‘দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া, ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া একটি ধানের শিষের উপর একটি শিশিরবিন্দু’
আমাদের এই ভূ-ভারতের সবকিছু ছেড়ে আমরা হারিয়ে যেতে চাই বিদেশের হাতছানিতে। আমাদের না দেখা হয় ভারতকে, না জানা হয় তার অজানা রহস্যকে। কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারি পর্যন্ত ভারতবর্ষেই লুকিয়ে রয়েছে কিছু অপার্থিব জায়গা, যেসব জায়গায় পা ফেললে মনে হয় বিশ্বে এমন কোনও জায়গার সত্যি সত্যি সন্ধান পাওয়া যায়! ছোটবেলায় ক্লাসমেট বা পায়ওনিয়ারের খাতার মলাটে যেসব পাহাড়ের ছবি থাকতো এ তেমনি ছবির মতো, স্বর্গের কোনও অংশ।
‘ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার্স’ এমন কোনও জায়গার নাম শুনেছেন কখনও? যেখানে দিগন্ত বিস্তৃত খালি ফুল আর ফুল, যারা পাহাড় ভালবাসে, তাদের জন্য এ কোনও স্বর্গের থেকে কম নয়। যেদিকে তাকাবেন পাহাড়, মাঝ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে খরস্রোতা পুষ্পবতী নদী। তার যাওয়ার পথে বাধা সৃষ্টি করে এমন কারও সাধ্য নেই। কোনও এক অনির্দিষ্টের পথে সে বয়ে চলেছে। তার পিছুটান নেই। প্রকৃতি যেখানে গল্প বলে কানে কানে। যে উপত্যকায় ফুল-শয্যায় ঘুমিয়ে পড়তে ইচ্ছে করে চিরনিদ্রায়।

ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার্স – UNESCO WORLD HERITAGE SITE
হিমালয়ের সুবিশাল পর্বতমালার পটভূমিকে সাক্ষী রেখে উত্তরাখন্ডের চামোলি জেলার ৮৭ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে বছরের পর বছর নিজের অস্তিত্ব জানান দিয়ে যাচ্ছে ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার্স। এটি UNESCO স্বীকৃত ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট এবং নন্দাদেবী বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভের দুটি মূল অঞ্চলের একটি। নন্দাদেবী বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভের একটি অংশ ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার্স, অপর একটি অংশ নন্দাদেবী ন্যাশনাল পার্ক। বছরের মাত্র ৪ মাস, জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত খোলা থাকে। বছরের বাকি সময় ঘন তুষারে ঢাকা থাকে এই জাতীয় উদ্যান।
কে আবিষ্কার করলেন ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার্স?
হিমালয়ের আড়ালে থাকায়, অতি দুর্গম এলাকা হওয়ায় লোকচক্ষুর আড়ালেই ছিল উত্তরাখন্ডের এই ফুলের উপত্যকা। বিশ্বের কাছেও প্রায় অজানাই ছিল। সালটা ১৯৩১, ব্রিটিশ পর্বতারোহী
ফ্র্যাঙ্ক এস. স্মাইথের নেতৃত্বে আরও দুই জন ব্রিটিশ পর্বতারোহী এরিক শিপটন এবং আর. এল. হোল্ডসওয়ার্থ মাউন্ট কামেট অভিযানে সফল হন। কামেট জয় করে ফেরার পথে রাস্তা হারিয়ে
এই ফুলে ভরা উপত্যকার সন্ধান পান ৩ ব্রিটিশ পর্বতারোহী। এই এলাকার অপার সৌন্দর্য্যে মুগ্ধ হয়ে তাঁরা এই অঞ্চলের নাম দেন ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার্স। পরে স্মাইথ ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার্স, ওই নামেই একটি বইও রচনা করেন।
১৯৩৭ সালের জুন মাসে আবার স্মাইথ রানিক্ষেত থেকে ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার্সের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন। তাঁর সঙ্গে যোগ দেন চারজন তিব্বতি নুরবু, তেওয়াং, ওয়াংদি এবং পসাং। সেই সময় তিনি নৈনিতাল হয়ে রানিক্ষেত, গরুর, গোয়ালদ্বাম, থারালি, দুংরি, সুবতাল, ঘাট, রামনি, সেমকার্ক, বিরাহী ভ্যালি, কালিয়াঘাট, ডাকওয়ানি, কুয়ারি পাস, জোশিমঠ থেকে ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার্সে যাত্রা করেন। সেখানে কিছুদিন বিশ্রাম করেন। পরে আশেপাশের নীলগিরি পর্বত, রাতাবান, ব্ল্যাঙ্ক প্লাটো, মানা পিক, নীলকণ্ঠ এবং দুনাগিরির মতো শৃঙ্গগুলি আরোহণের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। ওই বছরেই সেপ্টেম্বর মাসে এডিনবার্গ বোটানিক্যাল গার্ডেনের জন্য তাঁর উদ্ভিদবিদ্যাসংক্রান্ত কাজ শেষ করতে আবার ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার্সে ফিরে আসেন স্মাইথ।
১৯৩৯ সালে UK-এর রয়্যাল বোটানিক গার্ডেনস, কিউ-র পক্ষ থেকে উদ্বিদবিদ লেডি জোয়ান মার্গারেট ফুল নিয়ে গবেষণার জন্য ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার্সে যান। ফুল সংগ্রহ করতে গিয়ে পাথুরে ঢাল বেয়ে হাঁটার সময় পা পিছলে পড়ে যান, সেখানে তাঁর মৃত্যু হয়। পরবর্তীকালে তাঁর বোন সেখানে সেই স্থানে লেডি জোয়ান মার্গারেটের উদ্দেশ্যে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করেন। ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার্স গেলে আপনি এখনও সেই স্মৃতিসৌধ চাক্ষুস করতে পারবেন।
ভারতের ওয়ার্ল্ডলাইফ ইনস্টিটিউটের পক্ষ থেকে উদ্ভিবিদ অধ্যাপক চন্দ্রপ্রকাশ কালা ১৯৯৩ সাল থেকে থেকে প্রায় এক দশক ধরে এই উপত্যকার উদ্ভিদবৈচিত্র্য ও সংরক্ষণ নিয়ে গবেষণা করেন। তিনি এই জাতীয় উদ্যানে বেড়ে ওঠা ৫২০টি অ্যালপাইন উদ্ভিদের তালিকা তৈর করেন এবং দুটি গ্রন্থ রচনা করেন- “The Valley of Flowers – Myth and Reality” এবং “Ecology and Conservation of the Valley of Flowers National Park, Garhwal Himalaya”।
ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার্স যাওয়ার পথ
এ তো গেল ইতিহাসের কথা। তবে কীভাবে যাবেন ভ্য়ালি অফ ফ্লাওয়ার্স? যে কোনও নিকটবর্তী স্টেশন থেকে চলে যান হরিদ্বার। হরিদ্বারে সেদিন বিশ্রাম নিন, সন্ধ্যার দিকে হরিদ্বারের বাসস্ট্যান্ড থেকে বাসের সময় জেনে নিতে পারেন। পরের দিন ভোরবেলা হরিদ্বার থেকে বদ্রীনাথ যাওয়ার বাসে গোবিন্দঘাট নামুন। সেদিন রাতে গোবিন্দঘাটের গুরুদ্বারাতেই আপনাকে রাত কাটাতে হবে। যদিও সেখানে থাকার জন্য বেশ কিছু হোটেল রয়েছে। গুরুদ্বারার ঠিক পাশ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে অলকানন্দা। গুরুদ্বারায় জনপ্রতি ৫০০ টাকা মূল্যে আপনি থাকতে পারবেন। সেখানে লঙ্গরে খাওয়ার খেতে পারবেন। যেহেতু জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার্স খোলা থাকে। বর্ষার সময় হওয়ায় পাহাড়ি নদীর খরস্রোতা রূপই ধরা দেবে আপনার কাছে। শান্ত নদী হিসেবে পরিচিত অলকানন্দার এ রূপ ভয়াল। রাতে গুরুদ্বারা থেকে শুনতে পাবেন অলকানন্দার গগনচুম্বী গর্জন।

বেশিরভাগ মানুষ সাধারণত গোবিন্দঘাট থেকে ট্রেক করে ঘাংগারিয়া যেতে পারেন। গোবিন্দঘাট থেকে পুলনা পর্যন্ত গাড়ি চলাচল করে। আপনারা ট্রেক করতে না চাইলে গাড়ি করে পুলনা গেলেন। গোবিন্দঘাট ও ঘাংঘারিয়ার মাঝপথে পুলনা হল প্রথম গ্রাম। গোবিন্দঘাট সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৫৫০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত, আর ঘাংঘারিয়া রয়েছে প্রায় ১০,২০০ ফুট উচ্চতায়। যারা ট্রেকিং করবেন না তারা পুলনা থেকে পিঠ্ঠু (ওখানকার স্থানীয় কিছু ছেলে না নেপালি ছেলেরা পিঠে একটা ঝুরিতে মানুষ নিয়ে যান) অথবা খচ্চরের পিঠে চড়ে যেতে পারেন। এছাড়া গোবিন্দঘাট থেকে ঘাংঘারিয়া পর্যন্ত হেলিকপ্টার পরিষেবাও উপলব্ধ। গোবিন্দঘাট থেকে ঘাংঘারিয়া পর্যন্ত এই ট্রেকের মোট দূরত্ব প্রায় ১৪ কিলোমিটার। ট্রেকিং করে ঘাংগারিয়া পৌঁছতে ৭-৮ঘণ্টা সময় লাগবে। আপনারা ঘাংগারিয়া পৌঁছে ওখানে বেশ কিছু হোটেল রয়েছে সেখানে রাত্রিযাপন করতে পারেন। হোটেলে রুম ভাড়া ১৫০০-২০০০ এর মধ্যে। তবে ঘাংগারিয়া গুরুদ্বারেও রাত্রিযাপন করতে পারেন, সেখানে একদ্নের জন্য জনপ্রতি ৫০০ টাকা পড়বে। ঘাংগারিয়ার বেশ কিছু খাওয়ার দোকানও রয়েছে। তবে ঘাংগারিয়া গুরুদ্বারের খাবারও আপনি খেতে পারেন।
পরের দিন সকালে ঘাংগারিয়া থেকে ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার্সের উদ্দেশ্যে ট্রেক। ফ্যালি অফ ফ্লাওয়ার্স প্রবেশ মূল্য ২০০ টাকা, প্রবেশদ্বারের আগে ছোট্ট কাউন্টার সেখান থেকে টিকিট কেটে নিতে হবে। বিকেল ৫টার মধ্যে বন্ধ হয়ে যায় ভ্যালি, সকালে সেইমতো আপনাকে তৈরি হতে হবে। ঘাংগারিয়া থেকে ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার্সের দূরত্ব প্রায় ৫-৬ কিলোমিটার।
ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার্স অর্থাৎ ফুলের উপত্যকা, প্রবেশদ্বার থেকে জঙ্গল পেরিয়ে দেখবেন একটি নদী মাটি ভেদ করে বয়ে চলেছে, নাম পুষ্পবতী তবে নামের সঙ্গের এই নদীর কোনও মিল নেই। রাগে ফুঁসছে। নদী পেরিয়ে কিছুটা উঠতেই, চলার পথে পাশ দিয়ে চড়া খাড়াই যেখান থেকে পড়ে গেলে ঠিক কোথায় যাওয়া যায় তা কারোর জানা নেই। গোটা রাস্তায় কখনও নাম না জানা নদী পেরোতে হবে। কখনও দুপাশে সারি সারি ফুলের মাঝখান দিয়ে রাস্তা পেরিয়ে যেতে হবে। যেদিকে তাকাবেন সেদিকেই গগনচুম্বী পাহাড়। আকাশে পেঁজা পেঁজা তুলোর মতো মেঘ জড়ো হয়ে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। চলার পথে কখনও সূর্য ওই মেঘের আড়াল থেকে লুকোচুরি খেলবে।
ফুল দেখে ভুলে থাকি………………
ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার্স ন্যাশনাল পার্কে প্রায় ৭০০ প্রজাতির ফুল ফোটে। বছরের কয়েকসপ্তাহেই ঝরে যায় ফুল। জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সমস্ত ভ্যালি লাখ লাখ কোটি কোটি ফুলে ভরে যায়।এই সৌন্দর্য্য পৃথিবীর কোথাও খুঁজে পাবে না কেউ। এখানে Blue Poppy, Doggy face flowers, Thyme, Cheerful Senecio, Cinquefoil, Cosmos flaunts, Wild Rose, Cobra Lily, Brahma Kamal, Lax Willowherb, Bog Star, Inula Grandiflora Grey stem spirea, Himalayan knotweed, Erigeron ইত্যাদি হাজার হাজার ফুল দেখতে পাওয়া যায় ভ্যালিতে। সেই ফুলের মধু খেতে উড়ে বেড়াচ্ছে শয়ে শয়ে মৌমাছি আর প্রজাপতি।Raise Your Concern About this Content

হেমকুণ্ড সাহিব- বিশ্বের সর্বোচ্চ গুরুদ্বারা
ঘাংগারিয়া থেকে যাওয়া যায় বিশ্বের সর্বোচ্চ গুরুদ্বারা হেমকুণ্ড সাহিব। উত্তরাখণ্ডের গাড়ওয়াল হিমালয়ে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৪,৩২৯ মিটার (১৪,২০০ ফুট) উচ্চতায় অবস্থিত হেমকুণ্ড সাহিব শিখদের পবিত্র তীর্থস্থান। ঘাংগারিয়া থেকে হেমকুণ্ড সাহিবের দূরত্ব প্রায় ৬-৭ কিলোমিটার। ঘাংঘাড়িয়া গুরুদ্বারা পেরিয়ে একটু যেতে বাঁদিকের রাস্তা ধরলে পৌঁছে যাবেন ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার্স এবং ডানদিকে যে রাস্তা উঠে গিয়েছে সেটা যাচ্ছে হেমকুণ্ড সাহিব। সাধারণত ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার্স বা হেমকুন্ড যেতে গাইড লাগে না আপনারা গ্রুপ বা সোলো ট্রিপেই যেতে পারেন।হেমকুণ্ড যাওয়ার পথে পাহাড়ের গায়ে সারি সারি ব্রহ্মকমল ফুটে থাকে যা দেখে অপার্থিব বলে মনে হয়।

দু’দিনের জীবনের কর্মব্যস্ততায় যখন হাঁসফাঁস করবে তখন এই সব যান্ত্রিকতা থেকে দূরে বহু দূরে শান্তি খুঁজতে আপনি পাহাড়ি পথে হারিয়ে যেতে চাইলে আপনার গন্তব্য অবশ্যই হওয়া উচিত ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার্স বা হেমকুন্ড সাহিব। এই চলার পথে আপনার সঙ্গী হবে পাহাড়ি নদী অলকানন্দা-পুষ্পবতী, আবার কখনও সাথ দেবে ব্রক্ষকমল। আপনাকে রক্ষা করবে গগনচুম্বী পাহাড়কূল। আপনি সেখান থেকে ফিরে আসবেন ব্যস্ত শহরে। কিন্তু আপনার মন পড়ে থাকবে সেই ফুলের বনে। জেনে রাখুন জিন্দেগি বড়ি হোনি চাহিয়ে, লম্বি নেহি।





