Homeআধ্যাত্মিকঅধরপনা: জগন্নাথ সংস্কৃতির এক রহস্যময় আচার দেবতারা নয়, তৃপ্তি পান অদৃশ্য অতিথিরা

অধরপনা: জগন্নাথ সংস্কৃতির এক রহস্যময় আচার দেবতারা নয়, তৃপ্তি পান অদৃশ্য অতিথিরা

অধরপনার ইতিহাস ও উৎপত্তি

অধরপনার ইতিহাসের শিকড় প্রোথিত রয়েছে পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের শত শত বছরের প্রাচীন ঐতিহ্যে। প্রচলিত লোকগাথা অনুযায়ী, রথযাত্রা এবং উল্টোরথের পর দেবতা যখন রথে অবস্থান করেন, তখন দীর্ঘ সময় বাইরে থাকায় তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়েন। সেই ক্লান্তি দূর করতে এবং দেবতাদের তুষ্ট করতে মন্দির কর্তৃপক্ষ এবং সেবাইতরা বিশেষ এক শীতল পানীয় তৈরি করেন। কথিত আছে, এই প্রথার প্রচলন হয়েছিল মূলত ভক্তদের ঐকান্তিক ভক্তির বহিঃপ্রকাশ হিসেবে। শতাব্দী প্রাচীন এই আচারটি শুধু ওড়িশাতেই নয়, বাংলা ও ভারতের অন্যান্য জগন্নাথ মন্দিরগুলোতেও আজ সমান সমাদৃত।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

রথযাত্রার সঙ্গে নিগূঢ় সম্পর্ক

রথযাত্রা মানেই তো ভগবানের জনমক্ষেত্ৰে আগমন। রাজা থেকে প্রজা—সবাই যেন এই সময় ভগবানের খুব কাছাকাছি আসতে চান। অধরপনা মূলত রথযাত্রার শেষ লগ্নের উৎসব। রথের উপরেই এই পানীয়ের ভোগ নিবেদন করা হয়। রথযাত্রার যে ন’দিনের কর্মযজ্ঞ, তার একটি পূর্ণতা পায় এই অধরপনার মাধ্যমে। এটি যেন এক দীর্ঘ সফরের শেষে মিষ্টিমুখের মতো। দেবতাকে রথের ওপর বসিয়ে যখন এই পানীয় অর্পণ করা হয়, তখন মনে হয় যেন ভগবান নিজে তাঁর ভক্তদের সাথে একাত্ম হয়ে এক মর্ত্যের উৎসবে অংশ নিচ্ছেন।

কেন দেবতা পান করেন না?

অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, ভগবান যদি সর্বশক্তিমান হন, তবে কি তাঁর তৃষ্ণা পায়? বা তিনি কি সত্যিই এই পানীয় পান করেন? শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যার চেয়ে এখানে ভক্তের হৃদয়ের আবেদন বড়। দেবতা এখানে ‘মানুষ’ রূপেই আমাদের মাঝে আসেন। তিনি যখন রথে চড়ে সাধারণ মানুষের মতো রাস্তায় বের হন, তখন মানুষের মতোই তাঁর ক্লান্তি অনুভূত হয়। কিন্তু আদতে দেবতা ‘নিরাকার’ ও ‘নির্বিকার’। তাঁর পান করা না-করার চেয়ে বড় হলো—ভক্তের সেবার আকুলতা। ভগবান নিজে গ্রহণ করেন না, কিন্তু ভক্তের অকৃত্রিম ভক্তিভরা নিবেদনকে তিনি স্বীকার করে নেন।

‘অধরপনা’ নামের তাৎপর্য

‘অধরপনা’ শব্দটি বিশ্লেষণ করলে এর গভীরে লুকিয়ে থাকা ভক্তি স্পষ্ট হয়। ‘অধর’ মানে ঠোঁট বা মুখ, আর ‘পনা’ হলো সুস্বাদু পানীয়। রথযাত্রায় দেবতারা যখন রথে অধিষ্ঠিত থাকেন, তখন পানীয়ের পাত্রটি এমনভাবে ধরা হয় যাতে তা দেবগণের ওষ্ঠ বা অধর স্পর্শ করে। অর্থাৎ, দেবতার অধর বা ঠোঁট পর্যন্ত এই পানীয় পৌঁছে দেওয়া হয়, তাই এর নাম ‘অধরপনা’। এই নামটির মধ্যেই দেবতার প্রতি ভক্তের পরম সমর্পণের সুর মিশে আছে।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

কলস ভাঙার অন্তর্নিহিত দর্শন

অধরপনা আচারের শেষে রথের ওপর রাখা বড় বড় মাটির কলসগুলো ভেঙে ফেলা হয়। এটি কেবল একটি রীতি নয়, এর পেছনে রয়েছে গভীর দার্শনিক বার্তা। হিন্দুধর্মে মাটি বা পঞ্চভূত থেকে সৃষ্টির ধারণা রয়েছে। কলস ভাঙার অর্থ হলো—সবকিছুই নশ্বর।

মানুষ যেমন মৃত্যুর পর মাটিতে মিশে যায়, তেমনি এই মাটির পাত্রও উৎসর্গ শেষে চূর্ণ হয়ে প্রকৃতির সাথে মিশে যায়। এছাড়া, কলস ভেঙে পানীয়টি ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে দেবতার প্রসাদ সবদিকে ছড়িয়ে দেওয়ার একটি প্রতীকী প্রকাশ ঘটে। এটি যেন বিশ্বজনীন শান্তির বার্তার মতোই—দেবতার কৃপা কোনো গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকে না। কলস ভাঙার শব্দ এক ধরণের পবিত্রতার ধ্বনি বহন করে, যা ভক্তদের মনে আনন্দের জোয়ার আনে এবং অশুভ শক্তির বিনাশের বার্তা দেয়।

লোকবিশ্বাস ও শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যার মিল-অমিল

শাস্ত্রীয়ভাবে অধরপনা হলো দেবতাকে শীতল করা বা ‘শীতল ভোগ’। সেখানে মন্ত্র ও আচারের কঠোর নিয়মাবলি বিদ্যমান। অন্যদিকে, লোকবিশ্বাসে এটি হলো ‘বন্ধুর সেবা’। গ্রামের মানুষ বিশ্বাস করেন, এই পানীয় পান করলে সারা বছরের অশুভ শক্তি দূর হয়।

অনেকেই মনে করেন, এই পানীয়র কিছুটা অংশ রথের গায়ে ছিটিয়ে দিলে বা মাটিতে পড়লে তা চতুষ্পদ প্রাণী ও অশরীরী আত্মাদেরও তৃপ্তি দেয়। শাস্ত্র যেখানে নিয়ম শেখায়, লোকবিশ্বাস সেখানে আবেগ ও প্রাণের স্পন্দন যোগ করে। এই মেলবন্ধনেই অধরপনা আজও প্রাণবন্ত। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ধর্ম কেবল শাস্ত্রের পাতায় থাকে না, বরং তা মানুষের প্রতিদিনের বিশ্বাস ও কাজের মধ্যে বেঁচে থাকে।

ধর্মীয় আচার থেকে সামাজিক ও মানবিক বার্তা

অধরপনা উৎসব আমাদের শেখায় যে, ঈশ্বর কোনো বিচ্ছিন্ন সত্তা নন। তিনি আমাদের মতোই দুঃখ-সুখ, ক্লান্তি ও তৃষ্ণার অংশীদার। অধরপনার মাধ্যমে যে প্রসাদ বা পানীয় বিতরণ করা হয়, তা জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই গ্রহণ করেন। এই পানীয়র মধ্যে কোনো ভেদাভেদ নেই।

এটি আমাদের শেখায়—মানবসেবাই ঈশ্বরসেবা। যখন আমরা অন্যের তৃষ্ণা মেটাই, তখন আমরা পরোক্ষভাবে দেবতার সেবা করি। এটি সামাজিক সাম্যের এক চমৎকার উদাহরণ। রথের দড়ি টানার সময় যে ঐক্য গড়ে ওঠে, অধরপনা উৎসবে সেই ঐক্য যেন মধুর রূপ পায়। ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সবাই যখন সেই প্রসাদ পান করেন, তখন সমাজে বিভেদের প্রাচীরগুলো ধুলোয় মিশে যায়। 

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

আধুনিক যুগেও এই প্রাচীন প্রথার প্রাসঙ্গিকতা

যান্ত্রিকতার যুগে যখন মানুষ একাকীত্বে ভুগছে, তখন অধরপনার মতো উৎসবগুলো আমাদের আবার মাটির কাছে, সম্পর্কের কাছে ফিরিয়ে আনে। যখন আমরা অন্যের জন্য কিছু করি, তখন যে আনন্দ পাওয়া যায়, সেটাই তো অধরপনার আসল সার্থকতা।

আজকের দিনে এই প্রথা মনে করিয়ে দেয় যে, জীবন মানে শুধু দৌড়ানো নয়, মাঝে মাঝে একটু থেমে অন্যের ক্লান্তি ভাগ করে নেওয়াও জরুরি। এটি আমাদের শেকড়কে বাঁচিয়ে রাখে এবং আধুনিকতাকে মানবিকতায় ঋদ্ধ করে। আজকের দিনেও যখন মানুষ ভেদাভেদের দেয়াল গড়ে তুলছে, তখন অধরপনার পঙ্‌ক্তি ভোজন আমাদের অখণ্ডতার বার্তা দেয়। এটি প্রমাণ করে যে, প্রযুক্তির চরম উন্নতির দিনেও মানুষের হৃদয়ের আবেগ ও ভক্তিই শ্রেষ্ঠ সম্পদ।Raise Your Concern About this Content

অধরপনার সামাজিক বার্তা

অধরপনা কেবল ওড়িশার একটি স্থানীয় উৎসব হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি আজ বাঙালির হৃদয়েও গভীরভাবে জায়গা করে নিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জগন্নাথ মন্দিরে এই উৎসব মহা সমারোহে পালিত হয়। এই প্রথাটি স্থানীয় অর্থনীতির ওপরও প্রভাব ফেলে—দুধ বিক্রেতা, ফল বিক্রেতা, মৃৎশিল্পী—সবার জন্য এই উৎসব যেন এক আশীর্বাদ। এটি একাধারে আধ্যাত্মিক তৃপ্তি এবং সামাজিক উৎসবের এক অনন্য সমন্বয়। এই রীতি বার্তা দেয় সমাজে কেউ যেন অবহেলিত বা বঞ্চিত না থাকে। প্রকৃত ধর্ম মানে শুধু উপাসনা নয়, সবার কল্যাণের চিন্তা। ত্যাগ ও ভাগ করে নেওয়ার মধ্যেই রয়েছে মানবতার সৌন্দর্য। ক্ষমতা বা সম্পদ নিজের মধ্যে আটকে না রেখে সমাজের কল্যাণে ব্যবহার করা উচিত। দৃশ্যমানের পাশাপাশি অদৃশ্য ও প্রান্তিক মানুষের প্রতিও দায়িত্ব রয়েছে। ঈশ্বরের কৃপা সবার জন্য সমান— ধর্মের মূল শিক্ষা সমতা ও সহমর্মিতা।

পরিশেষে বলা যায়, অধরপনা কেবল জগন্নাথদেবের একটি বিশেষ নৈবেদ্য নয়, এটি আমাদের সংস্কৃতির এক অমোঘ দর্পণ। রথের ওপর সাজানো সেই মাটির পাত্র আর তার ভেতরের অমৃতসম পানীয় আমাদের শেখায় কী করে দেবতাকে নিজের করে নিতে হয়। রথযাত্রার ন’দিনের শেষে এই পানীয় যেমন দেবতাকে তৃপ্ত করে, তেমনি ভক্তের মনকে পূর্ণ করে দেয় পরম শান্তিতে। এই প্রাচীন ঐতিহ্যটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—ভালোবাসা এবং সেবা দিয়েই ঈশ্বরকে পাওয়া সম্ভব। এই প্রথা যেন যুগ যুগ ধরে আমাদের হৃদয়ে ঐক্যের সুধা ছড়িয়ে দিয়ে যায়।

তথ্যসূত্র

১. অধরপনার তথ্য  
২. ওড়িশা ট্যুরিজম ও কালচারাল পোর্টাল
৩. জগন্নাথ সংস্কৃতি ও বিভিন্ন আচার নিয়ে গবেষণাধর্মী গ্রন্থ
৪. অধরপনার নিয়ম

সৃজিতা মল্লিক
সৃজিতা মল্লিক
ডিজিটাল মিডিয়ার নিউজ ডেস্কে কেটে গিয়েছে ৫ বছর। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণমাধ্যম নিয়ে পড়ার সময় থেকেই সাংবাদিকতায় হাতেখড়ি হয় সৃজিতার। খবর ভালোবাসা তাই বাছবিচার ছাড়াই দেশ, দুনিয়া, রাজ্যের খবরের সঙ্গে সঙ্গে খেলা, বিনোদন দুনিয়ার ময়দানেও রয়েছে আনাগোনা। উৎসাহ বাজারের ওঠাপড়া, রাজনীতির বিষয়েও। খাদ্যরসিক। ছুটি পেলেই সপরিবার ভ্রমণে প্রাণের আরাম, মনের প্রশান্তি।
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

বাংলা ক্যালেন্ডার

- বিজ্ঞাপন -spot_img

Most Popular

Recent Comments