“আমি যেহেতু ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন রাজ্যকে প্রাধান্য দিয়ে লেখালেখি করি, তাই আজ ভাবলাম আমার নিজের রাজ্য ত্রিপুরাকে নিয়েই কেন নয়? বর্তমানে ত্রিপুরায় একটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক উৎসব চলছে—’খার্চি উৎসব‘। আজ সেই খার্চি উৎসব নিয়েই কিছু জানানোর চেষ্টা করছি। যাঁরা ত্রিপুরায় এসেছেন বা ত্রিপুরা সম্পর্কে পড়েছেন, তাঁরা নিশ্চয়ই এই খার্চি পূজা সম্পর্কে জানেন। তারপরও আমার নিজের রাজ্যের হয়ে আজ আমি আপনাদের পরিচয় করিয়ে দেব খার্চি পূজার চমৎকার গল্পের সাথে।”
উৎসবের মূল পরিচিতি ও অবস্থান
চতুর্দশ দেবতা মন্দির (Chaturdasha Temple) হলো ত্রিপুরা রাজ্যের অন্যতম ঐতিহাসিক, প্রাচীন এবং পবিত্র ধর্মীয় কীর্তি । ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলা থেকে প্রায় ১৪ কিলোমিটার দূরে পুরাতন আগরতলার খায়েরপুরে এই ঐতিহাসিক মন্দিরটি রয়েছে। এই মন্দিরটি মূলত ত্রিপুরার রাজপরিবারের কুলদেবতা বা ‘চতুর্দশ দেবতা‘ (১৪ জন দেব-দেবী)-র উদ্দেশ্যে উৎসর্গীকৃত, যেখানে প্রতি বছর বিশ্ববিখ্যাত খার্চি উৎসব অনুষ্ঠিত হয়।

নামের ইতিহাস ও মূল দর্শন (পৃথিবী শুদ্ধিকরণ)
খার্চি পূজার পেছনে প্রধান পৌরাণিক কাহিনীটি ত্রিপুরার অত্যাচারী রাজা ‘ত্রিপুর’-কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। হিন্দু পুরাণ ও ‘রাজমালা‘ অনুসারে, রাজা ত্রিপুর তাঁর প্রজাদের ওপর চরম অত্যাচার করতেন এবং দেবতারাও তাঁর ভয়ে ভীত ছিলেন। অবশেষে দেবাদিদেব শিবের হাতে রাজা ত্রিপুর নিহত হন। রাজার মৃত্যুর পর তাঁর রানি হীরাবতী রাজ্যে শান্তি ও প্রজাদের পাপমুক্তির জন্য শিবের শরণাপন্ন হন। তখন শিবের নির্দেশেই ধরিত্রী মাতাকে পবিত্র করতে এবং রাজ্যকে অমঙ্গল থেকে রক্ষা করতে ত্রিপুরার আদি রাজপরিবারের কুলদেবী ও দেবতা তথা ‘চতুর্দশ দেবতা‘-র আরাধনা শুরু হয় । এইভাবেই পাপ মোচনের উৎসব হিসেবে খার্চি পূজার ঐতিহাসিক সূচনা ঘটে।

রাজকীয় রীতিনীতি ও পূজা পদ্ধতি
“ঐতিহাসিক খার্চি পূজার অন্তরালে লুকিয়ে রয়েছে বেশ কিছু অনন্য ও রোমাঞ্চকর রীতিনীতি । এই উৎসবের সবচেয়ে প্রধান আকর্ষণ হলো দেবতাদের ‘রাজকীয় স্নানযাত্রা’। এছাড়া, উৎসবের সর্বেসর্বা এবং প্রধান পুরোহিত ‘চন্তাই’-এর নেতৃত্বে পরিচালিত বিশেষ পূজা-পার্বণ ও বৈদিক আচার এই উৎসবকে এক অন্য মাত্রায় নিয়ে যায়.
সারা বছর এই চতুর্দশ দেবতার পবিত্র মাথাগুলি মন্দিরের ভেতরে একটি অত্যন্ত গোপন ও সুরক্ষিত ঘরে বাক্সে বন্ধ থাকে । সাধারণ মানুষ বা ভক্তরা সারা বছর এদের দর্শনের সুযোগ পান না । কেবল মাত্র খার্চি উৎসবের এই সাতটি দিনই দেবতাদের সাধারণ মানুষের দর্শনের জন্য মূল বেদীতে সারিবদ্ধভাবে সাজিয়ে রাখা হয় ।এই পূজায় আজও সগৌরবে টিকে রয়েছে শত বছরের প্রাচীন বলিদান প্রথা । রাজ আমলের ঐতিহ্য ও নিয়ম মেনে দেবতাদের সন্তুষ্ট করতে উৎসবের দিনগুলিতে পশু বলি দেওয়া হয় । ঐতিহাসিক চুক্তি অনুসারে, রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে এবং সাধারণ ভক্তদের মানত রক্ষার্থে প্রতিদিন মহিষ, ছাগল ও পায়রা বলি দেওয়ার নিয়ম আজও এখানে অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে চালু রয়েছে ।Raise Your Concern About this Content

সম্প্রীতির মহাসঙ্গম: খার্চি মেলা
খার্চি মেলার সবচেয়ে বড় অনন্যতা হলো এর ধর্মনিরপেক্ষ এবং সর্বজনীন রূপ । এই মেলায় ত্রিপুরার ১৯টি পার্বত্য জনজাতির (আদিবাসী) মানুষ পাহাড় থেকে নেমে আসেন এবং সমতলের অ-জনজাতি বা বাঙালি সম্প্রদায়ের মানুষ একসঙ্গে শামিল হন । জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে লক্ষাধিক মানুষের এই সমাগম ত্রিপুরায় যুগ যুগ ধরে চলে আসা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক জীবন্ত উদাহরণ । এমনকি প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশ থেকেও বহু ভক্ত ও দর্শনার্থী এই মেলা উপভোগ করতে আসেন|
খার্চি পূজা কেবল সাত দিনের কোনো উৎসব বা মেলা নয়, এটি প্রতিটি ত্রিপুরাবাসীর হৃদয়ের এক গভীর আবেগ। যখন হাওড়া নদীর পবিত্র জলে স্নান সেরে চতুর্দশের রূপ ভক্তদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে, তখন ধূপের ধোঁয়া আর ককবরক মন্ত্রের সুরে পাহাড় ও সমতলের সব দূরত্ব মুছে এক হয়ে যায় । মেলা শেষের বাঁশির সুরে যখন উৎসবের আলো নিভে আসে, তখন মনটা এক অদ্ভুত বিষাদে ভরে ওঠে। তবে ধরিত্রী মাতার এই শুদ্ধিকরণ আমাদের বুকে রেখে যায় সম্প্রীতির এক পরম শিক্ষা ।
তথ্যসূচি :
১. ‘শ্রীরাজমালা’ (প্রথম থেকে চতুর্থ খণ্ড)
২. ‘ত্রিপুরার কৃষ্টি ও সংস্কৃতি’
৩. ‘The Boroks of Tripura’
৪. দৈনিক সংবাদ (ত্রিপুরা সংস্করণ)
৫. অফিসিয়াল ওয়েবসাইট
৬. খার্চি পূজা
৭. চতুর্দশ দেবতা মন্দির
৬. উইকিপিডিয়া



