Homeসাহিত্যচর্চাশ্রীজগন্নাথ মহাপ্রভুর আবির্ভাব ও তাঁর ইতিহাস

শ্রীজগন্নাথ মহাপ্রভুর আবির্ভাব ও তাঁর ইতিহাস

“দেবতা নন, ভাবনা; মূর্তি নন, প্রেম…”

১. পৌরাণিক উৎস:

পুরাণ অনুযায়ী, বিশেষত স্কন্দ পুরাণ (উৎকল খণ্ড)-এ বলা হয়েছে, দ্বাপর যুগের শেষে কৃষ্ণের দেহাবসান হলে তাঁর দেহের কিছু অংশ ভাসতে থাকে সমুদ্রে। সেই “দারু ব্রহ্ম” — এক জাদুকরী কাঠ — ভেসে এসে পৌঁছায় পুরীর উপকূলে। রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন সেই কাঠ থেকে ভগবান জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার মূর্তি গড়েন।

বিশেষ শর্ত ছিল: দেবশিল্পী বিশ্বকর্মা একাকী ঘরে দরজা বন্ধ রেখে মূর্তি নির্মাণ করবেন, তবে কেউ সেই দরজা খুলতে পারবে না। কিন্তু রাজার উদ্বেগ ও অস্থিরতায় তিনি দরজা খুলে ফেলেন, ফলে মূর্তিগুলি অসম্পূর্ণ অবস্থায় থেকে যায় — হাত ও পা নেই। তবে পুরাণে বলা হয়:

“সেই অসম্পূর্ণতাই পরিপূর্ণতা, কারণ এই রূপেই ঈশ্বরের সর্বজনীনতা প্রকাশ পায়।”

২. আদিবাসী সংস্কৃতি ও নীলমাধব:

ভগবান জগন্নাথের রূপের প্রাচীনতম রেফারেন্স পাওয়া যায় ওড়িশার আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে। তাঁরা ‘নীলমাধব’ নামে এক প্রাকৃতিক শক্তিকে পূজা করত, যার কোনও নির্দিষ্ট রূপ ছিল না। ইতিহাসবিদদের মতে, জগন্নাথের আজকের মূর্তি সেই আদিবাসী বিশ্বাস ও আর্য হিন্দু ধর্মের সংমিশ্রণ। Raise Your Concern About this Content

“জগন্নাথ একমাত্র হিন্দু দেবতা যাঁর আর্য ও অনার্য উভয় ঐতিহ্য মিশ্রিত।” — ডঃ সত্যেন্দ্রনাথ পণ্ডা, ওড়িশা ইতিহাস গবেষক।

৩. জগন্নাথ মানে ‘জগতের নাথ’ — 

জগন্নাথ দেবতা কোনও একটি সম্প্রদায়ের একচেটিয়া অধিকারভুক্ত নন। তাঁর মূর্তিতে কালো রঙ (কৃষ্ণ), সাদা (বলরাম), ও হলুদ (সুভদ্রা) — তিনটি গোষ্ঠী ও ভাবের প্রতীক: প্রেম, শক্তি ও করুণা।

চৈতন্য মহাপ্রভু ও জগন্নাথ: প্রেমভক্তির এক নব আখ্যান

চৈতন্য মহাপ্রভু || ছবি: lightofgodhead.com’র সৌজন্যে

চৈতন্য মহাপ্রভু যখন পুরী গমন করেন, তখন তিনি জগন্নাথ দর্শনের সময় অচেতন হয়ে পড়েন। তাঁর অভিজ্ঞতা কেবল একটি “দর্শন” নয়, বরং এটি ছিল রাধার আকুল প্রেমের পুনর্জন্ম।

“মোরা কৃষ্ণে বোল, নিতাইয়ে বলি, জগন্নাথে মোর প্রাণ।” — চৈতন্য পদাবলী

এই দর্শন তাঁকে এনে দেয় ‘মহাপ্রেম’ — যে প্রেমে নিজের অস্তিত্ব লুপ্ত হয়, আর কেবল ঈশ্বর বিরাজ করেন।

জগন্নাথের রথযাত্রা চৈতন্যের কাছে ছিল এক অনির্বচনীয় মিলনের রূপক। রথে চড়া জগন্নাথ যেন প্রেমিক কৃষ্ণ, আর চৈতন্য যেন রাধা – তাঁরা পথে পথে প্রেম বিলিয়ে চলেছেন।

“রথে উঠি চলিলে প্রভু, প্রেমে মূর্ছা গৌরাঙ্গ;
জগন্নাথে ডাকি কাঁদে, ‘কাঁহা গেলা মোর শ্যামরঙ্গ’।”

এই রচনাগুলি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বৈষ্ণব পদাবলীর জন্ম দেয়। Raise Your Concern About this Content

■ বৈষ্ণব পদাবলী সাহিত্যে জগন্নাথ

১. চণ্ডীদাস ও বিদ্যাপতির পদ

উড়িষ্যার জগন্নাথ পুরীতে অবস্থিত শ্রী জগন্নাথ ধাম মন্দির || ছবিঃ শ্রী বিশালের সৌজন্যে

বাঙালি প্রেমিক কবিরা জগন্নাথকে চিনেছেন প্রেমের কৃষ্ণ রূপে। তাঁদের পদাবলীতে বারবার উঠে এসেছে রাধার আকুলতা, কৃষ্ণের নির্লিপ্ততা, ও চৈতন্যের বিলাপ।

মধ্যযুগীয় সাহিত্য (১৩শ–১৬শ শতক)

এই যুগে বৈষ্ণব পদাবলী বাংলা সাহিত্যের মুখ্য ধারায় পরিণত হয়। চৈতন্য আন্দোলনের হাত ধরে বাংলা ভাষায় ধর্মীয় ভাববাদ ও আধ্যাত্মিক প্রেমের বিকাশ ঘটে।

  • রথযাত্রাগুন্ডিচা উৎসব বহু নাট্যরূপ ও লোকগাথার জন্ম দিয়েছে।
  • গীতগোবিন্দ-এর রাধা-কৃষ্ণ ভাব এখানে এসে জগন্নাথের মূর্তিতে মিশেছে।

“দেখিলেম তাঁরে নয়নের মণি।
বল রে হৃদয়, কেমনে রই?” — চৈতন্য

তথ্যসূত্র:

১. চৈতন্য চরিতামৃত – কৃষ্ণদাস কবিরাজ

২. চৈতন্যভাগবত – বৃন্দাবন দাস ঠাকুর

৩. বৈষ্ণব পদাবলী – সংকলক: দীনেশচন্দ্র সেন

৪. রাধা ও কৃষ্ণ: পদাবলী সাহিত্যে প্রেম ও ভক্তি – হরিপদ চট্টোপাধ্যায় 

৫. বাংলা বৈষ্ণব কবিতা ও দর্শন – বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী 

৬. জগন্নাথ দেব ও তাঁর রথযাত্রা – সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত

৭. শ্রীচৈতন্য ও বৈষ্ণব ধর্ম – নিখিলনাথ রায়

৮. জগন্নাথ ও উড়িষ্যার লোকধর্ম – দীনেশচন্দ্র সেন

৯. চৈতন্যদেব: নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী

১০. শ্রীচৈতন্যদেব – সুকুমার সেন



অদিতি
অদিতি
অদিতি — সাংবাদিকতা ও সৃজনশীল লেখায় প্রায়োগিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এক উদীয়মান সাহিত্যিক কণ্ঠ, যাঁর লেখা পত্রিকা, আন্তর্জাতিক জার্নাল ও সংকলনে প্রকাশিত। লেখিকা বাংলা সাহিত্যের প্রতি অগাধ ভালোবাসা আর সৃষ্টিশীল প্রতিভার ধারক।
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

বাংলা ক্যালেন্ডার

- বিজ্ঞাপন -spot_img

Most Popular

Recent Comments