এখন চারদিকে শিউলির গন্ধ। মহালয়ার ভোরে রেডিওর সেই চেনা কণ্ঠ, কাশফুলের দোলা আর নতুন জামার অপেক্ষা দেবীর আগমনকে আরও আনন্দে ভরিয়ে তোলে। এই অপেক্ষা এক বছরের অপেক্ষা। দুর্গাপূজা মানেই বাঙালির কাছে এক টুকরো শৈশব। সময় বদলেছে। বদলেছে মানুষের জীবনযাত্রা, পুজোর আয়োজন, মণ্ডপসজ্জা এবং আনন্দ করার ধরন। পুরনো দিনের দুর্গাপূজার সেই সরল, নির্মল আনন্দ আজ কোথাও বোধহয় লুকিয়ে আছে।
দুর্গাপুজো এলেই চারপাশে যেন ব্যস্ততা বেড়ে যায়। পুজোর দিনগুলোতে নতুন জামা। আলমারি ভর্তি নতুন জামা থাকলেও পুজোর সময় সবারই একটা নতুন জামার আশা থেকে যায়। এক বছরের অপেক্ষা থেকে এই পুজোর নতুন জামার।
মহালয়ার ভোর মানেই পুজোর শুরু
এখনকার প্রজন্ম হয়তো মোবাইল ফোনে মহালয়ার অনুষ্ঠান দেখে, ইউটিউবে গান শোনে বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মহালয়ার শুভেচ্ছা বিনিময় করে। কিন্তু একটা সময় ছিল, যখন মহালয়ার ভোর মানে রেডিওর সামনে বসে প্রখ্যাত বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের চণ্ডীপাঠ শোনার জন্য ভোর চারটের সময় বাড়ির ছোট-বড় সবাই ঘুম থেকে উঠে পড়ত। আমাদের ছোটবেলার এই স্মৃতিগুলো এখনো তাড়া করে।

অন্ধকার ভোর। জানালার বাইরে হালকা ঠান্ডা বাতাস। দূরে কোথাও পাখির ডাক। বাড়ির সবাই তখনও পুরোপুরি জেগে ওঠেনি। আর রেডিও থেকে ভেসে আসছে চণ্ডীপাঠের সেই গম্ভীর সুর। মনে হতো, দিদি বোধ হয় সত্যিই কৈলাস থেকে মর্তের পথে রওনা দিয়েছেন।
আজ প্রযুক্তি আমাদের হাতের মুঠোয় পৃথিবী এনে দিয়েছে। সেই রেডিওর সামনে পরিবারের সবাই মিলে বসে মহালয়া শোনার মুহূর্তটি যেন ছিল আরও আপন।
পাড়ার পুজো ছিল সবার পুজো
পুরনো দিনের দুর্গাপূজার সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য ছিল পাড়ার পুজো। মণ্ডপ হয়তো খুব বড় ছিল না, আলো হয়তো কম ছিল, কিন্তু সেই পুজোর আনন্দ ছিল অন্যরকম।
কেউ বাঁশ আনছে, কেউবা মণ্ডপ সাজাচ্ছে, কেউ কেউ চাঁদা তুলতে ব্যস্ত। পাড়ার মহিলারা ব্যস্ত মায়ের পুজোর আয়োজনে। বাচ্চারা ব্যস্ত ভিড় সামলানো আর নিজেদের খেলাধুলা নিয়ে। রাতের বেলা চলত পাড়ার ছেলেমেয়েদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
আজও অনেক জায়গায় ঐতিহ্য রয়েছে। কিন্তু ওই জায়গায় পুজোর আয়োজন এখন অনেক বেশি পেশাদার। শিল্পী, ডিজাইনার, আলোকশিল্পী—সবকিছুই বাইরের কারিগরদের উপর নির্ভরশীল। সবাই মিলে তৈরি করছে বিশাল আয়োজন।
তখনকার মণ্ডপে ছিল সরলতা, এখন আছে শিল্পের বিস্ময়

পুরনো দিনের মণ্ডপের কথা বললে চোখের সামনে ভেসে ওঠে বাঁশ, কাপড়, রঙিন কাগজ, থার্মোকল আর হাতে আঁকা নানা সাজসজ্জা। এই মণ্ডপ সাজাতে বিশেষ ভূমিকা নিত পাড়ার ছেলেমেয়েরাই। নিজেদের প্রতিভা দেখানোর এটা ছিল মোক্ষম সুযোগ।
আর এখনকার সময়ে দুর্গাপুজোর মণ্ডপ যেন এক একটি শিল্পকর্ম। কখনো প্রাচীন মন্দিরের আদলে, কখনোবা কোনো গ্রামবাংলায় হারিয়ে যাওয়া স্থাপত্যকে সামনে রেখে তৈরি হচ্ছে থিমের মণ্ডপ।
এখানে পুরনো আর নতুনকে মুখোমুখি দাঁড় করানোর প্রয়োজন নেই। পুরনো দিনের পুজো আমাদের দিয়েছে আবেগ ও অংশগ্রহণের শিক্ষা, আর সময়ের পুজো দিচ্ছে শিল্প ও সৃজনশীলতার নতুন দিগন্ত।
প্রযুক্তি ও যোগাযোগের প্রভাব
আগের পুজোয় কেনাকাটার খবর, সময়সূচি ও সাহিত্য পাওয়া যেত শারদীয় পত্রিকা ও খবরের কাগজে। দেখা যেত পুজোর সময় প্যান্ডেলে দর্শনার্থীদের দীর্ঘ লাইন।
আর বর্তমান সময়ে জিপিএস ট্র্যাকিং, ড্রোন ক্যামেরা, ভিড় নিয়ন্ত্রণের জন্য এআই-চালিত সিকিউরিটি, মেটাভার্স ও ভিআরের মাধ্যমে ভার্চুয়াল দর্শন এবং অনলাইন ফুড ডেলিভারি অ্যাপের ব্যবহারে প্রাধান্য।
এখনকার সময়ে মানুষ ভিড়ের মধ্যে গিয়ে মণ্ডপ দেখছে, অনেকেই বাড়ি বসে পুজো দেখতে পছন্দ করেন। ফলে সেই যে রাত জেগে পুজো দেখার আনন্দ, সে যেন আজ অনেকটাই প্রভাব ফেলছে।
ঢাকের শব্দের সাথে মিশেছিল পাড়ার মানুষের হাসি

পুজো মানেই ঢাকের আওয়াজ। ঢাকিদের আনাগোনা পুজোমণ্ডপগুলোতে। ঢাকের পেছনে একটি কাশফুলের মতো গুচ্ছ লাগিয়ে ছবি দেখলেই মনে হয় দুর্গাপুজো এসে গেছে।
আমরা যখন ছোট ছিলাম, তখন ষষ্ঠীর সকাল থেকে দূর থেকে ভেসে আসত ঢাকের আওয়াজ। এই ঢাকের আওয়াজ যেন সময়সূচি বলে দিত পুজোর। ঢাকের আওয়াজ জানান দিত কখন দেবীর বোধন হচ্ছে, কখন সপ্তমীর পুজো হচ্ছে, কখন পুজোর আরতি শুরু হবে, কখন ভোগারতি হবে—এইসব।
পুজোর প্রতিটি রীতিতে ঢাক বেজে উঠত। এই ঢাক যেন প্রতিমুহূর্তের নিজের মতো করে গল্প বলতে।
আজও ঢাক বাজে। বরং আয়োজনের অংশ হিসেবে ঢাকের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নানা ধরনের বাদ্যযন্ত্র। কিন্তু নির্দিষ্ট পাড়ায় ঢাকিদের দল, যাদের সঙ্গে এক ধরনের আত্মিক সম্পর্ক তৈরি হয়ে যেত, তাদের স্মৃতি এখন অনেকের কাছেই অমূল্য।
অষ্টমীতে অঞ্জলি আর মায়ের হাতের ভোগ
আগের দিনে পুজোর অন্যতম আনন্দ ছিল অষ্টমীর অঞ্জলি। সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে নতুন পোশাক পরা। হাতে ফুল, বেলপাতা। পুজোমণ্ডপে গিয়ে পরিচিত মানুষদের সঙ্গে দেখা করা। পুরোহিতের মন্ত্র উচ্চারণ। তারপর সবাই মিলে অঞ্জলি দেওয়া।
অঞ্জলি শেষে ভোগের অপেক্ষা। খিচুড়ি, লাবড়া, পায়েস, চাটনি—এই প্রসাদের স্বাদ যেন ভুলবার নয়। পাশাপাশি বাড়িতে চলত ঠাকুরের কাছে ভোগ রান্না করার প্রথাও।
এখনকার সময়ে প্রসাদের জন্য ভিড় জমে ঠিকই। কিন্তু বাড়ির বাইরে গিয়ে চলে রেস্তোরাঁ, ফুড স্টল, ক্যাফে—এসবে আনাগোনা। পুজোর সময় দেদার বিক্রি হচ্ছে ফাস্টফুড।

পুজোর চার দিন মানেই ছিল বাড়ির বাইরে থাকা
একসময় পুজোর চার দিন যেন ঘড়ির কাঁটা একটু ধীরে চলত। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বাইরে ঘোরা। ষষ্ঠীতে কাছের পুজো, সপ্তমীতে অন্য পাড়া, অষ্টমীতে আত্মীয়দের বাড়ি, নবমীতে বন্ধুদের সঙ্গে রাত জেগে আড্ডা দেওয়া।
চার দিন কোনো নির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছিল না, তবুও দিনগুলো সুন্দরভাবে কেটে যেত।
আর এখন কোথায় যাব, কোন মণ্ডপ দেখব, কোথায় খাব, কোথায় ছবি তুলব—সব পরিকল্পনা আগে থেকেই করা হয়। মোবাইলে ম্যাপ দেখে রুট ঠিক হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি দেওয়ার জন্য পোশাক নির্বাচন করা হয়।
না, কোনো কিছুই ভুল নয়। এটা সময়ের চাহিদা। কিন্তু পুরোনো দিনের সেই হঠাৎ বেরিয়ে পড়ার আনন্দটা অন্যরকম ছিল।
ছবি কম উঠত, স্মৃতি বেশি জমত
আজ পুজোর সময় প্রতিটি মুহূর্ত ক্যামেরাবন্দি করা হয়। কে কোথায় যাচ্ছে, কী জামা পরল, কী পোশাক ছিল—সবকিছুই ছবিতে তুলে প্রচার করা হয়।
কিন্তু আগে একটি ক্যামেরা থাকলেও সবাই ছবি তুলত না। তাই হয়তো ছবি কম থাকত, মনের ভিতর স্মৃতি বেশি থাকত।
আজ হাজার হাজার ছবির ভেতর হারিয়ে যায় স্মৃতি। প্রযুক্তি আমাদের মুহূর্ত ধরে রাখার ক্ষমতা দিয়েছে, কিন্তু শুধু সেই মুহূর্তটাকে বাঁচিয়ে রাখার অভ্যাসটুকু নতুন প্রজন্মের মধ্যে আনতে হবে।
তাহলে কি পুরনো দিনের পুজোই ভালো ছিল?
এই প্রশ্ন সবার মধ্যেই বারবার উঁকি দেয়। কিন্তু এ প্রশ্নের সহজ উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়।
কারণ সময়ের সঙ্গে মানুষের প্রয়োজন, আনন্দের ধরন বদলেছে। যে সময়ে বড়রা ছোট ছিলেন, সেই সময়ের পুজো তাদের কাছে স্বাভাবিকভাবেই বিশেষ। আর শিশুর কাছে হয়তো বিশাল থিমের মণ্ডপ, আলোর খেলা, মোবাইল ক্যামেরা কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে ঘোরাই সবচেয়ে বড় আনন্দ।
আগে মানুষ পুজোয় একসঙ্গে বসে গল্প করত, আজ মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যুক্ত থাকে। আগে পাড়ার মণ্ডপে দেখা হতো, আর আজ ভিডিও কলের মাধ্যমে শুভেচ্ছা জানায়।
অর্থাৎ পুজো বদলেছে, কিন্তু উৎসবের আকাঙ্ক্ষাটা এখনো একই রয়ে গেছে।Raise Your Concern About this Content

শেষ কথা
দুর্গাপুজোর আসল আনন্দ কোনো নির্দিষ্ট সময়ে আটকে নেই। অতীতের একচেটিয়া সম্পদও নয়, না এটা বর্তমানের প্রযুক্তিনির্ভর আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
আসল আনন্দ তখনই, যখন মায়ের সামনে দাঁড়িয়ে পরিচিত মুখ দেখা যায়। যখন অনেকদিন পর আত্মীয়ের সাথে দেখা হয়। যখন মায়ের হাতে নতুন জামা তুলে দেওয়া হয়। যখন অঞ্জলিতে সবাই একসঙ্গে দাঁড়ায়। যখন ঢাকের শব্দে মনের ভিতর অকারণে আনন্দ হয়। আবার যখন দশমীর বিকেলে মা বিদায়ের সময় চোখের কোণে জল এসে যায়।
সময় বদলাবে। পুজোর রং বদলাবে। মণ্ডপ বদলাবে। প্রযুক্তি আরও আধুনিক হবে। হয়তো আগামী দিনে এমন অনেক কিছু আসবে, যা আজ কল্পনা করতে পারছি না।
তবু মায়ের মুখের ঢাকের সেই ছন্দ আর আপনজনকে কাছে পাওয়ার আনন্দ—এসবের কোনো আধুনিক বিকল্প নেই।
তাই এবার পুজোয় আধুনিকতার আনন্দে মেতে উঠুন, নতুন কিছু উপভোগ করুন। সময় বের করে ফিরে তাকান পুরনো দিনের সেই স্মৃতিগুলোতে।
মনে মনে শুনুন মহালয়ার সেই ভোরের ডাক। মনে করুন না নতুন জামার গন্ধ, মণ্ডপের আলো, বন্ধুদের সঙ্গে রাত জাগা, বিসর্জনের সময় বুকের ভেতর জমা অদ্ভুত শূন্যতা।
হয়তো তখনই বুঝতে পারবেন—
সময় গেছে, বদলেছে দিন,
বদলায় কত রঙিন ঋণ।
তবু মায়ের আগমনী গান,
জাগিয়ে তোলে সেই প্রাণ।



