গল্পের সৌন্দর্য শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়; অভিনয়ের মাধ্যমে পর্দায় তার অনুপম রূপ ফুটিয়ে তোলার মধ্যেও লুকিয়ে থাকে এক অসাধারণ মাধুর্য। সে গল্প কখনো আবেগের, কখনো প্রতিবাদের, আবার কখনো নিজের অস্তিত্ব খুঁজে ফেরার। আর ঠিক সেই চিরন্তন ছন্দে নতুন সুরের সংযোজন করেছেন রাজর্ষি ধাড়া এবং তাঁর সৃজনশীল টিম। তাঁদের ভাবনায়, চিন্তায় ও প্রচেষ্টায় জন্ম নিয়েছে এমন কিছু কাজ, যা মূলস্রোতের বাইরে থেকেও সমাজকে এক নতুন আয়নায় দেখতে শেখায়।
“যক্ষ”: নাট্য থেকে পর্দায় প্রতিবাদ
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজেই ছিলেন চিরকাল স্রোতের বিপরীতে যাত্রা করা এক শিল্পী। তাঁর সাহিত্য ও নাটকে ছিল প্রতিবাদ, প্রশ্ন, বিপ্লব এবং আত্মদর্শনের এক মহাকাব্যিক প্রকাশ। রাজর্ষী ও তাঁর টিমের কাজ “যক্ষ” সেই চেতনাকেই আধুনিক এক পরিপ্রেক্ষিতে আত্মস্থ করেছে। তারা শুধু নাট্যরূপেই থেমে থাকেনি; বরং রবীন্দ্রনাথের নাটক “রক্তকরবী”-কে নতুনভাবে বিশ্লেষণ করে সমকালীন এক প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে তুলে ধরেছে।
“রক্তকরবী” এক আক্ষরিক ও রূপক অর্থে আবদ্ধ শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে একটি মানসিক বিপ্লবের প্রতীক। যে রাজার শাসন নিজেই এক খাঁচা, তার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসার আকাঙ্ক্ষাই নাটকের মূলে। রাজর্ষীর “যক্ষ”-এ ঠিক সেই পথেই হাঁটা হয়েছে—সৃষ্টি এবং ধ্বংসের দ্বন্দ্বের মধ্যে দিয়ে এক নতুন রূপে আত্মপ্রকাশ।
“বেকেটের মতো”: অস্তিত্বহীন সময়ের মুখোমুখি
সময়ের গতির সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে আমরা নিজের অস্তিত্বটাই যেন হারিয়ে ফেলছি। প্রতিদিনের ব্যস্ততা, কাঠামোর মতো রুটিন, আর ঠাসবুনটে গড়া জীবনযাত্রা আমাদের আর থেমে দাঁড়াতে দেয় না। কিন্তু সেই থেমে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা, নিজেকে ফিরে দেখার আকাঙ্ক্ষা থেকেই জন্ম নেয় “বেকেটের মতো”—একটি ছোটগল্প এবং শর্টফিল্ম, যা শুধু সময়কে নয়, আমাদের নিজেকেও প্রশ্ন করে।
রাজর্ষি ধাড়া বলেন,
“প্রায় ৬ মাসের একটা জার্নি। ডিসেম্বরে ‘এইসময়’ সংবাদপত্রের রবিবারোয়ারীতে গল্পটা ছাপা থেকে আজ পর্যন্ত, একটা স্বপ্নের মধ্যে ছিলাম। লেখা এবং শর্টফিল্ম, দুদিক থেকেই ‘বেকেটের মতো’ একটু বেশিই স্পেশাল আমার কাছে।”
কিন্তু কেন “বেকেটের মতো”? কে ছিলেন বেকেট?
স্যামুয়েল বেকেট (Samuel Beckett) ছিলেন ২০শ শতকের অন্যতম প্রভাবশালী নাট্যকার, ঔপন্যাসিক ও কবি। তাঁর লেখা মূলত “অ্যাবসার্ড থিয়েটার” ধারার অন্তর্গত, যেখানে মানুষের অস্তিত্বহীনতা, হতাশা, নৈরাশ্য এবং অর্থহীন জীবনের মাঝেও এক নির্লিপ্ত দর্শন উঠে আসে। তাঁর সর্বাধিক পরিচিত নাটক “Waiting for Godot”-এ দুই চরিত্র অনির্দিষ্টভাবে কারও অপেক্ষায় সময় কাটাচ্ছে—যে “গডো” কখনোই আসে না। সেই নাটকে উঠে এসেছে সময়ের প্রতি অসহায়তা, মানুষের সীমাবদ্ধতা এবং নিরর্থকতার মধ্যেও একধরনের অন্তর্দৃষ্টি। Raise Your Concern About this Content
রাজর্ষির “বেকেটের মতো” ঠিক তেমনই এক অনুসন্ধান। কেউ কারো জন্য অপেক্ষা করছে না—বরং নিজের ভেতরেই সময়ের খোঁজে ছুটে চলেছে। এই প্রজেক্টে সময় কখনো শান্ত, আবার কখনো উন্মত্ত এক দানবের মতো ধেয়ে এসেছে, যা মানুষকে নিজের ভেতরের ছায়ার সঙ্গে মুখোমুখি দাঁড় করায়। বেকেট যেমন মানুষকে তার শূন্যতার সামনে দাঁড় করিয়েছিলেন, রাজর্ষির কাজও ঠিক তেমনই কিছু প্রশ্ন তোলে—
“নিজের ভালো থাকাটা ঠিক কোথায় লুকিয়ে আছে?”
“অস্তিত্বহীন ভাবে ‘নাভি’র সন্ধান করা কি খুব দোষের কিছু?”
এই সব প্রশ্নই বুনে যায় এক অদৃশ্য বোধের রেখাচিত্র।
“বেকেটের মতো” কিংবা “যক্ষ”—এই সব কাজ সমাজে এক প্রতিবাদ ও অনুভূতির ভাষা, এক আত্মচিন্তার দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলে। তারা প্রমাণ করে দেয়, সত্যিকারের শিল্প কখনো শুধুই বিনোদন নয়; তা একসময় হয়ে ওঠে অস্তিত্বের পরিপূরক প্রশ্ন।
রাজর্ষি ও তাঁর টিম শুধু নাট্য বা চলচ্চিত্র নির্মাণ করেননি, তারা আমাদের সামনে এক আয়না তুলে ধরেছেন—যেখানে আমরা, আমাদের সমাজ এবং সময়—সব একসাথে দাঁড়িয়ে থাকে প্রশ্নের মুখে।
তথ্যসূত্র:
- রবীন্দ্রনাথের নাটকসমগ্র – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
- Modern Indian Theatre: A Reader – সম্পাদক: Nandi Bhatia
- Indian Theatre: Traditions of Performance – Farley P. Richmond
- বাংলা ছোটগল্পের ইতিহাস – আশীষ বন্দ্যোপাধ্যায়
- Narratives of Indian Cinema – Manju Jain
- Indian Drama in English – K. R. Srinivasa Iyengar



