Homeউৎসব অনুষ্ঠানকুমাওঁনী হোলি: সঙ্গীতের মূর্ছনার সহিত রঙের মিলন

কুমাওঁনী হোলি: সঙ্গীতের মূর্ছনার সহিত রঙের মিলন

কুমায়ুন হোলি বলতে কি বোঝা হয়:

ভৌগোলিক আঙ্গিকে হিমালয় পর্বতমালা দুইভাগে বিভক্ত – গাড়োয়াল হিমালয় এবং কুমায়ুন হিমালয়। কুমায়ুন হিমালয় বলতে বোঝায় পশ্চিমে শতলুজ নদী থেকে পূর্বে কালী নদী অবধি। প্রধানত নৈনিতাল, আলমোরা, বাঘেস্বর, রানিখেত ও কুমায়ুনের অন্যান্য জায়গায় উদযাপিত হয় কুমায়ুন হোলি।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

পটভূমি: 

কুমাওঁনী হোলি প্রকৃত হোলির অনেক আগে শুরু হয়। কুমাওঁনী হোলি উদযাপন শুরু হয় বসন্ত পঞ্চমী তিথি থেকে এবং শেষ হয় হোলির দিন। এই উৎসব বসন্তের কুমায়ুন হিমালয়ের প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য এবং সংস্কৃতির মাধুর্য জনসমক্ষে তুলে ধরে। উৎসবের মধ্যে যেসব গান, রাগ (ভীমপলাশি রাগ, পিলু রাগ) পরিবেশন করা হয় তা রাধাকৃষ্ণের প্রতি অর্পিত হয়।

ইতিহাস:

পঞ্চদশ শতাব্দির প্রাককালে চাঁদ রাজবংশ যখন চম্পাবতে রাজধানী স্থাপন করে, তখন এই কুমাওঁনী হোলির প্রবর্তন হয়। এনারা বংশ পরম্পরায় ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের অনুরাগী ছিলেন, এই অনুরাগের ফলস্বরুপ হোলিতে রঙ খেলার তুলনায় এরা শাস্ত্রীয় রাগের আরাধনায় সময় অতিবাহিত করতেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সময় থেকেই ব্রজ সঙ্গীতের ওপর স্থানীয় কুমাওঁনী সঙ্গীতের প্রভাব পরিলক্ষিত হয় যা পরবর্তীকালে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

কুমায়ুনি হোলির আচার-বিচার:

কুমাওঁনী হোলি উদযাপিত হয় প্রধানত চারভাগে বিভক্ত – চিয়ার বন্ধন, হোলি উদযাপন, চিয়ার দহন এবং চালাদি। চিয়ার বন্ধন, অর্থাৎ কুমাওঁনী হোলির প্রথম পর্ব হল বসন্ত পঞ্চমীর সকালে চিয়ার স্থাপন। চিয়ার হল একটি আনুষ্ঠানিক খুঁটি যা পদ্মকবৃক্ষের (চেরি গাছ) কাপড় দ্বারা সজ্জিত। দ্বিতীয় পর্ব বা হোলি উদযাপন তিনভাগে বিভক্ত – বৈঠকি হোলি, খাদি হোলি এবং মহিলা হোলি। মহিলা হোলিতে এলাকার সকল মেয়েরা একসাথে জমায়েত করে এবং গান গেয়ে আনন্দ উদযাপন করে। এই মহিলা হোলি বর্তমানে উদযাপন হয় না। তৃতীয় পর্ব, চিয়ার দহন যা অনুষ্ঠিত হয় দোলপূর্ণিমার দিন, এটি কুমাওঁনী হোলির শেষ দিন। এই দিনে সূর্যাস্তের পর চিয়ার জ্বালানো হয় এবং অগ্নিসঙ্গীত পরিবেশন করা হয়। চিয়ার দহনের মাধ্যমে “দুষ্টের ওপর শিষ্টের জয়” মতবাদকে প্রতিষ্ঠা করা হয়। অন্তিম পর্ব, চালাদি যা উদযাপিত হয় পূর্ণিমার পরের দিন। এই পর্বে গায়কেরা সকলের বাড়ি বাড়ি যান, গায়ে রঙ লাগিয়ে কুমাওঁনী হোলির অবসান ঘোষণা করে। উৎসবের প্রতীকী হিসেবে আলু গুতুক, গুজিয়া ও ভাঙ খাওয়া হয়।
Raise Your Concern About this Content

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

স্বতন্ত্রতা:

কুমাওঁনী হোলির বাকিদের থেকে অনন্য এবং স্বতন্ত্র হওয়ার কারণ হল, এই উৎসবে রঙ খেলার তুলনায় সঙ্গীতচর্চাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। কিছু বিশেষজ্ঞের মতে, কুমাওঁনী হোলি হোলি উদযাপনের তুলনায় বীণাপাণির আরাধনা, পাহাড়ি বসন্তের মাধুর্য এবং সঙ্গীতচর্চাকে সমাজের সামনে তুলে ধরে।

বৈঠকি হোলি:

এটি কুমাওঁনী হোলির একটি ভাগ, যেখানে দোলপূর্ণিমার দিন উদযাপিত হয় যেখানে এলাকার মন্দিরের সামনে সকলে গোল হয়ে বসে তবলা ও হারমোনিয়াম সহযোগে রাগ ও সঙ্গীত পরিবেশন করে। বৈঠকি হোলি, কুমাওঁনী হোলির সবথেকে পুরনো এবং ভক্তিগত সংস্করণ।

খাদি হোলি:

‘খাদি’ অর্থাৎ ‘দাঁড়ানো’, অর্থাৎ দাঁড়িয়ে হোলি খেলাকে খাদি হোলি বলে। এই হোলিতে ছেলেরা ধুতি-পাঞ্জাবি এবং মেয়েরা চুড়িদার পরিহিত অবস্থায় হোলি খেলে। দাঁড়িয়ে গান গাওয়া হয়, একটি ছন্দে হাততালি বাজিয়ে বাজনার রুপ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। 

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

আজ কুমাওঁনী হোলি কেন প্রাসঙ্গিক ও তাৎপর্যপূর্ণ: বর্তমানে কুমাওঁনী হোলি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, তাঁর কারণ হল এটি শুধুমাত্র একটি রঙ খেলার উৎসব নয়, বরং এই উৎসবের মাধ্যমে বীণাপাণির আরাধনা করা হয়, রাধাকৃষ্ণের প্রতি ভক্তি প্রদর্শনের চেষ্টা করা হয় এবং ভারতীয় রাগসঙ্গীত ও শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানো হয়। এই উৎসব কুমায়ুন হিমালয়ের প্রাকৃতিক মাধুর্যকে এবং কুমায়ুনবাসীদের কে বিস্বদরবারে তুলে ধরে। কুমাওঁনী হোলি স্বতন্ত্রভাবে এবং সানন্দে কুমায়ুন হিমালয়ের সংস্কৃতিকে বিস্বদরবারে তুলে ধরে।

তথ্যপঞ্জি :

১. চম্পাবতের চাঁদ রাজবংশ ও কুমাওঁনী হোলিতে তাদের প্রভাব
২. কুমায়ুন হিমালয়ের ভৌগোলিক অবস্থান
৩. চিয়ার বন্ধন, চিয়ার দহন ও চালাদি

শান্তনু
শান্তনু
বিজ্ঞানমনস্ক ও গবেষণাভিত্তিক লেখায় প্রায়োগিক অভিজ্ঞতা নিয়ে শান্তনু, এক উদীয়মান সাহিত্যিক প্রতিভা, প্রাণিবিদ্যায় স্নাতক ও পরিবেশবিদ্যায় স্নাতকোত্তর। তার লেখা "অদ্ভুতুড়ে আলিনগর" বইটি পাঠকমহলে সমাদৃত হয়েছে, কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলায় প্রকাশ পেয়েছে।
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

বাংলা ক্যালেন্ডার

- বিজ্ঞাপন -spot_img

Most Popular

Recent Comments