FIFA WORLD CUP 2026
ফুটবলের ইতিহাসে ভারতের জন্য সবচেয়ে বড় ঘটনা কী জানেন? ঘটনাটি কোনও জয় বা পরাজয়ের নয়। ঘটনাটি এমন এক টুর্নামেন্টকে ঘিরে, যেখানে খেলার সুযোগ পেয়েও শেষ পর্যন্ত মাঠে নামেনি ভারত। সালটা ১৯৫০। অর্থাৎ আজ থেকে সাত দশকেরও বেশি সময় আগে ব্রাজিলের মাটিতে বসেছিল ফিফা বিশ্বকাপের আসর। বিশ্বকাপে অংশ নিয়ে বিশ্বের দরবারে ভারতকে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হয়েছিল। ড্র-তে নিশ্চিত হয়েছিল ভারতের স্থান। আর উল্টোদিকে প্রতিপক্ষ হিসেবে অপেক্ষা করছিল ইতালি, সুইডেন ও প্যারাগুয়ে। কিন্তু টুর্নামেন্ট শুরুর আগে এক সিদ্ধান্তে নাম প্রত্যাহার করে নেয় ভারত। এই বিষয়কে ঘিরে এখনও রহস্য রয়েছে।
ভারতীয় ক্রীড়া ইতিহাসের অন্যতম ধোঁয়াশাপূর্ণ অধ্যায়:
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে ১৯৪২ এবং ১৯৪৬ সালের বিশ্বের দরবারে ফুটবলের এই টুর্নামেন্টের আসর বাতিল ছিল। তারপর দীর্ঘ ১২ বছর পর ১৯৫০ সালে বসেছিল বিশ্বকাপের এই আসর। ব্রাজিলের সেই টুর্নামেন্টে বাছাইপর্বে অংশ নিয়েছিল ৩৩টি দেশ। ভারতের গ্রুপে ছিল বার্মা (বর্তমান মায়ানমার) এবং ফিলিপাইন। কিন্তু খেলা শুরু হওয়ার আগেই এই দুই দেশ নাম প্রত্যাহার করে নেয়, কোনও ম্যাচ না খেলেই ভারত সরাসরি মূল পর্বে খেলার সুযোগ পেয়ে যায়। কিন্তু হয়তো খেলাটা ভারতের কপালে ছিল না। ইতিহাসে প্রথম এবং এখন পর্যন্ত একমাত্রবারের মতো বিশ্বকাপের মূলপর্বে খেলার সুযোগ পেয়েছিল ভারত। চূড়ান্ত ড্র-তে ৩ নম্বর গ্রুপে সুইডেন, ইতালি ও প্যারাগুয়ের পাশে জ্বলজ্বল করছিল ভারতের নাম।
বিশ্বমঞ্চে তখন ভারতের উজ্জ্বল নাম:
আজকের মতো আন্তর্জাতিক পরিচিতি না থাকলেও, তৎকালীন ভারতীয় ফুটবলের আক্রমণাত্মক শৈলী ও ড্রিবলিং দক্ষতা বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত ছিল। ১৯৪৮ সালের লন্ডন অলিম্পিকে ফ্রান্সের মতো শক্তিশালী দলের বিরুদ্ধে ভারত যেভাবে চোখে চোখ রেখে লড়াই করেছিল (২-১ ব্যবধানে হার), তা বিশ্ব ফুটবল মহলের নজর কেড়েছিল। আহমেদ খান, কে.কে. দাস, তাজ মহম্মদ, শৈলেন মান্না, এস. রমন, এম. এ. সাত্তার কিংবা এস. মেওয়ালালের মতো ফুটবলাররা তখন অতি জনপ্রিয়। লন্ডন অলিম্পিকের সেই আসরে ভারতীয় দলের খালি পায়ে খেলার দৃশ্যটি ফুটবল রোমান্টিকদের মনে আজও দাগ কেটে আছে। ফুল-ব্যাক তাজ মহম্মদ বুট পরে খেললেও, অধিকাংশ ফুটবলারই খালি পায়ে খেলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন।

কেন নাম প্রত্যাহার করেছিল ভারত?
ঠিক কী কারণে সেবার ভারত ব্রাজিল যায়নি, তার কোনো একক বা স্পষ্ট ব্যাখ্যা আজও পাওয়া যায় না। অল ইন্ডিয়া ফুটবল ফেডারেশন (AIFF) সে সময় দল নির্বাচন নিয়ে মতবিরোধ এবং অপর্যাপ্ত প্রস্তুতির অজুহাত দিয়েছিল। সেই সময় নাম প্রত্যাহারের বিষয়ে AIFF উল্লেখ করছিল, অপর্যাপ্ত প্রস্তুতি, পর্যাপ্ত অনুশীলনের অভাব এবং অলিম্পিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার মতো কথা।
তবে বছরের পর বছর ধরে অনেকেই একটি ভ্রান্ত ধারনা পোষণ করে চলেছে। তা হল, ফিফা ভারতীয় ফুটবলারদের খালি পায়ে খেলতে দিতে রাজি হয়নি। কিন্তু আধুনিক ফুটবল ঐতিহাসিক ও গবেষকেরা এই ‘খালি পা’-এর তত্ত্বকে সম্পূর্ণ নাকচ করে দিয়েছেন।
প্রখ্যাত ক্রীড়া সাংবাদিক নোভি কাপাদিয়া এবং জয়দীপ বসু তাঁদের গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, ফিফার পক্ষ থেকে খালি পায়ে খেলা নিয়ে কোনও নিষেধাজ্ঞা ছিল না। জয়দীপ বসুর ‘বক্স টু বক্স: ৭৫ ইয়ার্স অব দ্য ইন্ডিয়ান ফুটবল টিম’ বই অনুসারে, অলিম্পিক দলের ফুটবলারদের কিটব্যাগে বুট ছিল এবং তাঁরা নিজেদের পছন্দমতো তা ব্যবহার করতেন। তাছাড়া, সেই যুগে পায়ে ব্যান্ডেজ বেঁধে বুট ছাড়া খেলাটা বিশ্বের অনেক অংশেই স্বাভাবিক ছিল, যা ১৯৫০-এর দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত প্রচলিত ছিল।
টাকার অভাবও আসল কারণ ছিল না। ব্রাজিলের আয়োজকেরা খোদ মহাত্মা গান্ধী এবং জওহরলাল নেহরুর দেশের দলকে স্বাগত জানাতে এতটাই উদগ্রীব ছিলেন যে, তাঁরা ভারতের যাতায়াত খরচের সিংহভাগ বহন করতে রাজি হয়েছিলেন। বিশিষ্ট গবেষক ও ক্রীড়া ইতিহাসবিদদের মতে, ব্রাজিলের আয়োজক দল ভারতের খেলোয়ারদের যাতায়াতের মোট খরচের একটি বড় অংশ বহন করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিল। তবে এই বিষয়ের ওপর তেমন নির্ভরযোগ্য কোনও তথ্য পাওয়া যায়নি। উপরন্তু, স্কটল্যান্ড, ফ্রান্স, তুরস্কের মতো দেশগুলো নাম প্রত্যাহার করে নেওয়ায় টুর্নামেন্টকে বাঁচাতে ভারত যাতে আসে, তা আন্তরিকভাবেই চেয়েছিল ব্রাজিল।
এমনকি ১৯৫০ সালের ১৬ মে ভারতের বিশ্বকাপ দলও ঘোষণা করা হয়েছিল। সূচি অনুযায়ী, ১৫ জুন ভারতের ব্রাজিলের উদ্দেশে রওনা দেওয়ার কথা ছিল এবং ২৫ জুন প্যারাগুয়ের বিরুদ্ধে প্রথম ম্যাচ খেলার কথা ছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে সবকিছু বদলে যায়।Raise Your Concern About this Content

দূরদর্শিতার অভাব নাকি অলিম্পিক অপেশাদারিত্বের ফাঁদ?
ইতিহাসবিদদের মতে, তৎকালীন ক্রীড়া কর্তারা হয়তো বুঝতেই পারেননি যে ভবিষ্যৎ বিশ্বে ফুটবল বিশ্বকাপ কতটা প্রভাবশালী এক টুর্নামেন্টে রূপ নিতে যাচ্ছে। তখন ভারতের ধ্যানজ্ঞান ছিল হকি এবং অলিম্পিকের স্বর্ণপদক। পাশাপাশি, ১৯৫১ সালে নতুন দিল্লিতে প্রথম এশিয়ান গেমসের আয়োজন নিয়ে ব্যস্ত ছিল দেশ। ফলে বিশ্বকাপের গুরুত্ব তৎকালীন কর্মকর্তাদের কাছে অলিম্পিকের চেয়ে কম ছিল।
এর পেছনে আরও একটি আইনি জটিলতা থাকতে পারে। তৎকালীন নিয়ম অনুযায়ী, বিশ্বকাপে অংশ নিলে ফুটবলারদের ‘পেশাদার’ (Professional) হিসেবে গণ্য করার ঝুঁকি ছিল। আর পেশাদার খেলোয়াড়দের অলিম্পিক বা এশিয়ান গেমসের মতো ‘অপেশাদার’ (Amateur) টুর্নামেন্টে অংশ নেওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা ছিল। অন্যান্য দেশ এর বিকল্প পথ খুঁজে নিলেও, ভারতীয় কর্মকর্তারা হয়তো এই নিয়মের বেড়াজাল এড়ানোর উপায় জানতেন না। অলিম্পিক ধরে রাখার এই আশঙ্কাই হয়তো ভারতকে ব্রাজিল যাওয়া থেকে বিরত রেখেছিল।

এক অনন্ত আক্ষেপের নাম ১৯৫০:
সেদিন যদি ভারত ব্রাজিলে যেত, তবে ভারতীয় ফুটবলের গতিপথ আজ অন্যরকম হতে পারত। ভারতীয় ফুটবল সাংবাদিক নোভি কাপাদিয়ার মতে, সেই গ্রুপে প্যারাগুয়ে খুব একটা শক্তিশালী ছিল না, আর ইতালিও তৎকালীন অভ্যন্তরীণ নানা সংকটে ভুগছিল। সুইডেন শক্তিশালী দল হলেও, ভারত অন্তত দ্বিতীয় স্থানের জন্য লড়াই করতে পারত এবং মূল্যবান আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারত। উক্ত ফুটবল সাংবাদিকের কথায়, বিশ্বকাপে অংশ নিলে ভারত এক অনন্য আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারত। আর সেই অভিজ্ঞতা হয়তো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারতো।
উপসংহার:
আজ সাত দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। প্রতি চার বছর পর পর যখন গোটা পৃথিবী ফুটবল উৎসবে মেতে ওঠে, তখন প্রতিটি ভারতীয় ফুটবলপ্রেমীর বুকে এক সুপ্ত আক্ষেপ মোচড় দিয়ে ওঠে। মনে পড়ে যায়, ইতিহাসের এমন এক মুহূর্ত এসেছিল, যখন বিশ্ব ফুটবলের জায়গা পেয়েও সুযোগ ছেড়ে দিয়েছিল ভারত।
তথ্যসূত্র:
১. ১৯৫০: যে বিশ্বকাপে ছিল ভারত, কিন্তু মাঠে নামেনি দল (1950)
২. যে ফিফা বিশ্বকাপে ভারত খেলার যোগ্যতা অর্জন করেও খেলেনি: ফুটবলের সবচেয়ে বড় হাতছাড়া হওয়া সুযোগের অজানা কাহিনি।
৩. সুযোগ এলেও ফুটবল বিশ্বকাপ খেলতে রাজি হয়নি ভারত! কেন? রয়েছে অনেক কারণ এবং ভয়ঙ্কর এক গুজব
৪. জানেন কি, ফুটবল বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পেয়েছিল ভারত, তবুও খেলেনি!



