তাহলে খুঁজে দেখা যাক দক্ষিণ কলকাতায় এবারের পুজোর সেরা খাবারের ঠিকানাগুলি
শরতের নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা দেখলেই বোঝা যায়, উৎসবের দিন গুনতে শুরু করেছে কলকাতা। গলির মোড়ে বাঁশের কাঠামো, প্যান্ডেলে শেষ মুহূর্তের ব্যস্ততা, সন্ধে নামলেই রাস্তাজুড়ে আলো—শহর তখন ধীরে ধীরে বদলে যায়। পুজোর ক’টা দিন কলকাতাকে শুধু দেখা যায় না, তাকে হেঁটে অনুভব করতে হয়। আর সেই হাঁটার গল্প যদি হয় দক্ষিণ কলকাতায়, তা হলে এক মণ্ডপ থেকে আর এক মণ্ডপে যাওয়ার পথটাই হয়ে ওঠে আলাদা এক অভিজ্ঞতা। দেশপ্রিয় পার্কের আলো, একডালিয়ার চেনা ঐতিহ্য, ম্যাডক্স স্কোয়ারের আড্ডা, বালিগঞ্জের বনেদিয়ানা কিংবা গড়িয়াহাটের ব্যস্ততা—প্রতিটি মোড়েই যেন পুজোর আলাদা রং। কিন্তু ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঠাকুর দেখতে দেখতে যখন পেট জানান দেবে, তখন? তখন মণ্ডপের আলো পেরিয়ে নাক অনুসরণ করলেই হয়তো পৌঁছে যাবেন কোনও খাবারের ঠিকানায়। কারণ দক্ষিণ কলকাতার পুজো শুধু চোখের উৎসব নয়, রসনারও উৎসব। কোথাও ধোঁয়া ওঠা বিরিয়ানি, কোথাও বাঙালির মাছ-মাংসের পদ, কোথাও মুঘলাই স্বাদ, আবার কোথাও হালকা জলখাবার বা এক কাপ গরম চা। তাই এ বার ঠাকুর দেখতে বেরোনোর পরিকল্পনায় মণ্ডপের পাশাপাশি থাকুক খাবারের ঠিকানাও। কোন প্যান্ডেলের কাছে কোথায় মিলবে কী, কোথায় বসে একটু জিরিয়ে নেওয়া যাবে, আর কোন পথে ঠাকুর দেখা আর পেটপুজো—দুটিই একসঙ্গে সেরে ফেলা যায় । ২০২৬-এর দক্ষিণ কলকাতার পুজো-তালিকাতেও এই অঞ্চলগুলির একাধিক জনপ্রিয় মণ্ডপ রয়েছে।
দেশপ্রিয় পার্ক—ঠাকুর দেখার পর নবাবি স্বাদ
দেশপ্রিয় পার্কের পুজো দেখতে বেরিয়েছেন? তা হলে মণ্ডপ ঘোরা শেষে খুব বেশি দূরে যাওয়ার দরকার নেই। দেশপ্রিয় পার্কের কাছেই রয়েছে Oudh 1590 (Deshapriya Park)। ঠিকানা দেশপ্রিয় পার্ক পশ্চিম, মণোহরপুকুর, কলকাতা–৭০০০২৬। অবধি রান্নার নানা পদ দিয়ে পুজোর রাতে একটু জমিয়ে খাওয়াদাওয়া করা যায়।

আর যদি হালকা বা অন্য ধরনের খাবার খেতে চান, দেশপ্রিয় পার্কেরই কাছে Tamarind Restaurant। ঠিকানা ১৭৭, শরৎ বসু রোড, দেশপ্রিয় পার্ক পশ্চিম, কলকাতা–৭০০০২৬। দক্ষিণ ভারতীয় খাবারের স্বাদে পুজোর রাতের মেনু বদলে নেওয়া যায়।
ম্যাডক্স স্কোয়ার—পুজোর ভিড়ের মাঝে একটু বসে খাওয়া
ম্যাডক্স স্কোয়ারের পুজো দেখতে গেলে আশপাশের গলিগুলিও ঘুরে দেখা যায়। পুজোর মাঠের কাছেই রয়েছে I CanFlyy Tea Kafi। ঠিকানা ৪বি, বাল্মীকি স্ট্রিট, ম্যাডক্স স্কোয়ার পার্কের কাছে, গড়চা, বালিগঞ্জ, কলকাতা–৭০০০২৬। দীর্ঘক্ষণ হাঁটার মাঝে একটু বসে খাওয়া বা পানীয়ের জন্য এটি রাখা যায়।
ম্যাডক্স স্কোয়ারের আশপাশে পুজোর সময়ে ভিড় যথেষ্ট বাড়ে, তাই আগে খাবার সেরে নেওয়া বা একটু ফাঁকা সময়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করা সুবিধাজনক।
একডালিয়া—বাঙালি খাবারের টান
একডালিয়া এভারগ্রিনের পুজো দক্ষিণ কলকাতার অন্যতম পরিচিত পুজো-গন্তব্য। মণ্ডপের ঠিকানা ১৫, একডালিয়া রোড, একডালিয়া, বালিগঞ্জ, কলকাতা–৭০০০১৯। এই অঞ্চলে বাঙালি খাবারের জন্য যেতে পারেন 6 Ballygunge Place। ঠিকানা ৬, ড. অমিয় বসু সরণি রোড, বালিগঞ্জ প্লেস, বালিগঞ্জ, কলকাতা–৭০০০১৯। পুজোর ভিড়ের মধ্যে একেবারে বাঙালির চেনা স্বাদের খাবার চাইলে এই অঞ্চলটি খাবারের পরিকল্পনায় রাখা যায়।
আর একটু হালকা বা দ্রুত খাওয়ার জন্য বালিগঞ্জের দিকেই রয়েছে Chowman (Ballygunge)—চাইনিজ খাবারের বিকল্প হিসেবে রাখা যেতে পারে।
বালিগঞ্জ কালচারাল—ঠাকুর দেখে সরষে-মাছের খোঁজ
বালিগঞ্জ কালচারাল অ্যাসোসিয়েশনের পুজো ২০, লেক ভিউ রোড, লেক টেরেস, কলকাতা–৭০০০২৯।
এই পুজো ঘুরে খাবারের জন্য যেতে পারেন Kasturi Food Plaza। ঠিকানা ১৩/৬বি, অনিল মৈত্র রোড, বালিগঞ্জ প্লেস, বালিগঞ্জ, কলকাতা–৭০০০১৯। বাঙালি রান্নার নানা পদ দিয়ে পুজোর রাতের পেটপুজো সারতে পারেন।

আর যদি একটু ঝাল-মশলাদার উত্তর ভারতীয় খাবারের ইচ্ছে হয়, রয়েছে Sharma Dhaba—১৭/১বি, বালিগঞ্জ সার্কুলার রোড, চাকরাবেড়িয়া, বালিগঞ্জ, কলকাতা–৭০০০১৯।
মুদিয়ালি থেকে দেশপ্রিয়—আর একটু এগোলেই খাবারের নতুন ঠিকানা
রবীন্দ্র সরোবরের দিকের মুদিয়ালি, শিবমন্দির, ৬৬ পল্লি—এই পুজোগুলিও একসঙ্গে ধরতে পারেন। এই অঞ্চলগুলির পুজোগুলি পরস্পরের কাছাকাছি বলে ২০২৬-এর দক্ষিণ কলকাতার পুজো-পরিক্রমার গাইডগুলিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই পথ ধরে দেশপ্রিয় পার্কের দিকে এলে Burnt Garlic-এ ঢুঁ মারা যায়। ঠিকানা প্রিয়া সিনেমা ভবন, ৯৫, রাসবিহারী অ্যাভিনিউ, মণোহরপুকুর, কলকাতা–৭০০০২৯। আর একটু এগিয়ে Oudh 1590 – (Vivekananda Park)—ঠিকানা পি-৫৬২, হেমন্ত মুখোপাধ্যায় সরণি, বিবেকানন্দ পার্কের পিছনে, কলকাতা–৭০০০২৯।
সুরুচি থেকে চেতলা অগ্ৰণী – নানাবিধ খাবারের হদিশ
সুরুচি সংঘের কাছে পি-৮৫০, নিউ আলিপুরে রয়েছে Zyka Restaurant & Bar। ভারতীয় খাবারের পাশাপাশি বসে খাওয়ার ব্যবস্থা চাইলে এই জায়গাটি বিবেচনায় রাখা যায়। নিউ আলিপুরের ৫২, টালিগঞ্জ সার্কুলার রোডে রয়েছে Calcutta 53 Cafe। আবার ২১বি, আলিপুর রোড, চেতলায় রয়েছে The One Restaurant Cum Bar।
চেতলা অগ্রণীর দিকের পুজো ঘোরার পরিকল্পনা থাকলে আশপাশের খাবারের বিকল্প হিসেবে এই অঞ্চলটিকে মাথায় রাখা যায়।চেতলার খাবারের তালিকায় আরও রয়েছে ২এইচ, আলিপুর অ্যাভিনিউয়ের Mangio এবং ১, চেতলা সেন্ট্রাল রোডের ALIPORE DHABA। অর্থাৎ চেতলা-আলিপুরের দিকে পুজো ঘোরার পরিকল্পনা থাকলে খাবারের জন্যও একাধিক বিকল্প হাতের কাছে থাকবে।Raise Your Concern About this Content
যোধপুর পার্ক- বাঙালি খাবারের স্বাদ
যোধপুর পার্কের ৩৯০এ, প্রিন্স আনোয়ার শাহ রোডে রয়েছে Calcutta Pi। বাঙালি খাবারের স্বাদে পুজোর রাতের খিদে মেটাতে চাইলে এটি একটি বিকল্প। ১/৫০৪, যোধপুর পার্ক রোডে রয়েছে Victorious Restaurant & Cafe। আর যোধপুর পার্কেই ১/১/ডি/১ ঠিকানায় রয়েছে The Flamingo। ফলে এই এলাকার পুজো দেখার সময় খাবারের জন্য খুব বেশি দূরে যাওয়ার প্রয়োজন নাও হতে পারে।

দক্ষিণ কলকাতায় ঠাকুর দেখা তাই শুধু একের পর এক মণ্ডপে পৌঁছে যাওয়ার গল্প নয়। দেশপ্রিয় পার্কের আলো থেকে একডালিয়ার পুজো, ম্যাডক্স স্কোয়ারের ভিড় থেকে বালিগঞ্জের অলিগলি—প্রতিটি পথের পাশেই লুকিয়ে থাকে অন্য কোনও স্বাদের ঠিকানা।
কোথাও অবধি রান্নার গন্ধ, কোথাও বাঙালি মাছ-মাংস, কোথাও দক্ষিণ ভারতীয় খাবার, আবার কোথাও চাইনিজ বা উত্তর ভারতীয় পদ। তাই পুজোর রাতে বেরোনোর আগে মণ্ডপের তালিকার সঙ্গে খাবারের তালিকাটাও বানিয়ে রাখুন। কারণ সারাদিনের ঠাকুর দেখার পর কোনও এক নিরিবিলি টেবিলে বসে গরম খাবারটিও পুজোর স্মৃতিরই অংশ হয়ে থাকতে পারে। তাই পুজোয় বেরোনোর আগে শুধু কোন মণ্ডপে যাবেন, তার হিসাব নয়। সঙ্গে রাখুন পেটপুজোর ছোট্ট মানচিত্রটাও। কারণ পুজোর কলকাতায় কখনও কখনও সবচেয়ে সুন্দর আবিষ্কারটি হয় কোনও মণ্ডপের ভিতরে নয়—তার পাশের গলিতে, যেখানে এক প্লেট গরম খাবার অপেক্ষা করে থাকে সারাদিনের ঠাকুর দেখার ক্লান্তি ভুলিয়ে দিতে। তবে পুজোর রাতে বড় রেস্তরাঁয় বসে খাওয়ার পাশাপাশি রাস্তার ধারের খাবারের স্বাদও দক্ষিণ কলকাতার পুজোর অভিজ্ঞতার অংশ। গড়িয়াহাটের ফুটপাতের খাবার ও ছোট খাবারের দোকানগুলি রাত পর্যন্ত খোলা থাকে। আর একটা কথা মাথায় রাখা জরুরি—পুজোর দিন সাধারণ সময়ের তুলনায় ভিড় অনেক বেশি থাকে। তাই কোনও নির্দিষ্ট রেস্তরাঁকে কেন্দ্র করে পুরো পরিকল্পনা না করে কাছাকাছি কয়েকটি বিকল্প মাথায় রাখা বুদ্ধিমানের কাজ। একই এলাকার একাধিক পুজো একসঙ্গে ধরলে হাঁটার পরিমাণও কমে, সময়ও বাঁচে।
তথ্যসূত্র
১. দক্ষিণ কলকাতার বিখ্যাত পুজো মন্ডপ
২. দক্ষিণ কলকাতার বিভিন্ন খাবার সন্ধান
৩. নিজস্ব অভিজ্ঞতা



