বিপন্ন বসুন্ধরা: সমাধানের পথে বিজ্ঞানের আলো

পটভূমি:

বিশ্ব বসুন্ধরা দিবস প্রথম অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭০ সালের ২২শে এপ্রিল। কিন্তু কাহিনীর সুত্রপাত হয় ১৯৬২ সাল থেকে, যখন রাচেল কারসনের রচিত বই ‘সাইলেন্ট স্প্রিং’ নোবেল পুরষ্কার পেয়েছিলেন। তিনিই সর্বপ্রথম তাঁর বইতে আলোকপাত করেন যে কিভাবে একটি যুগান্তকারী নোবেলজয়ী আবিষ্কার (ডি ডি টি) কিভাবে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়। এরপর আসে ১৯৬৯ সালের জানুয়ারি মাস, দক্ষিন ক্যালিফোর্নিয়ায় অবস্থিত সান্তা বারবারা শহরে ঘটল ইউনিয়ন অয়েল স্পিল। এই দূর্ঘটনায় প্রায় ৯০ লক্ষ গ্যালন তেল সমুদ্রে মিশে যায়, যার ফলে মারা পরে ব্যাপক পরিমাণে জলজ প্রাণী, মারা যায় অগণিত পাখি। এরপর ১৯৭০ সালে তৎকালীন আমেরিকান সেনেটর গেয়েলর্ড নেলসন বিশ্ব বসুন্ধরা দিবস প্রবর্তন করেন। আর তবে থেকেই প্রতিবছর এই বিশেষ দিনটিতে পৃথিবীর সকল দেশ সবকিছুকে একদিনের জন্য ভুলে নিজের পারিপার্শ্বিক পরিবেশের প্রতি দৃষ্টিপাত করেন।

বিশ্ব বসুন্ধরা দিবসের ইতিহাস:

বিশ্ব বসুন্ধরা দিবসের ইতিহাস বলতে গেলে আমাদের যেতে হবে ১৯৪৮ সালে, যখন সুইস কেমিস্ট পল মুলার ‘ডিডিটি’ আবিস্কারের জন্য নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন। তারপর থেকে দেখা যায়, পর্যায়ক্রমে ইউরোপের পাখিদের সংখ্যা ধীরে ধীরে কমতে। এর নিস্পত্তি করেন গেয়েলর্ড নেলসন যিনি এই দূষণের কারণগুলিকে পর্যবেক্ষণ করেন এবং তিনি দেখেন, ডিডিটি এর অতিব্যবহারের ফলে ঘটছে ফসলের বিষক্রিয়া; আর তার প্রভাব লক্ষ করা যাচ্ছে ফসলে। এই ঘটনার প্রমাণ দেয় রাচেল কারসনের রচিত বই ‘সাইলেন্ট স্প্রিং’। এবং আরো দেখা গেছে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির জন্য বায়ুদূষণও বৃদ্ধি পায়। তাই ১৯৭০ সালে তৎকালীন সরকার ইউ.এস.ই.পি.এ (USEPA) প্রতিষ্ঠা করে বিশ্ব বসুন্ধরা দিবস প্রবর্তন করেন, যার মাধ্যমে ডিডিটি ব্যাবহারে নিয়মাবলী স্থাপন করা হয়।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

বিশ্ব বসুন্ধরা দিবসের ইতিহাসে ভারতের ভুমিকা

১৯৭০ খ্রিস্টাব্দে বিশ্ব বসুন্ধরা দিবস প্রথম পর্যবেক্ষণ করার পর প্রথম আন্তর্জাতিক সভা হয় দুবছর বাদে সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমে। এই সভায় আয়োজক আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের পরে যে দেশ অগ্রণী ভুমিকা পালন করে, সে আমাদের ভারতবর্ষ। এই সভায় তৎকালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী একটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রেখেছিলেন যা এখনও সমান সমাদৃত। তিনি বলেছিলেন, “কোনও দেশের দারিদ্র্য হল সেই দেশের দূষণের সবথেকে বড় কারণ, দেশ উন্নত হলে দারিদ্রতা মিটবে সেই দেশের মানুষের, সেই দেশে দূষণ তত কমবে।” এই সভার পরে সেই বছরেই উনি বন্যপ্রাণী সুরক্ষা আইন চালু করেন, তারপরের বছর বাঘের সংরক্ষনের জন্য ব্যাঘ্র প্রকল্প শুরু করেন; আর পরবর্তী বর্ষে জলসংরক্ষণ আইন চালু করেন তিনি। এইসব পরিকল্পনার জন্য আন্তর্জাতিক স্তরে ইন্দিরা গান্ধিকে ‘ভারতের প্রকৃতিবিদ প্রধানমন্ত্রী’ হিসেবে অভিহিত করা হয়।

বিশ্ব বসুন্ধরা দিবস ২০২৬ এর মূলসূত্র:

বিশ্ব বসুন্ধরা দিবস ২০২৬ এর মূলসূত্র হল ‘আমাদের শক্তি, আমাদের গ্রহ’ (Our Power, Our Planet)। এই মূলসূত্র বা থিমকে গভীরে দেখলে বোঝা যায়, পরিবেশ দূষণ রোধ করার জন্য এখন প্রত্যেকটি দেশ নবায়নযোগ্য শক্তি উতপাদনের প্রতি মনোযোগ যথেষ্ট মনযোগ দিচ্ছে। অন্যদিকে, বিশ্ব উষ্ণায়ন ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে; তাই সকলে এই কথাটিও মাথায় রেখে অগ্রসর হচ্ছেন।

বিশ্ব বসুন্ধরা দিবসের প্রাক পদক্ষেপসমূহ:

বর্তমানে যেখানে প্রাচ্যের দেশগুলো যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির সঙ্গে সময় অতিবাহিত করছে, সেখানে বিশ্ব বসুন্ধরা দিবস ২০২৬ উপলক্ষ্যে ভারতের প্রাক পদক্ষেপের কথা বলতে গেলে তিনটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপের কথা বলতে হয়:

  • নবীকরণযোগ্য শক্তিতে বিনিয়োগ: ই-১০ জ্বালানির সাথে এখন ই-২০ এবং ই-৩০ জাতের জ্বালানিদের কেও যানবাহনে ব্যাবহার করা হচ্ছে, এবং এদের থেকেও সহজলভ্য ই-৫০ জাতের জ্বালানি তৈরি করার কাজ চলছে সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের মাধ্যমে।
  • মিশন লাইফ: এই প্রকল্পের মাধ্যমে স্থিতিশীল জীবন অতিবাহিত করার সামগ্রীর ব্যবহার বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়। এডিবেল কাপ (চা খাওয়ার পর সেই কাপ খাওয়া যাবে, এর জন্য প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো যাবে), এডিবেল স্ট্র (ব্যবহার করার পরে এটিকেও খাওয়া যাবে) এই প্রকল্পের একটি অংশ।
  • স্থিতিশীল চাষাবাদ: এই চাষাবাদ পদ্ধ্বতি অজৈব সারের তুলনায় জৈব সার ব্যাবহারকে বেশি জোড় দেয়, এবং অযাচিত অজৈব উপাদানকে চাষাবাদ পদ্ধ্বতি থেকে নির্মূল করার বার্তা দেয়।

বিশ্ব বসুন্ধরা দিবসের তাৎপর্য:

বিশ্ব বসুন্ধরা দিবসে পৃথিবীর সকল প্রাকৃতিক এবং জলবায়ুর সমস্যাগুলো নিয়ে যুক্তিগতভাবে আলছনা করা হয়, এবং প্রতিকারের চেষ্টা করা হয় যাতে একটি সুষম পৃথিবীতে আমরা বাস করতে পারি। এই যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে কিছু দেশের প্রকৃতিবিদ এখনও সংকল্পে ব্রতি হয়েছে যে ২০৪৭ সালের মধ্যে ‘শূন্য নির্গমন’ হবে দেশগুলিতে।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশ্ব বসুন্ধরা দিবসের গুরুত্ব:

বর্তমান প্রেক্ষাপটে, বিশ্ব যখন জলবায়ু পরিবর্তন, জীববৈচিত্র্য হ্রাস, দূষণ এবং সম্পদ হ্রাসের মতো ক্রমবর্ধমান প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন, তখন বসুন্ধরা দিবস আগের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা যায়, গ্রিনহাউস প্রভাবের কারণে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে, চরম আবহাওয়ার ঘটনা বাড়ছে এবং বাস্তুতন্ত্রের স্বাস্থ্যহানি ঘটছে, যার সবই মানুষের বেঁচে থাকা এবং জীবিকার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। ধরিত্রী দিবস ব্যক্তি, সরকার এবং সংস্থাগুলোর মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি, টেকসই অনুশীলনকে উৎসাহিত করা এবং সম্মিলিত পদক্ষেপ গ্রহণে অনুপ্রাণিত করার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হিসেবে কাজ করে। এটি নবায়নযোগ্য শক্তি গ্রহণ, সংরক্ষণ প্রচেষ্টা এবং দায়িত্বশীল ভোগের মতো তাৎক্ষণিক ও বিজ্ঞান-ভিত্তিক সমাধানের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেয়, যা একটি টেকসই ও স্থিতিস্থাপক ভবিষ্যতের জন্য গ্রহকে রক্ষা করা অপরিহার্য—এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

কিভাবে আপনিও পালন করতে পারেন বিশ্ব বসুন্ধরা দিবস:

যে কেউ পরিবেশ রক্ষায় সহায়ক সহজ ও পরিবেশ-বান্ধব অভ্যাস গ্রহণের মাধ্যমে বিশ্ব বসুন্ধরা দিবস উদযাপন করতে পারেন। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে গাছ লাগানো, প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো, বর্জ্য পুনর্ব্যবহার করা, জল ও শক্তি সংরক্ষণ করা এবং হাঁটা বা সাইকেল চালানোর মতো পরিবহন বেছে নেওয়া। পরিচ্ছন্নতা অভিযানে অংশগ্রহণ এবং পরিবেশগত সমস্যা সম্পর্কে সচেতনতা ছড়িয়ে দেওয়াও সাধারণ পদক্ষেপে অবদান রাখে। গ্রিনহাউস এফেক্ট-এর মতো ধারণাগুলো বোঝার মাধ্যমে এবং জীবনযাত্রায় ছোট ছোট পরিবর্তন আনার মাধ্যমে ব্যক্তিরা তাদের পরিবেশগত প্রভাব কমাতে এবং একটি স্বাস্থ্যকর পৃথিবী গড়তে অর্থবহ ভূমিকা পালন করতে পারেন।Raise Your Concern About this Content

  • নতুন প্রজন্মের জন্য সঠিক শিক্ষা: নতুন প্রজন্ম সচেতনতা ও কর্মের সমন্বয়ে এবং গ্রহটিকে রক্ষা করার জন্য প্রযুক্তি ও জীবনযাত্রার পছন্দ উভয়কেই ব্যবহার করে বিশ্ব বসুন্ধরা দিবস উদযাপন করতে পারে। তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রচারণার মাধ্যমে স্থিতিশীল উন্নয়নের প্রসার ঘটাতে পারে, পরিচ্ছন্নতা অভিযানে অংশ নিতে পারে এবং প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো, শক্তি সংরক্ষণ ও গণপরিবহন বা সাইকেল চালানোর মতো পরিবেশ-বান্ধব অভ্যাস গ্রহণ করতে পারে।
  • অনুষ্ঠান সূচি:
সময়মূলসূত্রকার্যক্রমউদ্দেশ্য/প্রভাব
সকাল ৭টা হইতে ৯টাপ্রকৃতির সঙ্গে সংযোগপক্ষী পর্যবেক্ষণ, প্রাকৃতিক শোভাযাত্রাবাস্তুতন্ত্রের সাথে সংযোগ স্থাপন করে, জীববৈচিত্র্য সচেতনতা বৃদ্ধি করে
10:30 – 1:00 PMবিজ্ঞানের সহিত বাস্তবগ্রিন হাউস প্রভাবের বক্তৃতা শোনা এবং ভাবনা-অন্বেষণবৈজ্ঞানিক বোঝাপড়া এবং তথ্য-ভিত্তিক চিন্তাভাবনাকে উৎসাহিত করে
1:00 – 3:00 PMস্থিতিশীল জীবনযাত্রাশূন্য বর্জ্য খাদ্যগ্রহণ, কাপড়ের ব্যাগের ব্যবহার, ধাতব টিফিন বাক্সের ব্যবহার।স্থিতিশীল জীবনধারাকে উৎসাহিত করে এবং বর্জ্য কমায়।
৪টা হইতে ৬টাসামাজিক প্রভাব বিস্তারমিলিত হয়ে সাধারণ মানুষকে অবগত করা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনাস্থানীয় পরিবেশের উন্নতি ঘটায় এবং সচেতনতা ছড়িয়ে দেয়
৭টা হইতে ৯টাসমাপ্তিস্থিতিশীল শপথগ্রহণআত্ম-প্রতিফলন, দীর্ঘমেয়াদী অঙ্গীকার এবং আচরণগত পরিবর্তনে উৎসাহিত করে।

তথ্যপঞ্জি :

সাইলেন্ট স্প্রিং-এর কথায় – ডি ডি টি পরিবেশ দূষণের কুশিলব
ইন্দিরা গান্ধীর অবদান
মিশন লাইফ ও তাঁর বিবরণ
বিশ্ব বসুন্ধরা দিবসের মূলসূত্র

শান্তনু বারিক
শান্তনু বারিক
বিজ্ঞানমনস্কতা ও গবেষণাভিত্তিক লেখায় প্রায়োগিক অভিজ্ঞতা নিয়ে শান্তনু, এক উদীয়মান সাহিত্যিক প্রতিভা। সাহিত্যের প্রতি প্রফুল্ল স্নেহ এবং প্রকৃতির প্রতি দায়িত্ববান এক তরুণ লেখক। প্রাণিবিদ্যায় স্নাতক ও পরিবেশবিদ্যায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রী সম্পন্ন করে, আন্তর্জাতিক জার্নালে এবং গল্প সংকলনে তার লেখা প্রকাশ পেয়েছে। তার লেখা একক বই কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলায় প্রকাশ পেয়েছে, তার লেখা "অদ্ভুতুড়ে আলিনগর" বইটি পাঠকমহলে সমাদৃত হয়েছে। শান্তনুর মতে যেকোনো বই লেখকের মননের বহিঃপ্রকাশ। বর্তমানে তিনি বিশ্ব বাংলা হাব এর লেখক হিসেবে কর্মরত।

প্রাসঙ্গিক

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here
Captcha verification failed!
CAPTCHA user score failed. Please contact us!

সাথে থাকুন

110FansLike
105FollowersFollow
190SubscribersSubscribe
- বাংলা ক্যালেন্ডার -
- বিজ্ঞাপন -spot_img

সাম্প্রতিক