কলকাতার দুর্গাপুজো মানেই আলোর রোশনাই, ঢাকের বাদ্যি,প্যাণ্ডেলে প্যাণ্ডেলে মানুষের সমাগম। প্রত্যেক প্যাণ্ডেলে প্রধান আকর্ষণ মা দুর্গার অপরূপ প্রতিমা। কলকাতার প্রতিটি প্রতিমার সৌন্দর্ষের নেপথ্যে থাকেন কুমোরটুলির শিল্পীরা। তাঁদের নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় খড়, মাটি, বাঁশ আর রং-এর সংমিশ্রণে প্রতিমা শিল্পীদের নিপুণ হাতের জাদুতে প্রতিমাগুলোতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা হয়। প্রতিমাকে সম্পূর্ণ রূপ দেওয়ার আগে পর্যন্ত মাসের পর মাস তাঁরা পরিশ্রম করেন। এই উৎসব যাঁকে কেন্দ্র করে তাঁকে রূপ দেওয়ার গুরুদায়িত্ব থাকে প্রতিমা শিল্পীদের কাঁধে। পুজোর আগে কুমারটুলিতে থাকে ব্যস্ততা, শিল্পীদের দু’চোখ এক করারও সময় থাকে না। পুজো শেষ হওয়ার পর কুমারটুলিতে নামে বিষন্নতা। বিসর্জনের সঙ্গে সঙ্গে শহরের উৎসবের রেশ যখন ফিকে হয়ে যায়, তখন প্রতিমা শিল্পীদের জীবনেও কি কোনও আঁধার নামে? নাকি জারি থাকে জীবন সংগ্রাম?
মূর্তি তৈরিই জীবন সংগ্রাম
দুর্গাপুজো হয়তো তাঁদের কাছে বছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়, এমনকি সারা বছরের আয়ের উৎসও। তবে জীবন সংগ্রাম বা শিল্পচর্চা তো কোনও সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। এগিয়ে চলার নামই তো জীবন। দুর্গাপুজোর পরেও প্রতিমা তৈরির কাজ চলে , নতুন কোনও শিল্প ভাবনা যা পরের বছর মায়ের মূর্তিতে ফুটিয়ে তোলা যাবে। এটাই তো সংসার চালানোর নিরন্তর সংগ্রাম। শিল্পীর হাত কখনও থামে না, অবসর আসে না।

দুর্গাপুজোর সময় কুমোরটুলিতে যে ব্যস্ততা থাকে। দেশ-বিদেশের পুজো উদ্যোক্তাদের অর্ডার সামলাতে রীতিমত হিমশিম খেতে হয় প্রতিমা শিল্পীদের। সারা রাত সারা দিন ধরে কাজ চলে। দুর্গামূর্তি মণ্ডপে চলে যাওয়ার পর সেই ব্যস্ততায় অনেকটাই ভাঁটা পড়ে। কুমোরটুলির চেনা ছবি বদলে যায়। থাকে না লোকের ভিড়, প্রতিমা তৈরির তাড়াহুড়ো। কিন্তু শিল্পীদের কাজ বন্ধ হয়ে যায় না।
দুর্গাপুজোর পর থাকে একাধিক পুজো, সেই নিয়েও কুমোরদের মধ্যে ব্যস্ততা থাকে তুঙ্গে। দুর্গাপুজোর পর লক্ষ্মীপুজো, কালীপুজো, জগদ্ধাত্রীপুজো, সরস্বতীপুজো সারাবছর বিভিন্ন উৎসব ও পুজোর জন্য প্রতিমা তৈরি করা আবারও শুরু করে দেন শিল্পীরা। অনেকের ঘরে ঘরে লক্ষ্মীপুজো করা হয়। ফলে প্রতিমা নির্মাণের কাজ চলে। কোনও শিল্পী কোনও শিল্পী আবার কালীমূর্তি তৈরি করা শুরু করে দেন।
মাটির জিনিসে প্রাণ প্রতিষ্ঠা
কুমোরটুলির শিল্পীদের হাতে মাটির জিনিসেও প্রাণ প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়ে ওঠে। তাঁদের হাতের ছোঁয়ায় জীবন্ত হয়ে ওঠে মূর্তিগুলো। শুধুমাত্র উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে নয়, প্রত্যেক নতুন সৃষ্টি শিল্পী হিসেবে নিজেদের দক্ষতা প্রকাশের সুযোগ।
বারো মাসের উপার্জন থাকলেও নেই কাজের অনিশ্চয়তা
উপার্জনের অনিশ্চয়তা নিয়ে কুমোরটুলির শিল্পীদের দিন গুজরান। দুর্গাপুজোর সময় বিশাল অঙ্কের অর্ডার আসে। কিন্তু সেই টাকায় সারাবছর সংসার চালিয়ে নিয়ে যাওয়া প্রায় অসম্ভব। যাঁদের নিজস্ব জায়গা নেই, কর্মশালা নেই এবং আয়ের উৎস দুর্গাপ্রতিমা তৈরির উপরই নির্ভরশীল, তাঁদের কাছে পুজোর পরের সময়টা অনেক বেশি কঠিন হয়ে পড়ে।
প্রতিমা তৈরির নানা উপকরণ মাটি, খড়, বাঁশ,কাঠ, দড়ি ইত্যাদির খরচ রয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে শ্রমিকদের মজুরি, বিদ্যুতের বিল, পরিবহনের খরচ, কর্মশালার ভাড়া ইত্যাদি। প্রতিমা তৈরির কাজ শুরুর অনেক আগেই শিল্পীদের অর্থ বিনিয়োগ করতে হয়। অনেকসময় সব অর্ডারের টাকা সময়মতো পাওয়া যায় না, প্রত্যাশা অনুযায়ী লাভও হয় না। ফলে সংসার চালানো অনেকটা কঠিন হয়ে পড়ে।
প্রতিমার দাম নির্ধারনের ক্ষেত্রে শিল্পীর পরিশ্রম, সময়, নকশা, উপকরণ সবই খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রত্যেক প্রতিমা নির্মাণের নেপথ্যে রয়েছে বহু দিনের শ্রম এবং আর্থিক ঝুঁকি। দুর্গাপুজোর পর যখন অর্ডার আসা কমে যায় তখন সব খরচ চালানো শিল্পীদের কাছে বড় চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। নতুন নতুন শিল্প সৃষ্টির পাশাপাশি শিল্পকে টিকিয়ে সারা বছর জীবিকা নির্বাহ করার সংগ্রামের কথাও মাথায় রাখতে হয়।

বদলে যাচ্ছে শিল্পের অন্তর্নিহিত ভাষা
দীর্ঘদিন ধরে কুমোরটুলির প্রতিমাশিল্প ঐতিহ্য বহন করে আসছে। সময়ের সঙ্গে বদলে যাচ্ছে শিল্পের অন্তর্নিহিত ভাষা। আগে প্রতিমা তৈরির ক্ষেত্রে চিরাচরিত কিছু শিল্পকলাকে প্রাধান্য দেওয়া হত। পরিচিত সাজসজ্জা, ঐতিহ্যবাহী শৈলীতে সাজানো হত মায়ের মূর্তি। বর্তমানে সে জায়গায় থিমপুজোর প্রচলন হয়েছে। নতুন ধরনের মণ্ডপসজ্জা, প্রতিমা নির্মাণে নতুন ভাবনা প্রতিমা শিল্পীদের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।
কোনও প্রতিমায় দেখা যাচ্ছে লোকশিল্পের প্রভাব, আবার কোনও প্রতিমায় ফুটে উঠছে আধুনিক ভাস্কর্যের ছাপ। সাবেকি একচালার দুর্গা, কোথাও নতুন নির্মিত প্রতিমার মধ্যে নির্দিষ্ট ভাবনা ও গল্পকে ফুটিয়ে তুলতে হয়।
এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে শিল্পীদের প্রয়োজন হয় নতুন নকশা নিয়ে ভাবনা, উপকরণ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং কখনও কখনও নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার। পুজোর পর তুলনামূলক কম ব্যস্ত সময়ে তাই পরবর্তী বছরের প্রতিমা নিয়ে পরিকল্পনা করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এ শুধু শিল্পের জগৎ
কুমোরটুলির শিল্পীদের সৃজনশীলতা দুর্গাপুজোর চার দিনের উৎসবের থেকে অনেক বেশি। বিভিন্ন শিল্প প্রদর্শনী থেকে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ধর্মীয় অনুষ্ঠানে ছড়িয়ে পড়ে তাঁদের কাজ।
বাড়ির পুজোর জন্য অনেকে প্রতিমা তৈরি করেন। মাটির ভাস্কর্য, শৌখিন মূর্তি, সাজসজ্জার সামগ্রী তৈরি করেন। আবার কেউ প্রতিমার মুখ বা মডেল নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত থাকেন।
বর্তমানে এই ধরনের বিকল্প কাজের গুরুত্ব বাড়ছে। শুধুমাত্র দুর্গাপুজোর মতো একটা বড় উৎসবের উপর নির্ভর করে সারা বছরের আয় নিশ্চিত করা কঠিন। অন্য ক্ষেত্রগুলিতে কাজের সুযোগ হলে শিল্পীরা শিল্প দক্ষতাকে বিস্তৃতভাবে কাজে লাগাতে পারবে।
বিকল্প কাজ পাওয়া সব শিল্পীর পক্ষে সহজ নয়। কারও কাছে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, পরিচিতির সুবিধা রয়েছে। কোনও ক্ষেত্রে কেউ কেউ কাজের সন্ধান করে যাচ্ছেন। তাই শিল্প, সৃজনশীলতার পাশাপাশি যোগাযোগ, বাজারের চাহিদা এবং আর্থিক সামর্থ্য গুরুত্বপূর্ণ।

পরের প্রজন্মের ঐতিহ্য তুলে দেওয়ার সংগ্রাম
কুমোরটুলির প্রতিমাশিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বহু পরিবারের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও ঐতিহ্য। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে দাদু বাবা বা পরিবারের কোনও সদস্যের কাছ থেকে মাটি তৈরি, কাঠামো বাঁধা, খড় দিয়ে অবয়ব গড়া, মাটির প্রলেপ দেওয়া, মুখের সূক্ষ্ম কাজ এবং রং করার কৌশল শিখে আসছেন শিল্পীরা।
বেশিরভাগক্ষেত্রে ছোটবেলা থেকেই এই শিল্পের সঙ্গে পরিচিত হন তাঁরা। কিন্তু বর্তমান সময়ে সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখা ততটা সহজ নয়। দীর্ঘ সময় ধরে শারীরিক পরিশ্রম, অনিয়মিত আয় এবং পেশাগত অনিশ্চয়তার কারণে নতুন প্রজন্মের কেউ কেউ অন্য পেশার দিকে ঝুঁকতে পারেন।
অন্যদিকে, এই শিল্পের মধ্যে নিজের পরিচয় তৈরি করার স্বপ্নও রয়েছে অনেকের। আধুনিক শিক্ষা, ডিজিটাল নকশা, সামাজিক মাধ্যম এবং অনলাইন যোগাযোগের সাহায্যে নতুন প্রজন্মের শিল্পীরা নিজেদের কাজ আরও বেশি মানুষের সামনে তুলে ধরতে পারেন।Raise Your Concern About this Content
সোশ্যাল মিডিয়া অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম
আগে প্রতিমাশিল্পীদের কাজের পরিচিতি অনেকটাই নির্ভর করত পরিচিত পুজো উদ্যোক্তা, স্থানীয় যোগাযোগ এবং মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়া সুনামের উপর। এখন সামাজিক মাধ্যম সেই পরিচিতির পরিসর বাড়ানোর নতুন সুযোগ তৈরি করেছে।
ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম কিংবা ইউটিউবের মাধ্যমে শিল্পীরা তাঁদের তৈরি শিল্পের ছবি, প্রতিমা তৈরির বিভিন্ন ধাপ এবং চূড়ান্ত শিল্পকর্মের ভিডিও তুলে ধরতে পারেন। এতে শুধু পুজোর সময় নয়, বছরের অন্যান্য সময়েও তাঁদের কাজ মানুষের নজরে আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়।
বিদেশে বসবাসকারী বাঙালি সম্প্রদায় কিংবা অন্য শহরের পুজো উদ্যোক্তাদের কাছেও পৌঁছনোর সুযোগ তৈরি হতে পারে ডিজিটাল যোগাযোগের মাধ্যমে। তবে সামাজিক মাধ্যমে উপস্থিতি থাকলেই যে নিয়মিত অর্ডার বা আর্থিক সাফল্য নিশ্চিত হবে, তা নয়। তার জন্য প্রয়োজন ধারাবাহিক প্রচার, কাজের মান, যোগাযোগের দক্ষতা এবং বাস্তব বাজারের সঙ্গে সংযোগ।
উপসংহার
প্রতিমা তৈরির প্রক্রিয়াটি আসলে একটি শিল্পকাহিনি। বাঁশের কাঠামো থেকে মাটির অবয়ব, তারপর মুখের সূক্ষ্মতা এবং রঙের শেষ ছোঁয়া প্রতিটি ধাপের পিছনে রয়েছে শিল্পীর অভিজ্ঞতা ও সৃজনশীলতা। সেই গল্প মানুষের সামনে তুলে ধরলে প্রতিমার সৌন্দর্যের পাশাপাশি শিল্পীর শ্রমও আরও দৃশ্যমান হতে পারে।
বিসর্জনের পর শিল্পীদের জীবনে কী বদলায়? বিজয়া দশমীর পর প্রতিমা বিসর্জনের দৃশ্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়, উৎসবেরও শেষ আছে। কিন্তু প্রতিমাশিল্পীদের কাছে এই শেষের মধ্যেই শুরু হয় নতুন অধ্যায়। তাঁরা ধীরে ধীরে আবার কাজ গুছিয়ে নেন, পরবর্তী অর্ডারের প্রস্তুতি শুরু করেন, উপকরণের হিসাব মেলান এবং আগামী দিনের পরিকল্পনা করেন।
কেউ ব্যস্ত হয়ে পড়েন কালীপুজোর প্রতিমা তৈরিতে, কেউ অন্য উৎসবের কাজ সামলান। আবার কারও কাছে পুজোর পরের সময়টা হয় নতুন কাজের সন্ধান, আর্থিক হিসাব মেলানো কিংবা পরবর্তী মরশুমের জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার সময়।
অবশ্য প্রত্যেক শিল্পীর অভিজ্ঞতা এক নয়। কাজের ধরন, অর্ডারের সংখ্যা এবং ব্যক্তিগত পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে তাঁদের পুজো-পরবর্তী জীবন ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে। তাই কুমোরটুলির সমস্ত শিল্পীকে একই অভিজ্ঞতার মধ্যে ফেলা যায় না।
তথ্যসূত্র:
১. কুমোরটুলির ইতিহাসে অষ্টাদশ শতকের ঘাট: প্রতিমাশিল্পীদের জীবনে আজও কেন গুরুত্বপূর্ণ?
২. মাটির সংকটে কুমোরটুলি: প্রতিমা তৈরির উপকরণ জোগাড় করতে সমস্যায় শিল্পীরা
৩. কুমোরটুলির প্রতিমাশিল্পে জীবিকার সন্ধান: পুজোর মরশুমে রোজগারের আশায় শত শত গ্রামীণ কারিগর
৪. দুর্গাপ্রতিমার কাঠামোতেই কালীপ্রতিমা: খরচ ও সময় বাঁচাতে কুমোরটুলির শিল্পীদের অভিনব উদ্যোগ



