ভারত ও জাপানের মধ্যে সম্পর্কের সূচনা
ইতিহাস বলছে দুই দেশের সম্পর্ক আজকের নয়, বহু পুরোনো। সম্পর্কের সূচনা ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতির হাত ধরে। ষষ্ঠ শতাব্দীতে দুই দেশের মধ্যে বৌদ্ধ ধর্মের আদান-প্রদান ঘটে। জাপানি বৌদ্ধ ধর্মের মহাযান ধর্মাবলম্বীদের জনপ্রিয়তা ক্রমশ বাড়তে থাকে। সম্পর্ক সেই সময় থেকে শুরু। ধীরে ধীরে ভারতের প্রাচীন ঐতিহ্য জাপানের সংস্কৃতির উপর প্রভাব ফেলেছিল। ভারতবর্ষে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু প্রাপ্ত পুঁথি থেকে জাপানের সেই সময়কার বৌদ্ধ ভিক্ষুক, পন্ডিত, ছাত্রদের কথা জানা যায়।সংস্কৃতিক সম্পর্কের সূচনা এইভাবে হলেও রাজনৈতিক সম্পর্কের সূচনা অনেক পরেই হয়। মেইজি যুগে দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক আদান-প্রদান শুরু হয়, প্রসঙ্গত বলা বাহুল্য আধুনিক জাপানের যাত্রা এই সময় থেকেই শুরু হয়েছিল।
বর্তমান প্রজন্মের চোখে জাপানের নব্য সংস্করণ
ইতিহাস জাপানের ঐতিহ্য -সংস্কৃতির পরিচয় দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু আধুনিক জাপানের সাথে আমাদের যোগাযোগ এক নতুন পথেই হয়েছিল। সেই পথ কখনো সাহিত্যের, কখনো রাজনীতির, অথবা সাহিত্য রাজনীতিকে ছাপিয়ে জাতীয়তাবাদের, মানবতার। ভারতবাসী নতুনভাবে জাপান কে চিনতে পারলো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাত ধরে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পূর্বে ইউরো ভ্রমণ করেছিলেন। কিন্তু জাপানের শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতিকে জানার একটা সুতীব্র ইচ্ছা তাঁর মধ্যে ছিল। ১৯১৬ সালে রবীন্দ্রনাথের জাপান যাত্রা কোথাও যেন ভারতবাসীর কাছেও শাপে বর পাওয়ার মতই হল। তাঁর ভ্রমণের অভিজ্ঞতা থেকে জাপানের দ্রুত আধুনিকীকরণের কথা ভারতবর্ষে ছড়িয়ে পড়ল। পরবর্তীতে নন্দলাল বসু, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রমুখরাও জাপানি শিল্পকলা থেকে প্রভাবিত হয়ে ভারতবর্ষে মিশ্র চিত্রকলার রূপদান করেছিলেন। নেতাজির চোখে আমরা জাপানকে অন্য রূপে প্রত্যক্ষ করেছি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সমকালীন সময়ে ব্রিটিশ নৌশক্তির থেকেও জাপানের নৌশক্তি যে বেশি শক্তিশালী ছিল তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সেই কারণেই নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে জাপানের সাহায্যর উপর অনেকটাই ভরসা করেছিলেন। জাপানের সাথে ভারতবর্ষের যোগসূত্র আজকের নয়, দীর্ঘ কয়েক দশকের।

Image-1 : জাপানের উড ব্লক প্রিন্টিং || কৃতজ্ঞতা স্বীকার উইকিপেডিয়া এর নিজস্ব ওয়েবসাইট ||https://en-m-wikipedia-org.translate.goog/wiki/Woodblock_printing_in_Japan?x_tr_sl=en&_x_tr_tl=bn&_x_tr_hl=bn&_x_tr_pto=imgs#/media/File%3AUtagawa_Kunisada(1857)_Imay%C5%8D_mitate_shin%C5%8D_k%C5%8Dsh%C5%8D_yori_shokunin.jpg
পারমাণবিক অস্ত্রের আঘাতে জাপানকে দমানো অসম্ভব –
হিরোশিমা, নাগাসাকি তে পারমাণবিক অস্ত্রের আঘাতে যখন মনে করা হচ্ছে ওকাকুরার জাপান বোধ হয় নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে চলেছে, প্রাণহীন ছন্দে ঠিক তখনই যেন নতুন গতি। প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে জাপানের নতুনভাবে পথচলা শুরু। প্রাচ্যের সেই জাপান অনেক বেশি পশ্চিমী আদর্শে প্রভাবিত, অনেক বেশি আন্তর্জাতিক। সেদিন থেকেই আজকের উন্নত জাপানের প্রযুক্তির সূচনা হয়ে গিয়েছিল।
জাপানের সমাজ জীবন : আধুনিক জীবন চর্যায় নিয়ম শৃঙ্খলা
ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম এর দৌলতে জাপানি জনজীবন আজ অনেকটাই হাতের মুঠোতে। তাদের প্রতিদিনের জীবনধারণের ছবি আমরা খুব সহজেই পেয়ে যাচ্ছি। তাদের জীবন অনেকটাই নিয়ম শৃঙ্খলায় আবদ্ধ। জাপানি পরিভাষায় ‘শুকান ‘ অর্থাৎ সু শিক্ষায় এবং অভ্যাসে জীবন অতিবাহিত করা। একবিংশ শতকে জাপানিদের উন্নত জীবনের মূল মন্ত্র এটাই, সুঅভ্যাস, কর্ম দক্ষতা জাপানিদের সাফল্যের চাবিকাঠি।
জাপানিদের এই বিশেষ পন্থা ভারতীয়দের প্রতিদিনের রোজনামচায় স্থান পেয়েছে। প্রাণায়াম থেকে শরীর চর্চা – এগুলি আরো বেশি কর্মদক্ষতা বাড়িয়েছে ভারতীয়দের মধ্যে।
একলা চলো রে –
করোনা অতিমারি কালে আমরা একটা বিশেষ শব্দের সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলাম-‘আইসোলেশন ‘। বাংলায় যার তরজমা করলে পাই সামাজিকভাবে পরস্পর পরস্পরের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকা।
যা জন্ম দেয় মানসিক অবসাদের। জাপান মূলত ধনী দেশ। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সেখানে খুব বেশি দেখা যায় না। জাপানে একটি বিশেষ রোগের নাম হল হিকিকোমোরি। কিন্তু ৯০ এর দশক থেকেই জাপানে অত্যাধুনিক কর্মকাণ্ডের স্রোতে স্থায়ী কর্মীর সংখ্যা কমতে লাগলো, অস্থায়ী নিয়োগ বৃদ্ধি পেতে শুরু করল। পারিবারিক দ্বন্দ্ব, কর্মক্ষেত্রের অনিশ্চয়তা জাপানিদের মধ্যে একলা থাকার মানসিকতা তৈরি করে। সেই মানসিকতা থেকেই মানসিক অবসাদ অথবা হিকিকোমোরির মত রোগের প্রবণতার জন্ম।
ভারতীয়রা সেভাবে একা থাকতে খুব একটা পছন্দ করে না। পশ্চিমী স্রোতে গা ভাসিয়ে উইকেন্ডে চেনা মানুষের গণ্ডিতে তারা অবসর যাপন করে। কিন্তু বর্তমানে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ভারতীয়দের জীবনেও ফাঁদ পেতেছে। বিচ্ছিন্নতা ক্রমশ গ্রাস করছে ভারতীয় জীবন যাপনকে। মাত্র কয়েক দশক আগে আধুনিক জাপানে যে সামাজিক অনিশ্চয়তার সূচনা হয়েছিল সেটাই আজকের ভারতবর্ষের গুরুতর সামাজিক সমস্যা – কাজের অনিশ্চয়তা, কম বেতন, পারিবারিক অশান্তি, মূল্যবোধের অভাব, বৈবাহিক জীবনে বিচ্ছেদ।
জাপান শিখিয়েছে মন ভালো রাখার কৌশল –
একদিকে যেমন মানসিক উদ্বেগের কারণ হিসাবে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সমীক্ষায় জাপান কে আমরা কাঠগড়ায় তুলেছি, আবার মন ভালো রাখার কৌশল বলে দিয়েছে সেই জাপান। সারাদিনের কর্মব্যস্ততার ফাঁকে মাত্র কুড়ি মিনিটের দিবানিদ্রা আমাদের মন ভালো রাখে, শরীর থাকে সতেজ। আমরা কাজ করার অনেক বেশি শক্তি পাই। দীর্ঘক্ষণ মনোনিবেশ করতে পারি। জাপানি পরিভাষায় যাকে বলা হয়েছে ‘ইনেমুরি ‘। ভারতীয় চিকিৎসক রাও বিষয়টিকে মান্যতা দিয়ে বলেছেন এই জাতীয় দিবানিদ্রা স্বল্প সময়ের ঘুম মানুষের মনোবল অনেকটাই বাড়িয়ে দেয়। তবে এ প্রসঙ্গে একটি কথা বলে রাখাই ভালো, ঘুমটা যেন অধিক সময়ের জন্য না হয়, তাহলে হয়তো তা কাজের ব্যাঘাত ঘটাতে পারে।
আজকাল আমাদেরও দুই বা তিন কামরার ছোট ফ্ল্যাটে বাস করতে হচ্ছে। জাপানের ছোট্ট ঘরের কায়দায় সেখানে যদি জেন কর্নার তৈরি করা যায় তাহলে বোধহয় অনেকটাই সেগুলি আমাদের মনকে মুহূর্তের জন্য ভালো করে দেবে। আসলে জেন কর্নার হল সেই ব্যবস্থা যা আমাদের আরাম দিতে পারে। প্রকৃতির উন্মুক্ত পরিবেশে হোক বা ফ্ল্যাটের ব্যালকনিতে আরামদায়ক সোফা, টেবিল সহযোগে এক বিশেষ ব্যবস্থা যেখানে লিলি বা ফার্নের মত বা একাধিক সুগন্ধি ফুলের ব্যবস্থা থাকবে। নির্জন, কম আলোর বাতাবরণে, কর্পূর বা মোমের সুগন্ধে এমন এক রোমাঞ্চকর পরিবেশ তৈরি করা যেখানে এক মুহূর্তে সারাদিনের কর্মব্যস্ততার শেষে বসলে মুহূর্তেই ভালো হয়ে যাবে মন।

Image 2: টোকিও র মারুনোচিতে রয়েছে জনজীবনের স্থাপত্য। || কৃতজ্ঞতা স্বীকার সাকুরাকো এর নিজস্ব ওয়েবসাইট ||https://blog.sakura.co/wp-content/uploads/2023/01/sakuraco_nakamise-dori-eagles-eye-view.png
জাপানিদের শতায়ু জীবন দর্শন
ভারতীয়দের মূলত ১০০ বছর বয়স পর্যন্ত খুব কম সংখ্যায় বাঁচতে দেখা যায়। জাপানিরা কিন্তু শতায়ু পার করেও সুস্থ সবল অবস্থায় বেঁচে আছে এবং এই বয়সেও তারা পরিশ্রম করে। অনিয়ন্ত্রিত জীবন যাপন মানুষের আয়ু কমাতে পারে। জাপানি মানুষরা শৃঙ্খলা পরায়ণ। ‘ইকিগাই ‘ নামক বইটিতে সুস্থ শরীরে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকার কৌশল আলোচনা করা হয়েছে। তবে জাপানেও ১৮৯৯ সালের পর প্রজনন হার একটা সময়ে অনেকটাই কমে গিয়েছিল। শিশুর জন্মের বিষয়ে অনীহা তৈরি হয়েছিল জাপানের মানুষের মধ্যে। পরবর্তীকালে জাপান সরকারের উদ্যোগে বিষয়টি জনস্বার্থে প্রচারিত হওয়ায় সেখানকার মানুষ আজ বেশ সচেতন। ভারতীয়দের মধ্যেও এখন বৈবাহিক জীবনের পরিবর্তে লিভ-ইন এ বিশ্বাসী নতুন প্রজন্ম। শিশুর জন্মের হারের প্রতি এই প্রজন্ম বেশ কিছুটা উদাসীন। সচেতন না হলে যা হয়তো একটা সময় প্রভাব ফেলবে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে।
জাপান শিক্ষকতার ভূমিকা ও পালন করেছে
জাপানের থেকে আমাদের অনেক কিছুই শেখার আছে। কিভাবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকতে হয়, চারপাশ কিভাবে বর্জ্য মুক্ত করতে হবে, সেই বর্জ্য কিভাবে পুনর্ব্যবহার করা যায় সেইসব কৌশল জাপান আমাদের শিখিয়েছে। প্রতিদিনের চলার পথে আমরা রাস্তাঘাটে যে বিষয়গুলি দেখি – পাবলিক টয়লেট অর্থাৎ সুলভ শৌচাগার, গাড়ি রাখার পার্কিং, রাস্তাঘাট কে আবর্জনা মুক্ত করা, সৌন্দর্যায়ন বৃদ্ধি করা এই সকল ক্ষেত্রে শিক্ষকতার ভূমিকা পালন করেছে সূর্যোদয়ের দেশ।

Image-3 : নাকানোতে রাতের রাস্তার চিত্র । || কৃতজ্ঞতা স্বীকার: সাকুরাকো এর নিজস্ব ওয়েবসাইট ||
সূর্যোদয়ের দেশ জয় করেছে প্রতিবন্ধকতাকে –
জাপানি সংস্কৃতি আমাদের মূল্যবোধ শেখায়। আর তাই ভারতীয়দের আরো বেশি করে জাপানের সমাজ সংস্কৃতিকে জানা প্রয়োজন। তাদের কঠোর পরিশ্রম, সম্প্রীতি, প্রকৃতির প্রতি শ্রদ্ধা থেকে আধুনিক সময়ের সুস্বাদু খাবার, সুশি,হাতপাখা (সেনসু) তাদের উন্নতির পথে নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন জাপানের অগ্রগতির অন্যতম কারণ। স্বামীজি শিকাগোতে বক্তৃতা দিতে যাওয়ার আগে জাপান ঘুরে গিয়েছিলেন। সেই সময় জাপানের প্রতি তিনি আকৃষ্ট হয়েছিলেন। আর এই আধুনিক সময়ে জাপানের প্রতি ভারতবাসী কৃতজ্ঞ। ভারতবর্ষ একদিন আশা করে সমগ্র প্রতিকূলতাকে এইভাবে জয় করেই শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নাগরিক পরিষেবা, অর্থনীতি তে জাপানের দেখানো পথেই অগ্রসর হবে।

Image 4: নাকামিসে-দোরিতে প্রচুর ঐতিহ্যবাহী খাবার রয়েছে। || কৃতজ্ঞতা স্বীকার সাকুরাকো এর নিজস্ব ওয়েবসাইট ||https://blog.sakura.co/wp-content/uploads/2023/01/sakuraco_nakamise-dori.png
তথ্যসূত্র
- Wikipedia – ভারত জাপান বৈদেশিক সম্পর্ক
- জাপানের বিদেশ মন্ত্রক
- “জাপান যাত্রী ”(১৯১৯)- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
- ‘জার্মানির চোখে নেতাজি ‘- নন্দ মুখোপাধ্যায়
- National Herald -পত্রিকার প্রতিবেদনের অংশ
- জাপানে ভারতীয় দূতাবাসের প্রতিবেদন
- ভারতে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে প্রকাশিত – টোকিওতে প্রবাসী ভারতীয়দের সাথে বাক্যালাপের অংশবিশেষ
- আনন্দবাজার পত্রিকার প্রতিবেদনের মুদ্রিত সংস্করণ
- সংবাদ প্রতিদিনের রবিবারের ডিজিটালের মুদ্রিত সংস্করণের অংশবিশেষ
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর শম্পা পাল একজন অভিজ্ঞ শিক্ষক এবং বাংলা ফ্রিল্যান্স লেখিকা।জার্নালিজম এবং মাস কমিউনিকেশনে বর্তমানে স্নাতকোত্তর করছেন নেতাজী সুভাষ মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার জন্য বাংলা পড়ানোয় অভিজ্ঞ শম্পা অ্যাডামাস রাইস টাইমস ম্যাগাজিনে কলম ধরেছেন। এছাড়া আজকাল পত্রিকা ও আরো খবরে সম্পাদকীয় কলমে লেখেন।। প্রবন্ধ পাঠে বিশেষ দক্ষ শম্পা পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের যুব উৎসব প্রতিযোগিতায় ব্লক ও জেলা স্তরে প্রথম এবং রাজ্য স্তরে তৃতীয় স্থান অর্জন করেছিলেন। আকাশবাণী কলকাতা থেকে শিশুমহল ও গল্পদাদুর আসরে নজরুলগীতি বিভাগে উত্তীর্ণ।




