Homeইত্যাদিহুইস্লিং ভিলেজ (মেঘালয়, উত্তর পূর্বাঞ্চল, ভারত)

হুইস্লিং ভিলেজ (মেঘালয়, উত্তর পূর্বাঞ্চল, ভারত)

হুইসলিং ভিলেজ এর পরিচিত 

হুইস্লিং ভিলেজ  বা শিস দেওয়া গ্রাম বলতে মূলত বিশ্বের কাছে একটি গ্রামে পরিচিত। এটি হল ভারতের মেঘালয় রাজ্যের পূর্ব খাসি হিল্স জেলার কংথং গ্রাম। ২০১১ জনগণনা অনুযায়ী এই গ্রামের লোকসংখ্যা ৫৬৭ জন।যার মধ্যে ২৭৫জন পুরুষ ও ২৯২জন মহিলা রয়েছেন।১০৯ টি পরিবার রয়েছে। ঘুরে দেখলে আপনারা বুঝতেই পারবেন এই জায়গার লোকের না সুরে সুরে কথা বলে। শিস এর আওয়াজ বের করে একে অপরকে মনের কথা বলে। এ যেন এক সুরেলা গ্রাম। 

চলুন আলোচনা করি এই গ্রামের বৈশিষ্ট্য নিয়ে 

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

জিঙরোয়াই ইয়াওবে(Jingrwai lawbei):

এখানে প্রতিটি শিশুরজন্মের পর তার মা তাকে একটি নির্দিষ্ট সুর বা শিস উপহার দেন,যা সারা জীবন সেই ব্যক্তির পরিচয় বা নাম হিসাবে ব্যবহৃত হয়। এই সুরটি মূলত একটি ঘুম পাড়ানি গান বা থেকে নেওয়া হয়। 

দুই ধরনের সুর:

এখানে প্রতিটি মানুষের জন্য দুটি সুর থাকে। একটি হলো বড় সুর যা ৩০ সেকেন্ডের হয় আরেকটি ছোট সুর যা ১০ সেকেন্ডের।সাধারণত বাড়ির ভেতরে ছোট সুর ব্যবহৃত হয় এবং পাহাড়ে  বা  বনে ডাকার জন্য বড় সুরটি ব্যবহৃত হয়। 

মাতৃতান্ত্রিক সংস্কৃতি :

এই ঐতিহ্যটি খাসি উপজাতির মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার অংশ। এখানে নাম বা সুর দেওয়ার সম্পূর্ণ অধিকার শুধুমাত্র মায়ের রয়েছে। তাই মায়েরাই বেছে নেবেন তাদের সন্তানের নামের সুর কি হবে। 

শিস দেওয়ার উদ্দেশ্য :

এই ঐতিহ্য  প্রকৃতির সাথে গভীর সংযোগের জন্য করা হয়েছে। ছেলেমেয়েরা কাজের জন্য ও নিত্যনৈমিত্ত কাজের জন্য বনে জঙ্গলে ঘোরাফেরা করে। আর তাই  উপত্যকা জুড়ে যোগাযোগের ব্যবস্থা এই ঐতিহ্যের অংশ । 

গ্রামের অবস্থান:

মেঘালয়ের কুয়াশাছন্ন পূর্বখাসি পাহাড়ে অবস্থিত এই গ্রামটির প্রকৃতি যেন সবাইকেই টানে। অপরূপ সবুজ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরা এই গ্রাম আজ পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়। এখানে মেঘ আর গাছ যেন একে অপরের কানে কানে নিরবে কিছু বলে যায়।

যোগাযোগের মাধ্যম :

মেঘালয়ের শিলং শহর থেকে ৫২.৪ কিলোমিটার দূরে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ঘেরা এই গ্রাম অবস্থিত।শিলং শহরের পুলিশ বাজার এলাকা থেকে গাড়ি ভাড়া করে কংথং যেতে হয়।রয়েছে সরকারি বাসের ব্যবস্থা ও।

থাকার ব্যবস্থা :

গ্রামটিতে পর্যটকদের টানার জন্য হোমস্টের ব্যবস্থা রয়েছে। যেখানে গ্রামবাসীর ঘর গুলোর মতন কুঁড়েঘর বানানো আছে। রয়েছে বেশ কয়টি হোমস্টের ব্যবস্থা। সেখানে থেকে ওই গ্রামকে উপভোগ করার জন্য গাইড ও পেয়ে যাবেন। পর্যটকরা যেন এই এলাকাটিতে ঘুরতে আসে সেজন্য গ্রামের মানুষ হিন্দি শিখছে। চেষ্টা করছেন নিজেদের গ্রামকে বিশ্বের দরবারে পৌঁছে দেওয়ার।অনলাইনেও কিছু টুরিস্ট গাইড পেয়ে যাবেন। 

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

কংথং গ্রামের খাবার

উত্তর পূর্বাঞ্চলের এ পাহাড়ি গ্রামে গেলে স্থানীয়ভাবে  উৎপাদিত  খাসি উপজাতিদের খাবারের স্বাদ নিতে পারেন। যার বৈশিষ্ট্য হলো ভাত, ধুয়াজাত মাংস, গাজানো উপাদান। স্থানীয় হোমস্টেতে পাওয়া যায় জাদোহ (শূকরের মাংস মশলা দিয়ে রান্না করা ভাত), দো-নেইয়ং(কালো তিল দিয়ে শুকরের মাংস) এবং টুংরিম্বাই।পর্যটকরা এখানে তাজা মধুর সাধও পেতে পারেন। এখানকার হোমস্টে গুলোতে নিজেরা রান্না করে খাওয়ারও ব্যবস্থা রয়েছে। অর্গানিক সবজি, ফল খেতে হলে মেঘালয়ের এইসব উপজাতি এলাকা না ঘুরলে সেটা মিস করবেন। 

পর্যটকদের কাছে এই গ্রাম পৌঁছে গেছে বেশ কয়েক বছর আগে ২০২১ সালে UNWTO-এর সেরা গ্রাম পুরস্কারে   জন্য এই গ্রাম মনোনীত হয়েছিল। ২০৩০ সালে জাতীয় পর্যটন এরা পর্যটন গ্রাম হিসাবে ব্রোঞ্জ পুরস্কারে ভূষিত হয় শিস গ্রাম। পর্যটকদের আকর্ষণ বাড়াতে স্থানীয় সংস্কৃতি, মনোরম ট্রাকিং, এবং রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ দ্বারা সমর্থিত হোমস্টে রয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকার এই গ্রামটি উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করেছে। বছরের সেপ্টেম্বর অক্টোবর মাসে মেঘালয় ঘুরতে আসলে অবশ্যই এই গ্রামটি ভুলবেন না।

ভ্রমনের খরচ 

যদি বিমানে করে গৌহাটি পৌছে যান তাহলে গাড়ি করে শিলং,সেখান থেকে চেরাপুঞ্জী হয়ে কংথং এ ঘুরে বেড়ানো।৫দিনের ট্রেকিং,হোম স্টে,খাওয়ার  খরচ মিলিয়ে  জন প্রতি ১০ থেকে ২০ হাজারের বেশী খরচ হবেনা।

কংথং গ্রামের ভবিষ্যৎ :

ভারত সরকার মেঘালয়ের এই কংথং গ্রামটিকে গণ পর্যটনের পরিবর্তে অনন্য সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা অর্জনকারী এক বিশেষ গ্রামগড়ে তোলার চেষ্টা চালাচ্ছে। তার অবকাঠামো ও সংযোগ ব্যবস্থাকে আরো উন্নত করার। সেখানকার জীবন্ত শেকড়ের সেতু বাঁশের পথ দেখার জন্য প্রতিবছর পর্যটকরা দেশ বিদেশ থেকে এই গ্রামে ভিড় জমায়। 

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

চ্যালেঞ্জ :

গ্রামের প্রবীণরা ঐতিহ্যের সম্ভাব্য ক্ষতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। বিশেষ করে শিক্ষার উন্নয়নের জন্য বর্তমানে গ্রামের ছেলে মেয়েরা বাইরে চলে যাচ্ছে। আর এটা গ্রামটিকে তার ঐতিহ্য নিয়ে টিকিয়ে রাখার এক বিশাল চ্যালেঞ্জ।গ্রামের ধারণ ক্ষমতা বজায় রাখতে বর্তমানে একবারে  ১৫-২০জন পর্যটক প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে যাতে স্থানীয় সংস্কৃতি পরিবেশ ক্ষতি না হয়। গ্রামবাসীরা এই ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে গ্রামে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত কোন স্থাপনের দাবি জানিয়েছে। 

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও সংরক্ষণ :

UNESCO  স্বীকৃতি :

গ্রামের অনন্য ‘জিংরওয়াই ইয়াবেই’ প্রথাকে ইউনেস্কোর অপরিমেয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মর্যাদা দেওয়ার জন্য আমি ধোন জানানো হয়েছে।

ভ্রমনের শ্রেষ্ঠ সময়:

অক্টোবর থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত এই গ্রামের আবহাওয়া মনোরম থাকে। পরিষ্কার আকাশ আরামদায়ক তাপমাত্রা থাকে যার ফলে ট্র্যাকিং করা এবং স্থানীয় এলাকা ঘুরে দেখার আনন্দ আস্বাদন করা আনন্দদায়ক হয়। অক্টোবর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত শীতের মাস হওয়ায় ঝরঝরে পরিবেশ, পরিষ্কার আকাশ ও আশপাশের উপত্যকা গুলি দেখার জন্য আদর্শ। অন্যদিকে বর্ষার পরবর্তী সময় সেপ্টেম্বর থেকে অক্টোবর মাসে ভারী বৃষ্টিপাতের পরে সবুজ পরিবেশ বিরাজ করে।তবে ভারী, অবিরাম বৃষ্টিপাত, ভূমিধস, বর্ষার সর্বোচ্চ মৌসুমজুন থেকে আগস্ট মাস  এড়িয়ে চলা উচিত। 

ভ্রমণের কিছু ছোট্ট টিপস আমার পক্ষ থেকে:

গ্রামটির অভিজ্ঞতা লাভের জন্য সাধারণত তিন ঘন্টার ভ্রমণ  যথেষ্ট। স্থানীয়দের সঙ্গে তাদের সঙ্গে কথা বলুন তাহলেই তারাও আপনার সঙ্গে মিশে সংগীতের সুর আপনার সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারে। যাওয়ার সময় গরম কাপড় এবং ড্রিঙ্ক কোট সাথে রাখুন। যেকোনো সময় আবহাওয়ার পরিবর্তন হতে পারে। 

দুদিনের কংথং গ্রাম উপভোগ করার একটা আমার মতো করে টুর প্লেন করে দিলাম।দেখুন তো ,এভাবেও ঘুরে আসা যায় কিনা।Raise Your Concern About this Content

প্রথম দিন: শিলং → কংথং গ্রাম

যাত্রা

  • ভোরে শিলং থেকে রওনা
  • রুট: মাওরিংখাং / সাইতসোহপেন হয়ে
  • পাহাড়, উপত্যকা ও বনভূমির মনোরম দৃশ্য

কংথং পৌঁছে

  • স্থানীয় হোমস্টে-তে চেক-ইন
  • গ্রামবাসীদের আন্তরিক অভ্যর্থনা

গ্রাম অভিজ্ঞতা

  • ‘জিংরওয়াই ইয়াবেই’ (শিস দিয়ে ডাকার নাম) সম্পর্কে জানা
  • খাসি পরিবারগুলোর সঙ্গে আলাপচারিতা
  • গ্রাম ভ্রমণ ও ছবি তোলা

খাবার

  • ঐতিহ্যবাহী খাসি খাবার
  • বাঁশকোরল, স্থানীয় ভাত ও জৈব সবজি

রাতের ব্যবস্থা

  • ক্যাম্পফায়ার (যদি উপলব্ধ থাকে)
  • লোককথা ও গ্রামীণ জীবন উপভোগ

দ্বিতীয় দিন: ঘোরা ও ফেরা

সকাল

  • গ্রামের পাহাড় থেকে সূর্যোদয় দেখা
  • প্রকৃতির মাঝে হাঁটা / হালকা ট্রেকিং
  • পাখি পর্যবেক্ষণ

স্থানীয় সংস্কৃতি

  • গ্রামের হস্তশিল্প দেখা
  • খাসি সংস্কৃতি ও জীবনযাপন সম্পর্কে জানা

ফিরে আসা

  • কাছাকাছি গ্রাম বা শিলংয়ে মধ্যাহ্নভোজ
  • সন্ধ্যার মধ্যে শিলং ফেরা

ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলি নিয়ে গল্প করতে করতে আজ তুলে ধরলাম মেঘালয়ের এক গ্রামের গল্প। যে গ্রামে কথা বলে না অনুভূতি প্রকাশ হয় সুরে সুরে। আবার কখনো কথা হবে অন্য কোন জায়গা নিয়ে। উত্তর পূর্বাঞ্চলের কোন কোন জায়গা নিয়ে আপনারা জানতে আগ্রহী তা কিন্তু আমাদের  জানাবেন। আজ তাহলে এতটুকুই।

তথ্যসূত্র :

১. অফিশিয়াল পেজ : মেঘালয় সরকার
২. উইকিপিডিয়া

সঙ্ঘমিত্রা ভট্টাচার্য
সঙ্ঘমিত্রা ভট্টাচার্যhttps://www.biswabanglahub.com
আমি সংঘমিত্রা ভট্টাচার্য। পেশায় একজন মিডিয়া কর্মী এবং গত ১৭ বছর ধরে বিভিন্ন স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। সাংবাদিকতার মাধ্যমে মানুষের গল্প, সমাজের বাস্তবতা এবং আমাদের সংস্কৃতিকে তুলে ধরাই আমার মূল লক্ষ্য। বিশেষ করে ভ্রমণকাহিনি, উত্তর–পূর্ব ভারতের সংস্কৃতি, ঐতিহ্যবাহী খাবার এবং মানুষের জীবনধারা নিয়ে লিখতে আমি ভীষণ আগ্রহী। একজন উত্তর–পূর্ব ভারতের নারী হিসেবে আমি আমার রাজ্য এবং দেশের বৈচিত্র্য, সৌন্দর্য ও সংস্কৃতিকে বৃহত্তর বিশ্বের সামনে তুলে ধরতে চাই। আমার বিশ্বাস, গল্প ও লেখার মাধ্যমে আমরা আমাদের মাটির গন্ধ এবং মানুষের হৃদয়ের কথা সবার কাছে পৌঁছে দিতে পারি।
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

বাংলা ক্যালেন্ডার

- বিজ্ঞাপন -spot_img

Most Popular

Recent Comments