Homeপার্বণীথিমের পুজো ছেড়ে এবার দেখে নিন রাজবাড়ি আর বনেদি বাড়ির পুজো……..

থিমের পুজো ছেড়ে এবার দেখে নিন রাজবাড়ি আর বনেদি বাড়ির পুজো……..

কৃষ্ণনগর রাজবাড়ি

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

যদি রাজবাড়ির পুজো দেখতে চান, তাহলে  কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির পুজো অন্যতম। নদিয়ার কৃষ্ণনগরের রাজবাড়ির এই পুজো প্রায় ৪০০ বছরের পুরনো বলে অনুমান করা যায়। প্রতিমা নির্মাণ থেকে পুজোর বিভিন্ন রীতি রয়েছে। উল্টোরথের পরে প্রতিমা নির্মাণের কাজ শুরু করা হয় পাট পুজোর মাধ্যমে। 

এখানে দুর্গা প্রতিমার রাজরাজেশ্বরী রূপে পুজো করা হয়। দেবী যুদ্ধের বেশভূষায় সজ্জিত, গায়ে বর্ম। সামনের দুটো হাত আকারে বড়, পিছনের ৮টি হাত তুলনামূলকভাবে ছোট। প্রতিমার পিছনে সাবেক বাংলার চাললি যা আকারে অর্ধগোলাকৃতি তার উপর একদিকে আঁকা দশাবতার মাঝে পঞ্চানন শিব আর অপরদিকে দশমহাবিদ্যা আঁকা রয়েছে। এখানে ডাকের সাজেও রয়েছে বৈচিত্র্য যা ‘বেদেনি ডাক’ নামে পরিচিত। দেবীর দুর্গার বাহন সিংহ এখানে পৌরাণিক যার মুখ অনেকটা ঘোড়ার মতো দেখতে। 

মহালয়ার পরের দিন প্রতিপদ থেকে দেবী রাজরাজেশ্বরীর হোম জ্বালানো হয় যা নবমী পর্যন্ত জ্বালানো হয়। দেবীর ভোগেও রয়েছে নানা ধরণের বৈশিষ্ট্য। মহালয়ার পর থেকেই দেবীর উদ্দেশ্যে ভোগ উৎসর্গ করা হয়। ভোগে সপ্তমী সাত রকমের ভাজা, অষ্টমীতে আট রকমের ভাজা আর নবমীতে নয় রকমের ভাজা থাকবেই। দশমীতে গলা ভাত, সিঙি মাছ ও দই চিঁড়ে দিয়ে ভোগ দেওয়ার রীতি রয়েছে। দশমীর দিন রাজবাড়িতে সিঁদুরখেলা হয়, অসংখ্য মহিলারা আসেন, দেবীকে বরণ করেন। 

কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির দুর্গাপুজোর সাক্ষী থাকতে এই বছর পুজোয় কৃষ্ণনগর আসতেই পারেন। শিয়ালদহ থেকে মেন লাইনে কৃষ্ণনগরগামী প্রচুর ট্রেন রয়েছে। ধর্মতলা থেকে বেশ কিছু বাসের পরিষেবাও রয়েছে। কলকাতা গাড়ি করে পুজো দেখে সেদিনই ফিরে আসতে পারেন। 

কাশীপুর রাজবাড়ি 

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

পুরুলিয়ার অন্যতম  প্রাচীীন ও ঐতিহ্যবাহী পুজো কাশীপুর দুর্গাপুজো। পঞ্চকোট রাজপরিবারের শেষ রাজধানী ছিল কাশীপুর।  মহাসপ্তমী থেকে দশমী পর্যন্ত জনসাধারণের জন্য রাজবাড়ির মূল দরজা খোলা থাকে। যদিও রাজবাড়ির অন্দরমহলে প্রবেশের অনুমতি থাকে না।  শুধুমাত্র ঠাকুর দালান পর্যন্ত যাওয়া যায়। 

এই রাজবাড়ির পুজোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য সপ্তমীর রাতে মহাশক্তির আরাধনা করা হয়। বৈষ্ণব মতে পুজোর আয়োজন করা হয়। চতুর্ভূজা অষ্টধাতুর মূর্তিতে পুজো করা হয়। দেবীর এক হাতে থাকে বেদ, অপর হাতে থাকে জপমালা। অন্য দুটি হাতে বরদান ও অভয়। গলায় ঝোলে নরমুণ্ডমালা।

কাশীপুর রাজপরিবারের ইষ্টদেবতা শ্রী রামচন্দ্র। তিনি যেমন কৃষ্ণাষ্টমীতে পুজো শুরু করে দশমীতে শেষ করেছিলেন, তেমনি দেবীকে এখানে ষোড়শী রূপে পুজো করা হয়। ১৬ দিনে   ১৬টি ভিন্নরূপে দেবীর পুজো করা হয়।  এই চারদিন রাজবাড়ি মানুষের উপস্থিতিতে গমগম করে।

এই বছরে এই রাজবাড়ির কয়েক শতাব্দীর প্রাচীন পুজো দেখতে সাক্ষী থাকতে পারেন আপনিও। হাওড়া থেকে রাঁচি বা পুরুলিয়াগামী প্রচুর ট্রেন রয়েছে। কলকাতার থেকে একটু আলাদা রকম পুজোর অভিজ্ঞতা পেতে অবশ্যই আপনার গন্তব্য পুরুলিয়া হতেই পারে। 

কাশিমবাজার রাজবাড়ি 

মুর্শিদাবাদের কাশিমবাজার রাজবাড়ির দুর্গাপুজো প্রায় ৩০০ বছরের পুরনো। রথের দিন কাঠামো পুজোর মাধ্যমে শুরু হয় প্রতিমা তৈরির কাজ। এই পুজোর বৈশিষ্ট্য হল, সপ্তমী থেকে নবমী পর্যন্ত কুমারী পুজো করা হয়। রাজবাড়ির বধূরা কুমারী পুজোর সঙ্গে যুক্ত থাকেন। একচালার  দুর্গাপ্রতিমা, গণেশের গায়ের রঙ লাল। এখানে সিংহ ঘোড়া মতো দেখতে যা ‘সিন্ধুঘোটক’ নামে পরিচিত। দেবীর ভোগেও নানা রকমের বিশেষত্ব রয়েছে। ভোগে ইলিশ,চিংড়ি থেকে শুরু করে একাধিক মাছ নিবেদন করা হয়। এই দুর্গাপুজোয় অতিথি-আত্মীয়দের পান সুপড়ি দিয়ে আমন্ত্রণ জানানো হয়।

শিয়ালদহ থেকে মুর্শিদাবাদের বেশ কয়েকটি ট্রেন রয়েছে। খুব সহজেই দুর্গাপুজো দেখতে চলে যেতে পারেন নবাবের শহর মুর্শিদাবাদে। 

মহিষাদল রাজবাড়ি

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

পূর্ব মেদিনীপুরের প্রায় ২৫০ বছরের প্রাচীন মহিষাদল রাজবাড়ির দুর্গাপুজো। মহালয়ের পরেরদিন প্রতিপদ থেকে শুরু হয় পুজোর আয়োজন। মদন গোপাল জিউ এই রাজবাড়ির ইষ্টদেবতা তাই বৈষ্ণব মতে পুজোর আচার-রীতি পালন করা হয়। বহু বছর আগে কামান দেগে সন্ধিপুজোর সূচনা করা হত। কালের নিয়ম অনুযায়ী সেইসব নিয়ম এখন অতীত। 

তমলুক রাজবাড়ি 

পূর্ব মেদিনীপুরের আরও একটি ঐতিহ্যবাহী দুর্গাপুজো তমলুক রাজবাড়ির দুর্গাপুজো। বহু প্রাচীন প্রথা বৈদিক মন্ত্রোচ্চারণ করে আজও এই পুজো করা হয়। প্রাচীন কালে রাজা ছাড়া এই পুজোয় আর কারোও প্রবেশের অনুমতি ছিল না। কিন্ত বর্তমানে সেই দুর্গাপুজো হয়ে উঠেছে সর্বজনীন। প্রত্যেক বনেদি বাড়ি বা রাজবাড়ির পুজোর ভিন্ন ভিন্ন ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট রয়েছে।

পঁচেটগড় রাজবাড়ি

পূর্ব মেদিনীপুরের আরও একটি প্রাচীন পুজো পঁচেটগড় রাজবাড়ি দুর্গাপুজো। প্রায় ৫০০ বছর আগে এই রাজবাড়িতে শুরু হয় দুর্গাপুজো। এই পুজোর সবথেকে বড় বৈশিষ্ট্য। এই পুজোয় কোনও প্রতিমা থাকে না। দুর্গা প্রতিমা পটে এঁকে তা পুজো করা হয়। কেন মূর্তিপুজো বন্ধ করে দেওয়া হয় তা নিয়ে স্পষ্ট ধারণা নেই। ষষ্ঠী থেকে পুজো শুরু হয়। আগে বলি দেওয়ার প্রচলন ছিল।

হাওড়া থেকে দীঘা যে কোনও ট্রেনে পূর্ব মেদিনীপুরের মহিষাদল,  তমলুক বা পঁচেটগড় রাজবাড়ির পুজো দেখে আসতে পারেবেন 

কলকাতা

পুজোর সময় যদি কলকাতা ছেড়ে যেতে ইচ্ছে না হয়। তাহলে কলকাতার কিছু বনেদি ও রাজবাড়ির দুর্গাপুজোর সন্ধান দিচ্ছি আমরা। যেসব পুজোর সঙ্গে এতিহ্য ও সাবেকিআনা জড়িয়ে রয়েছে।

শোভাবাজার রাজবাড়ি 

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

প্রায় ২০০ বছরের পুরনো এই শোভাবাজার রাজবাড়ির দুর্গাপুজো। এটি কলকাতায় আয়োজিত প্রথম পুজোগুলোর মধ্যে একটি। এই পুজো দেখেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, স্বামী বিবেকানন্দ।

উল্টোরথের দিন কাঠামো পুজো করা হয়। রাজবাড়ির নিয়ম অনুসার্ প্রথম মাটি বা মেটে দালানে তোলা হয়। তার ১৫ দিন পর শুরু হয় প্রতিমা তারির কাজ। পপ্রতিমা নির্মাণ দায়িত্ব বংশপরম্পরায় একই পরিবারের শিল্পীদের উপর পড়ে। দেবীকে আতপ চাল, ফল, মিষ্টি ভোগ হিসেবে নিবেদন করা হয়। ঘরের মেয়ে রূপে দেবীর পুজো করা হয়, তাই প্রতিমা আড়াল করে রাখা হয় যাতে বাইরের লোক মায়ের মুখ সরাসরি দর্শন করতে না পারেন।

মেট্রোতে শোভাবাজার-সুতানুটি পৌঁছে সহজেই পৌঁছতে পারবেন শোভাবাজার রাজবাড়ি। মেট্রোস্টেশন থেকে হাঁটা পথের দূরত্ব।

সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের দুর্গাপুজো 

কলকাতার প্রাচীনতম পুজোগুলির মধ্যে অন্যতম সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের দুর্গাপুজো। কলকাতায় জমিদার বংশ হিসেবে পরিচিত ছিলেন সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবার। ব্রিটিশদের থেকে রায়চৌধুরী উপাধি গ্রহণ করেন।

সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের আটচালা পুজোর প্রচলন রয়েছে।এখানে বিশেষ রীতিতে চণ্ডীপাঠ ও কুমারী পুজো করা হয়। প্রায় ৪০০ বছর ধরে আড়ম্বরের সঙ্গে এই পুজো করা হয়। 

সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের দুর্গাপুজো দেখতে বেহালা বা তারাতলা মেট্রো ব্যবহার করে যাওয়া যায়।Raise Your Concern About this Content

শিবকৃৃষ্ণ দাঁ পরিবারের দুর্গাপুজো 

কলকাতার অন্যতম প্রাচীন পুজো শিবকৃষ্ণ দাঁ বাড়ির দুর্গাপুজো। সোনা ও রূপো গয়নায় সাজানো হয় দেবীমূর্তি। 

খেলাত ঘোষ বাড়ি 

উত্তর কলকাতার পাথুরিয়াঘাটার ঘোষবাড়ির দুর্গাপুজোয় বিখ্যাত। বাড়ির তৈরি মিষ্টি দেবীকে নিবেদন করা হয়। মহাত্মা গান্ধী রোড বা গিরিশ পার্ক মেট্রো স্টেশন থেকে সহজে চলে যেতে পারেন এখানে। 

জানবাজারের রানি রাসমণি পরিবারের দুর্গাপুজো দক্ষিণেশ্বর কালী মন্দিরের প্রতিষ্ঠা করেন রানি রাসমণি। প্রায় ১৯ শতকের দিকে এই পুজো শুরু করেন রানি। এসপ্ল্যানেড বা পার্ক স্ট্রিট মেট্রোস্টেশন থেকে যেতে পারবেন। 

মল্লিক পরিবারের দুর্গাপুজো

দক্ষিণ কলকাতার বনেদি বাড়ির পুজোর মধ্যে অন্যতম মল্লিক বাড়ির দুর্গাপুজো।  ১৮৬০ সাল থেকে ভবানীপুরে অনুষ্ঠিত হচ্ছে এই দুর্গাপুজো। 

পুজোর আর কিছুদিন বাকি, তার আগেই ঠিক করে ফেলুন এই বারের দুর্গাপুজোয় কোন কোন রাজবাড়ি আর বনেদি বাড়ি আপনার পরিক্রমার তালিকায় থাকবে। 

তথ্যসূত্র

১. রোজদিন.in — পুরুলিয়ার কাশীপুর রাজবাড়ির পুজো
২. News18 বাংলা — তমলুক রাজবাড়ির দুর্গাপুজো: ইতিহাস ও সর্বজনীন পুজোর ঐতিহ্য
৩. News18 বাংলা — মহিষাদল রাজবাড়ির প্রায় ২৫০ বছরের দুর্গাপুজো ও বিশেষ রীতিনীতি
৪. Aaj Tak Bangla — শোভাবাজার রাজবাড়ির দুর্গাপুজো ও তার অজানা রীতিনীতি


Author

- বিজ্ঞাপন -
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

বাংলা ক্যালেন্ডার

- বিজ্ঞাপন -spot_img

Most Popular

Recent Comments