ঢাকের তালে তালে ধোঁয়া ওঠা ধুনুচি হাতে নাচছেন কেউ। ধুনোর গন্ধে ভরে উঠেছে পুজোমণ্ডপ। কখনও দুই হাতে দুটি ধুনুচি, কখনও কোমর দুলিয়ে তালে তালে নাচ, আবার কোথাও ধুনুচি নাচের প্রতিযোগিতা। দুর্গাপুজোর এই দৃশ্য দেখলে মনে হয়, ধুনুচি নাচ যেন বাঙালির উৎসবের নিজস্ব পরিচয়।
কিন্তু কখনও কি আমরা ভেবে দেখেছি , ধুনুচি নাচের শুরু কোথা থেকে? কে প্রথম ধুনুচি হাতে নেচেছিলেন? আর কীভাবেই বা পুজোর একটি আরতির অনুষঙ্গ হয়ে উঠল উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ?
এই প্রশ্নগুলির সব কটিরই নিশ্চিত ঐতিহাসিক উত্তর পাওয়া যায় না। তবে ধুনুচির ব্যবহার, বাংলার পূজাপদ্ধতি এবং সময়ের সঙ্গে উৎসবের সামাজিক রূপ বদলে যাওয়ার ইতিহাস মিলিয়ে এই ঐতিহ্যের গল্পটা বেশ আকর্ষণীয়।

ধুনুচি নাচের শুরু কি জমিদারবাড়ির দুর্গাপুজো থেকে?
ধুনুচি নাচের উৎপত্তি নিয়ে একটি প্রচলিত ধারণা হল, বাংলার পুরনো বনেদি বাড়ি ও জমিদারবাড়ির দুর্গাপুজোর আচার থেকেই এই নাচ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তবে এই ধারণার পক্ষে নির্দিষ্ট কোনও প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক দলিল পাওয়া কঠিন। তাই ধুনুচি নাচ ঠিক কোনও একটি জমিদারবাড়িতে বা নির্দিষ্ট সময়ে শুরু হয়েছিল, এমন দাবি করা ঠিক হবে না।
যেটুকু নিশ্চিতভাবে বলা যায়, ধুনুচি হাতে ধুনো জ্বালিয়ে দেবীর আরাধনা এবং আরতির সঙ্গে যুক্ত হওয়া বাংলার ধর্মীয় সংস্কৃতির একটি পরিচিত অংশ। পরবর্তী সময়ে এই আচারের সঙ্গে ঢাকের তাল, শরীরের ছন্দ এবং নৃত্যভঙ্গি মিশে ধুনুচি নাচের পরিচিত রূপ তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ, এর ইতিহাস খুঁজতে গেলে শুধু নাচের উৎপত্তি নয়, ধুনুচি ব্যবহারের ধর্মীয় প্রেক্ষাপটও বুঝতে হবে।
ধুনুচি আসলে কী? এর সঙ্গে ধুনোর সম্পর্ক কোথায়?
ধুনুচি হল সাধারণত মাটির তৈরি একটি বিশেষ পাত্র, যার উপরের অংশটি চওড়া এবং নিচে ধরার জন্য একটি হাতল থাকে। বর্তমানে মাটির পাশাপাশি ধাতুর ধুনুচিও ব্যবহার করা হয়।
এই পাত্রে জ্বলন্ত কাঠকয়লা বা অন্য উপযুক্ত জ্বলন্ত উপাদানের উপর নারকেলের ছোবড়া ও ধুনো দেওয়া হয়। ধুনো জ্বলে ধোঁয়া তৈরি করে, যার গন্ধ পূজার পরিবেশকে বিশেষ আবহ দেয়। দুর্গাপুজোর আরতি, ধূপ-ধুনো নিবেদন এবং দেবীর সামনে ভক্তি প্রকাশের সঙ্গে এই পাত্রের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। ধুনুচি নাচে সেই পাত্রটিই হয়ে ওঠে নাচের প্রধান উপকরণ।
এখানে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার, ধুনো জ্বালিয়ে আরতি করা এবং ধুনুচি হাতে নাচ করা এক বিষয় নয়। প্রথমটি পূজার আচার; দ্বিতীয়টি সেই আচারকে ঘিরে গড়ে ওঠা একটি বিশেষ সাংস্কৃতিক প্রকাশ।

ঢাকের তালে কীভাবে নাচের জন্ম হল?
ধুনুচি নাচের কোনও নির্দিষ্ট প্রাচীন নৃত্যশৈলীর নিয়ম বা নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠাকাল জানা যায় না। তবে এর জনপ্রিয় রূপটি বুঝতে গেলে ঢাকের ভূমিকা এড়ানো যায় না।
ঢাকের শব্দ দুর্গাপুজোর আবহ তৈরির অন্যতম প্রধান উপাদান। আরতির সময় ঢাকের দ্রুত তাল, ধুনোর ধোঁয়া এবং ধুনুচির আগুন একসঙ্গে মিলে এক ধরনের নাটকীয় পরিবেশ সৃষ্টি করে। সেই পরিবেশে ভক্তি প্রকাশের অঙ্গভঙ্গি ধীরে ধীরে ছন্দময় নাচের রূপ নেয়।
এই নাচের সৌন্দর্য তার নির্দিষ্ট পদক্ষেপে নয়, বরং তাল, শরীরের ভঙ্গি এবং ধুনুচি সামলানোর দক্ষতায়। কেউ ধীর ছন্দে নাচেন, কেউ দ্রুত তালে ঘুরে দাঁড়ান, আবার কেউ দুই হাতে ধুনুচি নিয়ে নাচকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলেন। তবে ধুনুচি নাচের জনপ্রিয় ব্যাখ্যায় দেবী দুর্গার শক্তি ও মহিষাসুরবধের সঙ্গে এর প্রতীকী সম্পর্কের কথাও বলা হয়। এটিকে সাংস্কৃতিক ব্যাখ্যা হিসেবে দেখা যায়; নাচটির উৎপত্তি সম্পর্কে প্রমাণিত ঐতিহাসিক তথ্য হিসেবে নয়।
দুর্গাপুজোর কোন সময়ে ধুনুচি নাচ হয়?
বাংলার বহু দুর্গাপুজোয় সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী কিংবা বিসর্জনের আগে ধুনুচি নাচ দেখা যায়। তবে কোন দিন বা কোন সময়ে নাচ হবে, তা পুজোর রীতি ও স্থানীয় প্রথার উপর নির্ভর করে।
বিশেষ করে সন্ধ্যারতি বা নবমীর সময় ঢাকের তালে ধুনুচি নাচ অনেক মণ্ডপে বিশেষ আকর্ষণ হয়ে ওঠে। কোথাও এটি পরিবারের সদস্যদের অংশগ্রহণে সীমাবদ্ধ, কোথাও আবার পাড়ার মানুষ একসঙ্গে নাচে যোগ দেন। অনেক জায়গায় আয়োজন করা হয় ধুনুচি নাচের প্রতিযোগিতাও।
এই বৈচিত্র্যই দেখায়, ধুনুচি নাচ কোনও একক নিয়মে বাঁধা নয় বরং সবার অংশগ্রহণ এই বিশেষ নৃত্যকে সম্পূর্ণ করে তোলে।

শুধু পুরুষদের নাচ নয়, নারীরাও হয়ে উঠেছেন ধুনুচি নাচের মুখ
ধুনুচি নাচের ছবি মনে করলেই অনেকের চোখে ভেসে ওঠে ধুতি-পাঞ্জাবি পরা কোনও পুরুষের নাচ। কিন্তু আজকের দুর্গাপুজোয় নারীদের অংশগ্রহণও এই ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
শাড়ি পরে ধুনুচি হাতে নাচ, ঢাকের তালে দলবদ্ধ পরিবেশনা কিংবা প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া, সবই এখন বহু পুজোমণ্ডপের পরিচিত দৃশ্য। এর ফলে ধুনুচি নাচ আর শুধু পূজার নির্দিষ্ট আচার বা সীমিত গোষ্ঠীর অংশগ্রহণে আটকে নেই; এটি আরও বেশি মানুষের উৎসব উদযাপনের মাধ্যম হয়ে উঠেছে।
অবশ্য এই পরিবর্তন সব জায়গায় একইভাবে ঘটেনি। কোথাও পুরনো পারিবারিক রীতি বজায় রয়েছে, আবার কোথাও আধুনিক প্রতিযোগিতা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের প্রভাব বেশি।
ধুনুচি নাচ কীভাবে উৎসবের প্রতীক হয়ে উঠল?
এর উত্তর লুকিয়ে আছে দুর্গাপুজোর বদলে যাওয়া সামাজিক চরিত্রে। একসময় দুর্গাপুজোর অনেক আচার মূলত বাড়ি বা নির্দিষ্ট পূজামণ্ডপকেন্দ্রিক ছিল। পরে সার্বজনীন পুজোর বিস্তার, পাড়ার মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণ এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের জনপ্রিয়তার সঙ্গে ধুনুচি নাচ আরও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।
আজ ধুনুচি নাচের ছবি ও ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। পুজোর স্মৃতি ধরে রাখতে মানুষ ছবি তোলেন, ভিডিও করেন, বন্ধুদের সঙ্গে ভাগ করে নেন। ধুনুচি নাচের প্রতিযোগিতা দর্শকদের আকর্ষণ করে এবং পুজোর সাংস্কৃতিক আয়োজনেও নতুন মাত্রা যোগ করে। ফলে ধুনুচি নাচ এখন একই সঙ্গে ভক্তি, ঐতিহ্য, বিনোদন ও সামাজিক অংশগ্রহণের প্রতীক হয়ে উঠেছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে ধর্মীয় গুরুত্ব হারিয়ে গিয়েছে। বহু মানুষের কাছে ধুনুচি হাতে নাচা এখনও দেবীর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের একটি উপায় যেখানে অন্যদের কাছে এটি পরিবার ও পাড়ার সঙ্গে উৎসব ভাগ করে নেওয়ার আনন্দ।
ধুনুচি নাচের ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে কারিগরদের জীবনও
ধুনুচি নাচের কথা বলতে গিয়ে ধুনুচি তৈরির কারিগরদের কথা ভুলে গেলে চলবে না। মাটির ধুনুচি তৈরি করতে প্রয়োজন মাটি, দক্ষ হাত এবং সময়। পুজোর আগে বিভিন্ন জায়গায় মৃৎশিল্পীরা ধুনুচি, প্রদীপ এবং অন্যান্য পূজার সামগ্রী তৈরিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। ফলে ধুনুচি শুধু একটি ধর্মীয় উপকরণ নয়, গ্রামীণ ও স্থানীয় কারুশিল্পের সঙ্গেও যুক্ত।
মাটির ধুনুচির পাশাপাশি ধাতুর ধুনুচি ও নকশাদার সংস্করণের চাহিদাও দেখা যায়। এই চাহিদা পুজোর বাজারের একটি ছোট অংশ হলেও বহু কারিগর ও বিক্রেতার জীবিকার সঙ্গে যুক্ত। অর্থাৎ ধুনুচি নাচের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের পিছনে রয়েছে মানুষের দক্ষতা, শ্রম এবং প্রজন্ম ধরে চলে আসা কারুশিল্পের ঐতিহ্য।Raise Your Concern About this Content
ধুনুচি নাচের সময় নিরাপত্তাও জরুরি
ধুনুচি নাচ দেখতে যতটা সুন্দর, জ্বলন্ত ধুনুচি নিয়ে নাচার ক্ষেত্রে ততটাই সতর্ক থাকা প্রয়োজন। আগুনের ফুলকি, গরম কাঠ কয়লা এবং ধোঁয়া থেকে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তাই ধুনুচি ভালোভাবে ধরে রাখা, ঢিলেঢালা বা সহজে আগুন ধরে যায় এমন পোশাক এড়ানো, শিশুদের নিরাপদ দূরত্বে রাখা এবং ভিড়ের মধ্যে পর্যাপ্ত জায়গা নিশ্চিত করা জরুরি। মুখে ধুনুচি ধরে নাচার মতো ঝুঁকিপূর্ণ কসরত অনুকরণ না করাই ভালো। উৎসবের আনন্দ তখনই পূর্ণ হয়, যখন ঐতিহ্যের সঙ্গে নিরাপত্তার দিকটিও গুরুত্ব পায়।
শেষ কথা: ধুনুচি নাচ মানেই ভক্তি, ছন্দ আর বাঙালির উৎসব
ধুনুচি নাচের জন্ম ঠিক কোথায়, কোন সালে কিংবা কোন ব্যক্তি প্রথম এই নাচ শুরু করেছিলেন, তার নিশ্চিত উত্তর আজও স্পষ্ট নয়। কিন্তু এই ঐতিহ্য কীভাবে বাঙালির দুর্গাপুজোর সঙ্গে মিশে গিয়েছে, তা আমাদের চারপাশেই দেখা যায়।
ধুনোর গন্ধ, জ্বলন্ত ধুনুচি, ঢাকের তালে শরীরের ছন্দ আর চারপাশের মানুষের উচ্ছ্বাস, সব মিলিয়ে ধুনুচি নাচ দুর্গাপুজোর এক বিশেষ সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা। তাই ধুনুচি নাচকে শুধু একটি নাচ হিসেবে দেখলে তার তাৎপর্য অসম্পূর্ণ থেকে যায়। বরং বলা যেতে পারে এটি পূজার আচার থেকে উৎসবের সম্মিলিত আনন্দের বহিঃপ্রকাশ এর এক জীবন্ত উদাহরণ।
তথ্যসূত্র
১. দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস — দুর্গাপুজো ২০২৪
২. দৃক পঞ্জিকা — দুর্গাপুজোয় ধুনুচি নাচের ঐতিহ্য ও তাৎপর্য
৩. মুড কলকাতা — ধুনুচি নাচের ইতিহাস, ধর্মীয় আচার ও ঢাকের সঙ্গে সম্পর্ক
৪. উইকিপিডিয়া — ধুনুচি নৃত্যের পরিচয়, ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব



