দীপাবলি আর কালীপুজো কি একই উৎসব? ভারতের অন্যান্য জায়গার সঙ্গে বাংলার উদযাপনের তুলনা
‘‘সে যে মুক্তকেশীর শক্ত বেড়া
তার কাছেতে যম ঘেঁষে না’’…….
থেকে
‘‘ডরি না ডরি না, আমি শুধু স্মরি মা
কালী নামে এ বেড়াতে শমনও ঘেঁষে না’’
বাংলাতে শাক্ত আরাধ্য দেবী কালীর আরাধনার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। এই পুজোর অন্যতম অবিচ্ছেদ্য অংশ শ্যামাসঙ্গীত। মা কালীর প্রতি ভক্তি, অভিমান, ভালোবাসা, ভয়, আকুলতা এবং আত্মসমর্পণের অনুভূতি শ্যামাসঙ্গীতের প্রতিটি পঙ্ক্তিতে যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে। তবে দীপাবলি আর কালীপুজোর এই দুটি উৎসব উদযাপনের সময়সীমা এক হলেও, কালীপুজো ও দীপাবলির ধর্মীয় তাৎপর্য, পৌরাণিক ব্যাখ্যা, রীতি-নীতি, আচার-অনুষ্ঠান সবটাই আলাদা।
দীপাবলি একটি বৃহত্তর উৎসব, আর কালীপুজো তার কাছাকাছি সময়ে পালিত একটি স্বতন্ত্র ধর্মীয় আরাধনা। ‘দীপাবলি’ শব্দের অর্থ প্রদীপের সারি। হিন্দু চান্দ্রপঞ্জিকা অনুসারে কার্তিক মাসের অমাবস্যাকে কেন্দ্র করে এই উৎসব পালিত হয়। তবে বিভিন্ন অঞ্চলে দীপাবলির উদযাপন একেকরকম। এই সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের জন্য ভারত হয়ে ওঠে সকল দেশের সেরা।
দীপাবলির তাৎপর্য কী? দীপাবলি শব্দের অর্থ কী?
দীপাবলি শব্দটি এসেছে দীপ অর্থাৎ প্রদীপ, আর আবলি যার অর্থ সারি। দীপাবলি শব্দের অর্থ প্রদীপের সারি। মূলত অন্ধকারের মধ্যে আলোর জয়ের উৎসবই দীপাবলি হিসেবে পালিত হয়।
দীপাবলির সঙ্গে সম্পর্কিত পৌরাণিক কাহিনি
হিন্দু মহাকাব্য রামায়ণে উল্লেখ রয়েছে রামচন্দ্র তাঁর বাবা রাজা দশরথের আদেশে ১৪ বছরের জন্য বনবাস গিয়েছিল। তাঁর সঙ্গে যায় স্ত্রী সীতা এবং ভাই লক্ষ্মণ। এই সময়ে সীতাকে হরণ করে লঙ্কায় আটকে রাখে। সীতাকে উদ্ধার করতে হনুমান, বিভীষণ, বানর রাজা সুগ্রীবের সাহায্যে রাবণের সঙ্গে যুদ্ধ করে রাবণকে হত্যা করে রাম।
চৌদ্দ বছর যখন শ্রীরামচন্দ্রের সাক্ষাৎ পাওয়ার জন্য যখন কাতর হয়েছিল অযোধ্যাবাসী, তখন বনবাসলীলা শেষ করে ভাই ভরতের কাছে অযোধ্যায় প্রত্যাবর্তনের বার্তা প্রেরণ করেন তিনি। যে দামোদর মাসে অর্থাৎ কার্তিক মাসে কৃষ্ণপক্ষের অমাবস্যা তিথিতে ভক্তদের কাছে ফিরে আসবেন । শ্রীরামচন্দ্রকে স্বাগত জানাতে অধীর আগ্রহ করে অযোধ্যাবাসী।

শ্রী রামচন্দ্রের আগমন বার্তা পেয়ে সমগ্র নগরে উৎসবের ঘোষণা করেন ভরত। সব অমঙ্গল, অকল্যাণ দূর করে প্রত্যেক বাড়িতে, রাস্তায় রাস্তায় সর্বত্র প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখা হয়। যেহেতু সেদিন ছিল অমাবস্যার রাত, তাই গোটা অযোধ্যাকে একপ্রকার প্রদীপের আলোতে মোড়ানো হয়। অমাবস্যার অন্ধকার দূর করে মঙ্গলময় আলোতে অযোধ্যায় প্রবেশ করতে পারেন শ্রীরামচন্দ্র। অর্থাৎ যেদিন দীপাবলি উৎসব পালন করা হয় ত্রেতা যুগে সেদিনই অযোধ্যায় ফিরে এসেছিলেন রাম। এই বিশেষ দিনকে যুগ যুগ ধরে মহা ধুমধাম করে উদযাপন করা হয়।
দীপাবলির সঙ্গে কৃষ্ণের সম্পর্ক
দীপাবলির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আরও এক কাহিনি । বিষ্ণুর বরাহ অবতারের ঔরসে ধরিত্রীর গর্ভে জন্ম নেয় নরকাসুর। পিতা বিষ্ণুর কাছ থেকে প্রাগজ্যোতিষপুর অর্থাৎ কামরূপ রাজ্য লাভ করে। দেবী কামাখ্যাকে তুষ্ট করে হয়ে ওঠে মহাপরাক্রমশালী। এমনকী তাঁর ভয়ে ভীত হয়ে ওঠেন দেবতারা। স্বর্গ-মর্ত্য-পাতালে চলতে থাকে তার দাপট। এমনকী দেব-দানব গন্ধর্ব নির্বিশেষে ষোল হাজার সুন্দরী রমণীদের বলপূর্বক হরণ করে এক পাহাড়ে নির্মিত বন্দিশালায় সে আটকে রাখে।
এমন সময়ে দ্বারকাধীশ নরকাসুরের কুকীর্তির কথা শুনে প্রাগজ্যোতিষপুরের দিকে ক্রোধ বর্ষণ করেন শ্রীকৃষ্। যুদ্ধে সুদর্শন চক্রে নরকের মস্তক ছিন্ন করে শ্রীকৃষ্ণ ষোল হাজার বন্দিনীকে মুক্ত করেন। নরকাসুরের দানবীয় অত্যাচার ও নারী নির্যাতনের হাত থেকে মুক্তিলাভের পর নারী-পুরুষ নির্বিশেষে ঘর আলোতে সাজিয়েছিল। কামরূপ থেকে দ্বারকা পূর্ব পশ্চিমে প্রায় দু হাজার মাইল ভারত দ্বীপান্বিতা রূপে আত্মপ্রকাশ করেছিল।

লক্ষ্মীর সঙ্গে দীপাবলির সম্পর্ক
আবার পুরাণ মতে বলা হয়, দীপাবলির দিন বিষ্ণুর সঙ্গে লক্ষ্মী বৈবাহিক সম্পর্কে আবদ্ধ হয়েছিলেন।
অনেকের বাড়িতেই এই দিন লক্ষ্মী-নারায়ণের পুজো হয়ে থাকে। অন্য এক কাহিনি অনুসারে এই দিন নাকি মা লক্ষ্মী জন্ম নেন। তাই বাড়িতে শুভ আগমনের জন্য এই দিন মা লক্ষ্মীর পুজো করা হয়। কোথাও কোথাও দীপাবলির দিন হয় লক্ষ্মী ও অলক্ষ্মী পুজো। অলক্ষ্মীকে বিদায় জানিয়ে লক্ষ্মীকে সমারোহে ঘরে স্থাপন করা হয়, তাই প্রদীপ জ্বালিয়ে তাঁকে বরণ করা হয় ঘরে ঘরে। পরদিন ভূত চতুর্দশী থেকে এর সূচনা হয়। অশুভ শক্তি যাতে বিঘ্ন ঘটাতে না পারে, তাই প্রদীপ জ্বালিয়ে সব আলো করা হয়। অন্ধকার থেকে আলোয় ফেরার দিন দীপাবলি।
বাংলায় কালীপুজোর ইতিহাস
8১৬০০ সালের আশপাশে কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ নবদ্বীপে জন্মগ্রহণ করেন। লোকমুখে প্রচলিত বাংলায় প্রথম দক্ষিণা কালীর মূর্তি তৈরি করে কালী আরাধনা শুরু করেন কৃষ্ণানন্দ। যদিও এমন কোনও প্রমাণ নেই।
বাংলায় সর্ববৃহৎ ও সুপরিচিত বৃহৎতন্ত্রসার কৃষ্ণানন্দ রচিত হলেও, কৃষ্ণানন্দের বহু পূর্বে রচিত বিশ্বসারতন্ত্র, নিরুত্তরতন্ত্র ও কালীতন্ত্রে দক্ষিণা কালীর মূর্তির বর্ণনা আছে। আসলে কালীতন্ত্র থেকে বচন উদ্ধৃত করে তন্ত্রসারে কালীমূর্তির পূর্বতন বর্ণনাকে স্বীকৃতি দিয়েছেন তিনি। তার আগে মা কালীর উপাসকরা তাম্রপটে বা খোদাই করে কালীর মূর্তি এঁকে মা কালী সাধনা করতেন। কৃষ্ণানন্দ এক দিনেই মাটির মূর্তি তৈরি করে, কার্তিকী অমাবস্যায় রাতে পুজো করে, পরদিনই বিসর্জন দিতেন। তখনও ঘরে কালীপুজোর প্রচলন হয়নি। অষ্টাদশ শতাব্দীতে নদীয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায় কালী পুজোকে জনপ্রিয় করে তোলেন। উনবিংশ শতাব্দীতে বাংলার বিভিন্ন ধনী জমিদারদের পৃষ্ঠপোষকতায় কালীপুজোর ব্যাপক প্রচলন শুরু হয়।
সময়ের সঙ্গে এই আরাধনা পারিবারিক ও মন্দিরকেন্দ্রিক পরিসর ছাড়িয়ে সর্বজনীন পুজো, মণ্ডপসজ্জা এবং নগরজীবনের উৎসবের অংশ হয়ে উঠেছে।
একই উৎসবের মধ্যে এত পার্থক্য কেন?
ভারতের বিভিন্ন রাজ্য ও অঞ্চলভেদে ভিন্ন জায়গায় পৃথকভাবে দীপাবলি উদযাপন করা হয়। কোথাও কালীপুজো করা হয়, কোথাও দীপাবলি পালন করা হয়। ভারতের আঞ্চলিক উৎসবগুলির বৈচিত্র্যের পিছনে রয়েছে স্থানীয় পৌরাণিক কাহিনি, ধর্মীয় বিশ্বাস, ঐতিহাসিক ঘটনা এবং লোকাচারের দীর্ঘ বিবর্তন। দীপাবলির ক্ষেত্রেও কোনও একটিমাত্র কাহিনি গোটা দেশের উদ্যাপনকে ব্যাখ্যা করে না। কোথাও রামচন্দ্রের প্রত্যাবর্তন, কোথাও কৃষ্ণের বিজয়, কোথাও লক্ষ্মীর আরাধনা, আবার বাংলায় মা কালীর উপাসনা উৎসবের কেন্দ্রে রয়েছে।Raise Your Concern About this Content
পশ্চিমবঙ্গে মা কালীর আরাধনা
কালীপুজোর প্রধান আকর্ষণ ঘরে ঘরে মায়ের আরাধনা। কিছু বড় পুজোমণ্ডপে মাতৃ আরাধনা। ঘরে ঘরে আলোকসজ্জা। কলকাতা-সহ বিভিন্ন জায়গায় কালীপুজোকে ঘিরে তৈরি উৎসবের আবহ।

উত্তর ভারতে রামচন্দ্রের প্রতাবর্তন ও দিওয়ালি
উত্তর ভারতের দীপাবলি উদযাপনের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে রামচন্দ্র, সীতা ও লক্ষ্মণের অযোধ্যায় প্রত্যাবর্তনের কাহিনি। ঘরে ঘরে লক্ষ্মী-গণেশের পুজো, রঙ্গোলি, মাটির প্রদীপ, মিষ্টি বিতরণ এবং আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেওয়া এই উৎসবের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
মহারাষ্ট্র: রাজা বলির স্মৃতি ও পারিবারিক ঐতিহ্য
মহারাষ্ট্রে দীপাবলির বিভিন্ন দিনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে রাজা বলির কাহিনি, পারিবারিক আচার এবং সমৃদ্ধির কামনা। এখানে দীপাবলি কেবল এক রাতের উৎসব নয়; একাধিক দিনের নানা রীতির মধ্য দিয়ে তা উদযাপন করা হয়।
দক্ষিণ ভারত: অশুভের বিনাশ

তামিলনাড়ু সহ দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে দীপাবলির সঙ্গে কৃষ্ণের নরকাসুর বধের কাহিনি যুক্ত। অনেক পরিবারে ভোরে স্নান, নতুন পোশাক, তেল মাখার রীতি, মিষ্টি ও নোনতা খাবার দিয়ে দিন শুরু হয়। তবে রাজ্য ও সম্প্রদায়ভেদে কিছু আচারের পার্থক্য রয়েছে।
পঞ্জাব: বন্দি ছোড় দিবস
শিখ সম্প্রদায়ের কাছে এই সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যাপন বন্দি ছোড় দিবস। গুরু হরগোবিন্দের গ্বালিয়র দুর্গ থেকে মুক্তি পাওয়ার স্মৃতির সঙ্গে দিনটি যুক্ত। গুরুদ্বার সাজানো, প্রার্থনা ও আলোকসজ্জার মাধ্যমে এই দিন পালিত হয়।
ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে দীপাবলি উদযাপন করা হয়। অন্ধকারের অবসান ঘটিয়ে আলোর প্রতিষ্ঠা, হতাশার মাঝে আশার সঞ্চার এবং অশুভের বিরুদ্ধে শুভের জয়। তাই দীপাবলি কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য, সম্প্রীতি ও নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখার এক সর্বজনীন উদযাপন।
তথ্যসূত্র :
১. রাজা কৃষ্ণচন্দ্র, কালীপুজো ও নবদ্বীপের রাস উৎসবের ইতিহাস
২. দীপাবলি কী, কেন পালিত হয় এবং বিভিন্ন ধর্মে এর তাৎপর্য
৩. দীপাবলির উৎপত্তি, ইতিহাস ও আলোর উৎসবের বিবর্তন
৪. দীপাবলিতে বাংলায় কালীপুজোর প্রচলন ও দেবী কালীর বিভিন্ন রূপ
৫. ইউনেস্কোর অধরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় দীপাবলির স্বীকৃতি



