ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত অধ্যায়গুলোর একটি ‘হ্যান্ড অব গড’ গোল। ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের মধ্যকার কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচে এই ঐতিহাসিক ঘটনাটি ঘটে। ম্যাচের ৫১তম মিনিটে আর্জেন্টিনার কিংবদন্তি ফুটবলার দিয়েগো ম্যারাদোনা ইংল্যান্ডের গোলরক্ষক পিটার শিলটনকের নাকের ডগা থেকে একটি গোল করেন। সেই গোল নিয়ে শুরু তীব্র বিতর্ক।
হ্যান্ড অফ গড:
“গোলটা হয়েছিল কিছুটা দিয়েগোর মাথা দিয়ে
আর বাকিটা ইশ্বরের হাত দিয়ে”
-মারাদোনা
একটা অবিশ্বাস্য গোল। ১৯৮৬ সালের ২২ জুন। ফুটবল ইতিহাসের এক বিতর্কিত দিন। ম্যাচের প্রথমার্ধ গোলশূন্য থাকার পর, দ্বিতীয় অর্ধে ইংল্যান্ডের ডি-বক্সের ভেতর এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের সৃষ্টি হয়। মাঠে বাতাসে ভেসে আসা বলটি হেড করার জন্য একদিকে লাফিয়ে ওঠেন ইংল্যান্ডের দীর্ঘদেহী গোলরক্ষক পিটার শিল্পটন, আর অন্যদিকে লাফিয়ে ওঠেন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক ম্যারাদোনা। শিল্পটনকে ফাঁকি দিতে ম্যারাদোনা চালাকির আশ্রয় নেন এবং মাথার খুব কাছ দিয়ে তাঁর বাঁ হাত ব্যবহার করে বলটি ইংল্যান্ডের জালে জড়িয়ে দেন। তারপর ওপরের ওই উক্তিটি করেন মারাদোনা। টিউনিসিয়ার রেফারি আলী বিন নাসের হাতের স্পর্শটি দেখতে না পাওয়ায় এটিকে বৈধ গোল বলে ঘোষণা করেন। কিন্তু পরবর্তীতে নিজেই সবটা স্বীকার করেছিলেন মারাদোনা।

মারাদোনার স্বীকারক্তি:
হ্যান্ড অফ গড গোলটি করার ১৯ বছর পর এই নিয়ে বিস্ফোরক স্বীকারোক্তি করেন দিয়েগো মারাদোনা। ২০০৫ সালে আর্জেন্টিনার টেলিভিশন অনুষ্ঠান ‘লা নোচে দেল ১০’-এ তিনি স্বীকার করেন যে তিনি হাত দিয়েই গোলটি করেছিলেন। বিশ্বের বেশ কয়েকটি সংবাদমাধ্যম ম্যারাদোনার এই ক্ষমা চাওয়ার বিষয়টি প্রতিবেদন আকারে প্রকাশ করে, যা একটি ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়। তবে সেই দিনের সেই ম্যাচের গোলকিপার পিটার শিলটন এই ক্ষমা প্রার্থনা প্রত্যাখ্যান করে বলেন যে, এটি অনেক দেরিতে করা হয়েছে।
দিয়েগো মারাদোনা কে?
১৯৬০ সালের ৩০ অক্টোবর আর্জেন্টিনার লানুস শহরে জন্মগ্রহণ করেন দিয়েগো ম্যারাদোনা। সর্বকালের অন্যতম ফুটবলার হিসেবে ব্যাপকভাবে বিবেচিত এই খেলোয়াড় অল্প বয়স থেকেই অসাধারণ প্রতিভা প্রদর্শন করেন তিনি। কিশোর বয়স থেকেই শুরু করেন পেশাদার ক্যারিয়ার।
ম্যারাদোনা বোকা জুনিয়র্স, এফসি বার্সেলোনা এবং নাপোলির মতো ক্লাবের হয়ে খেলেছেন এবং বিশেষ করে নেপলসে কিংবদন্তি মর্যাদা অর্জন করেন। তিনি ক্লদিয়া ভিলাফানেকে বিয়ে করেন। অধিনায়ক হিসেবে ১৯৮৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে জয়ী করেন। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে একই ম্যাচে করা ‘হ্যান্ড অফ গড’ গোল ও ‘শতাব্দীর সেরা গোল’ উভয়ের জন্যই বিখ্যাত হন।
তাঁর অসাধারণ ড্রিবলিং দক্ষতা, সৃজনশীলতা, নেতৃত্ব তাঁকে একজন বিশ্ব ক্রীড়া আইকনে পরিণত করেছিল। ম্যারাদোনা ২০২০ সালের ২৫শে নভেম্বর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। কিন্তু ফুটবল জগতে তাঁর অবদানের কথা আজও শোনা যায়। তিনি আজও ফুটবল প্রেমীদের মনে।Raise Your Concern About this Content
বিতর্কের জড়িয়েও বিশ্বজুড়ে খ্যাতি অর্জন মারাদোনার:
১. ‘শতাব্দীর সেরা গোল’:
‘হ্যান্ড অফ গড’ গোলের ঠিক চার মিনিট পরেই মারাদোনা আরও একটি ঐতিহাসিক গোল করেছিলেন মারাদোনা। যা মারাদোনাকে ঘিরে তৈরি হওয়া সমস্ত বিতর্ককে এক লহমায় ফিকে করে দেয়। নিজেদের অর্ধে বল পেয়ে ইংল্যান্ডের পাঁচজন ডিফেন্ডার এবং গোলরক্ষক পিটার শিল্পটনকে কাটিয়ে তিনি যে গোলটি করেছিলেন, তা ফিফা কর্তৃক ‘শতাব্দীর সেরা গোল’ হিসেবে স্বীকৃতি পায়। এক ম্যাচে এই দুই গোলের বৈপরীত্য মারাদোনাকে একজন ‘বিতর্কিত খেলোয়াড়’ থেকে ‘ফুটবল ঈশ্বরে’ পরিণত করে।

২. ফকল্যান্ড যুদ্ধের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট:
১৯৮২ সালে আর্জেন্টিনা ও ব্রিটেনের মধ্যে ‘ফকল্যান্ড যুদ্ধ’ হয়েছিল, যাতে আর্জেন্টিনা পরাজিত হয়। ১৯৮৬-র ম্যাচটি তাই আর্জেন্টিনার মানুষের কাছে কেবল ফুটবল ছিল না, ছিল এক ধরণের প্রতিশোধ।
৩. একক দক্ষতায় বিশ্বকাপ জয়:
১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপকে বলা হয় “একক দক্ষতায় জেতা বিশ্বকাপ”। মারাদোনা সেই টুর্নামেন্টে একাই ৫টি গোল করেছিলেন এবং ৫টি গোল করিয়েছিলেন। কোয়ার্টার ফাইনাল ও সেমিফাইনালে তাঁর জাদুকরী পারফরম্যান্স ফুটবল বিশ্বকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল।

৪. নাপোলির হয়ে অলৌকিক উত্থান:
মারাদোনার খ্যাতি কেবল আর্জেন্টিনার জার্সিতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ইতালির ক্লাব নাপোলি-তে যোগ দিয়ে তিনি ইতালিয়ান ফুটবলের ইতিহাস বদলে দেন। তৎকালীন ইতালির ধনী উত্তরের ক্লাবগুলোর (যেমন- জুভেন্টাস, এসি মিলান) আধিপত্য ভেঙে মারাদোনা দরিদ্র দক্ষিণের ক্লাব নাপোলিকে দু’বার সিরি-এ চ্যাম্পিয়ন করেন।
উপসংহার:
‘হ্যান্ড অফ গড’ মারাদোনার ক্যারিয়ারের একটি বিতর্কিত অধ্যায় তা অস্বীকার করার কোনও জায়গা নেই। কিন্তু তাঁর অবিশ্বাস্য ড্রিবলিং, ফুটবল বুদ্ধি এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের ক্ষমতা সেই বিতর্ককে ছাপিয়ে গেছে। ফুটবল জগত তাঁকে শুধু নিয়ম দিয়ে বিচার করেনি, তাঁর পায়ের জাদু আর আবেগের স্ফুলিঙ্গ দিয়েও বিচার করেছে। সে কারণেই এই বিতর্কের তিন দশক পর আজও বিশ্বজুড়ে এক অমর লেজেন্ড ফুটবলার মারাদোনা।
তথ্যসুূত্র:
১. উইকিপিডিয়া
২. The Guardian
৩. আনন্দবাজার
৪. নিউজ 18 বাংলা
৫. লাইভ মিন্ট



