Homeভ্রমণনেপালের পশুপতিনাথ মন্দির: এক অনবদ্য তীর্থস্থান

নেপালের পশুপতিনাথ মন্দির: এক অনবদ্য তীর্থস্থান

বাঙালির তীর্থক্ষেত্র : নেপালের পশুপতিনাথ মন্দির

শুরুটা করব বাঙালির আরেক নস্টালজিয়া কে ঘিরে। নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডু। আর এই শহরেই সত্যজিতের ফেলুদাকে আমরা দেখি জব্দ করতে মগনলাল মেঘরাজ কে। তবে আমাদের সাথে তাদের দেখা না হলেও ক্ষতি নেই, কাঠমান্ডু বেড়াতে গেলে যে ঐতিহ্যবাহী স্থান, পুণ্যতীর্থ ক্ষেত্র মুগ্ধ করে আপামর ভারতবাসী তথা  বিশ্ববাসীকে তা হল নেপালের পশুপতিনাথের মন্দির। আগেই বলেছি, বিদেশ ভ্রমনে বাঙালি যতটা সচেতন হয়ে থাকে, নেপাল দর্শন ততটা কঠিন নয়। কিভাবে পশুপতিনাথের মন্দির দর্শন করবেন, কেনই বা আজও এই মন্দিরের নাম বিশ্ব বিখ্যাত সেই কথাতেই এবার আসা যাক।

পশুপতিনাথ মন্দিরের পৌরাণিক ইতিহাস

কথিত আছে যে, ভগবান শিবের অপর নাম  পশুপতিনাথ। পৌরাণিক আখ্যান থেকে জানা যায়, শিব ঠাকুর এবং পার্বতী মর্ত্যে একবার একান্তে সময় কাটাচ্ছিলেন এই স্থানে। স্থানটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য তাঁদের আকৃষ্ট করায় হরিণের ছদ্মবেশে তারা ভ্রমণ করতে থাকেন কাঠমান্ডুর এই পবিত্রস্থান।  এই স্থানের পশুরাও ভগবান শিব কে তাদের অধিকর্তা বলেই মেনে নেয়। কিন্তু ইতিমধ্যে এক অদ্ভুত কান্ড ঘটে। স্বর্গে দেবতারা ভগবান শিবের সাক্ষাৎ না পেয়ে এই স্থানে চলে আসে এবং তাকে অনুরোধ জানায়, স্বর্গে ফিরে যাবার জন্য। আর তখনই ভগবান শিব জানায়, যে এই স্থানে যেহেতু তিনি ভ্রমণ করেছিলেন, তাই এখানে তার মূর্তি প্রতিষ্ঠা হবে,এবং প্রত্যহ সেই জাগ্রত  মূর্তি পূজা করা হবে। সেই থেকেই এই স্থানে নিয়মিত পূজো হয়। জাগ্রত এই মন্দিরে শিবরাত্রির দিন বিশেষ পুজোর আয়োজন করা হয়। শোনা যায়, শ্রীকৃষ্ণ কিংবদন্তি মতে দেব পাটনে শিবলিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

পশুপতি মন্দির প্রতিষ্ঠার প্রাচীন ইতিহাস

আগেই বললাম পৌরানিক গল্পের কথা, এবারে আসা যাক মন্দির প্রতিষ্ঠার ইতিহাসের কথায়। সময়টা আজকের নয়। সহস্র সহস্র বছর  আগের কথা। যীশু খ্রীষ্টের  জন্মের ৪৭৮ বছর আগে নেপালে তখন রাজত্ব করতেন শিবদেব। তিনি ছিলেন বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। হিন্দু ধর্ম তখন নেপালে কোণঠাসা। বৌদ্ধ ধর্মের অত্যাচারে হিন্দুরা সেই সময় বেশ সংকট কালীন সময়ের  মধ্যে দিয়েই জীবন যাপন করছেন। এই খবর পেলেন হিন্দু ধর্মের আদিগুরু শঙ্করাচার্য। তিনি নেপালের কাঠমান্ডুতে  গেলেন। আজকে যেখানে পশুপতিনাথের মন্দির, সেই স্থানেই কোনো এক প্রাঙ্গণে মধুর ভাষ্যে হিন্দু ধর্মের আধ্যাত্ম্যবাদের  কথা শোনালেন। শংকরাচার্যের সুমধুর কন্ঠে রাজা শিবদেব তাঁর শিষ্যত্ব  গ্রহণ করেন। তারপর হিন্দু ধর্ম গ্রহণ করলেন। শংকরাচার্য  যখন হিন্দু ধর্মের লুপ্তপ্রায় মন্দিরগুলি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছেন তখনই তার কানে আসে নেপালের বৌদ্ধ ধর্মের অত্যাচারের কথা। পরবর্তীতে শংকরাচার্যের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েই শিবদেব মন্দিরের সংস্কার করলেন। তবে আজকের  মন্দিরের  সঙ্গে সেই মন্দিরের মিল পাওয়া যায় না। শোনা যায়, ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে নতুন করে মন্দিরের ভিত্তি প্রস্তর খন্ড প্রতিষ্ঠা করেছিলেন মোহন্ত শ্রী স্বামী রামানন্দ গিরি। কাঠমান্ডুতে বাগমতী নদীর পূর্ব তীরে অবস্থিত পশুপতিনাথের মন্দির। মন্দির সংলগ্ন চারপাশে অসংখ্য ছোট ছোট শিবের মন্দির রয়েছে। ১৯৭৯ সালে ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসাবে পশুপতিনাথের মন্দিরকে ঘোষণা করা হয়।

Image 1: কাঠমান্ডুর পশুপতিনাথ মন্দিরের কাছে শঙ্করাচার্য মঠ ||

কৃতজ্ঞতা স্বীকার উইকিপিডিয়া এর নিজস্ব ওয়েবসাইট ||https://en.wikipedia.org/wiki/Pashupatinath_Temple#/media/File:Shankaracharya_Math_Pashupatinath_Temple_Pashupati_Kathmandu_Nepal_Rajesh_Dhungana_6.jpg

হিন্দু ধর্মের মাহাত্ম্য ও বর্তমান পরম্পরা –

নেপালের রাজবংশের সঙ্গে বৌদ্ধধর্ম ওতপ্রোতভাবে জড়িত। পশুপতিনাথের মন্দির হিন্দু ধর্মের সাথে জড়িত হবার কারণে নানা বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে যখন শংকরাচার্য নেপাল পৌছলেন, তিনি সেখানে গিয়ে জানতে পারেন নেপালের রাজবংশের কেউ মারা গেলে নেপালের মানুষকে অশৌচ পালন করতে হয়। প্রসঙ্গত পশুপতিনাথের মন্দির সংলগ্ন এলাকার সাথেই ছিল একটি শ্মশান। সেই আর্যঘাটে নেপালের রাজ বংশের  কেউ মারা গেলে সেখানে তার পারলৌকিক  ক্রিয়া সম্পন্ন হতো।  সেখানকার পুরোহিতরা যদি মন্দিরের প্রধান পুরোহিতের দায়িত্বে থাকেন তবে তারা এই সময়ে পূজা নিবেদন করতে পারবেন না। তখন শঙ্করাচার্য সিদ্ধান্ত নিলেন মন্দিরের প্রধান পুরোহিতের দায়িত্বে থাকবেন দক্ষিন ভারতীয় ভট্ট পুরোহিত। কারণ ভারতীয় পুরোহিতদের সঙ্গে নেপালের রাজবংশের সম্পর্ক না থাকায় নিয়মিতভাবে পশুপতিনাথ পুজো পাবেন। সেই সময় কাল থেকেই মন্দিরের গর্ভগৃহ হিন্দুদের প্রধান  প্রবেশদ্বার ছিল। সেখানে আজও সমস্ত সম্প্রদায়ের মানুষকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না। মন্দিরের চারদিকে হিন্দু ধর্মের দেব-দেবীদের, বিভিন্ন পৌরাণিক চরিত্রের কারুকার্য যেন হিন্দু ধর্মের মাহাত্ম্যকে আরো একবার সারা বিশ্বের কাছে তুলে ধরেছে। পশুপতিনাথের মাহাত্ম্যেই আজও লক্ষ লক্ষ মানুষের ঢল নামে শিবরাত্রির পুণ্য তিথিতে।

Image 2: ১৫টি শিবালয় এবং মন্দির এলাকা দেখার জন্য দর্শনার্থীদের জন্য দেখার জায়গা || কৃতজ্ঞতা স্বীকার: উইকিপিডিয়া এর নিজস্ব ওয়েবসাইট ||

পশুপতিনাথের মন্দির দর্শন –

নেপালের কাঠমান্ডু শহরের বাগমতী নদীর পূর্ব তীরে ঐতিহ্যবাহী পশুপতিনাথের মন্দির। চারকোণা প্যাগোডা স্টাইলের মন্দিরে অধিষ্ঠাতা ভগবান শিব। মন্দিরের বাইরের অংশে রয়েছে বিশাল উঠোন। যেখানে প্রচুর পরিমাণে পায়রা দেখা যায়। মন্দিরের আশেপাশে রয়েছে বেশ কিছু লাল এবং সাদা বাড়ি। তারপরে মন্দিরের মূল প্রবেশ দ্বার। মূল প্রবেশদ্বার দিয়ে ঢুকেই পশ্চিমেই রয়েছে ষাঁড় অর্থাৎ নন্দী। আর তার পরেই রয়েছে আরেকটি ছোট ষাঁড় অর্থাৎ কিনা ছোট নন্দী। মন্দিরের চারটি দরজা রয়েছে। সোনা এবং রূপোয় মোড়া দরজা গুলি। আগেই বলেছি, পৌরাণিক দেবদেবীদের চিত্র রয়েছে পশুপতিনাথের মন্দিরে। এই সেই দরজা যার উপরে খোদাই করা  রয়েছে শিব, পার্বতী, গনেশ, যোগিনীদের মূর্তি, আর রয়েছে রামায়ণের কাহিনী অনুসারে নানা মূর্তি। প্রবেশদ্বারে রয়েছে ব্রোঞ্জের তৈরি সিংহ দুয়ার। এবারে আসি শিবলিঙ্গের কথায়। প্রায় ৬ ফুট উঁচু শিবলিঙ্গ। সেই লিঙ্গের  চারটি মুখ রয়েছে। উত্তরে বামদেব, দক্ষিণের অঘোর, পূর্বে রয়েছে তৎপুরুষ, পশ্চিমে সদ্যোজাত। লিঙ্গের উপরে যে প্রধান স্থান তা হল ঈশান। যে স্থানে শুধুমাত্রই প্রধান পুরোহিত পুজো করতে পারেন। নিম্নদেশকে বলা হয় কালানি রুদ্র। শোনা যায়, লিঙ্গের এই উপরে মা ললিতা ত্রিপুরা  সুন্দরী অধিষ্ঠাত্রী। গর্ভ গৃহে সকলকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না। মন্দিরের পিছনে শ্মশান। এখানে প্রচুর সাধুদেরও দেখা যায়। মূল মন্দিরের শিবলিঙ্গ ছাড়াও আরো অসংখ্য  শিবের মন্দির রয়েছে এখানে। আর রয়েছে অজানা রহস্য। সোনার ছাতা। তবে ২০১৫ সালে ভূমিকম্পে মন্দিরের  বেশ কিছুটা অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও লোহার বীম দিয়ে ধরে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এবার আসা যাক ঐতিহ্যশালী এই মন্দির কিভাবে দর্শন করবেন?

কিভাবে যাবেন এই মন্দির দর্শনে?

কলকাতা থেকে বিমানে কাঠমান্ডু রওনা দিয়ে অবশ্যই দর্শন করতে  পারেন এই মন্দির। বিমানে সময় লাগবে দেড় থেকে দুই ঘন্টা। বিমানবন্দর  থেকে ট্যাক্সি নিয়ে চলে যেতে পারেন মন্দির সংলগ্ন স্থানে। তাছাড়া নেপালের যে কোন শহর থেকেই কাঠমান্ডুতে যাওয়া যাবে। তাছাড়া ট্রেনে যাওয়া যেতে পারে। হাওড়া থেকে মিথিলা এক্সপ্রেস। বিকেল ৩:৫০মিনিটে হাওড়া থেকে ছাড়ে।  নেপালের সীমান্ত শহর রক্সাল পর্যন্ত । তারপর সেখান থেকে বীরগঞ্জ টোটো তে । নেপালের প্রবেশদ্বার। এখান থেকেও গাড়ি ভাড়া করে কাঠমান্ডু যাওয়া যাবে।  অবশ্যই বলে রাখবো নেপালে ভারতীয় মুদ্রার ১০০ এবং ৫০০ টাকা ব্যবহার করা যাবে।  সঙ্গে ভারত সরকারের দেওয়া সচিত্র  পরিচয় পত্র অবশ্যই রাখবেন। মন্দির সংলগ্ন এলাকায় থাকার জন্য হোটেলের ব্যবস্থা রয়েছে। ঘর ভাড়া -১৫০০-৩০০০ টাকা ভারতীয় মুদ্রায় ( একদিনের ভাড়া হিসাবে)

Image 3: আরতি পূজারসময় পশুপতিনাথের ভিড় || কৃতজ্ঞতা স্বীকার উইকিপিডিয়া এর নিজস্ব ওয়েবসাইট ||

পশুপতিনাথ দর্শনের জন্য  গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য –

মন্দির খোলা থাকবে ভোর চারটা থেকে – দুপুর দুটো পর্যন্ত।

আবার বিকেল পাঁচটা থেকে – সন্ধ্যে সাতটা পর্যন্ত।

সন্ধ্যা সাড়ে ছটায় সন্ধ্যারতি হয় পশুপতিনাথের মন্দিরে।

Image-4 : মাঙ্কি টেম্পল কাঠমান্ডু ( স্বয়ম্ভূনাথ স্তূপ) || কৃতজ্ঞতা স্বীকার উইকিপিডিয়া এর নিজস্ব ওয়েবসাইট: https://medium.com/@asthanepal012/monkey-temple-kathmandu-swayambhunath-stupa-f1470d457582

তবে একটা কথা বলেই  শেষ করব এবারের কাঠমান্ডু ভ্রমণের গল্প, কাঠমান্ডু শহরে যাবেন অথচ শুধুমাত্র পশুপতিনাথের মন্দির দেখে চলে আসবেন তা তো হয় না, সেই সাথে অবশ্যই ঘুরে দেখবেন দরবার স্কোয়ার, যারা কেনাকাটা করতে ভালোবাসেন অবশ্যই দেখবেন থামেল, আর রয়েছে স্বয়ম্ভূনাথের স্তূপ। কাঠমান্ডু শহরটি ঘন জনবসতিপূর্ণ হলেও শহরের মূল আকর্ষণ কিন্তু এই দর্শনীয় স্থানগুলি।তাই আপনারাও জানাতে ভুলবেন না আপনাদের নেপাল ভ্রমণের অভিজ্ঞতার  কথা।

Image-5 : পাটান দরবার স্কোয়ার।। কৃতজ্ঞতা স্বীকার- উইকিপিডিয়া এর নিজস্ব ওয়েবসাইট

তথ্যসূত্র –

  • Google, wikipedia
  • Make my trip
  • Information from travel blogger from YouTube
  • Indian Railway
  • Kundu special – Travel agency
শম্পা পাল
শম্পা পাল
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর শম্পা পাল একজন অভিজ্ঞ শিক্ষক এবং বাংলা ফ্রিল্যান্স লেখিকা।জার্নালিজম এবং মাস কমিউনিকেশনে বর্তমানে স্নাতকোত্তর করছেন নেতাজী সুভাষ মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার জন্য বাংলা পড়ানোয় অভিজ্ঞ শম্পা অ্যাডামাস রাইস টাইমস ম্যাগাজিনে কলম ধরেছেন। এছাড়া আজকাল পত্রিকা ও আরো খবরে সম্পাদকীয় কলমে লেখেন।। প্রবন্ধ পাঠে বিশেষ দক্ষ শম্পা পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের যুব উৎসব প্রতিযোগিতায় ব্লক ও জেলা স্তরে প্রথম এবং রাজ্য স্তরে তৃতীয় স্থান অর্জন করেছিলেন। আকাশবাণী কলকাতা থেকে শিশুমহল ও গল্পদাদুর আসরে নজরুলগীতি বিভাগে উত্তীর্ণ।
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular