ভারতের মূল ভূখণ্ডের একদম দক্ষিণতম বিন্দুতে অবস্থিত তামিলনাড়ু রাজ্যের বিখ্যাত শহর কন্যাকুমারী। যেখানে মিলিত হয়েছে তিনটি সাগর। ভারতে এমন অনেক জায়গা রয়েছে যা না দেখলেই নয়, যার ইতিহাস না জানলেই নয়, তার মধ্যে কন্যাকুমারী অন্যতম। বাঙালির ভ্রমণের অন্যতম পীঠস্থানও দক্ষিণের এই পর্যটনকেন্দ্র। এই শহরের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে স্বামী বিবেকানন্দের নাম। আপনি যদি সমুদ্র ভালবাসেন, তাহলে এই শহরের নৈসর্গিক সৌন্দর্য্যের সাক্ষী থাকতে দক্ষিণের এই পূণ্যভূমিতে অনায়াসে কাটিয়ে দেওয়া যায় দুই-তিন দিন।
ইংরেজিতে কন্যাকুমারীকে বলা হয় Cape Comorin বা কুমারী অন্তরীপ। দুর্গার কুমারী রূপ অর্থাৎ কন্যাকুমারী, স্থানীয় ভাষায় কুমারী আম্মামের নামানুসারে এই শহরের নামকরণ করা হয়। সঙ্গম যুগ থেকেই কন্যাকুমারী একটি গুরুত্বপূর্ণ জনপদ হিসেবে পরিচিত। প্রাচীন তামিল ও মালয়ালম সাহিত্য, গ্রিক ভূগোলবিদ টলেমি এবং বিখ্যাত পর্যটক মার্কো পোলোর ভ্রমণবৃত্তান্তেও কন্যাকুমারীর উল্লেখ পাওয়া যায়। এই কন্যাকুমারীর ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন বাঙালি তথা ভারতের বীর সন্তান বিবেকানন্দ।
ভারতের দক্ষিণতম বিন্দুতে ধ্যান করেছিলেন স্বয়ং স্বামী বিবেকানন্দ

সাল ১৮৯২ , পরাধীন ভারতের কন্যাকুমারী শহরে উত্তাল সমুদ্র পার হয়ে ধ্যানমগ্ন হয়েছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ। যেখানে আরব সাগর, ভারত মহাসাগর এবং বঙ্গোপসাগর পরস্পরের সঙ্গে মিলিত হয়েছে। এই তিন সাগরের মিলনস্থলেই একটা প্রস্তরখণ্ডের উপর ধ্যানস্থ হয়েছিলেন বাঙালির প্রিয় নরেন।

বর্তমানে যা বিবেকানন্দ রক মেমোরিয়াল নামে পরিচিত। কন্যাকুমারীর মূল ভূখণ্ড থেকে প্রায় ৫০০ মিটার দূরে সমুদ্রের মাঝে অবস্থিত দুটি শিলাখণ্ডের একটির উপর এই স্মৃতিসৌধ নির্মিত হয়েছে। এটি দক্ষিণের রাজ্যে বাঙালির অন্যতম তীর্থস্থান। এই শিলার উপর তিন দিন ও তিন রাত গভীর ধ্যানে নিমগ্ন ছিলেন স্বামীজি। অনেকেই বিশ্বাস করেন, এই স্থানেই ভবিষ্যৎ ভারতের রূপরেখা নিয়ে গভীর চিন্তায় নিমগ্ন হন। স্বামীজির জাতীয় পুনর্জাগরণের ভাবনা আরও সুস্পষ্ট ধারণা পায়। বিবেকানন্দ রক মেমোরিয়াল কন্যাকুমারীর অন্যতম জনপ্রিয় দর্শনীয় স্থান। ১৯৭০ সালে স্বামী বিবেকানন্দের স্মৃতির উদ্দেশ্যে এই স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়।
স্মৃতিসৌধের সঙ্গে একটি ধ্যান মণ্ডপ (ধ্যান মণ্ডপম) রয়েছে, যেখানে দর্শনার্থীরা ধ্যান করতে পারেন। স্থাপত্যশৈলীতে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের মন্দির স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্যের সুন্দর সমন্বয় দেখা যায়। এখানে স্বামী বিবেকানন্দের একটি বিশাল মূর্তিও স্থাপন করা হয়েছে। পুরো স্মৃতিসৌধটি মূলত দুটি অংশ নিয়ে গঠিত, বিবেকানন্দ মণ্ডপম এবং শ্রীপাদ মণ্ডপম। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী শ্রীপাদ মণ্ডপমে রয়েছে দেবী কুমারীর পায়ের ছাপ।
দেবী দুর্গার তপস্যা-পৌরাণিক কাহিনি
এই শিলাখণ্ডকে ঘিরে সাধারণ মানুষের একটি প্রাচীন বিশ্বাসও প্রচলিত রয়েছে। বলা হয়, দেবী কন্যাকুমারী অর্থাৎ পার্বতী ভগবান শিবকে পেতে এই স্থানেই কঠোর তপস্যা করেছিলেন। সেই কারণেও এই শিলা হিন্দুদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র।
হিন্দু পুরাণ অনুসারে, কন্যাকুমারী অঞ্চলের শাসক ছিলেন জন্মসূত্রে রাক্ষস “বানাসুর”। তিনি ছিলেন অত্যন্ত শক্তিশালী রাজা। তিনি কঠোর তপস্যার পর ভগবান ব্রহ্মার কাছ থেকে বর পেয়েছিলেন এক কিশোরীর হাতেই তার মৃত্যু হবে। বর পেয়ে দৈত্যরাজ বানাসুর দেবতাদের উপর নির্মম অত্যাচার করতে লাগল। সমগ্র পৃথিবীতে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে তিনি। এমনকি দেবরাজ ইন্দ্রকেও পরাজিত করে স্বর্গ থেকে বিতাড়িত করে এবং পঞ্চভূতের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে সমগ্র বিশ্বে অরাজকতা ও বিপর্যয় নেমে আসে।
লোককথা অনুসারে, এই বিশৃঙ্খলা দূর করে বিশ্বে পুনরায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সক্ষম ছিলেন একমাত্র ভগবতী। কিশোর বয়সে কুমারীর হৃদয়ে মহাদেব শিবের প্রতি গভীর ভক্তি ছিল। শিবও তাঁকে বিবাহ করার সিদ্ধান্ত নেন। বিবাহের সমস্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন হয় এবং শিব শুচীন্দ্রম থেকে যাত্রা শুরু করেন। বিবাহের শুভ মুহূর্ত নির্ধারিত ছিল ব্রহ্মমুহূর্তে, অর্থাৎ ভোরের আগের পবিত্র সময়ে। শিবের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা করেন কুমারী কিন্তু শিব আর আসেননি। শেষ পর্যন্ত তিনি মনে করেন, শিব তাঁকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। এই অপমান, দুঃখ, বেদনা ও ক্রোধে তিনি চারপাশের সবকিছু ধ্বংস করতে শুরু করেন। বিবাহের জন্য প্রস্তুত করা সমস্ত খাবার ছুড়ে ফেলে দেন এবং নিজের চুড়িগুলি ভেঙে ফেলেন। স্থানীয়দের বিশ্বাস , সেই ছড়িয়ে পড়া খাদ্যকণাগুলিই আজকের কন্যাকুমারীর বহুরঙা বালুর উৎস।পরবর্তীকালে মন শান্ত হলে কুমারী পুনরায় কঠোর তপস্যায় নিমগ্ন হন। বহু যুগ পরে বানাসুর, তাঁর প্রকৃত পরিচয় না জেনে, কুমারীকে প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করেন। এতে দেবী ক্রোধে মুহূর্তের মধ্যেই বানাসুরকে বধ করেন। তাই কুমারী রূপে এখানে দেবী দুর্গাকে পুজো করা হয়।
শক্তিপীঠ- ভগবতী কুমারী অম্মান মন্দির
ভগবতী কুমারী আম্মাম মন্দির হিন্দুধর্মে ভারতের অন্যতম পবিত্র শক্তিপীঠের একটি । বিশ্বাস করা হয়, দেবী সতীর দেহের একটি অংশ এই স্থানেই পতিত হয়েছিল। তামিলনাড়ুর কন্যাকুমারীতে অবস্থিত ভগবতী আম্মাম মন্দির ভারতের মূল ভূখণ্ডের সর্বদক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত। প্রচলিত কিংবদন্তি অনুসারে, পরশুরাম ঋষিই এই মন্দির প্রতিষ্ঠা ও দেবীর প্রাণপ্রতিষ্ঠা সম্পন্ন করেছিলেন।
পশ্চিম দিকের প্রবেশদ্বার দিয়েই মন্দিরে ঢোকে ভক্তরা। বিশেষ কিছু দিনে অবশ্য ভক্তদের জন্য পূর্বদিকের দরজাও খোলা হয়। এখানে তাঁকে নবদুর্গার ষষ্ঠ রূপ কাত্যায়নী হিসেবে পুজো করা হয়। মন্দিরের সমস্ত আচার-অনুষ্ঠান আদি শঙ্করাচার্যের নির্দেশিত শাস্ত্রবিধি অনুসারে পরিচালিত হয়। মন্দিরের অভ্যন্তরে আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দর্শনীয় স্থান রয়েছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য পাতাল গঙ্গা তীর্থ এবং কালভৈরব মন্দির। মন্দিরে পুজো দেওয়ার একটি বিশেষ রীতি রয়েছে। সাধারণত, দক্ষিণ ভারতের সমস্ত মন্দিরেই পুরুষদের গায়ের জামা খুলে মন্দিরে প্রবেশ করতে হয়।
গান্ধী মেমোরিয়াল
যেখানে মহাত্মা গান্ধীর অস্থিভস্ম সমুদ্রে বিসর্জনের আগে জনসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য রাখা হয়েছিল, সেখানেই গান্ধী মণ্ডপম (মেমোরিয়াল) নির্মিত হয়েছে। মন্দির, মসজিদ ও গির্জার আদলে এই স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়েছে।

কামারাজার মণি মণ্ডপম
কামারাজার মণি মণ্ডপম নির্মিত হয়েছে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামী, তামিলনাড়ুর প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী এবং ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রাক্তন সভাপতি কে. কামারাজারের স্মৃতির উদ্দেশ্যে।এই স্মৃতিসৌধটিও সেই স্থানে নির্মিত হয়েছে, যেখানে তাঁর অস্থিভস্ম সমুদ্রে বিসর্জনের আগে সাধারণ মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য রাখা হয়েছিল। গান্ধী মেমোরিয়াল মণ্ডপমের মতোই এই স্মৃতিসৌধও কন্যাকুমারীর ইতিহাস ও ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।
তিরুভল্লুভর মূর্তি
তিরুভল্লুভর মূর্তি তামিল সাহিত্যের প্রখ্যাত কবি, দার্শনিক এবং ‘তিরুক্কুরাল’-এর রচয়িতা সন্ত তিরুভল্লুভরের স্মৃতির উদ্দেশ্যে নির্মিত এক বিশাল ভাস্কর্য যা তামিল সাহিত্য ও সংস্কৃতির গৌরবের প্রতীক।
প্রায় ৪০.৬ মিটার উচ্চতার এই মূর্তিটি ভারতের তামিলনাড়ুর কন্যাকুমারী শহরের উপকূলের কাছে বিবেকানন্দ মেমোরিয়ালের পাশেই একটি ছোট দ্বীপের ওপর নির্মিত।
মূর্তিটি নির্মাণ করেন ভারতের খ্যাতনামা ভাস্কর ভি. গণপতি স্থপতি । ১ জানুয়ারি, ২০০০ সালে তৎকালীন তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী এম. করুণানিধি এই স্মৃতিস্তম্ভের উদ্বোধন করেন।
তিন সাগরের মিলনস্থল

বঙ্গোপসাগর, আরব সাগর এবং ভারত মহাসাগরের মিলনস্থল। কন্যাকুমারীর সানসেট ভিউ পয়েন্ট থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের অপূর্ব দৃশ্য উফভোগ করতে দেশ-বিদেশ থেকে মানুষ এখানে জড়ো হন।
কীভাবে যাবেন কন্যাকুমারী?
কলকাতা থেকে সরাসরি কন্যাকুমারী যাওয়ার জন্য নির্দিষ্ট সাপ্তাহিক ট্রেন রয়েছে। আকাশপথে
ত্রিবান্দ্রমে গিয়ে সেখান থেকেও প্রায় ৯০ কিমি দূরে অবস্থিত কন্যাকুমারীতে যাওয়া যায়।
চেন্নাই থেকেও ট্রেনে এবং বাসে চেপেও পৌঁছানো যায় এই শহরে।

কোথায় থাকবেন?
শান্ত পরিবেশে থাকতে অনেক পর্যটকরা বিবেকানন্দ কেন্দ্রকেই থাকার জন্য বেছে নেন। থাকার জায়গার পাশে ওদের নিজস্ব একটি ক্যান্টিন রয়েছে সেখানেই আপনারা খাওয়া দাওয়া করতে পারেন। ওদের বিনামূল্যে বাসের পরিষেবাও রয়েছে। বিবেকানন্দ কেন্দ্রের ক্যাম্পাস থেকে আপনাদের নির্দিষ্ট স্থানে নামিয়ে দেবেন, সেখান থেকেই পায়ে হেঁটে , কুমারী আম্মাম মন্দির, গান্ধী মণ্ডপম, কামারাজার মণি মণ্ডপম ঘুরে নিতে পারবেন। বিবেকানন্দ মেমোরিয়াল ও তিরুভল্লুভর মূর্তি দর্শনের জন্য আপনাদের ফেরি পরিষেবা নিতে হবে। বাস যেখানে নামায় সেখান থেকেই হেঁটে ফেরিঘাটে যেতে পারবেন। তবে ফেরিঘাটে খুব ভিড় হয় এবং লাইন পড়ে। বিশেষ টিকিটেরও ব্যবস্থা রয়েছে যেখানে লাইন দিতে হবে না কিন্তু অনেক মানুষ যেহেতু সেই অপশন বেছে নেন সেক্ষেত্রেও প্রচুর মানুষের ভিড় থাকে।ফেরির ভাড়া সময়ে সময়ে পরিবর্তিত হতে পারে। ভ্রমণের আগে সর্বশেষ তথ্য যাচাই করে নেওয়া ভালো।Raise Your Concern About this Content
বিস্তারিত তথ্য ও বুকিং: https://www.vrmvk.org/accommodations
উপসংহার
ভারতের ঐতিহ্য, দর্শন এবং প্রকৃতির মনোমুগ্ধকর দৃশ্যকে হৃদয় দিয়ে অনুভব করতে জীবনে একবার অন্তত কন্যাকুমারী যেতে হবে। ভারতের মূল ভূখণ্ডের সর্বদক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত, আরব সাগর, বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরের মিলনস্থল কন্যাকুমারী।
তথ্যসূত্র
১. নিজস্ব অভিজ্ঞতা
২. কন্যাকুমারী
৩. দেবী কন্যাকুমারী
৪. এই সময়
৫. তিরুবল্লুবর মূর্তি



