বাংলার ঢাকি ও তাঁদের অজানা জীবন
ঢাকের আওয়াজ বাঙালিদের কাছে উৎসবের শ্রুতিস্মৃতি। ঢাক বাজছে শুনলেই মনে হয় পুজো এসে গেছে। ঢাক হচ্ছে ইমোশন। অনেক দুঃখ-কষ্টের মাঝে ঢাকের বাদ্যি শুনলেই মনে হয় সব ব্যথা জাস্ট ভ্যানিশ। দুর্গাপুজোর মাত্র আর কিছুদিন বাকি। সব জায়গায় চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। পাড়ায় পাড়ায় প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে বাঁশ বাঁধা প্রায় শেষ। এসবের মাঝে স্মৃতিতে ফিরে আসছে ঢাকের আওয়াজ ।
বাঙালির সাংস্কৃতিক জীবনের সঙ্গে ঢাকের আওয়াজ অঙ্গাঙ্গিভাবেযুক্ত। গড়পড়তা গ্রাম্য বা শহুরে বাঙালির কাছে ঢাক দুর্গাপুজোর অন্যতম অনুষঙ্গ। পশ্চিমবঙ্গের এই ঢাকি পরিবারের বেশিরভাগই বসবাস করে বাঁকুড়া, মুর্শিদাবাদ, বীরভূমে। দুর্গাপুজোর সঙ্গে শুধু বাঙালির ধর্মীয় আবেগ জড়িয়ে আছে তা কিন্তু নয়, জড়িয়ে রয়েছে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, শৈশবের স্মৃতি, অনুভূতি এবং আত্মপরিচয়। সেই আবেগকে জাগিয়ে তুলতে ঢাকের অবদান কম নয়। যে মানুষগুলোর হাতের ছোঁয়া ঢাকের মধ্যে প্রাণ প্রতিষ্ঠিত হয়, তাঁদের জীবনের গল্পটা কি আদৌ আমরা জানি। নাকি কোনওদিন খোঁজ রাখার চেষ্টা করেছি।
বিভিন্ন প্রকারের ঢাক
হাজার হাজার বছর ধরে ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রদেশে বাদ্যযন্ত্র হিসাবে নানা ধরনের ঢাকের প্রচলন রয়েছে। সেক্ষেত্রে পাশ্চাত্য সঙ্গীতের ক্ষেত্রেও তাল দিতে ড্রামের ব্যবহার করা হয় সেটাও এক প্রকারের ঢাক। তাছাড়া বাংলাতেই বিভিন্ন ধরনের ঢাক দেখা যায়।
প্রাশ্চাত্য সঙ্গীতে বিটস দেবার জন্য যে ড্রামের জনপ্রিয়তা, সেটাও এক প্রকারের ঢাক। এছাড়া বাঙালিতেই দেখা যায় নানা ধরনের ঢাক। যেমন জয়ঢাক যা সাধারণত রাজা মহারাজাদের শোভাযাত্রায় দেখা যেত। শিবাজী মহারাজের বিভিন্ন রাজকার্যেও দেখা যেত বিভিন্ন রকমের ঢাক। গণেশচতুর্থীর শোভাযাত্রায় দেখা যায় এক ধরনের ঢাক।
কেরালাতে বিভিন্ন হিন্দু ধর্মীয় শোভাযাত্রায় ঢাকের প্রচলন রয়েছে।রাজস্থানের রাজাদের বিভিন্ন শোভাযাত্রায় ঢাকের ব্যবহার হত। এই পর্যায়ে আমরা বাংলায় বিশেষত দুর্গাপুজোয় ব্যাবহৃত ঢাক নিয়ে আলোচনা করছি।

ঢাকের আওয়াজ মানেই পুজো এসে গেছে
আশ্বীনের শরতের প্রভাত না হলেও তা শীত, গ্রীষ্ম কিংবা বর্ষা হোক দূর থেকে ঢাকের আওয়াজ শুনলেই মনে হয় পুজো এসে গেছে।
দুর্গাপুজোর সময় মণ্ডপে ঢাকের তালে ধুনুচি নাচ, সন্ধিপুজোর সময় একনাগারে ঢাকের বোল, বিসর্জনের সময় ঢাকের আওয়াজে বিষন্নতার সুর,সবমিলিয়ে ঢাকের সুরেই পুজোর নিজস্ব একটা ভাষা লুকিয়ে রয়েছে।
ছেলেবেলায় পুজোয় নতুন জামা, প্যান্ডেল হপিং, অঞ্জলি বা বিসর্জন, প্রত্যেক স্মৃতির পিছনে কোনও না কোনওভাবে ঢাকের শব্দ মিশে রয়েছে। তাই শরৎকাল এলেই ঢাকের আওয়াজ ফিরে ফিরে আসে।
ঢাকি সমাজের অজানা গল্প
মণ্ডপে যাঁরা প্রতিবছর এসে ঢাক বাজায়, আমরা কি কেউ তাদের নাম জানি? পুজো শেষ হয়ে যাওয়ার পর কতজন আমরা তাঁদের খোঁজ রাখি। সারা পুজোয় যাদের ঢাকের আওয়াজ আমাদের মুখে হাসি নিয়ে এল, আনন্দ নিয়ে এল আমরা তাদেঁর গল্প আর জানার চেষ্টা করিনা।
বাংলার বিভিন্ন গ্রামের বহু পরিবার বহু প্রজন্ম ধরে ঢাক বাজানোর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। পুজোর চার দিন তাঁরা বিভিন্ন পুজো মণ্ডপে থাকেন, ঢাক বাজান আবার পুজো শেষে ফিরে যান নিজের বাড়ি।
ঢাক বাজানো হয়তো কিছু মানুষের পারিবারিক ঐতিহ্য। দাদু বা বাবার কাছ থেকে এইভাবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম তাঁরা ঢাক বাজানো শিখে আসছে। ঢাকের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে বহু বছরের শিল্পচর্চা।
পুজোর জন্য সারা বছরের অপেক্ষা
দুর্গাপুজো ৫ দিনের উৎসব। কিন্তু ঢাকিদের কাছে এই পাঁচ দিন বছরের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই মরশুমে বিভিন্ন পুজো মণ্ডপে ঢাক বাজানোর জন্য তাঁরা শহর-শহরতলীতে যায়, ফেলে আসে তাঁদের সংসার, তাঁদের বাড়ি। কলকাতা, অন্য জেলা, অন্য রাজ্য এমনকি বিদেশেও পাড়ি দিতে হয়। এই চারদিন তাঁদের তুমুল ব্যস্ততা। আসলে এই কয়েকদিনের উপার্জনই তাঁদের সারা বছরের সম্বল। সংসারের গুরুত্বপূর্ণ খরচ মেটাতে এই টাকার উপর তাঁদের ভরসা করে থাকতে হয়।
শিল্পসত্ত্বা
ঢাকিরাও কিন্তু একেকজন শিল্পী। তাল, ছন্দ, গতি সবমিলিয়ে তৈরি হয় ঢাকের বোল। পুজোর শুরু, আরতি, সন্ধিপুজো প্রত্যেক মুহূর্তে বদলে যায় ঢাকের ছন্দ।
ধুনুচি নাচের সময় ঢাকের আওয়াজ যেমন উন্মাদনা সৃষ্টি করে, তেমনি বিসর্জনের সময় সেই ঢাকের বোল শুনলেই মনটা ভারী হয়ে আসে, তৈরি হয় এক বিষণ্ণতা।
একজন অভিজ্ঞ ঢাকি শুধু ঢাকে বোল সৃষ্টি করেন না, ঢাকের বোলের মধ্যে দিয়ে পরিবেশের আবেগকে ফুটিয়ে তোলেন। এটাই তাঁদের শিল্পসত্ত্বাকে তুলে ধরে।

শব্দের আড়ালে শ্রম
ঢাকের তালে নাচের সময় আমরা শুধু আনন্দটাকে লক্ষ্য করি। একজন ঢাকির শরীরের পরিশ্রমটা কারও চোখে পড়ে না।
দীর্ঘ সময় ধরে ঢাক বাজানো, ভারী বাদ্যযন্ত্র বয়ে নিয়ে যাওয়া, ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকা সবকিছুই কঠোর পরিশ্রমের কাজ। তার সঙ্গে রয়েছে অচেনা জায়গায় যাতায়াত।
এমনকি পুজোর সময় তারা পরিবারের সঙ্গে আনন্দ, সুখের মূহুর্তগুলোও ভাগ করে নিতে পারেনা।
গম্ভীর ও উচ্চ- দুই ধরনের ঢাকের শব্দ
ঢাকিদের করা নৃ-তাত্ত্বিক বা স্থানীয় শ্রেণিবিভাগ অনুযায়ী ঢাকের আওয়াজের দুটি শব্দ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। গাজনের ঢাকের আওয়াজ ‘গম্ভীর’, দুর্গাপুজোর ঢাকের আওয়াজ ‘উচ্চ’ শব্দ।
গম্ভীর বলতে বোঝায় গভীর বা তীব্র। অন্যদিকে ‘উচ্চ’ বলতে বোঝায় উচ্চস্বর, জোরালো শব্দ। এই শব্দগুলির মধ্যে শুধু শ্রুতিগত পার্থক্য নেই। পাশাপাশি প্রকৃতি, পরিবেশনা, দেবতা, ভক্তি এবং মানুষের আবেগও জড়িয়ে রয়েছে।
দুর্গাপুজোর ঢাকের দ্রুত, উচ্চস্বরের বোল শহরের ব্যস্ত মানুষের মধ্যে উৎসবের উত্তেজনা তৈরি করে। আবার গাজনের গভীর, গম্ভীর ঢাক গ্রামীণ সমাজে শিবের সঙ্গে মানুষের এক বিশেষ ধর্মীয় সম্পর্ককে অনুভবযোগ্য করে তোলে।
একই বাদ্যযন্ত্র দুই ভিন্ন জগতের দুই ভিন্ন অনুভূতিকে প্রকাশ করতে পারে।
পুজোর সময় বায়না
দুর্গাপুজোর সময় পঞ্চমী আর ষষ্ঠীর দিন শিয়ালদহ স্টেশনে প্রতি বছর একটা চেনা ছবি দেখা যায়। বিভিন্ন জেলা, গ্রাম, মফস্বল থেকে ঢাকিরা এসে জড়ো হয়। কলকাতার পুজো কমিটিগুলোর প্রতিনিধিরা এখানে ঢাকিদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন, পুজোয় ঢাক বাজানোর বায়না দেন। এখান থেকে ঢাকিদের বিভিন্ন দল বিভিন্ন পুজো মণ্ডপে চলে যান।
শিয়ালদহকে পুজোর সময় ঢাকিদের গুরুত্বপূর্ণ একটি মিলনস্থল বলে বর্ণনা করা হয় NDTV- র প্রতিবেদনে। পিপলস অ্যাচিভ অব রুরাল ইন্ডিয়া-র প্রতিবেদনে খবর করা হয় পুজোর সময় বাঁকুড়া, মুর্শিদাবাদ , মালদা, বর্ধমান, নদিয়ার বিভিন্ন ঢাকিরা কলকাতায় আসেন।
পুজোর আগে যে ঢাকিদের শহরে আসা, এটা আসলে ঋতুভিত্তিক শ্রম।
ঢাক বাজানো কি শুধুই পুরুষের কাজ?
আগে ঢাকি বলতেই চোখে ভেসে উঠত পরনে ধুতি আর ফতুয়া পরা কোনও ব্যক্তির ছবি। কিন্তু এখন পুরুুষদের পাশাপাশি মহিলারাও এই পেশার সঙ্গে যুক্ত হতে চাইছেন। মছলন্দপুরের নারী ঢাকিদের কথা উঠে এসেছে। পূর্ব বর্ধমানের মন্তেশ্বরেও মহিলা ঢাকিদের একটি দল রয়েছে। এই জগতের সীমারেখাও আসতে আসতে বিস্তৃত হচ্ছে। শতাব্দী প্রাচীন ঐতিহ্য রক্ষা করার দায়িত্ব পুরুষদের পাশাপাশি মহিলারাও পালন করে চলেছেন।
গ্রহণযোগ্যতা
আধুনিক যুগে ঢাকিদের গ্রহণযোগ্যতা কমছে না তো। বর্তমানে পুজো মণ্ডপে DJ ডিজিটাল সাউন্ড, বিভিন্ন রকমের মিউজিক ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে ঢাকিদের জীবন অনিয়মিত আয়ের উপর নির্ভরশীল।
তবে আশার কথা UNESCO-র স্বীকৃতির নথিতে দুর্গাপুজোকে একটি জীবন্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে। সেখানে স্থানীয় সম্প্রদায়, শিল্পী, কারিগর ও সংশ্লিষ্ট মানুষদের অংশগ্রহণের উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

ঢাকিদের ধর্মীয় বিশ্বাস
সমস্ত ঢাকিরা গ্রামবাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মতো দীক্ষাগতভাবে নিম্নবর্ণের বৈষ্ণব। তাদের শিবের গাজনকে ঘিরেও গভীর ভক্তি রয়েছে। Raise Your Concern About this Content
ঢাকের শব্দ
ভক্তদের কাছে নির্দিষ্ট দেবতার রূপকে স্পষ্ট, অনুভবযোগ্য এবং বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে ঢাকের শব্দ ও ছন্দ । দেবতা তাঁদের দৈনন্দিন সামাজিক জগতের অংশ হয়ে ওঠেন।
একই বাদ্যযন্ত্র কীভাবে তৈরি করা হচ্ছে, কীভাবে বাজানো হচ্ছে এবং কোন পরিবেশে বাজানো হচ্ছে তার উপর নির্ভর করে একই ঢাক সম্পূর্ণ বিপরীত ধরনের ধর্মীয় অনুভূতি সৃষ্টি করতে পারে।
ঢাক নিজেই এক দীর্ঘ ইতিহাসের বাহক। বাংলার বহুমাত্রিক ধর্মীয় অস্তিত্বের কথা আমাদের মনে করিয়ে দেয়।
উপসংহার
ঢাকের শব্দ আমাদের কাছে পুজোর আগমনী বার্তা। ঢাকের শব্দে লুকিয়ে থাকে বাবার থেকে ছেলের শেখা প্রথম ঢাকের বোল। কোনও পরিবারের অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা,কোনও নারী ঢাকির নিজের অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠা করার লড়াই।
আর হয়তো সেই কারণেই, শরতের বাতাসে দূর থেকে যখন ঢাকের প্রথম বোল ভেসে আসে, তখন আমাদের মনে শুধু পুজোর আনন্দ নয় বাংলার মাটির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক দীর্ঘ সাংস্কৃতিক স্মৃতিও জেগে ওঠে।
ঢাক বাজে। পুজো আসে। আর সেই শব্দের সঙ্গে বেঁচে থাকে বাংলার ঢাকিরাও, বেঁচে থাকে বাংলার সংস্কৃতি, বাংলার ঐতিহ্য।
তথ্যসূত্র
১. MDPI – Religions Journal
২. UNESCO Intangible Cultural Heritage – Durga Puja in Kolkata



