‘সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি, সারাদিন আমি যেন রিলস দেখে চলি’- ইদানিং এটাই যেন জেন- জি’ র বেদবাক্য। রিলসে বিভোর একটা গোটা তরুণ প্রজন্মই এখন এই মায়াজালে আবদ্ধ। উঠতে বসতে খেতে শুতে এমন কি কাজের ফাঁকেও রিলস স্কল এখন শ্বাস-প্রশ্বাসের আনুষঙ্গিক একটা বিষয় ওটা ছাড়া বাঁচা যায় না। তাই চিকিৎসকের বলেন আর পাঁচটা নেশার সঙ্গে এর তুলনাও করা যায় অনায়াসে।
আপাত দৃষ্টিতে রিলস বিনোদনের অঙ্গ, তবে রিলস- সাগরে ডুব দেয়ার অভ্যেসকে অনেকেই শুধু সময়ের অপচয় বলেই এড়িয়ে যায়। কিন্তু বিষয়টা কি আদতে এইটুকুই স্নায়ু বিজ্ঞানীদের বিভিন্ন গবেষণায় কিছু অন্য কথা বলছে। তাদের মতে, মদ-জুয়া কিংবা ড্রাগ,রিলসে আসক্তি এদের চাইতে কম ক্ষতিকারক কিছু নয়। নিউরোইমেজে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন ‘পির রিভিউ স্টাডি‘ র সমীক্ষায় বলছে, যেকোনো ধরনের মাদকাসক্তি কিংবা জুয়া জাতীয় যেকোনো খেলায় আমাদের মস্তিষ্কে ডোপামিন ও সেরোটোনিন নামক দুটি রাসায়নিক তরলের ক্ষরণ বাড়িয়ে দেয়। ঠিক একই ঘটনা ঘটে রিলস দেখার সময়ও।
১. কীভাবে ঘটে?
ধরুন, আপনি এমন কোন কাজ করলেন যেটা করে আপনার ভালো লাগছে। যেকোনো কাজ কারুর একটা সিনেমা দেখে মন ভালো হয়, কেউ আবার তার পছন্দের মানুষের সঙ্গে কথা বলেন। কেউ গেম খেলেন আবার কেউ কেউ সিগারেটে সুখটান বিয়ে কিংবা অ্যালকোহলেই জীবনের উদ্বেগ ভোলাতে ব্যস্ত। এই সমস্ত ক্ষেত্রেই আপনার ভালো অনুভূতি হয় কারণ সে সময় আপনার মস্তিষ্ক ডোপামিন ও সেরোটোনিন নিঃসরণ করে। এরমধ্যে ডোপামিন মুখ্য যা আপনার আনন্দ অনুভূত হওয়ার অন্যতম কারণ। এখানে ডোপামিনের ভূমিকা একটি নিউরো ট্রান্সমিটারের মত যা আপনাকে বোঝায় আপনার ভালো লাগছে।
২. রিলস কীভাবে ক্ষতি করছে?
মনোযোগ, আত্মনিয়ন্ত্রণ, সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য দায়ী হল মস্তিষ্কের প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স। ২৬-২৭ বছর বয়স পর্যন্ত এই অংশ পরিণত (ডেভলপ) হয়। বার বার সমাজমাধ্যমে বিভিন্ন কন্টেন্ট দেখলে এই প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স অতিমাত্রায় ব্যবহার করে ফেলি। এ রকম চলতে থাকলে এই অংশ সঙ্কুচিত হতে পারে। সে ক্ষেত্রে রোজের কার্যকলাপ ব্যাহত হয়।রাতে শোওয়ার সময়ে রিল দেখলে ঘুমের ব্যাঘাত হতে পারে। এ ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের হিপ্পোক্যাম্পাস বিরক্ত হতে পারে। এই হিপ্পোক্যাম্পাস স্মৃতি ধরে রাখা এবং স্থানিক নেভিগেশনের জন্য প্রয়োজনীয়। সে কারণে যাঁরা বেশি রিল দেখেন, তাঁদের অনেকেই অভিযোগ করেন, যে কিছু মনে রাখতে পারছেন না।
অ্যালকোহল এবং তামাক মস্তিষ্কের উপরে নিউরোটক্সিক প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে। রিল কতটা ক্ষতি করতে পারে তা এখনও পরিমাপ করতে সমর্থ হননি বিজ্ঞানীরা। তারা মনে করছেন, রিলও ডোপামিন ক্ষরণ বৃদ্ধি করে। তার জেরে মস্তিষ্কের ‘পুরস্কৃত’ করার প্রক্রিয়া নষ্ট হয়। বিশেষত, যে মস্তিষ্ক এখনও পরিণত হয়নি, তার উপর এই ছোট ভিডিয়ো খারাপ প্রভাব তৈরি করতে পারে। তামাক বা অ্যালকোহলের মতো মস্তিষ্কের রাসায়নিক ক্ষতি (কেমিক্যাল ব্রেন ড্যামেজ) না করলেও দীর্ঘদিন ধরে রিল দেখলে মনসংযোগ নষ্ট হতে পারে।

এক, প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স। এটি মস্তিষ্কের সামনের অংশ, যা আমাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ক্ষমতা, স্ব-নিয়ন্ত্রণ এবং মনোযোগ তৈরিতে মুখ্য ভূমিকা পালন করে। ২৫-২৭ বছরের মধ্যে একজন মানুষের প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স সম্পূর্ণ পরিণত হয়। স্নায়ুবিজ্ঞানীদের মতে, এই বয়সে অতিরিক্ত রিলস স্ক্রলিং প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সের সার্বিক উন্নতিতে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে। স্বল্প সময়ের ব্যবধানে একাধিক বিষয়, একটার সঙ্গে আরেকটার যোগ আছে আবার নেইও- সমস্ত বার্তা | বুঝে একটা সিদ্ধান্তে আসতে মস্তিষ্ককে বাড়তি চাপ দিতে হচ্ছে। সংকুচিত হচ্ছে প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স। ফলে, খিটখিটে মেজাজ, ধৈর্যহীনতা, অমনোযোগী এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে বাড়তি সময়, একের পর এক লক্ষণ প্রকাশ পাচ্ছে ব্যবহারে।
দুই, হিপ্পোক্যাম্পাস, মস্তিষ্কের অন্যতম গুরুপূর্ণ একটি অংশ। যা সরাসরি আমাদের স্মৃতিশক্তির সঙ্গে জড়িত। অর্থাৎ, আমরা যা কিছু মনে রাখি , যা কিছু আমাদের স্মৃতিতে বর্তমান, তা সচল রাখে মস্তিষ্কের এই অংশটি। এমনকি, ‘ফাস্ট লার্নিং’-এর বিষয়টিও দেখে এই হিপ্পোক্যাম্পাস। স্নায়ুবিজ্ঞানীরা বলছেন, অতিরিক্ত রিলস দেখা বিশেষত রাতে ঘুমোনোর আগে, মস্তিষ্কের হিপ্পোক্যাম্পাসের কার্যক্ষমতাকে কম করে। যার ফলে, স্মৃতিশক্তি হ্রাস- স্বল্প কিংবা দীর্ঘমেয়াদী উভয়ই হতে পারে। অমনোযোগী, চঞ্চলতা বেড়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ প্রকাশ পাচ্ছে। তাহলে, কতটা সময় নিরাপদ? চিকিৎসক এবং স্নায়ুবিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, ‘কতটা সময় নিরাপদ তার সুনির্দিষ্ট কোনো মানদণ্ড এখনও নেই।’ তবে আপাতত সংঘটিত প্রায় সবকটা গবেষণারই সারমর্ম, দিনে ২-৩ ঘণ্টার বেশি মোবাইল আসক্তিই মস্তিষ্কের জন্য ক্ষতিকারক।
৩. রিলস যেভাবে দর্শককে ফাঁদে ফেলে
ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে রয়েছে রিলস, ইউটিউবে শর্টস। আলাদা নাম হলেও দুটি জিনিস একই। কনটেন্টগুলো হয় খুবই আকর্ষণীয়।
ধরুন, আপনি ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রাম ফিড স্ক্রল করছেন, হঠাৎ একটা সুন্দর রিলস দেখলেন। সঙ্গে সঙ্গেই সেটিতে ক্লিক করলেন, ভালো লেগে গেল। সেটি দেখা শেষে পরের রিলসে গেলেন, এভাবে ধারাবাহিকভাবে একটার পর একটা রিলস দেখতেই থাকলেন। কনটেন্টগুলো আনন্দদায়ক হওয়ায় আপনিও মজা পেয়ে গেলেন। এভাবে নিজের অজান্তেই কখন যে ফাঁদে পড়ে গেলেন, বুঝতেই পারেননি।
এই প্রসঙ্গে মনোরোগ চিকিৎসক অনন্যা ভট্টাচার্য বলেন, ‘বইয়ের প্রতিটা পাতা লাইন ধরে পড়া, আর ক্রমাগত পাতা উল্টানোর মধ্যে ফারাক রয়েছে। আর যে অংশ আপনি দিনের পর দিন ব্যবহার করবেন না, সেটা নষ্ট হবেই। এ ক্ষেত্রেও বিষয়টা একই।’ স্ক্রোল করার সময়ে মাথা ঘামাতে হয় না। কিন্তু কোনও গুরুত্বপূর্ণ কাজে মনোযোগ না দিলেই মুশকিল। কগনিটিভ ফাংশনের কাজ বন্ধ থাকলে সেটাও একদিন গাছের পাতার মতো শুকিয়ে যাবে।
৪. ফাঁদ যেমন হয়
আপনি রিলস দেখেন কখন? কাজের ফাঁকে, অবসর সময়ে কিংবা রাতে ঘুমানোর আগে? অধিকাংশ মানুষই এই সময়টায় বিনোদনের জন্য রিলস দেখেন। ধরুন, রাত ১২টায় ঘুমানোর প্রস্তুতি নিয়ে বিছানায় গেলেন। সকালে আবার ক্লাস বা অফিস আছে। ভালো ঘুম দরকার। হঠাৎ মনে হলো, একটু সোশ্যাল মিডিয়া থেকে ঘুরে আসি। সোশ্যাল মিডিয়ায় ঢুঁ মারার পর রিলস দেখা শুরু করলেন এবং একটার পর একটা দেখতেই থাকলেন। তারপর যখন ঘুমানোর কথা আবার মনে পড়ল, তখন দেখলেন এক-দুই ঘণ্টা সময় এরই মধ্যে নষ্ট হয়ে গেছে। তার মানে আপনার পর্যাপ্ত ঘুম হবে না, যার প্রভাব পড়বে পরের দিন কাজে গেলে।
আবার কেউ কেউ অফিস চলাকালে কাজে বিরক্তি এসে গেলে মাইন্ড রিফ্রেশ করার জন্য রিলস দেখেন। এটাও কাজের সময় নষ্ট করে দেয়, মনোযোগও নষ্ট করে। এতে সৃজনশীল চিন্তাভাবনার ক্ষমতা কমে যায়, ধৈর্য কমে যায়।রিল বা শর্ট ভিডিও যত বেশি স্পিডে দেখা হয়, তত কম সংযোগ তৈরি হয় কনটেন্টের সঙ্গে- ফলে কম তথ্য ধরে রাখা যায় মাথায়। অতিরিক্ত দ্বিগুণ গতিতে কনটেন্ট দেখার ফলে উত্তেজনা, অস্থিরতা, দ্রুত কথা বলা, সহানুভূতি কমে যাওয়া এবং আবেগজনিত অস্থিরতার জন্ম দিতে পারে।Raise Your Concern About this Content

৫. কেন আমরা রিলস দেখায় মজে থাকি
যখন আমরা খাবার খাই, যখন কেউ প্রশংসা করে কিংবা কোনো ব্যক্তিগত অর্জন হয়; তখন আমাদের মস্তিষ্ক ডোপামিন হরমোন নিঃসরণ করে। ডোপামিন হরমোন মানুষের মধ্যে শান্তি ও তৃপ্তির অনুভূতি সৃষ্টি করে। পাশাপাশি ব্রেন, মানসিক অবস্থা, মনোযোগ ও ঘুম নিয়ন্ত্রণ করে। কেউ যখন রিলস দেখেন, তখন তাঁর মধ্যেও ডোপামিন হরমোন নিঃসরণ হয়। তাই রিলস দেখাটা নেশার মতো হয়ে যায়।
৬. রিলস দেখা কী বন্ধ করতে হবে?
রিলস দেখায় কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু এটা দেখতে গিয়ে যেসব ক্ষতি হচ্ছে, সেটা সমস্যা। এই নেশার ফাঁদ থেকে বের হয়ে আসতে হলে নিজের প্রতি সচেতন হতে হবে। নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করা জানতে হবে।
যেমন অবসর সময়ও নিজেকে ঠিক অবসর রাখা যাবে না। বই পড়া, শরীরচর্চা, রান্না করা, ঘরের বিভিন্ন কাজ করাসহ নানা কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখতে হবে। সোশ্যাল মিডিয়ায় যতটা কম সময় দেওয়া যায়, ততই ভালো। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী-
• ফোন ছাড়া খাওয়ার অভ্যাস করুন।
• দিনে কয়েকবার স্ক্রিন থেকে বিরতি নিন।
• DND বা সাইলেন্ট মোড চালু করে বই পড়ুন বা কাজ করুন।
• “Pomodoro” টেকনিক ব্যবহার করুন । মানে ২৫ মিনিট কাজ, ৫ মিনিট বিরতি।
• মনোযোগ বৃদ্ধিতে উপকারী কাজ: পড়া, হাতের লেখা, রান্না, ছবি আঁকা।
• প্রতিদিন পার্কে হাঁটুন বা প্রকৃতির মধ্যে থাকার চেষ্টা করুন, অন্তত ১৫ থেকে ৩০ মিনিট।
• ঘুম, ব্যায়ামের সঙ্গে আপোষ কোনওমতেই চলবে না। ওমেগা-৩ সমৃদ্ধ খাবার রাখুন ডায়েটে।
• মস্তিষ্ককে খাটানোর মতো কাজে নিযুক্ত করুন নিজেকে। যেমন- পাজল সলভ করা, নতুন ভাষা শেখা, বাদ্যযন্ত্র বাজানো, পেইন্টিং ইত্যাদি।
• ঘুমানোর আগে ক্রমাগত উদ্দীপনা মস্তিষ্ককে শান্ত হতে দেয় না। ফলে ঘুমের মান খারাপ হয়। আর ঘুমের ঘাটতি সরাসরি মানুষের পরের দিনের মেজাজ, সহনশীলতা এবং সহনশীলতার পরিধি কমিয়ে দেয়।
৩০ সেকেন্ডের রিল আমাদের মস্তিষ্কে ক্ষণিক আনন্দ দিতে পারে, কিন্তু তা জীবনের দীর্ঘমেয়াদী ধৈর্য, গভীর চিন্তাভাবনা এবং মানসিক প্রশান্তির মূল্য কেড়ে নিচ্ছে। প্রযুক্তি আমাদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে, নাকি আমরা প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণে চলে যাব—তা নির্ভর করছে আমাদের সচেতন ব্যবহারের ওপর।
রিলসের আসক্তি যদি দৈনন্দিন কাজ, পড়াশোনা, ঘুম বা সম্পর্কের উপর প্রভাব ফেলতে শুরু করে, সেটিকে অবহেলা না করে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। তারমধ্যে কলকাতায় রয়েছে Lifeline Foundation-এর কেন্দ্র ৯, কাঁকুলিয়া রোড, গোলপার্ক, কলকাতা–৭০০০২৯। সংস্থাটি বিনামূল্যে এখানে এই বিষয় পরিষেবা দিয়ে থাকে । এছাড়াও Tele-MANAS — 14416 / 1800-89-14416 দেশের যে কোনও প্রান্ত থেকে ২৪×৭ মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা পাওয়া যায়। পশ্চিমবঙ্গেও এই পরিষেবা চালু রয়েছে। KIRAN Mental Health Helpline ফোন নম্বর- 1800-599-0019। গোটা ভারত জুড়ে এই সংস্থা পরিষেবা দিয়ে থাকে ।
তথ্যসূত্র
১. ব্রেন রুট
২. রিলস স্কোরিং
৩. মানসিক স্বাস্থ্য
৪. রিলস-এর ক্ষতিকারক প্রভাব
৫. রিলস-এর প্রতি আসক্তি



