ড্রী উৎসব ২০২৬ কবে? কীভাবে যাবেন জিরো উপত্যকায়? জানুন আপাতানি সম্প্রদায়ের এই ঐতিহ্যবাহী কৃষি উৎসবের ইতিহাস, সংস্কৃতি, নাচ, আচার এবং ভ্রমণ টিপস।
পাহাড়ের গায়ে মেঘের আনাগোনা। চারদিকে সবুজ ধানখেত। দূরে পাইন গাছের সারি। তারই মাঝে ঐতিহ্যবাহী পোশাকে সেজে উঠেছেন আপাতানি সম্প্রদায়ের মানুষ। কোথাও প্রার্থনা, কোথাও লোকগান, আবার কোথাও ছন্দ মিলিয়ে চলছে ঐতিহ্যবাহী নৃত্য। প্রকৃতি আর মানুষের এই অপূর্ব মিলনই ড্রী উৎসব (Dree Festival)।
অরুণাচল প্রদেশের জিরো উপত্যকা (Ziro Valley)-য় আপাতানি সম্প্রদায়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৃষিভিত্তিক উৎসব হল ড্রী। প্রতি বছর জুলাই মাসে এই উৎসবকে ঘিরে জিরো যেন নতুন সাজে সেজে ওঠে। ২০২৬ সালে ৫ জুলাই ড্রী উৎসব পালিত হয়েছে।

কেন এত গুরুত্বপূর্ণ ড্রী উৎসব?
অরুণাচল প্রদেশ শুধু পাহাড় আর জঙ্গলের সৌন্দর্যের জন্য বিখ্যাত নয়। এই রাজ্যের আসল আকর্ষণ তার বৈচিত্র্যময় আদিবাসী সংস্কৃতি। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ড্রী হল আপাতানি সম্প্রদায়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎসবগুলোর একটি।
জিরো উপত্যকা মূলত আপাতানি জনগোষ্ঠীর আবাসভূমি। এখানকার কৃষিপদ্ধতি, বিশেষ করে ধানচাষ ও জলব্যবস্থাপনার ঐতিহ্য, দীর্ঘদিন ধরে পর্যটক ও গবেষকদের আকর্ষণ করে আসছে। অরুণাচল পর্যটন দফতরের তথ্য অনুযায়ী, জিরো প্রায় ১,৫০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত এবং এখানকার টেরেস ধানখেত ও ধান-সহ-মাছ চাষের পদ্ধতি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
তাই ড্রী উৎসব শুধু একটি উৎসব নয়—এটি আপাতানি সমাজের কৃষি, প্রকৃতি, বিশ্বাস ও সামাজিক ঐতিহ্যের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।
ড্রী উৎসবের ইতিহাস: ভালো ফসলের প্রার্থনা থেকেই শুরু
ড্রী উৎসবের শিকড় আপাতানি জনগোষ্ঠীর প্রাচীন কৃষিজীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। অতীতে কৃষিই ছিল মানুষের জীবনধারণের প্রধান অবলম্বন। কিন্তু খরা, অতিবৃষ্টি, পোকামাকড়ের আক্রমণ, রোগব্যাধি কিংবা ফসল নষ্ট হওয়ার মতো নানা সমস্যার সঙ্গে কৃষকদের লড়াই করতে হতো।
তাই প্রকৃতির শক্তিকে সন্তুষ্ট করা, ভালো ফসলের জন্য প্রার্থনা করা এবং সমাজের মানুষের সুস্বাস্থ্য কামনা করার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন আচার পালনের ঐতিহ্য তৈরি হয়।
ড্রী উৎসবের বিভিন্ন আচার মূলত ফসল রক্ষা, রোগব্যাধি দূর করা, জমির উর্বরতা বজায় রাখা এবং মানুষের কল্যাণ কামনা-কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই আচারগুলো একটি বৃহত্তর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উৎসবের রূপ নেয়। আজ ড্রী উৎসব আপাতানি সংস্কৃতির অন্যতম পরিচায়ক।

উৎসবের আচার: পুরোহিতের মন্ত্রে শুরু হয় প্রার্থনা
ড্রী উৎসবের ধর্মীয় আচার পরিচালনা করেন ঐতিহ্যবাহী পুরোহিতরা। আপাতানি সমাজে তাঁদের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মুখে মুখে চলে আসা মন্ত্র, লোককথা ও ঐতিহ্যবাহী জ্ঞান তাঁরা স্মৃতি থেকে উচ্চারণ করেন।
প্রকৃতির বিভিন্ন উপাদানকে কেন্দ্র করে তৈরি হয় অস্থায়ী বেদী। বাঁশ, পাতা ও অন্যান্য প্রাকৃতিক উপকরণ ব্যবহার করে সাজানো হয় সেই স্থান। কোনও জাঁকজমকপূর্ণ মন্দিরের বদলে প্রকৃতির বুকেই যেন তৈরি হয় উৎসবের পবিত্র পরিসর।
এখানেই ড্রী উৎসবের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য—প্রকৃতিই যেন এই উৎসবের মন্দির।
মিথুনের বিশেষ গুরুত্ব কেন?
ড্রী উৎসবের ঐতিহ্যবাহী আচারগুলোর সঙ্গে মিথুন (Mithun/Gayal)-এর বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে। অরুণাচল প্রদেশের রাজ্য পশু মিথুন বহু আদিবাসী সম্প্রদায়ের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রাচীন রীতিতে উৎসবের আচার-অনুষ্ঠানে মিথুন উৎসর্গের প্রথার উল্লেখ পাওয়া যায়। এই প্রথার সঙ্গে দেবতার আশীর্বাদ, সমৃদ্ধি ও ভালো ফসলের প্রত্যাশা জড়িয়ে রয়েছে।
তবে আধুনিক সময়ে এই ধরনের ঐতিহ্যকে বোঝার ক্ষেত্রে স্থানীয় সংস্কৃতি ও সম্প্রদায়ের বিশ্বাসের প্রতি সম্মান রাখা অত্যন্ত জরুরি।
শুধু পূজা নয়, উৎসবের প্রাণ ‘দামিন্দা’ নাচ
ড্রী উৎসবের কথা বললে দামিন্দা (Daminda) নৃত্যের কথা না বললেই নয়।
ঐতিহ্যবাহী পোশাক ও গয়নায় সেজে আপাতানি নারীরা দলবদ্ধভাবে এই লোকনৃত্যে অংশ নেন। নাচের ছন্দ, লোকসংগীত, পোশাক এবং পাহাড়ি পরিবেশ—সবকিছু মিলে তৈরি হয় এক অপূর্ব সাংস্কৃতিক আবহ।
পর্যটকদের কাছে ড্রী উৎসবের এই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বিশেষ আকর্ষণের। ক্যামেরায় ছবি তোলার পাশাপাশি স্থানীয়দের সংস্কৃতিকে কাছ থেকে বোঝার সুযোগও পাওয়া যায়।
ড্রী উৎসবের ‘ট্যাবু’ বা সামাজিক নিষেধপর্ব
ড্রী উৎসবের সঙ্গে ঐতিহ্যগতভাবে কিছু সামাজিক নিষেধও যুক্ত রয়েছে। উৎসবের আচার শেষ হওয়ার পর নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কৃষিকাজ, জমি খোঁড়া, গাছ কাটা কিংবা অন্যান্য কিছু কাজ বন্ধ রাখার প্রথা ছিল।
এই রীতির সঙ্গে ধর্মীয় বিশ্বাস যেমন রয়েছে, তেমনই কৃষিনির্ভর সমাজে প্রকৃতি ও জমিকে বিশ্রাম দেওয়ার ধারণাটিও গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থাৎ ড্রী উৎসব আমাদের মনে করিয়ে দেয়—প্রকৃতিকে জয় করা নয়, প্রকৃতির সঙ্গে তাল মিলিয়েই বাঁচতে হয়।
জিরো উপত্যকা কেন পর্যটকদের এত পছন্দ?
ড্রী উৎসব দেখতে গেলে শুধু উৎসব নয়, ঘুরে দেখা যায় অসাধারণ সুন্দর জিরো উপত্যকা।
অরুণাচল পর্যটনের তথ্য অনুযায়ী, জিরো লোয়ার সুবানসিরি জেলার সদর দফতর এবং এটি প্রায় ১,৫০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত। সবুজ বন, ছোট নদী-ঝরনা, পাহাড় এবং বিস্তীর্ণ ধানখেত জিরোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
বিশেষ করে আপাতানি সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী কৃষিপদ্ধতি জিরোর পর্যটন আকর্ষণকে আরও বাড়িয়েছে।
কীভাবে যাবেন জিরো?
জিরো যাওয়ার ক্ষেত্রে বিমান, রেল ও সড়ক—তিনটি পথই ব্যবহার করা যায়। ইটানগর থেকেও সড়কপথে জিরো যাওয়া সম্ভব। সরকারি পর্যটন তথ্য অনুযায়ী, ইটানগর থেকে জিরো সড়কপথে প্রায় পাঁচ ঘণ্টার যাত্রা।
আকাশপথে আসামের লিলাবাড়ি বিমানবন্দর ব্যবহার করা যেতে পারে। গুয়াহাটি বা ডিব্রুগড় হয়েও যাত্রা পরিকল্পনা করা সম্ভব।
রেলপথে নাহারলাগুন হয়ে সড়কপথে জিরো যাওয়ার পরিকল্পনাও করা যায়। তবে বর্ষাকালে পাহাড়ি রাস্তায় যাতায়াতের ক্ষেত্রে আবহাওয়া ও রাস্তার পরিস্থিতি আগে দেখে নেওয়া ভালো।
জিরো যেতে ILP লাগবে?
হ্যাঁ। অরুণাচল প্রদেশে ভ্রমণের ক্ষেত্রে ভারতীয় নাগরিকদের জন্য Inner Line Permit বা ILP প্রয়োজন। রাজ্য সরকারের সরকারি eILP পোর্টালে অনলাইনে আবেদন করা যায়।
সরকারি পোর্টালের বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, পর্যটকদের জন্য Tourist eILP-এর নির্দিষ্ট মেয়াদ ও ফি রয়েছে; আবেদন করার আগে সরকারি পোর্টালে সর্বশেষ নিয়ম দেখে নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।
বিদেশি পর্যটকদের জন্য ILP-এর পরিবর্তে প্রযোজ্য Protected Area Permit (PAP)-এর নিয়ম রয়েছে।
ড্রী উৎসবে গেলে কী কী সঙ্গে রাখবেন?
জুলাই মাসে অরুণাচল প্রদেশে বর্ষার প্রভাব থাকে। তাই জিরো ভ্রমণের সময় সঙ্গে রাখুন—
- রেইনকোট ও ছাতা
- জলরোধী জুতো
- হালকা গরম পোশাক
- প্রয়োজনীয় ওষুধ
- পাওয়ারব্যাঙ্ক
- পরিচয়পত্র ও ILP-এর কপি
- ক্যামেরা বা মোবাইল ফোন
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—স্থানীয় সংস্কৃতির প্রতি সম্মান রাখুন। কোনও ধর্মীয় আচার বা মানুষের ছবি তোলার আগে অনুমতি নেওয়া ভালো।

থাকার ব্যবস্থা কেমন?
ড্রী উৎসবের সময় পর্যটকের চাপ বাড়তে পারে। তাই আগে থেকেই থাকার ব্যবস্থা করা বুদ্ধিমানের কাজ।
জিরো ও আশপাশে স্থানীয় হোমস্টে পর্যটকদের জন্য বিশেষ আকর্ষণীয় হতে পারে। হোমস্টেতে থাকলে শুধু থাকার অভিজ্ঞতা নয়, আপাতানি মানুষের খাবার, জীবনযাত্রা ও স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গেও পরিচিত হওয়ার সুযোগ মেলে।
ড্রী উৎসব আসলে কী শেখায়?
ড্রী উৎসবের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়তো এখানেই—মানুষ ও প্রকৃতি আলাদা নয়।
একদিকে কৃষিজমি, অন্যদিকে পাহাড় ও অরণ্য। তার মাঝেই মানুষের বসতি। ভালো ফসলের জন্য প্রার্থনা, রোগ থেকে মুক্তির কামনা, সামাজিক ঐক্য, নাচ-গান এবং প্রাচীন ঐতিহ্য—সবকিছু মিলিয়ে ড্রী উৎসব হয়ে ওঠে আপাতানি সমাজের জীবনদর্শনের একটি পূর্ণাঙ্গ ছবি।
আজকের ডিজিটাল জীবনে যখন মানুষ প্রকৃতি থেকে ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে, তখন জিরোর ড্রী উৎসব যেন অন্যরকম এক বার্তা দেয়—প্রকৃতিকে ভালোবেসে, তার নিয়ম মেনে, তার সঙ্গে মিলেমিশেই বেঁচে থাকা যায়।
শেষ কথা
অরুণাচল প্রদেশের জিরো উপত্যকা শুধু একটি পর্যটনকেন্দ্র নয়; এটি যেন জীবন্ত সংস্কৃতির একটি খোলা বই। আর সেই বইয়ের সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায়গুলোর একটি হল ড্রী উৎসব।
সবুজ পাহাড়, ধানখেত, আপাতানি সংস্কৃতি, ঐতিহ্যবাহী পোশাক, দামিন্দা নৃত্য, প্রাচীন আচার এবং উৎসবের আনন্দ—সব মিলিয়ে ড্রী হয়ে উঠেছে উত্তর-পূর্ব ভারতের অন্যতম আকর্ষণীয় সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা।Raise Your Concern About this Content
তাই পাহাড়ের সৌন্দর্যের পাশাপাশি যদি উত্তর-পূর্ব ভারতের আদিবাসী সংস্কৃতিকে কাছ থেকে জানতে চান, তাহলে আপনার ভ্রমণ তালিকায় জিরো উপত্যকার ড্রী উৎসবকে জায়গা দিতেই পারেন।
তথ্যসূত্র ও তথ্যসূচি
১. ড্রী উৎসবের ইতিহাস, আচার, দেবতা ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্য
২. জিরো উপত্যকার পর্যটন, কীভাবে যাবেন, আবহাওয়া, দর্শনীয় স্থান ইত্যাদি
৩. আপাতানি সম্প্রদায়, ড্রী, মিয়োকোসহ স্থানীয় সংস্কৃতি
৪. আপাতানি জনগোষ্ঠী, টেকসই কৃষিপদ্ধতি, UNESCO Tentative World Heritage প্রসঙ্গ



