দেশের জন্য নিজের সুখী পারিবারিক জীবন জলাঞ্জলী দিয়ে বরণ করছিলেন অকথ্য অত্যাচার। কে সেই বীরাঙ্গনা?
ভারতের স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনার ইতিহাসের নেপথ্যে অগণিত ত্যাগ, সাহস ও অদম্য দেশপ্রেমের কাহিনি রয়েছে। বহু বীর-বীরাঙ্গনাদের আত্ম বলিদানের ফলে ১৯৪৭-এর ১৫ আগস্ট স্বাধীনতার স্বাদ পেয়েছে ভারতবাসী। তবে লড়াকু সকল যোদ্ধাদের মনের মধ্যে যতটা তেজ, সাহস ও দেশের প্রতি ভালবাসা ছিল, ঠিক ততোটা শ্রদ্ধার সঙ্গে সকল যোদ্ধাদের মনে রাখেনি এই দেশ। অধিকাংশ যোদ্ধাদের ভুলতে বসেছে বর্তমান সমাজের মানুষ। অনেকের নাম হয়তো ইতিহাসের পাতায় পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে কিন্তু অনেকেরই নাম সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ফিকে হয়ে গিয়েছে। তেমনই এক বীরাঙ্গনা হলেন নীরা আর্য। যিনি আমাদের সবার প্রিয় দেশনায়ক নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর জীবন বাঁচাতে হত্যা করেছিলেন নিজের স্বামীকে। যার ফলস্বরূপ ইংরেজদের পাশবিক অত্যাচারের শিকারও হন। তিনিই ছিলেন আজাদ হিন্দ ফৌজের প্রথম নারী গোয়েন্দা।
নীরা আর্যের প্রারম্ভিক জীবন
সালটা ১৯০২, মার্চ মাসের ৫ তারিখ। উত্তরপ্রদেশের খেকড়া নামক এক ছোট শহরে জন্ম হয় নীরা আর্যের। যে পরবর্তীতে পুরো দেশকে দেখিয়েদিয়েছিল তিনি শুধুমাত্র একজন নারী দেশমাতৃকার জন্য নিজের সংসারও বিসর্জন দিতে পারেন। তিনি একজন অতীব সাহসী নারী। নীরার পিতা ছিলেন পেশায় একজন ব্যবসায়ী। বিভিন্ন প্রতিবেদনের দাবি অনুযায়ী, বাল্যকাল থেকেই নীরার মধ্যে এক অদম্য দূরন্তপনা ও দেশের প্রতি গভীর টান চোখে পড়ত। যে বয়সে আর চার-পাঁচটা ছেলে-মেয়েরা খেলা-ধুলায় বিভোর থাকত, সেই বয়সে ভারতের পরাধীনতা ও ব্রিটিশদের অত্যাচার দেখে রীতিমত ক্ষুব্ধ হতেন তিনি। পড়ালেখার পাশাপাশি অত্যন্ত সাহসের সঙ্গে দেশমাতৃকাকে স্বাধীন করার স্বপ্ন দেখতেন নীরা।
নীরার বৈবাহিক জীবন

এদিকে মেয়ের ব্যবহার দেখে নীরার বাবা অনুমান করেন, স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সঙ্গে হাত মেলাতে পারেন তাঁর কন্যা। জানা যায়, সেই কারণে তড়িঘড়ি মেয়ের জন্য উপযুক্ত পাত্র খুঁজতে শুরু করে দেন নীরার বাবা শেঠ ছাজু রাম লাম্বা। যেহেতু নীরার বাবা শেঠ চৌধুরী ছাজু রাম লাম্বা একজন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ছিলেন, তাই তিনি তাঁর মেয়ের জন্য একজন ধনী ও সুশিক্ষিত যুবক খুঁজছিলেন। ১৯২৮ সালের ২৪শে ডিসেম্বর, তিনি অত্যন্ত জাঁকজমক ও আড়ম্বরের সাথে নীরার সঙ্গে ব্রিটিশ পুলিশ অফিসার শ্রীকান্ত জয়রঞ্জন দাসের বিবাহ দেন। এভাবেই ঔপনিবেশিক ভারতের উচ্চপদস্থ সরকারি আধিকারীক শ্রীকান্ত জয়রঞ্জন দাসের সঙ্গে বিয়ে হয় দেশপ্রেমী নীরা আর্যর। নীরার মনে ছিল দেশের প্রতি অগাধ ভালবাসা। আর শাসক ইংরেজদের প্রতি ছিল ঘৃণা। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাসে সেই ব্রিটিশদের অনুগত শ্রীকান্তের সঙ্গেই তাঁর জীবন জুড়ে গেল। বিভিন্ন প্রথম সারির প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্বামীর পেশার কারণে নীরা ও শ্রীকান্তের মধ্যে অর্ন্তদ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়। যদিও ছাজু রাম লাম্বা জানতেন যে শ্রীকান্ত শুধু একজন পুলিশ অফিসার, তিনি জানতেন না যে শ্রীকান্ত ব্রিটিশ পুলিশের গোয়েন্দা সংস্থায় কাজ করতেন। কিন্তু নীরা যেহেতু বিপ্লবী মানসিকতাসম্পন্ন একজন। তাই তাঁর আর তাঁর স্বামীর মধ্যে বনিবনা হচ্ছিল না, তাই নীরা আর্য অবিলম্বে তার স্বামী ও শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে তার বাবা শেঠ চৌধুরী ছাজুরামের বাড়িতে চলে আসেন। এরপর তিনি দিল্লির শাহদারায় চলে আসেন নীরা।
আজাদ হিন্দ ফৌজে যোগদান ও নেতাজীর সান্নিধ্য
সুভাষচন্দ্র বসুর “আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব” আহ্বানে সারা দেশ যখন উত্তাল, তখন নীরা আর্যও এগিয়ে আসেন। শাহদারায় এসে তিনি শিশুদের পড়াতে শুরু করেন। সে সময় তাঁর দেখা হয় পূর্বপরিচিত রাম সিং-এর সঙ্গে। রাম সিং-এর আজাদ হিন্দ ফৌজে যোগ দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানতে পেরে নীরাও সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। এরপর ভাই বসন্ত কুমারের সঙ্গে সিঙ্গাপুরে গিয়ে আজাদ হিন্দ ফৌজে যোগ দেন নীরা। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর রানি ঝাঁসি রেজিমেন্ট ঘোষণা করেন। ক্যাপ্টেন লক্ষ্মী সহগলের নেতৃত্বে গঠিত ‘রানী ঝাঁসি রেজিমেন্টে’ যোগ দেন। নীরা কেবল সাধারণ সৈনিক হিসেবে কাজ করেননি। তাঁর তীক্ষ্ণ বুদ্ধি, সাহস ও পর্যবেক্ষণ ক্ষমতার জন্য তাঁকে নেতাজী নিজেই আজাদ হিন্দ ফৌজের প্রথম নারী গোয়েন্দার পদ দেন। নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুকে তিনি কেবল নিজের নেতাই মনে করতেন না, বরং তাঁকে নিজের গুরু ও পিতার মতো শ্রদ্ধা করতেন। নেতাজীর প্রতিটি নির্দেশ পালন করাই ছিল তাঁর জীবনের একমাত্র ব্রত।
এক সময় নিজের এক সহযোদ্ধা দুর্গা মল্লকে কারাগার থেকে পালাতে সাহায্য করেন নীরা। এই ঘটনার পর নীরাকে ঝাঁসির রানী রেজিমেন্টের ক্যাপ্টেন করা হয় আর তাঁর বন্ধুকে লেফটেন্যান্ট পদে উন্নীত করা হয়।

নেতাজীকে বাঁচাতে নিজের স্বামীকে খুন
ব্রিটিশ পুলিশ নেতাজীকে হত্যা করার দায়িত্ব নীরার স্বামী শ্রীকান্তকে দিয়েছিলেন। সেই দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে নিজের স্ত্রী-এর হাতে জীবন হারালেন শ্রীকান্ত। জানা যায়, ঘটনার দিন গাড়ির মধ্যে বসে থাকা দেশ নেতা নেতাজীকে লক্ষ্য করে গুলি চালান শ্রীকান্ত। কিন্তু সেই গুলি নেতাজীকে স্পর্শ করতে পারেনি। তা গিয়ে লাগে গাড়ির ড্রাইভারের গায়ে। আর এরপরই এতটুকুও সময় নষ্ট না করে নিজের স্বামী শ্রীকান্তকে হত্যা করেন নীরা। এই ঘটনার পর নীরাকে ‘নাগিনী’ বলে উপাধি নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু।
কারাবাস এবং নির্যাতন
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন দেখলে জানা যায়, ব্রিটিশ সরকারের কর্মচারী অর্থাৎ নিজের স্বামী শ্রীকান্তকে খুন করার অপরাধে নীরা আর্যকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সাজা ঘোষণা করা হয়। নীরাকে পাঠানো হয় আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের কুখ্যাত সেলুলার জেলে। যে জেল সাধারণত ‘কালা পানি‘ নামে পরিচিত। সেখানে তাঁর ওপর প্রতিদিন অকথ্য অত্যাচার করা হত। একটি ছোট্ট কুঠুরিতে লোহার শিকল দিয়ে তাঁকে বেঁধে রাখা হয়। যারা ঐতিহাসিক ঘটনার বিবরণ দেন তাঁদের থেকে ব্রিটিশ কারারক্ষীদের হাতে নীরার ওপর হওয়া নির্মম অত্যাচার করা ও চরম শারীরিক নির্যাতনের বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যায়।
উইকিপিডিয়ার দেওয়া তথ্য থেকে জানা গিয়েছে, কারাবাসে থাকার সময়ও নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুর বিষয়ে অনেক তথ্য ছিল নীরার কাছে। সেই কথা জানতে পেরে তাঁকে প্রথমে নানা রকম প্রলোভন দেখানো হয়। পরে তাঁর ওপর নানা অকথ্য অত্যাচারও করা হয়। কিন্তু নেতাজি ও দেশের প্রতি ভালবাসা ও নিষ্ঠা থাকার জন্য অনেক অনেক অত্যাচারের পরেও নীরা সেই তথ্য ব্রিটিশদের দেয়নি। নীরার থেকে তথ্য না পেয়ে, জেলের মধ্যে লোহা দিয়ে তাঁর স্তন কেটে নেওয়ার মতো নিশংস কাজও করে ব্রিটিশ কারারক্ষিরা। অন্যান্য বন্দীদের সঙ্গে তাঁকেও কঠোর কায়িক শ্রম করতে বাধ্য করা হতো। যার মধ্যে নারকেল থেকে তেল বের করার কাজও অন্তর্ভুক্ত ছিল । ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীনতা লাভ করা পর্যন্ত তিনি কারাবন্দী ছিলেন। এরপর তিনি মুক্তি পান এবং অবশেষে হায়দ্রাবাদে স্থায়ী হন।Raise Your Concern About this Content
নীরা আর্য ও তাঁর শেষ জীবন
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর নীরা আর্য তাঁর বাকি জীবন হায়দ্রাবাদে কাটান। জীবন যাপন করতে তিনি রাস্তার ধারে ফুল বিক্রি করে এক অজ্ঞাত, দুর্দশাগ্রস্ত ও অসহায় জীবনযাপন করতেন। তাও তিনি কোনও ধরনের সরকারি সাহায্য বা পেনশন গ্রহণ করেননি, দেশমাতৃকা ও প্রিয় নেতা নেতাজীর জন্য সহ্য করা কষ্টের কোনও মূল্য হয়না, তা বোঝাতেই হয়তো তাঁর এই সিদ্ধান্ত। নীরার ছোট ভাই বসন্ত কুমারও ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মির একজন স্বাধীনতা সংগ্রামী ছিলেন, যিনি স্বাধীনতার পর সন্ন্যাসীর জীবনযাপন করতেন। হায়দ্রাবাদের মহিলারা নাকি তাঁকে ‘পেদাম্মা’ বলে ডাকতেন। নীরার জীবন নিয়ে ‘নীরা নাগিনী’ নামে এক মহাকাব্যও রয়েছে।

নীরা তাঁর আত্মজীবনী আকারে ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামে নিজের ভূমিকা সম্পর্কেও লিখেছেন। তাঁর আত্মজীবনীতে কালাপানির কারাগারে বন্দী থাকাকালীন ব্রিটিশদের দ্বারা তাঁর প্রতি করা অমানবিক আচরণের ঘটনারও উল্লেখ রয়েছে। হিন্দি-উর্দু লেখিকা মধু ধামার কাছে নিজের জীবন ও স্বাধীনতা সংগ্রামের অনেক ঘটনা জানিয়েছিলেন নীরা। মধু ধামা নীরা আর্যের বর্ণিত ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে একটি উপন্যাসও লিখেছেন, যেখানে ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামে তাঁর অবদানকে তুলে ধরা হয়েছে। ১৯৯৮ সালের ২৬ জুলাই হায়দ্রাবাদের ওসমানিয়া হাসপাতালে এই বীরাঙ্গনা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুর সময় তাঁর কাছে আপন কেউই ছিল না, প্রায় অজ্ঞাতবাসেই তাঁর জীবনাবসান ঘটে বলে জানা যায়।
উপসংহার
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের নেপথ্যে করা আত্মত্যাগের এক শক্তিশালী সাক্ষ্য হলেন নীরা আর্য। নেতাজীকে বাঁচাতে স্বামীকে হত্যা করা বা কোনও গোপন তথ্য প্রকাশ না করে নির্যাতন সহ্য করা বা গুপ্তচর হিসেবে জীবন বাজি রাখা, নীরার অটল সাহস তাঁকে নারীশক্তি ও জাতীয়তাবাদের এক বিস্মৃত চরিত্র হিসাবে ব্যাখ্যা করা যায়। অনেক শিল্পী নীরা আর্য এবং তাঁর ভাই বসন্ত কুমারের জীবন নিয়ে কবিতা ও স্তোত্র রচনা করেছেন।
নীরা আর্য আমাদের কাছে এক উজ্জ্বল উদাহরণ। নারী হয়েও যে দেশের জন্য এত এত আত্মত্যাগ, বলিদান করা যায়, দেশের জন্য লড়াই করা যায় তা নীরা আর্য, প্রিতিলতা ওয়াদ্দেদার, মাতঙ্গিনী হাজরাদের মতো মহিয়সী নারীরা বারবার প্রমাণ করে গিয়েছেন। আর সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে আজও আমরা নারী পুরুষ ভেদাভেদ করি। অনেক সময় বইয়ের পাতায় হয়তো সমস্ত উজ্জ্বল নক্ষত্রদের কথা উল্লেখ করা হয় না, কিন্তু আমাদের মনে তাঁদেরকে জায়গা দিতে ভুললে চলবে না।
তথ্যসূত্র
১. উইকিপিডিয়া
২. আনন্দবাজার
৩. দ্য ওয়াল
৪. আজ তক বাংলা
৫. ফ্যানডম



