Homeইত্যাদিস্মৃতিচারণ১৮ই অগাস্ট স্বাধীন হয় নদীয়ার কৃষ্ণনগর

১৮ই অগাস্ট স্বাধীন হয় নদীয়ার কৃষ্ণনগর

১৯৪৭ সালের ১৫ অগাস্ট পরাধীনতার শিকল থেকে মুক্ত হয় ভারতবর্ষ। সেই দিনে সারা দেশেই গর্ব ও মর্যাদার সঙ্গে স্বাধীনতা দিবস উদযাপিত হয়। তবে জানেন কি পশ্চিমবঙ্গের কিছু এলাকা স্বাধীনতা পেয়েছিল ১৮ অগাস্ট। তাই নদিয়া এবং মালদার মতো পশ্চিমবঙ্গের কিছু অঞ্চলে স্বাধীনতা দিবসের বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে ১৮ আগস্ট।

র‍্যাডক্লিফ রেখা 

র‍্যাডক্লিফ লাইন হল ভারত-পাকিস্তানকে বিভাজনকারী সীমান্ত রেখা। ১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতা বিষয়ক একটি আইন পাশ করা হহয় ব্রিটিশ পার্লামেন্টে। যেই আইনের মাধ্যমে গোটা ভারতবর্ষকে স্বাধীনতা দেওয়ার প্রস্তাব গৃহীত হয়। সীমান্ত বিভাজনের জন্য একটি কমিশন গঠন করে লর্ড মাউন্টব্যাটন।১৯৪৭ সালের ৩০ জুন ব্রিটিশ আইনজীবী সিরিল র‍্যাডক্লিফকে মাথায় রেখে পাঁচ জন সদস্যকে নিয়ে ‘বাউন্ডারি কমিশন’ গঠন করা হয়েছিল।  অর্থাৎ দুইটি আলাদা রাষ্ট্র ভারত ও পাকিস্তানের গঠন এবং সীমান্ত নির্ণয়ের দায়িত্বে ছিল গভর্নর জেনারেল র‌্যাডক্লিফের কাঁধে। যেহেতু ১৯৪৭ সালের ১৭ই আগস্ট একটি সীমানা টেনে ভারত-পাকিস্তানকে দু’ভাগ ভাগ করা হয়।  র‍্যাডক্লিফের নামে এই সীমারেখার নামকরণ করা হয় র‍্যাডক্লিফ রেখা। 

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

জানেন কি, ঠিক কী যোগ্যতা ছিল র‍্যাডক্লিফের? 

র‍্যাডক্লিফ ছিলেন ব্রিটিশ চেন্সারী বারের একজন প্রখ্যাত আইনজীবী । তিনি একবার মাত্র ব্রিটিশ তথ্য মন্ত্রকে কাজ করেছেন। পরবর্তীকালে মাউন্টব্যাটনের নির্দেশে স্বাধীনতা আইন পাস হওয়ার পর গঠিত সীমান্ত কমিশনের চেয়ারম্যান নিযুক্ত করা হয়। মাত্র পাঁচ সপ্তাহের মধ্যে ভারত ও পাকিস্তানের নতুন সীমান্ত নির্ধারণ করার দায়িত্ব পড়ে তাঁর ওপর। 

দেশভাগের পর শুরু হওয়া সাম্প্রদায়িক হিংসায় আনুমানিক ২ লক্ষ থেকে ২০ লক্ষ মানুষ প্রাণ হারান এবং আরও কয়েক লক্ষ মানুষ আহত হন। সীমান্তের দুই পাশে এই ভয়াবহ রক্তপাত ও মানবিক বিপর্যয় লক্ষ্য করার পর র‍্যাডক্লিফ তাঁর পারিশ্রমিক হিসেবে নির্ধারিত ৪০ হাজার টাকা (তৎকালীন প্রায় ৩ হাজার পাউন্ড) গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন। পরে, ১৯৪৮ সালে তাঁকে নাইট উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

কেন ১৮ অগাস্ট পালন করা হয় স্বাধীনতা দিবস? 

১৯৪৭ সালে ধর্মের ভিত্তিকে ভারতের বিভাজন করেছিল ব্রিটিশরা। হিন্দু প্রধান দেশ হিসেবে জন্ম নেয় ভারত, মুসলমান প্রধান দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে পাকিস্তান। একটি বিস্তারিত রিপোর্টও গঠন করে বাউন্ডারি কমিশন। সমস্যা হয়, র‍্যাডক্লিফের তৈরি করা নয়া মানচিত্রে মালদার কিছু এলাকা, কৃষ্ণনগর, শিবনিবাস, রানাঘাট, মুর্শিদাবাদের বেশ কয়েকটি অঞ্চলকেও  পূর্ব পাকিস্তান বর্তমানে যা বাংলাদেশ নামে পরিচিত, সেখানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল হয়েও পূর্ব পাকিস্তানের মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলের সঙ্গে অন্তর্ভুক্তির ঘটনায় ভয় পেয়ে যান ওই সমস্ত অঞ্চলের মানুষ। তাই গোটা দেশ যখন ২০০ বছর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অপশাসন ও পরাধীনতার শাপমুক্তির আনন্দে মেতে উঠেছিল, তখন বাংলার নদিয়া, মালদহ জেলার ওইসব অঞ্চলের মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। দিকে দিকে প্রতিবাদের আগুন জ্বলে ওঠে।

এর পরে এই এলাকাগুলি উত্তাল বিক্ষোভে ফেটে পড়ে।  ভারতে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার জোরালো দাবি উঠতে থাকে সাধারণ মানুষদের কাছ থেকে। তীব্র প্রতিবাদের জেরে তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেনের হস্তক্ষেপে সেই ভুল সংশোধন করা হয়। ১৯৪৭ সালের ১৭ আগস্ট গভীর রাতে নতুন করে সীমান্ত নির্ধারণের ঘোষণা করা হয় । ঘোষণা অনুযায়ী এলাকাগুলিকে ভারতের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ফলে ১৮ আগস্ট নদিয়া, মালদহ, মুর্শিদাবাদ বেশ কিছু এলাকায়  প্রথমবারের মতো ভারতের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। সেই কারণেই এই দিনটিকেই ওই অঞ্চলের প্রকৃত স্বাধীনতার দিন হিসেবে মনে করা হয়।

ইতিহাস বদলের নেপথ্যে ছিল মানচিত্রগত ভুল

দেশভাগের সময় সিরিল র‍্যাডক্লিফের সীমারেখা নির্ধারণের সময় একটি গুরুতর মানচিত্রগত ভুলের কারণে নদিয়া, মালদহ, উত্তর ২৪ পরগনা, মুর্শিদাবাদ জেলার কয়েকটি অঞ্চল, যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু জনগোষ্ঠীর বসবাস ছিল, পূর্ব পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়।

সীমান্ত সংশোধনের পর নদিয়ার বিভিন্ন এলাকায় পাকিস্তানের পতাকা নামিয়ে ফেলা হয় এবং ১৯৪৭ সালের ১৮ আগস্ট ভারতের তেরঙ্গা উত্তোলন করা হয়। সেই দিন থেকেই এই অঞ্চলগুলিতে ১৮ আগস্ট প্রকৃত স্বাধীনতা দিবস হিসেবে স্মরণীয় হয়ে রয়েছে।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

ইতিহাস ও আত্মপরিচয়ের প্রতীক

বর্তমানে ১৮ আগস্টের স্বাধীনতা দিবস উদযাপন শুধুমাত্র একটি ঐতিহাসিক ঘটনার স্মরণ নয়, বরং স্থানীয় মানুষের আত্মপরিচয়, সংগ্রাম এবং গর্বের প্রতীক। এই দিনটি দেশভাগের জটিল ও বেদনাদায়ক ইতিহাসের পাশাপাশি মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ের কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়।

প্রতি বছর স্থানীয় প্রশাসন, বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)-এর সহযোগিতায় এই বিশেষ দিনটি মর্যাদার সঙ্গে পালন করা হয়, যাতে এই অনন্য ঐতিহ্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছেও পৌঁছে যায়।

যদিও ১৫ আগস্ট ভারতের সরকারি স্বাধীনতা দিবস, তবুও নদিয়া ও মালদার কিছু অঞ্চলের মানুষের কাছে ১৮ আগস্ট বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। এই দিনটি তাদের কাছে শুধুমাত্র স্বাধীনতার দিন নয়, বরং ইতিহাসের ভুল সংশোধন, তাদের কঠোর সংগ্রামের জয় এবং আত্মমর্যাদার এক অনন্য প্রতীক যা ভারতের স্বাধীনতার ইতিহাসকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।

র‍্যাডক্লিফ রেখা সৃষ্টির পটভূমি

র‍্যাডক্লিফ রেখা সৃষ্টির পিছনে রয়েছে আরও গভীর ইতিহাস।  ভারতবর্ষের ক্ষমতা দখল করার পর থেকেই ব্রিটিশদের ভারত থেকে তাড়ানোর জন্য তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে সমগ্র দেশবাসী।

র‍্যাডক্লিফ রেখার উৎপত্তি ঘটে ব্রিটিশ শাসনের শেষ পর্যায়ে। বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকেই ভারতের বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে উত্তেজনা ক্রমশ বাড়তে থাকে, বিশেষ করে হিন্দু ও মুসলিমদের মধ্যে। অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগের নেতৃত্বে পৃথক মুসলিম রাষ্ট্র গঠনের দাবি জোরালো হয়ে ওঠে। একই সময়ে, ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস একটি ঐক্যবদ্ধ ও স্বাধীন ভারতের পক্ষে আন্দোলন চালিয়ে যায়।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ভারতের স্বাধীনতা যখন প্রায় নিশ্চিত হয়ে ওঠে, তখন ব্রিটিশ সরকার ভারতীয় উপমহাদেশকে দুটি পৃথক রাষ্ট্র ভারত ও পাকিস্তানে বিভক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়। এই সিদ্ধান্ত ১৯৪৭ সালের ভারত স্বাধীনতা আইন ১৯৪৭-এর মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক রূপ পায়। তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল নতুন দুই রাষ্ট্রের মধ্যে সঠিক সীমান্ত নির্ধারণ করা, বিশেষ করে যেসব অঞ্চলে বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষ একসঙ্গে বসবাস করতেন। এই সীমান্ত নির্ধারণের দায়িত্বই পরবর্তীতে র‍্যাডক্লিফ কমিশনের ওপর অর্পণ করা হয়।Raise Your Concern About this Content

দেশভাগের পরিণতি

দুই দেশের পরিণতি ছিল মানব ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম এবং সবচেয়ে মর্মান্তিক গণ-অভিবাসন। নতুন সীমান্ত ঘোষণার ফলে পাকিস্তানে বসবাসকারী বিপুল সংখ্যক হিন্দু এবং ভারতে বসবাসকারী অসংখ্য মুসলমান নিজেদের বাড়িঘর ছেড়ে অন্য দেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। এর ফলে দুই দেশেই ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, হত্যা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ ছড়িয়ে পড়ে। ফলে গোটা উপমহাদেশ এক অভূতপূর্ব বিশৃঙ্খলা ও মানবিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়।

দেশভাগের সেই রক্তাক্ত সময় নিয়ে একটি বহুল প্রচলিত বর্ণনা রয়েছে, যে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে শুধু সাধারণ মানুষের মরদেহ নিয়ে অনেক ট্রেন গন্তব্যে পৌঁছাত; জীবিত কোনও যাত্রীর অস্তিত্ব থাকত না। এই দৃশ্য দেশভাগের নির্মমতা ও সাম্প্রদায়িক হিংসার ভয়াবহতার এক শোকাবহ প্রতীক হিসেবে স্থান করে নিয়েছে ইতিহাসের পাতায়।

তথ্যসূত্র

১. ১৯৪৭ সালে এই ভারতীয়দের জন্য স্বাধীনতা কেন দেরিতে এসেছিল?
২. ১৫ অগস্ট নয়, ১৮ অগস্ট স্বাধীনতা উদযাপিত হয় বাংলার প্রচার জেলায়, কারণ জানেন? (এইসময়ে)
৩. যে মানচিত্র ভারতকে দুটি রাষ্ট্রে বিভক্ত করেছিল: র‍্যাডক্লিফ লাইনের কাহিনী
৪. জ্ঞানভাণ্ডার
৫. সিরিল র‍্যাডক্লিফ, ১ম ভিসকাউন্ট র‍্যাডক্লিফ

বিশ্বয়নী দত্ত
বিশ্বয়নী দত্ত
কলকাতা বিশ্ববিদ্য়ালয় থেকে জার্নালিজম এবং মাস কমিউনিকেশনে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন। গত কয়েক বছর ধরে জাতীয় প্রতিষ্ঠানে সাংবাদিকতা ও কন্টেট রাইটিং-এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। লেখালেখির প্রতি তাঁর বিশেষ অনুরাগ রয়েছে । ব্যস্ত জীবনের একঘেয়েমি কাটাতে মাঝেমধ্যে পাহাড়ে ঘুরতে যেতে ভালবাসেন।
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

বাংলা ক্যালেন্ডার

- বিজ্ঞাপন -spot_img

Most Popular

Recent Comments