Homeইত্যাদিবিশ্বের সবচেয়ে বহুসাংস্কৃতিক শহর টরন্টো এক শহরে যেন গোটা পৃথিবীর মিলনমেলা

বিশ্বের সবচেয়ে বহুসাংস্কৃতিক শহর টরন্টো এক শহরে যেন গোটা পৃথিবীর মিলনমেলা

বিষয়বস্তুর সারণী [hide]

This entry is part 17 of 17 in the series FIFA WORLD CUP 2026

FIFA WORLD CUP 2026

বিশ্বকাপের উন্মাদনা আছে, বিশ্বকাপে  নেই বাংলা বা ভারত, তবুও “সব খেলার সেরা বাঙালির তুমি ফুটবল” 

মেক্সিকো-আমেরিকায় নয়, ২০২৬ বিশ্বকাপ আসলে হচ্ছে বাংলার ঘরে ঘরে

জাতীয় পতাকা, আবেগ আর ফুটবল—কেন হলুদই ব্রাজিলের প্রতীক

সবচেয়ে বেশি বিশ্বকাপ খেলা ফুটবলার

২০২৬ বিশ্বকাপ: কেন এটি ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপ?

মারাদোনার ‘হ্যান্ড অফ গড’

২০২৬ বিশ্বকাপে AI ও স্মার্ট বলের ব্যবহার

লিওনেল মেসি ও ২০২৬ বিশ্বকাপ : বৈদিক জ্যোতিষ কী ইঙ্গিত দিচ্ছে?

লেদারের বল থেকে আধুনিক ফুটবল: বিশ্বকাপ বলের  বিবর্তন

সিয়াটেলের বৃষ্টির শহর 

নিউ ইয়র্কের ফুটবলের গল্প: পেলের কসমস থেকে ২০২৬ বিশ্বকাপের মহামঞ্চ

দারিদ্র্যকে হারিয়ে রোনাল্ডো বিশ্বজয়

বিশ্বকাপের সবচেয়ে অভিশপ্ত স্টেডিয়াম: কেন আজও মারাকানাকে ঘিরে রহস্য ও আতঙ্ক?

লুকা মদ্রিচের যুদ্ধ বিপর্যস্ত শৈশব

দু’দুবার চুরি, একবার উদ্ধার, তারপর চিরতরে অন্তর্ধান, বিশ্বকাপ ট্রফি হারিয়ে যাওয়ার নিয়ে রয়েছে রহস্য

ফুটবল সম্রাট পেলের আগমনে থেমে গিয়েছিল রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ

বিশ্বের সবচেয়ে বহুসাংস্কৃতিক শহর টরন্টো এক শহরে যেন গোটা পৃথিবীর মিলনমেলা

কেন টরন্টোকে বিশ্বের সবচেয়ে বহুসাংস্কৃতিক শহর বলা হয়?

১) জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই বিদেশে জন্মগ্রহণকারী

টরন্টোর সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো এর অভিবাসী জনসংখ্যা। সাম্প্রতিক জনগণনা অনুযায়ী, টরন্টো শহরের প্রায় ৪৬ শতাংশ বাসিন্দা বিদেশে জন্মগ্রহণ করেছেন। বৃহত্তর টরন্টো অঞ্চলেও (Greater Toronto Area) এই হার অত্যন্ত বেশি। বিশ্বের বড় শহরগুলোর মধ্যে এত বড় পরিসরে বিদেশে জন্ম নেওয়া মানুষের বসবাস খুবই বিরল। ফলে শহরটি কার্যত বিশ্বের নানা দেশের মানুষের মিলনস্থলে পরিণত হয়েছে।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

২) ২০০-রও বেশি জাতিগোষ্ঠীর সহাবস্থান

টরন্টোতে শুধু বিভিন্ন দেশের মানুষই নয়, ২০০-রও বেশি জাতিগত ও নৃতাত্ত্বিক সম্প্রদায় বসবাস করে। ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, চীন, ফিলিপাইন, ইতালি, গ্রিস, জ্যামাইকা, ইরান, ইউক্রেন, নাইজেরিয়া, শ্রীলঙ্কা, আফগানিস্তান, সোমালিয়া—তালিকা দীর্ঘ। এই বৈচিত্র্য শহরের অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও সামাজিক জীবনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

৩) ১৮০-রও বেশি ভাষা ও উপভাষার ব্যবহার

ইংরেজি অবশ্যই প্রধান ভাষা। তবে দৈনন্দিন জীবনে শোনা যায় বাংলা, হিন্দি, পাঞ্জাবি, উর্দু , আরবি , মান্দারিন , ক্যান্টনিজ , স্প্যানিশ তামিল,  ফার্সি , রুশ , পর্তুগিজ , কোরিয়ান- সহ ১৮০-রও বেশি ভাষা ও উপভাষা। টরন্টোর অনেক সরকারি অফিস, হাসপাতাল, স্কুল এবং জনসেবামূলক সংস্থা বহু ভাষায় পরিষেবা দেয়।

৪) কানাডার বহুসংস্কৃতিবাদ নীতির বড় প্রভাব

১৯৭১ সালে কানাডা বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে Multiculturalism Policy গ্রহণ করে। পরবর্তীতে Canadian Multiculturalism Act (1988) এই নীতিকে আইনি স্বীকৃতি দেয়।এই নীতির মূল উদ্দেশ্য হল সব সংস্কৃতিকে সমান মর্যাদা দেওয়া , বৈষম্য কমানো , নতুন অভিবাসীদের সমাজে অন্তর্ভুক্ত করা , নিজস্ব সংস্কৃতি ধরে রাখার অধিকার নিশ্চিত করা । টরন্টো এই নীতির সবচেয়ে সফল উদাহরণগুলোর একটি।

৫) অভিবাসীদের স্বপ্নের শহর

প্রতি বছর বিশ্বের নানা দেশ থেকে হাজার হাজার মানুষ কাজ, পড়াশোনা ও স্থায়ী বসবাসের জন্য টরন্টোতে আসেন।এর প্রধান কারণ হল- উন্নত চাকরির বাজার , বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয়,  উন্নত স্বাস্থ্যব্যবস্থা, নিরাপদ নগরজীবন , বহুসাংস্কৃতিক পরিবেশ। অনেক নতুন অভিবাসীর কাছে টরন্টোই কানাডায় প্রথম ঠিকানা।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

৬) বিশ্বের প্রায় সব দেশের মানুষের বসবাস

টরন্টোকে অনেক সময় “The World Within a City” বলা হয়।কারণ, বিশ্বের প্রায় প্রতিটি অঞ্চলের মানুষ এখানে বসবাস করেন। জাতিসংঘের সদস্যভুক্ত অধিকাংশ দেশের প্রতিনিধিত্ব কোনো না কোনোভাবে টরন্টোর জনসংখ্যায় দেখা যায়।

৭) ধর্মীয় বৈচিত্র্যের অনন্য উদাহরণ

টরন্টো এমন একটি শহর, যেখানে— গির্জা , মসজিদ , হিন্দু মন্দির , শিখ গুরুদ্বার,  বৌদ্ধ বিহার , সিনাগগ সবই পাশাপাশি দেখা যায়।

শহরে বড়দিন, ঈদ, দীপাবলি, বৈশাখ, বৈশাখী, হনুক্কা, নওরোজ, লুনার নিউ ইয়ার—সব উৎসবই উদ্‌যাপিত হয়। ধর্মীয় সহনশীলতা টরন্টোর অন্যতম বড় শক্তি।

বিশ্বের নানা দেশের খাবারের রাজধানী

টরন্টোকে উত্তর আমেরিকার অন্যতম সেরা Food Capital বলা হয়। এখানে পাওয়া যায়-  বাংলাদেশি বিরিয়ানি, ভারতীয় থালি , জাপানি সুশি,  কোরিয়ান বারবিকিউ , ইতালিয়ান, গ্রিক সুভলাকি , মেক্সিকান টাকো , ইথিওপিয়ান খাবার, মধ্যপ্রাচ্যের শাওয়ারমা সহশহরে হাজার হাজার আন্তর্জাতিক রেস্তোরাঁ রয়েছে।

এক শহরে বহু সংস্কৃতির পাড়া

টরন্টোর অন্যতম আকর্ষণ এর সাংস্কৃতিক অঞ্চলগুলো। সবচেয়ে পরিচিত কয়েকটি—Chinatown , Little Italy , Greektown , Koreatown , Little India , Kensington Market , Roncesvalles (পোলিশ সম্প্রদায়) , Little Portugal  প্রতিটি এলাকাই নিজস্ব সংস্কৃতি, খাবার ও উৎসবের জন্য বিখ্যাত।

আন্তর্জাতিক উৎসবের শহর

বছরজুড়ে টরন্টোতে অনুষ্ঠিত হয় অসংখ্য আন্তর্জাতিক উৎসব। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—Toronto Caribbean Carnival (Caribana) , Toronto International Film Festival (TIFF) , Taste of the Danforth , Pride Toronto , Cavalcade of Lights , Toronto Fringe Festival এই উৎসবগুলো প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ দর্শককে আকর্ষণ করে।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

শিল্প, সঙ্গীত ও ফ্যাশনে বহুসংস্কৃতির প্রভাব

টরন্টোর সংগীতজগতে হিপ-হপ, জ্যাজ, ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীত, আফ্রিকান বিট, কোরিয়ান পপ—সবকিছুর প্রভাব রয়েছে। ফ্যাশনেও দেখা যায় নানা সংস্কৃতির সংমিশ্রণ। শহরের আর্ট গ্যালারি ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রগুলোতেও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিল্পকর্ম প্রদর্শিত হয়।

খেলাধুলাতেও সংস্কৃতির মিলন

টরন্টোতে ফুটবল, ক্রিকেট , বাস্কেটবল , আইস হকি এবং বেসবল সব খেলাই জনপ্রিয়।বিশেষ করে দক্ষিণ এশীয় অভিবাসীদের কারণে ক্রিকেট দ্রুত জনপ্রিয়তা পাচ্ছে।অন্যদিকে বাস্কেটবল ও ফুটবলও বহুজাতিক জনগোষ্ঠীকে একত্রিত করেছে।

প্রযুক্তি ও ব্যবসায় বহুজাতিক কর্মপরিবেশ

টরন্টো এখন উত্তর আমেরিকার অন্যতম দ্রুত বিকাশমান প্রযুক্তি কেন্দ্র। Google, Microsoft, Amazon, Shopify, IBM-সহ বহু আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের অফিস এখানে রয়েছে। বিশ্বের নানা দেশের দক্ষ কর্মীরা একসঙ্গে কাজ করেন। এই বৈচিত্র্য নতুন উদ্ভাবন ও স্টার্টআপ সংস্কৃতিকে শক্তিশালী করেছে।

বৈচিত্র্যের মধ্যেও সামাজিক সম্প্রীতি

বহুসংস্কৃতি থাকা মানেই যে সংঘাত হবে, টরন্টো সেই ধারণাকে অনেকটাই ভুল প্রমাণ করেছে।এখানে বৈষম্যবিরোধী আইন , অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা,  কমিউনিটি প্রোগ্রাম,  সরকারি সহায়তা, বহুভাষিক পরিষেবা সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যদিও বর্ণবাদ বা বৈষম্যের বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটে, তবুও সামগ্রিকভাবে শহরটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ার ক্ষেত্রে বিশ্বে উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়।Raise Your Concern About this Content

পর্যটকদের কাছে সাংস্কৃতিক আকর্ষণ

পর্যটকেরা শুধু CN Tower বা Niagara Falls-এর জন্যই টরন্টোতে আসেন না। তারা আসেন—আন্তর্জাতিক খাবারের স্বাদ নিতে,  বিভিন্ন সংস্কৃতির উৎসব দেখতে , ঐতিহাসিক অভিবাসী পাড়া ঘুরতে , বহুসাংস্কৃতিক জীবনযাত্রার অভিজ্ঞতা অর্জন করতে।  এ কারণেই টরন্টোকে অনেকেই “বিশ্বের সংস্কৃতির মিলনমেলা” বলে অভিহিত করেন।

ভবিষ্যতের টরন্টো—বৈচিত্র্য কি আরও বাড়বে?

বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী কয়েক দশকে কানাডার জনসংখ্যা বৃদ্ধির প্রধান উৎস হবে অভিবাসন। সেই কারণে টরন্টোতে নতুন ভাষা, নতুন সংস্কৃতি ও নতুন জনগোষ্ঠীর উপস্থিতি আরও বাড়বে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, প্রযুক্তি, গবেষণা ও আন্তর্জাতিক ব্যবসার কেন্দ্র হিসেবে শহরটির গুরুত্ব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর বহুসাংস্কৃতিক চরিত্রও আরও শক্তিশালী হবে।

পরিশেষে বলা যায়,  টরন্টোকে অনেক সময় “The World in One City বলেও উল্লেখ করা হয়।   শহরে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ দক্ষিণ এশীয়, চীনা ও ক্যারিবীয় অভিবাসী সম্প্রদায় রয়েছে। টরন্টো পাবলিক লাইব্রেরি বহু ভাষায় বই সরবরাহ করে।  শহরের বিভিন্ন স্কুলে শতাধিক মাতৃভাষার শিক্ষার্থীরা একসঙ্গে পড়াশোনা করে। টরন্টো বিশ্বের অন্যতম নিরাপদ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক মহানগর হিসেবে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূচকে নিয়মিত স্থান পায়। তাই টরন্টোর পরিচয় শুধু একটি আধুনিক মহানগর হিসেবে নয় এটি এমন একটি শহর যেখানে পৃথিবীর নানা প্রান্তের মানুষ নিজেদের সংস্কৃতি, ভাষা ও পরিচয় বজায় রেখেও একই সমাজের অংশ হয়ে উঠেছেন। বৈচিত্র্যকে বিভাজনের নয়, বরং শক্তির উৎস হিসেবে গ্রহণ করার যে উদাহরণ টরন্টো তৈরি করেছে, তা আজ বিশ্বের বহু শহরের কাছেই অনুকরণীয়। দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বে টরন্টো তাই কেবল কানাডার অর্থনৈতিক কেন্দ্র নয়, বহুসংস্কৃতির সফল সহাবস্থানেরও এক উজ্জ্বল প্রতীক।

তথ্যসূত্র :

১. টরন্টোর জনসংখ্যায় বিদেশে জন্মগ্রহণকারীর হার, জাতিগোষ্ঠী ও ভাষার তথ্য
২. কানাডার বহুসংস্কৃতিবাদ নীতি ও Canadian Multiculturalism Act (1988)
৩.  টরন্টোর আন্তর্জাতিক উৎসব
৪. প্রযুক্তি, স্টার্টআপ ও বহুজাতিক কর্মপরিবেশ
৫. বহুভাষিক পরিষেবা ও সামাজিক বৈচিত্র্য

FIFA WORLD CUP 2026

ফুটবল সম্রাট পেলের আগমনে থেমে গিয়েছিল রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ
সৃজিতা মল্লিক
সৃজিতা মল্লিক
ডিজিটাল মিডিয়ার নিউজ ডেস্কে কেটে গিয়েছে ৫ বছর। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণমাধ্যম নিয়ে পড়ার সময় থেকেই সাংবাদিকতায় হাতেখড়ি হয় সৃজিতার। খবর ভালোবাসা তাই বাছবিচার ছাড়াই দেশ, দুনিয়া, রাজ্যের খবরের সঙ্গে সঙ্গে খেলা, বিনোদন দুনিয়ার ময়দানেও রয়েছে আনাগোনা। উৎসাহ বাজারের ওঠাপড়া, রাজনীতির বিষয়েও। খাদ্যরসিক। ছুটি পেলেই সপরিবার ভ্রমণে প্রাণের আরাম, মনের প্রশান্তি।
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

বাংলা ক্যালেন্ডার

- বিজ্ঞাপন -spot_img

Most Popular

Recent Comments