কারও হাতে সোনার গয়না, কারও ঘরে নতুন বাসন, আবার কারও কেনাকাটার তালিকায় ছোট্ট একটি রুপোর মুদ্রা। ধনতেরাস এলেই এমন নানা দৃশ্য চোখে পড়ে। আলোর উৎসবের আগে এই একটি দিনকে ঘিরে তৈরি হয় আলাদা উন্মাদনা। সোনার দোকানে ভিড় বাড়ে, গয়নার বিপণিতে চলে বিশেষ আয়োজন, বিজ্ঞাপনে ভেসে ওঠে শুভলাভের বার্তা। অনেকের কাছে ধনতেরাস মানেই নতুন কিছু কেনা। আর সেই কেনাকাটার তালিকায় সবার উপরে থাকে সোনা।
কিন্তু প্রশ্ন হল, ধনতেরাসে সোনা না কিনলে কি সত্যিই অমঙ্গল হয়? সেদিন সোনার গয়না না কিনলে কি সংসারে লক্ষ্মীর কৃপা কমে যায়? নাকি বছরের পর বছর ধরে চলে আসা একটি ধর্মীয় বিশ্বাসকে কেন্দ্র করেই তৈরি হয়েছে কেনাকাটার বিশেষ সংস্কৃতি?

আসলে ধনতেরাসের গল্প শুধু সোনা কেনার নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে পুরাণ, ধর্মীয় বিশ্বাস, সম্পদের ধারণা, ব্যবসায়ীদের বিপণন কৌশল এবং সময়ের সঙ্গে বদলে যাওয়া মধ্যবিত্ত বাঙালির জীবনযাপন। একদিকে ঐতিহ্য, অন্যদিকে আধুনিক বাজার—এই দুইয়ের মাঝখানেই নিজের জায়গা করে নিয়েছে ধনতেরাস।
ধনতেরাসের আখ্যান: ধন্বন্তরি, লক্ষ্মী এবং শুভলাভের বিশ্বাস
‘ধনতেরাস’ শব্দটির মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে উৎসবের পরিচয়। ‘ধন’ অর্থ সম্পদ এবং ‘তেরাস’ বা ‘ত্রয়োদশী’ বলতে বোঝায় চান্দ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের ত্রয়োদশী তিথি। কার্তিক মাসের এই তিথিতেই পালিত হয় ধনতেরাস। দীপাবলি বা কালীপুজোর ঠিক আগে আসে এই উৎসব। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে দিনটি ‘ধনত্রয়োদশী’ নামেও পরিচিত।
ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, ধনতেরাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে সমুদ্র মন্থনের পৌরাণিক কাহিনি। পুরাণের বর্ণনা অনুসারে, দেবতা ও অসুরদের সমুদ্র মন্থনের সময় অমৃতের কলস হাতে আবির্ভূত হয়েছিলেন ভগবান ধন্বন্তরি। হিন্দু ধর্মে তিনি আয়ুর্বেদ ও চিকিৎসাশাস্ত্রের দেবতা হিসেবে পূজিত। সেই কারণে ধনতেরাসের দিন ধন্বন্তরির আরাধনার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। অনেকের বিশ্বাস, এই দিনে তাঁর পুজো করলে সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু লাভ হয়।
অন্যদিকে, ধনতেরাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দেবী লক্ষ্মীর আরাধনাও। লক্ষ্মী হিন্দু ধর্মে সম্পদ, সৌভাগ্য ও সমৃদ্ধির প্রতীক। তাই এই দিন বাড়িঘর পরিষ্কার করে প্রদীপ জ্বালানো, লক্ষ্মী-কুবেরের পুজো এবং নতুন সামগ্রী কেনার রীতি প্রচলিত হয়েছে। কোথাও কোথাও ধনতেরাসের সন্ধ্যায় যমদেবের উদ্দেশে প্রদীপ জ্বালানোরও প্রথা রয়েছে। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, এই প্রদীপ অকালমৃত্যুর আশঙ্কা দূর করার প্রতীক।
এখানেই ধনতেরাসের সঙ্গে সোনা কেনার যোগসূত্র তৈরি হয়েছে। সোনা ও রুপোকে বহুদিন ধরেই ভারতীয় সমাজে সম্পদ, সৌভাগ্য ও স্থায়িত্বের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। ফলে শুভ তিথিতে মূল্যবান ধাতু ঘরে আনার রীতি ক্রমশ জনপ্রিয় হয়েছে। তবে একটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন, ধনতেরাসে সোনা কিনতেই হবে, এমন কোনও সর্বজনীন ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা নেই। সোনা না কিনলে অমঙ্গল হবে, এমন কথারও কোনও নিশ্চিত ধর্মীয় ভিত্তি নেই।
অর্থাৎ, ধনতেরাসের মূল ভাবনা সম্পদ ও সমৃদ্ধির কামনা। সেই সম্পদের প্রকাশ যে শুধু সোনার গয়নাতেই হতে হবে, এমন নয়। কারও কাছে তা রুপোর মুদ্রা, কারও কাছে নতুন বাসন, আবার কারও কাছে পরিবারের প্রয়োজনীয় কোনও সামগ্রী। বিশ্বাসের জায়গাটি একই থাকলেও তার প্রকাশ আলাদা হতে পারে।
বাঙালির ধনতেরাস: যে উৎসব একদিন ছিল অন্যের, আজ নিজেরও
বাঙালির উৎসবের ক্যালেন্ডারে দুর্গাপুজো, কালীপুজো, লক্ষ্মীপুজো, সরস্বতীপুজো কিংবা পয়লা বৈশাখের জায়গা দীর্ঘদিনের। কিন্তু ধনতেরাসের সঙ্গে বাঙালির সম্পর্ক তুলনায় নতুন। একসময় বাংলার অধিকাংশ পরিবারের কাছে এই দিনটি ছিল মূলত অবাঙালি সম্প্রদায়ের উৎসব। বিশেষ করে উত্তর ও পশ্চিম ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে ধনতেরাসে সোনা-রুপো কেনার প্রচলন অনেক বেশি পুরনো।
তবে সময়ের সঙ্গে কলকাতাতেও এই উৎসবের জনপ্রিয়তা বাড়তে শুরু করে। ২০০৪ সালের একটি সংবাদ প্রতিবেদনে কলকাতার গয়নার বাজারে ধনতেরাসের কেনাকাটার প্রসঙ্গ উঠে এসেছিল। সেই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, একসময় তুলনায় কম পরিচিত এই উৎসব ক্রমে শহরের মানুষের কাছে বড় কেনাকাটার উপলক্ষ হয়ে উঠছে। এমনকী, সেই সময় কলকাতার একটি গয়না বিপণির ক্রেতাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাঙালির উপস্থিতির কথাও উঠে এসেছিল। অর্থাৎ, প্রায় দুই দশক আগেই কলকাতার বাঙালি সমাজে ধনতেরাসের প্রভাব বিস্তারের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছিল।
কেন এই পরিবর্তন? এর পিছনে রয়েছে একাধিক কারণ। প্রথমত, কলকাতা একটি বহুজাতিক ও বহুসাংস্কৃতিক শহর। এখানে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের উৎসব, খাদ্যাভ্যাস ও সামাজিক রীতির আদানপ্রদান দীর্ঘদিনের। দ্বিতীয়ত, কর্মসূত্রে এবং ব্যবসার প্রয়োজনে বিভিন্ন রাজ্যের মানুষের সঙ্গে বাঙালির যোগাযোগ বেড়েছে। তৃতীয়ত, শহরের বিপণি সংস্কৃতি এবং বিজ্ঞাপনের জগৎ ধনতেরাসকে আরও পরিচিত করে তুলেছে।
আগে যে পরিবার ধনতেরাসের দিন বিশেষ কিছু কেনার কথা ভাবত না, তারাও এখন অন্তত একটি ছোটখাটো জিনিস কেনার কথা ভাবে। কারও কেনাকাটার তালিকায় থাকে সোনার আংটি, কারও রুপোর কয়েন, আবার কেউ কেনেন রান্নাঘরের নতুন বাসন। অনেক পরিবারে এই দিনটিকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে নতুন পারিবারিক অভ্যাস।
এখানে লক্ষণীয়, বাঙালি ধনতেরাসকে গ্রহণ করলেও নিজের মতো করে সাজিয়ে নিয়েছে। দুর্গাপুজোর মতো আবেগ কিংবা কালীপুজোর মতো পারিবারিক ঐতিহ্য হয়তো এখনও তৈরি হয়নি, কিন্তু কেনাকাটার উৎসব হিসেবে ধনতেরাসের পরিচিতি ক্রমশ বেড়েছে। উৎসবের এই মেলবন্ধনই বাঙালির সংস্কৃতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

কেনাকাটার তালিকায় বদল: সোনা থেকে বাসন, রুপো থেকে ছোট্ট উপহার
ধনতেরাসের সঙ্গে সোনা কেনার সম্পর্ক থাকলেও এই দিনে কেনাকাটার পরিধি অনেক বড়। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, এই তিথিতে সোনা, রুপো কিংবা ধাতুর কোনও সামগ্রী বাড়িতে নিয়ে আসা শুভ। তাই যাঁদের পক্ষে সোনার গয়না কেনা সম্ভব নয়, তাঁরা অনেক সময় রুপোর মুদ্রা, লক্ষ্মী-গণেশের মূর্তি, পিতল বা তামার বাসন কেনেন। এমনকী, অনেক পরিবারে নতুন স্টিলের থালা, বাটি, গ্লাস কিংবা রান্নার সামগ্রী কেনারও রেওয়াজ রয়েছে।
এই কেনাকাটার পিছনে রয়েছে সামর্থ্য অনুযায়ী শুভলাভের ভাবনা। ধনতেরাসের মাহাত্ম্য বজায় রাখতে কয়েক লক্ষ টাকা খরচ করতে হবে, এমন কোনও কথা নেই। বরং পরিবারের প্রয়োজন এবং আর্থিক সামর্থ্য অনুযায়ী কিছু কেনাই অনেকের কাছে এই দিনের তাৎপর্য।
একসময় সোনার গয়না কেনা মানেই ছিল বড়সড় আর্থিক সিদ্ধান্ত। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত পরিবারের ক্ষেত্রে একটি হার, বালা কিংবা আংটি কেনার জন্য দীর্ঘদিন ধরে টাকা জমাতে হত। কিন্তু ধনতেরাস সেই কেনাকাটার জন্য একটি নির্দিষ্ট দিন তৈরি করেছে। ফলে বড় গয়না কেনার সামর্থ্য না থাকলেও ছোট্ট সোনার মুদ্রা কিংবা রুপোর সামগ্রী কেনার প্রবণতা বেড়েছে।
বিশ্ব সোনার পরিষদের তথ্যেও এই পরিবর্তনের ইঙ্গিত রয়েছে। সংস্থার ভারতীয় বাজার সংক্রান্ত বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ধনতেরাস ও দীপাবলির মতো উৎসবের সময়ে সোনার মুদ্রার চাহিদা বিশেষ ভাবে বাড়ে। দুই, পাঁচ ও দশ গ্রামের মতো ছোট মাপের সোনার মুদ্রা উপহার দেওয়ার জন্যও জনপ্রিয়। অর্থাৎ, সোনা কেনার আকাঙ্ক্ষা থাকলেও ক্রেতারা অনেক সময় নিজেদের বাজেট অনুযায়ী কেনাকাটার ধরন বদলে নিচ্ছেন।
এই পরিবর্তন আসলে উৎসবের চরিত্রকেও বদলে দিয়েছে। আগে যেখানে সোনা কেনাই ছিল প্রধান আকর্ষণ, এখন সেখানে রুপো, বাসনপত্র এবং ছোটখাটো উপহারও সমান গুরুত্ব পাচ্ছে। ফলে ধনতেরাস আর শুধু ধনী পরিবারের কেনাকাটার উৎসব নয়, বরং বিভিন্ন আর্থিক সামর্থ্যের মানুষের অংশগ্রহণের একটি উপলক্ষ হয়ে উঠেছে।
সোনার দামের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বদলাচ্ছে ক্রেতার পছন্দ
ধনতেরাসের বাজারে সবচেয়ে বড় প্রভাব ফেলে সোনার দাম। দাম বাড়লে ক্রেতার আগ্রহ একেবারে হারিয়ে যায়, এমন নয়। বরং কেনাকাটার ধরন বদলে যায়। কেউ ভারী গয়নার পরিবর্তে হালকা নকশা বেছে নেন, কেউ বড় গয়নার বদলে ছোট মুদ্রা কেনেন, আবার কেউ সোনার পরিবর্তে রুপোর দিকে ঝোঁকেন।
২০২৪ ও ২০২৫ সালের ধনতেরাসের বাজারেও এই প্রবণতা দেখা গিয়েছিল। সোনার দাম বেশি থাকায় ক্রেতাদের একাংশ ভারী গয়নার বদলে ছোট মুদ্রা ও হালকা গয়না কেনার দিকে ঝুঁকেছিলেন। ২০২৫ সালে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দেখা যায়, সোনার বিক্রির পরিমাণ কমলেও বেশি দামের কারণে বিক্রির মোট অর্থমূল্য তুলনায় বেশি ছিল। অর্থাৎ, ক্রেতারা আগের মতো পরিমাণে সোনা না কিনলেও বেশি টাকা খরচ করছিলেন।
২০২৬ সালের বাজারেও সেই হিসাব গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ব সোনার পরিষদের ৩ নভেম্বর প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের তৃতীয় ত্রৈমাসিকে ভারতে গয়নার জন্য সোনার চাহিদা আগের ত্রৈমাসিকের তুলনায় ৩৩ শতাংশ বেড়ে ১০০ টনে পৌঁছেছে। কিন্তু আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় চাহিদা ২০ শতাংশ কম। অন্যদিকে, প্রথম ন’মাসে গয়নার চাহিদার পরিমাণ ১৮ শতাংশ কমলেও তার অর্থমূল্য ২৯ শতাংশ বেড়েছে। এর অন্যতম কারণ সোনার উচ্চ দাম।
এই পরিসংখ্যান একটি গুরুত্বপূর্ণ ছবি তুলে ধরে। বাজারে কেনাকাটা হচ্ছে, কিন্তু ক্রেতার সিদ্ধান্তে আগের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে হিসাব-নিকাশ। কত গ্রাম সোনা কেনা হবে, কোন নকশার গয়না বাজেটের মধ্যে থাকবে, গয়না না মুদ্রা কেনা বেশি সুবিধাজনক—সবকিছু ভেবেচিন্তেই সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন ক্রেতারা।
কলকাতার বাজারের সাম্প্রতিক ছবিও সেই কথাই বলছে। ৩ নভেম্বর প্রকাশিত দ্য ইকোনমিক টাইমস-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এক মাসে সোনার দাম ৭ শতাংশের বেশি কমায় কলকাতার গয়নার দোকানগুলিতে ক্রেতাদের আনাগোনা বেড়েছে। আগামী বিয়ের মরশুমের জন্যও আগাম কেনাকাটা শুরু হয়েছে। ভারতীয় বুলিয়ন অ্যান্ড জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশনের এক কর্তার পূর্বাভাস ছিল, ২০২৬ সালের ধনতেরাসে বিক্রির পরিমাণ আগের বছরের তুলনায় ১০ থেকে ১২ শতাংশ বাড়তে পারে। প্রতিবেদনে হালকা গয়না এবং তুলনায় কম সোনার ভাগযুক্ত গয়নার প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহের কথাও উঠে এসেছে।
অর্থাৎ, উৎসবের বিশ্বাস অটুট থাকলেও কেনাকাটার সিদ্ধান্ত এখন অনেক বেশি বাস্তবসম্মত। সোনা কিনতে হবে বলে সাধ্যের বাইরে গিয়ে খরচ করার প্রবণতার বদলে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী কেনাকাটার দিকেই ঝুঁকছেন অনেকে।
ব্যবসায়ীদের কাছে ধনতেরাস কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
ধনতেরাস এখন শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, সোনার ব্যবসার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সময়। বিশেষ করে গয়নার দোকান, রুপোর সামগ্রীর বিপণি এবং বাসনপত্রের ব্যবসায়ীদের কাছে এই দিনটির গুরুত্ব অনেক। কারণ, এই একটি দিনকে কেন্দ্র করে তৈরি হয় বিশেষ বিক্রির সম্ভাবনা।
উৎসবের কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই শুরু হয়ে যায় প্রস্তুতি। দোকান সাজানো, নতুন নকশার গয়না আনা, ছোট মাপের সোনার মুদ্রা মজুত রাখা, বিশেষ ছাড়ের ব্যবস্থা করা—সবকিছুই পরিকল্পনা করে করেন ব্যবসায়ীরা। ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে কোথাও গয়নার গড়ন তৈরির খরচে ছাড় দেওয়া হয়, কোথাও নির্দিষ্ট অঙ্কের কেনাকাটায় উপহার দেওয়া হয়। আবার কোথাও পুরনো সোনার বদলে নতুন গয়না কেনার সুবিধা থাকে।
এখানে ব্যবসার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। ধনতেরাসে যাঁরা কেনাকাটা করতে আসেন, তাঁদের সকলের বাজেট এক নয়। কেউ কয়েক লক্ষ টাকার গয়না কেনেন, কেউ আবার সামান্য ওজনের একটি মুদ্রা কিনেই সন্তুষ্ট থাকেন। তাই ব্যবসায়ীদেরও বিভিন্ন ধরনের ক্রেতার কথা মাথায় রেখে পণ্য সাজাতে হয়।

বিশেষ করে ছোট মাপের সোনার মুদ্রা এই বাজারে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা করে নিয়েছে। কারণ, এর মাধ্যমে কম খরচেও সোনা কেনার রীতি পালন করা যায়। অন্যদিকে, রুপোর মুদ্রা কিংবা লক্ষ্মী-গণেশের মূর্তিও ক্রেতাদের কাছে জনপ্রিয়। ফলে শুধু সোনার গয়নার বাজার নয়, ধনতেরাসের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে একাধিক ব্যবসায়িক ক্ষেত্রেও।
এই উৎসবকে কেন্দ্র করে বিজ্ঞাপনের ভাষাতেও তৈরি হয়েছে আলাদা আবহ। ‘শুভলাভ’, ‘সমৃদ্ধির সূচনা’, ‘লক্ষ্মীর আগমন’—এমন নানা বার্তার মাধ্যমে কেনাকাটাকে উৎসবের আবেগের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। কোনও কোনও বিজ্ঞাপনে সোনার গয়নাকে শুধু সাজের সামগ্রী হিসেবে নয়, ভবিষ্যতের সঞ্চয় হিসেবেও তুলে ধরা হয়। ফলে ধর্মীয় বিশ্বাস এবং আর্থিক নিরাপত্তার ধারণা একই সঙ্গে ক্রেতার মনে জায়গা করে নেয়।
তবে বাজারের এই প্রচারের মধ্যেও একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। উৎসবের ছাড় বা শুভ কেনাকাটার বার্তা শুনে তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন নেই। সোনার গয়না কিনলে তার বিশুদ্ধতার ছাপ, দাম, গয়নার গড়ন তৈরির খরচ এবং বিক্রির শর্ত সম্পর্কে জেনে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। উৎসবের আনন্দ যেন অপ্রয়োজনীয় আর্থিক চাপের কারণ না হয়।
নতুন প্রজন্মের কেনাকাটা: ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিকতার মেলবন্ধন
ধনতেরাসের বাজারে আরও একটি পরিবর্তন চোখে পড়ছে। নতুন প্রজন্মের ক্রেতারা শুধু ঐতিহ্য মেনে গয়না কিনছেন না, কেনাকাটার আগে তুলনাও করছেন। কোন দোকানে কত দাম, কোন নকশায় গয়নার গড়ন তৈরির খরচ কম, কোন ধরনের গয়না প্রতিদিন ব্যবহার করা যাবে—এমন নানা বিষয় বিবেচনা করছেন তাঁরা।
আগে সোনা কেনার ক্ষেত্রে ভারী নকশার গয়নার প্রতি আকর্ষণ বেশি থাকলেও এখন হালকা গয়নার চাহিদা বাড়ছে। ছোট কানের দুল, আংটি, সরু চেন কিংবা দৈনন্দিন ব্যবহারের উপযোগী গয়না পছন্দ করছেন অনেকে। এর পিছনে যেমন রয়েছে বদলে যাওয়া পোশাক ও জীবনযাত্রা, তেমনই রয়েছে সোনার দামের প্রভাব।
বিশ্ব সোনার পরিষদের ভারতীয় বাজার সংক্রান্ত একটি বিশ্লেষণেও দেখা গিয়েছে, কম ওজনের গয়না তৈরির দিকে বিশেষ নজর দিচ্ছেন নির্মাতারা। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের ক্রেতাদের চাহিদার কথা মাথায় রেখে তৈরি হচ্ছে এমন গয়না, যা প্রতিদিন ব্যবহার করা যায়।
অন্যদিকে, কেনাকাটার পদ্ধতিতেও এসেছে পরিবর্তন। আগে ধনতেরাসের দিন দোকানে গিয়ে গয়না বা মুদ্রা কেনাই ছিল প্রধান রীতি। এখন অনলাইনেও সোনার মুদ্রা ও বিভিন্ন সামগ্রী কেনার সুযোগ রয়েছে। ডিজিটাল মাধ্যমে সোনা কেনার প্রতিও আগ্রহ তৈরি হয়েছে একাংশের মধ্যে।
বিশ্ব সোনার পরিষদের ২০২৬ সালের তৃতীয় ত্রৈমাসিকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ন’মাসে ভারতে ডিজিটাল সোনার চাহিদা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৭৬ শতাংশ বেড়ে ১৬.৩ টনে পৌঁছেছে। কম অঙ্কে কেনার সুযোগ, সহজ লেনদেন এবং সুবিধাজনক পদ্ধতির কারণে এই মাধ্যম জনপ্রিয় হচ্ছে। যদিও ডিজিটাল সোনা এবং হাতে পাওয়া গয়না বা মুদ্রা এক জিনিস নয়। কেনার আগে সংশ্লিষ্ট মাধ্যমের নিয়ম, খরচ ও ঝুঁকি বুঝে নেওয়া প্রয়োজন।
অর্থাৎ, নতুন প্রজন্মের কাছে ধনতেরাস মানে শুধু সোনার দোকানে যাওয়া নয়। বরং ঐতিহ্য বজায় রেখেও নিজের প্রয়োজন ও পছন্দ অনুযায়ী কেনাকাটা করা। কেউ হয়তো পরিবারের সঙ্গে দোকানে গিয়ে রুপোর মুদ্রা কিনছেন, কেউ অনলাইনে ছোট অঙ্কের সোনা কেনার কথা ভাবছেন। মাধ্যম বদলেছে, কিন্তু শুভ কিছু ঘরে আনার ইচ্ছেটা একই রয়েছে।
বিশ্বাসের সঙ্গে জড়িয়ে অর্থনীতির বড় হিসাব
ধনতেরাসকে কেন্দ্র করে কেনাকাটার এই প্রবণতা আসলে দেশের সোনার বাজারের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ। ভারতীয় সমাজে সোনা শুধু অলংকার নয়, বহু পরিবারের কাছে সম্পদ সঞ্চয়ের একটি পরিচিত মাধ্যম। বিয়ে, পারিবারিক অনুষ্ঠান, সন্তানের ভবিষ্যৎ কিংবা বিপদের সময় আর্থিক সহায়তা—বিভিন্ন কারণেই সোনার প্রতি মানুষের আস্থা রয়েছে।
বিশ্ব সোনার পরিষদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ভারতে সোনার গয়না কেনার ক্ষেত্রে বিয়ে এবং উৎসব সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষগুলির মধ্যে পড়ে। বিশেষ করে বিয়ের গয়নার বাজারের অংশীদারিত্ব যথেষ্ট বড়। পরিবারের সম্পদের অংশ হিসেবে সোনাকে দেখার দীর্ঘদিনের সামাজিক অভ্যাসও এই চাহিদাকে ধরে রেখেছে।
ধনতেরাস সেই চাহিদাকে আরও নির্দিষ্ট একটি দিনের সঙ্গে যুক্ত করেছে। বছরের অন্য সময়ে যাঁরা গয়না কেনার পরিকল্পনা করেন, তাঁদের একাংশও এই তিথিকে বেছে নেন। ফলে উৎসবের মরশুমে গয়নার বাজারে বাড়তি চাহিদা তৈরি হয়। ব্যবসায়ীরা নতুন পণ্য আনেন, বিপণিতে কর্মব্যস্ততা বাড়ে, সোনার পাশাপাশি রুপো এবং অন্যান্য ধাতুর বাজারেও কেনাবেচা বাড়ে।
তবে এই বাজারের একটি অন্য দিকও রয়েছে। সোনার দাম বাড়লে সাধারণ ক্রেতার পক্ষে কেনাকাটা কঠিন হয়ে পড়ে। তখন ছোট গয়না, কম ওজনের মুদ্রা কিংবা রুপোর সামগ্রী বিকল্প হয়ে ওঠে। ২০২৬ সালের বিশ্ব সোনার পরিষদের পরিসংখ্যানেও দেখা যাচ্ছে, সোনার চাহিদার পরিমাণ কমলেও তার মোট অর্থমূল্য বেড়েছে। অর্থাৎ, বাজারে টাকার অঙ্ক বাড়ছে, কিন্তু ক্রেতারা আগের তুলনায় কম পরিমাণ সোনা কিনছেন।
এই পরিবর্তন থেকে স্পষ্ট, ধনতেরাসের বাজারে বিশ্বাসের পাশাপাশি ক্রেতার আর্থিক সামর্থ্যও বড় ভূমিকা পালন করছে। উৎসবের আবেগ রয়েছে, কিন্তু সেই আবেগের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলছে হিসাবের খাতা।
তাহলে সোনা না কিনলে কি অমঙ্গল?
ফিরে আসা যাক শুরুর প্রশ্নে। ধনতেরাসে সোনা না কিনলে কি অমঙ্গল হয়? ধর্মীয় বিশ্বাসের মূল বক্তব্য কিন্তু তা নয়। ধনতেরাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ধন্বন্তরির আরাধনা, লক্ষ্মীর কাছে সমৃদ্ধির প্রার্থনা এবং পরিবারের মঙ্গল কামনা। সোনা কেনা সেই বিশ্বাসের একটি প্রচলিত প্রকাশ মাত্র।Raise Your Concern About this Content
ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে এই দিন কেনাকাটার রীতিও এক নয়। কোথাও সোনা বা রুপো কেনা হয়, কোথাও নতুন বাসনপত্র, আবার কোথাও ধন্বন্তরির পুজো এবং প্রদীপ জ্বালানোই বেশি গুরুত্ব পায়। অর্থাৎ, উৎসবের মূল ভাবনা একই হলেও আচার-অনুষ্ঠানের ধরন আলাদা।
সুতরাং, কারও আর্থিক সামর্থ্য না থাকলে সোনা কেনার জন্য ঋণ নেওয়া কিংবা অপ্রয়োজনীয় খরচ করার কোনও প্রয়োজন নেই। পরিবারের প্রয়োজনীয় কোনও সামগ্রী কেনা, সামান্য রুপোর জিনিস ঘরে আনা কিংবা শুধু পুজো করে দিনটি পালন করাও সম্ভব। বিশ্বাসকে সম্মান করার জন্য দামি গয়না কিনতেই হবে, এমন কোনও বাধ্যবাধকতা নেই।
বরং ধনতেরাসের আসল তাৎপর্য খুঁজে পাওয়া যায় সুস্থতা, সমৃদ্ধি এবং পরিবারের মঙ্গল কামনার মধ্যে। সোনা সেই সমৃদ্ধির একটি প্রতীক হতে পারে, কিন্তু সমৃদ্ধির একমাত্র মাপকাঠি নয়।

উৎসবের আলোয় বদলে যাওয়া বাঙালির মন
বাঙালির উৎসব মানেই একসময় ছিল নতুন জামাকাপড়, মিষ্টি, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করা এবং বাড়ির পুজো। সেই তালিকায় এখন ধনতেরাসও জায়গা করে নিয়েছে। দুর্গাপুজোর কেনাকাটার পর কালীপুজোর আগে আবার নতুন করে বাজারে যাওয়ার উপলক্ষ তৈরি হয়েছে। শহরের গয়নার দোকান থেকে পাড়ার বাসনপত্রের বিপণি—সব জায়গাতেই এই উৎসবের ছাপ পড়ছে।
তবে বাঙালির এই নতুন কেনাকাটার অভ্যাসকে শুধু অন্য সংস্কৃতির অনুকরণ বলে ব্যাখ্যা করলে ভুল হবে। সময়ের সঙ্গে উৎসবের আদানপ্রদান হয়, নতুন প্রজন্ম নতুন কিছু গ্রহণ করে, আবার নিজেদের মতো করে তাকে সাজিয়েও নেয়। ধনতেরাসের ক্ষেত্রেও সেটাই হয়েছে।
একসময় যে দিনটি কলকাতার বহু বাঙালি পরিবারের কাছে ছিল অপরিচিত, আজ সেই দিনেই পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দোকানে যাওয়ার পরিকল্পনা হয়। কেউ সন্তানের জন্য ছোট্ট সোনার আংটি কেনেন, কেউ সংসারের প্রয়োজনীয় বাসন কেনেন, আবার কেউ সামর্থ্য অনুযায়ী একটি রুপোর মুদ্রা ঘরে তোলেন। কেনাকাটার অঙ্ক আলাদা, কিন্তু শুভ কিছু শুরু করার আনন্দটা একই।
আসলে উৎসবের সার্থকতা কত টাকা খরচ হল, কত গ্রাম সোনা কেনা হল কিংবা কার গয়না কত দামি—তার উপর নির্ভর করে না। উৎসব মানুষের মধ্যে আনন্দ তৈরি করে, পরিবারকে একসঙ্গে নিয়ে আসে, আর পুরনো বিশ্বাসের সঙ্গে নতুন সময়ের পরিচয় ঘটায়। ধনতেরাসও সেই পথেই এগোচ্ছে।
সোনার ঝলকানি হয়তো চোখ টানে, দোকানের আলোয় উৎসবের রং আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। কিন্তু ঘরে সত্যিকারের লক্ষ্মীর আগমন কি শুধুই সোনার গয়নায়? যে সংসারে সুস্থতা রয়েছে, পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ভালোবাসা রয়েছে, পরিশ্রমের মূল্য রয়েছে এবং আগামী দিনের জন্য আশার আলো রয়েছে, সেই সংসারও তো সমৃদ্ধ। ধনতেরাসের প্রদীপ আসলে সেই সমৃদ্ধিরই প্রতীক।
তাই এ বছর ধনতেরাসে সোনা কিনুন বা না কিনুন, ঘরে অন্তত একটু আনন্দ, একটু আলো আর অনেকটা শুভকামনা নিয়ে ফিরুন। কারণ, সম্পদের মূল্য শুধু তার দামে নয়, জীবনে তার অর্থ কতখানি—সেটাই আসল কথা। সোনার গয়না না থাকলেও উৎসবের আলো ম্লান হয় না। সমৃদ্ধির শুরু হয় মন থেকে, আর সেই আলোতেই উজ্জ্বল হয়ে ওঠে সংসার।
তথ্যসূত্র
১. বাঙালিদের মনে ধনতেরাসের সূচনা
২. ধনতেরাসে বর্তমানে গয়না কেনার রীতি
৩. কেন ধনতেরাসে সোনা- রুপোর গয়না কেনা হয়?
৪. ধনতেরাস সম্বন্ধে নানা তথ্য



