শরতের ভোর। নদীর ঘাটে তখনও কুয়াশার হালকা আস্তরণ। চারপাশে ঢাকের মৃদু আওয়াজ। সাদা শাড়ি, লাল পাড়। ঘোমটা টানা এক বধূকে নিয়ে ঘাটের দিকে এগিয়ে চলেছেন কয়েকজন। তাঁকে স্নান করিয়ে, নতুন শাড়ি পরিয়ে আবার ফিরিয়ে আনা হবে পুজোমণ্ডপে। সেখানে তাঁর জায়গা হবে গণেশের পাশে।
দৃশ্যটি দেখলে প্রথমেই মনে হতে পারে, এ তো গণেশের স্ত্রী! বাঙালির মুখে মুখেও সেই পরিচয়—‘কলাবউ’, অর্থাৎ গণেশের বউ। কিন্তু এই পরিচিত ধারণার আড়ালেই রয়েছে দুর্গাপুজোর অন্যতম প্রাচীন এবং তাৎপর্যপূর্ণ একটি আচার। কারণ, শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যায় কলাবউ আসলে গণেশের স্ত্রী নন। তিনি নবপত্রিকা—নয়টি উদ্ভিদের সমাহারে দেবীশক্তির প্রতীক।

তাহলে কেন তাঁকে বধূর মতো সাজানো হয়? কেনই বা গণেশের পাশে রাখা হয়? নবপত্রিকার সঙ্গে দুর্গাপুজোর সম্পর্কই বা কতটা পুরনো? আর এই নয়টি গাছের মধ্যেই বা কী এমন তাৎপর্য লুকিয়ে আছে? কলাবউয়ের ইতিহাস খুঁজতে গেলে আসলে ফিরে যেতে হয় বাংলার লোকসংস্কৃতি, কৃষিজীবন এবং শক্তি আরাধনার বহু পুরনো পরম্পরায়।
কলাবউ না নবপত্রিকা?
প্রথমেই নামের জায়গাটা পরিষ্কার করা যাক। ‘কলাবউ’ নামটি এসেছে মূলত কলাগাছ থেকে। দুর্গাপুজোর সপ্তমীর সকালে যে নবপত্রিকা তৈরি করা হয়, তার অন্যতম প্রধান উপাদান হল সপত্র কলাগাছ। কলাগাছকে কেন্দ্র করে বাকি আটটি উদ্ভিদ একসঙ্গে বাঁধা হয়। তার পর পুরো গাছটিকে লালপাড় সাদা শাড়িতে সাজানো হয়।
কলাগাছের বড় বড় পাতার আড়ালে যখন গোটা উদ্ভিদসমষ্টি ঢেকে যায়, তখন দূর থেকে তাকে সত্যিই শাড়ি পরা এক বধূর মতো দেখতে লাগে। সেখান থেকেই ‘কলাবউ’ নামটির প্রচলন।
কিন্তু ‘কলাবউ’ আসলে শুধু কলাগাছ নন। তাঁর শরীরে বা সঙ্গে জড়িয়ে থাকে আরও আটটি উদ্ভিদ। সব মিলিয়েই তিনি নবপত্রিকা।
অর্থাৎ, নামটি যতই একটি গাছকে কেন্দ্র করে হোক, আচারটির অর্থ অনেক বড়।
কী কী থাকে নবপত্রিকায়?
প্রচলিত শাস্ত্রীয় রীতি অনুযায়ী নবপত্রিকায় থাকে নয়টি উদ্ভিদ—কলাগাছ, কচু, হলুদ, জয়ন্তী, বেল, ডালিম, অশোক, মানকচু এবং ধান।
এই নয়টি উদ্ভিদকে নিছক গাছপালা হিসেবে দেখা হয় না। প্রত্যেকটির সঙ্গে একটি করে দেবীর প্রতীকী সম্পর্ক রয়েছে।
কলাগাছকে ব্রাহ্মাণী, কচুকে কালিকা, হলুদকে দুর্গা, জয়ন্তীকে কার্তিকী, বেলকে শিবানী, ডালিমকে রক্তদন্তিকা, অশোককে শোকরহিতা, মানকচুকে চামুণ্ডা এবং ধানকে লক্ষ্মীর প্রতীক হিসেবে ধরা হয়।

ফলে নবপত্রিকা আসলে নয়টি শক্তির সম্মিলিত প্রতীক। সেই কারণেই একে অনেক সময় দেবীর আর এক প্রতীকী রূপ হিসেবেও ব্যাখ্যা করা হয়।
এখানেই বোঝা যায়, কলাবউকে শুধুমাত্র ‘গণেশের স্ত্রী’ হিসেবে দেখলে তাঁর আচারগত গুরুত্ব অনেকটাই আড়ালে থেকে যায়।
গণেশের পাশে কেন?
এটাই সবচেয়ে পরিচিত প্রশ্ন। দুর্গাপুজোর মণ্ডপে দেবী দুর্গার সঙ্গে তাঁর চার সন্তান—লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক এবং গণেশের অবস্থান দেখা যায়। সেই বিন্যাসে গণেশের পাশে থাকে নবপত্রিকা। আর যেহেতু নবপত্রিকাকে বধূর সাজে সাজানো হয়, তাই লোকমুখে ধারণা তৈরি হয়েছে—তিনি বুঝি গণেশের স্ত্রী। কিন্তু শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যায় এই ধারণার ভিত্তি নেই।
বরং নবপত্রিকা হল দেবীরই প্রতীক। গণেশের সঙ্গে তাঁর কোনও বৈবাহিক সম্পর্কের উল্লেখ দুর্গাপুজোর মূল আচারবিধিতে নেই। ফলে ‘গণেশের বউ’ পরিচয়টি মূলত লোকবিশ্বাস ও লোকাচারের অংশ।
এই লোকবিশ্বাস কীভাবে তৈরি হল, তারও একটা স্বাভাবিক ব্যাখ্যা রয়েছে। একটি উদ্ভিদসমষ্টিকে বধূর মতো সাজানো, তার পর তাকে গণেশের পাশে বসানো—সাধারণ মানুষের চোখে সম্পর্কটি স্বামী-স্ত্রীর বলেই মনে হওয়া স্বাভাবিক। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সেই ব্যাখ্যাই লোকমুখে ছড়িয়েছে। কিন্তু লোকবিশ্বাস এবং শাস্ত্রীয় পরিচয় সবসময় এক হয় না। কলাবউয়ের ক্ষেত্রেও সেটিই ঘটেছে।
সপ্তমীর ভোরে কেন স্নান?
মহাষষ্ঠীর বোধন ও অধিবাসের পর আসে মহাসপ্তমী। সপ্তমীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আচার হল নবপত্রিকা স্নান।
ভোরে শুভক্ষণে নবপত্রিকাকে নদী, পুকুর বা অন্য কোনও জলাশয়ের ঘাটে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে নিয়ম মেনে স্নান করানোর পর তাঁকে নতুন শাড়ি পরানো হয়। সিঁদুর দেওয়া হয়। অনেক জায়গায় ঘোমটা টেনে নববধূর মতো সাজানো হয়। তারপর শোভাযাত্রা করে তাঁকে ফিরিয়ে আনা হয় মণ্ডপে। এই আচারই সাধারণ মানুষের কাছে ‘কলাবউ স্নান’ নামে পরিচিত।
তবে ‘কলাবউ স্নান’ বললেও মনে রাখতে হবে—স্নান করানো হচ্ছে শুধু একটি কলাগাছকে নয়, নয়টি উদ্ভিদের সমাহারে তৈরি নবপত্রিকাকে।
জলের সঙ্গে এই আচারের সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ। ভারতীয় ধর্মীয় সংস্কৃতিতে জল শুদ্ধি, জীবন এবং পুনর্জন্মের প্রতীক। আর উদ্ভিদ ও জলের এই মিলন নবপত্রিকার প্রকৃতিনির্ভর চরিত্রটিকেও সামনে আনে।
কৃষির সঙ্গে দুর্গাপুজোর যোগ
নবপত্রিকার সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক সম্ভবত এখানেই। দুর্গাপুজোকে আমরা সাধারণত দেবী দুর্গার মহিষাসুরবধের পৌরাণিক কাহিনির সঙ্গে যুক্ত করি। কিন্তু নবপত্রিকা সেই পুজোর আর একটি পুরনো স্তরকে সামনে আনে—প্রকৃতি ও কৃষির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক।
নয়টি উদ্ভিদের তালিকায় রয়েছে ধান। রয়েছে হলুদ, কচু, ডালিম, বেল, অশোকের মতো উদ্ভিদ। অর্থাৎ মানুষের খাদ্য, কৃষি, ঔষধি ব্যবহার এবং দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে যুক্ত উদ্ভিদই পুজোর আচার হয়ে উঠেছে।
ধান বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলার কৃষিজীবনে ধান শুধু খাদ্য নয়, জীবনধারণের অন্যতম প্রধান অবলম্বন। ফলে ধানকে দেবীর সঙ্গে যুক্ত করা নিছক ধর্মীয় প্রতীক নয়; এর মধ্যে কৃষিনির্ভর সমাজের জীবনবোধও ধরা পড়ে।
এক অর্থে, নবপত্রিকার মধ্যে দিয়ে মানুষ প্রকৃতিকেই দেবীর রূপে সম্মান জানিয়েছে—এমন ব্যাখ্যাও পাওয়া যায়।

শুধু পুরাণ নয়, লোকজীবনের গল্পও
বাংলার দুর্গাপুজো কখনও শুধুমাত্র পুরাণের মধ্যে আটকে থাকেনি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার সঙ্গে মিশেছে স্থানীয় সংস্কৃতি, কৃষি, প্রকৃতি, লোকবিশ্বাস এবং পারিবারিক আচার।
নবপত্রিকাও সেই মিশ্র সংস্কৃতিরই একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। দেবীকে মাটির প্রতিমায় প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে। আবার একই সঙ্গে তাঁকে উদ্ভিদের মধ্যেও খোঁজা হচ্ছে। একদিকে অস্ত্রধারী মহিষাসুরমর্দিনী, অন্যদিকে ধান, হলুদ, কলা, কচু—জীবনের একেবারে পরিচিত উপাদান। এই দুই রূপ পাশাপাশি থাকার মধ্যেই বাংলার দুর্গাপুজোর বৈচিত্র্য।
এ কারণেই নবপত্রিকা শুধু একটি পুজোর উপকরণ নয়। এটি বাংলার প্রাচীন প্রকৃতি-নির্ভর বিশ্বাসেরও স্মারক।
‘বউ’ সাজানোর তাৎপর্য কী?
প্রশ্ন উঠতেই পারে, যদি কলাবউ গণেশের স্ত্রী না হন, তবে তাঁকে বধূর সাজ দেওয়া হয় কেন?
এর একক কোনও ব্যাখ্যা নেই। লোকসংস্কৃতির গবেষণায় বধূর সাজকে শুভ, উর্বরতা, সমৃদ্ধি ও পূর্ণতার প্রতীকের সঙ্গে যুক্ত করে দেখা হয়। বাংলার সামাজিক সংস্কৃতিতে সিঁদুর, শাড়ি, ঘোমটা—সবই দীর্ঘদিন ধরে বিবাহিত নারীর পাশাপাশি শুভতার চিহ্ন হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে। ফলে নবপত্রিকাকে বধূর সাজ দেওয়ার মধ্যে প্রকৃতি ও শস্যের উর্বরতা, নতুন জীবনের প্রত্যাশা এবং সমৃদ্ধির প্রতীকী প্রকাশ রয়েছে বলে মনে করা হয়।
অর্থাৎ ‘বউ’ শব্দটি এখানে শুধুমাত্র বৈবাহিক সম্পর্ক বোঝায় না। বরং শুভশক্তির এক লোকজ রূপ হিসেবেও তাকে দেখা যায়।
ইতিহাসের কোন সময় থেকে?
নবপত্রিকার সঠিক উৎপত্তির সময় নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন। কারণ দুর্গাপুজোর আচার বহু শতাব্দী ধরে নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে। শাস্ত্রীয় বিধান, স্থানীয় রীতি এবং লোকাচার একে অন্যের সঙ্গে মিশেছে।
বাংলায় দুর্গাপুজোর জমিদারবাড়ি ও বনেদি বাড়ির ঐতিহ্য প্রসারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নবপত্রিকা স্নান এবং কলাবউ সাজানোর রীতিও আরও সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তবে এর পেছনে থাকা প্রকৃতি ও উদ্ভিদকেন্দ্রিক আরাধনার ধারণা আরও পুরনো বলে মনে করেন বহু গবেষক।
তাই নবপত্রিকার ইতিহাসকে একটি নির্দিষ্ট সাল বা একটি মাত্র পৌরাণিক গল্প দিয়ে ব্যাখ্যা করা ঠিক নয়। বরং এটি দীর্ঘ সময় ধরে গড়ে ওঠা ধর্মীয় ও লোকসংস্কৃতির এক সমন্বিত রূপ।Raise Your Concern About this Content
তাহলে কলাবউয়ের আসল পরিচয় কী?
এতক্ষণকার আলোচনা থেকে উত্তরটা স্পষ্ট।
কলাবউ গণেশের স্ত্রী নন—শাস্ত্রীয় অর্থে তিনি নবপত্রিকা।
নয়টি উদ্ভিদকে একত্র করে তৈরি হয় এই নবপত্রিকা। তাকে বধূর সাজ দেওয়া হয়। সপ্তমীর ভোরে স্নান করানো হয়। তারপর মণ্ডপে এনে দেবীর সঙ্গে তাঁর পুজো করা হয়।
গণেশের পাশে তাঁর অবস্থান এবং বধূর সাজ থেকেই তৈরি হয়েছে ‘গণেশের বউ’ হিসেবে লোকপ্রচলিত পরিচয়। কিন্তু সেই পরিচয়কে শাস্ত্রীয় সত্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং নবপত্রিকার তাৎপর্য আরও বিস্তৃত। এখানে দেবী আছেন কলাগাছে, ধানের শিষে, হলুদের গন্ধে, কচুর পাতায়। অর্থাৎ মাটির সঙ্গে মানুষের যে সম্পর্ক, প্রকৃতির সঙ্গে যে নির্ভরতা—তারই এক ধর্মীয় প্রতীক হয়ে উঠেছে নবপত্রিকা।
দুর্গাপুজোর মণ্ডপে আমরা যখন দেবীর দিকে তাকাই, তখন চোখে পড়ে তাঁর দশ হাত, ত্রিশূল, সিংহ আর অসুর। কিন্তু সপ্তমীর ভোরে ঘাটের দিকে তাকালে দেখা যায় অন্য এক দুর্গাকে—যিনি কোনও অলঙ্কৃত মূর্তি নন, বরং সবুজ পাতায়, শস্যে আর মাটির গন্ধে ধরা দেন।
তিনি গণেশের স্ত্রী নন—তবু বাঙালির কাছে তিনি ‘বউ’। তিনি শুধু কলাগাছ নন—তাঁর শরীরে জড়িয়ে থাকে আরও আটটি উদ্ভিদ। তিনি শুধু পুজোর একটি উপকরণ নন—তাঁর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কৃষিজীবন, প্রকৃতির প্রতি শ্রদ্ধা এবং বাংলার লোকবিশ্বাসের দীর্ঘ ইতিহাস। তাই সপ্তমীর সকালে লালপাড় সাদা শাড়িতে ঘোমটা টানা সেই কলাবউকে দেখলে শুধু ‘গণেশের বউ’ বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়া নয়। একবার মনে করা যায়—এই ছোট্ট সবুজ সংসারের মধ্যেই হয়তো লুকিয়ে আছে বাঙালির বহু পুরনো এক বিশ্বাস: দেবী শুধু মন্দিরে বা মূর্তিতে নন, তিনি মাটিতেও আছেন, শস্যেও আছেন, গাছের পাতাতেও আছেন। আর সেই কারণেই কলাবউ আজও দুর্গাপুজোর এক রহস্যময়, সুন্দর এবং গভীরভাবে বাংলার নিজস্ব এক প্রতীক হয়ে বেঁচে আছেন।
তথ্যসূত্র
১. কলা বউ সম্পর্কিত তথ্য
২. দুর্গাপুজোর সঙ্গে সম্পর্ক
৩. কলা বউ স্নানের নিয়মকানুন



