Homeপার্বণীরাখি বন্ধন উৎসবের ইতিহাস: পুরাণ, ইতিহাস ও ভারতের নানা প্রান্তের বিচিত্র উদযাপন

রাখি বন্ধন উৎসবের ইতিহাস: পুরাণ, ইতিহাস ও ভারতের নানা প্রান্তের বিচিত্র উদযাপন

অর্থাৎ একই রাখি পূর্ণিমা কেন্দ্র করে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে তার পরিচয় আলাদা। এই বৈচিত্র্যই রাখি বন্ধনকে শুধু একটি পারিবারিক উৎসব না বানিয়ে ভারতীয় সংস্কৃতির একটি জীবন্ত উদাহরণ করে তুলেছে।

তাহলে জেনে নিই চলুন, রাখি বন্ধনের ইতিহাস কোথা থেকে শুরু? এর সঙ্গে কৃষ্ণ-দ্রৌপদীর পৌরাণিক কাহিনির সম্পর্ক কী? আর রাজস্থান থেকে বাংলা, মহারাষ্ট্র থেকে দক্ষিণ ভারত, একই দিনে এত আলাদা উৎসব কেন?

রাখি বন্ধন উৎসবের অর্থ কী?

‘রক্ষা বন্ধন’ শব্দটির আক্ষরিক অর্থ রক্ষার বন্ধন। শ্রাবণ   বা ভাদ্র মাসের পূর্ণিমায় পালিত এই উৎসবে প্রচলিত রীতি অনুযায়ী বোন ভাইয়ের হাতে রাখি বাঁধেন, তিলক দেন, আর ভাই বোনকে উপহার দেওয়ার পাশাপাশি তাঁর পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দেন।

তবে এই সম্পর্কের অর্থ সময়ের সঙ্গে আরও বিস্ত্রিত হয়েছে। এখন রাখি কেবল সহোদর ভাই-বোনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বন্ধু কিংবা ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের মানুষদের মধ্যেও রাখি বিনিময় দেখা যায়। ভারতের সরকারি পর্যটন পোর্টালও রাখি বন্ধনকে ভালোবাসা, সুরক্ষা ও পারিবারিক বন্ধনের উৎসব হিসেবে তুলে ধরেছে।

পুরাণে রাখির গল্প: কৃষ্ণ ও দ্রৌপদীর কাহিনি

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

রাখি বন্ধনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সবচেয়ে জনপ্রিয় পৌরাণিক কাহিনিগুলোর একটি হল শ্রীকৃষ্ণ ও দ্রৌপদীর গল্প

প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, একবার কৃষ্ণের আঙুলে আঘাত লেগে রক্তপাত হলে দ্রৌপদী তাঁর শাড়ির একটি অংশ ছিঁড়ে কৃষ্ণের আঙুলে বেঁধে দেন। এই ঘটনাকে পরবর্তী লোকবিশ্বাসে ভালোবাসা, স্নেহ ও সুরক্ষার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়েছে। 

আরেকটি জনপ্রিয় কিংবদন্তি কাহিনিতে রাজা বলি ও দেবী লক্ষ্মীর প্রসঙ্গ রয়েছে। বিশ্বাস অনুযায়ী, লক্ষ্মী রাজা বলির হাতে রাখি বেঁধেছিলেন। এই গল্পগুলোর ঐতিহাসিক প্রমাণের প্রশ্ন আলাদা হলেও, এগুলো রাখির সাংস্কৃতিক অর্থ বুঝতে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা করে নিয়েছে।  

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

ইতিহাসের পাতায় রাখি: বাংলায় রবীন্দ্রনাথের ‘রাখি’

রাখি বন্ধনের ইতিহাসে বাংলার একটি বিশেষ অধ্যায় রয়েছে। ১৯০৫ সালে ব্রিটিশ সরকারের বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বাংলায় স্বদেশি আন্দোলন তীব্র হয়ে ওঠে। সেই সময় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রাখিকে ব্যবহার করেছিলেন হিন্দু-মুসলমানের ঐক্য ও সামাজিক সম্প্রীতির প্রতীক হিসেবে।

বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হওয়ার দিন, ১৬ অক্টোবর ১৯০৫, মানুষ পরস্পরের হাতে রাখি বেঁধে ঐক্যের বার্তা দিয়েছিল। এই উদ্যোগে রাখি কেবল ভাই-বোনের ব্যক্তিগত সম্পর্কের প্রতীক থাকেনি; তা হয়ে উঠেছিল সামাজিক সংহতির ভাষা। 

আজও পশ্চিমবঙ্গে রাখির এই সম্প্রীতির ঐতিহ্য বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আয়োজনে বারবার ফিরে আসে।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

দেশের কোন রাজ্যে কীভাবে পালিত হয় রাখি পূর্ণিমা?

এখানেই রাখি বন্ধনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক। দিন একই, কিন্তু রাজ্য বদলালেই বদলে যায় উৎসবের নাম, রীতি এবং সাংস্কৃতিক অর্থ।

রাজস্থান: লুম্বা রাখির বিশেষত্ব

রাজস্থানের কিছু অঞ্চলে লুম্বা রাখি বিশেষভাবে পরিচিত। এটি শুধু ভাইয়ের জন্য নয়, ভাইয়ের স্ত্রীর হাতেও রাখি বা বিশেষ ধরনের লুম্বা বাঁধার রীতি রয়েছে। ফলে এখানে রাখির বন্ধন ভাই-বোনের সম্পর্ক পেরিয়ে দাম্পত্য পরিবারের সম্পর্ককেও ছুঁয়ে যায়।

উত্তরাখণ্ড: উপাকর্মের ঐতিহ্য

উত্তর ভারতের কিছু অঞ্চলে শ্রাবণ পূর্ণিমা উপাকর্ম-এর সঙ্গেও যুক্ত। এই আচার মূলত বৈদিক অধ্যয়ন ও পবিত্র সূত্র পরিবর্তনের ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। পুরনো পৈতে পরিবর্তন করে নতুন পৈতে ধারণ করার রীতিও এই দিনের সঙ্গে যুক্ত। অর্থাৎ একই পূর্ণিমা এখানে শুধু রাখি নয়, ধর্মীয় ও বৈদিক আচারেও গুরুত্বপূর্ণ।

গুজরাট: পবিত্রোপণা

গুজরাটে শ্রাবণ পূর্ণিমার সঙ্গে পবিত্রোপণা-র ঐতিহ্য যুক্ত। এই দিনে শিবের পূজা করা হয় এবং পবিত্র সুতো বা তুলোর সূত্র শিবলিঙ্গে অর্পণের রীতি রয়েছে। ফলে এখানে উৎসবের কেন্দ্রবিন্দু ভাই-বোনের সম্পর্কের পাশাপাশি শৈব ধর্মীয় আচারও।

পশ্চিমবঙ্গ: রাখি উৎসব ও সম্প্রীতির বার্তা

বাংলায় রাখি সাধারণত ভাই-বোনের উৎসব হলেও এর একটি আলাদা ঐতিহাসিক পরিচয় রয়েছে। রবীন্দ্রনাথের ১৯০৫ সালের উদ্যোগের কারণে বাংলায় রাখি সামাজিক সম্প্রীতি ও ঐক্যের প্রতীক হিসেবেও পরিচিত। প্রতিবেশী, বন্ধু ও পরিচিতদের হাতে রাখি পরিয়ে সম্পর্কের বন্ধন দৃঢ় করার রীতিও দেখা যায়।

ওড়িশা: গামহা পূর্ণিমা

ওড়িশায় এই পূর্ণিমা গামহা পূর্ণিমা নামে পরিচিত। কৃষিভিত্তিক সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত এই দিনে গবাদি পশু, বিশেষ করে গরুর যত্ন ও পূজার ঐতিহ্য রয়েছে। কোথাও কোথাও গরুকে সাজানো এবং বিশেষ খাবার দেওয়ার রীতিও দেখা যায়।

মহারাষ্ট্র ও গোয়া: নারালি পূর্ণিমা

এখানে রাখি পূর্ণিমা যেন সমুদ্রের সঙ্গেও হাত মেলায়। মহারাষ্ট্রের কোঙ্কণ উপকূল ও মুম্বইয়ের মৎস্যজীবী সম্প্রদায়ের মধ্যে এই দিনটি নারালি পূর্ণিমা নামে পালিত হয়।

‘নারালি’ শব্দের সঙ্গে নারকেলের সম্পর্ক রয়েছে। এই দিনে সমুদ্রদেবতা বরুণের উদ্দেশে নারকেল নিবেদন করে নিরাপদ সমুদ্রযাত্রা ও ভালো মাছ ধরার প্রার্থনা করা হয়। একই দিনে রাখি বন্ধনও পালিত হয়।

দক্ষিণ ভারত: অবনি অবিত্তম

দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়ু, কেরল ও কর্ণাটকের কিছু সম্প্রদায়ের মধ্যে শ্রাবণ পূর্ণিমা অবনি অবিত্তম নামে পরিচিত। এখানে পৈতে পরিবর্তন এবং বৈদিক আচার গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ উত্তর ভারতের উপাকর্মের মতোই এই দিনটি ধর্মীয় ও বৈদিক ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।

একই  দিন , এত আলাদা  উদযাপন কেন?

এর উত্তর লুকিয়ে আছে ভারতের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যে। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে একই চন্দ্রতিথি স্থানীয় কৃষি, নদী, সমুদ্র, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং সামাজিক রীতির সঙ্গে মিশে আলাদা অর্থ তৈরি করেছে। ফলে রাখি পূর্ণিমা শুধু একটি নির্দিষ্ট উৎসব নয়; এটি একই সময়ে পালিত বহু আঞ্চলিক ঐতিহ্যের সমষ্টি।

এই কারণেই রাজস্থানের লুম্বা রাখি, গুজরাটের পবিত্রোপণা, বাংলার রাখি উৎসব, ওড়িশার গামহা পূর্ণিমা, মহারাষ্ট্রের নারালি পূর্ণিমা এবং দক্ষিণ ভারতের অবনি অবিত্তম, সবকটিকে একই সাংস্কৃতিক ক্যালেন্ডারের ভিন্ন ভিন্ন অভিব্যক্তি হিসেবে দেখা যায়।

দিন বদলেছে, সম্পর্ক নয়

আজকের রাখি বন্ধনেও এসেছে প্রযুক্তির ছোঁয়া। বিদেশে থাকা ভাই বা বোনের জন্য অনলাইনে রাখি পাঠানো, ভিডিও কলে রাখি বাঁধা, ডিজিটাল গিফট পাঠানো, সবই এখন স্বাভাবিক।Raise Your Concern About this Content

তবু উৎসবের মূল আবেগটি বদলায়নি। একটি ছোট্ট সুতো এখনও মনে করিয়ে দেয়, সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখতে শুধু রক্তের সম্পর্ক যথেষ্ট নয়; দরকার বিশ্বাস, যত্ন এবং একে অপরের পাশে থাকার মানসিকতা।

রাখি বন্ধনের ইতিহাস তাই শুধু পুরাণ বা একটি ধর্মীয় উৎসবের ইতিহাস নয়। এটি ভারতের সামাজিক বৈচিত্র্য, বাংলার সম্প্রীতির ইতিহাস এবং আঞ্চলিক সংস্কৃতির এক অসাধারণ মিলনকাহিনি।

একই পূর্ণিমা তিথিতে কোথাও ভাইয়ের হাতে রাখি পরানোর চল, কোথাও সমুদ্রের বুকে নারকেল, কোথাও নতুন পৈতে। এই বৈচিত্র্যের মধ্যেই হয়তো রাখি পূর্ণিমার সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে।

তথ্যসূত্র :

১. অবিশ্বাস্য ভারত
২. আনন্দবাজার সোশ্যাল
৩. দ্য বেটার ইন্ডিয়া

- বিজ্ঞাপন -
শ্রেয়া ভদ্র
শ্রেয়া ভদ্র
বর্তমানে মাইক্রো ড্রামা স্ক্রীপ্ট আর বাংলা অডিও স্টোরিতে নিজের পরিচয় গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। সিনেমা দেখা, বই পড়া, নতুন নতুন বিষয় নিয়ে ব্লগ লেখা পছন্দের সঙ্গে সঙ্গে ঘুরতেও ভালো লাগে। ভবিষ্যতে নিজের বই প্রকাশে আগ্রহী।
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

বাংলা ক্যালেন্ডার

- বিজ্ঞাপন -spot_img

Most Popular

Recent Comments