Homeইত্যাদিশিল্প সমন্বয়জাতীয় গ্রন্থাগার – শব্দের জাদুঘর

জাতীয় গ্রন্থাগার – শব্দের জাদুঘর

ভাষার মাধ্যমে আমরা মনের ভাব প্রকাশ করি। এই ভাষার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আবেগ। পৃথিবীর যোগাযোগব্যবস্থার প্রধান ভিত্তিও কিন্তু ভাষা। দুই মানুষের মধ্যে অনুভূতির আদান-প্রদানের জন্য তো ভাষার প্রয়োজন রয়েছে, তবেই না আজ এই আধুনিক পৃথিবীর বিস্ময়গুলো  আবিস্কার করা সম্ভব হয়েছে। প্রথম এবং প্রাচীনতম ধ্বনি থেকে ভাষা এবং বর্তমানে আধুনিক যোগাযোগ তৈরি হওয়ার ইতিহাস পৃথিবী সৃষ্টির ইতিহাসের মতোই রোমাঞ্চকর। ভাষা আসলে মানবসভ্যতার উত্তরাধিকার যা আমরা বংশানুক্রমে পূর্বপুরুষদের কাছে পেয়ে আসছি।

ভাষার ইতিহাস আমরা কম-বেশি সকলেই জানি, তবে পাঠ্যপুস্তকের বাইরে ভাষা ও ধ্বনির উৎপত্তি, বিবর্তন, লিপির আবিস্কার ছাড়াও রয়েছে অনেক জানা ও অজানা কাহিনি। ভাষা শুধু ব্যাকরণ দিয়ে জানা যায় না, ভাষার সম্যক জ্ঞান লাভ করতে আমাদের ফিরতে হবে আমাদের শিকড়ের কাছে, খোঁজ নিতে হবে কেমন ছিল আমাদের পূর্বপুরুষের জীবনযাত্রা, জানতে হবে তাঁদের জীবনদর্শন।

শব্দের জাদুঘর বা ওয়ার্ড অফ মিউজিয়াম কী?

কলকাতার জাতীয় গ্রন্থাগারে বেলভেডিয়ার হাউসে চলছে শব্দের জাদু | ছবি: বিশ্বয়নী দত্ত

ভাষার পৃথিবীকে জানতে, আবিস্কার করতে এই জাদুঘরে একবার যেতেই হবে। যদি আপনার দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ভাষা নিয়ে আগ্রহ রয়েছে তাহলে তো মেঘ না চাইতেই জল। কারণ কন্নড়, তামিল, গুজরাতি ভাষা জানতে আর যেতে হবে না মুম্বই, তামিলনাড়ু কিংবা গুজরাত। এই শহরে থেকেই জানতে পারবেন বিভিন্ন ভাষার উৎপত্তি, ওই ভাষার বৈশিষ্ট্য। এই জাদুঘরে ভারতবর্ষের কমপক্ষে ৩৮০টি ভাষা নিয়ে ডিজিটাল প্রদর্শনী করা হয়েছে। শুধু তাই নয় এর মধ্যে ২০১১ সালে জনগণনায় নথিভুক্ত ১২১টি ভাষার উপস্থিতি রয়েছে।

 নিঃশব্দ থেকে শব্দের পথে

পৃথিবীর সূচনালগ্নে ছিল না কোনও শব্দ, ছিল না কোনও ভাষা। কোনও শব্দ লেখার মাধ্যমে প্রকাশের আগে সেই শব্দকে শুনতে হবে, অন্তর্নিহিত অর্থ অনুধাবন ও অনুভব করতে হয়। এটি একটি ধারাবাহিক পদ্ধতি যার মাধ্যমে নীরবতা থেকে শব্দের দিকে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব। ধ্বনি থেকে অর্থপূর্ণভাবে মনের ভাব প্রকাশ করা সম্ভব। মানুষের মধ্যে এইভাবে তৈরি হয়েছে যোগাযোগ। 

কোন কোন অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করবেন?

জানতে পারবেন নীরবতা, ধ্বনি ও ভাষার জন্মলগ্ন 
ভারতবর্ষের বৈচিত্র্যপূর্ণ লিপিসমূহের বিবরণ 
দেশের বিভিন্ন ভাষার উৎপত্তি, বিস্তার ও বিবর্তন
শিশুদের জন্য রয়েছে বিভিন্ন ইন্টারেক্টিভ গেম

বিশাল গ্যালারিতে ধ্বনি থেকে শব্দ তৈরির ইতিহাসের প্রদর্শন করা হয়েছে | ছবি: বিশ্বয়নী দত্ত

প্রায় ৩০০,০০০ বছর আগে ভাষার উৎপত্তি

প্রায় ৩০০,০০০ বছর আগে ভাষার উৎপত্তি হয়েছে।ভাষা শেখা এবং সেই ভাষায় কথা বলা মানবজাতির সহজাত ক্ষমতা। মানবদেহ, স্বর ও অভিব্যক্তির বহিঃপ্রকাশ ও একজনের সঙ্গে অপরজনের যোগাযোগের চাহিদা এই তিনটি বিষয়ের পারস্পরিক যোগসূত্র রয়েছে যা  জাদুঘরের ‘প্রথম শব্দ’ গ্যালারিতে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। 

গুহাচিত্র, বিভিন্ন চিহ্ন অঙ্কন থেকে অনুভূতি কথ্য ভাষায় রূপান্তর এই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াই আসলে যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরও উন্নত করে। এই বিভাগে প্রদর্শিত হয় ভাষা ও ধ্বনি আবিস্কারের আগে আদিম যুগে কীভাবে মানবজাতি নিজস্ব অভিজ্ঞতা, স্মৃতি, মনের ভাব, আবেগ, আচার-অনুষ্ঠান এবং কল্পনাকে প্রকাশ করত। সেগুলি কীভাবে সংরক্ষণ ও নথিবদ্ধ করা হত। 

‘প্রথম শব্দ’ গ্যালারিতে বৈজ্ঞানিক ব্যখ্যার সঙ্গে স্থান পেয়েছে সাংস্কৃতিক ব্যাখ্যাও। স্মৃতিকে ধরে রাখা, একে অপরের সঙ্গে অনুভূতির আদানপ্রদান, মনের আবেগ প্রকাশ করার মতো একাধিক বিষয়গুলি কীভাবে মানবসমাজের বিকাশে ও পরিকাঠামো নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। 

মাতৃভাষা

‘মা বলিতে প্রাণ করে আনচান, চোখে আসে জল ভরে’
-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 

মা আর মাতৃভাষা দুটোর সঙ্গে মানুষের নারীর টান। মা আমাদের দুনিয়া দেখায়, মাতৃভাষা আমাদের সেই দুনিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে শেখায়। মাতৃভাষা প্রত্যেক মানুষের প্রথম সাংস্কৃতির জগৎ তৈরি করে। এই ভাষার মাধ্যমে শিশুরা সুখ,দুঃখ, ব্যাথা বেদনার বহিঃপ্রকাশ করে। জন্মের পর জীবনের ছন্দের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ভবিষ্যতের পথচলা শুরু হয়। তাই মাতৃভাষার সঙ্গে আমাদের আত্মার সংযোগ রয়েছে।

মাতৃভাষা গ্যালারিতে ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলের ভাষার সঙ্গে দর্শকদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিশ্লেষণ করা হয়েছে কীভাবে প্রত্যেকটি ভাষার সঙ্গে অপর একটি ভাষার সংযোগ রয়েছে, কীভাবে আঞ্চলিক ভাষাগুলো পরস্পরের উপর প্রভাব ফেলে। ভৌগোলিক অঞ্চলভেদে কীভাবে ভাষার বিবর্তন হয়েছে। কীভাবে গোটা দেশে সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। জেনে রাখবেন ভাষার বৈচিত্র্যের জন্য জগৎসভায় ভারতবর্ষ আরও ব্যতিক্রমী হয়ে উঠেছে।

এই বিভাগে কুইজের আয়োজন করা হয়েছে যার মাধ্যমে ভাষার বৃহত্তর পরিসরে আপনি নিজের ভাষার অবস্থানের সন্ধান পেতে পারেন এবং অনুভব করতে পারেন প্রত্যেক মাতৃভাষার মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানের অমূল্য ভাণ্ডার। 

ভারতবর্ষে সাহিত্য সৃষ্টির কেন্দ্রসমূহ | ছবি: বিশ্বয়নী দত্ত

ভাষার সময়কাল

প্রচীন চিহ্ন-প্রতীক, লিপি থেকে শিলালিপির বিকাশ এবং পরবর্তীকালে সুসংগঠিত সাহিত্যচর্চার উত্থানের এই দীর্ঘ যাত্রাপথ তুলে ধরা হয়েছে এই গ্যালারিতে। প্রদর্শনীর মাধ্যমে দেখানো হয়েছে কীভাবে ধর্ম, রাজনীতি, বাণিজ্য প্রভাব ফেলেছে ভাষার বিস্তার ও প্রসারে। বিশ্লেষণ করা হয়েছে একই জনপরিসরে একাধিক ভাষার সহবস্থানের প্রমাণ মিলেছে বহু ভাষায় লেখা শিলালিপিগুলিতে।  

ওরাল ট্র্যাডিশন 

বিভিন্ন ভাষায় জ্ঞান বইয়ের পাতায় সংরক্ষিত হওয়ার বহু বছর আগে শুধুমাত্র মৌখিকভাবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে জ্ঞান ও স্মৃতির সঞ্চার করা হত। ওরাল ট্যাডিশন আসলে মানবজাতির ইতিহাস, সংস্কৃতি, আচার-রীতিনীতি, ভাবনা, প্রকৃতি সম্পর্কে জ্ঞান, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের বৈচিত্র্যকে সংরক্ষণ করে এসেছে। লোকগাথা, গল্প বলা, ঘুমপাড়ানি গান মৌথিকভাবে জ্ঞান, নিজের ইতিহাসকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার অন্যতম মাধ্যম। মজার বিষয় এই প্রত্যেকটি মাধ্যমই শুধুমাত্র বক্তা ও শ্রোতার সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল। বক্তা যেভাবে ইতিহাস বলছে শ্রোতা তা শুনে সেইভাবে সেই ইতিহাস মনে রাখছে, তার কাছ থেকে অপরজনের কাছে সেই ইতিহাস ছড়িয়ে পড়ছে। 

পারফর্মিং ট্র্যাডিশন 

বিশ শতাব্দীর মুদ্রণযন্ত্র | ছবি: বিশ্বয়নী দত্ত

ভাষাকে রূপ দেয় পরিবেশনা, যদি ভাষা আত্মা হয় তাহলে পরিবেশনা শরীর। কখনও শব্দের সঙ্গে ছন্দ যুক্ত হয়ে তৈরি হয় আবৃতি, সুর যুক্ত হয়ে তৈরি হয় সংগীত। পারফর্মিং ট্যাডিশন গ্যালারিতে নাটক, সংগীত, পুতুলনাচ, ছৌনৃত্য, ভক্তিগীতি বিভিন্ন শিল্পরূপের কথা তুলে ধরা হয়। বিভিন্ন ছবি প্রদর্শনীর মাধ্যমে পরিবেশন করা হয় কীভাবে বিভিন্ন শিল্পীরা উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া নিজেদের ইতিহাস, স্মৃতি ও সংস্কৃতিকে  নিজস্ব ব্যাখ্যার মাধ্যমে নতুন রূপ দেন। পারফর্মিং ট্যাডিশন হয়ে ওঠে শিল্পীর সত্ত্বা ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম। 

বসুধৈব কুটুম্বকম্

গোটা পৃথিবীটা আসলে একটাই পরিবার, তার সবথেকে বড় প্রমাণ হচ্ছে ভাষা। ভারতের বিভিন্ন ভাষা, এতিহ্য, সংস্কৃতি ভৌগোলিক ও আঞ্চলিক গণ্ডি ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়েছে সারা বিশ্বে। কূটনৈতিক সম্পর্ক, তীর্থযাত্রা, পারস্পরিক সংস্কৃতির আদান-প্রদানের মাধ্যমে উৎসস্থলের সীমানা পেরিয়ে গোটার বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে গেছে ভারতীয় শব্দ, ছড়িয়ে পড়েছে ভারতীয় দর্শন। ‘গ্লোবাল ডায়লগ’ গ্যালারিতে যত্ন সহকারে তুলে ধরা হয়েছে পারস্পরিক আদান-প্রদানের ইতিহাস। ভারতের সংস্কৃতি যেমন গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে একইভাবে অন্যান্য দেশের সংস্কৃতি ও বিভিন্ন শব্দ ও ধর্মীয় চিন্তাধারা ভারতবর্ষে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে। যুগ যুগ ধরে এইভাবেই ভাষা ও ভাবনার বিশ্বব্যাপী বিস্তার ও আদান-প্রদান হচ্ছে। Raise Your Concern About this Content

কীভাবে যাবেন?

হাওড়া থেকে বাসে চলে যেতে পারেন রবীন্দ্র সদন, মেট্রোতেও রবীন্দ্র সদন যেতে পারেন। রবীন্দ্র সদন থেকে ২৩০ নং বাস ধরবেন, ন্যাশনাল লাইব্রেরির প্রধান গেটে নামিয়ে দেবে বাস। সেখানে আই-কার্ড বা আধার কার্ড দেখালে জাতীয় গ্রন্থাগারের বেলভেডিয়ার হাউসে আপনারা প্রবেশ করতে পারবেন। জাদুঘরের পাশেই রয়েছে টিকিট কাউন্টার, সেখান থেকে সংগ্রহ করতে হবে টিকিট যা ১৫ অগাস্ট পর্যন্ত আপনারা বিনামূল্যে পেয়ে যাবেন। 

কবে ও কখন খোলা থাকে?

মঙ্গলবার থেকে রবিবার সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যে ৬টা পর্যন্ত খোলা থাকে বিকেল ৫.৩০টায় বন্ধ হয়ে যায় টিকিট কাউন্টার 
সপ্তাহে সোমবার সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে
সরকারি ছুটিগুলিতেও বন্ধ থাকে এই সংগ্রহশালা  
ভাষা যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম।  এই ভাষার মাধ্যমে ইতিহাস, সংস্কৃতি, শিক্ষা, স্মৃতি, এতিহ্য এক প্রজন্ম থেকে পরের প্রজন্মের কাছে পৌঁছে যায়। ধ্বনি থেকে শব্দ, তারপর লিপি এবং পরবর্তীকালে সাহিত্য,জ্ঞান, শিল্প, প্রযুক্তির দীর্ঘ যাত্রায় ভাষা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। সেই যাত্রাপথকে খুব নিঁখুতভাবে তুলে ধরা হয়েছে কলকাতার মিউজিয়াম অফ ওয়ার্ডসের মঞ্চে। 

তথ্যসূত্র

১. শব্দের জাদুঘর : অফিশিয়াল ওয়েবসাইট
২. কলকাতার নতুন Museum of Words – ThePrint প্রতিবেদন

বিশ্বয়নী দত্ত
বিশ্বয়নী দত্ত
কলকাতা বিশ্ববিদ্য়ালয় থেকে জার্নালিজম এবং মাস কমিউনিকেশনে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন। গত কয়েক বছর ধরে জাতীয় প্রতিষ্ঠানে সাংবাদিকতা ও কন্টেট রাইটিং-এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। লেখালেখির প্রতি তাঁর বিশেষ অনুরাগ রয়েছে । ব্যস্ত জীবনের একঘেয়েমি কাটাতে মাঝেমধ্যে পাহাড়ে ঘুরতে যেতে ভালবাসেন।
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

বাংলা ক্যালেন্ডার

- বিজ্ঞাপন -spot_img

Most Popular

Recent Comments