একটা সময় কলকাতায় গণেশপুজো বলতেই মনে পড়ত বড়বাজার, পোস্তা বা ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের কয়েকটি পুরনো পুজোর কথা। বাঙালির উৎসবের ক্যালেন্ডারে তখন দুর্গাপুজো, কালীপুজো, সরস্বতীপুজো, লক্ষ্মীপুজো কিংবা বিশ্বকর্মাপুজোর মতো জায়গা গণেশ চতুর্থীর ছিল না। কিন্তু সেই ছবিটা এখন বেশ বদলে গেছে।
আজ কলকাতার বিভিন্ন পাড়া, আবাসন, ক্লাব এমনকি ছোট-বড় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানেও গণেশপুজোর আয়োজন দেখা যায়। কুমোরটুলিতেও বাড়ছে গণেশের প্রতিমার চাহিদা। ২০২৬ সালে মৃৎশিল্পীদের হিসাব অনুযায়ী কলকাতা ও আশপাশের এলাকায় গণেশপুজোর সংখ্যা প্রায় ১১ হাজারে পৌঁছতে পারে এবং প্রতিমার অর্ডারও আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১০–১৫ শতাংশ বেড়েছে।
তাহলে প্রশ্নটা স্বাভাবিক, বাংলায় গণেশপুজোর জনপ্রিয়তা হঠাৎ এত বাড়ছে কেন? এটা কি শুধু অন্য রাজ্যের সংস্কৃতির প্রভাব, নাকি এর পেছনে আরও বড় সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তন কাজ করছে?

গনেশচতুর্থী আজ বাংলায় এক অনন্য উৎসব
অনাদিকাল থেকেই বাংলার ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনে গণেশপুজোর প্রচলন রয়েছে। দুর্গাপুজোয় মায়ের সঙ্গে গণেশের আরাধনা, পয়লা বৈশাখ ও অক্ষয়তৃতীয়ায় গৃহস্থালি এবং ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে গণেশপুজো, সবই বাংলার পরিচিত ঐতিহ্য। রায়গঞ্জের মতো শহরে পয়লা বৈশাখে সার্বজনীন গণেশপুজোও দীর্ঘদিনের রীতি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে মহারাষ্ট্রের গণেশচতুর্থীর আদলে বাংলাতেও গণেশপুজো নতুন মাত্রা পেয়েছে। প্রতিবেশী বিহারসহ বিভিন্ন রাজ্যে এই উৎসবের জনপ্রিয়তা এবং বাংলার সঙ্গে সাংস্কৃতিক যোগাযোগের ফলে গণেশচতুর্থী আজ শহর থেকে মফস্সল, বিভিন্ন জায়গায় ধীরে ধীরে এক অনন্য উৎসবে পরিণত হচ্ছে।
বাঙালির উৎসবের ক্যালেন্ডারে গণেশ এলেন কীভাবে?
গণেশ বাংলায় একেবারেই নতুন দেবতা নন। বাড়ির লক্ষ্মীপুজো, সরস্বতীপুজো বা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের পুজোয় গণেশের উপস্থিতি বহুদিনের। কিন্তু গণেশ চতুর্থীকে বড় আকারের সর্বজনীন উৎসব হিসেবে পালন করার সংস্কৃতি বাংলায় তুলনামূলকভাবে নতুন।
কলকাতায় পুরনো গণেশপুজোর সঙ্গে বড়বাজার, পোস্তা ও ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের যোগাযোগ দীর্ঘদিনের। তবে গত এক-দেড় দশকে গণেশপুজো ঘর বা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের গণ্ডি ছাড়িয়ে পাড়ার ক্লাব এবং কমিউনিটি পুজোর রূপ নিতে শুরু করেছে। ২০১৫ সালের একটি প্রতিবেদনে দেখা যায়, সেই সময়েই কুমোরটুলিতে গণেশের প্রতিমার চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছিল এবং বিভিন্ন পাড়ায় বড় আকারের গণেশপুজো শুরু হচ্ছিল। অর্থাৎ এই জনপ্রিয়তা একদিনে তৈরি হয়নি।

একটু পুর্যালোচনা করে দেখা যাক আজ বাংলায় গণেশপুজোর জনপ্রিয়তা কেন বেড়ে চলেছে?
বাংলায় গণেশপুজো জনপ্রিয় হওয়ার অন্যতম বড় কারণ সম্ভবত গণেশের সঙ্গে সমৃদ্ধি, সাফল্য ও নতুন শুরুর ধারণার সম্পর্ক। ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের কাছে গণেশ দীর্ঘদিন ধরেই সিদ্ধিদাতা ও বিঘ্নহর্তা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ। নতুন ব্যবসা শুরু, দোকানের উদ্বোধন কিংবা আর্থিক সাফল্যের প্রার্থনায় গণেশের পুজো করার রীতি রয়েছে।
কলকাতায় নতুন উদ্যোক্তা, ছোট ব্যবসা এবং বিভিন্ন পেশাজীবী গোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে এই বিশ্বাসও নতুন করে জনপ্রিয় হয়েছে। ২০২৩ সালের একটি প্রতিবেদনে মৃৎশিল্পী ও সমাজবিশ্লেষকদের বক্তব্যে স্টার্টআপ, ছোট ব্যবসা এবং সমৃদ্ধির আকাঙ্ক্ষাকে গণেশপুজোর প্রসারের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল।
এখানে একটা মজার পরিবর্তনও হয়েছে, আগে গণেশপুজো মানেই যেন ব্যবসায়ী মহল; এখন চাকরিজীবী, উদ্যোক্তা, আবাসনের বাসিন্দা, অনেকেই এই উৎসবের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন।
শুধু ব্যবসা নয়, বদলেছে বাংলার শহুরে সমাজও
কলকাতা আজ আগের তুলনায় অনেক বেশি বহুসাংস্কৃতিক শহর। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ কাজ, ব্যবসা বা পড়াশোনার জন্য কলকাতা ও তার আশপাশে এসে বসবাস করছেন।
বিশেষ করে বড় আবাসন, IT হাব এবং নতুন শহুরে অঞ্চলগুলিতে বিভিন্ন রাজ্য ও ভাষার মানুষের সহাবস্থান তৈরি হয়েছে। ফলে মহারাষ্ট্র, গুজরাট, রাজস্থান বা উত্তর ভারতের বিভিন্ন উৎসবও বাংলার শহুরে জীবনে বেশি দৃশ্যমান হয়ে উঠছে।
গণেশ পুজোর ক্ষেত্রেও এই সাংস্কৃতিক বিনিময় গুরুত্বপূর্ণ। গণেশ পুজো উৎসবটি এখন আর নির্দিষ্ট কিছু সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; নানা ধরনের বাসিন্দা ও স্থানীয় মানুষ এতে অংশ নিচ্ছেন।
অর্থাৎ এটি শুধু “অন্য রাজ্যের উৎসব বাংলায় এসেছে”, এত সরল করে দেখলে পুরো ছবিটা ধরা পড়বে না। বরং কলকাতার পরিবর্তিত জনসংখ্যা ও নাগরিক সংস্কৃতির সঙ্গে গণেশ পূজা উদযাপন এর জনপ্রিয়তা বাড়ছে সেটা বলার আর অপেক্ষা থাকে না।
২০২১ সালেই কলকাতায় আবাসন সমিতিগুলির মধ্যে গণেশপুজো আয়োজনের বৃদ্ধি লক্ষ্য করা গিয়েছিল। সেই সময় শহর ও শহরতলিতে প্রায় ১,২০০টি পুজোর কথা সংবাদ প্রতিবেদনে উঠে আসে।

সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে গণেশপুজোও ‘ইনস্টাগ্রামেবল’
এখানে Gen Z-কে বাদ দিলে গল্পটা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। আজকের উৎসব শুধু মণ্ডপে গিয়ে দেখার বিষয় নয়; সেটি ছবি তোলার, Reel বানানোর এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করারও বিষয়।
কুমোরটুলির শিল্পীরা এখন গণেশের প্রতিমা তৈরির সময় নতুন নতুন থিম ও ডিজাইনের চাহিদা পাচ্ছেন। ২০২৪ সালে ম্যাকাওয়ের পিঠে গণেশ থেকে শুরু করে জগন্নাথ-অনুপ্রাণিত গণেশ, এমন নানা অভিনব প্রতিমার অর্ডারের কথাও সামনে এসেছিল। ফলে গণেশপুজো হয়ে উঠছে এক ধরনের visual festival। ছোট, সুন্দর, থিম-ভিত্তিক এবং ছবি তোলার উপযোগী প্রতিমা ও মণ্ডপ তরুণ প্রজন্মের কাছে উৎসবটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলছে।
কুমোরটুলির শিল্পীদের কাছেও গণেশ এখন বড় বাজার
কোনও উৎসব জনপ্রিয় হচ্ছে কি না, তা বোঝার অন্যতম সহজ উপায় হল প্রতিমার বাজারের দিকে তাকানো।
কুমোরটুলিতে গণেশের প্রতিমার চাহিদা গত কয়েক বছরে ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ২০২৫ সালে এক মৃৎশিল্পীর বক্তব্য অনুযায়ী, গণেশপুজোর সংখ্যা প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে বলে তাঁরা লক্ষ্য করেছিলেন।
২০২৬ সালেও সেই বৃদ্ধির ধারার কথা উঠে এসেছে। শিল্পীদের মতে, নতুন নতুন পুজো যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি পুরনো পুজোগুলিও বড় হচ্ছে।
এর অর্থ শুধু বেশি প্রতিমা বিক্রি নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে—
- মৃৎশিল্পী
- মণ্ডপ নির্মাতা
- আলো ও সাজসজ্জার কর্মী
- ফুল ও পুজোর সামগ্রী বিক্রেতা
- ক্যাটারিং ও মিষ্টির ব্যবসা
- স্থানীয় দোকান ও ছোট ব্যবসা
অর্থাৎ গণেশপুজো ধীরে ধীরে একটি ছোট উৎসব অর্থনীতি তৈরি করছে।
বিশ্বকর্মাপুজোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা?
বাংলার ক্ষেত্রে এই তুলনাটিও বেশ interesting। একসময় কারখানা, গ্যারেজ ও শিল্পাঞ্চলে বিশ্বকর্মাপুজো ছিল বড় উৎসব। কিন্তু শিল্পের ধরন বদলেছে, অনেক পুরনো শিল্পক্ষেত্র সংকুচিত হয়েছে, অন্যদিকে ব্যবসা, পরিষেবা, স্টার্টআপ এবং আবাসনভিত্তিক কমিউনিটি বেড়েছে।
২০২৩ সালে কুমোরটুলির শিল্পীদের বক্তব্য নিয়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, গণেশের প্রতিমার চাহিদা বিশ্বকর্মার তুলনায় বেশি হয়ে উঠেছে। সেখানে শিল্পীরা শিল্পক্ষেত্রের পরিবর্তন এবং ব্যবসায়িক সম্প্রদায়ের মধ্যে গণেশের জনপ্রিয়তার বিষয়টিও তুলে ধরেছিলেন। অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে বিশ্বকর্মাপুজো হারিয়ে যাচ্ছে। বরং বলা যায়, বাংলার অর্থনীতি বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে কোন দেবতার সঙ্গে কোন পেশার সাংস্কৃতিক সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে, সেটিও বদলাচ্ছে।
তাহলে কি গণেশপুজো বাংলার ‘নতুন দুর্গাপুজো’?

একেবারেই নয়। দুর্গাপুজোর সঙ্গে বাংলার ইতিহাস, সাহিত্য, শিল্প, অর্থনীতি এবং সামাজিক পরিচয় এমনভাবে জড়িয়ে আছে যে তার সঙ্গে গণেশপুজোর তুলনা করা ঠিক হবে না। গণেশপুজোর জনপ্রিয়তা বরং বাংলার উৎসব সংস্কৃতির বৈচিত্র্য বাড়াচ্ছে।Raise Your Concern About this Content
২০২৪ সালে কলকাতায় প্রায় ৪০০টি লাইসেন্সপ্রাপ্ত গণেশপুজোর কথা পুলিশের তথ্যের ভিত্তিতে জানানো হয়েছিল। আর ২০২৬ সালে বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে পুজোর সংখ্যা আরও বাড়ার সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে। অর্থাৎ প্রবণতাটি স্পষ্ট, গণেশপুজো এখন বাংলার শহুরে উৎসব ক্যালেন্ডারে স্থায়ী জায়গা করে নিচ্ছে।
গণেশপুজোর জনপ্রিয়তার আসল কারণ একটিমাত্র নয়
বাংলায় গণেশপুজোর জনপ্রিয়তা কেন বাড়ছে, তার উত্তর আসলে কয়েকটি পরিবর্তনের মিলিত ফল।
ব্যবসা ও সমৃদ্ধির সঙ্গে গণেশের ঐতিহ্যগত সম্পর্ক, নতুন উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের বৃদ্ধি, বিভিন্ন রাজ্য থেকে মানুষের বাংলায় আসা, আবাসনভিত্তিক কমিউনিটি সংস্কৃতি, সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব এবং তুলনামূলক ছোট পরিসরে উৎসব আয়োজনের সুযোগ—সবকিছু মিলেই তৈরি হয়েছে এই নতুন প্রবণতা।
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়? গণেশপুজো বাংলায় এসে শুধু নিজের পরিচয় ধরে রাখেনি; বাংলার উৎসব সংস্কৃতির সঙ্গেও মিশে যাচ্ছে।
তথ্যসূত্র
১. কলকাতা ও শহরতলিতে বাড়ছে গণেশপুজোর জনপ্রিয়তা, প্রতিমার অর্ডার বেড়েছে ১৫ শতাংশ
২. কলকাতায় ক্রমশ বড় হয়ে উঠছে গণেশপুজোর আয়োজন
৩. গণেশপুজো ঘিরে কুমোরটুলিতে উৎসবের আমেজ, প্রতিমার অর্ডার বেড়েছে ২০ শতাংশ
৪. বিভিন্ন সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণে কলকাতাজুড়ে জমজমাট গণেশপুজো উদযাপন
৫. ভিড় এড়াতে গণেশপুজোয় অনলাইন দর্শন ও প্যাকেটবন্দি প্রসাদের ব্যবস্থা
৬. গণেশ চতুর্থীকে সামনে রেখে ব্যস্ত কুমোরটুলি, বাড়ছে গণেশ প্রতিমার চাহিদা



