“আষাঢ়ে বৃষ্টি, ভাদ্রে ধান—
কৃষকের মুখে তখন হাসির গান।”
বাংলার লোকজ সংস্কৃতিতে কৃষিকাজকে ঘিরে অসংখ্য উৎসবের জন্ম হয়েছে। প্রকৃতি, ঋতুচক্র, বৃষ্টি আর মাটির সঙ্গে মানুষের যে চিরন্তন সম্পর্ক, তারই এক অনন্য প্রকাশ ‘রোহিন’ বা ‘রোহিনী উৎসব’। এই উৎসবের মধ্যে দিয়ে বীজ বপণের কাজ শুরু হয়। গোটা জঙ্গলমহলজুড়ে এই উৎসব পালিত হয়। পশ্চিমবঙ্গের জঙ্গলমহল অঞ্চল—পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, ঝাড়গ্রাম ও পশ্চিম মেদিনীপুরের গ্রামাঞ্চল এবং সংলগ্ন ঝাড়খণ্ডের বিস্তীর্ণ এলাকায় এই উৎসব আজও সমান আবেগ ও শ্রদ্ধার সঙ্গে পালিত হয়।
কথায় আছে ‘বারো দিনে বারনি, তেরো দিনে রোহিনী’। প্রতিবছরের মত এ-বছর জঙ্গলমহলের আপামর কৃষিজীবী মানুষজ রোহিণী উৎসবের আনন্দে মেতে উঠেছে। জঙ্গলমহলের অত্যন্ত জনপ্রিয় লোকউৎসব এটি। এটি শুধু একটি উৎসব নয়, বরং কৃষকদের আশা, বিশ্বাস, পরিশ্রম ও প্রকৃতিনির্ভর জীবনযাত্রার এক সাংস্কৃতিক দলিল। বছরের নতুন চাষ মরসুমের সূচনা হয় এই উৎসবের মধ্য দিয়ে। বীজ বোনার আগে মাটির কাছে আশীর্বাদ চাওয়ার এই প্রাচীন প্রথা আজও গ্রামীণ সমাজে অটুট।
রোহিন উৎসব কী?
রোহিন বা রোহিনী পরব হল জঙ্গলমহলের একটি ঐতিহ্যবাহী কৃষিভিত্তিক লোকউৎসব। প্রতি বছর বাংলা জ্যৈষ্ঠ মাসের ১৩ তারিখে এই উৎসব পালিত হয়। স্থানীয় ভাষায় একে অনেক সময় ‘বীচ পুহ্না’ বা ‘বীজবপন পরব’ও বলা হয়। এই দিনকে কৃষিকাজের জন্য অত্যন্ত শুভ বলে মনে করা হয়। উৎসবের প্রধান উদ্দেশ্য হল নতুন বছরের কৃষি মরসুমের সূচনা এবং ধানের বীজ বোনার প্রস্তুতি গ্রহণ।
রোহিন নামের উৎস
‘রোহিন’ শব্দটি এসেছে ‘রোহিণী’ নক্ষত্র থেকে। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, জ্যৈষ্ঠ মাসের ১৩ তারিখে রোহিণী নক্ষত্র পৃথিবীর নিকটবর্তী অবস্থানে থাকে। সেই সময় মাটিতে বীজ বপন করলে শস্যের বৃদ্ধি ভালো হয় এবং কৃষিকাজে সাফল্য আসে। বলা যায়, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও লোকবিশ্বাসের মেলবন্ধনে এই উৎসবের নামকরণ হয়েছে বলে মনে করা হয়।
কেন রোহিন উৎসব হয়?
কৃষকের জীবন সম্পূর্ণভাবে প্রকৃতির উপর নির্ভরশীল। বৃষ্টি, উর্বর মাটি এবং সঠিক সময়ে বীজ বপনের উপর নির্ভর করে ফসলের ভবিষ্যৎ। তাই বীজ বোনার আগে কৃষকেরা প্রকৃতি ও ভূমিদেবীর আশীর্বাদ কামনা করেন। তাঁদের বিশ্বাস, এই শুভ দিনে বীজ বপন করলে রোগ-পোকামাকড়ের আক্রমণ কম হয় এবং ফলন ভালো হয়। রোহিন উৎসব তাই একদিকে কৃষি মৌসুমের সূচনা, অন্যদিকে প্রকৃতির প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের অনুষ্ঠান।
কোথায় পালিত হয়?
রোহিন উৎসব প্রধানত পালিত হয় পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, ঝাড়গ্রাম, পশ্চিম মেদিনীপুর এবং সংলগ্ন ঝাড়খণ্ডের বিভিন্ন গ্রামীণ অঞ্চলে। বিশেষত কুড়মি, মাহাতো, সাঁওতালসহ বিভিন্ন কৃষিনির্ভর জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই উৎসবের প্রচলন বেশি দেখা যায়।

উৎসবের ঐতিহাসিক পটভূমি
রোহিন উৎসবের সুনির্দিষ্ট সূচনাকাল সম্পর্কে লিখিত ঐতিহাসিক তথ্য খুব বেশি পাওয়া যায় না। গবেষকদের মতে, এটি বহু শতাব্দী ধরে প্রচলিত একটি লোকায়ত কৃষি উৎসব। আধুনিক কৃষিবিজ্ঞানের বিকাশের বহু আগে কৃষকরা নক্ষত্র, ঋতুচক্র ও প্রকৃতির লক্ষণ পর্যবেক্ষণ করে চাষাবাদের সময় নির্ধারণ করতেন। সেই ঐতিহ্যেরই উত্তরাধিকার বহন করে চলেছে রোহিন উৎসব। লোকসংস্কৃতি গবেষকদের মতে, এটি মূলত আদিবাসী ও গ্রামীণ কৃষিজীবী সমাজের প্রাচীন কৃষি-সংস্কৃতির অংশ।
কৃষির সঙ্গে রোহিন উৎসবের সম্পর্ক
রোহিন উৎসবের কেন্দ্রবিন্দু হল কৃষিকাজ। এই দিন ধানের বীজ বোনার শুভ সূচনা করা হয়। বীজতলা তৈরির প্রস্তুতি নেওয়া হয়। কৃষিজমির উর্বরতা কামনা করা হয়। নতুন ফসলের জন্য আশীর্বাদ চাওয়া হয়। কৃষকদের কাছে এই উৎসব প্রকৃত অর্থেই নতুন কৃষি বর্ষের সূচনার প্রতীক।
উৎসবের আচার-অনুষ্ঠান
রোহিন পরবের নানা আচার-অনুষ্ঠান আজও গ্রামীণ সমাজে প্রচলিত। ভোরবেলায় মহিলারা গোবর দিয়ে উঠোন পরিষ্কার করেন। গোবর-গোলা জলে বিভিন্ন লতাপাতা ডুবিয়ে নকশা বা আলপনা আঁকা হয়। সেই সঙ্গে রয়েছে কিছু নিয়ম। যেমন-
রোহিন মাটি সংগ্রহ
স্নান সেরে ভিজে কাপড়ে মাঠ থেকে ‘রোহিন মাটি’ আনা হয়। এটি হলো বছরের প্রথম লাঙল চালানোর পর তৈরি হওয়া পবিত্র মাটি। সেই মাটি ঘরের চার কোণে এবং তুলসীমঞ্চে রাখা হয়।
বীজবপন
গ্রামের প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, যে পরিবারের আয় বেশি এবং ব্যয় কম, অর্থাৎ অর্থনৈতিকভাবে শুভ অবস্থায় থাকা ব্যক্তি প্রথম বীজ বপন করেন।
রোহিন ফল সংগ্রহ
পুরুষেরা ‘রোহিন ফল’ বা ‘কেলেকড়া’ সংগ্রহ করে আনেন, যা শুভ প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।
এছাড়াও বাড়ির মেয়েরা মুখে কালি, রং মেখে বাদ্য যন্ত্র বাজিয়ে পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে বেড়ায়। তারা পূর্বপুরুষদের আমল থেকে এই উৎসব পালন করে আসছেন। তাই এই উৎসবের বিরাট মাহাত্ম্য রয়েছে জঙ্গলমহল পুরুলিয়া কৃষক পরিবারগুলির মধ্যে। রোহিন উৎসব কেবল কৃষিকাজের অনুষ্ঠান নয়, এটি গ্রামীণ সমাজকে একত্রিত করারও উপলক্ষ। গ্রামের মানুষ একসঙ্গে উৎসবে অংশ নেন। পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন দৃঢ় হয়। লোকবিশ্বাস ও ঐতিহ্য নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে যায়। গ্রামীণ সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা বজায় থাকে। একই সঙ্গে নারী পুরুষ নির্বিশেষে এই দিন শস্য ক্ষেতে প্রথাগত পুজো ছেড়ে বীজ বপন করেন। এই উৎসব গ্রামবাংলার সমবায়ভিত্তিক জীবনধারার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক।

পরিবেশ ও প্রকৃতির সঙ্গে যোগ
রোহিন উৎসব প্রকৃতিনির্ভর জীবনের এক অনন্য উদাহরণ। এই উৎসবের মাধ্যমে মাটির প্রতি শ্রদ্ধা প্রকাশ করা হয়। কৃষিজমির গুরুত্ব স্মরণ করা হয়। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সহাবস্থানের বার্তা দেওয়া হয়।পরিবেশবান্ধব জীবনযাপনের শিক্ষা মেলে। আজকের পরিবেশ সংকটের সময়ে এই উৎসবের তাৎপর্য আরও বেড়ে গেছে।Raise Your Concern About this Content
বর্তমান প্রেক্ষাপটে রোহিন উৎসব
আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির যুগেও জঙ্গলমহলের বহু গ্রামে রোহিন উৎসবের ঐতিহ্য অটুট রয়েছে। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সবকিছুতেই রয়েছে আধুনিকতার ছোঁয়া। কিন্তু তবুও গ্রাম বাংলার এই লোকউৎসব আজও মহা ধুমধামে সঙ্গে পালিত হয় জঙ্গলমহলে গ্রামে ,গ্রামে। পুরুলিয়ার কৃষিজীবি মানুষ যুগযুগ ধরে চলে আসা এই রোহিনী উৎসবের মধ্য দিয়ে গ্রাম বাংলার লোকসংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। যদিও যান্ত্রিক কৃষিকাজ, নগরায়ণ এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তনের কারণে কিছু আচার হারিয়ে যাচ্ছে, তবু স্থানীয় মানুষ এখনও এই উৎসবকে নিজেদের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ হিসেবে ধরে রেখেছেন। বর্তমানে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন ও গবেষকও এই লোকউৎসবকে সংরক্ষণ এবং প্রচারের উদ্যোগ নিচ্ছেন। তাই মোবাইল ও ইন্টারনেটের যুগেও ফিকে পড়েনি এই লোকউৎসব। মাদলের বোলে, ঝুমুরের সুরে আর প্রকৃতির আরাধনায় রহিন পরব যেন মনে করিয়ে দেয়, সভ্যতার আসল শিকড় লুকিয়ে আছে এই মাটির বুকেই।
রোহিন উৎসব দেখতে গেলে কোথায় থাকবেন পর্যটকেরা?
রোহিন উৎসব প্রত্যক্ষ করতে চাইলে জঙ্গলমহলের বিভিন্ন এলাকায় থাকা যায়। তারমধ্যে রয়েছে- পুরুলিয়া,অযোধ্যা পাহাড় পর্যটন কেন্দ্র,বাঘমুণ্ডি,বরন্তি, ঝাড়গ্রাম।
ঝাড়গ্রাম
– ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ি পর্যটন কমপ্লেক্স
– ঝাড়গ্রাম শহরের বিভিন্ন হোটেল ও লজ
বাঁকুড়া
– মুকুটমণিপুর পর্যটন কেন্দ্র
– বিষ্ণুপুর শহরের হোটেল
পশ্চিম মেদিনীপুর
– গড়বেতা ও শালবনি সংলগ্ন পর্যটন আবাস
– বেলপাহাড়ি এলাকার হোমস্টে
তবে উৎসব মূলত গ্রামীণ এলাকায় পালিত হয়। তাই স্থানীয় প্রশাসন বা পর্যটন দফতরের সঙ্গে যোগাযোগ করে আগে থেকেই থাকার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা উচিত। বলা যায়, এই উৎসব দেখার জন্য থাকার কোন অসুবিধা নেই।

পরিশেষে বলা যায়, রোহিন উৎসব জঙ্গলমহলের মাটি, মানুষ এবং কৃষিজীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা এক অমূল্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। কৃষি কাজের জন্য কৃষকেরা এই উৎসব পালন করে থাকেন। এই পরব মূলত কৃষি কাজের উপর নির্ভরশীল মানুষরাই করে থাকেন। এই দিন মা মনসার আরাধনা করা হয়। এই উৎসবে যদি বৃষ্টি হয় তাহলে ভীষণই শুভ বলে মনে করা হয়। আধুনিকতার প্রবল স্রোতের মধ্যেও এই উৎসব মনে করিয়ে দেয়—মানুষের অস্তিত্বের শিকড় আসলে মাটির গভীরেই প্রোথিত। বীজ বোনার সেই প্রাচীন মুহূর্তে কৃষকের যে প্রার্থনা ধ্বনিত হয়, তা শুধু ভালো ফসলের জন্য নয় প্রকৃতি ও মানুষের চিরন্তন সহাবস্থানেরও এক নিঃশব্দ অঙ্গীকার। রোহিন পরব শুধু একটি উৎসব নয়, এ আমাদের মাটি, মানুষ আর সংস্কৃতির এক সুন্দর মিলন। বাংলার গ্রাম, আদিবাসী সমাজের ঐতিহ্য, তাদের গান, নাচ আর আনন্দের মধ্যে লুকিয়ে আছে আমাদের নিজের শিকড়ের গল্প। তাই আজও গ্রাম বাংলায় পালিত হয়ে থাকে রোহিন উৎসব।
তথ্যসূত্র
১. পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি প্রকাশিত লোকসংস্কৃতি বিষয়ক গ্রন্থ ও প্রবন্ধ।
২. লোকসংস্কৃতি ও আদিবাসী সংস্কৃতি কেন্দ্র-এর প্রকাশনা ও গবেষণাপত্র।
৩. পশ্চিমবঙ্গের লোকউৎসব এবং জঙ্গলমহলের লোকঐতিহ্য সম্পর্কিত গবেষণা।
৪. পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, ঝাড়গ্রাম ও পশ্চিম মেদিনীপুর অঞ্চলের প্রচলিত লোকবিশ্বাস, কৃষি-সংস্কৃতি ও মাঠসমীক্ষাভিত্তিক তথ্য।
৫. স্থানীয় কৃষিজীবী সমাজে প্রচলিত রোহিন পরব সংক্রান্ত মৌখিক ঐতিহ্য ও লোককথা।




