Homeজীবনশৈলীস্বপ্ন নিয়েই পাহাড়েই বিলীন নির্মল পুর্জা

স্বপ্ন নিয়েই পাহাড়েই বিলীন নির্মল পুর্জা

‘’Find what you love the most and let it kill you ‘’-  Nirmal Purja

স্বপ্ন দেখা খুব সহজ কিন্তু সেই স্বপ্নকে আমৃত্যু সঙ্গে নিয়ে জীবনের পথে চলা খুব কঠিন। স্বপ্নের সেই অমসৃণ পথই বেছে নিয়েছিলেন নির্মল “নিমসদাই” পুরজা। একঘেয়ে জীবনের তোয়াক্কা না করে পাহাড় যার কাছে ছিল শান্তির একমাত্র ঠিকানা। সেই পাহাড়েই কোলেই মাথা রেখে চিরনিদ্রায় চলে গেলেন “নিমসদাই”। যাকে তিনি সবথেকে বেশি ভালোবাসতেন সেই পাহাড়ে মাত্র ৪৩ বছরে চিরকালের মতো বিলীন হয়ে গেলেন।

কে ছিলেন নির্মল “নিমসদাই” পুরজা?

অনেকের হয়তো এই মানুষটার কথা জানেন না।  নেপালের মায়াগদি জেলার ডানা নামক ছোট্ট গ্রামে ১৯৮৩ সালে ২৫ জুলাই জন্মগ্রহণ করেন নির্মল পুরজা। নেপালের সাধারণ পরিবারে বড় হওয়া নির্মল পুর্জা কেরিয়ারের শুরুতে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর গুর্খা ব্রিগেডে যোগ দেন।  পরবর্তীতে রয়্যাল নেভির বিশেষ বাহিনী ইউনিট স্পেশাল বোট সার্ভিস-এর দায়িত্ব পালন করেন। 

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

পুরজা জানিয়েছিলেন, ব্রিটেন যে সমস্ত যুদ্ধক্ষেত্রে সামরিকভাবে অংশ নিয়েছিল, তিনি সেগুলির প্রত্যেকটিতেই দায়িত্ব পালন করেছেন। একবার এক স্নাইপারের গুলি তাঁর রাইফেলের বাঁটের অংশে আঘাত করে। গুলিটি অল্পের জন্য তাঁর ঘাড়ে লাগেনি। এই ঘটনায় তিনি আহতও হয়েছিলেন।

নির্মল পুরজার পর্বতারোহণ

২০১২ সালে নির্মল পুরজা তাঁর প্রথম উল্লেখযোগ্য হিমালয় অভিযান সম্পন্ন করেন। কোনও পূর্ববর্তী পর্বতারোহণের অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও তিনি লোবুচে ইস্ট-এর শৃঙ্গে আরোহণ করে সফলভাবে চূড়ায় পৌঁছান।

১৮ মে ২০১৪ সালে মাত্র ১৫ দিনের একটি অভিযানে তিনি প্রথমবারের মতো বিশ্বের আট-হাজারি শৃঙ্গ জয় করেন। তিনি ধৌলাগিরির ৮,১৬৭ মিটার উচ্চ শৃঙ্গে আরোহণ করে এই কৃতিত্ব অর্জন করেন। ১৩ মে ২০১৬ সালে তিনি মাউন্ট এভারেস্ট-এর চূড়ায় পৌঁছান এটি ছিল তাঁর জয় করা দ্বিতীয় আট-হাজারি শৃঙ্গ।

১৫ মে ২০১৭ সালে পুরজা “G200E” নামে গুর্খা অভিযানের নেতৃত্ব দেন। ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে গুর্খাদের ২০০ বছরের সামরিক পরিষেবা উদ্‌যাপন উপলক্ষে আয়োজিত এই অভিযানে তাঁর নেতৃত্বে ১৩ জন গুর্খা পর্বতারোহী এভারেস্টের চূড়ায় আরোহণ করেন।

পুরজা মোট আটবার মাউন্ট এভারেস্টের চূড়ায় আরোহণ করেন। তাঁর তৃতীয় এভারেস্ট জয় ২৭ মে ২০১৭ সালে, চতুর্থবার ২২ মে ২০১৯ সালে, পঞ্চমবার ৩১ মে ২০২১ সালে, ষষ্ঠবার ১৫ মে ২০২২ সালে, সপ্তমবার ১৭ মে ২০২৩ সালে এবং অষ্টমবার ২৭ মে ২০২৬ সালে।

প্রোজেক্ট পসিবল

সাল ২০১৯,  ‘‘প্রজেক্ট পসিবল ১৪/৭’’ নামে এক অসাধারণ পর্বতারোহণের অভিযানের পরিকল্পনা করেন পুরজা। মাত্র সাত মাসের মধ্যে আট-হাজারি শৃঙ্গ জয় করা এই অভিযানের মূল লক্ষ্য।  সেই বছর ২৩ এপ্রিল প্রথম শৃঙ্গ জয়ের মধ্য শুরু হয় তাঁর এই বিস্ময়কর অভিযান। ২৪ মে-র মধ্যেই প্রথম পর্যায়ে ৬টি শৃঙ্গ অন্নপূর্ণা, ধৌলাগিরি, কাঞ্চনজঙ্ঘা, মাউন্ট এভারেস্ট, লোৎসে এবং মাকালু জয় করে ফেলেন তিনি।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

পুরজার সঙ্গে ছিলেন মিংমা গ্যাবু “ডেভিড” শেরপা, লাকপা ডেন্ডি , গেলজেন শেরপা এবং তেনসি কাসাং-সহ আরও কয়েকজন পর্বতারোহী। মাত্র ১২ দিনের মধ্যে তিনি জয় করেন শেষ পাঁচটি শৃঙ্গ। এভারেস্ট, লোৎসে এবং মাকালু এই তিনটি শৃঙ্গ মাত্র ২ দিন ৩০ ঘণ্টার মধ্যে জয় করে তিনি নিজের আগের গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডও ভেঙে দেন।

২০১৯ সালের জুলাই মাসে শুরু হয় অভিযানের দ্বিতীয় পর্যায়। পাকিস্তানে মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তিনি নাঙ্গা পর্বত (৮,১২৬ মিটার; ৩ জুলাই), গ্যাশারব্রুম I (৮,০৮০ মিটার; ১৫ জুলাই), গ্যাশারব্রুম II (৮,০৩৪ মিটার; ১৮ জুলাই), K2 (৮,৬১১ মিটার; ২৪ জুলাই) এবং ব্রড পিক (৮,০৪৭ মিটার; ২৬ জুলাই) জয় করেন।

২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে শুরু হয় এই অভিযানের তৃতীয় ও চূড়ান্ত পর্যায়। ২৩ সেপ্টেম্বর তিনি চোয়োয়ু (৮,১৮৮ মিটার) এবং ২৭ সেপ্টেম্বর মানাসলু (৮,১৬৩ মিটার) জয় করেন। এরপর শিসাপাংমা জয়ের জন্য বিশেষ অনুমতির প্রয়োজন হয়। নেপাল সরকারের অনুরোধে চিনা কর্তৃপক্ষ শরৎকালীন মৌসুমে পুরজা ও তাঁর দলকে শিসাপাংমায় আরোহণের বিশেষ অনুমতি দেয়।

২০১৯ সালের ১৮ অক্টোবরে ৫ সদস্যের একটি অভিযানের নেতৃত্ব দিয়ে পুরজা নেপাল থেকে তিব্বতের উদ্দেশে রওনা হন। অবশেষে ২৯ অক্টোবর ২০১৯ সালে সম্পূরক অক্সিজেন ব্যবহার করে শিসাপাংমার চূড়ায় পৌঁছানোর মাধ্যমে তিনি ‘‘প্রজেক্ট পসিবল ১৪/৭’’ সম্পূর্ণ করেন। মাত্র ৬ মাস ৬ দিন সময়ে বিশ্বের ১৪টি আট-হাজারি শৃঙ্গ জয় করে তিনি পর্বতারোহণের ইতিহাসে এক অনন্য নজির স্থাপন করেন।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

অন্যান্য দুর্গম পর্বতারোহণের কৃতিত্ব 

১৪টি সর্বোচ্চ পর্বত দ্রুততম সময়ে আরোহণের পাশাপাশি পুরজা আরও বেশ কয়েকটি রেকর্ড গড়েন। এর মধ্যে ছিল এক মৌসুমে সর্বাধিক ছয়টি ৮,০০০ মিটারের বেশি উচ্চতার শৃঙ্গ জয়, গ্রীষ্মকালীন মৌসুমে পাঁচটি আট-হাজারি শৃঙ্গ জয় এবং বিশ্বের তিনটি সর্বোচ্চ পর্বত এভারেস্ট, K2 ও কাঞ্চনজঙ্ঘা দ্রুততম সময়ে জয় করার রেকর্ড। এছাড়াও বিশ্বের পাঁচটি সর্বোচ্চ পর্বত এভারেস্ট, K2, কাঞ্চনজঙ্ঘা, লোৎসে ও মাকালু দ্রুততম সময়ে জয় করেন তিনি।Raise Your Concern About this Content

বিশেষ করে এভারেস্ট, লোৎসে ও মাকালু পরপর মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে জয় করে পুরজা নিজের আগের পাঁচ দিনের রেকর্ডও ভেঙে দেন। একইভাবে গ্যাশারব্রুম I, গ্যাশারব্রুম II ও ব্রড পিক-ও দ্রুততম সময়ে জয় করার রেকর্ড গড়েন।

২০১৯ সালের মে মাসে প্রজেক্ট পসিবল চলাকালীন এভারেস্টে অতিরিক্ত ভিড়ের একটি ছবি পুরজা নিজেই তোলেন। ছবিটি দ্রুত ভাইরাল হয়ে আন্তর্জাতিকভাবে আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস-এ প্রকাশিত হয়।

নির্মল পুরজার এই অবিশ্বাস্য অভিযানকে কেন্দ্র করে নির্মিত হয় নেটফ্লিক্সের তথ্যচিত্র “14 Peaks: Nothing Is Impossible”। ছবিটি ২৯ নভেম্বর ২০২১ সালে মুক্তি পায় এবং তাঁর সাত মাসের মধ্যে ১৪টি আট-হাজারি শৃঙ্গ জয়ের অসম্ভবকে সম্ভব করার অভিযানের কাহিনি তুলে ধরে। নেটফ্লিক্সের “১৪ পিকস: নাথিং ইজ ইম্পসিবল” তথ্যচিত্রের মাধ্যমে কোটি কোটি মানুষের কাছে তাঁর গল্প পৌঁছে যায়।

শেষ অভিযান 

৩১ জুলাই ২০২৬, পাকিস্তানের কারাকোরাম পর্বতমালার ব্রড পিক অভিযানে ভয়াবহ তুষারধস কেড়ে নেয় সেই কিংবদন্তি পর্বতারোহীর জীবন। ৮,০৪৭ মিটার উচ্চতার এই শৃঙ্গ বিশ্বের দ্বাদশ সর্বোচ্চ পর্বত। অভিযানের সময় প্রায় ৭,০০০ মিটার উচ্চতায় একটি বড় তুষারধস নেমে আসে। প্রথমে তাঁকে নিখোঁজ ঘোষণা করা হয়। পরবর্তীকালে চাঁর সংস্থা এলিট এক্সপেডের তরফ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়, সেই তুষারধসেই প্রাণ হারিয়েছেন নির্মল “নিমসদাই” পুরজা। 

তথ্যসূত্র

১. উইকিপিডিয়া
২. হিন্দুস্তান টাইমস
৩. ইয়াহু নিউজ
৪. এওএল নিউজ


বিশ্বয়নী দত্ত
বিশ্বয়নী দত্ত
কলকাতা বিশ্ববিদ্য়ালয় থেকে জার্নালিজম এবং মাস কমিউনিকেশনে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন। গত কয়েক বছর ধরে জাতীয় প্রতিষ্ঠানে সাংবাদিকতা ও কন্টেট রাইটিং-এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। লেখালেখির প্রতি তাঁর বিশেষ অনুরাগ রয়েছে । ব্যস্ত জীবনের একঘেয়েমি কাটাতে মাঝেমধ্যে পাহাড়ে ঘুরতে যেতে ভালবাসেন।
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

বাংলা ক্যালেন্ডার

- বিজ্ঞাপন -spot_img

Most Popular

Recent Comments