবং বসন্তে বছরের বেশিরভাগ মাসজুড়ে মেঘলা আকাশ থাকায় সিয়াটেল চিরকালীন বৃষ্টির নগরী হিসেবে জনমুখে পরিচিতি লাভ করেছে।  

প্রশান্ত মহাসাগর ও ক্যাসকেড পর্বতমালার অবস্থান সিয়াটেলে বৃষ্টির অন্যতম কারণ

সিয়াটেলের অবস্থান প্রশান্ত মহাসাগর এবং ক্যাসকেড পর্বতমালার মাঝামাঝি। পশ্চিম দিক থেকে আসা আর্দ্র বায়ু মহাসাগর থেকে জলীয় বাষ্প নিয়ে স্থলভাগে প্রবেশ করে। এই বায়ু যখন পর্বতের গায়ে উঠে যায়, তখন তা ঠান্ডা হয়ে বৃষ্টিতে পরিণত হয়। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘ওরোগ্রাফিক লিফট’।কিন্তু উল্লেখযোগ্যভাবে ক্যাসকেড পর্বতমালার পশ্চিম ঢালে সিয়াটেলের তুলনায় অনেক বেশি বৃষ্টি হয়। এছাড়া অলিম্পিক পর্বতমালা সিয়াটেলকে অতিরিক্ত বৃষ্টির হাত থেকে রক্ষা করে।

সিয়াটেলের স্থানীয় সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রায় বৃষ্টিময় আবহাওয়ার প্রভাব

সিয়াটলের ঘনঘন বৃষ্টি এখানকার সংস্কৃতি ও জীবনধারার উপর গভীরভাবে প্রভাব ফেলে। এখানকার মানুষ বৃষ্টিকে জীবনের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে মেনে নিয়েছেন। সিয়াটেলের বাসিন্দারা দৈনন্দিন কাজ চালিয়ে যেতে হুইডযুক্ত রেইন জ্যাকেট ব্যবহার করেন। সিয়াটেলে ক্যাফে সংস্কৃতির প্রচলন রয়েছে। শহরের একাধিক কফি শপ রয়েছে। সিয়াটেলকে বিশ্বের অন্যতম কফি সংস্কৃতির শহর হিসেবে ধরা হয়।

সিয়াটেলের দর্শনীয় স্থান 

বৃষ্টির দিনে ঘুরে দেখার জন্য সিয়াটল সেন্টার অন্যতম সেরা জায়গা। চিহুলি গার্ডেন অ্যান্ড গ্লাস, মিউজিয়াম অব পপ কালচার এবং প্যাসিফিক সায়েন্স সেন্টার ঘুরে আসতে পারেন। প্রত্যেকটি জায়গা একে অপরের থেকে মাত্র পাঁচ মিনিট হাঁটা দূরত্বে অবস্থিত। 

শহরের কেন্দ্রস্থলে যদি একটি বৃষ্টিভেজা বিকেল কাটাতে চান, তাহলে পাইক প্লেস মার্কেট, সিয়াটেল আন্ডারগ্রাউন্ড ট্যুর এবং সিয়াটেল সেন্ট্রাল লাইব্রেরি সমস্ত জায়গায় হেঁটে হেঁটেই ঘুরতে পারেন। 

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

বৃষ্টির দিনে রোমান্টিক ডেট নাইটের জন্য পাইক প্লেস মার্কেটের ভেতরে অবস্থিত ক্যান ক্যান কালিনারি ক্যাবারে এবং স্মিথ টাওয়ার অবজারভেটরি দারুন ডেস্টিনেশন হতে পারে। এখানে বৃষ্টি বিরক্তির নয়, এই শহরে বৃষ্টিকে নতুন করে উপভোগ করা যায়। 

কীভাবে যাবেন?

সিয়াটেলের নিজস্ব আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হল সিয়াটল-টাকোমা ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট (Seattle-Tacoma International Airport বা SEA)। আপনার কাছাকাছি বিমানবন্দর থেকে দিল্লি, দোহা, বা দুবাই যেতে হবে। সেখান থেকেই পেয়ে যাবেন সিয়াটেলের বিমান। কলকাতা থেকে সিয়াটেলে কোনও সরাসরি বিমান পরিষেবা নেই। তাই অন্তত এক বা দুইবার ট্রানজিট করতেই হবে। 

বিশ্বকাপের ম্যাচ ভেন্যু লুমেন ফিল্ড থেকে সিয়াটেলের প্রধান পর্যটন এলাকাগুলি ২ থেকে ৫ কিলোমিটারের মধ্যেই অবস্থিত। ট্যাক্সি, রেলপথে, বাস কিংবা রাইড-শেয়ারিং পরিষেবার মাধ্যমে সহজেই পৌঁছে যেতে পারবেন।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

কত খরচ হবে?

বিশ্বকাপের সময় বিমান ভাড়া সাধারণ সময়ের তুলনায় অনেক বেশি হতে পারে। যাওয়া এবং ফেরা নিয়ে ইকোনমি ক্লাসে প্রায় ১.২০ লক্ষ থেকে ২.৫০ লক্ষ টাকা খরচ হতে পারে। প্রিমিয়াম ইকোনমিতে ২.৫০ লক্ষ থেকে ₹৪ লক্ষ টাকা খরচ হতে পারে। বিজনেস ক্লাসে ৫ লক্ষ বা তারও বেশি খরচ হবে।

সিয়াটেলে কবে কবে বসেছে ফুটবল মহাযজ্ঞের আসর?

২৬ জুনে সিয়াটেলে ইজিপ্ট ও ইরানের বিশ্বকাপ ম্যাচের আসর বসেছে। এরপরে ৩, ১১,১৮ জুলাই 
মিয়ামিতেও রয়েছে বিশ্বকাপের ম্যাচ। মিয়ামিতে খেলা দেখেও সেখাল থেকে  সিয়াটেলে ঘুরে আসতে পারেন। সময় লাগবে প্রায় ২ দিন ১০ ঘণ্টা।

তথ্যসূত্র-

১. Maria’s Green Cleaning
২. সিয়াটেল-উইকিপিডিয়া

আদরে-আহ্লাদে বিদ্যমান জামাই, কবে সম্মান পাবে ঘরের ‘ব্রাত্য’ লক্ষ্মী?

জামাই ষষ্ঠী হোক বা অন্য যেকোনও সময় বাড়িতে জামাই এলে একটা হইহই ব্যাপার পড়ে যায় বাড়িতে। সবাই আনন্দে মুখর থাকে। যেমন থাকে উপচে পড়া খুশির মহল তেমনই এলাহি খাওয়া দাওয়া চোখে পড়ার মতো। উচ্চবিত্ত হোক বা মধবিত্ত প্রত্যেকে নিজেদের সাধ্যমত নিজেদের জামাই এর জন্য আয়োজন করতে ব্যস্ত থাকেন। জামাইরাও এই বিষয়টাকে খুব সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করেন। জামাই ষষ্ঠিতেই সব থেকে বেশি আদর যত্ন পান জামাইরা। বছরের অন্য দিনগুলিতে আদর আপ্পায়ন ভাল পেলেও জামাই ষষ্ঠিতে প্রত্যেকটা জামাইয়ের আশা থাকে অনেক উঁচুতে। সবার কাছে এটাই স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু বাড়ির লক্ষ্মীদের কি? তাঁদের জন্য না বাপের বাড়িতে কোনও বিশেষ উদ্যোগ চোখে পড়ে, আর না শ্বশুর বাড়িতে কোনও বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। বাড়ির মেয়েদের কাছেও এটাই স্বাভাবিক বিষয়। কারণ শুরুর সময় থেকে সবাই এটাই দেখে দেখে অভ্যস্ত। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে যেমন মানুষ ডিজিটাল যুগে পা দিয়েছে, যেমন উন্নত চিন্তাভাবনা দিয়ে এআই বা রোবটের সাহায্যে নিজেদের কাজকে আরও সহজভাবে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তেমনই এই উন্নত সমাজে বাড়ির লক্ষ্মী অর্থাৎ বাড়ির বৌমাদের সম্মান-মর্যাদা ও গুরুত্বকে প্রাধান্য দিতে তাঁদের জন্য বিশেষ দিনের সূচনা করে আরও একধাপ আধুনিকতার দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় এসেছে।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

কেন ব্রাত্য ঘরের লক্ষ্মীরা?

জামাই ষষ্ঠীতে জামাই-এর জন্য এলাহি ব্যবস্থা করেন শ্বশুর বাড়ির লোক। নতুন ধুতি-পাঞ্জাবি, আম-লিচু-মিষ্টির বিপুল সম্ভার। সেই সঙ্গে অবশ্যই থাকে থালা সাজানো ইলিশ, চিংড়ি বা খাসির মাংস। জামাইকে খুশি করতে শ্বশুর-শাশুড়ি নিজেদের সাধ্যের সর্বোচ্চ উজাড় করে দেন। শুধু জামাই ষষ্ঠীই নয়, বছরের যেকোনও অনুষ্ঠানে, পুজো-পার্বণে বা অন্য সময়ে শ্বশুরবাড়িতে পা রাখলে জামাইয়ের স্থান হয় সবার ওপরে। তাঁকে ঘিরে বাড়ির সবার মধ্যে এক রাজকীয় ব্যস্ততা তৈরি হয়। এই আদর, এই ভালবাসা বাঙালির পারিবারিক বন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু এই চেনা ছবির উল্টো পিঠেই লুকিয়ে আছে এক উপেক্ষা ও একাকীত্বের গল্প। বিয়ের পর একটি মেয়ে যখন নিজের বাড়ি, চেনা পরিবেশ, চেনা মানুষগুলোকে ছেড়ে সম্পূর্ণ এক নতুন পরিবারে পা রাখে, তখন তাকে বধূ বরণ করে মহা আয়োজনের সঙ্গে ঘরে তোলা হয়। আলতা-দুধের থালায় পা রেখে, বরণ ডালা ছুঁয়ে, ঘরের লক্ষ্মী হিসেবে তাঁকে বরণ করে নেওয়ার সেই মুহূর্তটি অত্যন্ত আবেগঘন এবং উৎসবমুখর। বাস্তবতা কিন্তু এখানেই থেমে থাকে।

সেই একদিনের রাজকীয় বরণের পর আর থাকে না সেই আরম্বর। বাড়ির গৃহলক্ষ্মীটি হয়ে ওঠে সংসারের মূল চালিকাশক্তি। সকালের চা থেকে শুরু করে রাতের বিছানা গোছানো, শ্বশুর-শাশুড়ির ওষুধপত্র, অতিথি আপ্যায়ন-সহ সংসারের খুঁটিনাটি সবকিছু সে নিজের কাঁধে তুলে নেয় বা তাঁর কাঁধে তুলে দেওয়া হয়। সে নিজের পরিবারকে একপ্রকার ভুলে গিয়ে স্বামীর পরিবারকে আপন করে নেয়। অথচ, যে মেয়েটি প্রতিদিন পুরো পরিবারকে আগলে রাখছে, তাঁকে আলাদা করে ধন্যবাদ জানানোর বা তাঁর উপস্থিতি উদযাপনের কোনও বিশেষ দিন আমাদের সংস্কৃতিতে নেই। জামাই বছরে কয়েকদিন এসে যে খাতির পায়, ঘরের বৌমা ৩৬৫ দিন হাড়ভাঙা খাটুনি খেটেও অনেক সময় সেই নূন্যতম সম্মান বা স্বীকৃতিটুকুও পায় না। সময় বদলেছে, আর সময়ের সাথেই বদলানো উচিত আমাদের মানসিকতার। জামাই ষষ্ঠী যদি জামাইকে ভালবাসার দিন হয়। তাহলে যে মেয়েটি নিজের বাপের বাড়ি ছেড়ে এসে এই বাড়িটাকে আগলে রাখছে, তাঁর জন্য কেন একটা বিশেষ দিন থাকবে না?Raise Your Concern About this Content

‘অরণ্যষষ্ঠী’ থেকে ‘জামাইষষ্ঠী’ হয়ে ওঠার ইতিহাস:

মূলত জ্যৈষ্ঠ মাসের শুক্লা তিথি ধরে আয়োজিত ‘অরণ্যষষ্ঠী’-ই সময়ের ফেরে আজকের জামাইষষ্ঠী-তে রূপান্তরিত হয়েছে, বলা ভাল রূপান্তরিত করা হয়েছে। এই রূপান্তরের পেছনে রয়েছে এক গভীর সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক ইতিহাস রয়েছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। 

একসময় জ্যৈষ্ঠের দাবদাহে যখন মাঠ-ঘাট শুকিয়ে যেত, তখন মেয়েরা বৃষ্টি ও উত্তম ফসলের কামনায় বনে গিয়ে গান গেয়ে বনদেবীকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করতো। তারপর অরণ্যের দেবীই হয়ে উঠলেন প্রজনন ও সন্তান রক্ষয়িত্রী দেবী। রাঢ় অঞ্চলে কৃষি জমি ও ষষ্ঠীপুজো একসঙ্গে হতো, যার নাম ‘গাবরষষ্ঠী’। রঘুনন্দনের তিথিতত্ত্ব অনুযায়ী, মহিলারা অরণ্যে গিয়ে পাখা হাতে ‘বিন্দ্যবাসিনী স্কন্দ ষষ্ঠী’-র পুজো করতেন। বন বা অরণ্যে এই পুজো হতো বলেই এর নাম অরণ্যষষ্ঠী।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

অনেক সময় শ্বশুরবাড়িতে অধিকাংশ নারীর কপালে জুটত তুমুল লাঞ্ছনা-গঞ্জনা। বিশেষ করে সন্তান জন্ম দিতে না পারলে অত্যাচারের মাত্রা চরম পর্যায়ে পৌঁছে যেত। বর্তমানে সেই বিষয় লক্ষ্য করা গেলেও পরিমাণটা কমেছে। এই নিষ্ঠুর সামাজিক পরিস্থিতিতে মেয়েকে অত্যাচার থেকে বাঁচাতে এবং জামাইকে খুশি রাখতে ‘জামাইকে তোয়াজ করার’ প্রথাটি চালু হয় বলেও উল্লেখ পাওয়া যায়। শ্বশুর-শাশুড়ির কাছে জামাতাও এক প্রকার সন্তান তুল্য। জামাই সাধারণত বাইরে থাকার কারণে, জ্যৈষ্ঠ মাসের এই বিশেষ তিথিতে তাঁকে সসম্মানে নিমন্ত্রণ করে আনার রেওয়াজ তৈরি হয়। গবেষকদের মতে, জ্যৈষ্ঠ মাসের কৃষ্ণপক্ষের সাবিত্রী চতুর্দশীতে স্ত্রীরা স্বামীদের দীর্ঘজীবন কামনা করে যমের আরাধনা করতেন। এই লোকচারের সূত্র ধরেই কলকাতার বাবু সংস্কৃতিতে জ্যৈষ্ঠের শুক্লা ষষ্ঠীতে ‘জামাইষষ্ঠী’-র অনুপ্রবেশ ঘটে। ১৮-১৯ শতকের বাংলায় বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহের ব্যাপক প্রচলন ছিল। যার ফলশ্রুতি ছিল অসংখ্য বালবিধবা ও সতীদাহের মতো ঘটনা। তৎকালীন ওই অনিশ্চয়তার মাঝে জামাইদের দীর্ঘজীবন কামনা করা বাঙালি মা এবং মেয়ের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। সন্তানের মঙ্গলকামনার চেয়েও জামাতার আয়ু বৃদ্ধির গুরুত্ব কোনও কোনও ক্ষেত্রে বেশি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ইতিহাসে বারংবার দেখা গিয়েছে, সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার জন্যে প্রয়োজন অনুযায়ী সমাজ তার পুরনো আচার-অনুষ্ঠানগুলোকে সংশোধন করে নেয়। অরণ্যষষ্ঠীও ঠিক একইভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। কন্যার ভবিষ্যৎ এবং সন্তানের কল্যাণ নিয়ে উদ্বিগ্ন বাঙালি মায়েরা প্রাচীন অরণ্যষষ্ঠীর ব্রতটিকেও পরিবর্তন করে জামাইয়ের জন্য ভূরিভোজ ও আদরের উৎসব অর্থাৎ জামাইষষ্ঠী-তে রূপান্তর করেছেন।

উপসংহার:

আধুনিক যুগে একান্ন পরিবার প্রায় বিলুপ্ত। এখন একক পরিবারের দাপট। এই যুগে সম্পর্কের সমীকরণগুলো অনেকটাই বদলেছে। ব্যস্ততার কারণে হয়তো অনেক সময় তিথি মেনে উৎসব পালন করাও সম্ভব হয় না। কিন্তু জামাইষষ্ঠীর মতো উৎসব আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, এই লৌকিক আচারের মূল উদ্দেশ্য হল দুটি ভিন্ন পরিবারের মধ্যে ভালবাসার সেতুটি মজবুত রাখা। আর এমনভাবেই বৌমা ষষ্ঠীর মাধ্যমে বৌমা ও শ্বশুর-শ্বাশুড়ির মধ্যেও সম্পর্ক আরও মধুর হতে পারে। তাই বাড়ির লক্ষ্মী অর্থাৎ বৌমাদের আরও আপন করার জন্যও এটা একটা ভাল পদ্ধতি হিসাবেও কাজ করতে পারে।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

ওপরের ইতিহাসে যদি সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যেতে পারে। অরণ্যষষ্ঠী থেকে জামাই ষষ্ঠী হতে পারে। তাহলে বর্তমান আধুনিক সমাজে জামাই ষষ্ঠীর পাশাপাশি বৌমা ষষ্ঠী পালন করে কেন কঠিন হবে? আসুন, আমরাই এই অচলায়তন ভাঙি। জামাই ষষ্ঠীর মতোই একটি দিন নির্বাচন করে আমরা বৌমা ষষ্ঠি পালন করি। বর্তমানে হাতে গোনার মতো কয়েকটা বউমা ষষ্ঠীর মিষ্টি মুহূর্ত সামনে এলেও তা নিতান্ত্যই অল্প সংখ্যক।

নারীর ক্ষমতায়ন বা সাম্যের কথা শুধু মুখে বললেই হয় না, তা নিজেদের ঘর থেকে শুরু করতে হয়। জামাই ষষ্ঠীর আনন্দ যেমন খাঁটি, বৌমা ষষ্ঠী-র মতো ভাবনাকে বাস্তবায়িত করা তেমনই জরুরি। ঘরের লক্ষ্মীকে তাঁর প্রাপ্য সম্মান, ভালবাসা ও একটু বিশ্রামের সুযোগ করে দেওয়া কোনও দয়া নয়, এটা তাঁর অধিকার। আসুন, আমরা আধুনিক সমাজকে আরও একধাপ আধুনিকতার দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। ঘরের লক্ষ্মীকে তাঁর ষথাষথ মর্যাদা ও সম্মান দেওয়া শুরু করি।

তথ্যসূত্র :

উইকিপিডিয়া
সমবাংলায় লেখালেখি
জি ২৪ ঘন্টা- প্রতিবেদন
ঐমুহুর্তের প্রতিবেদন
অন্যান্য প্রতিবেদন