কলকাতার কুমোরটুলি মানেই যেন শরৎ আসার অনেক আগেই দুর্গাপুজোর গন্ধ। বর্ষার শেষটুকু পেরোতেই এই পাড়ার সরু গলিগুলো বদলে যেতে শুরু করে। কোথাও বাঁশের কাঠামো, কোথাও খড়ের স্তূপ, কোথাও শিল্পীর হাতে মাটির প্রলেপ।
এখানে তখন সময়ের হিসেব একটু অন্যরকম। দিন-রাত মিলেমিশে যায় কাজের মধ্যে। কারও হাতে মাটি, কারও হাতে তুলি, কেউ আবার শেষ মুহূর্তের সাজসজ্জা নিয়ে ব্যস্ত। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে, এ যেন এক বিশাল কর্মশালা। কিন্তু একটু মন দিয়ে দেখলে বোঝা যায়, এ শুধু প্রতিমা তৈরি নয়, এর মধ্যে মিশে আছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এক শিল্প-ঐতিহ্য।
শুরুটা কিন্তু মাটি দিয়ে হয় না :

আমরা সাধারণত বলি, “মাটি দিয়ে দুর্গাপ্রতিমা তৈরি হয়।” কথাটা ঠিক, কিন্তু আসলে প্রতিমা তৈরির কাজ মাটি দিয়ে শুরু হয় না। মাটির স্পর্শ পাওয়ার অনেক আগেই শুরু হয়ে যায় এক দুর্গাপ্রতিমার জন্ম। প্রথমে তৈরি করা হয় প্রতিমার কাঠামো। বাঁশ, কাঠ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যান্য উপকরণ দিয়ে শিল্পী তৈরি করেন সেই কাঠামো, যার ওপর দাঁড়িয়ে থাকবে পুরো প্রতিমা। অনেকটা মানুষের কঙ্কালের মতোই এই কাঠামোই পরে প্রতিমাকে দেয় তার আকৃতি ও ভারসাম্য।
এরপর আসে খড়ের কাজ। বাঁশ ও কাঠের কাঠামোর সঙ্গে খড় শক্ত করে বাঁধতে বাঁধতে শিল্পী ধীরে ধীরে তৈরি করেন শরীরের প্রাথমিক গঠন—হাত, পা, ধড়, কাঁধ, কোমর থেকে শুরু করে শরীরের প্রতিটি অংশের আকার। কোথায় কতটা খড় দিতে হবে, কোথায় চাপ কমাতে হবে, কোথায় শরীরের বাঁক তৈরি করতে হবে—সবকিছুর ওপর নির্ভর করে পরের ধাপে প্রতিমাটি কেমন দেখতে হবে।
এই কাজটা যতটা সহজ মনে হয়, আসলে ততটাই নিখুঁত হতে হয়। কারণ খড়ের এই গঠনেই যদি সামান্য ভুল থাকে, পরে মাটি দিয়ে সেই ভুল পুরোপুরি ঠিক করা কঠিন হয়ে যায়। তাই প্রতিমার সৌন্দর্য তৈরি হওয়ার অনেক আগেই শিল্পী তার ভিত্তিটা তৈরি করে ফেলেন।
এই পর্যায়ে প্রতিমাটিকে দেখলে হয়তো আপনার মনে হবে—“এ আবার কীভাবে মা দুর্গা হবে?” না আছে মুখ, না আছে চোখ, না আছে সেই পরিচিত দেবীর রূপ। শুধু বাঁশ, কাঠ আর খড়ের একটি অসম্পূর্ণ অবয়ব। কিন্তু ঠিক এখানেই লুকিয়ে থাকে শিল্পীর আসল জাদু। কারণ একজন দক্ষ শিল্পী এই খড়ের কাঠামোর মধ্যে আগেই দেখতে পান মা দুর্গার সম্পূর্ণ রূপ।
মাটির তাল থেকে শরীরের অবয়ব :

খড়ের কাঠামোর ওপর এবার পড়তে শুরু করে মাটি। কুমোরটুলিতে ব্যবহৃত মাটিরও আলাদা প্রস্তুতি থাকে। মাটি সংগ্রহ, পরিষ্কার করা, প্রয়োজনমতো জল মেশানো, সবকিছুর মধ্যেই রয়েছে অভিজ্ঞতা। শিল্পীরা মাটির গুণ বুঝে তাতে প্রয়োজনীয় উপাদান মেশান, যাতে মাটি কাঠামোর সঙ্গে ভালোভাবে বসে এবং শুকিয়ে শক্ত হয়ে যায়।
প্রথমে দেওয়া হয় মোটা মাটির আস্তরণ। এর উদ্দেশ্য মূলত খড়ের কাঠামোকে ঢেকে শরীরের আকার তৈরি করা। মাটি শুকোতে দেওয়া হয়। তারপর আবার আসে মাটির প্রলেপ যা দিয়ে ধীরে ধীরে খসখসে কাঠামো মসৃণ হতে থাকে। এইভাবেই শিল্পীর আঙুলের চাপে মাটির শরীর যেন ধীরে ধীরে জীবন্ত হয়ে ওঠে।
মায়ের মুখটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ :
দুর্গাপ্রতিমা তৈরির সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্তগুলোর একটি নিঃসন্দেহে মুখ গড়া। একজন শিল্পী যখন মাটি দিয়ে চোখ, নাক, ঠোঁটের রেখা তৈরি করেন, তখন তাঁর সামনে শুধু একটা প্রতিমার মুখ থাকে না। থাকে একটি নির্দিষ্ট ভাব ফুটিয়ে তোলার চ্যালেঞ্জ। মায়ের মুখে কি থাকবে শান্তি? দৃঢ়তা? মমতা? অসুরবধের সময়ের তেজ? এই অভিব্যক্তিই তো শেষ পর্যন্ত প্রতিমার চরিত্র নির্ধারণ করে।Raise Your Concern About this Content
তারপর রং—আর মায়ের সাজ :
মাটি শুকিয়ে গেলে শুরু হয় রঙের কাজ। প্রথমে বেস বা প্রাথমিক রং, তারপর ধীরে ধীরে মুখের সূক্ষ্মতা, ঠোঁট, চোখ, চুল, শরীরের বিভিন্ন অংশে রঙের ব্যবহার। মুখের সূক্ষ্ম কাজ শেষ হলে আসে চোখ আঁকার পালা। দুর্গাপুজোর সঙ্গে পরিচিত বাঙালির কাছে চক্ষুদান’ শব্দটির আলাদা আবেগ আছে। সেই চোখ আঁকার মুহূর্তে বহু শিল্পীর কাজের জায়গায় এক ধরনের মনোযোগ নেমে আসে। একটি সরু তুলির টানে যেন মাটির মুখে এসে পড়ে প্রাণের আভাস।
এরপর তো সাজের পালা। শাড়ি, অলংকার, মুকুট, অস্ত্র, চুলের সাজ—সব মিলিয়ে প্রতিমা ধীরে ধীরে সম্পূর্ণ হয়ে ওঠে। সঙ্গে থাকে লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক, গণেশ এবং অসুরের মূর্তিও। কোনও কোনও প্রতিমার সাজ ঐতিহ্যবাহী, কোনওটি আবার আধুনিক ভাবনায় তৈরি। কোথাও সাবেকি ডাকের সাজ, কোথাও সোনালি-রুপোলি অলংকার, আবার কোথাও শিল্পীর নিজস্ব নকশা। তবু যতই পরিবর্তন আসুক, সেই পরিচিত মুখের মধ্যে বাঙালি খুঁজে নেয় তার চেনা দুর্গাকে।

কুমোরটুলিতে এখন কেমন ব্যস্ততা?
পুজো যত এগিয়ে আসে, কুমোরটুলির ব্যস্ততাও তত বাড়ে। একেকটি ঘর বা স্টুডিওতে একসঙ্গে তৈরি হয় একাধিক প্রতিমা। কোথাও শিল্পীরা মাটি মাখছেন, কোথাও রঙের কাজ চলছে, কোথাও প্রতিমার সাজ গুছিয়ে রাখা হচ্ছে।
সরু গলির মধ্যে দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ চোখে পড়ে বিশাল কোনও প্রতিমার মুখ। পাশেই হয়তো ছোট প্রতিমা তৈরি হচ্ছে অন্য একটি পুজোর জন্য। শুধু শিল্পীরাই নন, এই সময় ব্যস্ত থাকেন আরও বহু মানুষ—সাজসজ্জার কারিগর, রং-তুলি প্রস্তুতকারক, বাঁশ ও কাঠের কাজের সঙ্গে যুক্ত কর্মী, পরিবহণকর্মী থেকে শুরু করে নানা সহযোগী শিল্পী। কারও হাতে সময় কম, কারও সামনে ডেলিভারির নির্দিষ্ট দিন। তাই কাজের জায়গায় তখন এক মুহূর্তও যেন নষ্ট করার সুযোগ নেই।
তবু এই ব্যস্ততার মধ্যেও কুমোরটুলির একটা নিজস্ব ছন্দ আছে। মাটির গন্ধ, খড়ের গন্ধ, রঙের গন্ধ—সব মিলিয়ে একটা অদ্ভুত পুজোর আবহ তৈরি হয়। মনে হয়, কলকাতার শরৎ যেন এখানে এসেই ধরা দিচ্ছে।
একটা প্রতিমার পেছনে থাকে অনেক মানুষের গল্প!
আমরা যখন প্যান্ডেলে গিয়ে সুন্দর একটি দুর্গাপ্রতিমা দেখি, তখন সাধারণত তার সৌন্দর্যটাই চোখে পড়ে। কিন্তু সেই প্রতিমার পেছনে থাকে পরিশ্রম, কত হাতের কাজ, কত প্রজন্মের অভিজ্ঞতা। একজন শিল্পী মাটির শরীর গড়ছেন। আরেকজন হয়তো চুল তৈরি করছেন। কেউ রং করছেন, কেউ অলংকার সাজাচ্ছেন। কেউ আবার প্রতিমাকে নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। অর্থাৎ একটি দুর্গাপ্রতিমা আসলে একক শিল্পীর সৃষ্টি নয়; এর মধ্যে জড়িয়ে থাকে একটি গোটা কর্মজগতের শ্রম। আর এই কারণেই কুমোরটুলি শুধু প্রতিমা তৈরির জায়গা নয়। এটি বাংলার লোকশিল্প, কারিগরি দক্ষতা এবং জীবন্ত ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঠিকানা।
মাটি থেকে মা—এটাই তো সবচেয়ে বড় গল্প :
কুমোরটুলির সবচেয়ে সুন্দর ব্যাপার হয়তো এখানেই। এক মুঠো মাটি দিয়ে শুরু। তারপর বাঁশ, খড়, মাটি, রং, তুলির ছোয়া, অলংকার, এক এক করে সবকিছু যোগ হতে থাকে। শেষ পর্যন্ত সেই মাটির শরীরই হয়ে ওঠে আমাদের কাছে মা দুর্গার প্রতিমা। তারপর ঢাকের শব্দ, ধূপের গন্ধ, অঞ্জলি, সিঁদুর খেলা, বিসর্জন। আর শেষে? আবার সেই মাটিই ফিরে যায় জলে। মনে হয়, এ যেন আসা আর চলে যাওয়ার এক চিরন্তন গল্প।
কুমোরটুলির গলিতে দাঁড়িয়ে তাই কোনও অর্ধসমাপ্ত প্রতিমাকে দেখলে একটু অন্যরকম অনুভূতি হয়। আজ যার শুধু খড়ের কাঠামো, কাল সে পূর্ণ প্রতিমা হয়ে উঠবে। আজ যার মুখে রং নেই, কাল তার চোখে ফুটে উঠবে মায়া। আর কয়েকদিন পর সেই প্রতিমার সামনে দাঁড়িয়ে হাজার হাজার মানুষ বলবে—“মা এসেছেন।” মাটি থেকে মা হয়ে ওঠার এই যাত্রাটাই কুমোরটুলিকে কুমোরটুলি করে রেখেছে।

শিল্পী – প্রশান্ত পাল
ফোন নম্বর – +919433359617/+919831164846
ঠিকানা -1, Kumartuli Street, Kolkata 700005
বিশেষত্ব – ক্লে, প্রতিমা, ফাইবার, গ্লাস, টেরাকোটা
ডেলিভারি টাইমফ্রেম – নির্ভর করছে বুকিং এর উপর
বাজেট- নির্ভর করছে প্রতিমা এবং থিমের উপর।
শিল্পী – ইন্দ্রজিৎ পাল
ফোন নম্বর – +919007293886
ঠিকানা -1/1, Banamali Sarkar Street, Kumartuli, Kolkata 700005
বিশেষত্ব – প্রতিমা এবং মূর্তি
ডেলিভারি টাইমফ্রেম – নির্ভর করছে বুকিং এর উপর
বাজেট- নির্ভর করছে প্রতিমা এবং থিমের উপর।
শিল্পী – কৌশিক ঘোষ, জয় দুর্গা ভাণ্ডার কুমোরটুলি
ফোন নম্বর – +91 98305 09949
ঠিকানা -503, Rabindra Sarani, Kumartuli, Kolkata 700005
বিশেষত্ব – প্রতিমা নির্মাণ
ডেলিভারি টাইমফ্রেম – নির্ভর করছে বুকিং এর উপর
বাজেট- নির্ভর করছে প্রতিমা এবং থিমের উপর।
শিল্পী – প্রতিমা এক্সপোর্ট কুমোরটুলি
ফোন নম্বর – +91 89108 83980
ঠিকানা -4/A, Gopeshwar Pal Street, Kumartuli, Kolkata 700005
বিশেষত্ব – প্রতিমা নির্মাণ ও বিদেশে এক্সপোর্ট করা
ডেলিভারি টাইমফ্রেম – নির্ভর করছে বুকিং এর উপর
বাজেট- নির্ভর করছে প্রতিমা এবং থিমের উপর।
শিল্পী – মিন্টু পাল স্টুডিও
ফোন নম্বর – +91 79084 16269
ঠিকানা – 511, Rabindra Sarani, Kumartuli, Kolkata 700005
বিশেষত্ব – দুর্গা প্রতিমা নির্মাণ ও বড় মূর্তি নির্মাণ।
ডেলিভারি টাইমফ্রেম – নির্ভর করছে বুকিং এর উপর
বাজেট- নির্ভর করছে প্রতিমা এবং থিমের উপর।
তথ্যসূত্র :
১. কুমোরটুলির প্রতিমাশিল্পের যাত্রা
২. দুর্গা প্রতিমা তৈরির ধাপ ও প্রক্রিয়া
৩. কুমোরটুলির শিল্পঐতিহ্য ও পরিবর্তনের গল্প



