ভারত এমন দেশ যেখানে একই দেবীকে ঘিরে অঞ্চলভেদে তৈরি হয়েছে বিভিন্ন আচার, রীতি ও উৎসবের পরম্পরা। শরৎকাল এলেই যেমন সবচেয়ে বড় উৎসব দুর্গাপুজো পালন করে বাঙালিরা, তেমনি দেশের বহু অবাঙালি সম্প্রদায় এইসময় নবরাত্রি পালন করে। নয় রাত, দশ দিন ধরে পালন করা হয় এই উৎসব। যা মূলত শক্তির আরাধনা। বিভিন্ন রাজ্যে এবং স্থানীয় সংস্কৃতির উপর নির্ভর করে উদযাপনের ধরন বদলে যায়।
কোথাও একাধিক রূপে দেবী দুর্গার আরাধনা করা হয়। কোথাও গরবা বা ডান্ডিয়ার তালে আনন্দ উদযাপন করা হয়। কোথাও কঠোর উপবাস, নিষ্ঠার মাধ্যমে মা দুর্গার পুজো করা হয়। দশমীতে কোথাও বিজয়াদশমী আবার কোথাও দশেরা উদযাপন করা হয়। এই বৈচিত্র্যই ভারতের বহুত্ববাদী সংস্কৃতির এক অনুচ্চারিত অধ্যায়।
নবরাত্রি কী?
নবরাত্রি শব্দের অর্থ হল নয় রাত। হিন্দু পঞ্জিকা অনুযায়ী একটা বছরে চারটি নবরাত্রির উল্লেখ পাওয়া যায়। অর্থাৎ চৈত্র, আষাঢ়, আশ্বিন, মাঘ এই চার মাসে নবরাত্রি পালন করা হয়। তবে আশ্বিন মাসের নবরাত্রি দেশের বিভিন্ন জায়গায় পালন করা হয়। নয় দিনে দেবী দুর্গার নয়টি রূপের আরাধনা করা হয়। নয়টি রূপই নবদুর্গা নামে পরিচিত। শৈল্যপুত্রী, ব্রক্ষ্মচারিণী, চন্দ্রঘটা, কুষ্মাণ্ডা, স্কন্দমাতা, কাত্যায়নী, কালরাত্রি, মহাগৌরী, এবং সিদ্ধিদাত্রী এই নয়রূপে দেবী দুর্গার আরাধনা করা হয়।
নয় দিনে নয় রূপ- নবদুর্গার আরাধনা
প্রথম দিন: শৈল্যপুত্রী পর্বতকন্যা পার্বতীর রূপ
দ্বিতীয় দিন: ব্রক্ষ্মচারিণী তপস্যা ও সাধনার প্রতীক
তৃতীয় দিন: চন্দ্রঘটা,সাহস ও শক্তির প্রতীক
চতুর্থ দিন: কুষ্মাণ্ডা, সৃষ্টিশক্তির সঙ্গে যুক্ত দেবীর রূপ
পঞ্চম দিন: স্কন্দমাতা, মাতৃত্বের প্রতীক
ষষ্ঠ দিন: কাত্যায়নী সাহস ও শক্তির প্রতীক
সপ্তম দিন: কালরাত্রি, অশুভ শক্তি বিনাশের প্রতীক
অষ্টম দিন: মহাগৌরী, পবিত্রতা ও শান্তির প্রতীক
নবম দিন: সিদ্ধিদাত্রী, সিদ্ধি ও পূর্ণতার প্রতীক
বাংলার দুর্গাপুজো ও নবরাত্রির মধ্যে পার্থক্য কোথায়?
দুর্গাপুজোয় মহিষাসুরমর্দিনী রূপে দেবী দুর্গার আরাধনা করা হয়। বোধন, সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী ও দশমীতে নিষ্ঠা ভরে মা দুর্গার পুজো করা হয়।
অন্যদিকে এই সময়ে নবরাত্রিতে মেতে ওঠে বাংলা ও অন্য রাজ্যের অবাঙালি সম্প্রদায়ের মানুষ। নয় দিন ধরে নয় রূপে দেবী দুর্গার আরাধনা করা হয়। আবার গুজরাটে নবরাত্রির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে রয়েছে গরবা ও ডান্ডিয়া।
অর্থাৎ বুঝতেই পারছি মা দুর্গাকে বন্দনা করার নিয়ম আলাদা হলেও মূল ভাবনা কিন্তু সবক্ষেত্রেই এক।
বাংলার পুজোমণ্ডপে যেমন ঢাকের শব্দ, ধুনুচি নাচে এক আলাদা আবহ সৃষ্টি হয় তেমনি গুজরাটে নবরাত্রিতে ঢোল, গান, রঙিন পোশাক, গরবার ছন্দে মেতে ওঠে সকলে।
গুজরাটে গরবার তালে নবরাত্রি উদযাপন

গুজরাটে খুব ধুমধাম করে নবরাত্রি পালন করা হয়। এটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উৎসবও।
রাতে খোলা মাঠে গরবার আয়োজন করা হয়। সাধারণত মাঝখানে দেবীর উদ্দেশ্যে জ্বালানো প্রদীপ, তাকে কেন্দ্র করে বৃত্তাকারে নাচেন নারী ও পুরুষ।
গরবা শব্দটি গর্ভ বা জীবন উৎস থেকে এসেছে বলেই মনে করা হয়। মাঝখানে রাখা প্রদীপকে জীবনের উৎস বা দেবীর প্রতীক হিসেবে দেখা হয়।
গরবা আর ডান্ডিয়ার মধ্যে কী পার্থক্য রয়েছে?
অনেকেই ভাবেন গরবা আর ডান্ডিয়া মানেই হয়তো এক। কিন্তু দুটোর মধ্যে বিস্তর পার্থক্য রয়েছে।
হাততালি ও তালে তালে নাচ হচ্ছে গরবা। অন্যদিকে ডান্ডিয়ায় কাঠের ছোট ছোট লাঠি ব্যবহার করা হয়। জোড়ায় বা দলবদ্ধভাবে নাচার সময় একে অপরের ডান্ডিয়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে আঘাতের মধ্য দিয়ে নাচের ছন্দ সৃষ্টি হয়।
নবরাত্রিতে ডান্ডিয়া ও গরবা দু’টোর আয়োজন করা হয়।
মহারাষ্ট্রে জাঁকজমকভাবে নবরাত্রি পালন
মহারাষ্ট্রেও নবরাত্রি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক পরিবারে দেবীর ঘট স্থাপন করে পুজো করার রীতি রয়েছে। নিয়ম মেনে দেবীর আরাধনা, প্রদীপ জ্বালানো এবং বিভিন্ন ধর্মীয় আচার পালন করা হয়।
মহারাষ্ট্রে নবরাত্রিতে বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ভক্তিগীতি ও বিশেষ পুজোর ব্যবস্থা করা হয়।
নবরাত্রির শেষদিনে দশেরা বিশেষ গুরুত্ব পায়। বিজয়ের প্রতীক হিসেবে এই দিনটি উদযাপন করা হয়।

ভাংড়ার তালে মিলেমিশে একাকার পঞ্জাবের নবরাত্রি
উত্তর ভারতের পঞ্জাবে নবরাত্রি উদযাপনের নিজস্ব এক ছন্দ রয়েছে, যা অনেকটা “ঢোলের নৃত্য”-এর মতো প্রাণবন্ত। পাঞ্জাবিরা রঙিন পাগড়ি পরে ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র ঢোলের তালে রাতভর নাচে মেতে ওঠেন। ঢোলের উদ্দীপনাময় ছন্দ, পায়ের তালে তালে নৃত্য এবং প্রাণবন্ত পরিবেশনা তৈরি করে এক অপূর্ব দৃশ্য।
নারী ও পুরুষ উভয়েই রঙিন ও ঐতিহ্যবাহী পোশাকে সেজে নিজেদের উচ্ছ্বসিত নৃত্যভঙ্গির মাধ্যমে উৎসবের আনন্দকে আরও বাড়িয়ে তোলেন। চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে ভাংড়ার প্রাণবন্ত শক্তি ও উদ্দীপনা। ভক্তি এবং উৎসবের আনন্দের এই অপূর্ব মেলবন্ধন পাঞ্জাবের নবরাত্রিকে করে তোলে এক অনন্য সাংস্কৃতিক উদযাপন।
কেরালার নবরাত্রিতে দেবী সরস্বতীর বন্দনা
দক্ষিণ ভারতের কেরালায় নবরাত্রি উদযাপনে আধ্যাত্মিকতা ও শিক্ষার এক অনন্য মেলবন্ধন দেখা যায়। এখানে সরস্বতী পুজো এবং বিদ্যারম্ভম নবরাত্রির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আচার। পরিবার ও শিক্ষার্থীরা একত্রিত হয়ে জ্ঞান ও বিদ্যার দেবী সরস্বতীর আরাধনা করেন।
কেরালার নবরাত্রির বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল, দেবীর মূর্তির সামনে বই ও বাদ্যযন্ত্র রেখে পুজো করা। এটি জ্ঞান অর্জন, শিক্ষা ও সৃজনশীলতার প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা এবং জ্ঞানচর্চার প্রতীক। আধ্যাত্মিকতা ও শিক্ষার এই মেলবন্ধন কেরালার গভীর সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ এবং বিদ্যার প্রতি মানুষের শ্রদ্ধাকে তুলে ধরে।
নবরাত্রির শেষ দিনে রাজ্যের ১০৮টি দুর্গামন্দির সাজানো হয়। ফলে কেরালার নবরাত্রি হয়ে ওঠে সংস্কৃতি, আধ্যাত্মিকতা ও জ্ঞানচর্চার এক সুরেলা সমন্বয় যা একইসঙ্গে মানুষের মন ও আত্মাকে সমৃদ্ধ করে।
বিহুর ছোঁয়ায় অসমের দুর্গাপুজো
অসমে নবরাত্রি উদযাপনে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক সুন্দর মেলবন্ধন দেখা যায়। এখানে বিহুর রঙিন উৎসব এবং দুর্গাপুজোর জাঁকজমক একসঙ্গে মিশে যায়। ঐতিহ্যবাহী অসমীয়া আচার-অনুষ্ঠানের সঙ্গে প্রাণবন্ত বিহু নৃত্যের মধ্য দিয়ে উৎসবের সূচনা হয়।
উৎসব যত এগিয়ে যায়, ধীরে ধীরে উদযাপনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে দুর্গাপুজোর মহিমা ও আড়ম্বর। দুটি ভিন্ন সাংস্কৃতিক উৎসবের এই সুরেলা মেলবন্ধন অসমের নবরাত্রিকে করে তোলে আরও আকর্ষণীয়। ভারতের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য, ঐতিহ্য ও সম্প্রীতির এক সুন্দর চিত্র ফুটে ওঠে।
রাজস্থানের মারওয়ার উৎসব
রাজস্থানে নবরাত্রিতে মারওয়ার উৎসব পালন করা হয়। রাতের খোলা আকাশের নিচে ঢোলকের ছন্দ ও ঘুমরের ঘূর্ণায়মান ভঙ্গি মরুভূমির এই রাজ্যে আলাদা বর্ণময় আবহ তৈরি করে। নানা ধরনের ঐতিহ্যবাহী রাজস্থানি খাবার ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান সব মিলিয়ে দশেরর মাঠ হয়ে ওঠে অন্যতম আকর্ষণ। প্রধান আকর্ষণ হল ৭২ ফুট রাবণের কুশপুতুল পোড়ানো হয়। রাজস্থানে এই উৎসব প্রায় ২০ দিন ধরে চলতে থাকে। ধনতেরাস পর্যন্ত নানা মেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
তামিলনাড়ুর গোলু ও কোলুর উৎসব
তামিলনাড়ুতে নবরাত্রির সময় গোলু কোলুর উৎসব পালিত হয়। এখানে মূলত মাটির পুতুল ও মূর্তির মাধ্যমে বিভিন্ন পৌরাণিক কাহিনি ও ধর্মীয় আখ্যান তুলে ধরা হয়। দেবী দুর্গার পাশাপাশি দেবী লক্ষ্মী ও সরস্বতীরও আরাধনা করা হয়। স্থানীয় লোকেদের প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী আলাদা আলাদা দিনে তিন দেবীর পুজো করা হয়।

তামিলনাড়ুর বেশ কিছু অঞ্চলে নবরাত্রির নবমীতে আয়ুধ পুজো পালিত হয়। এই পুজো আসলে দেবী সরস্বতীর আরাধনা। ওই দিন কৃষিকাজের সরঞ্জাম, বাদ্যযন্ত্র, বই, মেশিন, গাড়িও পুজো করা হয়।
হিমাচলের কুল্লুর দশেরা
দেশ ও বিদেশের বহু পর্যটকদের কাছে হিমাচলের কুল্লুর দশেরা বেশ জনপ্রিয়। ভগবান রামের অযোধ্যায় প্রত্যাবর্তনের স্মরণে এই উৎসব পালন করা হয়। এই উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ দেবদেবীর মূর্তি নিয়ে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা। বিয়াস নদীর ধারে লঙ্কাদহনের প্রতীকী আয়োজন করা হয়। Raise Your Concern About this Content
বিহার ও উত্তরপ্রদেশের রামলীলা
রামলীলা বিহার ও উত্তরপ্রদেশের নবরাত্রি উৎসব পালনের অন্যতম আকর্ষণ। হিন্দু মহাকাব্য রামায়ণ ও ভগবান রামের জীবনের ওপরে বিভিন্ন ঘটনা নাটকের মাধ্যমে মঞ্চস্থ করা হয়।
দেবী দুর্গার আরাধনা করা হয়। অনেকে উপবাস পালন করে এবং নিরামিষ খাবার খান। নয় দিন পর দশমীর দিন রাবণ, কুম্ভকর্ণ ও মেঘনাদের কুশপুতুল দহন করা হয়। অশুভর বিনাশ, শুভ কাজের জয়ের প্রতীক হিসেবে এই উৎসবের আয়োজন করা হয়।
অন্ধ্রপ্রদেশের বতুকাম্মা উৎসব
নবরাত্রির সময় দেবী দুর্গার আরাধনা করেন মহিলারা। দাম্পত্য জীবনে সুখ ও সমৃদ্ধির জন্য দেবীর কাছে প্রার্থনা করেন। জীবনসঙ্গী খুঁজে পেতে অবিবাহিত তরুণীরা দেবীর পুজো করেন। তেলেগু ভাষায় এই উৎসব বতুকাম্মা পাণ্ডুগা নামে পরিচিত। বতুকাম্মা পাণ্ডুগা শব্দের অর্থ মাতৃশক্তি জীবন্ত হয়ে ওঠো। নারীরা স্থানীয় বিভিন্ন ফুল দিয়ে স্তুপ তৈরি করেন এবং দেবীর আরাধনা করেন। উৎসবের শেষ দিনে ফুলের স্তুপগুলি বিসর্জন দেওয়া হয়।
কর্ণাটকের মাইসোরের দশেরা
১৬১০ সালে রাজা ওয়োদেয়ারের শাসনকাল থেকে মাইসোর শহরে অত্যন্ত জাঁকজমকভাবে দশেরা উৎসব পালন করা হত। উৎসবের নবম দিনে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বার করা হয়। ওয়োদেয়ার রাজবংশের ক্ষমতার প্রতীক রাজকীয় তরবারিকে সিংহাসনে প্রতিষ্ঠা করে পুজো করা হয়। পরে সেই তরবারি নিয়ে বিশাল শোভাযাত্রা বের করা হয়। দশমীতে দুর্গার আরও এক রূপ দেবী চামুণ্ডেশ্বরীর প্রতিমা হাতির পিঠে চাপিয়ে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের করা হয়।
ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে নবরাত্রি উৎসব পালন বিভিন্ন ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও উৎসবের বর্ণময় ক্যালাইডোস্কোপ। দেশের প্রতিটি নিজের মতো ধরে নবরাত্রি পালন করে। এই বৈচিত্র্য ভারতের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে আরও সমৃদ্ধ করে তোলে।
তথ্যসূত্র
১. ভারতের ১৩টি রাজ্যে নবরাত্রি উদযাপনের ১৩টি অনন্য ঐতিহ্য
২. ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে নবরাত্রি উদযাপনের রীতি ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য
৩. ভারতজুড়ে নবরাত্রি উৎসব: আঞ্চলিক প্রথা, সংস্কৃতি ও উদযাপনের বৈচিত্র্য
৪. উত্তর থেকে দক্ষিণ ভারত: নবরাত্রি পালনের ভিন্ন ভিন্ন ঐতিহ্য
৫. নবরাত্রি ও দুর্গাপূজা ২০২৬: উৎসবের তারিখ, ধর্মীয় আচার ও তাৎপর্য



