শরতের সকাল, আকাশে সাদা মেঘ, মাঠে কাশফুলের মেলা, কুমোরপাড়ায় মূর্তি তৈরির প্রস্তুতি, প্যান্ডেলে বাঁশের কাঠামো , ভেসে আসা ঢাকের আওয়াজ সবমিলিয়ে দুর্গাপুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বাঙালির আবেগ। প্যান্ডেল হপিং, অষ্টমীর অঞ্জলি, দশমীর সিঁদুরখেলা, নবমীর কুমারী পুজো, প্রত্যেক আচার-রীতি বাঙালির সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এই উৎসবের পরের দৃশ্যটাই আমরা ভুলতে বসেছি। তার ঠিক কোন প্রভাব পড়ছে পরিবেশের উপরে তা কি আমরা আদৌ বুঝে ওঠার চেষ্টা করেছি। দুর্গাপুজো শেষ হওয়ার পর, প্যান্ডেল খোলা হয়, আলো খোলা হয়, প্রতিমা বিসর্জনের পর পড়ে থাকে বিপুল পরিমাণে বর্জ্য। খাবারের প্যাকেট, প্লাস্টিকের বোতল, মণ্ডপ সাজসজ্জার নানা সরঞ্জাম, ফুল, থার্মোকল সবই পড়ে থাকে ফলে পরিবেশ দূষণের সম্ভাবনাও বৃদ্ধি পায়। এই পরিস্থিতি পরিবেশের উপর আরও বেশি চাপ সৃষ্টি করে। তাহলে অনেকেই প্রশ্ন করবেন এগুলো বাদেই পুজো উদযাপন করা উচিত? উত্তর হবে একদমই না। তবে উদযাপন, আনন্দের পাশপাশি আমাদের পরিবেশের প্রতি যত্নশীল ও দায়িত্বশীল হতে হবে। ইকো ফ্রেন্ডলি বা পরিবেশানুকূলদুর্গাপুজোর মতো কনসেপ্ট রয়েছে। এই প্রতিবেদনের মাধ্যমে আমরা আপনাকে বলব উৎসবের আনন্দ মাটি না করেও কীভাবে পরিবেশ বাঁচানো সম্ভব।
ইকো-ফ্রেন্ডলি বা পরিবেশানুকূল দুর্গাপুজো কী?
দুর্গাপুজো এমনভাবে করতে হবে যাতে পরিবেশের উপর কোনও নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে। প্রতিমা নির্মাণ থেকে শুরু করে মণ্ডপসজ্জা,বিসর্জন পর্যন্ত প্রত্যেক পদক্ষেপেই পরিবেশানুকূলসামগ্রীর ব্যবহার।
পরিবেশানুকূল দুর্গাপ্রতিমা
দুর্গাপুজোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ দুর্গাপ্রতিমা। প্রতিমা এমনিই পরিবেশানুকূলমাটি দিয়ে তৈরি করা হয়। তবে থিমপুজোর জন্য অনেকসময় থার্মোকল বা অন্য কিছু উপকরণ দিয়ে মূর্তি তৈরি করা হচ্ছে যেগুলি বিসর্জনের আগে অতিরিক্ত সাজপোশাক আলাদা করে নিতে হবে, যাতে নদী বা গঙ্গাতে ওই সব সামগ্রী দূষণ সৃষ্টি করতে না পারে। প্রতিমা নির্মাণে এমন কিছু রঙ, সরঞ্জাম ব্যবহার না করা উচিত যেগুলি জলে মিশে দূষণ সৃষ্টি করতে পারে।

প্যান্ডেলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ
দুর্গাপুজোর প্যান্ডেল এখন শুধুই পুজোমণ্ডপের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। অনেকক্ষেত্রেই এখন শিল্প ও স্থাপত্যের প্রদর্শনীতে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন থিম, প্যান্ডেলের সাজসজ্জা, নানা প্লাস্টিকজাত সরঞ্জাম ব্যবহার করা হয়। তাই প্রত্যেক প্যান্ডেলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ নিতে হবে। বিভিন্ন জায়গায় ডাস্টবিনের ব্যবস্থা করতে হবে। যাতে যেখানে সেখানে প্লাস্টিক না পড়ে থাকে, এলাকার ড্রেনে প্লাস্টিক আটকে নোংরা না হয়ে যায়।
বাঁশ, কাপড়, কাঠ প্রভৃতি পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণ ব্যবহার করতে হবে যাতে দূষণের সম্ভাবনা অনেক কম থাকে। প্যান্ডেল তো পুজোর কিছুদিনের জন্য তৈরি করা হয় কিন্তু প্যান্ডেল নির্মাণে ব্যবহৃত সামগ্রী যেন কোনওভাবেই পরিবেশের উপর দীর্ঘস্থায়ী কোনও নেতিবাচক প্রভাব না ফেলে সেদিকে আমাদের সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে তবেই পরিবেশের যত্ন নেওয়া সম্ভব।
শব্দদূষণ মুক্ত দুর্গাপুজো
মনে রাখবেন আপনার পুজোর আনন্দ যেন কারও দুঃখের কারণ না হয়ে ওঠে। অনেক সময় আমরা পুজোর উদযাপন করতে গিয়ে আশেপাশের মানুষের অনেক ক্ষতি করে ফেলি। পাশাপাশি পরিবেশের নিজস্ব শান্তি রয়েছে তাতেও বিঘ্ন ঘটিয়ে ফেলি। মাত্রাতিরিক্ত ডেসিবেলে মাইক, স্পিকার বাজিয়ে আমরা শব্দদূষণকে ডেকে আনি। কোনও কোনও পুজোমণ্ডপে রাত ১০টার পরও জোরে মাইক বাজানো হয়।
দুর্গাপুজোর সঙ্গে ঢাকের আওয়োজ অঙ্গাঙ্গিভাবেযুক্ত। ঢাকের বোল ছাড়া পুজোর আবেগ একেবারে অসম্পূর্ণ। কিন্তু ঢাক আর সাউন্ডসিস্টেম কিন্তু এক নয়। বেশি সময় ধরে মাইক বাজানো শিশু, প্রবীণ ও অসুস্থ মানুষদের জন্য অস্বস্তিকর হতে পারে। এমনকী অতিরিক্ত আওয়াজ পথকুকুর, পাখিদের জন্য ক্ষতিকর। শব্দদূষণ পরিবেশের পাশাপাশি প্রাণীজগতের উপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই অপ্রয়োজনীয় শব্দ এড়িয়ে যাওয়াই ভালো। পুজো হোক আনন্দের।
আলোর ব্যবহারে সতর্কীকরণ
কলকাতার দুর্গাপুজোয় আলোকসজ্জা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। আলো ব্যবহারে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হয়ে যায়, যার ফলে পরিবেশের উপর প্রভাব পড়তে পারে। LED লাইটিং ব্যবহার করে আলো ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ আনারও প্রয়োজন রয়েছে।

প্লাস্টিকের ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা
প্যান্ডেলে লোকের ভিড় হয়। প্লাস্টিকের কাপ, খাবারের প্যাকেট, প্লাস্টিকের প্লেট এবং বিভিন্ন ধরনের একবার ব্যবহারযোগ্য সামগ্রী থেকে প্রচুর পরিমাণে বর্জ্য় উৎপন্ন হয়। সেক্ষেত্রে দর্শনার্থী ও পুজো কমিটি দু’পক্ষেরই ভূমিকা রয়েছে। প্যান্ডেলে প্লাস্টিকের প্লেটের বদলে শালপাতা বা পুনর্ব্যবহারযোগ্য সামগ্রী ব্যবহার করার পরিকল্পনা করতে হবে। প্রত্যেক জায়গায় ডাস্টবিন রাখা বাধ্যতামূলক। ভেজা ও শুকনো বর্জ্য আলাদা রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। প্যান্ডেলে প্লাস্টিকের বোতল ঢোকা নিষিদ্ধ করে দিতে হবে। সেক্ষেত্রেও প্লাস্টিকের ব্যবহার অনেকটা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। ছোট ছোট পদক্ষেপই কিন্তু বিরাট বড় পরিবর্তন আনতে পারে। তাই আমাদের প্রথমে খুব ছোট ছোট সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
ফুলের বর্জ্যকে সম্পদে পরিণত করা
প্রত্যেক প্যান্ডেলে পুজোর ফুল, বেলপাতা ও অন্যান্য জৈব উপকরণ বিপুল পরিমাণে জমা হয়। সেগুলি ড্রেনে বা জলাশয়ে ফেলে না দিয়ে সংগ্রহ করতে হবে। পরে কম্পোস্ট করার সুযোগ রয়েছে যা সার হিসেবেও ব্যবহার করা যায়। অর্থ্যাৎ সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পরিবেশের ভালো হবে এমন একাধিক পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব।
পরিবেশানুকূল বিসর্জন
মুম্বইয়ে মালহার কালামবে এবং ড. বিনীশ দেশাই গণেশপুজোর বিসর্জনের পর এক অভিনব উদ্যোগ নিয়েছেন। প্লাস্টার অফ প্যারিসের যে গণেশ মূর্তি রয়েছে সেগুলি পুনর্ব্যবহারযোগ্য করে তুলেছেন। সেগুলো থেকে স্টাডি টেবিল, বেঞ্চের মতো জিনিস তৈরি করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এই পুরো কর্মসূচিকে তাঁরা ‘বিসর্জন সে বিদ্যা তক’ অর্থাৎ ‘বিসর্জন থেকে বিদ্যা পর্যন্ত’ নামকরণ করেছেন। কলকাতা ও পার্শ্ববর্তী জেলাতেও এমন অভিনব উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। তাতে গঠনমূলক কাজও করা হবে, পরিবেশকেও রক্ষা করা সম্ভব।
কলকাতাতেও বেশ কিছু বছর ধরে টালা প্রত্যয় পরিবেশানুকূলপুজো করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। গত কয়েক বছর ধরে পুজো শেষে মণ্ডপে নিরঞ্জন করা হয় দেবী মূর্তির। টালা প্রত্যয়ের কর্মকর্তারা একাধিক সংবাদ মাধ্যমে বারবার বলেছেন তারা যথাসম্ভব শিশামুক্ত রঙ ব্যবহার করেছেন। পরিবেশের কথা মাথায় রেখেই মণ্ডপে বিসর্জনের মতো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে পুজো কমিটির তরফে।
টালা প্রত্যয়ের মতো আরও কিছু পুজোকমিটি যদি এগিয়ে আসে এমন অভিনব ভাবনা নিয়ে। তাহলে পরিবেশানুকূল পুজো করাও খুব সহজ হবে। কৃত্রিম জলাশয় বা নির্দিষ্ট immersion facility ব্যবহারের ব্যবস্থাও করা যেতে পারে । এই ধরনের ব্যবস্থার উদ্দেশ্য হল প্রাকৃতিক জলাশয়ের উপর চাপ কমানো এবং বিসর্জনের পর বর্জ্য সংগ্রহ সহজ করা।
প্রতিমার সঙ্গে থাকা ফুল, প্লাস্টিক, কাপড়, থার্মোকল বা অন্যান্য সাজসজ্জার সামগ্রী আগে আলাদা করে নেওয়া উচিত। নির্দিষ্ট নিয়ম ও স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে বিসর্জন করা প্রয়োজন। বিসর্জনের সময় যেন আমরা কোনও ক্ষতিকর জিনিস জলাশয়ে না ফেলি, সেবিষয়ে আমাদের কড়া নজরদারি রাখা প্রয়োজন। পরিবেশানুকূল পুজোর দায়িত্ব শুধু পুজো কমিটির নয়, প্রত্যেক নাগরিককেই ছোট বা বড় কোনও না কোনও পদক্ষেপ নিতে হবে। Raise Your Concern About this Content
পরিবেশানুকূল দুর্গাপুজো উদযাপনের আধ্যাত্মিক তাৎপর্য
পরিবেশানুকূল দুর্গাপুজো শুধুমাত্র বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রয়োজন বলে নয়, এর সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে আধ্যাত্মিকতার ভাবনাও। প্রকৃতি আর মা দুর্গার মধ্যে আসলে কোনও বিভেদ নেই। তিনি ধরিত্রী, পৃথিবীকে ধারণ করেন আবার তিনিই প্রকৃতি।
তাই প্লাস্টিক, বিষাক্ত রঙ কিংবা দূষণ সৃষ্টিকারী ধোঁয়া ব্যবহার করে মা দুর্গার আরাধনা আসলে তাঁর অসম্মান করা।
আমরা ইতিহাস ঘাঁটলে জানতে পারব যে প্রাচীন যুগে প্রকৃতির পুজোই করতেন আমাদের পূর্বপুরুষরা। এখনও আদিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে এমন কিছু আচার রীতি প্রচলন রয়েছে। তাঁরা গাছের পুজো করে।
পরিবেশানুকূল পদ্ধতি বেছে নেওয়া আসলে কর্মের মাধ্যমে দেবী দুর্গার কাছে প্রার্থনা করা। নদী, অরণ্য, আকাশ তথা প্রকৃতির মাঝেই তো আসলে দেবী বিরাজ করেন।
জ্যোতিষশাস্ত্রেও দুর্গাপুজোর সঙ্গে ভারসাম্যের ধারণা জড়িয়ে রয়েছে। আলো ও অন্ধকার, শুভ ও অশুভ, শক্তি ও স্থিতির মধ্যে সামঞ্জস্য। পৃথিবীর প্রতি সচেতনতাই তো সবুজানুকূল পদ্ধতিতে দুর্গাপুজো পালনের ভাবনায় প্রতিফলিত হয়। মানুষের উৎসবের সঙ্গে প্রকৃতির সুস্থতা ও অস্থিত্বের মধ্যে সুন্দর সমন্বয় তৈরি হয়।
আনন্দ এমনভাবে ভাগ করে নিতে হবে যাতে সেই আনন্দ ভবিষ্যৎ প্রজন্ম উপভোগ করতে পারে। আগামী দিনে শিশুরা যেন সুস্থ ভবিষ্যৎ পেতে পারে। নির্মল আকাশের নিচে. দুষণমুক্ত পরিবেশেই বেঁচে থাকে তাদের শৈশব।
ঐতিহ্য ও পরিবেশ সচেতনতা হয়ে উঠুক একে অপরের পরিপূরক। ভারতের প্রাচীন সংস্কৃতির গভীরে প্রকৃতিকে দেবত্বের আসনে প্রতিষ্ঠা করার ঐতিহ্য রয়েছে। নদী, গাছপালা, পর্বত, আকাশ প্রকৃতির প্রতিটি উপাদানকে শ্রদ্ধা জানানো আমাদের সংস্কৃতির অংশ।

উপসংহার
অনেক পুজো কমিটি ইতিমধ্যেই পরিবেশানুকূল পুজো করার কথা ভাবছেন। কিন্তু পরিবেশানুকূল পুজোকে শুধু পুরস্কার প্রাপ্তি বা প্রতিযোগিতার বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না।
একটি পুজো কমিটি যদি এক বছর প্লাস্টিক কমায়, পরের বছর বর্জ্য পৃথকীকরণ শুরু করে, তার পরের বছর বিদ্যুৎ ব্যবহারে আরও দক্ষ ব্যবস্থা নেয় তাহলে ধীরে ধীরে একটি স্থায়ী পরিবর্তন তৈরি হতে পারে।
পরিবেশানুকূল পুজো আসলে কোনও এক বছরের ‘থিম’ নয়।এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি অভ্যাস।
পুজো তো আনন্দের, তাহলে এবার পরিবেশের কথাও আনন্দের সঙ্গে ভাবা প্রয়োজন।
দুর্গাপুজো বাঙালির জীবনের অন্যতম বড় উৎসব। এই উৎসবের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অর্থনীতি, শিল্প, কারিগর, ব্যবসা, পর্যটন, সংস্কৃতি এবং অসংখ্য মানুষের জীবিকা।
তাই পরিবেশ রক্ষার নামে উৎসবের আমেজ বদলে ফেলার প্রয়োজন নেই। বরং উৎসবের মধ্যেই পরিবেশ সচেতনতার জায়গা তৈরি করা দরকার।
তথ্যসূত্র
১. দুর্গাপুজো ও প্রতিমা বিসর্জন সম্পর্কিত ইনস্টাগ্রাম রিল
২. তালা প্রত্যয়ের মণ্ডপে দুর্গা প্রতিমা বিসর্জনের বিশেষ আয়োজন
৩. দুর্গাপুজো ২০২৫: পরিবেশবান্ধব পুজো, সবুজ আচার ও প্রতিমা তৈরির পরামর্শ
৪. পরিবেশবান্ধব দুর্গাপুজো: টেকসই ও সচেতন উদযাপনের পথ



