Homeপার্বণীপুজোর মধ্যে কোন FOMO-তে ভুগছে জেন জি, উৎসবের নতুন সোশ্যাল প্রেসার কী? 

পুজোর মধ্যে কোন FOMO-তে ভুগছে জেন জি, উৎসবের নতুন সোশ্যাল প্রেসার কী? 

সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে নতুন এক রোগ বাসা বেঁধেছে মস্তিস্কে, FOMO। এই গাল ভরা শব্দের অর্থ ফিয়ার অফ মিসিং আউট। বর্তমানে মানসিক রোগে পরিণত হয়েছে এই ফোমো। কোনও কিছু থেকে বাদ পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা।

স্মার্টফোন বর্তমানে শুধু যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে পড়ে নেই, এখন মুঠোফোনই কাজ, খবর, .সামাজিকতা, বিনোদন সবকিছুরই প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠছে। ঘুম থেকে ওঠা থেকে ঘুমোতে যাওয়া পর্যন্ত ফোন স্ক্রল করা যেকোনও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন অভ্যাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠছে। সকালে ফোন খুলে দেশ-দুনিয়ার সব আপডেট পেয়ে যাচ্ছি আমরা। আবার রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে সারাদিনে কোনও খবর নজর এড়িয়ে গিয়েছে কিনা সেটাও একবার দেখে নিচ্ছে। অর্থাৎ আমাদের অবচেতন মনে এটা কাজ করছে বর্তমান যুগে দাঁড়িয়ে আমরা কোনও মানুষের থেকে পিছিয়ে যাচ্ছি না তো, তার ফলাফল হিসেবে কাজের ফাঁকে, পড়াশোনার ফাঁকে একবার ফোন চেক করাটা আমাদের কাছে বাধ্যতামূলক হয়ে পড়ছে। 

প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে সহজ করে দিচ্ছে ঠিকই, কিন্তু অতিরিক্ত ডিজিটাল মিডিয়ার সঙ্গে সংযোগ আবার আমাদের জীবনে নিয়ে আসছে অবসাদ। কারণ এর ফলে আমরা স্বাভাবিক জীবনযাপন থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছি। 

পুজো ফোমো কী?

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

পুজোয় ঠাকুর দেখা, অঞ্জলি, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা এসবকিছুর পাশে সবথেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ পুজোর প্রত্যেক মুহূর্ত সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাগ করে নেওয়া।  প্রত্যেকের পুজোর ডায়রি হিসেবে পোস্ট হচ্ছে একের পর এক ছবি, রিল। সমস্যা হচ্ছে তখন, যখন সোশ্যাল মিডিয়ার কোনও ফ্রেন্ডের ওয়াল একটু বেশি কালারফুল হয়ে উঠছে বা প্যান্ডেল দেখা বেশি হয়ে যাচ্ছে। কারণ তখনই জন্ম নিচ্ছে এক মানসিক চাপ, এই প্যান্ডেলটা তো দেখা হল না, তাহলে কি আমি পিছিয়ে পড়ছি অন্যদের থেকে। বন্ধুরা ঘুরে বেড়াচ্ছে আর আমি বাড়িতে বসে বা বন্ধুরা এই প্যান্ডেল ঘুরে নিল অথচ আমার এই প্যান্ডেল এক্সপ্লোর করা হল না বা বন্ধুদের সঙ্গে প্রতিটি প্ল্যানে অংশ নিতে না পারা, এই না পাওয়ার অনুভূতি থেকে তৈরি হচ্ছে পুজো ফোমা। এই মন খারাপই এখন ইয়ং জেনারেশনকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে। জেন Z-দের এই প্রবণতাই আসলে উৎসবের নতুন সোশ্যাল প্রেসার।  

পুজোর আনন্দ না কি সবকিছু থেকে বাদ না পড়ে যাওয়ার কম্পিটিশন!

দুর্গাপুজো বাঙালির কাছে আবেগ, সামাজিকতা, এতিহ্য, সংস্কৃতির এক অনন্য মেলবন্ধন। সারাবছর ধরে এই সময়টার জন্য অপেক্ষা করে বাঙালিরা। পাড়ার মণ্ডপে অঞ্জলি, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা সবমিলিয়ে শারদোৎসব বাঙালির কাছে এক বিশেষ অনুভূতি। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই পুজোর আনন্দে এসেছে বদল।

ইয়ং জেনারেশনের কাছে প্রতিমা দর্শন, প্যাণ্ডেল হপিং, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, পরিবাররে সঙ্গে সময় কাটানোর থেকেও কোনওসময় প্রধান হয়ে উঠছে কোন প্যান্ডেলে যাওয়া হল, সেখানে কতটা পিকচার পারফেক্ট ছবি তোলা হল, কোন রেস্তোরাঁয় খাওয়া হল এবং সেখানে তোলা ছবিগুলো কতটা আকর্ষণীয়ভাবে সোশ্যাল মিডিয়ার দেওয়ালে তুলে ধরা গেল। স্বাভাবিকভাবেই এই ট্রেন্ডে থাকা, সোশ্যাল মিডিয়ায় হ্যাপেনিং দেখানোর এই রেসে পিছিয়ে পড়লেই অবসাদ বাড়ছে। বড় বড় পুজোর তালিকা, ইনস্টাগ্রামে ট্রেন্ডিং প্যাণ্ডেলের রিল,বন্ধুদের সঙ্গে গল্প-আড্ডার ছবি-আপডেট দেখে অনেকের মনে ভয় জন্ম নিচ্ছে যে ‘ সবাই এত জায়গায় যাচ্ছে আমি পিছিয়ে পড়ছি না তো ?’ নিজের সঙ্গে অন্যদের জীবনের এই তুলনা করার মেন্টালিটি থেকে আসলে ফোমোর উদ্ভব। যেন ওই জীবন না পেলে আমাদের জীবনটাই অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। বর্তমানে পুজোর সেলিব্রেশনও সেই কম্পিটিশনের অংশ হয়ে উঠছে। পুজোর কয়েক দিন ধরেই এই অদ্ভূত রেষারেষি চলছে শুধুমাত্র সোশ্যাল মিডিয়ায় একটু হ্যাপেনিং থাকার চেষ্টায়। এই আশঙ্কা আসলে নতুন জেনারেশনের মানসিক ব্যধিতে পরিণত হচ্ছে। 

সোশ্যাল মিডিয়া বাড়িয়ে তুলছে FOMO?

আগে পুজো সেলিব্রেশন চলত বন্ধু, পরিবারের সঙ্গে। কোন প্যান্ডেল ভালো হয়েছে লোকের কাছ থেকেই জানা যেত। কিন্তু এখন প্যান্ডেল তৈরির সময় থেকে মানুষ জেনে যাচ্ছে কোথায় কী থিম হয়েছে? কোন প্যাণ্ডেলে দুর্গা প্রতিমা কত সুন্দর। কারণ প্রত্যেক মূহূর্তের আপডেট শেয়ার করা হচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। স্মার্টফোনের ওয়ালে ধরা পড়ছে শত শত মানুষের পুজোর অভিজ্ঞতা। 

ইনস্টাগ্রাম স্টোরি, ফেসবুক পোস্ট, রিলের মাধ্যমে অন্যের পুজো সেলিব্রেশনের প্রতিটা আকর্ষণীয় মুহূর্ত আমাদের সামনে উঠে আসছে। ফলে খুব স্বাভাবিকভাবেই নিজের সঙ্গে অন্যের অভিজ্ঞতা তুলনা করার সুযোগও বাড়ছে।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, সপ্তমীর দিন কেউ চারটে প্যাণ্ডেল দেখে বাড়ি ফিরে গেল, সে খুব আনন্দে ছিল কিন্তু বাড়ি গিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখতে পেল তার কোনও বন্ধু ১০টা প্যাণ্ডেল দেখেছে, নতুন কোনও ক্যাফে এক্সপ্লোর করেছে, একাধিক ছবি পোস্ট করেছে । আর এগুলো দেখেই শুরু হয় ফোমো। তাঁর মনে হতে থাকে তার পুজো হয়তো ভালো কাটল না। 

কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আমরা শুধু ভালো মুহূর্তগুলো ভাগ করি। অনেকসময় আমাদের কষ্ট বা খারাপ কোনও ঘটনা শেয়ার করিনা। ফলে আপাতত দৃষ্টিতে সবকিছুই খুব আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। কারণ যে লোক ১০টি প্যাণ্ডডেল দেখেছে. তাকে হয়তো এক ঘণ্টা যানযটে আটকে থাকতে হয়েছে, কোনও বন্ধুর সঙ্গে প্ল্যান ক্যানসেল হয়েছে কিন্তু এইসব ঘটনা সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করেনি তাই অন্যজনের কাছে মনে তার পুজো ভাইবস আকর্ষণীয় মনে হতেই পারে।

ফলে অন্যের সাজানো মুহূর্তের সঙ্গে নিজের সম্পূর্ণ অভিজ্ঞতার তুলনা করতে গিয়ে অনেকেই অজান্তে নিজের আনন্দকেই ছোট করে দেখতে শুরু করেন।Raise Your Concern About this Content

সব প্যাণ্ডেল দেখতে হবে, এমন মানসিকতা তৈরি হচ্ছে কেন?

এর জন্য শুধু ফোমো দায়ী নয়, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা আকাঙ্ক্ষাও একটা গুরুত্বপূর্ণ কারণ। 

জনপ্রিয়তার তালিকায় পিছিয়ে পড়ার ভয়

প্রতিবছর সোশ্যাল মিডিয়া, সংবাদমাধ্যম, বিভিন্ন পুজো গাইডে নতুন থিম, আকর্ষণীয় প্রতিমা, মণ্ডপসজ্জার নিরিখে জনপ্রিয় প্যাণ্ডেলের তালিকা প্রকাশিত হয়। এই তালিকায় প্রত্যেকটি পুজো কভার করা অনেকসময় কারোও কারোও একমাত্র লক্ষ্য হয়ে উঠতে থাকে যেটা একেবারেই উচিত নয়। শহরের প্রত্যেক জনপ্রিয় প্যাণ্ডেল ঘোরা সম্ভব নয়। শারীরিক সক্ষমতা, বাজেট, ভিড় , যোগাযোগ ব্যবস্থা সবকিছুর উপর নির্ভর করে কতটা ঘোরা সম্ভব। কিন্তু ‘কতগুলো প্যাণ্ডেল দেখলে?’ এই প্রশ্ন কোথাও যেন এক প্রতিযোগিতার মনোভাব তৈরি করে দিচ্ছে। 

ট্রেন্ড মিস করার ভয়

সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনও বিশেষ প্যান্ডেল, খাবার, পোশাক কিংবা ফটোগ্রাফির জায়গা জনপ্রিয় হয়ে উঠলে অনেকেই সেখানে যাওয়ার আগ্রহ অনুভব করেন। বন্ধুরা যেখানে ছবি তুলছে, জনপ্রিয় কনটেন্ট ক্রিয়েটররা যে প্যান্ডেলের রিভিউ দিচ্ছেন, কিংবা যে জায়গাটি নিয়ে বারবার রিল দেখা যাচ্ছে, সেখানে না যেতে পারলে মনে হতে পারে গুরুত্বপূর্ণ কিছু বাদ পড়ে গেল। এই প্রবণতা প্যান্ডেল হপিংয়ের পরিকল্পনাকেও প্রভাবিত করতে পারে। নিজের পছন্দের জায়গায় সময় কাটানোর পরিবর্তে কখনও কখনও মানুষ জনপ্রিয়তার তালিকা অনুসরণ করতেই বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

Pujo FOMO-র প্রভাব পড়ছে মানসিক স্বস্তিতে?

উৎসবের সময় আনন্দ, উত্তেজনা এবং ব্যস্ততা থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু যখন আনন্দ উপভোগ করার বদলে কিছু মিস হয়ে যাওয়ার চিন্তাই প্রধান হয়ে ওঠে, তখন পুজোর অভিজ্ঞতা ক্লান্তিকর হয়ে উঠতে পারে।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

পারফেক্ট পুজোর ধারণা   

পৃথিবীতে পারফেক্ট বলে কিছু হয় না। সোশ্যাল মিডিয়ার কনটেন্ট ক্রিয়েটর বা ইনফ্লুয়েন্সারদের পুজোর প্রস্তুতি দেখে আগ্রহ বাড়ে। অ্যামেজিং আউটফিট, নিখুঁত সাজ, আসথেটিক ব্যাকগ্রাউন্ড দেখে পারফেকট পুজো বলে ধারণা হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে প্রত্যেকের পুজো এমন হয় না। 

তাই অনলাইনে আকর্ষণীয় অভিজ্ঞতাকে পুজোর মানদণ্ড বানিয়ে ফেললে হতাশা তৈরি হতে পারে। কনটেন্ট থেকে অনুপ্রেরণা নেওয়া এবং সেই কনটেন্টের সঙ্গে নিজের জীবনের তুলনা করার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।

শেষ পর্যন্ত, পুজো কোনও চেকলিস্ট নয়, কোনও প্রতিযোগিতা নয়, আর অন্যের সঙ্গে নিজের আনন্দের হিসাব মেলানোর পরীক্ষাও নয়।

সব প্যান্ডেল দেখা না হলেও পুজো অসম্পূর্ণ হয় না। সব ট্রেন্ড অনুসরণ না করলেও উৎসবের আনন্দ কমে যায় না। আর সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতিটি মুহূর্ত ভাগ করে না নিলেও সেই মুহূর্তের মূল্য হারিয়ে যায় না।

তথ্যসূত্র:

১. অবজারভেটোরিও (OBS) — ডিজিটাল যুগে ফোমো (FOMO) ও সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব
২. রিসার্চগেট — জেন Z প্রজন্মের কর্মদক্ষতা ও দৈনন্দিন জীবনে ফোমো (FOMO)-র প্রভাব
৩. আনন্দবাজার পত্রিকা — নতুন প্রজন্মের মধ্যে ফোমো (FOMO): কিছু মিস করে ফেলার ভয় ও মানসিক স্বাস্থ্যের সম্পর্ক
৪. সংবাদ প্রতিদিন — প্রযুক্তি ও মানুষের সম্পর্ক: সুস্থ ডিজিটাল অভ্যাস গড়ে তোলার গুরুত্ব

Author

- বিজ্ঞাপন -
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

বাংলা ক্যালেন্ডার

- বিজ্ঞাপন -spot_img

Most Popular

Recent Comments