দুর্গাপুজো মানেই ঢাকের আওয়াজ, মাটিতে পড়ে থাকা শিউলি ফুল, ট্রেনলাইনের ধার ঘেঁষা জমিতে গজিয়ে ওঠা কাশফুলের মেলা। সেলিব্রেশন মানে অঞ্জলি,প্যান্ডেল হপিং, ঠাকুর দেখা, নবমীতে কচি পাঁঠার মাংস আর হলুদ পোলাও, বন্ধুদের সঙ্গে রিউনিয়ন। নব্বই দশকের ছেলেমেয়ে বলা ভাল, মিলেনিয়ালদের কাছে পুজোয় আনন্দ বা দুর্গাপুজো বলতে ছিল এই সবকিছু। তবে এখনকার জেনারেশনের কাছেও কি দুর্গাপুজোর আনন্দ একই রয়েছে? যুগ বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে মানুষের পছন্দ-অপছন্দের তালিকাতেও আসছে বিরাট বদল। তাহলে এখনকার জেনারেশন দুর্গাপুজো কীভাবে সেলিব্রেট করবে? জেন জি-দের পছন্দই কোনটা? নাকি নিজেদের স্টাইলে মজা আর আনন্দে মেতে উঠছে ওরা। নতুন জেনারেশনে পুজোতে সেলিব্রেশনের সংজ্ঞা বদলে যাচ্ছে?
স্মার্টফোন, সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে হাল আমলে আনন্দের থেকেও ট্রেন্ডে গা ভাসানো যেন ইয়ং-জেনারেশনের কাছে বেশি ইম্পর্ট্যান্ট। সোশ্যাল মিডিয়ায় এন্ডলেস পসিবিলিটিস, নতুন জায়গা এক্সপ্লোর করা এখন ওদের কাছে ট্রেন্ডিং। তাই প্রশ্ন উঠছে ঠাকুর দেখার থেকে ওরা কি রিল, ক্যাফে আর আউটফিট হপিং-এর দিকেই বেশি ঝুঁকছে!
প্যান্ডেল হপিং করার প্রবণতা কি কমছে?
অনেকে মনে করেন জেন জি-রা হয়তো ভিড় থেকে ঠাকুর দেখতে একদমই পছন্দ করে না কিন্তু সেটা কিন্তু সম্পূর্ণভাবে সঠিক নয়। একদল রয়েছে যারা এখনও প্যান্ডেল হপিং করে। ভিড়ে লাইন দিয়ে ঠাকুর দেখা ছাড়া পুজো ইনকমপ্লিট তাদের কাছে। আবার কেউ কেউ ভিড় অপছন্দ করে ঠিকই, তবে পুজো মণ্ডপের ভিআইপি পাস পেলেই ঠাকুর দেখতে যাওয়ায় তারা এক পায়ে খাড়া। অর্থাৎ এই প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা অর্থাৎ জেন জি-দের প্যান্ডেল হপিং-এ আগ্রহ নেই এমনটা কিন্তু নয়। জেনেরেশনের কিছু ছেলেমেয়ে হয়তো ভিড় পছন্দ করেনা। কিন্তু সেক্ষেত্রে গোটা প্রজন্মকেই এই ক্যাটেগরির মধ্যে ফেলা ঠিক হবে না।

ঠাকুর দেখা মানেই ফটোগ্রাফিও
আগের প্রজন্মের কাছে ঠাকুর দেখা মানেই ছিল প্রতিমা দর্শন, প্যান্ডেলে আড্ডা, পুজো পুজো পরিবেশটা উপভোগ করা, জেনারেশন z-এর কাছে এসবকিছুর পাশপাশি আরও একটা লেয়ার অ্যাড হয়েছে, যা হল কন্টেন্ট ক্রিয়েশন।
দুর্গাপুজোর প্যান্ডেলের থিম. কোথাকার কোন থিম হয়েছে. প্রতিমার সাজসজ্জা, প্যান্ডেল সজ্জা, আলোকসজ্জা থেকে প্রতিমার শিল্পসজ্জা সবকিছুতেই রয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার কন্টেন্টের সম্ভাব্য উপাদান। কোন মন্ডপ সবথেকে ভিস্যুয়াল অ্যাপিলিং, কোন মণ্ডপে সিনেম্যাটিক ব্যাকগ্রাউন্ড রয়েছে
এগুলোও তাদের প্যান্ডেল হপিং-এর প্ল্যানিয়ের অংশ। এখন সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টই হয়ে উঠছে নিজস্ব পুজো ডায়রি। প্রত্যেক বছরের পুজোর স্মৃতি জমা থাকে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামের স্টোরি আর রিলে। সেখানে কখনও ধরা পড়ছে ষষ্ঠীর সন্ধ্যার আলো, আবার কখনও ধরা পড়ছে সপ্তমীতে কলাবউ স্নান, অষ্টমীর অঞ্জলি, নবমীর কুমারি পুজো কিংবা দশমীর সিঁদুরখেলা।
পুজো মানেই ফ্যাশন
বাঙালির কাছে পুজো মানেই ফ্যাশন। সে মিলেনিয়াল হোক কিংবা জেন জি, পুজোর সময় ফ্যাশন ইন থাকতে কে না চায়। চতুর্থী, পঞ্চমী থেকে দশমী পর্যন্ত হাল আমলের আউটফিটে নিজেদের সাজিয়ে রাখা কমপালসারি। অষ্টমী আর দমশীর জন্য তো লাল সাদা রঙও ম্যানডেটরি। তাই ফ্যাশন ছাড়া পুজো প্রায় অসম্পূর্ণ।
আগে পুজোর শপিং হত মহালয়ার পর। এখন তো এক-দু মাস আগে থেকেই শুরু হয়ে যায় কেনাকাটা। কোন দিন কোন আউটফিট পড়া হবে তাও বহু আগে থেকেই ঠিক হয়ে যায়। জেন জি-রা ফ্যাশনের ব্যাপারে আরও বেশি অ্যাডভান্স।
পুজো আউটফিট ওদের কাছে শুধু পোশাক পরা নয়, নিজেদের সেই লুকে এলিভেট করাও অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তাদের কাছে। ষষ্ঠীতে যদি তারা এলিগ্যান্ট এথনিক লুকে নিজেদের সাজিয়ে নেয়, তাহলে সপ্তমীতে তাঁরা আউটফিট হিসেবে বেছে নেবে শাড়ি আর ছেলেরা কুর্তা। অষ্টমীতে তারা অবশ্যই অপশন
হিসেবে বেছে নেবে ট্র্যাডিশনাল অ্যাটায়ার, নবমীতে মাতাবে গ্ল্যামারাস ইন্দো-ওয়েস্টার্ন লুক। দশমীতে বাঙালিয়ানায় মোড়া আটপৌরে শাড়ি আর ছেলেরা ধুতি পাঞ্জাবিতে সাজিয়ে নেবে নিজেদের।
আর এর সঙ্গে তো ফুটওয়ের, জুয়েলারি, মেকআপ, হেয়ারস্টাইল তো রয়েছে। সেগুলোতে যে ইনস্টাগ্রাম ফ্রেন্ডলি অ্যাসথেটিকস থাকবে তা তো বলাই বাহুল্য।
কী পরব থেকে, সোশ্যাল মিডিয়ায় কীভাবে পোস্ট করব?
আজকের জেন-z জেনারেশনের জীবনে সোশ্যাল মিডিয়া একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
তারা জীবনের সব আপডেট সেখানে শেয়ার করে। তাদের জীবনে লাইক, ফলোয়ার খুবই ম্যাটার করে। সেখানে পুজোর মতো একটা ভাইব্র্যান্ট ব্যাপার তো তারা সোশ্যাল মিডিয়ার দেওয়ালে তুলে ধরবেই। অর্থাৎ পুজো আউটফিটের কীভাবে ফটোগ্রাফ বা ভিডিও প্রেসেন্ট করা হবে সেটাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

ডিজিটাল সেলিব্রেশন
গেট রেডি উইথ মি থেকে শুরু করে মিরর সেলফি, আউটফিট ট্রান্সিশন, বিভিন্ন লুকের রিল বা স্লো মোশন ভিডিও সবই জেন-z জেনারেশনের ডিজিটাল সেলিব্রেশনের অংশ।
প্যান্ডেল হপিং-এর পাশাপাশি ক্যাফে হপিং
বাঙালির কোনও অনুষ্ঠানই পেটপুজো ছাড়া একেবারে ইনকম্প্লিট। জেনারেশন Z-এর সেই অবসেশন পৌঁছেছে অন্য মাত্রায়।
আগে মণ্ডপের পাশে স্ট্রিট ফুডের স্টলে ভিড় করত সকলে। ফুচকা, চাউমিন, এগরোল খাওয়া চলত জোরকদমে। আর এখন এসবের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ক্যাফে হপিং। পুজোর দিনগুলোতে ফ্রেন্ড গ্রুপের সঙ্গে এক ক্যাফে থেকে অন্য ক্যাফেতে জমে ওঠে আড্ডা, পাশাপাশি চলে নতুন কোনও ফুড আইটেম ট্রাই করা। সেইসব ইনস্টাগ্রাম ওর্দি ছবি মুঠোফোনে বন্দি করাও হয়ে ওঠে এই জেনারেশনের অন্যতম কাজ। কফি, মকটেল, আড্ডা, ইনস্টাগ্রামের অ্যাসথেটিক ফটোশুট এইসবই হয়ে ওঠে তাদের পুজো সেলিব্রেশনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে।
সঙ্গে সেলফি
ফ্যাশন, মেকআপ, আলোর ঝলকানি আর ঠাকুরের সামনে দাঁড়িয়ে একটা পারফেক্ট সেলফি, জেন z-দের কাছে দুর্গাপুজোর ছবিটা ঠিক এমনই। প্যান্ডেল হপিং-এর পাশপাশি সমান গুরুত্বপূর্ণ সেলফি তোলা, সেই ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাগ করে নেওয়া। কিন্ত দুর্গাপুজো উদযাপনে সেলফি শুধু স্মৃতি ধরে রাখার মাধ্যমই নয়, হয়ে উঠছে নিজেকে প্রকাশ করার এক নতুন ভাষা।
অ্যাইসথেটিক পুজো
এই প্রজন্মের কাছে অ্যাইসথেটিক খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পুজোর ডেকরেশন থেকে শাড়ির আঁচল,ধূপের ধোঁয়া, আলপনা, ঢাক , আলোকসজ্জা সবকিছুর মধ্যেই অ্যাসথেটিক এলিমেন্ট খোঁজে এই জেনারেশন।
পুরনো বনেদি বা জমিদার বাড়ির পুজোও এই প্রজন্মের কাছে বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। পুরনো বনেদি বাড়ির পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে হেরিটেজ, ট্র্যাডিশন, ভিস্যুয়াল স্টোরি-টেলিং। তাই পুরনো বনেদি বা জমিদার বাড়ির পুজোর দিকে ঝুঁকছে ইয়ং জেনারেশন।
অর্থাৎ একদিকে ক্যাফের পাশাপাশি অন্যদিকে জমিদার বাড়ির পুজোর এই কনট্রাস্ট জেনারেশন Z-এর কনটেন্ট ক্রিয়েশনের টপিক হয়ে উঠছে।

অষ্টমীর অঞ্জলি এখনও গুরুত্বপূর্ণ
তবে সোশ্যাল মিডিয়ার বাইরেও কিন্তু পুজো সেলিব্রেশনে মেতে ওঠে জেনারেশন Z। অষ্টমীর সকালে অঞ্জলি দিতে যাওয়া, পরিবারের সঙ্গে পুজো মণ্ডপে সময় কাটানো কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা এগুলির সঙ্গে জেন Z -দেরও একটা ইমোশনাল কানেকশন রয়েছে।
জেন Z -দের কাছেও বন্ধুদের সঙ্গে রাত জাগা, মায়ের সঙ্গে অষ্টমীর অঞ্জলি দেওয়া এগুলি তো রয়েছে।
তারা পাশাপাশি মডার্নিটি ও ট্র্যাডিশন দুটোকেই পাশে রাখতে চায়। Raise Your Concern About this Content
কনটেন্ট ফেস্টিভ্যাল
সোশ্যাল মিডিয়া পুজোকে ভিস্যুয়াল ড্রাইভেন করে তুলছে। পুজো আজকাল ক্যামেরা ফ্রেন্ডলি হয়ে উঠছে। কোন আউটফিটে নজরকাড়া দেখাবে, কোথায় ছবি তুললে ভালো লাগবে, কোন রিল বেশি ভিউ পাবে এগুলোও সেলিব্রেশনের অংশ হয়ে উঠবে।
ট্র্যাডিশন না ট্রেন্ড, জেন z-এর কাছে কোনটা প্রাধান্য?
দুটোর মধ্যে যেকোনও একটাকে চুজ করতে হবে এমন কোনও কথা নেই। সকালে অঞ্জলি দিয়ে বিকেলে ক্যাফেতে যাওয়া যায়। জেন z-রা চাইলে শাড়ির সঙ্গে স্নিকার পরতে পারবে। প্যান্ডেলে প্রতিমা দর্শনের পর বানাতে পারে রিলও। ঢাকের তালে নাচও চলবে আর ক্যাফেতে বসে কফিও খাবে।
জেন z -রা পুজোকে বদলে দিচ্ছে না, বরং নিজেদের ভাষায় নতুন করে পুজো উদযাপন করছে।
তাদের পুজোয় যেমন আছে মায়ের সামনে দাঁড়ানোর আবেগ, তেমনই আছে স্মার্টফোন ক্যামেরা। পুজোর নস্টালজিয়ার সঙ্গে ক্যাফে হপিং সবকিছুই মিলেমিশে একাকার হয়ে যাবে। শাড়ি পাঞ্জাবির সঙ্গে স্নিকার আর ইন্দো ওয়েস্টার্ন ফ্যাশন সব মিলিয়ে জেন-z দের পুজো জমজমাট। ঠাকুর দেখা আর রিল ক্যাফে হপিং বা আউটফিটের মধ্যে বেছে নেওয়া নয়। পুজোর সেলিব্রেশনকে জেন z-রা নিজেদের মতো করে পাল্টে ফেলছে।
অঞ্জলির ফুল আর স্মার্টফোন দুটোই জায়গা করে নিচ্ছে হাতে। ঢাকের শব্দের পাশপাশি রিলের মিউজিক হয়ে উঠছে এন্টারটেনমেন্ট। প্যান্ডেলের সঙ্গে সঙ্গে থাকছে ক্যাফে হপিং-ও। কিন্তু এসবের মাঝে কিন্তু একটুও বদলাচ্ছে না পুজোর আনন্দ। বদলে যাচ্ছে খালি পুজো উপভোগ করার ভাষা।
তথ্যসূত্র
১. কুমোরটুলি থেকে ঢাক-ধুনুচি, ইনস্টাগ্রাম রিলসে পুজোর নতুন উন্মাদনা
২. সাবেকি পুজো নাকি থিমের চমক? কী পছন্দ জেন জি প্রজন্মের?
৩. ব্যোমকেশ থেকে বদ্রীনাথ, কলকাতার থিমপুজোয় সৃজনশীলতার নতুন দিগন্ত
৪. পুজোর কেনাকাটা ও খাওয়াদাওয়ায় জমজমাট কলকাতার শপিং মল ও রেস্তোরাঁ
৫. জেন জি-র পুজোর ফ্যাশনে আরাম, স্টাইল ও পরিবেশবান্ধব পোশাকের মেলবন্ধন



