স্বাভাবিক ছন্দে ফিরতে কী করবেন?
পুজো পুজো আসছে আসছে ভালোই, এলে কেমন হুট করে শেষ হয়ে যায়। দুর্গাপুজো শেষ হওয়ার পর এই ভাবনা কম-বেশি আমাদের সব বাঙালিদের মনে দুঃখ জমায়। চার দিনের মজা আনন্দ হাসির শেষে অদ্ভূত বিষন্নতা ঘিরে ধরে আমাদের। বিসর্জনের পরের দুর্গা মণ্ডপের শূন্যতা আমাদের মনকেও গ্রাস করে ফেলে। কিছু একটা বুক চাপা কষ্ট গলার কাছে আটকে থাকে। এই সবকিছুর প্রভাব পড়তে থাকে, আমাদের স্বাভাবিক জীবনের ছন্দ কাটে।
পুজোর ক’টা দিন যেন চোখের পলকে কেটে গেল। আলো ঝলমলে প্যান্ডেল, ঢাকের আওয়াজ, নতুন পোশাক, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, রাত জেগে ঠাকুর দেখা, রেস্তরাঁয় খাওয়াদাওয়া আর সোশ্যাল মিডিয়ায় একের পর এক ছবি পোস্ট করা সব মিলিয়ে পাওয়ার প্যাক্ট মেমোরিজ। কিন্তু উৎসব শেষ হতেই যেন মনটা কেমন খালি খালি লাগছে। কাজে মন বসছে না, সকালে ঘুম থেকে উঠতে ইচ্ছে করছে না, পুরনো রুটিনে ফিরতে বিরক্তি হচ্ছে। কখনও আবার সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্যদের উৎসবের ছবি দেখে মনে হচ্ছে, আনন্দের দিনগুলো বুঝি খুব তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গেল! মন খারাপের এই অনুভূতি অনেকের কাছেই খুব পরিচিত।
পোস্ট ফেল্টিভ্যাল ব্লুজ কী?
মনডে ব্লুজ থেকে পোস্ট ফোস্টিভ্যাল ব্লুজ, এখন সব ডিপ্রেশনের আলাদা আলাদা নাম রয়েছে। উইকেন্ডের মজা আনন্দ কাটিয়ে সপ্তাহের প্রথমে অফিসে গেলে যে বিষন্নতা ঘিরে ধরে তা মনডে ব্লুজ পরিচিত। তেমনি উৎসবের পর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতেও একটা মনকষ্টে ভোগে অনেকে, যা মনোবিজ্ঞানের ভাষায় ‘পোস্ট ফেস্টিভ্যাল ব্লুজ’ নামে পরিচিত। ঠিক কেমন অনুভূতি হয়? উৎসবের আনন্দ, উত্তেজনা, ব্যস্ততার পর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার সময় সাময়িক ক্লান্তি, মনখারাপ বা শূন্যতা অনুভব করা।

কেন এমন মনখারাপ?
উৎসব শেষ হলেই কেন এমন মনখারাপ বাসা বাঁধে মনে? ঠিক কোন মানসিক চাপ থেকে এমন মনোকষ্ট অনুভব করতে হয়?
উৎসবের ব্যস্ততা থেকে হঠাৎ নীরবতা
দুর্গাপুজো শুধু চার দিনের নয়, তার প্রস্তুতি শুরু হয় এক মাস আগে থেকে। হাজার হাজার পরিকল্পনা, কবে কোন ঠাকুর দেখা হবে, কোন প্য়ান্ডেল না দেখলেই নয়, সপ্তমী থেকে দশমী কোন দিন কোন পোশাক পরা হবে সব মিলিয়ে তুমুল উত্তেজনা থাকে। পুজোর চার দিন তো সেই উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়। প্রতিদিনই থাকে নতুন কিছু করার প্ল্যান। তার উপর বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হওয়া বা রিইউনিয়ন, পরিবারের সঙ্গে কোয়ালিটি টাইম স্পেন্ড বা প্রিয় মানুষের সঙ্গে বিশেষ কোনও মুহূর্ত কাটানো এগুলো তো থাকেই। উৎসব শেষ হলেই সেই ব্যস্ততা থাকে না। স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে হয়। সংসার,অফিস, পড়াশোনা বা কোনও না কোনও দায়িত্ব পালনে আবার ব্যস্ত হয়ে পড়তে হয়।
হঠাৎ করে এই পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতেই সময় লেগে যায়। পুজোর আনন্দ ঘিরে যাদের অনেক প্ল্যান থাকে তাদের হঠাৎ করে এই পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া একটু অসম্ভব হয়ে পড়ে এটাও ঠিক।
প্রত্যাশা ও বাস্তবের মধ্যে পার্থক্য
দুর্গাপুজো ঘিরে সারাবছর ধরে অনেক মানুষের অনেক কিছু প্ল্যান থাকে। অনেক ক্ষেত্রে সেই পরিকল্পনা মতো পুজো কাটানো সম্ভব হয়ে ওঠে না। কোনও বন্ধু হয়তো কাজের চাপে বাড়ি ফিরতে পারেনা তাই হয়তো রিইউনিয়ন করার প্ল্যান ভেস্তে যায়। আবার কারও কারও প্রচুর ঘোরার পরিকল্পনা থাকে, কিন্তু ব্যক্তিগত কারণে সব ঘোরা হয়ে ওঠে না। ফলে উৎসব শেষ হওয়ার পর মনে হয় ‘এত অপেক্ষা করার পরও ভালোভাবে পুজোয় আনন্দ করাই হল না’। এই অপূর্ণতাও উৎসব পরবর্তী মনখারাপের অন্যতম কারণ।
পারফেক্ট পুজো আর FOMO
পৃথিবীতে পারফেক্ট বলে কিছু হয় না। এটা হয়তো আমরা অনেক জানি কিন্তু মানতে পারিনা। আমরা সবসময় অসম্ভবের পিছনে দৌড়তে ভালোবাসি,অবাস্তব জিনিসকে ঘিরে কখনও কখনও বুনে ফেলি স্বপ্নের মায়াজাল। এইসবে বর্তমানে বাড়তি ইন্ধন জোগাচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়া। ইনস্টাগ্রামের রিল, ফেসবুকের ছবি-স্টোরি বা বন্ধুর প্যান্ডেল হপিং-এর ছবি দেখে নিজের জীবনের সঙ্গে তুলনা করার প্রবণতা বাড়তে থাকে। মনে হতে পারে আমার থেকে অন্যরা বেশি আনন্দ করছে। এখানেই কাজ করে ফিয়ার অফ মিসিম আউট। আনন্দের কোনও এক বানানো স্ট্যান্ডার্ড থেকে বঞ্চিত হওয়ার অনুভূতি।
মনে রাখা প্রয়োজন, সোশ্যাল মিডিয়ায় আমরা সাধারণত মানুষের আনন্দের মুহূর্তগুলোই দেখি, তাদের ক্লান্তি, হতাশা কিংবা ব্যক্তিগত সমস্যাগুলো নয়। তাই অন্যের কয়েকটি ছবি দেখে নিজের আনন্দকে কম ভাবার কোনও কারণ নেই।

পুজোর ইনডিসিপ্লিন ও ক্লান্তি
পুজোর সময় আমাদের জীবন থেকে ডিসিপ্লিন শব্দটাই হারিয়ে যায়। রাত জেগে ঠাকুর দেখা, বাইরের খাবার খাওয়া, অনেকক্ষণ হাঁটাহাঁটি, অতিরিক্ত ভিড়ের মধ্যে থাকা, এই সমস্ত অনিয়মের জন্য শরীর ক্লান্ত হয়ে পড়ে। পুজোর কয়েকদিন পর্যাপ্ত ঘুমও হয়না। যার ফলে মেজাজ ও আবেগ নিয়ন্ত্রণের উপর প্রভাব পড়ে। পাশাপাশি উৎসবের পরে অফিস বা পড়াশোনার চাপ শুরু হলে ক্লান্তি আরও বেশি অনুভূূত হয়। মনখারাপের পিছনে তাই শারীরিক ক্লান্তিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।
পুজোর স্মৃতি ও আবেগ
পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে প্রচুর স্মৃতি। পুজোর সময় বিদেশে চাকরি করা বহু মানুষ দেশে ফেরে। পরিচিত কাছের মানুষদের সঙ্গে সময় কাটানো। কিছু ক্ষেত্রে এমনও হয় শুধু পুজোর সময় কিছু মানুষের সঙ্গে দেখা হয়. বিশেষ সময় কাটানো হয়।Raise Your Concern About this Content
পুজো শেষ হওয়ার পর সেই স্মৃতি বেশি করে মনে পড়তে থাকে। সেই স্মৃতি কোনওক্ষেত্রে এই বিষন্নতাকে ডেকে আনে।
পোস্ট ফেস্টিভ্যাল ব্লুজ কাটিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আসার উপায়
পুজোর পর এই মনখারাপ অত্যন্ত স্বাভাবিক। তাই অযথা এই মনখারাপ নিয়ে ভাববেন না কারণ আপনি যত ভাববেন তত বেশি মন খারাপ করবে।
একদিনে সব স্বাভাবিক হবে না
উৎসব শেষ হওয়ার পরদিন থেকে ম্যাজিকের মতো সবকিছু স্বাভাবিক হবে না।আগের মতো কর্মক্ষম হওয়ার প্রত্যাশা করবেন না। নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার সময় দিন। ধীরে ধীরে ঘুম, খাওয়া, কাজের রুটিনে ফিরুন। প্রয়োজনে কাজ ভাগ করে নিন। মনে রাখবেন সময় সবকিছু ঠিক করে দেয়।
ডিসিপ্লিন ফিরিয়ে আনুন
নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট কাজ করার অভ্যাস ফিরিয়ে আনতে হবে। ঘুমাতে যাওয়া, পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া, নিয়মিত খাবার খাওয়া ও জল পান করার দিকে নজর দিন। শরীরের ক্লান্তি কমলে মনও অনেক সময় কিছুটা স্বস্তি পায়। মোবাইল দেখা যতটা সম্ভব কমানোর চেষ্টা করুন।

কথা বলুন ও প্রিয়জনের সঙ্গে যোগাযোগ করুন
পুজোর সময় যাঁদের সঙ্গে অনেকটা সময় কাটিয়েছেন, তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ একেবারে বন্ধ হয়ে যেতে দেবেন না। যে বন্ধু বিদেশে থাকে তার সঙ্গে সপ্তাহে একটা সময় বের করে কথা বলুন। দেখবেন অনেকটা হালকা লাগবে, চাপা কষ্ট অনেকটা কমবে।
সোশ্যাল মিডিয়া থেকে সাময়িক বিরতি নিন
অন্যদের পুজোর ছবি বা রিল দেখে যদি নিজের মন খারাপ হয়, তাহলে কিছু সময়ের জন্য স্ক্রিন টাইম কমিয়ে দিন। মনে রাখবেন, আপনার উৎসব কতটা সুন্দর ছিল, তা লাইক, কমেন্ট বা ছবির সংখ্যায় বিচার হয় না। নিজের অভিজ্ঞতাকে অন্যের অভিজ্ঞতার সঙ্গে তুলনা না করাই ভালো। প্রত্যেকটা মানুষের আলাদা আলাদা অভিজ্ঞতা রয়েছে।
শরীরচর্চা ও জিম বা যোগব্যায়ামে মনোনিবেশ করুন
দৈনন্দিন রুটিনে শরীরচর্চার বিষয়ে গুরুত্ব দিন। জিম বা হালকা স্ট্রেচিং প্রথমে শুরু করুন। ইচ্ছা করলে বাইরে হাঁটতেও যেতে পারেন। এটাও মাথায় রাখবেন যাতে ক্লান্ত শরীরকে অতিরিক্ত ব্যায়াম না করানো হয়।
নিজের জীবনে ছোট ছোট আনন্দ শুরু করুন
আনন্দ পাওয়ার জন্য সব সময় বড় কোনও অনুষ্ঠান প্রয়োজন হয় না। পছন্দের বই পড়া, গান শোনা, প্রিয় খাবার রান্না করা, গাছের যত্ন নেওয়া কিংবা নিজের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটানো—এমন ছোট ছোট কাজেও ভালো লাগা ফিরে আসতে পারে।
মনখারাপ হলে নিজেকে কী বলবেন?
কখনও কখনও আনন্দ শেষ হওয়ার পর সেই আনন্দের অনুপস্থিতি অনুভব করাটাই স্বাভাবিক। তবে সেটা নিয়ে পড়ে থাকাটা কোনও কাজের কথা নয়। অনুভূতিকে অস্বীকার না করে নিজেকে বোঝার চেষ্টা করুন। মন খারাপ হলে জোর করে হাসিখুশি থাকার প্রয়োজন নেই। সাময়িক কারণে মন খারাপ হতেই পারে।

মনখারাপ হলে কখন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সঙ্গে পরামর্শ করবেন?
সাধারণত উৎসব-পরবর্তী মনখারাপ সাময়িক হতে পারে। তবে যদি মন খারাপ দীর্ঘদিন ধরে থাকে, দৈনন্দিন কাজকর্মে গুরুতর বাধা সৃষ্টি করে, কোনও কিছুতেই আনন্দ না পান, ঘুম বা খাওয়াদাওয়ায় বড় পরিবর্তন আসে কিংবা হতাশা ক্রমশ বাড়তে থাকে, তাহলে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
দুর্গাপুজো বা যে কোনও উৎসবের আনন্দ কিছু সময় বা কয়েকটি নির্দিষ্ট দিনের জন্য সীমাবদ্ধ নয়, সেই আনন্দ আমরা সারাজীবন স্মৃতিতে যত্নে রেখে দিতে পারি। পুজোর আলো নিভে গেলে শহর আবার নিজের চেনা ছন্দে ফিরে আসে। শুরু হয় কাজ, দায়িত্বপালন ও ব্যস্ততার দিন। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে জীবনের আনন্দও শেষ হয়ে গেল। আবার আরও একটা বছরের জন্য অপেক্ষাও প্রতিদিনের জীবনকে আরও সুন্দর করে তুলতে পারে।
তথ্যসূত্র:
১. ছুটি কাটিয়ে ফেরার পর মন খারাপ কেন? পোস্ট-ভ্যাকেশন ব্লুজ কাটানোর উপায়
২. পুজো শেষ হতেই মন খারাপ আর ক্লান্তি? পোস্ট-ফেস্টিভ্যাল ব্লুজ কাটাতে কী করবেন?
৩. উৎসব শেষ, মনে একরাশ শূন্যতা! পোস্ট-ফেস্টিভ্যাল ব্লুজ কাটিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরবেন কীভাবে?
৪. উৎসবের আনন্দ শেষে বিষণ্ণতা? মন ভালো রেখে দৈনন্দিন জীবনে ফেরার সহজ উপায়
৫. দুর্গাপুজো শেষ হতেই মন খারাপ? পুরোনো ছন্দে ফিরে আসার সহজ উপায়



