FIFA WORLD CUP 2026
শৈশব থেকে এই গান শুনেই বড় হয়েছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম। একসময় এই লাইন শুধু আবেগ নয়, ছিল আত্মপরিচয়। পাড়ার মাঠ, স্কুলের টুর্নামেন্ট, ময়দানের গ্যালারি, ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগানের লড়াই—সবকিছুর কেন্দ্রেই ছিল ফুটবল। অথচ আজ বিশ্বকাপ এলেই বাঙালি আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল নিয়ে উত্তেজিত হয়, কিন্তু নিজের দেশের নাম বিশ্বকাপের মানচিত্রে খুঁজে পায় না। তখন প্রশ্ন জাগে—যে জাতি ফুটবলকে এত ভালোবাসে, সেই জাতির ফুটবল আজ কোথায়?
সারা ফুটবল বিশ্ব ভুগছে বিশ্বকাপ জ্বরে
২০২৬ সালের বিশ্বকাপকে ঘিরে ইতিমধ্যেই উন্মাদনা ছড়িয়ে পড়েছে গোটা বিশ্বে। ইউরোপ থেকে লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকা থেকে এশিয়া—সর্বত্র ফুটবলপ্রেমীদের আলোচনার কেন্দ্র বিশ্বকাপ। সামাজিক মাধ্যম, সংবাদমাধ্যম, খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স বিশ্লেষণ—সবই ঘুরপাক খাচ্ছে বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে। ফুটবল আজ শুধুমাত্র একটি খেলা নয়, এটি এক বৈশ্বিক সংস্কৃতি।
প্রতিবারের ন্যায় বাঙালির মাতামাতি
বিশ্বকাপ এলেই বাংলার রাস্তাঘাটের চেহারা বদলে যায়। ছাদে ছাদে উড়ে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, জার্মানি কিংবা ফ্রান্সের পতাকা। চায়ের দোকানে শুরু হয় তর্ক, সামাজিক মাধ্যমে চলে সমর্থকদের বাকযুদ্ধ। কিন্তু এই আবেগের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে এক বেদনাও—আমরা অন্য দেশের হয়ে গলা ফাটাই, কারণ নিজের দেশকে বিশ্বকাপের মঞ্চে দেখতে পাই না।

বাঙালির ফুটবল আবেগের ইতিহাস
বাংলার সঙ্গে ফুটবলের সম্পর্ক একশো বছরেরও বেশি পুরনো। ১৯১১ সালে মোহনবাগানের আইএফএ শিল্ড জয় ভারতীয় আত্মমর্যাদার প্রতীক হয়ে উঠেছিল। কলকাতার ময়দান ছিল ভারতীয় ফুটবলের প্রাণকেন্দ্র। শৈলেন মান্না, পি কে বন্দ্যোপাধ্যায়, চুনী গোস্বামী, প্রদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়দের মতো কিংবদন্তিরা বাঙালির ফুটবলপ্রেমকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। একসময় দেশের সেরা ফুটবলারদের বড় অংশই উঠে আসতেন বাংলা থেকে।
বিশ্বকাপের মানচিত্রে বঙ্গদেশের স্থান কোথায়?
ফুটবলপ্রেমে বিশ্বের অন্যতম অঞ্চল হয়েও বিশ্বকাপের মানচিত্রে বাংলার অবস্থান কার্যত দর্শকের চেয়ারে। বিশ্বকাপে খেলোয়াড়, কোচ, প্রশাসক—কোনও ক্ষেত্রেই বাংলার উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি নেই। যে রাজ্য একসময় ভারতীয় ফুটবলের রাজধানী ছিল, আজ সেখানে আন্তর্জাতিক মানের ফুটবলার তৈরি হওয়া বিরল ঘটনা।
বিশ্বকাপের মঞ্চে ভারতের অনুপস্থিতি
ভারত মাত্র একবার, ১৯৫০ সালের বিশ্বকাপের জন্য যোগ্যতা অর্জন করেছিল।
Elaborate: তখন আমাদের খেলোয়াড়রা নেমে ছিলেন খালি পায়ে, আধুনিক সুবিধা তো দূরে থাক, খেলোয়াড়দের খাওয়ানো হতো খিচুড়ি।
কিন্তু নানা প্রশাসনিক ও আর্থিক কারণে সেই বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া হয়নি। তারপর কেটে গেছে সাত দশকেরও বেশি সময়। বিশ্বকাপের মূল পর্বে ভারত এখনও অনুপস্থিত। জনসংখ্যা, অর্থনীতি এবং ফুটবলপ্রেম—সবকিছু থাকা সত্ত্বেও এই ব্যর্থতা আমাদের ক্রীড়া কাঠামোর সীমাবদ্ধতাকেই সামনে আনে।
ফেলে আসা ফুটবলের পুরোনো দিনগুলি
একটা সময় সন্ধ্যা নামলেই পাড়ার মাঠ ভরে উঠত। স্কুল শেষে ব্যাগ ছুড়ে রেখে ছেলেমেয়েরা নেমে পড়ত খেলতে। আজ সেই মাঠের অনেকটাই বহুতল, বাজার বা পার্কিং লটে পরিণত হয়েছে। খেলাধুলার জায়গা কমেছে, বেড়েছে স্ক্রিনের সামনে কাটানো সময়। ফলে ফুটবলের সঙ্গে প্রজন্মের স্বাভাবিক সম্পর্কও দুর্বল হয়েছে।
বাংলার বর্তমান আর্থসামাজিক পরিস্থিতি
রাজ্যের বহু পরিবার আজ জীবিকার চাপে জর্জরিত। খেলাধুলা, বিশেষ করে ফুটবল, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের বিষয়। কিন্তু অনিশ্চিত অর্থনৈতিক বাস্তবতায় অধিকাংশ পরিবার সন্তানের কেরিয়ার হিসেবে খেলাধুলাকে উৎসাহ দিতে সাহস পায় না। ফলে প্রতিভা থাকলেও অনেকেই মাঝপথে হারিয়ে যায়।
পেটের দায়ে প্রবাসী যুবক, খেলাধুলার প্রতি অনীহা
কর্মসংস্থানের সন্ধানে বাংলার বহু যুবককে ভিনরাজ্যে বা বিদেশে পাড়ি দিতে হচ্ছে। জীবনের প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা। খেলাধুলা বা শরীরচর্চা অনেকের কাছেই বিলাসিতার বিষয় হয়ে উঠেছে। যে বয়সে মাঠে থাকার কথা, সেই বয়সে অনেকে জীবিকার সংগ্রামে ব্যস্ত।

বিশ্বকাপে ক্রিকেটের সর্বগ্রাসী প্রভাব, ফুটবল নেই কেন?
ভারতে ক্রিকেট আজ এক বিশাল শিল্প। বিপুল অর্থ, প্রচার, স্পনসরশিপ এবং পরিকাঠামো ক্রিকেটকে এমন উচ্চতায় নিয়ে গেছে, যেখানে অন্য খেলাগুলি পিছিয়ে পড়েছে। ফুটবলের প্রতি মানুষের আবেগ থাকলেও সেই অনুপাতে বিনিয়োগ, প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব স্পষ্ট। ফলে বিশ্বকাপের স্বপ্ন এখনও অধরাই রয়ে গেছে।
খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন ও স্বাস্থ্যের অবনতি
ফাস্টফুড এবং অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাত্রা নতুন প্রজন্মের শারীরিক সক্ষমতাকে প্রভাবিত করছে। স্থূলতা, কম শারীরিক সক্রিয়তা এবং স্বাস্থ্যগত নানা সমস্যা খেলাধুলার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। একজন ফুটবলারের জন্য যে ধরনের শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবনযাপন প্রয়োজন, তা ক্রমশ দুর্লভ হয়ে উঠছে।
বাংলার অগ্রণী ক্লাবগুলোর দুর্দশা আজ আর আলোচনায় আসে না
এক সময় মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গল, মহামেডান—এই ক্লাবগুলোর সাফল্য ও ব্যর্থতা নিয়ে সরগরম থাকত বাংলা। এখন মাঠের পারফরম্যান্সের চেয়ে প্রশাসনিক টানাপোড়েন, স্পনসর বা রাজনৈতিক যোগাযোগই বেশি আলোচিত হয়।
আর্থিক ব্যবসাই যেন প্রধান লক্ষ্য
ক্লাবগুলোর মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত খেলোয়াড় তৈরি ও ফুটবলের উন্নয়ন। কিন্তু বর্তমানে আয়ের উৎস, বাণিজ্যিক চুক্তি এবং আর্থিক স্বার্থ অনেক ক্ষেত্রেই খেলাধুলার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।Raise Your Concern About this Content
ফুটবল পরিকাঠামো উন্নয়নে অনীহা
আধুনিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, উন্নত একাডেমি, গ্রাসরুট স্তরে কোচিং—এসব ক্ষেত্রে বড় ক্লাবগুলোর দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ খুবই সীমিত। ফলে নতুন প্রতিভা তৈরি হওয়ার পথ সংকুচিত হচ্ছে।
ফুটবল সংস্কৃতি গড়ে তোলার উদ্যোগের অভাব
স্কুল, কলেজ ও পাড়ার মাঠে ফুটবল জনপ্রিয় করার জন্য বড় ক্লাবগুলোর উল্লেখযোগ্য ভূমিকা দেখা যায় না। সমর্থক তৈরির চেয়ে সমর্থকদের আবেগকে ব্যবহার করাতেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বিখ্যাত ফুটবল ক্লাবগুলো রাজনীতির পীঠস্থান
বাংলার ঐতিহ্যবাহী ক্লাবগুলো ক্রমশ রাজনৈতিক প্রভাব ও ক্ষমতার কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। ক্লাব পরিচালনা, নির্বাচন কিংবা সিদ্ধান্ত গ্রহণে ফুটবল নয়, রাজনৈতিক সমীকরণই অনেক সময় মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়।
তরুণ ফুটবলার তৈরির চেয়ে তারকা নির্ভরতা
নিজেদের একাডেমি থেকে খেলোয়াড় তুলে আনার বদলে বাইরের প্রতিষ্ঠিত ফুটবলারদের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। এতে স্বল্পমেয়াদি ফল মিললেও দীর্ঘমেয়াদে বাংলা ফুটবল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

অনলাইন গেমের সর্বনাশা আবির্ভাব
প্রযুক্তির উন্নতি আশীর্বাদ হলেও এর কিছু নেতিবাচক দিকও রয়েছে। মোবাইল ও অনলাইন গেমে আসক্তি অনেক শিশুকিশোরকে মাঠ থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। ভার্চুয়াল জগতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটলেও বাস্তব মাঠে দৌড়ঝাঁপের অভ্যাস কমছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে শারীরিক ও মানসিক বিকাশে।
এই অধঃগতির কোথায় শুরু, আর কোথায় শেষ?
ফুটবলের এই অবক্ষয়ের জন্য একক কোনও কারণ দায়ী নয়। প্রশাসনিক ব্যর্থতা, পরিকাঠামোর অভাব, সামাজিক পরিবর্তন, অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং জীবনযাত্রার বদল—সবকিছু মিলেই এই পরিস্থিতি তৈরি করেছে। তবে সমস্যার শিকড় যত গভীরই হোক, সমাধানের পথও আছে। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, স্কুলস্তরে ফুটবল চর্চা, আধুনিক প্রশিক্ষণ এবং খেলাধুলাকে সামাজিক অগ্রাধিকারের জায়গায় ফিরিয়ে আনা। তবে আশার কথা, ফুটবলের প্রতি মানুষের আবেগ এখনও অটুট। কলকাতার গ্যালারি এখনও ভরে যায়, বিশ্বকাপ এলেই বাংলা এখনও জেগে ওঠে। প্রয়োজন শুধু সেই আবেগকে পরিকল্পনা, পরিকাঠামো এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করা।
পরিশেষে বলা যায়, বিশ্বকাপের মরসুমে আমরা এখনও রাত জেগে মেসি, এমবাপে কিংবা বেলিংহ্যামের খেলা দেখি। কিন্তু নিজের দেশের জার্সিকে বিশ্বকাপের মঞ্চে দেখার স্বপ্ন এখনও অপূর্ণ। “সব খেলার সেরা বাঙালির তুমি ফুটবল”—এই লাইনটি আবার যেন গর্বের সঙ্গে গাওয়া যায়, সেই পরিবেশ তৈরি করাই আজকের চ্যালেঞ্জ। ফুটবল শুধু অতীতের গৌরব নয়, ভবিষ্যতের সম্ভাবনাও হতে পারে। প্রশ্ন একটাই—আমরা কি সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রস্তুত?
তথ্যসুত্র :
১. ভারতের বিশ্বকাপ ইতিহাস ও অংশগ্রহণ সংক্রান্ত তথ্য (AIFF অফিসিয়াল ওয়েবসাইট)
২. ভারতের বিশ্বকাপ ইতিহাস ও অংশগ্রহণ সংক্রান্ত তথ্য (FIFA অফিসিয়াল ওয়েবসাইট)
৩. বাংলার ফুটবল ঐতিহ্য
৪. ভারতের ক্রীড়া পরিকাঠামো ও ফুটবল উন্নয়ন সংক্রান্ত তথ্য (স্পোর্টস অথরিটি অফ ইন্ডিয়ার অফিসিয়াল ওয়েবসাইট)
৫. বাংলার আর্থসামাজিক পরিস্থিতি, কর্মসংস্থান ও যুবসমাজের প্রবণতা সংক্রান্ত তথ্য (ভারত সরকারের পরিসংখ্যান ও কর্মসূচি রূপায়ণ মন্ত্রক)
৬. BBC Sport – Kolkata Derby History: [BBC Sport: East Bengal vs Mohun Bagan Rivalry]
৭. India Today – Bengal Football’s Decline: [India Today Report]
৮. গবেষণাপত্র: Ghati-Bangal on the Maidan: Subregionalism, Club Rivalry and Fan Culture in Indian Football (Boria Majumdar) – ResearchGate. [Research Paper]




