উ: কলকাতার জনপ্রিয় প্যান্ডেলগুলির আশেপাশে কোথায় কী খাবেন
শিউলির গন্ধে ভোর, কাশফুলের দোল আর ঢাকের শব্দে শহর যখন ধীরে ধীরে উৎসবের পোশাক পরে, তখন কলকাতার গলিগুলিও যেন নতুন করে জেগে ওঠে। পুজোর ক’টা দিন এই শহরে পথই হয়ে ওঠে গন্তব্য। এক মণ্ডপ থেকে আর এক মণ্ডপে হাঁটা, আলোর সাজ দেখতে দেখতে পুরনো পাড়ার অলিগলি পেরিয়ে যাওয়া, কোথাও ধুনোর গন্ধ, কোথাও ঢাকের তালে জমে ওঠা ভিড়—উৎসবের কলকাতাকে চেনার এ এক আলাদা উপায়।
আর উত্তর কলকাতা? সেখানে পুজো দেখা মানেই যেন সময়ের ভিতর দিয়ে হাঁটা। বাগবাজার থেকে কুমারটুলি, আহিরীটোলা থেকে শোভাবাজার, হাতিবাগান পেরিয়ে শ্যামবাজার—প্রতিটি পাড়ারই রয়েছে নিজস্ব গল্প, নিজস্ব ঐতিহ্য। বনেদি বাড়ির পুজো থেকে জনপ্রিয় বারোয়ারি মণ্ডপ, প্রতিমার বৈচিত্র্য থেকে আলোর কারুকাজ—চোখের সামনে একের পর এক বদলে যায় দৃশ্যপট।

কিন্তু ঘণ্টার পর ঘণ্টা হাঁটতে হাঁটতে যখন পেটেও ঢাক বাজতে শুরু করবে? তখন ঠাকুর দেখার পথেই খুঁজে নিতে হবে পেটপুজোর ঠিকানা। কারণ উত্তর কলকাতার পুজো শুধু চোখের উৎসব নয়, জিভেরও উৎসব। পুরনো কেবিনের কাটলেট, ধোঁয়া ওঠা বিরিয়ানি, মুঘলাই খাবার, বাঙালির মাছ-মাংস কিংবা এক কাপ গরম চায়ের সঙ্গে টুকিটাকি—প্যান্ডেল থেকে কয়েক পা দূরেই অপেক্ষা করে থাকে নানা স্বাদের গল্প।
তাই এ বার ঠাকুর দেখতে বেরোনোর আগে শুধু কোন মণ্ডপে যাবেন, সেই তালিকা নয়। সঙ্গে রাখুন খাবারের ঠিকানার তালিকাও। কোন প্যান্ডেলের কাছেই বা কোথায় মিলবে কী খাবার, কোথায় বসে একটু বিশ্রাম নেওয়া যায়, আর কোন পথে হাঁটলে একসঙ্গে কয়েকটি পুজো ও কয়েকটি খাবারের ঠিকানা ছুঁয়ে ফেলা যায়—উত্তর কলকাতার সেই স্বাদের মানচিত্রেই শুরু হোক এ বারের পুজো পরিক্রমা।
নলিনী সরকার স্ট্রিট—মণ্ডপের ভিড় পেরিয়ে খাবারের গন্ধ
নলিনী সরকার স্ট্রিটের পুজো দেখতে গেলে আলাদা করে খাবারের পরিকল্পনা না করলেও চলবে। কারণ মণ্ডপের আশপাশের রাস্তাতেই রয়েছে একাধিক খাবারের ঠিকানা। বর্তমান স্থানীয় তালিকাতেও নলিনী সরকার স্ট্রিটের খুব কাছে মিষ্টির দোকান ও রেস্তরাঁর উল্লেখ রয়েছে।
এখানে পুজো দেখে শ্যামবাজারের দিকে এগোলে পাওয়া যাবে খানা খাজানা। শিকদার বাগান স্ট্রিট, শ্যামবাজার-শোভাবাজার অঞ্চলের এই রেস্তরাঁটি তুলনামূলক সহজলভ্য একটি বিকল্প।
আর একটু জমিয়ে খেতে চাইলে হাতিবাগানের দিকে ফিরে আসা যায়। সরষে পোস্ত-র ঠিকানা ১০৪, গ্রে স্ট্রিট, শোভাবাজার, হাতিবাগান ক্রসিং। নামেই যখন সরষে-পোস্ত, তখন বাঙালির চেনা স্বাদের দিকে যাঁদের টান, তাঁদের জন্য এই ঠিকানাটি ফিচারে রাখাই যায়।

বাগবাজার সর্বজনীনের কাছে — নীলাচল ও ব্রাদার্স কাবাব
বাগবাজার সর্বজনীন উত্তর কলকাতার অন্যতম পরিচিত পুজো। ৭৮, বাগবাজার স্ট্রিটে এই পুজো।
এই প্যান্ডেল ঘুরে কাছেই খেতে চাইলে যেতে পারেন Neelachal Restaurant Bagbazar-এ। ঠিকানা ৬৫/৫এ, বাগবাজার স্ট্রিট, বাগবাজার, কলকাতা – ৭০০০০৩। বাগবাজারের মধ্যেই হওয়ায় ঠাকুর দেখার পর খাবারের জন্য এটি সুবিধাজনক একটি ঠিকানা।
আর একটু জমিয়ে মাংসের পদ খেতে চাইলে রয়েছে Bro’s Kebab। ঠিকানা ৭২/১/১, বাগবাজার স্ট্রিট, বাগবাজার, কলকাতা – ৭০০০০৩। অর্থাৎ বাগবাজার পুজো থেকে খুব বেশি দূরে না গিয়েই খাওয়ার ব্যবস্থা করা যায়।

কুমারটুলি—মাটির গন্ধ থেকে ক্যাফের টেবিলে
কুমারটুলিতে ঠাকুর দেখা মানে শুধু পুজো দেখা নয়, মৃৎশিল্পীদের পাড়ার ভিতর দিয়ে হাঁটা। প্রতিমা তৈরির সেই চেনা পরিবেশ পুজোর সময় অন্য রূপ নেয়। কুমারটুলি ঘুরে শোভাবাজারের দিকে বেরিয়ে আসা যায়।
এই পথে অন্যতম পরিচিত খাবারের ঠিকানা মিত্রা ক্যাফে। কুমারটুলির কাছাকাছি শোভাবাজারের ৪৭, যতীন্দ্রমোহন অ্যাভিনিউ, রাজা নবকৃষ্ণ স্ট্রিটের এই পুরনো খাবারের জায়গাটি কলকাতার কেবিন-সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি নাম। কুমারটুলি এলাকার কাছাকাছি খাবারের তালিকাতেও মিত্রা ক্যাফের উল্লেখ রয়েছে।
আর যদি খুব হালকা কিছু দিয়ে শুরু করতে চান, কুমারটুলি থেকে স্ট্র্যান্ড ব্যাঙ্ক রোডের দিকে রয়েছে বাউন্ডুলে ক্যালকাটা কুমারটুলি।
আহিরীটোলা—গঙ্গার হাওয়া আর অন্য স্বাদের খাবার
আহিরীটোলার দিকে পুজো দেখতে গেলে উত্তর কলকাতার পুরনো শহরটাকে আরও কাছ থেকে পাওয়া যায়। গঙ্গার দিকের হাওয়া, পুরনো রাস্তা আর পুজোর ভিড়—সব মিলিয়ে পরিবেশটা অন্যরকম।
এই অঞ্চলে রয়েছে লিট্টি চোকা ভূতনাথ। ৬৪, স্ট্র্যান্ড রোড, আহিরীটোলা—মণ্ডপ ঘোরার পর একটু অন্য স্বাদের খাবার খুঁজলে এই ঠিকানাটি রাখা যায়।
আর রবীন্দ্র সরণির দিকে রয়েছে ওরিয়েন্টাল রেস্তরাঁ, ৩৬৫, রবীন্দ্র সরণি, নূতনবাজার, আহিরীটোলা।

Gupta Veg Family Restaurant — ৯৬, বি কে পাল অ্যাভিনিউ, শোভাবাজার-আহিরীটোলা, কলকাতা–৭০০০০৫।
শোভাবাজারের পুজো — বাঙালি খাবারের সঙ্গে মুঘলাইও
শোভাবাজারের ঐতিহ্যবাহী পুজো দেখতে গেলে আশপাশে খাবারের অভাব নেই। শোভাবাজার-হাতিবাগান এলাকায় রয়েছে Kolkata Rajbari-Hatibagan। ঠিকানা ৫৬এ, হরি ঘোষ স্ট্রিট, শোভাবাজার, হাতিবাগান, কলকাতা – ৭০০০০৬।
আর একটু মুঘলাই স্বাদের খাবার খেতে চাইলে রয়েছে Sagar Restaurant। ঠিকানা ৭৬/২বি, বিধান সরণি রোড, পিসি চন্দ্র রূপবাণীর কাছে, শোভাবাজার, কলকাতা – ৭০০০০৬।
কাশী বোস লেন- হাতিবাগান সর্বজনীনের কাছে — কস্তুরী ও করিমস
হাতিবাগান সর্বজনীন উত্তর কলকাতার অন্যতম জনপ্রিয় পুজো। পুজোর ঠিকানা হাতিবাগান ক্রসিং, বিধান সরণি, কলকাতা – ৭০০০০৪।

হাতিবাগান ঘুরতে গিয়ে বাঙালি খাবারের স্বাদ নিতে পারেন Kasturi Restaurant-এ। ঠিকানা ১০/৫, প্রিন্সিপাল ক্ষুদিরাম বসু রোড, শোভাবাজার, হাতিবাগান, কলকাতা – ৭০০০০৬।
অন্য রকম স্বাদের জন্য রয়েছে Karim’s – Original From Jama Masjid Delhi 6। ঠিকানা ৮৪, অরবিন্দ সরণি, হাতিবাগান, রাধাকৃষ্ণ মন্দিরের কাছে, কলকাতা – ৭০০০০৫। মুঘলাই খাবারের স্বাদে পুজোর রাতের মেনুতে বদল আনতে চাইলে এই ঠিকানাটি রাখা যায়।Raise Your Concern About this Content
শ্যামবাজারের দিকে গেলে — গোলবাড়ির স্বাদ
হাতিবাগান থেকে শ্যামবাজারের দিকে গেলে আরও একটি পরিচিত খাবারের ঠিকানা Golbari। ঠিকানা আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রোড, শ্যামবাজার, ফড়িয়াপুকুর, কলকাতা – ৭০০০০৪।
উত্তর কলকাতার পুজোর আসল মজা শুধু প্যান্ডেল দেখা নয়, তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা পাড়ার গলি, পুরনো বাড়ি, আলোর সাজ আর খাবারের গন্ধও সেই অভিজ্ঞতার অংশ। বাগবাজারে ঠাকুর দেখে খাবার, কুমারটুলি ঘুরে শোভাবাজারে রাতের খাবার, কিংবা হাতিবাগানের পুজো দেখে বিধান সরণির আশপাশে পেটপুজো—পরিকল্পনা করে বেরোলে এক রাতেই অনেকটা উত্তর কলকাতা চেনা যায়।
তবে পুজোর সময়ে ভিড় ও যানবাহন নিয়ন্ত্রণের কারণে রাস্তা চলাচলের নিয়ম বদলাতে পারে। খাবারের জায়গাগুলির সময়সূচিও উৎসবের দিনগুলিতে পরিবর্তিত হতে পারে। তাই বেরোনোর আগে সংশ্লিষ্ট খাবারের জায়গায় সময়সূচি যাচাই করে নেওয়াই ভালো।
তথ্যসূত্র
১. উত্তর কলকাতায় জনপ্রিয় পুজো মন্ডপ
২. মন্ডপের কাছে খাবারের ঠিকানা
৩. উত্তর কলকাতায় জনপ্রিয় খাবারের ঠিকানা



