Homeভ্রমণস্পিতি-এককথায় ভয়ঙ্কর সুন্দর………

স্পিতি-এককথায় ভয়ঙ্কর সুন্দর………

This entry is part 1 of 1 in the series SPITI VALLEY

SPITI VALLEY

স্পিতি-এককথায় ভয়ঙ্কর সুন্দর………

কেউ বলে মুন ল্যান্ড, কেউ বলে স্পিতি…তবে যেখানে গেলে একটাই শব্দ মুখ থেকে বেরোয় তা হল ভয়ঙ্কর সুন্দর। ভয়ঙ্কর আর সুন্দর দুটো বিপরীতার্থক শব্দ কিন্তু স্পিতি এই দুটোর অর্থই বহন করে।

কল্পা পেরনোর পর যে রাস্তা ধরে গাড়ি আস্তেআস্তে স্পিতির উদ্দেশ্যে এগোয় ,চোখে না দেখলে সেই রাস্তার ভয়াবহতা বর্ণণা করা প্রায় অসম্ভব। আবার সেই রাস্তার সৌন্দর্য্য প্রকাশ করার মতো ভাষাও শব্দভাণ্ডারে আছে বলে আমার জানা নেই। সুবিশাল পাথর কেটে রাস্তা তৈরি হয়েছে, তার ঠিক গা ঘেষে 

চলে যাচ্ছে সর্পিল রাস্তা, আরেকপাশে চড়া খাড়াই। যেদিকে চোখ যাবে সেদিকেই পাহাড়, কোথাও পাহাড়ের রঙ হালকা সবুজ, কোথাও পাহাড়ের রঙ হালকা বাদামি, কোথাও বা পাহাড় পাথুড়ে রঙের। আবার কোথাও দৃশ্যপটে  প্রত্যেক রূপের পাহাড় চোখে ধরা দেয়। মাঝে মাঝে উঁকি দেবে বরফে মোড়া বিশাল পাহাড়। স্পিতি যাওয়ার গোটা রাস্তাই ক্ষণে ক্ষণে বদলে যায় পুরো ল্যান্ডস্কেপ। সঙ্গে বদলে যায় আকাশের রূপ।

হিমালয়ের মাঝে একফালি প্রিয় ‘স্পিতি’

ফটো- বিশ্বয়নী দত্ত

কীভাবে যাবেন স্পিতি উপত্যকা?

হাওড়া বা শালিমার থেকে চণ্ডীগড়, চণ্ডীগড় থেকে স্করপিও বা সেডান বা ট্রাভেলার নিয়ে শিমলা হয়ে নারকান্ডা।নারকান্দা থেকে সারাহান, সারাহান থেকে সাংলা, সাংলা থেকে কল্পা, কল্পা থেকেই শুরু হয় স্পিতি ভ্যালির রাস্তা। গাড়ি ভাড়া দিন প্রতি ৬ হাজার থেকে ৭ হাজার টাকা, ট্রাভেলারের ক্ষেত্রে প্রায় ১২০০০টাকা পড়ে। নারকান্দা, সারাহান, সাংলা, কল্পা প্রত্যেক জায়গায় একদিন করে থাকা বাধ্যতামূলক। কারণ মানবদেহে আবহাওয়া পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার জন্য কিছু সময় প্রয়োজন। প্রত্যেক জায়গায় রাত্রিবাস করে আপনাদের শরীরকেও সময় দেওয়া হয় ওই জায়গার আবহাওয়া ও পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার জন্য। 

সারাহান-ভীমাকালি মন্দির ৫১ শক্তিপীঠের অন্যতম

প্রথম দিন চণ্ডীগড় থেকে শিমলা-কুফরি হয়ে চলে যান সারাহান। শিমলা থেকে প্রায় ১৮০ কিমি দূরে অবস্থিত সারাহান। সারাহানে ভীমাকালি মন্দির রয়েছে যা ৫১ শক্তিপীঠের অন্যতম। পুরাণ মতে এই স্থানে

দেবী দূর্গার বাম কান পড়েছিল। এটি প্রায় ৮০০ বছরের পুরনো মন্দির। দেবী দূর্গা স্থানীয়দের কাছে ভীমাকালী রূপে পূজিত হন।  দেবী ভীমাকালী প্রাক্তন বুশাহর রাজ্যের শাসকদের কুলদেবী ছিলেন। হিমাচল প্রদেশে এই মন্দিরটি একটি জনপ্রিয় তীর্থস্থান। ১৯২০-এর দশকে রাজা পদম সিং মন্দিরটির পুনর্নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

ভীমাকালি মন্দিরের বাইরের ফটক । ফটো – বিশ্বয়নী দত্ত

১৯০৫ সালের কাংড়া ভূমিকম্পের সময় মন্দিরের প্রধান স্থাপত্যটি কিছুটা হেলে পড়েছিল, কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে পরবর্তী কম্পনের পর তা আবার সোজা হয়ে যায়। এই মন্দির রানউইন গ্রাম পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার দীর্ঘ একটি পরিত্যক্ত গোপন সুড়ঙ্গের সঙ্গে যুক্ত। বরফ পড়লে যেহেতু যাতায়াত করতে অসুবিধা হত তাই প্রাচীনকালে পুরোহিতরা এই গোপন পথ ব্যবহার করে মন্দিরে যাতায়াত করতেন।

মন্দিরটি তার অনন্য স্থাপত্য, ধর্মীয় গুরুত্ব এবং হিমালয়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য বিখ্যাত। মন্দিরটির স্থাপত্য হিমালীয় ধাঁচের, যেখানে মন্দির নির্মাণে কাঠ ও পাথরের যুগ্ম ব্যবহার চোখে পড়ার মতো। উপরের তলায় দেবী ভীমাকালীর মূর্তি রয়েছে। আর নীচের তলায় তাঁর প্রাচীন রূপের মূর্তিতে পূজা করা হয়।  মন্দির প্রাঙ্গণে আরও বিভিন্ন দেবদেবীর মন্দির রয়েছে, যেমন রঘুনাথজি, নরসিংহ, গণেশ প্রভৃতি।

অন্য লোককথা অনুযায়ী,  ভীম নামক এক অসুরকে বধ করেন দেবী দূর্গা। তাই ভীমাকালী রূপে এই মন্দিরে পূজিত হন দেবী। মূল মন্দিরে ক্য়ামেরা বা মোবাইল ফোন নিয়ে প্রবেশ নিষেধ। মন্দিরের বাইরে কাউন্টারে জমা দিতে হয় মোবাইল বা ক্যামেরা। খালি পায়েই মন্দির প্রবেশ করা বাধ্যতামূলক, জুতো বা মোজা পরে থাকলে সেগুলো খুলে প্রবেশ করতে হয়। স্থানীয় নিয়ম অনুযায়ী মহিলা বা পুরুষ উভয়কেই হিমাচলী টুপি বা মাথা ঢেকে মন্দির প্রবেশ করতে হয়। 

সারাহানে মন্দিরের আশেপাশে হোটেল শ্রীখণ্ড, স্নো ভিউ-র মতো বেশ কিছু হোটেল রয়েছে, ১২০০ থেকে ২০০০-এর মধ্যে রুম ভাড়া পড়বে। সেখানে করবেন রাত্রিবাস। সকালে পায়ে হেঁটে ঘুরে দেখুন মন্দির। Raise Your Concern About this Content

মন্দিরের ঠিক বিপরীত দিকে একটা রাস্তা চলে যাচ্ছে, সেই রাস্তায় ৫ মিনিট হাঁটলেই দেখতে পারেন সারাহান রাজবাড়ি রয়্যাল প্যালেস। যদিও রাজবাড়িতে সাধারণের অনুপ্রবেশ নিষেধ। হিমালীয় ধাঁচের ও নকশা দেখতে রাজবাড়িটি চোখে দেখা আবশ্যক। নাই বা ঢুকতে পারেন। বাইরে থেকে দেখেও তো চক্ষু-কর্ণের বিবাদভঞ্জন করা যায় নাকি।  রাজবাড়ি যাওয়ার রাস্তায় সারি সারি আপেল গাছ, থোকা থোকা আপেল ঝুলছে । জুনের দিকে গেলে সেই আপেল পুরো সবুজ হয়ে গাছ থেকে ঝুলতে দেখবেন। 

তারান্ডা দেবীর মন্দির । ফটো- বিশ্বয়নী দত্ত

কিন্নর গেট ও তারান্ডা দেবীর মন্দির 

পরের দিনের গন্তব্য সাংলা। সাংলা যাওয়ার রাস্তায় আপনারা দেখতে পাবেন সেই বিখ্যাত কিন্নর গেট।  পাথর কেটে বানানো সেই রাস্তা দিয়ে গাড়ি চলাচল দেখলে এখনও অবিশ্বাস্য বলে মনে হয়। যাওয়ার রাস্তায় একটা নাম জানা পাহাড়ি ঝর্ণা দেখা মিলবে। জলের তোড় এত বেশি, ঝর্ণার জল যেখানে পড়ছে ঠিক সেখানে দেখা মিলতে পারে সাতরঙা রামধনুর। কিন্নর গেট পেরিয়ে কিছুটা পথ যাওয়ার পর দর্শন করে নেবেন তারান্ডা দেবীর মন্দির।  

হিমাচল প্রদেশের কিন্নর জেলার নিগুলসারি এলাকায়, NH-5 সড়কের একেবারে খাদ ঘেষে মা তারান্ডা দেবীর একটি মন্দির রয়েছে। কিন্নরের দিকে যাওয়া এবং কিন্নরের দিক থেকে ফেরা প্রায় সব যানবাহনই এই মন্দিরে থামে। স্থানীয়দের বিশ্বাস, এই দুর্গম ও বিপজ্জনক পাহাড়ি রাস্তায় মা তারান্ডা দেবী সবাইকে রক্ষা করেন। গ্রামের মানুষদের কাছ থেকে এই এলাকায় ঘটে যাওয়া বহু দুর্ঘটনার গল্প শোনা যায়। তাই নিয়ম মেনেই এখানে থেমে প্রার্থনা করার প্রচলন রয়েছে।

১৯৬২ সালের ভারত-চীন যুদ্ধের পর, সীমান্তে সহজে অস্ত্র ও সরঞ্জাম পৌঁছে দেওয়ার জন্য সেনাবাহিনী এই অঞ্চলে একটি রাস্তা নির্মাণের পরিকল্পনা করে। ১৯৬৩ সালে সেনাবাহিনীর BRO-র গ্রাফ উইং এখানে রাস্তা নির্মাণ শুরু করে। কিন্তু নির্মাণকাজ চলাকালীন প্রায় প্রতিদিনই পাথর ধসে কোনও না কোনও শ্রমিকের মৃত্যু হত। এতে সেনাবাহিনী খুবই চিন্তিত হয়ে পড়ে। পরে তারান্ডা গ্রামের মানুষরা সেনাবাহিনীকে গ্রামের মা চন্দ্রলেখা দেবীর মন্দিরে যাওয়ার পরামর্শ দেয়। ওই মন্দিরের পুরোহিত যেখানে রাস্তা তৈরি করা হচ্ছে, সেখানে দেবীকে প্রতিষ্ঠা করতে বলেন । পুরোহিতের কথা মতো সেনাবাহিনী সেখানে একটি মন্দির নির্মাণ করে এবং তারান্ডা গ্রাম থেকে দেবীর মূর্তি এনে প্রতিষ্ঠা করে। ১৯৬৫ সালে মন্দির নির্মাণ সম্পন্ন হওয়ার পর রাস্তার কাজও শেষ হয় এবং এরপর আর কোনও দুর্ঘটনা ঘটেনি। তখন থেকেই বিশ্বাস করা হয়, যে কেউ এই মন্দিরে মাথা নত করে প্রার্থনা করে, তার কোনো অমঙ্গল হয় না।

নিগুলসারির তারান্ডা গ্রামে এখনও দেবী চন্দ্রলেখার রথ সংরক্ষিত রয়েছে। এখানে দেবীর একটি প্রাচীন মন্দিরও আছে। উৎসবের সময় দেবীর রথযাত্রা হয় এবং বিশ্বাস করা হয়, এতে এলাকার মানুষের দুঃখ-কষ্ট দূর হয়। মন্দিরের দর্শন সেরে পরের গন্তব্য কারছাম ড্যাম। বাসপা নদীর উপর এই ড্যাম অবস্থিত। বাসপা নদীর উপর জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র রয়েছে। চারিদিকে সৌন্দর্য্য নৈস্বর্গীক। বাসপা নদী পেরিয়ে আমাদের পরের গন্তব্য সাংলার কামরু ফোর্ট।  

কামরু ফোর্ট- সাংলা

কামরু হল ভারতের হিমাচল প্রদেশ-এর কিন্নর জেলার সাংলা উপত্যকায় অবস্থিত একটি গ্রাম। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২,৯০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত এই গ্রামটি পর্যটন কেন্দ্র সাংলা থেকে প্রায় ২ কিলোমিটার দূরে, কিন্নর কৈলাশ পর্বতের পাদদেশে অবস্থিত।

পাণ্ডবদের নির্মিত কামরু ফোর্ট, হাজার হাজার বছর ধরে গল্প বলা ইতিহাস | ফটো- বিশ্বয়নী দত্ত




কামরু গ্রামটি প্রাচীন বুশাহর রাজ্যের রাজধানী ছিল। গ্রামের সর্বোচ্চ স্থানে টাওয়ার-আকৃতির কামরু ফোর্ট অবস্থিত। মনে করা হয়, এই দূর্গ  হাজার হাজার বছর আগে পাণ্ডবরা নির্মাণ করেছিলেন। এই দুর্গের ভেতরে প্রায় ৩৩ প্রকার দেবদেবীর অবস্থান রয়েছে বলে লোককথায় উল্লেখ আছে। দুর্গের প্রাঙ্গণে কামাখ্যা দেবীর একটি মন্দিরও রয়েছে। বহু বছর আগে অসম থেকে কামাখ্যা দেবীর মূর্তি এখানে আনা হয়েছিল। কামরু দুর্গটি সাততলা। নিচের দুটি তলা পাথর দিয়ে তৈরি, আর উপরের পাঁচটি তলা সম্পূর্ণ কাঠ দিয়ে নির্মিত। মূল দুর্গের ভেতরে পুরোহিত ছাড়া অন্য কারও প্রবেশের অনুমতি নেই। দুর্গের ভেতরে প্রাক্তন রাজাদের ব্যবহৃত অনেক অস্ত্রশস্ত্র ও সামগ্রী সংরক্ষিত রয়েছে। এই দুর্গে প্রবেশ করতে মহিলা ও পুরুষ উভয়কেই মাথায় হিমাচলী চুপি বা শাল বা ওড়না জাতীয় কাপড় দিয়ে মাথা ঢাকা দিয়ে, জুতো-মোজা খুলে, কোমড়ে দড়ি বেঁধে মন্দিরে প্রবেশ করতে হয়। মন্দির কর্তৃপক্ষের তরফেই ওই টুপি ও কোমড়ে বাঁধার ফিতে দেওয়া হয়। সেদিন রাত্রিবাস সাংলায়। কামরু ফোর্টের কাছাকাছি সাংলা ম্যানশন,  সাংলা রিট্রিট  একাধিক হোটেল রয়েছে, সেখানে থাকতে পারেন। কামরু ফোর্ট থেকে নীচেও নেমে আসতে পারেন সেখানে ভিড় একটু কম। কামরু ফোর্টের নীচের দিকে হোটেল গীতাঞ্জলি রয়েছে সেখানেও রাত্রিবাস করতে পারেন।

বাসপা নদীর তীরে ভারতের শেষ গ্রাম চিটকুল । ফটো- বিশ্বয়নী দত্ত

 

ভারতের শেষ গ্রাম- চিটকুল

সাংলা থেকেই ঘুরে আসতে হবে ভারতের শেষ গ্রাম চিটকুল। ভারত-তিব্বত বর্ডার পুলিশ ফোর্স 2ND BN NAGATI POST, সেনাবাহিনী সুরক্ষিত এলাকায় পারমিট করিয়ে ঘুরে আসুন। চিটকুলের পাহাড়ের পিছনের অঞ্চল হচ্ছে তিব্বত।  চিটকুলের গ্রামের মধ্যে দিয়ে বয়ে চলেছে বাসপা নদী। বাসপা নদীর তীরে অনেকে ক্যাম্প রয়েছে। সেখানে রাত্রিযাপন করা যেতে পারে। জস্টেল চিটকুল বা বাসপা রিভার ক্যাম্পে থাকতে পারেন। ১৫০০ থেকে ৩০০০-এর মধ্যে হোটেল ভাড়া পড়বে। তবে রাতে প্রচন্ড ঠান্ডা পড়ে। তাই চিটকুল ঘুরে কল্পা বা সাংলা রাত্রিবাস করা ভালো। 

গাড়ি- ট্রাভেলর- রানাপ্রতাপ সিং 9805354377 (ওনার কাছ স্করপিও বা সেডানের গাড়িj বুক করার  কন্ট্যাক্ট নম্বরও পেয়ে যেতে পারেন )

চলবে………………

তথ্যসূত্র-

১. উইকিপিডিয়া 
২. নিজস্ব অভিজ্ঞতা

বিশ্বয়নী দত্ত
বিশ্বয়নী দত্ত
কলকাতা বিশ্ববিদ্য়ালয় থেকে জার্নালিজম এবং মাস কমিউনিকেশনে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন। গত কয়েক বছর ধরে জাতীয় প্রতিষ্ঠানে সাংবাদিকতা ও কন্টেট রাইটিং-এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। লেখালেখির প্রতি তাঁর বিশেষ অনুরাগ রয়েছে । ব্যস্ত জীবনের একঘেয়েমি কাটাতে মাঝেমধ্যে পাহাড়ে ঘুরতে যেতে ভালবাসেন।
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

বাংলা ক্যালেন্ডার

- বিজ্ঞাপন -spot_img

Most Popular

Recent Comments