শরতের আকাশে মেঘের ভেলা ভাসতে শুরু করলেই শহরের মনটা কেমন যেন বদলে যায়। রাস্তার ধারে ধারে বাঁশের কাঠামো, মণ্ডপ তৈরির ব্যস্ততা, আলোর মালা আর নতুন জামাকাপড়ের গন্ধ—সব মিলিয়ে বোঝা যায়, মা আসছেন। কলকাতার মতোই নদিয়ার কল্যাণীও তখন নিজের চেনা ছন্দ ছেড়ে ঢুকে পড়ে উৎসবের জগতে। তবে কল্যাণীর পুজোর একটা আলাদা মেজাজ রয়েছে। পরিকল্পিত শহরের চওড়া রাস্তা, সবুজে ঘেরা পাড়া আর এক মণ্ডপ থেকে অন্য মণ্ডপে সহজে পৌঁছে যাওয়ার সুযোগ—সব মিলিয়ে পুজোর ক’দিন কল্যাণী হয়ে ওঠে প্যান্ডেল-পরিক্রমার অন্যতম আকর্ষণীয় ঠিকানা।
শুধু পুজো দেখাই নয়, কল্যাণীর পুজোর সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে রয়েছে আড্ডা আর খাওয়াদাওয়া। একটি মণ্ডপ দেখে বেরিয়ে একটু হাঁটলেই কোথাও বিরিয়ানি, কোথাও চিনা খাবার, কোথাও রোল-মোমো, আবার কোথাও বসে বাঙালি খাবার খাওয়ার সুযোগ। অর্থাৎ চোখের জন্য মণ্ডপ, কানের জন্য ঢাক আর জিভের জন্য পছন্দের খাবার—পুজোর আনন্দ যেন তিন দিক থেকেই পূর্ণ।
কল্যাণীর সবচেয়ে পরিচিত পুজোগুলির মধ্যে আইটিআই মোড়ের লুমিনাস ক্লাব এবং সেন্ট্রাল পার্কের পুজো বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য। সাম্প্রতিক পুজো-রুটগুলিতে এর সঙ্গে রথতলা, এ-৯ স্কোয়ার এবং বোট পার্ককেও যুক্ত করা হয়েছে।
তাই এ বার কল্যাণীর পুজো দেখতে যাওয়ার আগে শুধু মণ্ডপের তালিকা নয়, সঙ্গে রাখুন খাবারেরও একটা ছোট্ট মানচিত্র।
আইটিআই মোড়ের লুমিনাস ক্লাব: মণ্ডপের পাশেই ধাকেশ্বরী, রয়্যাল হাট

কল্যাণীর পুজোর কথা উঠলেই যে নামটি সবার আগে আসে, তার মধ্যে অন্যতম আইটিআই মোড়ের লুমিনাস ক্লাব। বড় মণ্ডপ, আলো এবং প্রতি বছরই নতুন ভাবনায় দর্শকদের চমকে দেওয়ার চেষ্টা—এই পুজোকে ঘিরে কল্যাণীর বাইরের মানুষেরও উৎসাহ থাকে। ২০২৬-এ লুমিনাস ক্লাবের মণ্ডপের ভাবনায় রয়েছে মায়ানমারের ইয়াঙ্গনের সোয়ে তাও মিয়াত প্যাগোডা। পুজোর মণ্ডপ তৈরি শুরু হওয়ার খবরও প্রকাশিত হয়েছে চলতি বছরেই।
মণ্ডপটি রয়েছে বি-৯, ব্লক বি, কল্যাণী, নদিয়া—৭৪১২৩৫ ঠিকানায়।
এখানে ঠাকুর দেখে বেরিয়ে খাবারের জন্য প্রথমেই রাখা যায় Dhakeswari Palace। আইটিআই মোড়ের কাছেই বি-৮/৪ (সি.এ), ব্লক বি, কল্যাণী—৭৪১২৩৫ ঠিকানায় এই রেস্তরাঁ। বিরিয়ানি বা মুঘলাই ধরনের খাবার খেতে চাইলে পুজোর রাতের খিদে মেটানোর একটি পরিচিত বিকল্প।
চিনা খাবার পছন্দ হলে একই এলাকার বি-৮/৯ (সি.এ), বি-ব্লক, কল্যাণী—৭৪১২৩৫ ঠিকানায় রয়েছে Dhakeswari Chinese Restaurant And Caterers। অর্থাৎ একই মণ্ডপের কাছে খাবারের ধরন বদলানোর সুযোগও রয়েছে।
আর একটু কাছেই রয়েছে ROYAL HUT RESTAURANT & CATERER। ঠিকানা আইটিআই মোড় দুর্গাপুজো মাঠ সংলগ্ন, বি-১৬/১৯, এ-বি কানেক্টর, বি-১৬, ব্লক বি, কল্যাণী—৭৪১২৩৫। উত্তর ভারতীয় খাবারের জন্য এই জায়গাটি তালিকায় রাখা যেতে পারে।
যাঁরা ভারী খাবারের বদলে হালকা কিছু খেয়ে পরের মণ্ডপে যেতে চান, তাঁদের জন্য আইটিআই মোড়ের আশপাশে মোমো, রোল ও অন্যান্য দ্রুত খাবারের দোকানও রয়েছে। ফলে লুমিনাস ক্লাবের পুজো দিয়ে শুরু করাটা শুধু চোখের জন্য নয়, পেটের জন্যও সুবিধাজনক।
সেন্ট্রাল পার্কের পুজো: কস্তুরি, চাউম্যান থেকে স্ট্রিট ফুড

আইটিআই মোড় থেকে পুজোর রুট এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায় সেন্ট্রাল পার্কের দিকে। কল্যাণীর সেন্ট্রাল পার্ক শুধু একটি পার্ক নয়, শহরের সামাজিক জীবনেরও গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। পুজোর সময়ে এই এলাকা আরও জমজমাট হয়ে ওঠে। সেন্ট্রাল পার্কের পুজোকে কল্যাণী টাউনশিপের অন্যতম পুরনো ও জনপ্রিয় পুজো হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
সেন্ট্রাল পার্কের পুজো দেখতে গিয়ে খিদে পেলে কাছেই রয়েছে Kasturi Restaurant – Kalyani। ঠিকানা বি-১৪, ব্লক বি, কল্যাণী, নদিয়া—৭৪১২৩৫। একটু বসে খেয়ে ফের প্যান্ডেল ঘোরার পরিকল্পনা থাকলে এই জায়গাটি তালিকায় রাখা যায়।
চিনা খাবারের ভক্তদের জন্য রয়েছে Chowman (Kalyani)। ঠিকানা বি-৯, ব্লক বি, কল্যাণ—৭৪১২৩৫, পিএনবি অক্ষয় শাখার পাশে। পুজোর রাতে বিরিয়ানি বা বাঙালি খাবারের বদলে নুডলস, মোমো বা অন্য চিনা খাবারে স্বাদ বদল করতে চাইলে এই ঠিকানাটি কাজে আসতে পারে।
তবে সেন্ট্রাল পার্কের খাবারের আকর্ষণ শুধু বড় রেস্তরাঁয় আটকে নেই। পার্ক সংলগ্ন এলাকায় ছোট খাবারের দোকান ও দ্রুত খাবারের জায়গাও রয়েছে। যেমন Brother’s Street Food Center রয়েছে সেন্ট্রাল পার্ক, বি টি কলেজ, বি-১৩, মোর, কল্যাণী—৭৪১২৩৫ ঠিকানায়। সন্ধ্যার পরে দ্রুত কিছু খেয়ে আবার মণ্ডপের পথে বেরিয়ে পড়তে চাইলে এই ধরনের জায়গা বেশ সুবিধাজনক।
আর পিৎজার ইচ্ছে হলে সেন্ট্রাল পার্কের বি-১৩ মার্কেট, দোকান নম্বর ১৯এস-এ রয়েছে 4Slices- Pizzeria and Cafe। পুজোর প্রচলিত ফুচকা, রোল, বিরিয়ানি থেকে একটু আলাদা কিছু খেতে চাইলে তরুণদের কাছে এই ধরনের খাবারও আকর্ষণীয় হতে পারে।
রথতলার পুজো: পথে খাবারের জন্য বি-ব্লকই ভরসা
২০২৬-এর কল্যাণীর পুজো-রুটে আইটিআই মোড়ের পর রথতলাকে রাখা হয়েছে। রথতলার পুজো দেখে সেন্ট্রাল পার্কের দিকে যাওয়ার পরিকল্পনা করলে বি-ব্লকের খাবারের জায়গাগুলিকে রুটের সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া যায়।
বিশেষ করে বিরিয়ানি বা মুঘলাই খাবারের জন্য ধাকেশ্বরী প্যালেস, চিনা খাবারের জন্য ধাকেশ্বরী চিনা রেস্তরাঁ এবং বসে খাওয়ার জন্য কস্তুরি—এই তিনটি বিকল্প একই বৃহত্তর বি-ব্লক এলাকার মধ্যে পড়ে। ফলে প্যান্ডেল-পরিক্রমার মাঝে খাবারের জন্য খুব বেশি দূরে যাওয়ার প্রয়োজন হয় না।
আর যদি খুব বেশি সময় না থাকে, হাতে রোল বা মোমো নিয়ে ফের মণ্ডপের দিকে চলে যাওয়াই ভালো। পুজোর রাতে দীর্ঘ সময় রেস্তরাঁয় বসে থাকার বদলে অনেকেই এই দ্রুত খাবারের পথ বেছে নেন।
এ-৯ স্কোয়ার: পুজোর ভিড়ের মাঝে স্টেশন রোডের খাবার
কল্যাণীর এ-৯ স্কোয়ারও ২০২৬-এর উল্লেখযোগ্য পুজোর তালিকায় রয়েছে। সাম্প্রতিক পুজো-তালিকায় এই পুজোর নাম এবং আইটিআই মোড়, সেন্ট্রাল পার্ক, বোট পার্কের সঙ্গে এর রুটও দেখানো হয়েছে।
এ-৯ স্কোয়ারের দিকে ঘোরার সময়ে খাবারের জন্য স্টেশন রোডের দিকটাও মাথায় রাখা যায়। এ-১, ব্লক এ-১, ৯, কল্যাণী স্টেশন রোড, কল্যাণী—৭৪১২৩৫ ঠিকানায় রয়েছে Salsa Restaurant।
এখানে বসে খাবারের পরিকল্পনা করা যেতে পারে। আর একই স্টেশন রোড এলাকায় রয়েছে Rasoi Restaurant। ঠিকানা এ-৯এক্স, কল্যাণী স্টেশন রোড, কল্যাণী—৭৪১২৩৫।
অর্থাৎ এ-৯ স্কোয়ারের পুজো ঘোরার সঙ্গে স্টেশন রোডকে খাবারের একটি আলাদা পর্ব হিসেবে রাখা যায়।
এ-ব্লকের পুজো: সালসা থেকে রসোই
কল্যাণীর এ-ব্লক পুজোর সময় এমনিতেই ব্যস্ত হয়ে ওঠে। পুজোর সময়ে এ-ব্লক, বি-ব্লক এবং সেন্ট্রাল পার্ককে শহরের সবচেয়ে জমজমাট অঞ্চলগুলির মধ্যে ধরা হয়। স্থানীয় আলোচনাতেও এই এলাকাগুলিকে পুজোর সময়ের গুরুত্বপূর্ণ আড্ডা ও প্যান্ডেল-পরিক্রমার অঞ্চল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই এলাকায় খাবারের জন্য আগে থেকেই কয়েকটি ঠিকানা মাথায় রাখা যায়। সালসা রেস্তরাঁর পাশাপাশি রসোই রেস্তরাঁ রয়েছে। আর একটু অন্য ধরনের খাবার চাইলে এ-ব্লকের দিকে রয়েছে Wow! Momo—এ-১, ভানুমতী রোড, ব্লক এ-১, কল্যাণী—৭৪১২৩৫।

পুজোর রাতে দল বেঁধে ঘোরার সময়ে মোমোর মতো দ্রুত খাবার বেশ সুবিধাজনক। এক প্লেট ভাগ করে খাওয়া, একটু আড্ডা, তার পর আবার পরের মণ্ডপ—পুজোর রাতের এই ছোট ছোট বিরতিই অনেক সময় সবচেয়ে বেশি মনে থাকে।
বোট পার্কের পুজো: জলপাড়ের পথে খাবারের পরিকল্পনা
কল্যাণীর ২০২৬-এর পুজো-রুটে বোট পার্ককেও অন্যতম উল্লেখযোগ্য গন্তব্য হিসেবে রাখা হয়েছে।
বোট পার্কের দিকে যাওয়ার আগে সেন্ট্রাল পার্ক বা বি-ব্লকের এলাকায় খাবার সেরে নেওয়া যেতে পারে। কারণ পুজোর রুটে একাধিক মণ্ডপ একসঙ্গে ধরলে মাঝে খাবারের জন্য একটি নির্দিষ্ট জায়গা বেছে নেওয়াই সময় বাঁচায়।
সেন্ট্রাল পার্কের আশপাশে কস্তুরি, চাউম্যান, ব্রাদার্স স্ট্রিট ফুড সেন্টার বা ৪স্লাইসের মতো বিকল্প রয়েছে। ফলে বোট পার্ককে দিনের বা রাতের শেষ গন্তব্য ধরে তার আগে খাবারের বিরতি নেওয়া যেতে পারে।
যাঁরা পুজো দেখতে গিয়ে বেশি হাঁটতে চান না, তাঁদের জন্য এই পরিকল্পনা আরও সুবিধাজনক—প্রথমে একটি বড় মণ্ডপ, তার পরে কাছাকাছি খাবার, তারপর পরের মণ্ডপ।Raise Your Concern About this Content
এক রাতেই পুরো কল্যাণী? রুটটা হোক পরিকল্পনা করে
কল্যাণীতে পুজো দেখতে গেলে সবচেয়ে বড় সুবিধা হল, বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ মণ্ডপকে একটি রুটে ধরা যায়। ২০২৬-এর একটি প্রস্তাবিত রুটে আইটিআই মোড় → সেন্ট্রাল পার্ক → হাউজিং এস্টেট → আয়ান বিহার → বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ধরার কথা বলা হয়েছে। অন্য সাম্প্রতিক তালিকায় আইটিআই মোড় → রথতলা → সেন্ট্রাল পার্ক → এ-৯ স্কোয়ার → বোট পার্ক রুটও দেখানো হয়েছে।
তাই পুজোর রাতে সব মণ্ডপ একসঙ্গে দেখার চেষ্টা না করে অঞ্চল ধরে এগোনোই সুবিধাজনক। প্রথম দিন আইটিআই মোড় ও বি-ব্লক, দ্বিতীয় দিন সেন্ট্রাল পার্ক ও এ-৯ স্কোয়ার, অন্য দিন রথতলা ও বোট পার্ক—এইভাবে ভাগ করে নিলে পুজো দেখার আনন্দও থাকবে, হাঁটার ক্লান্তিও কমবে।
আর প্রতিটি রুটের মাঝখানে খাবারের একটা নির্দিষ্ট বিরতি রাখলে পুজোর রাত আরও আরামদায়ক হয়ে উঠবে।
কল্যাণীর পুজো তাই শুধু বিশাল মণ্ডপের গল্প নয়। এখানে পুজো মানে চওড়া রাস্তা ধরে হাঁটা, পরিচিত কারও সঙ্গে হঠাৎ দেখা হয়ে যাওয়া, মণ্ডপের সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তোলা, ঢাকের আওয়াজে কয়েক মুহূর্ত থেমে যাওয়া। আর তারপরই কোথাও একটা খাবারের গন্ধ নাকে এসে পৌঁছনো।
হয়তো আইটিআই মোড়ের মণ্ডপ দেখে বেরিয়ে বিরিয়ানির গন্ধ টানবে। হয়তো সেন্ট্রাল পার্কের পুজো ঘুরে মোমো কিংবা পিৎজা খেতে ইচ্ছে করবে। কখনও আবার শুধু এক কাপ চা আর সামান্য আড্ডাই যথেষ্ট মনে হবে। পুজোর আনন্দের কোনও নির্দিষ্ট নিয়ম নেই—যে যার মতো করে তাকে সুন্দর করে।
কারণ পুজোর কলকাতা বা কল্যাণী—কোথাও উৎসব শুধু চোখের নয়। মণ্ডপের আলো চোখে থাকে, ঢাকের শব্দ কানে থাকে, আর ভাল খাবারের স্বাদ থেকে যায় মনে। সেই জন্যই হয়তো পুজোর রাত শেষ হয়ে গেলেও, একটা শহরের উৎসবের স্মৃতি এত সহজে শেষ হয় না।
তথ্যসূত্র
১. কল্যাণী দুর্গাপুজো
২. কল্যাণীতে খাওয়া দাওয়া



