Homeপার্বণীসেপ্টেম্বর মাসের আগমনের সাথে জড়িয়ে বাঙালির দুর্গাপুজোর কাউন্ট ডাউন 

সেপ্টেম্বর মাসের আগমনের সাথে জড়িয়ে বাঙালির দুর্গাপুজোর কাউন্ট ডাউন 

বাঙালির কাছে তাই শরৎ শুধু একটি ঋতু নয়। শরৎ মানেই দুর্গাপুজোর অপেক্ষা। আর সেই অপেক্ষার প্রথম স্পষ্ট অনুভূতিটা অনেকের কাছেই আসে সেপ্টেম্বর মাসে। স্কুল-কলেজে পুজোর ছুটির আলোচনা, দোকানে নতুন পোশাকের সম্ভার, পাড়ার মণ্ডপ তৈরিতে ব্যস্ততা, যারা মাকে মৃন্ময়ী রূপ দেন সেই সব মৃৎশিল্পীর হাতে প্রতিমার কাঠামো তৈরি,সবকিছু মিলে শহর ও গ্রামের বাতাসে ধীরে ধীরে উৎসবের আবহ তৈরি হতে থাকে।

সেপ্টেম্বর,পুজো পুজো গন্ধে ভরে উঠে চারদিক

বাংলা পঞ্জিকা অনুযায়ী দুর্গাপুজো আশ্বিন মাসে অনুষ্ঠিত হয়। ইংরেজি ক্যালেন্ডারে সেই সময়টা সাধারণত সেপ্টেম্বরের শেষ থেকে অক্টোবরের মধ্যে পড়ে। ফলে সেপ্টেম্বর এলেই পুজোর প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায়।

ফটো : সঙ্ঘমিত্রা ভট্টাচার্য

তবে শুধু ক্যালেন্ডারের হিসাব নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রকৃতির পরিবর্তনও। বর্ষার ঘন মেঘ ধীরে ধীরে সরে গিয়ে আকাশ পরিষ্কার হতে থাকে। নীল আকাশে তুলোর মতো সাদা মেঘ ভেসে বেড়ায়। রাস্তাঘাটের পাশে বা নদীর চরে ফুটতে শুরু করে কাশফুল। আর ভোরের বাতাসে পাওয়া যায় শিউলির মিষ্টি গন্ধ।প্রকৃতি যেন জানান দেয় উমার বাড়ি আসার সময় এসে গেছে।

কাশফুল আর পূজার সম্পর্ক

বাংলার শরৎকে কল্পনা করলেই কাশফুলের ছবি চোখের সামনে ভেসে ওঠে। নদীর ধারে বা খোলা মাঠে দুলতে থাকা সাদা কাশ যেন শরতের নিজস্ব শুভ্রতা। ছোটবেলা থেকে গল্প, কবিতা, ছবি ও পুজোর স্মৃতির সঙ্গে কাশফুলের পরিচয় তৈরি হয়েছে বাঙালির। তাই সেপ্টেম্বরের শুরুতে কোথাও কাশফুল ফুটতে দেখা গেলেই মনে হয়—আর বেশি দেরি নেই, মা আসছেন।আজকের শহুরে জীবনে অনেকেই হয়তো কাশবন চোখে দেখেন না। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শরতের কাশফুলের ছবি দেখেও সেই পুরনো অনুভূতি ফিরে আসে।

শিউলির গন্ধ আর মায়ের আগমনের বার্তা

শরতের আরেক পরিচিত প্রতীক শিউলি। ভোরবেলায় গাছের নিচে পড়ে থাকা সাদা-কমলা শিউলি কুড়িয়ে নেওয়া বাঙালি ছেলেমেয়েদের ছোটবেলার  অন্যতম সুন্দর স্মৃতি।অনেক বাড়িতেই ছোটরা ভোরে উঠে শিউলি কুড়িয়ে ঠাকুরের পায়ে দিত। কারও কাছে সেই ফুল পুজোর অঞ্জলির স্মৃতি, কারও কাছে ঠাকুমা-দিদার হাত ধরে ভোরের উঠোনে যাওয়ার স্মৃতি।আজ শহুরে ফ্ল্যাটবাড়িতে সেই দৃশ্য অনেকটাই বিরল। তবু সেপ্টেম্বরের সকালে শিউলির গন্ধ পেলেই যেন বহু বছর আগের সেই সকাল ফিরে আসে।

পুজোর আগে বাঙালির ঘরে শুরু হয় প্রস্তুতি

দুর্গাপুজো শুধু চারদিনের উৎসব নয়। বাঙালির কাছে পুজো আসলে এক বছরের অপেক্ষা ও প্রস্তুতির ফল।একসময় পুজোর আগে বাড়িতে ঘটা করে  পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ শুরু হতো। আলমারি পরিষ্কার, পুরনো জামাকাপড় গুছিয়ে রাখা, ঘর সাজানো, রান্নাঘর পরিষ্কার—সবকিছুতেই থাকত উৎসবের ছোঁয়া।তারপর শুরু হতো নতুন জামাকাপড় কেনা। বাবা-মায়ের সঙ্গে দোকানে গিয়ে নিজের পছন্দের পোশাক বেছে নেওয়ার আনন্দ ছিল আলাদা। নতুন জুতোর বাক্স, জামার গন্ধ এবং কেনাকাটা শেষে বাড়ি ফেরার সেই উত্তেজনা আজও অনেকের স্মৃতিতে অমলিন।এখন অবশ্য কেনাকাটার ধরন বদলে গেছে। শপিং মল, অনলাইন সোপিং, হোম ডেলিভারী সবই এসেছে। কিন্তু নতুন পোশাক কেনার আনন্দটা এখনও বাঙালির পুজোর প্রস্তুতির অন্যতম অংশ।

ফটো : সঙ্ঘমিত্রা ভট্টাচার্য

পাড়ার পুজোও জানান দেয়—উৎসব আসছে

সেপ্টেম্বর এলেই পাড়ার চেহারা বদলাতে শুরু করে। কোথাও মণ্ডপ তৈরির কাজ শুরু হয়, কোথাও আলো লাগানোর পরিকল্পনা চলে, আবার কোথাও পুজো কমিটির বৈঠক।

আগে পাড়ার পুজোর প্রস্তুতিতে স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ ছিল অনেক বেশি। ছোট-বড় সবাই কোনও না কোনওভাবে যুক্ত থাকত। এখন সময় বদলেছে। থিম পূজা, বড় বাজেট, স্যোশাল মিডিয়া প্রমোশন, অনলাইন ডোনেশন —নতুন অনেক কিছু যোগ হয়েছে।তবু মণ্ডপের কাঠামো উঠতে শুরু করলে কিংবা ঢাকের আওয়াজ শোনা গেলে বাঙালির মনে সেই পুরনো উত্তেজনাই ফিরে আসে।

মহালয়ার অপেক্ষা

দুর্গাপুজোর আগমনী অনুভূতিকে আরও গভীর করে তোলে মহালয়া। ভোরবেলা রেডিও বা টেলিভিশনে মহিষাসুরমর্দিনীর আবহে ঘুম ভাঙার স্মৃতি বহু বাঙালির জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। এখনও রেডিও তে বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্রের চন্ডী পাঠ যেন মহালয়ার আমেজকে আরো বাড়িয়ে দেয়।আগে মহালয়ার ভোরে বাড়ির সবাই একসঙ্গে উঠে অনুষ্ঠান শুনতাম। এখন রেডিও-র পাশাপাশি ইউ টিউব, মোবাইল এপ ও স্যোশাল মিডিয়া-তেও মহালয়ার অনুষ্ঠান দেখা ও শোনা যায়। মাধ্যম বদলেছে, কিন্তু অনুভূতিটা এখনও একই রকম—মনে হয়, সত্যিই মা আসছেনRaise Your Concern About this Content

শহর ও গ্রামের শরৎ—দুই রকম, অনুভূতি এক

গ্রামে শরতের আগমন এখনও অনেক বেশি দৃশ্যমান। মাঠের পাশে কাশফুল, পুকুরের ধারে শিউলি, পরিষ্কার আকাশ—প্রকৃতিই যেন উৎসবের সাজ পরে নেয়। আবার শহরে ,সেই দৃশ্য অনেকটা বদলে গেছে। কংক্রিটের বাড়ি, ব্যস্ত রাস্তা আর যানজটের মধ্যে শরৎকে খুঁজে পাওয়া কঠিন। তবু কোনও রাস্তার ধারে একটি শিউলি গাছ, কোনও পার্কের পাশে কাশফুল কিংবা নীল আকাশের ফাঁকে সাদা মেঘ—এই সামান্য দৃশ্যই শহুরে বাঙালির মনে পুজোর অনুভূতি জাগিয়ে দিতে পারে।

পুজো  শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়

ফটো : সঙ্ঘমিত্রা ভট্টাচার্য

বাঙালির কাছে দুর্গাপুজোর অর্থ অনেক বিস্তৃত। এটি ধর্মীয় উৎসব হওয়ার পাশাপাশি সামাজিক মিলন, সংস্কৃতি, খাবার, পোশাক, শিল্প, সাহিত্য, সঙ্গীত এবং পারিবারিক আনন্দেরও উৎসব। যে মানুষ সারা বছর অন্য শহরে বা অন্য দেশে থাকেন, তিনিও পুজোর সময় বাড়ি ফেরার পরিকল্পনা করেন। বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করা, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো, নতুন পোশাক পরা, প্যান্ডেল ঘোরা, ভোগ খাওয়া—সবকিছু মিলিয়ে পুজো হয়ে ওঠে বাঙালির সামাজিক জীবনের অন্যতম বড় আয়োজন।

বদলে গেছে সময়, বদলায়নি অপেক্ষা

আজকের বাঙালির জীবন অনেক দ্রুত চলে। স্মার্টফোন, স্যোশাল মিডিয়া, অনলাইন সোপিং এবং ব্যস্ত কর্মজীবন আমাদের দৈনন্দিন অভ্যাস বদলে দিয়েছে। পুজোর প্রস্তুতিও তাই আগের মতো নেই।কিন্তু সেপ্টেম্বর এলেই কিছু অনুভূতি এখনও একই রয়ে যায়।নীল আকাশ দেখলে পুজোর কথা মনে পড়ে। কাশফুল দেখলে মন ভালো হয়ে যায়। শিউলির গন্ধে শৈশব ফিরে আসে। নতুন জামার বিজ্ঞাপন দেখলে কেনাকাটার কথা মনে পড়ে। আর কোথাও দূরে ঢাকের শব্দ শুনলে মনে হয়—আর কয়েকদিন পরেই তো মা আসছেন।এই অপেক্ষাটাই বোধহয় বাঙালির দুর্গাপুজোর সবচেয়ে সুন্দর অংশ।সেপ্টেম্বর তাই শুধু একটি মাস নয়,সেপ্টেম্বর বাঙালির কাছে অনেক সময় একটি মানসিক পরিবর্তনের মাস। বর্ষার আবহ ধীরে ধীরে পিছিয়ে যায়, শরৎ তার পরিচয় দিতে শুরু করে। প্রকৃতির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মনেও নিয়ে আসে উৎসবের প্রস্তুতি।দুর্গাপুজোর আনন্দ হয়তো কয়েকদিনের। কিন্তু তার অপেক্ষা অনেক দীর্ঘ। আর সেই অপেক্ষার প্রথম ঘণ্টাধ্বনি যেন শোনা যায় সেপ্টেম্বরের আকাশেই। তাই সেপ্টেম্বর এলেই বাঙালির মনে সত্যিই যেন পুজোর ঘণ্টা বাজে।

তথ্যসূচী

নিজস্ব

- বিজ্ঞাপন -
সঙ্ঘমিত্রা ভট্টাচার্য
সঙ্ঘমিত্রা ভট্টাচার্যhttps://www.biswabanglahub.com
আমি সংঘমিত্রা ভট্টাচার্য। পেশায় একজন মিডিয়া কর্মী এবং গত ১৭ বছর ধরে বিভিন্ন স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। সাংবাদিকতার মাধ্যমে মানুষের গল্প, সমাজের বাস্তবতা এবং আমাদের সংস্কৃতিকে তুলে ধরাই আমার মূল লক্ষ্য। বিশেষ করে ভ্রমণকাহিনি, উত্তর–পূর্ব ভারতের সংস্কৃতি, ঐতিহ্যবাহী খাবার এবং মানুষের জীবনধারা নিয়ে লিখতে আমি ভীষণ আগ্রহী। একজন উত্তর–পূর্ব ভারতের নারী হিসেবে আমি আমার রাজ্য এবং দেশের বৈচিত্র্য, সৌন্দর্য ও সংস্কৃতিকে বৃহত্তর বিশ্বের সামনে তুলে ধরতে চাই। আমার বিশ্বাস, গল্প ও লেখার মাধ্যমে আমরা আমাদের মাটির গন্ধ এবং মানুষের হৃদয়ের কথা সবার কাছে পৌঁছে দিতে পারি।
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

বাংলা ক্যালেন্ডার

- বিজ্ঞাপন -spot_img

Most Popular

Recent Comments