Home Blog Page 4

লেদারের বল থেকে আধুনিক ফুটবল: বিশ্বকাপ বলের  বিবর্তন

লেদার ও লেসের যুগ: অনিয়মিত ও হাতে তৈরি ম্যাচ বল

বিশ্বকাপের শুরুর যুগে ফুটবল ছিল সম্পূর্ণ হাতে তৈরি চামড়ার বলের ওপর নির্ভরশীল। ১৯৩০-এর দশকে ব্যবহৃত বলগুলো সাধারণত মোটা চামড়া দিয়ে তৈরি হত এবং বাইরের দিকে লেস (ফিতে) দিয়ে সেলাই করা থাকত। ফলে বলের আকৃতি সবসময় সমান থাকত না। বৃষ্টির সময় চামড়া জল শোষণ করায় বল ভারী হয়ে যেত, যা খেলোয়াড়দের জন্য বড় সমস্যা ছিল।

সেই সময় কোনও নির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক মান ছিল না। আয়োজক দেশগুলো নিজেদের মতো বল তৈরি করত। ফলে এক বিশ্বকাপ থেকে অন্য বিশ্বকাপে বলের গুণগত মানে যথেষ্ট পার্থক্য দেখা যেত।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

১৯৩০–১৯৫০: বিশ্বকাপের প্রাথমিক বল ও নানা বিতর্ক

প্রথম বিশ্বকাপ (উরুগুয়ে, ১৯৩০)-এর ফাইনালেই বল নিয়ে বিতর্কের সূচনা। ফাইনালে আর্জেন্টিনা ও উরুগুয়ে নিজেদের পছন্দের বল ব্যবহার করার দাবি তোলে। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হয়, প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনার ‘টিয়েন্তো’ এবং দ্বিতীয়ার্ধে উরুগুয়ের ‘টি-মডেল’ ব্যবহার করা হবে। প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনা এগিয়ে থাকলেও দ্বিতীয়ার্ধে উরুগুয়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়। ১৯৩৪ সালে ইতালির Federale 102-এ ১৩টি হাতে সেলাই করা প্যানেল ব্যবহার করা হয়েছিল। ১৯৩৮ সালে ফ্রান্সের Allen Ball একই ধাঁচ বজায় রাখে।

১৯৫০ সালে ব্রাজিল বিশ্বকাপে ব্যবহৃত Superball Duplo T ছিল বিশ্বকাপ ইতিহাসের প্রথম বল, যাতে বাইরের লেস ছিল না। ভালভ প্রযুক্তির সাহায্যে বাতাস ভরার ফলে বল আরও গোলাকার ও সমান আকৃতির হয়। এটি আধুনিক ফুটবলের দিকে এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

১৯৬৬–১৯৭৮: আধুনিক ডিজাইনের সূচনা ও Adidas Telstar বিপ্লব

১৯৫৮ সালের সুইডেন বিশ্বকাপে ফিফা প্রথমবারের মতো শতাধিক বল পরীক্ষা করে একটি নির্দিষ্ট বল নির্বাচন করে। নির্বাচিত Top Star-এ ছিল ২৪টি প্যানেল। ১৯৬২ সালের Mr Crack ছিল প্রথম বিশ্বকাপ বল যাতে ল্যাটেক্স ভালভ ব্যবহার করা হয়। এর ফলে বল দীর্ঘ সময় বাতাস ধরে রাখতে পারত। ১৯৬৬ সালে ইংল্যান্ড বিশ্বকাপে Slazenger Challenge 4-Star ব্যবহৃত হয়। ফাইনালে ব্যবহৃত কমলা রঙের বলটি পরবর্তীকালে আইকনিক হয়ে ওঠে। তবে প্রকৃত বিপ্লব আসে ১৯৭০ সালে। এই বিশ্বকাপ থেকে Adidas প্রথমবারের মতো সরকারি বল সরবরাহকারী হয় এবং বাজারে আনে Telstar। কালো-সাদা ষড়ভুজ ও পঞ্চভুজের নকশা টেলিভিশনের পর্দায় বলকে আরও দৃশ্যমান করে তোলে। টেলস্টার নামটি নেওয়া হয়েছিল একটি যোগাযোগ উপগ্রহের নাম থেকে।

১৯৭৮ সালের Tango নতুন বাঁকানো ত্রয়ী নকশা নিয়ে আসে, যা পরবর্তী পাঁচটি বিশ্বকাপেও বজায় ছিল।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

সিনথেটিক যুগ: আরও টেকসই,  স্থিতিশীল বল

১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপের Azteca ছিল সম্পূর্ণ সিনথেটিক উপাদানে তৈরি প্রথম বিশ্বকাপ বল। এর ফলে জল শোষণের সমস্যা অনেকটাই কমে যায় এবং বলের স্থায়িত্ব বাড়ে।

১৯৯০ সালের Etrusco Unico এবং ১৯৯৪ সালের Questra-তে সিনথেটিক প্রযুক্তিকে আরও উন্নত করা হয়। বলগুলো আরও হালকা, টেকসই এবং সব আবহাওয়ায় ব্যবহার উপযোগী হয়ে ওঠে।

১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপের Tricolore ছিল বিশ্বকাপ ইতিহাসের প্রথম বহুরঙা বল। এটি ফুটবল ডিজাইনের নতুন যুগের সূচনা করে।

২০০২–২০১০: অ্যারোডাইনামিক্স ও প্রযুক্তিনির্ভর বলের দ্রুত উন্নয়ন

২০০২ সালের বিশ্বকাপে Fevernova দীর্ঘদিনের Tango নকশা থেকে সরে এসে সম্পূর্ণ নতুন গ্রাফিক ডিজাইন নিয়ে আসে।

২০০৬ সালের Teamgeist বলে প্রচলিত ৩২ প্যানেলের পরিবর্তে মাত্র ১৪টি তাপ-সংযুক্ত (thermally bonded) প্যানেল ব্যবহার করা হয়। এর ফলে বল প্রায় নিখুঁত গোলকের আকার পায় এবং উড়ানের স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি পায়।

২০১০ সালের Jabulani ছিল প্রযুক্তিগতভাবে সবচেয়ে উন্নত বলগুলির একটি। মাত্র আটটি থ্রিডি প্যানেল দিয়ে তৈরি এই বলে বিশেষ টেক্সচার ব্যবহার করা হয়েছিল। যদিও অনেক গোলরক্ষক ও খেলোয়াড় বলটির অস্বাভাবিক গতিপথ নিয়ে অভিযোগ করেছিলেন। তবুও অ্যারোডাইনামিক গবেষণায় এটি নতুন অধ্যায় সূচনা করে।Raise Your Concern About this Content

২০১৪–২০১৮: বৈজ্ঞানিক টেস্টিং ও মাইক্রোচিপ প্রযুক্তির প্রবেশ

২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপের Brazuca বাজারে আসার আগে ৬০০-রও বেশি পেশাদার ফুটবলার, ৩০টি বৈজ্ঞানিক দল এবং একাধিক পরীক্ষাগারে দীর্ঘ পরীক্ষা চালানো হয়েছিল। লক্ষ্য ছিল, বলের উড়ান ও নিয়ন্ত্রণ আরও নির্ভুল করা।

২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপের Telstar 18-এ প্রথমবারের মতো NFC-ভিত্তিক মাইক্রোচিপ যুক্ত করা হয়। এর মাধ্যমে স্মার্টফোন ব্যবহার করে ভক্তরা বলের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে পারতেন। এটি ‘স্মার্ট বল’ যুগের সূচনা করে।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

২০২২–বর্তমান: ‘Connected Ball’ ও রিয়েল-টাইম ডেটা-চালিত সিদ্ধান্ত ব্যবস্থা

কাতার বিশ্বকাপের Al Rihla ছিল প্রথম বল যাতে Adidas-এর Connected Ball Technology ব্যবহৃত হয়। বলের ভিতরে থাকা ইনর্শিয়াল মেজারমেন্ট ইউনিট (IMU) সেন্সর প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৫০০ বার তথ্য সংগ্রহ করে ম্যাচ কর্মকর্তাদের কাছে পাঠাতে পারে।

এই প্রযুক্তি সেমি-অটোমেটেড অফসাইড সিস্টেমকে সহায়তা করে, যার ফলে অফসাইড ও বল স্পর্শ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত দ্রুত ও আরও নির্ভুলভাবে নেওয়া সম্ভব হয়।

২০২৬ বিশ্বকাপের জন্য তৈরি Trionda-তেও রিয়েল-টাইম মোশন সেন্সর ব্যবহৃত হয়েছে। এর মাধ্যমে ম্যাচ পরিচালনায় প্রযুক্তির ভূমিকা আরও বাড়ছে।

ভবিষ্যতের বল: এআই দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবে?

ফুটবলের ভবিষ্যৎ বল সম্ভবত আরও বুদ্ধিমান হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), উন্নত সেন্সর, বায়োমেট্রিক বিশ্লেষণ এবং রিয়েল-টাইম ডেটা প্রক্রিয়াকরণ প্রযুক্তি আগামী দিনে বলের অংশ হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতের বল— খেলোয়াড়ের স্পর্শের ধরন বিশ্লেষণ করতে পারবে, বলের গতি ও স্পিনের তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে সম্প্রচার করতে পারবে, স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফাউল বা হ্যান্ডবলের সম্ভাব্য পরিস্থিতি চিহ্নিত করতে সাহায্য করতে পারে, কোচদের জন্য কৌশলগত বিশ্লেষণের নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে। তবে প্রযুক্তির অতি-ব্যবহার খেলাটির স্বাভাবিক মানবিক উপাদানকে কতটা প্রভাবিত করবে, সেই বিতর্কও সমানভাবে চলবে।

পরিশেষে বলা যায়, বিশ্বকাপের বলের বিবর্তন কেবল একটি ক্রীড়া সরঞ্জামের পরিবর্তন নয়, বরং ফুটবলের প্রযুক্তিগত বিপ্লবের প্রতিচ্ছবি। লেদারের ভারী বল থেকে শুরু করে আজকের সেন্সরযুক্ত স্মার্ট বল—এই যাত্রা ফুটবলকে আরও দ্রুত, নির্ভুল ও প্রযুক্তিনির্ভর করেছে। ভবিষ্যতে এই বলই হয়তো পুরো খেলাটির সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠবে।

তথ্যসূত্র 

১. বিশ্বকাপ বলের সামগ্রিক বিবর্তন, ১৯৩০ থেকে ২০২৬, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন, Connected Ball প্রযুক্তি
২. ১৯৩০ সালের T-Model থেকে ২০২৬ সালের Trionda পর্যন্ত সব সরকারি বিশ্বকাপ বলের ইতিহাস
৩. ১৯৭০ সালে Telstar-এর আবির্ভাব থেকে আধুনিক বিশ্বকাপ বলের প্রযুক্তিগত বিবর্তন
৪. লেদারের বল থেকে মাইক্রোচিপ-সমৃদ্ধ আধুনিক বলে রূপান্তরের বিশদ বিবরণ

জামাই আদরের দিন না কি লোকঐতিহ্যের উৎসব? জামাই ষষ্ঠীর অজানা ইতিহাস

জামাই ষষ্ঠীর ইতিহাস ও উৎপত্তি

জামাই ষষ্ঠীর শিকড় প্রাচীন বাংলার লোকধর্ম ও কৃষিনির্ভর সমাজে। মূলত সন্তানদের মঙ্গল কামনায় পালিত ষষ্ঠী ব্রত থেকেই এই উৎসবের উৎপত্তি। ষষ্ঠী দেবীকে সন্তানরক্ষা ও বংশবৃদ্ধির অধিষ্ঠাত্রী দেবী হিসেবে মানা হয়। প্রাচীনকালে মেয়ের সুখী দাম্পত্য জীবন ও সন্তানের কল্যাণ কামনায় শ্বশুরবাড়ির তরফে জামাইকে সম্মান জানানো হতো। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই রীতিই আলাদা সামাজিক উৎসবে পরিণত হয়।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

ঊনবিংশ শতাব্দীতে বাংলার যৌথ পরিবারব্যবস্থা এবং আত্মীয়তার সম্পর্ককে দৃঢ় করার প্রথার মধ্যে জামাই ষষ্ঠী বিশেষ গুরুত্ব পায়। ধীরে ধীরে এটি বাঙালির অন্যতম জনপ্রিয় পারিবারিক উৎসবে পরিণত হয়।

কোথা থেকে এল ‘জামাই ষষ্ঠী’ নাম?

জামাইষষ্ঠী মূলত লোকায়ত প্রথা। ষষ্ঠীদেবীর পার্বণ থেকেই এই প্রথার উদ্ভব। জামাতা বা  ‘জামাই’ এবং ‘ষষ্ঠী’—এই দুই শব্দের সংমিশ্রণেই নাম ‘জামাই ষষ্ঠী’। ষষ্ঠী তিথিতে জামাইকে নিমন্ত্রণ করে আপ্যায়ন করার রীতি থেকেই এই নামের প্রচলন। তবে উৎসবটির মূল ধর্মীয় পরিচয় ছিল ‘ষষ্ঠী ব্রত’। পরে সামাজিক গুরুত্ব বাড়তে থাকায় ‘জামাই ষষ্ঠী’ নামটিই বেশি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

জামাই ষষ্ঠীর আরেক নাম ‘অরণ্যষষ্ঠী’ কেন?

বাঙালির ১২ মাসের ১৩ পার্বণের অন্যতম হল জামাই ষষ্ঠী। এই বিশেষ তিথিটি মূলত শাশুড়ি মা ও জামাইয়ের মধ্যে পালনীয় একটি বিশেষ তিথি। পঞ্জিকায় জামাই ষষ্ঠী অরণ্য ষষ্ঠী নামেও পরিচিত। অনেক জায়গায় জামাই ষষ্ঠীকে ‘অরণ্যষষ্ঠী’ বলা হয়। এর কারণ ষষ্ঠী দেবীর সঙ্গে বৃক্ষ, বনভূমি ও প্রকৃতির গভীর সম্পর্ক রয়েছে। প্রাচীনকালে গ্রামবাংলার মহিলারা বট, অশ্বত্থ বা অন্যান্য বৃক্ষতলায় গিয়ে ষষ্ঠী ব্রত পালন করতেন। সন্তান ও পরিবারের মঙ্গল কামনায় বনদেবীরূপে ষষ্ঠীর আরাধনা করা হতো। সেই থেকেই ‘অরণ্যষষ্ঠী’ নামের প্রচলন। 

ষষ্ঠী দেবী ও এই উৎসবের ধর্মীয় তাৎপর্য

হিন্দু লোকবিশ্বাসে ষষ্ঠী দেবী হলেন সন্তানদের রক্ষাকর্ত্রী। তাঁর বাহন কালো বিড়াল। বাংলার মঙ্গলকাব্য, ব্রতকথা ও লোককাহিনিতে ষষ্ঠী দেবীর উল্লেখ পাওয়া যায়। বিশ্বাস করা হয়, সন্তানদের দীর্ঘায়ু, সুস্বাস্থ্য এবং পারিবারিক সুখ-সমৃদ্ধির জন্য তাঁর পূজা করা হয়। জামাই ষষ্ঠীর দিন মায়েরা দেবীর কাছে কন্যার সংসার ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কল্যাণ কামনা করেন। সেই কারণে জামাইকে সম্মান জানানোও এই ধর্মীয় বিশ্বাসেরই একটি সামাজিক প্রকাশ।

বাংলার সমাজে জামাই ষষ্ঠীর ঐতিহ্য

বাংলা সমাজে জামাই শুধু একজন পরিবারের সদস্য নন, তিনি কন্যার সুখ-দুঃখের সঙ্গী। তাই তাঁকে সম্মান জানানো মানে মেয়ের সংসারকে সম্মান জানানো। বহু পরিবারে জামাইকে নতুন পোশাক, ফল, মিষ্টি ও উপহার দেওয়ার রীতি রয়েছে। একসময় এই উৎসব আত্মীয়তার বন্ধন দৃঢ় করার অন্যতম মাধ্যম ছিল। দূরে বিয়ে হওয়া মেয়েরা এই উপলক্ষে বাপের বাড়িতে আসতেন। ফলে উৎসবটি পারিবারিক পুনর্মিলনেরও একটি উপলক্ষ হয়ে উঠত।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

কেন পালিত হয় জামাই ষষ্ঠী? উৎসবের মূল উদ্দেশ্য

জামাইষষ্ঠী মূলত লোকায়ত প্রথা। ষষ্ঠীদেবীর পার্বণ থেকেই এই প্রথার উদ্ভব। জামাই ষষ্ঠীর মূল উদ্দেশ্য শুধু আপ্যায়ন নয়। এর মধ্যে রয়েছে— কন্যার সুখী দাম্পত্য জীবনের প্রার্থনা। জামাইয়ের দীর্ঘায়ু ও সুস্বাস্থ্যের কামনা। দুই পরিবারের সম্পর্ককে আরও মজবুত করা। পারিবারিক বন্ধন ও সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখা। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মঙ্গল কামনা। 

গ্রামবাংলা বনাম শহুরে জামাই ষষ্ঠী

গ্রামবাংলায় এখনও অনেক জায়গায় ষষ্ঠী দেবীর পূজা, ব্রতকথা পাঠ এবং লোকাচার মেনে উৎসব পালিত হয়। গাছের ডাল, পাতা, ফল ও ঐতিহ্যবাহী উপকরণ ব্যবহার করে পূজার আয়োজন দেখা যায়। অন্যদিকে শহুরে জীবনে ধর্মীয় আচার অপেক্ষা সামাজিক ও পারিবারিক অংশটাই বেশি গুরুত্ব পায়। এখন অনেক পরিবারে রেস্তোরাঁয় খাওয়াদাওয়া, অনলাইন উপহার পাঠানো কিংবা ছোট পারিবারিক জমায়েতের মাধ্যমে জামাই ষষ্ঠী উদযাপন করা হয়।

জামাই ষষ্ঠীর বিশেষ আচার ও রীতি-নীতি

শাস্ত্র মতে এই পুজোয় কাঁঠালপাতার ওপর ৫, ৭ বা ৯ রকমের ফল কেটে সাজিয়ে রাখা হয়। জ্যৈষ্ঠ মাসে আম, লিচু, কাঁঠালের রমরমা। তাই এই মরশুমি ফলগুলিও থাকে পাতে। সঙ্গে থাকে ১০৮ আঁটি দূর্বা। এই দিনে ষষ্ঠী পুজোর জন্য শ্বাশুড়িরা ভোরবেলা স্নান সেরে ঘটে জল ভরে নেন। তারপর ঘটের ওপর আম পাতা রাখেন। সঙ্গে থাকে তালপাতার পাখা। একটি সুতো হলুদে চুবিয়ে তাতে ফুল ও বেলপাতা দিয়ে গিট বেঁধে ডোর তৈরি করা হয়। একে ষষ্ঠীর ডোর বলা হয়ে থাকে।

এই দিনে সাধারণত শাশুড়ি জামাইয়ের কপালে চন্দনের ফোঁটা দেন। মঙ্গলসূত্র বা হলুদ সুতো বেঁধে দীর্ঘায়ু কামনা করেন। এরপর ফল, মিষ্টি ও নানা উপকরণ দিয়ে আশীর্বাদ করা হয়।

খাবারের তালিকায় থাকে ইলিশ বা বড় মাছ, চিংড়ি, পোলাও, মাংস, বিভিন্ন ভাজা। সেইসঙ্গে আম, লিচু, কাঁঠাল- সহ মৌসুমি ফল। এছাড়াও থাকে পায়েস ও মিষ্টান্ন। শাশুড়ি মায়ের হাতেও নতুন শাড়ি তুলে দেন জামাই বাবাজি। জামাইয়ের সঙ্গে মেয়ে ও নাতি-নাতনিকেও নতুন জামাকাপড় দেওয়া ও ভুরিভোজ করানো হয় এ দিন।বাঙালির খাদ্যসংস্কৃতির এক অনন্য প্রদর্শনীও বলা চলে এই দিনটিকে।

জামাই ষষ্ঠী ও বাংলার অর্থনীতি

জামাই ষষ্ঠী এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ মৌসুমি বাজারও তৈরি করেছে। এই সময় মাছের বাজারে চাহিদা ও দাম বাড়ে। মিষ্টির দোকানে বিক্রি বৃদ্ধি পায়। পোশাক ও উপহারের ব্যবসায় বিশেষ ছাড় ও অফার দেখা যায়। ফল বিক্রেতাদের ব্যবসা বাড়ে। রেস্তোরাঁগুলিতে বিশেষ ‘জামাই ষষ্ঠী মেনু’ চালু হয়। অর্থাৎ একটি পারিবারিক উৎসব স্থানীয় অর্থনীতিরও গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে।Raise Your Concern About this Content

সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে বদলে যাওয়া জামাই ষষ্ঠী

একসময় জামাই ষষ্ঠীর স্মৃতি সীমাবদ্ধ থাকত পারিবারিক অ্যালবামে। এখন ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপের যুগে উৎসবের রূপ অনেকটাই বদলে গেছে। জামাইকে নিয়ে মজার মিম, ছবি, ভিডিও, রিল—সবই এখন উৎসবের অংশ। অনেক পরিবার দূরে থাকলেও ভিডিও কলে শুভেচ্ছা বিনিময় করে। ফলে ঐতিহ্য ও প্রযুক্তির এক নতুন মেলবন্ধন তৈরি হয়েছে।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

আধুনিক পরিবারে জামাই ষষ্ঠীর নতুন ব্যাখ্যা

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উৎসবটির ব্যাখ্যাও বদলাচ্ছে। অনেকেই মনে করেন, শুধু জামাই নয়, পরিবারের সব সদস্যের প্রতি সমান সম্মান প্রদর্শনের সংস্কৃতি গড়ে তোলা উচিত।

তাই কোথাও কোথাও এখন ‘মেয়ে-জামাই’ কিংবা সমগ্র পরিবারের মিলনোৎসব হিসেবেও দিনটি পালিত হচ্ছে। উৎসবের মূল বার্তা হয়ে উঠছে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।

বর্তমান প্রজন্মের কাছে জামাই ষষ্ঠীর প্রাসঙ্গিকতা

ব্যস্ত নগরজীবন ও ছোট পরিবারের যুগেও জামাই ষষ্ঠী তার গুরুত্ব হারায়নি। কারণ উৎসবটি আসলে সম্পর্ক উদযাপনের দিন। পরিবারের সদস্যদের একত্রিত হওয়ার, হাসি-আড্ডায় মেতে ওঠার এবং আত্মীয়তার বন্ধনকে নতুন করে ঝালিয়ে নেওয়ার সুযোগ দেয় এই দিন। আধুনিকতার ছোঁয়ায় রীতিনীতি বদলালেও উৎসবের মূল সুর একই রয়ে গেছে—পরিবার, সম্পর্ক এবং শুভকামনা।

পরিশেষে বলা যায়, বাঙালির নানা পার্বণের মধ্যে একটি খুব গুরুত্বপূর্ণ উৎসব জামাইষষ্ঠী। এটি, বাঙালির ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতিক লৌকিক আচার। জামাই ষষ্ঠী শুধু মাছ-মাংস আর ভুরিভোজের উৎসব নয় এটি বাংলার সামাজিক ইতিহাস, লোকবিশ্বাস, পারিবারিক সংস্কৃতি ও আবেগের এক জীবন্ত দলিল।  

 অরণ্যষষ্ঠীর ধর্মীয় আচার থেকে শুরু করে আজকের সোশ্যাল মিডিয়া যুগ—সব পরিবর্তনের মধ্যেও এই উৎসব বাঙালির পারিবারিক ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে রয়েছে।

তথ্যসূত্র

১. ষষ্ঠী দেবীর পরিচয়, উৎপত্তি ও ধর্মীয় গুরুত্ব
২. জামাই ষষ্ঠীর উৎপত্তি, সামাজিক প্রেক্ষাপট ও প্রচলিত কাহিনি
৩. অরণ্যষষ্ঠীর তাৎপর্য ।  কেন অরণ্যষষ্ঠী বলা হয়, তার ধর্মীয় ও লোকাচারগত ব্যাখ্যা
৪. বাংলায় পালিত ১২টি ষষ্ঠী ব্রত
৫. ষষ্ঠী দেবী সম্পর্কিত ঐতিহাসিক ও লোকবিশ্বাসভিত্তিক তথ্য
৬. বাংলা লোকসংস্কৃতি বিষয়ক বিভিন্ন গবেষণা গ্রন্থ, ব্রতকথা সংকলন এবং পশ্চিমবঙ্গের আঞ্চলিক লোকঐতিহ্য সম্পর্কিত প্রকাশনা।

২০২৬ বিশ্বকাপে AI ও স্মার্ট বলের ব্যবহার

AI বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স কী?

AI বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্রা হল এমন একটি প্রযুক্তি, যার মাধ্যমে কম্পিউটার বা মেশিনকে মানুষের মতো চিন্তা করা, শেখানো এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

২০২৬ বিশ্বকাপে বলের বিশেষত্ব কী? তিনটি আয়োজক দেশের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি

এবারের বিশ্বকাপের অফিসিয়াল বলের নামকরন করা হয়েছে ট্রিয়োন্ডা। এটি শুধুমাত্র ফুটবল নয়, আধুনিক প্রযুক্তি ও নকশার নতুন মেলবন্ধন। ট্রিয়োন্ডা হল স্প্যানিশ শব্দ, বঙ্গানুবাদ করলে যার অর্থ দাঁড়ায় ‘তিনটি ঢেউ’। এই নামের মধ্যেই যেমন বিশেষত্ব রয়েছে, তেমনই এর অনন্য ও উদ্ভাবনী নকশা ঐতিহাসিক মুহূর্তকেও উদযাপন করে। প্রথমবারের মতো তিনটি দেশ, কানাডা, মেক্সিকো এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একসঙ্গে ফিফা বিশ্বকাপ আয়োজন করছে। 

২০২৬ বিশ্বকাপের বলটিতে উজ্জ্বল নকশা রয়েছে, লাল, সবুজ এবং নীল রঙের ব্যবহার করা হয়েছে, যা তিনটি আয়োজক দেশের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে। পাশাপাশি, সম্পূর্ণ নতুন চার-প্যানেলের গঠন এবং জ্যামিতিক নকশা “ঢেউ”-এর ধারণাকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, যা বলটির নামের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এই প্যানেলগুলো একত্রিত হয়ে বলের মাঝখানে একটি ত্রিভুজ গঠন করে, যা তিনটি দেশের ঐক্যের প্রতীক।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

বলটির উপর প্রতিটি দেশের প্রতীকী চিহ্নও রয়েছে—কানাডার জন্য ম্যাপল পাতা, মেক্সিকোর জন্য ঈগল এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি তারা। এছাড়াও, সোনালি অলঙ্করণ ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফির প্রতি শ্রদ্ধা জানায়, যা এই বিশ্বমঞ্চের গুরুত্বকে আরও উজ্জ্বল করে তোলে।Raise Your Concern About this Content

উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার

ট্রিয়োন্ডাতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন রয়েছে। চার-প্যানেলের গঠন গভীর সেলাই দ্বারা তৈরি, যা বলটি বাতাসে চলার সময় সুষম ও পর্যাপ্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে এবং উড়ানের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে।

এছাড়া, বলের উপর খোদাই করা বিশেষ আইকনগুলি কাছ থেকে দেখা যায় এবং ভেজা বা আর্দ্র আবহাওয়ায় বল কন্ট্রোল বা ড্রিবল করার সময় গ্রিপ বাড়াতে সাহায্য করে।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

২০২৬ বিশ্বকাপে AI 

এই বিশ্বকাপের অফিসিয়াল ম্যাচ বলেও “কানেক্টেড বল প্রযুক্তি” ব্যবহার করা হয়েছে। ট্রিয়োন্ডার আসল বিশেষত্ব লুকিয়ে রয়েছে এর ভেতরে। বলে অত্যাধুনিক 500Hz মোশন সেন্সর চিপ বসানো হয়েছে , যা বলের প্রতিটি নড়াচড়ার তথ্য সংগ্রহ করে। এই প্রযুক্তি রিয়েল-টাইমে ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (VAR)-এর কাছে সেই নির্ভুল তথ্য সংগ্রহ করে পাঠায়। যেমন ঠিক কখন কোনও খেলোয়াড়ের বলটি ছেড়েছে বা বলের গতি কত রয়েছে। বিশেষত অফসাইড সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চিপের সাহায্যে রেফারি খুব সহজেই বুঝতে পারবেন কোনও খেলোয়াড় অফসাইডে ছিলেন কি না। এছাড়াও বলটি গোললাইন অতিক্রম করার সঙ্গে সঙ্গে রেফারির ঘড়িতে দ্রুত সিগন্যাল পৌঁছে যায় ফলে গোল হয়েছে কি না সহজেই বুঝতে পারেন রেফারি।

  তথ্যসূত্র :

১. উইকিপিডিয়া
২. ট্রিওন্ডা – ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬™-এর অফিসিয়াল ম্যাচ বল

মারাদোনার ‘হ্যান্ড অফ গড’

হ্যান্ড অফ গড:

একটা অবিশ্বাস্য গোল। ১৯৮৬ সালের ২২ জুন। ফুটবল ইতিহাসের এক বিতর্কিত দিন। ম্যাচের প্রথমার্ধ গোলশূন্য থাকার পর, দ্বিতীয় অর্ধে ইংল্যান্ডের ডি-বক্সের ভেতর এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের সৃষ্টি হয়। মাঠে বাতাসে ভেসে আসা বলটি হেড করার জন্য একদিকে লাফিয়ে ওঠেন ইংল্যান্ডের দীর্ঘদেহী গোলরক্ষক পিটার শিল্পটন, আর অন্যদিকে লাফিয়ে ওঠেন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক ম্যারাদোনা। শিল্পটনকে ফাঁকি দিতে ম্যারাদোনা চালাকির আশ্রয় নেন এবং মাথার খুব কাছ দিয়ে তাঁর বাঁ হাত ব্যবহার করে বলটি ইংল্যান্ডের জালে জড়িয়ে দেন। তারপর ওপরের ওই উক্তিটি করেন মারাদোনা। টিউনিসিয়ার রেফারি আলী বিন নাসের হাতের স্পর্শটি দেখতে না পাওয়ায় এটিকে বৈধ গোল বলে ঘোষণা করেন। কিন্তু পরবর্তীতে নিজেই সবটা স্বীকার করেছিলেন মারাদোনা।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

মারাদোনার স্বীকারক্তি:

হ্যান্ড অফ গড গোলটি করার ১৯ বছর পর এই নিয়ে বিস্ফোরক স্বীকারোক্তি করেন দিয়েগো মারাদোনা। ২০০৫ সালে আর্জেন্টিনার টেলিভিশন অনুষ্ঠান ‘লা নোচে দেল ১০’-এ তিনি স্বীকার করেন যে তিনি হাত দিয়েই গোলটি করেছিলেন। বিশ্বের বেশ কয়েকটি সংবাদমাধ্যম ম্যারাদোনার এই ক্ষমা চাওয়ার বিষয়টি প্রতিবেদন আকারে প্রকাশ করে, যা একটি ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়। তবে সেই দিনের সেই ম্যাচের গোলকিপার পিটার শিলটন এই ক্ষমা প্রার্থনা প্রত্যাখ্যান করে বলেন যে, এটি অনেক দেরিতে করা হয়েছে।

দিয়েগো মারাদোনা কে?

১৯৬০ সালের ৩০ অক্টোবর আর্জেন্টিনার লানুস শহরে জন্মগ্রহণ করেন দিয়েগো ম্যারাদোনা। সর্বকালের অন্যতম ফুটবলার হিসেবে ব্যাপকভাবে বিবেচিত এই খেলোয়াড় অল্প বয়স থেকেই অসাধারণ প্রতিভা প্রদর্শন করেন তিনি। কিশোর বয়স থেকেই শুরু করেন পেশাদার ক্যারিয়ার।

ম্যারাদোনা বোকা জুনিয়র্স, এফসি বার্সেলোনা এবং নাপোলির মতো ক্লাবের হয়ে খেলেছেন এবং বিশেষ করে নেপলসে কিংবদন্তি মর্যাদা অর্জন করেন। তিনি ক্লদিয়া ভিলাফানেকে বিয়ে করেন। অধিনায়ক হিসেবে ১৯৮৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে জয়ী করেন। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে একই ম্যাচে করা ‘হ্যান্ড অফ গড’ গোল ও ‘শতাব্দীর সেরা গোল’ উভয়ের জন্যই বিখ্যাত হন।

তাঁর অসাধারণ ড্রিবলিং দক্ষতা, সৃজনশীলতা, নেতৃত্ব তাঁকে একজন বিশ্ব ক্রীড়া আইকনে পরিণত করেছিল। ম্যারাদোনা ২০২০ সালের ২৫শে নভেম্বর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। কিন্তু ফুটবল জগতে তাঁর অবদানের কথা আজও শোনা যায়। তিনি আজও ফুটবল প্রেমীদের মনে।Raise Your Concern About this Content

বিতর্কের জড়িয়েও বিশ্বজুড়ে খ্যাতি অর্জন মারাদোনার:

১. ‘শতাব্দীর সেরা গোল’:

‘হ্যান্ড অফ গড’ গোলের ঠিক চার মিনিট পরেই মারাদোনা আর‌ও একটি ঐতিহাসিক গোল করেছিলেন মারাদোনা। যা মারাদোনাকে ঘিরে তৈরি হ‌ওয়া সমস্ত বিতর্ককে এক লহমায় ফিকে করে দেয়। নিজেদের অর্ধে বল পেয়ে ইংল্যান্ডের পাঁচজন ডিফেন্ডার এবং গোলরক্ষক পিটার শিল্পটনকে কাটিয়ে তিনি যে গোলটি করেছিলেন, তা ফিফা কর্তৃক ‘শতাব্দীর সেরা গোল’ হিসেবে স্বীকৃতি পায়। এক ম্যাচে এই দুই গোলের বৈপরীত্য মারাদোনাকে একজন ‘বিতর্কিত খেলোয়াড়’ থেকে ‘ফুটবল ঈশ্বরে’ পরিণত করে।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

২. ফকল্যান্ড যুদ্ধের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট:

১৯৮২ সালে আর্জেন্টিনা ও ব্রিটেনের মধ্যে ‘ফকল্যান্ড যুদ্ধ’ হয়েছিল, যাতে আর্জেন্টিনা পরাজিত হয়। ১৯৮৬-র ম্যাচটি তাই আর্জেন্টিনার মানুষের কাছে কেবল ফুটবল ছিল না, ছিল এক ধরণের প্রতিশোধ।

৩. একক দক্ষতায় বিশ্বকাপ জয়:

১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপকে বলা হয় “একক দক্ষতায় জেতা বিশ্বকাপ”। মারাদোনা সেই টুর্নামেন্টে একাই ৫টি গোল করেছিলেন এবং ৫টি গোল করিয়েছিলেন। কোয়ার্টার ফাইনাল ও সেমিফাইনালে তাঁর জাদুকরী পারফরম্যান্স ফুটবল বিশ্বকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

৪. নাপোলির হয়ে অলৌকিক উত্থান:

মারাদোনার খ্যাতি কেবল আর্জেন্টিনার জার্সিতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ইতালির ক্লাব নাপোলি-তে যোগ দিয়ে তিনি ইতালিয়ান ফুটবলের ইতিহাস বদলে দেন। তৎকালীন ইতালির ধনী উত্তরের ক্লাবগুলোর (যেমন- জুভেন্টাস, এসি মিলান) আধিপত্য ভেঙে মারাদোনা দরিদ্র দক্ষিণের ক্লাব নাপোলিকে দু’বার সিরি-এ চ্যাম্পিয়ন করেন।

উপসংহার:

‘হ্যান্ড অফ গড’ মারাদোনার ক্যারিয়ারের একটি বিতর্কিত অধ্যায় তা অস্বীকার করার কোন‌ও জায়গা নেই। কিন্তু তাঁর অবিশ্বাস্য ড্রিবলিং, ফুটবল বুদ্ধি এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের ক্ষমতা সেই বিতর্ককে ছাপিয়ে গেছে। ফুটবল জগত তাঁকে শুধু নিয়ম দিয়ে বিচার করেনি, তাঁর পায়ের জাদু আর আবেগের স্ফুলিঙ্গ দিয়েও বিচার করেছে। সে কারণেই এই বিতর্কের তিন দশক পর আজ‌ও বিশ্বজুড়ে এক অমর লেজেন্ড ফুটবলার মারাদোনা।

তথ্যসুূত্র:

১. উইকিপিডিয়া
২. The Guardian
৩. আনন্দবাজার
৪. নিউজ 18 বাংলা
৫. লাইভ মিন্ট

২০২৬ বিশ্বকাপ: কেন এটি ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপ?

২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ কী?

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

ফিফা বিশ্বকাপ বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ফুটবল প্রতিযোগিতা। প্রতি চার বছর অন্তর অনুষ্ঠিত হয়। এই আসরে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ তাদের সেরা দল পাঠায়। প্রত্যেক দলের একটাই লক্ষ্য সোনালি ট্রফি জয় করা। এই ফুটবল মহাযজ্ঞের সাক্ষী থাকে সারা বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ।

২০২৬ বিশ্বকাপ কেন বিশ্বের সবথেকে বড় ফুটবল বিশ্বকাপ?

২০২৬ সালের বিশ্বকাপকে সবচেয়ে বড় বলা হচ্ছে শুধুমাত্র আকারের জন্য নয়, বরং তার বহুমাত্রিক বিস্তারের কারণে। 

প্রথমত, এটি প্রথম বিশ্বকাপ যেখানে তিনটি দেশ একসঙ্গে আয়োজকের ভূমিকায় রয়েছে  মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো। স্বাভাবিকভাবেই বেড়েছে স্টেডিয়ামের সংখ্যা, শহরের পরিসর এবং দর্শকদের অংশগ্রহণ। অতীতে যেখানে একটি দেশই সবকিছু সামলাত, সেখানে এবার দায়িত্ব ও উদযাপন দুটোই ভাগ করে নিচ্ছে ৩টি দেশ। 

অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৮ যা বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। ১৯৩০ সালে প্রথম বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করেছিল মাত্র ১৩টি দল। সেখানে এই সম্প্রসারণ বিশ্ব ফুটবলের পরিধির আরও ব্যাপ্তি ঘটিয়েছে বলা চলে।

দলের সংখ্যা বৃদ্ধি মানেই ম্যাচের সংখ্যাও বেড়েছে, অংশগ্রহণ করবে আরও বেশি খেলোয়াড় এবং  প্রতিযোগিতাও হয়ে উঠবে আরও বেশি বৈচিত্র্যময়। 

অন্যদিকে এই টুর্নামেন্টের ভৌগোলিক বিস্তারও অভূতপূর্ব। উত্তর আমেরিকার বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে অনুষ্ঠিত হবে ম্যাচ। কানাডার উত্তর থেকে মেক্সিকোর দক্ষিণ পর্যন্ত বিভিন্ন স্টেডিয়ামে বসছে বিশ্ব ফুটবলের আসর। এখানেই শেষ নয়, দর্শকসংখ্যার দিক থেকেও এই বিশ্বকাপ নতুন রেকর্ড গড়ে তুলতে চলেছে। ফিফা আশা করছে এই বিশ্বকাপের সাক্ষী থাকতে চলেছে বিলিয়ন সংখ্যক মানুষ। এই বিশ্বকাপের অংশীদার হয়ে উঠবে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের কোটি কোটি মানুষ। এই আন্তর্জাতিক ফুটবল টুর্নামেন্টের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতির সঙ্গে একাত্মবোধ অনুভব করে গোটা বিশ্ব, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম।  সেখানে দেশের সীমানা, ভাষা অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায় না।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

 

কোন কোন দেশ আয়োজন করছে ২০২৬ বিশ্বকাপের?

এবারের ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ তো ঐতিহাসিকও বটে। পৃথিবীর সবথেকে বড় বিশ্বকাপ। এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ, দক্ষিণ আমেরিকা, উত্তর আমেরিকা এবং ওশেনিয়া ৬টি মহাদেশ থেকে আসবে সেরা খেলোয়াড়রা। বিশ্বকাপ শুধুমাত্র ফুটবল নিয়ে উন্মাদনা নয়। এটি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষকে একত্রিত করার মূল মন্ত্র। 

তিনটি দেশের মধ্যে আমেরিকার অনেক বড় স্টেডিয়াম রয়েছে। এমনিতেও মার্কিন যুক্তরাষ্টের স্টেডিয়ামগুলি আকারে অনেক বড়। এই স্টেডিয়ামগুলিতে ৮০ হাজারেরও বেশি মানুষ জায়গা করে নিতে পারে। এই স্টেডিয়ামগুলিতেও বসছে বিশ্বকাপের আসর। দ্বিতীয় আয়োজক দেশ কানাডা। অতীতে ১৯৭৬ এবং ২০১০ সালে অলিম্পিকের আয়োজন করেছিল কানাডা। এই  বিশ্বকাপের জন্য টরেন্টো এবং ভ্যাঙ্কুভারের মতো শহরে বিশ্বকাপের আয়োজন করেছে কানাডা । তৃতীয় আয়োজক দেশ হল মেক্সিকো। এর আগেও দুবার বিশ্বকাপের আয়োজন করেছে উত্তর আমেরিকার এই দেশ।  ১৯৭০ এবং ১৯৮৬ সালেও  বিশ্বকাপের হোস্ট ছিল তারা। এই নিয়ে তৃতীয়বারের জন্য বিশ্বকাপ আয়োজন করার গুরুদায়িত্ব পড়েছে মেক্সিকোর কাঁধে।

ট্রিয়োন্ডা কী? ট্রিয়োন্ডার সঙ্গে ২০২৬-এর বিশ্বকাপের কী সম্পর্ক?

এবারের বিশ্বকাপের অফিসিয়াল বল ট্রিয়োন্ডা। এটি শুধুমাত্র ফুটবল নয়, আধুনিক প্রযুক্তি ও নকশার নতুন মেলবন্ধন। গঠনগত দিক থেকে এই বল পুরনো বলগুলির তুলনায় একেবারে ভিন্ন। এই ফুটবলে মাত্র চারটি প্যানেল রয়েছে যেখানে অন্যান্য ফুটবলে ৪টির থেকে অনেক বেশি প্যানেল থাকে। কম প্যানেল থাকায় এই ফুটবল আরও নিঁখুতভাবে গোলাকার হয়ে উঠেছে। ফলে এই বল বাতাসে আরও সোজা ও স্থিরভাবে চলতে পারে। এতে খেলোয়াড়দের জন্য বল নিয়ন্ত্রণ করাও সহজ হয়। তবে ট্রিয়োন্ডার আসল বিশেষত্ব লুকিয়ে রয়েছে এর ভেতরে। বলের ভিতরে একটি অত্যন্ত ছোট কম্পিউটার চিপ বসানো হয়েছে, যা বাইরে থেকে চোখে পড়ে না, কিন্তু মাঠে তার কাজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই চিপ ম্যাচ চলাকালীন বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করে এবং তা রেফারিদের কাছে পাঠায় যেমন ঠিক কখন বলটি কোনও খেলোয়াড়ের পা ছেড়েছে বা বলের গতি কত রয়েছে। বিশেষত অফসাইড সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চিপের সাহায্যে রেফারি খুব সহজেই বুঝতে পারবেন কোনও খেলোয়াড় অফসাইডে ছিলেন কি না। এছাড়াও বলটি গোললাইন অতিক্রম করলে রেফারির ঘড়িতে দ্রুত সিগন্যাল পৌঁছয় ফলে গোল হয়েছে কি না সহজেই বুঝতে পারেন রেফারি।  Raise Your Concern About this Content

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

বিশ্বকাপের ম্যাচগুলি দেখতে চান, কীভাবে বুক করবেন টিকিট?

সাধারণত ফিফার অফিসিয়াল ওয়েবসাইট থেকেই বিশ্বকাপের টিকিট বিক্রি করা হয়। প্রথমে আপনাকে ফিফার অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে অ্যাকাউন্ট তৈরি করতে হবে। পরে টিকিট বিক্রির প্রক্রিয়া শুরু হলে আবেদন করতে হবে। কোয়ার্টার ফাইনাল, সেমিফাইনাল ও ফাইনালের টিকিট লটারির মাধ্যমে বা ফার্স্ট কাম ফার্স্ট সার্ভের ভিত্তিতে পাওয়া যায়। অনেক সময় অনুমোদিত রিসেলার বা ট্রাভেল প্যাকেজের মাধ্যমেও টিকিট পাওয়া যায়। 

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

কত টাকা খরচ হতে পারে?

ম্যাচ, সিট ক্যাটেগরি ও দেশ অনুযায়ী টিকিটের দাম নির্ভর করে। কোয়ার্টার ফাইনালে ভারতীয় মুদ্রায় আনুমানিক ১৫,০০০ – ৪০,০০০ টাকা, সেমিফাইনালে প্রায় ৩০,০০০ – ৮০,০০০ টাকা এবং ফাইনালে ৫০,০০০ টাকা থেকে শুরু করে ২-৩ লক্ষ টাকাও খরচ হতে পারে। ফ্লাইট খরচ ৬০,০০০ থেকে ১.৫ লক্ষ টাকা।

কোথায় থাকবেন?

ম্যাচের শহরের উপর নির্ভর করে থাকার জায়গা নির্বাচন করবেন। হোস্টেল,এআরবিএনবি ,৩-৪ স্টার হোটেল, ৫ স্টার হোটেলেও থাকতে পারেন।

ভিসা 

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো এই ৩ দেশে বসেছে বিশ্বকাপের আসর। আপনার গন্তব্য অনুযায়ী আলাদা ভিসা লাগতে পারে। সাধারণত ট্যুরিস্ট ভিসা (B1/B2 বা Visitor Visa) প্রয়োজন হয়। ভিসা পেতে কিছু ডকুমেন্টের প্রয়োজন। সেগুলি হল বৈধ পাসপোর্ট, টিকিট/ম্যাচ কনফার্মেশন,হোটেল বুকিং, ব্যাংক স্টেটমেন্ট।

কোথায় কোথায় ঘুরে দেখতে পারেন?

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গেলে নিউ ইয়র্ক-এর স্ট্যাচু অফ লিবার্টি , টাইম স্কোয়ার, লস অ্যাঞ্জেলেস,মিয়ামি বিচ ঘুরে দেখতে পারেন। 
কানাডার আশেপাশে টরেন্টোর টাওয়ার, ভ্যাঙ্কুভার,নায়াগ্রা জলপ্রপাত ঘুরে দেখতে পারেন। 
মেক্সিকো সিটি এক্সপ্লোর করতে পারেন। ক্যানকুন বিচ ঘুরে দেখতে পারেন।

তথ্যসূত্র-

উইকিপিডিয়া
বাংলা আজতক

সবচেয়ে বেশি বিশ্বকাপ খেলা ফুটবলার

সবচেয়ে বেশি বিশ্বকাপ খেলা ফুটবলার কে?

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

সাল ২০২২ বিশ্বকাপ ফাইনালে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে আর্জেন্টিনাকে জয়ের পথে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন লিওনেল মেসি। সেই বছর ২৬টি ম্যাচ খেলে বিশ্বকাপে সর্বাধিক ম্যাচ খেলার রেকর্ড গড়েন তিনি। ২০২২ সালের আগে পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি বিশ্বকাপ খেলা ফুটবলারের তালিকার শীর্ষে ছিল জার্মান কিংবদন্তি লাথার ম্যাথুয়াস। ২০২২ সালে ম্যাথুয়াসের জায়গা দখল করেন মেসি।  

মেসি সেই ১৪ জন খেলোয়াড়ের একজন, যারা ৬ টি দেশের হয়ে ২০ বা তার বেশি বিশ্বকাপ ম্যাচ খেলেছেন। আটবারের ব্যালন ডি’অর জয়ী এই তারকার ঝুলিতে ২০২৬-এর বিশ্বকাপের আসরের অন্তত আরও ৩টি ম্যাচ যুক্ত হবে বলে আশা রাখা যায়। 

স্বাভাবিকভাবেই, ফুটবলের ইতিহাসে ২০ বা তার বেশি বিশ্বকাপ ম্যাচ খেলা খেলোয়াড়দের তালিকায় সেরা ফুটবলাররাই জায়গা করে নিয়েছেন তা বলাই বাহুল্য। 

ফুটবলার দেশ কয়টি বিশ্বকাপ ম্যাচ খেলেছেন?
লিওনেল মেসি আর্জেন্টিনা ২৭
লোথার ম্যাথুয়াস জার্মানি ২৫
মিরোস্লাভ কোসেজার্মানি২৪
পাওলো মালদিনিইতালি২৩
ক্রিস্টিয়ানো রোনাল্ডোপর্তুগাল ২২
দিয়েগো মারাদোনাআর্জেন্টিনা ২১
ব্লাডিস্লো জমুডাপোল্যান্ড২১
উই সিলার জার্মানি২১
গর্জেগর্জ লাটোপোল্যান্ড ২০
কাফুব্রাজিল ২০
ফিলিপ লাহম জার্মানি২০
বাস্টিয়ান সচুইনস্টাইগারজার্মানি২০
জাভিয়ার মাসচেরানো আর্জেন্টিনা ২০
হুগো লরিস ফ্রান্স২০
লুকা মদ্রিকক্রোয়েশিয়া২০
কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

বিশ্বকাপ না জিতেও সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলেছেন কোন খোলোয়াড়?

বিশ্বকাপ না জিতেও সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলা খেলোয়াড়দের তালিকাও উল্লেখযোগ্য। এই তালিকায় শীর্ষস্থান দখল করেছেন ক্রিস্টিয়ানো রোনাল্ডো।

কোন কোন ফুটবলাররা সবচেয়ে বেশি বিশ্বকাপ আসরে অংশ নিয়েছেন?

দুইজন খেলোয়াড় পাঁচটি বিশ্বকাপের দলে থাকলেও সবগুলোতে খেলেননি। তারা হলেন ইতালির গোলকিপার গিয়ানলুইগি বাফন। তিনি ১৯৯৮-এ ম্যাচ খেলেননি। আরেকজন হলেন মেক্সিকোর গুইলারমো ওকোআ। তিনি ২০০৬ ও ২০১০ সালের বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করলেও খেলেননি।Raise Your Concern About this Content

সবচেয়ে বেশি বিশ্বকাপ খেলা গোলকিপার কে?

গোলকিপারদের মধ্যে একমাত্র হুগো লরিস-ই ২০টি বিশ্বকাপ ম্যাচ খেলেছেন। তবে এই বছর যদি বেলজিয়াম শেষ ১৬-তে পৌঁছায় এবং থিবাউট কোরটয়েস সব ম্যাচ খেলতে পারেন, তবে তিনিও লরিসের সমকক্ষে আসন গ্রহণ করবেন।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

কোন কোন ফুটবলাররা সবচেয়ে বেশি বিশ্বকাপ আসরে অংশ নিয়েছেন?

দুইজন খেলোয়াড় পাঁচটি বিশ্বকাপের দলে থাকলেও সবগুলোতে খেলেননি। তারা হলেন ইতালির গোলকিপার গিয়ানলুইগি বাফন। তিনি ১৯৯৮-এ ম্যাচ খেলেননি। আরেকজন হলেন মেক্সিকোর গুইলারমো ওকোআ। তিনি ২০০৬ ও ২০১০ সালের বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করলেও খেলেননি।

সবচেয়ে বেশি বিশ্বকাপ খেলা গোলকিপার কে?

গোলকিপারদের মধ্যে একমাত্র হুগো লরিস-ই ২০টি বিশ্বকাপ ম্যাচ খেলেছেন। তবে এই বছর যদি বেলজিয়াম শেষ ১৬-তে পৌঁছায় এবং থিবাউট কোরটয়েস সব ম্যাচ খেলতে পারেন, তবে তিনিও লরিসের সমকক্ষে আসন গ্রহণ করবেন।

তথ্যসূত্র :

১. লাইভ স্কোর
২. উইকিপিডিয়া

জাতীয় পতাকা, আবেগ আর ফুটবল—কেন হলুদই ব্রাজিলের প্রতীক

ব্রাজিলের প্রথম জার্সি

ব্রাজিল জাতীয় ফুটবল দল প্রথমদিকে সাদা রঙের জার্সি পরেই খেলত। ১৯১৪ সালে আন্তর্জাতিক ফুটবলে অভিষেকের পর দীর্ঘদিন সাদা জার্সিই ছিল তাদের পরিচয়। সেই জার্সির কলারে থাকত নীল রঙের ছোঁয়া। কিন্তু ১৯৫০ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে উরুগুয়ের কাছে ব্রাজিলের ঐতিহাসিক হার— যা “মারাকানাজো” নামে পরিচিত— গোটা দেশকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। সেই পরাজয়ের পর সাদা জার্সিকে অনেকেই অশুভ বলে মনে করতে শুরু করেন।

১৯৫০ সালের ‘মারাকানাজো’ ট্র্যাজেডি

১৯৫০ সালের বিশ্বকাপের আয়োজক ছিল ব্রাজিল। ফাইনালে (আসলে শেষ রাউন্ডের নির্ধারক ম্যাচ) উরুগুয়ের বিরুদ্ধে ড্র করলেই বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হতো ব্রাজিল। রিও ডি জেনেইরোর ঐতিহাসিক মারাকানা স্টেডিয়াম-এ প্রায় দুই লক্ষ দর্শকের সামনে ২-১ গোলে হেরে যায় ব্রাজিল। এই হার ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাসে ‘মারাকানাজো’ নামে পরিচিত। অনেকেই সেই পরাজয়ের জন্য সাদা জার্সিকে দায়ী করেছিলেন।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

জার্সির রঙ বদল

১৯৫৩ সালে ব্রাজিলের সংবাদপত্র Correio da Manhã নতুন জার্সির নকশা তৈরির জন্য একটি প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। শর্ত ছিল, নতুন জার্সিতে অবশ্যই ব্রাজিলের জাতীয় পতাকার চারটি রঙ— হলুদ, সবুজ, নীল এবং সাদা— থাকতে হবে।

এই প্রতিযোগিতায় জয়ী হন মাত্র ১৯ বছর বয়সি ডিজাইনার আলদির গার্সিয়া শ্লি। তাঁর নকশা অনুযায়ী তৈরি হয় হলুদ জার্সি, সবুজ কলার, নীল শর্টস এবং সাদা মোজার সমন্বয়ে নতুন কিট। ১৯৫৪ সাল থেকে ব্রাজিল এই নতুন জার্সি ব্যবহার শুরু করে।

জাতীয় পতাকার রঙের প্রতীকী ব্যবহার

ব্রাজিলের জাতীয় পতাকায় ব্যবহৃত প্রতিটি রঙেরই আলাদা তাৎপর্য রয়েছে। হলুদ রঙ দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ ও সমৃদ্ধির প্রতীক, সবুজ রঙ প্রতীক বিশাল বনভূমি ও প্রকৃতির, আর নীল রঙ আকাশ ও জাতীয় ঐক্যের প্রতীক। সেই কারণেই নতুন জার্সির নকশায় জাতীয় পতাকার রঙকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।

“ক্যানারিনহো” পরিচিতি

হলুদ জার্সির কারণেই ব্রাজিল দল “ক্যানারিনহো” (Canarinho) নামে পরিচিতি পায়। পর্তুগিজ ভাষায় “ক্যানারিনহো” শব্দের অর্থ ছোট ক্যানারি পাখি। উজ্জ্বল হলুদ জার্সি ক্যানারি পাখির রঙের সঙ্গে মিল থাকায় এই নামটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। বর্তমানে “সেলেসাও” (Seleção)-এর পাশাপাশি “ক্যানারিনহো” নামটিও বিশ্বজুড়ে সমান জনপ্রিয়।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

জার্সি নিয়ে বিতর্কও রয়েছে

সাম্প্রতিক সময়ে ব্রাজিলের জার্সি কখনও কখনও রাজনৈতিক প্রতীকের রূপ নিয়েছে বলে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তবে ব্রাজিল ফুটবল ফেডারেশন বারবার জানিয়েছে, জাতীয় দলের জার্সি দেশের সকল মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে এবং এর সঙ্গে কোনও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শের সম্পর্ক নেই।Raise Your Concern About this Content

ফুটবল সংস্কৃতি ও বিশ্বমঞ্চে প্রভাব

হলুদ জার্সি শুধু একটি পোশাক নয়, এটি ব্রাজিলের ফুটবল সংস্কৃতির প্রতীক। পেলে, জিকো, রোনালদো, রোনালদিনহো কিংবা নেইমার— সকলেই এই জার্সি গায়ে বিশ্ব ফুটবলে নিজেদের ছাপ রেখে গিয়েছেন। পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের সাফল্যের সঙ্গে হলুদ জার্সি আজ অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে গিয়েছে।

সাইকোলজিক্যাল ইমপ্যাক্ট

মনোবিজ্ঞানীদের মতে, উজ্জ্বল হলুদ রঙ আত্মবিশ্বাস, উদ্যম এবং ইতিবাচক মানসিকতার প্রতীক। মাঠে এই রঙ প্রতিপক্ষের উপর মানসিক চাপ তৈরি করতেও সাহায্য করে। ব্রাজিলের ফুটবলারদের আত্মবিশ্বাসী ও আক্রমণাত্মক ফুটবল দর্শনের সঙ্গেও এই রঙ যেন স্বাভাবিকভাবেই মানিয়ে যায়।

আধুনিক ব্র্যান্ডিং

বর্তমানে ব্রাজিলের হলুদ জার্সি বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় ক্রীড়া ব্র্যান্ড। ফুটবলের গণ্ডি পেরিয়ে এটি এখন ফ্যাশন, সংস্কৃতি এবং জাতীয় পরিচয়ের প্রতীক হয়ে উঠেছে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ব্রাজিলের সমর্থকেরা এই জার্সি পরেই নিজেদের আবেগ প্রকাশ করেন।

তথ্যসূত্র :

১. ব্রাজিল ফুটবল টিম
২. জার্সি নিয়ে তথ্য
৩. ব্রাজিল জাতীয় দলের সাফল্য ও বিশ্বকাপ ইতিহাস
৪.  উইকিপিডিয়া 

রোহিন উৎসব: মাটির টানে, বীজবপনের মাধ্যমে জঙ্গলমহলের প্রাণের পরব

কথায় আছে ‘বারো দিনে বারনি, তেরো দিনে রোহিনী’। প্রতিবছরের মত এ-বছর জঙ্গলমহলের আপামর কৃষিজীবী মানুষজ রোহিণী উৎসবের আনন্দে মেতে উঠেছে। জঙ্গলমহলের অত্যন্ত জনপ্রিয় লোকউৎসব এটি। এটি শুধু একটি উৎসব নয়, বরং কৃষকদের আশা, বিশ্বাস, পরিশ্রম ও প্রকৃতিনির্ভর জীবনযাত্রার এক সাংস্কৃতিক দলিল। বছরের নতুন চাষ মরসুমের সূচনা হয় এই উৎসবের মধ্য দিয়ে। বীজ বোনার আগে মাটির কাছে আশীর্বাদ চাওয়ার এই প্রাচীন প্রথা আজও গ্রামীণ সমাজে অটুট। 

রোহিন উৎসব কী?

রোহিন বা রোহিনী পরব হল জঙ্গলমহলের একটি ঐতিহ্যবাহী কৃষিভিত্তিক লোকউৎসব। প্রতি বছর বাংলা জ্যৈষ্ঠ মাসের ১৩ তারিখে এই উৎসব পালিত হয়। স্থানীয় ভাষায় একে অনেক সময় ‘বীচ পুহ্না’ বা ‘বীজবপন পরব’ও বলা হয়। এই দিনকে কৃষিকাজের জন্য অত্যন্ত শুভ বলে মনে করা হয়। উৎসবের প্রধান উদ্দেশ্য হল নতুন বছরের কৃষি মরসুমের সূচনা এবং ধানের বীজ বোনার প্রস্তুতি গ্রহণ।

রোহিন নামের উৎস

‘রোহিন’ শব্দটি এসেছে ‘রোহিণী’ নক্ষত্র থেকে। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, জ্যৈষ্ঠ মাসের ১৩ তারিখে রোহিণী নক্ষত্র পৃথিবীর নিকটবর্তী অবস্থানে থাকে। সেই সময় মাটিতে বীজ বপন করলে শস্যের বৃদ্ধি ভালো হয় এবং কৃষিকাজে সাফল্য আসে। বলা যায়, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও লোকবিশ্বাসের মেলবন্ধনে এই উৎসবের নামকরণ হয়েছে বলে মনে করা হয়।

কেন রোহিন উৎসব হয়?

কৃষকের জীবন সম্পূর্ণভাবে প্রকৃতির উপর নির্ভরশীল। বৃষ্টি, উর্বর মাটি এবং সঠিক সময়ে বীজ বপনের উপর নির্ভর করে ফসলের ভবিষ্যৎ। তাই বীজ বোনার আগে কৃষকেরা প্রকৃতি ও ভূমিদেবীর আশীর্বাদ কামনা করেন। তাঁদের বিশ্বাস, এই শুভ দিনে বীজ বপন করলে রোগ-পোকামাকড়ের আক্রমণ কম হয় এবং ফলন ভালো হয়। রোহিন উৎসব তাই একদিকে কৃষি মৌসুমের সূচনা, অন্যদিকে প্রকৃতির প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের অনুষ্ঠান।

কোথায় পালিত হয়?

রোহিন উৎসব প্রধানত পালিত হয় পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, ঝাড়গ্রাম, পশ্চিম মেদিনীপুর এবং সংলগ্ন ঝাড়খণ্ডের বিভিন্ন গ্রামীণ অঞ্চলে। বিশেষত কুড়মি, মাহাতো, সাঁওতালসহ বিভিন্ন কৃষিনির্ভর জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই উৎসবের প্রচলন বেশি দেখা যায়।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

উৎসবের ঐতিহাসিক পটভূমি

রোহিন উৎসবের সুনির্দিষ্ট সূচনাকাল সম্পর্কে লিখিত ঐতিহাসিক তথ্য খুব বেশি পাওয়া যায় না। গবেষকদের মতে, এটি বহু শতাব্দী ধরে প্রচলিত একটি লোকায়ত কৃষি উৎসব। আধুনিক কৃষিবিজ্ঞানের বিকাশের বহু আগে কৃষকরা নক্ষত্র, ঋতুচক্র ও প্রকৃতির লক্ষণ পর্যবেক্ষণ করে চাষাবাদের সময় নির্ধারণ করতেন। সেই ঐতিহ্যেরই উত্তরাধিকার বহন করে চলেছে রোহিন উৎসব। লোকসংস্কৃতি গবেষকদের মতে, এটি মূলত আদিবাসী ও গ্রামীণ কৃষিজীবী সমাজের প্রাচীন কৃষি-সংস্কৃতির অংশ।

কৃষির সঙ্গে রোহিন উৎসবের সম্পর্ক

রোহিন উৎসবের কেন্দ্রবিন্দু হল কৃষিকাজ। এই দিন ধানের বীজ বোনার শুভ সূচনা করা হয়। বীজতলা তৈরির প্রস্তুতি নেওয়া হয়। কৃষিজমির উর্বরতা কামনা করা হয়। নতুন ফসলের জন্য আশীর্বাদ চাওয়া হয়। কৃষকদের কাছে এই উৎসব প্রকৃত অর্থেই নতুন কৃষি বর্ষের সূচনার প্রতীক। 

উৎসবের আচার-অনুষ্ঠান

রোহিন পরবের নানা আচার-অনুষ্ঠান আজও গ্রামীণ সমাজে প্রচলিত। ভোরবেলায় মহিলারা গোবর দিয়ে উঠোন পরিষ্কার করেন। গোবর-গোলা জলে বিভিন্ন লতাপাতা ডুবিয়ে নকশা বা আলপনা আঁকা হয়। সেই সঙ্গে রয়েছে কিছু নিয়ম। যেমন-

রোহিন মাটি সংগ্রহ

স্নান সেরে ভিজে কাপড়ে মাঠ থেকে ‘রোহিন মাটি’ আনা হয়। এটি হলো বছরের প্রথম লাঙল চালানোর পর তৈরি হওয়া পবিত্র মাটি। সেই মাটি ঘরের চার কোণে এবং তুলসীমঞ্চে রাখা হয়। 

বীজবপন

গ্রামের প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, যে পরিবারের আয় বেশি এবং ব্যয় কম, অর্থাৎ অর্থনৈতিকভাবে শুভ অবস্থায় থাকা ব্যক্তি প্রথম বীজ বপন করেন।

রোহিন ফল সংগ্রহ

পুরুষেরা ‘রোহিন ফল’ বা ‘কেলেকড়া’ সংগ্রহ করে আনেন, যা শুভ প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।

এছাড়াও বাড়ির মেয়েরা মুখে কালি, রং মেখে বাদ্য যন্ত্র বাজিয়ে পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে বেড়ায়। তারা পূর্বপুরুষদের আমল থেকে এই উৎসব পালন করে আসছেন। ‌তাই এই উৎসবের বিরাট মাহাত্ম্য রয়েছে জঙ্গলমহল পুরুলিয়া কৃষক পরিবারগুলির মধ্যে। রোহিন উৎসব কেবল কৃষিকাজের অনুষ্ঠান নয়, এটি গ্রামীণ সমাজকে একত্রিত করারও উপলক্ষ। গ্রামের মানুষ একসঙ্গে উৎসবে অংশ নেন। পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন দৃঢ় হয়। লোকবিশ্বাস ও ঐতিহ্য নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে যায়। গ্রামীণ সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা বজায় থাকে। একই সঙ্গে নারী পুরুষ নির্বিশেষে এই দিন শস্য ক্ষেতে প্রথাগত পুজো ছেড়ে বীজ বপন করেন। এই উৎসব গ্রামবাংলার সমবায়ভিত্তিক জীবনধারার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। 

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

পরিবেশ ও প্রকৃতির সঙ্গে যোগ

রোহিন উৎসব প্রকৃতিনির্ভর জীবনের এক অনন্য উদাহরণ। এই উৎসবের মাধ্যমে মাটির প্রতি শ্রদ্ধা প্রকাশ করা হয়। কৃষিজমির গুরুত্ব স্মরণ করা হয়। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সহাবস্থানের বার্তা দেওয়া হয়।পরিবেশবান্ধব জীবনযাপনের শিক্ষা মেলে। আজকের পরিবেশ সংকটের সময়ে এই উৎসবের তাৎপর্য আরও বেড়ে গেছে।Raise Your Concern About this Content

বর্তমান প্রেক্ষাপটে রোহিন উৎসব

আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির যুগেও জঙ্গলমহলের বহু গ্রামে রোহিন উৎসবের ঐতিহ্য অটুট রয়েছে। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সবকিছুতেই রয়েছে আধুনিকতার ছোঁয়া। কিন্তু তবুও গ্রাম বাংলার এই লোকউৎসব আজও মহা ধুমধামে সঙ্গে পালিত হয় জঙ্গলমহলে গ্রামে ,গ্রামে। পুরুলিয়ার কৃষিজীবি মানুষ যুগযুগ ধরে চলে আসা এই রোহিনী উৎসবের মধ্য দিয়ে গ্রাম বাংলার লোকসংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। যদিও যান্ত্রিক কৃষিকাজ, নগরায়ণ এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তনের কারণে কিছু আচার হারিয়ে যাচ্ছে, তবু স্থানীয় মানুষ এখনও এই উৎসবকে নিজেদের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ হিসেবে ধরে রেখেছেন। বর্তমানে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন ও গবেষকও এই লোকউৎসবকে সংরক্ষণ এবং প্রচারের উদ্যোগ নিচ্ছেন। তাই মোবাইল ও ইন্টারনেটের যুগেও ফিকে পড়েনি এই লোকউৎসব। মাদলের বোলে, ঝুমুরের সুরে আর প্রকৃতির আরাধনায় রহিন পরব যেন মনে করিয়ে দেয়, সভ্যতার আসল শিকড় লুকিয়ে আছে এই মাটির বুকেই।

রোহিন উৎসব দেখতে গেলে কোথায় থাকবেন পর্যটকেরা?

রোহিন উৎসব প্রত্যক্ষ করতে চাইলে জঙ্গলমহলের বিভিন্ন এলাকায় থাকা যায়। তারমধ্যে রয়েছে- পুরুলিয়া,অযোধ্যা পাহাড় পর্যটন কেন্দ্র,বাঘমুণ্ডি,বরন্তি, ঝাড়গ্রাম। 

ঝাড়গ্রাম

– ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ি পর্যটন কমপ্লেক্স
– ঝাড়গ্রাম শহরের বিভিন্ন হোটেল ও লজ

বাঁকুড়া

– মুকুটমণিপুর পর্যটন কেন্দ্র
– বিষ্ণুপুর শহরের হোটেল

পশ্চিম মেদিনীপুর

– গড়বেতা ও শালবনি সংলগ্ন পর্যটন আবাস
– বেলপাহাড়ি এলাকার হোমস্টে

তবে উৎসব মূলত গ্রামীণ এলাকায় পালিত হয়। তাই স্থানীয় প্রশাসন বা পর্যটন দফতরের সঙ্গে যোগাযোগ করে আগে থেকেই থাকার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা উচিত। বলা যায়, এই উৎসব দেখার জন্য থাকার কোন অসুবিধা নেই। 

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

পরিশেষে বলা যায়, রোহিন উৎসব জঙ্গলমহলের মাটি, মানুষ এবং কৃষিজীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা এক অমূল্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। কৃষি কাজের জন্য কৃষকেরা এই উৎসব পালন করে থাকেন। এই পরব মূলত কৃষি কাজের উপর নির্ভরশীল মানুষরাই করে থাকেন। এই দিন মা মনসার আরাধনা করা হয়। এই উৎসবে যদি বৃষ্টি হয় তাহলে ভীষণই শুভ বলে মনে করা হয়। আধুনিকতার প্রবল স্রোতের মধ্যেও এই উৎসব মনে করিয়ে দেয়—মানুষের অস্তিত্বের শিকড় আসলে মাটির গভীরেই প্রোথিত। বীজ বোনার সেই প্রাচীন মুহূর্তে কৃষকের যে প্রার্থনা ধ্বনিত হয়, তা শুধু ভালো ফসলের জন্য নয় প্রকৃতি ও মানুষের চিরন্তন সহাবস্থানেরও এক নিঃশব্দ অঙ্গীকার। রোহিন পরব শুধু একটি উৎসব নয়, এ আমাদের মাটি, মানুষ আর সংস্কৃতির এক সুন্দর মিলন। বাংলার গ্রাম, আদিবাসী সমাজের ঐতিহ্য, তাদের গান, নাচ আর আনন্দের মধ্যে লুকিয়ে আছে আমাদের নিজের শিকড়ের গল্প। তাই আজও গ্রাম বাংলায় পালিত হয়ে থাকে রোহিন উৎসব। 

তথ্যসূত্র

১. পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি প্রকাশিত লোকসংস্কৃতি বিষয়ক গ্রন্থ ও প্রবন্ধ।
২. লোকসংস্কৃতি ও আদিবাসী সংস্কৃতি কেন্দ্র-এর প্রকাশনা ও গবেষণাপত্র।
৩. পশ্চিমবঙ্গের লোকউৎসব এবং জঙ্গলমহলের লোকঐতিহ্য সম্পর্কিত গবেষণা।
৪. পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, ঝাড়গ্রাম ও পশ্চিম মেদিনীপুর অঞ্চলের প্রচলিত লোকবিশ্বাস, কৃষি-সংস্কৃতি ও মাঠসমীক্ষাভিত্তিক তথ্য।
৫. স্থানীয় কৃষিজীবী সমাজে প্রচলিত রোহিন পরব সংক্রান্ত মৌখিক ঐতিহ্য ও লোককথা।

পুষ্প উপত্যকা জাতীয় উদ্যান

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার্স – UNESCO WORLD HERITAGE SITE 

হিমালয়ের সুবিশাল পর্বতমালার পটভূমিকে সাক্ষী রেখে উত্তরাখন্ডের চামোলি জেলার  ৮৭ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে বছরের পর বছর  নিজের অস্তিত্ব জানান দিয়ে যাচ্ছে ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার্স। এটি UNESCO স্বীকৃত ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট এবং নন্দাদেবী বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভের দুটি মূল অঞ্চলের একটি। নন্দাদেবী বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভের একটি অংশ ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার্স, অপর একটি অংশ নন্দাদেবী ন্যাশনাল পার্ক। বছরের মাত্র ৪ মাস,  জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত  খোলা থাকে। বছরের বাকি সময় ঘন তুষারে ঢাকা থাকে এই জাতীয় উদ্যান।

কে আবিষ্কার করলেন ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার্স?

হিমালয়ের আড়ালে থাকায়, অতি দুর্গম এলাকা হওয়ায় লোকচক্ষুর আড়ালেই ছিল উত্তরাখন্ডের এই ফুলের উপত্যকা। বিশ্বের কাছেও প্রায় অজানাই ছিল। সালটা ১৯৩১, ব্রিটিশ পর্বতারোহী 

 ফ্র্যাঙ্ক এস. স্মাইথের নেতৃত্বে আরও দুই জন ব্রিটিশ পর্বতারোহী এরিক শিপটন এবং আর. এল. হোল্ডসওয়ার্থ মাউন্ট কামেট অভিযানে সফল হন। কামেট জয় করে ফেরার পথে রাস্তা হারিয়ে 

এই ফুলে ভরা উপত্যকার সন্ধান পান ৩ ব্রিটিশ পর্বতারোহী। এই এলাকার অপার সৌন্দর্য্যে মুগ্ধ হয়ে তাঁরা এই অঞ্চলের নাম দেন ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার্স। পরে স্মাইথ ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার্স, ওই নামেই একটি বইও রচনা করেন।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

১৯৩৭ সালের জুন মাসে আবার স্মাইথ রানিক্ষেত থেকে ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার্সের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন। তাঁর সঙ্গে যোগ দেন চারজন তিব্বতি নুরবু, তেওয়াং, ওয়াংদি এবং পসাং। সেই সময় তিনি নৈনিতাল হয়ে রানিক্ষেত, গরুর, গোয়ালদ্বাম, থারালি, দুংরি, সুবতাল, ঘাট, রামনি, সেমকার্ক, বিরাহী ভ্যালি, কালিয়াঘাট, ডাকওয়ানি, কুয়ারি পাস, জোশিমঠ থেকে ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার্সে যাত্রা করেন। সেখানে কিছুদিন বিশ্রাম করেন। পরে আশেপাশের  নীলগিরি পর্বত, রাতাবান, ব্ল্যাঙ্ক প্লাটো, মানা পিক, নীলকণ্ঠ এবং দুনাগিরির মতো শৃঙ্গগুলি আরোহণের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। ওই বছরেই সেপ্টেম্বর মাসে এডিনবার্গ বোটানিক্যাল গার্ডেনের জন্য তাঁর উদ্ভিদবিদ্যাসংক্রান্ত কাজ শেষ করতে আবার ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার্সে ফিরে আসেন স্মাইথ।

১৯৩৯ সালে UK-এর রয়্যাল বোটানিক গার্ডেনস, কিউ-র পক্ষ থেকে উদ্বিদবিদ লেডি জোয়ান মার্গারেট ফুল নিয়ে গবেষণার জন্য ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার্সে যান। ফুল সংগ্রহ করতে গিয়ে পাথুরে ঢাল বেয়ে হাঁটার সময় পা পিছলে পড়ে যান, সেখানে তাঁর মৃত্যু হয়। পরবর্তীকালে তাঁর বোন সেখানে সেই স্থানে লেডি জোয়ান মার্গারেটের উদ্দেশ্যে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করেন। ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার্স গেলে আপনি এখনও সেই স্মৃতিসৌধ চাক্ষুস করতে পারবেন। 

ভারতের ওয়ার্ল্ডলাইফ ইনস্টিটিউটের পক্ষ থেকে উদ্ভিবিদ অধ্যাপক চন্দ্রপ্রকাশ কালা ১৯৯৩ সাল থেকে থেকে প্রায় এক দশক ধরে এই উপত্যকার উদ্ভিদবৈচিত্র্য ও সংরক্ষণ নিয়ে গবেষণা করেন। তিনি এই জাতীয় উদ্যানে বেড়ে ওঠা ৫২০টি অ্যালপাইন উদ্ভিদের তালিকা তৈর করেন এবং দুটি গ্রন্থ রচনা করেন- “The Valley of Flowers – Myth and Reality” এবং “Ecology and Conservation of the Valley of Flowers National Park, Garhwal Himalaya”।

ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার্স যাওয়ার পথ

এ তো গেল ইতিহাসের কথা। তবে কীভাবে যাবেন ভ্য়ালি অফ ফ্লাওয়ার্স? যে কোনও নিকটবর্তী স্টেশন থেকে চলে যান হরিদ্বার। হরিদ্বারে সেদিন বিশ্রাম নিন, সন্ধ্যার দিকে হরিদ্বারের বাসস্ট্যান্ড থেকে বাসের সময় জেনে নিতে পারেন। পরের দিন ভোরবেলা হরিদ্বার থেকে বদ্রীনাথ যাওয়ার বাসে গোবিন্দঘাট নামুন। সেদিন রাতে গোবিন্দঘাটের গুরুদ্বারাতেই আপনাকে রাত কাটাতে হবে। যদিও সেখানে থাকার জন্য বেশ কিছু হোটেল রয়েছে। গুরুদ্বারার ঠিক পাশ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে অলকানন্দা। গুরুদ্বারায় জনপ্রতি ৫০০ টাকা মূল্যে আপনি থাকতে পারবেন। সেখানে লঙ্গরে খাওয়ার খেতে পারবেন। যেহেতু জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার্স খোলা থাকে। বর্ষার সময় হওয়ায় পাহাড়ি নদীর খরস্রোতা রূপই ধরা দেবে আপনার কাছে। শান্ত নদী হিসেবে পরিচিত অলকানন্দার এ রূপ ভয়াল। রাতে গুরুদ্বারা থেকে শুনতে পাবেন অলকানন্দার গগনচুম্বী গর্জন। 

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

বেশিরভাগ মানুষ সাধারণত গোবিন্দঘাট থেকে ট্রেক করে ঘাংগারিয়া যেতে পারেন। গোবিন্দঘাট থেকে পুলনা পর্যন্ত গাড়ি চলাচল করে। আপনারা ট্রেক করতে না চাইলে গাড়ি করে পুলনা গেলেন। গোবিন্দঘাট ও ঘাংঘারিয়ার মাঝপথে পুলনা হল প্রথম গ্রাম। গোবিন্দঘাট সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৫৫০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত, আর ঘাংঘারিয়া রয়েছে প্রায় ১০,২০০ ফুট উচ্চতায়। যারা ট্রেকিং করবেন না তারা পুলনা থেকে  পিঠ্ঠু (ওখানকার স্থানীয় কিছু ছেলে না নেপালি ছেলেরা পিঠে একটা ঝুরিতে মানুষ নিয়ে যান) অথবা খচ্চরের পিঠে চড়ে যেতে পারেন। এছাড়া গোবিন্দঘাট থেকে ঘাংঘারিয়া পর্যন্ত হেলিকপ্টার পরিষেবাও উপলব্ধ। গোবিন্দঘাট থেকে ঘাংঘারিয়া পর্যন্ত এই ট্রেকের মোট দূরত্ব প্রায় ১৪ কিলোমিটার। ট্রেকিং করে ঘাংগারিয়া পৌঁছতে ৭-৮ঘণ্টা সময় লাগবে। আপনারা ঘাংগারিয়া পৌঁছে ওখানে বেশ কিছু হোটেল রয়েছে সেখানে রাত্রিযাপন করতে পারেন। হোটেলে রুম ভাড়া ১৫০০-২০০০ এর মধ্যে। তবে ঘাংগারিয়া গুরুদ্বারেও রাত্রিযাপন করতে পারেন, সেখানে একদ্নের জন্য জনপ্রতি ৫০০ টাকা পড়বে। ঘাংগারিয়ার বেশ কিছু খাওয়ার দোকানও রয়েছে। তবে ঘাংগারিয়া গুরুদ্বারের খাবারও আপনি খেতে পারেন।

পরের দিন সকালে ঘাংগারিয়া থেকে ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার্সের উদ্দেশ্যে ট্রেক। ফ্যালি অফ ফ্লাওয়ার্স প্রবেশ মূল্য ২০০ টাকা, প্রবেশদ্বারের আগে ছোট্ট কাউন্টার সেখান থেকে টিকিট কেটে নিতে হবে। বিকেল ৫টার মধ্যে বন্ধ হয়ে যায় ভ্যালি, সকালে সেইমতো আপনাকে তৈরি হতে হবে। ঘাংগারিয়া থেকে ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার্সের দূরত্ব প্রায় ৫-৬ কিলোমিটার।

ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার্স অর্থাৎ ফুলের উপত্যকা, প্রবেশদ্বার থেকে জঙ্গল পেরিয়ে দেখবেন একটি নদী মাটি ভেদ করে বয়ে চলেছে, নাম পুষ্পবতী তবে নামের সঙ্গের এই নদীর কোনও মিল নেই। রাগে ফুঁসছে। নদী পেরিয়ে কিছুটা উঠতেই, চলার পথে পাশ দিয়ে চড়া খাড়াই যেখান থেকে পড়ে গেলে ঠিক কোথায় যাওয়া যায় তা কারোর জানা নেই। গোটা রাস্তায় কখনও নাম না জানা নদী পেরোতে হবে। কখনও দুপাশে সারি সারি ফুলের মাঝখান দিয়ে রাস্তা পেরিয়ে যেতে হবে। যেদিকে তাকাবেন সেদিকেই গগনচুম্বী পাহাড়। আকাশে পেঁজা পেঁজা তুলোর মতো মেঘ জড়ো হয়ে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। চলার পথে কখনও সূর্য ওই মেঘের আড়াল থেকে লুকোচুরি খেলবে। 

ফুল দেখে ভুলে থাকি………………

ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার্স ন্যাশনাল পার্কে প্রায় ৭০০ প্রজাতির ফুল ফোটে। বছরের কয়েকসপ্তাহেই ঝরে যায় ফুল। জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সমস্ত ভ্যালি লাখ লাখ কোটি কোটি ফুলে ভরে যায়।এই সৌন্দর্য্য পৃথিবীর কোথাও খুঁজে পাবে না কেউ। এখানে Blue Poppy, Doggy face flowers, Thyme, Cheerful Senecio, Cinquefoil, Cosmos flaunts, Wild Rose, Cobra Lily, Brahma Kamal, Lax Willowherb, Bog Star, Inula Grandiflora Grey stem spirea, Himalayan knotweed, Erigeron ইত্যাদি হাজার হাজার ফুল দেখতে পাওয়া যায় ভ্যালিতে। সেই ফুলের মধু খেতে উড়ে বেড়াচ্ছে শয়ে শয়ে মৌমাছি আর প্রজাপতি।Raise Your Concern About this Content

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

হেমকুণ্ড সাহিব- বিশ্বের সর্বোচ্চ গুরুদ্বারা

ঘাংগারিয়া থেকে যাওয়া যায় বিশ্বের সর্বোচ্চ গুরুদ্বারা  হেমকুণ্ড সাহিব। উত্তরাখণ্ডের গাড়ওয়াল হিমালয়ে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৪,৩২৯ মিটার (১৪,২০০ ফুট) উচ্চতায় অবস্থিত  হেমকুণ্ড সাহিব শিখদের পবিত্র তীর্থস্থান। ঘাংগারিয়া থেকে হেমকুণ্ড সাহিবের দূরত্ব প্রায় ৬-৭ কিলোমিটার। ঘাংঘাড়িয়া গুরুদ্বারা পেরিয়ে একটু যেতে বাঁদিকের রাস্তা ধরলে পৌঁছে যাবেন ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার্স এবং ডানদিকে যে রাস্তা উঠে গিয়েছে সেটা যাচ্ছে হেমকুণ্ড সাহিব। সাধারণত ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার্স বা হেমকুন্ড  যেতে গাইড লাগে না আপনারা গ্রুপ বা সোলো ট্রিপেই যেতে পারেন।হেমকুণ্ড যাওয়ার পথে পাহাড়ের গায়ে সারি সারি ব্রহ্মকমল ফুটে থাকে যা দেখে অপার্থিব বলে মনে হয়। 

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

দু’দিনের জীবনের কর্মব্যস্ততায় যখন হাঁসফাঁস করবে তখন এই সব যান্ত্রিকতা থেকে দূরে বহু দূরে শান্তি খুঁজতে আপনি পাহাড়ি পথে হারিয়ে যেতে চাইলে আপনার গন্তব্য অবশ্যই হওয়া উচিত ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার্স বা হেমকুন্ড সাহিব। এই চলার পথে আপনার সঙ্গী হবে পাহাড়ি নদী অলকানন্দা-পুষ্পবতী, আবার কখনও সাথ দেবে ব্রক্ষকমল। আপনাকে রক্ষা করবে গগনচুম্বী পাহাড়কূল। আপনি সেখান থেকে ফিরে আসবেন ব্যস্ত শহরে। কিন্তু আপনার মন পড়ে থাকবে সেই ফুলের বনে। জেনে রাখুন জিন্দেগি বড়ি হোনি চাহিয়ে, লম্বি নেহি।

তথ্যসূত্র

একটি গাঁদা (গেন্দা) ফুলের জীবন গাঁথা

দুখু মিয়াঁ সাহেব (কাজী নজরুল ইসলাম) এই গানে গেয়ে যেন বোঝাতে চেয়েছেন আমার প্রতি মেয়েদের ভালবাসার কথা। এভাবেই চলছে যুগের পর যুগ। আর পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তোমরাও কেন জানি বাঁচিয়ে রেখে চলেছো আমার অস্তিত্ব। বহু বছর পর, শুধু বাংলার জগতে নয়, সুদূর মুম্বাইয়ের হিন্দি আধুনিক গানেও শোনা গেল একই রকম কথা। বাদশার গলায় বেজে উঠল “বড়লোকের বেটি লো লম্বা লম্বা চুল এমন মাথায় বেঁধে দেবো লাল গেন্দা ফুল”। চলো তাহলে আজকে জমজমাট গল্প হোক আমার এই জীবন গাঁথা নিয়ে। 

আচ্ছা! জানতে কি চাও আমার নাম আমার ঘর কোথায়? শুনবে তো? তাহলে বলি শোন তোমরা তো জানোই আমাকে গাঁদা নামে সবাই চেনে, কেউবা ডাকে গেঁদা বা গেন্দা বলে। কিন্তু তোমাদের মতো আমারও আরো নাম আছে।

গাঁদা ফুলের বৈজ্ঞানিক নাম হল ট্যাজিটিজ এরেকটা।(Tagetes erecta)। ট্রাজিটিক গনের গাছগুলো প্রধানত দক্ষিণ আমেরিকার দক্ষিণ অংশে দেখা যায়। গাঁদা ফুল হলো বর্ষজীবী গাছ।এদের বর্ষজীবী বলা হয় কারণ এরা কেবল এক বছরের জন্য থাকে। এদের উচ্চতা ১থেকে ৫ ফুট।এরা মূলত রৌদ্রজ্জ্বল এলাকায় জন্মায়।বুঝলে তো আমার পরিচয় ?

 এবার বলি আমার বিশ্ব জুড়া প্রচার কি করে হলো। গেন্দা ফুল বা মেরিগোল্ড (Tagetes) নামটি এসেছে এট্রাস্কান জ্ঞানের দেবতা ‘টাগেস’ (Tages)–এর নাম থেকে। ধারণা করা হয়, ‘মেরিগোল্ড’ নামটি এসেছে মাদার মেরির নামানুসারে “Mary’s Gold” শব্দগুচ্ছ থেকে। গাঁদা ফুলের আদি নিবাস মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকা বিশেষ করে মেক্সিকোঅঞ্চল। ১৬ শতকে স্প্যানিশ নাবিক ও অভিযাত্রীরা নতুন পৃথিবী আবিষ্কারের সময় গাঁদা ফুল ইউরোপে নিয়ে আসেন। ইউরোপে রং ও সহজ চাষের গুণে জনপ্রিয়তা বাড়ে। তারপর পর্তুগিজ বণিকরা গাঁদা ফুল ভারতে নিয়ে আসে। সম্ভবত গোয়া ও উপকূলবর্তী অঞ্চল দিয়ে। 

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

আমার কিন্তু অনেক রকমভেদ রয়েছে ।বলছি শুন সে কথা।গাঁদা ফুল  প্রধানত দুই প্রজাতির হলেও রং আকার ব্যবহার অনুযায়ী আমার নানা রকম ভেদ আছে। 

আফ্রিকান গাঁদা ফুলের কথাই ধরো :  

  • ফুল আকারে বড় ও গোল 
  • রং হলুদ ও গাঢ় কমলা 
  • গাছের উচ্চতা বেশি 
  • পূজা মন্দিরসজ্জা ও মালা বানাতে বেশি ব্যবহৃত 

আবার যেমন রয়েছে ফরাসি গাঁদা :

  • এই ফুলের আকার ছোট 
  • হলুদ কমলা লালচে বাদামী মিশ্রিত রং 
  • গাছ খাটো ও ধোপালো 
  • বাগান সাজাতে ব্যবহৃত হয় 

ডাবল গাঁদা :

  • অনেক অনেক পাপড়ি 
  • ফুল ঘন ও সুন্দর 
  • পূজা সাজসজ্জা জনপ্রিয় 

ডাবল গাদা থাকবে সিঙ্গেল গাঁদা থাকবে না?  রয়েছে সিঙ্গেল গাঁদাও

  • সিঙ্গেল গাঁদার বৈশিষ্ট্য এক স্তরের পাপড়ি রয়েছে 
  • দেখতে সহজ ও হালকা 
  • বীজ উৎপাদনে উপযোগী 
  • দেশীয় /স্থানীয় গাঁদা
  • অঞ্চল ভেদে আলাদা নাম ও রূপ 
  • চাষ সহজ ও টেকসই 
  • গ্রামীন এলাকায় বেশি দেখা যায় .

জানো কি আমার উজ্জ্বল রঙের কারন কি? তাহলে বলে দেই গাঁদা ফুলে রয়েছে ক্যারোটিনয়েড। যার ফলে এই রঞ্জকই হলুদ কমলা গাড় সোনালী রং দেয়। এর মধ্যে লুটিন ও জিয়াজ্যান্থিন গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে গাছের যত রোদ পায়, ক্যারোটিনয়েড তৈরি হয় তত বেশি। মাটির গুণ ও সূর্যি মামার ভরপুর এল পেলে আমি নিজের রূপের সৌন্দর্য দেখাতে আরও উৎফুল হই। 

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

বাংলা সংস্কৃতির সাথে রয়েছে আমার এক বিশেষ সম্পর্ক। পুজো বিবাহ অন্নপ্রাশন উপনয়ন,গৃহ প্রবেশ  যাই হোক না কেন মন্ডপ ও বাড়ি সাজাতে আমার জুড়ি মেলা ভার। আমার উজ্জ্বল রং কে অশুভ শক্তি নাশক ও শুভ শক্তির প্রতীক ধরা হয়। লোকাচার ও গ্রামীণ সংস্কৃতিতে গাঁদা ফুল শুভ শক্তির আহ্বায়ক বলে বিশ্বাস করা হয়। 

এছাড়া গানে গানে আমাকে পাবে তোমরা। কিভাবে এতো পরিচিতি জানতে ইচ্ছে হচ্ছে তো? হিংসে করোনা, আমার নাম নিয়ে বহু গান হয়েছে জানো?
যেমন ধরো,”বড়লোকের বেটি লো” এই গানটি সবারই জানা। গানটির প্রথম লিরিক্স ও সুর দিয়েছিলেন বাংলার এক লোকশিল্পী রতন কাহার। পরবর্তী সময়ে এই গান বিশেষভাবে প্রচার পায় পপ সিঙ্গার বাদশার হিন্দি রিমিক্সে। আজ  এই “বড়লোকের বেটি লো “গানটি বাঙালি অবাঙালি সবার মুখেই শোনা যায়। এখানে প্রেমের প্রতীক আমি।লোক কথা ও গানে গাঁদা ফুল মানে নীরব কিন্তু গভীর প্রেম। যে প্রেমে অপেক্ষা ও নিষ্ঠা রয়েছে তাই এই ফুলের সাজ মানে এক সম্পর্কের শক্ত উষ্ণ বিশ্বাসের প্রেমের প্রতীক। 

এছাড়াও চলচ্চিত্র জগতে স্থান রয়েছে আমার আধিপত্য।বিশেষ করে ভারতবর্ষের যতগুলো ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি রয়েছে প্রায় সবগুলোতেই এই আমাকে সাজসজ্জায় ব্যবহার করতে দেখা যায়। তাছাড়া হিন্দি সিনেমায় জায়গা করে নিয়েছে মেরিগোল দিয়ে সিনেমাও। শুধু কি তাই! গদর সিনেমার সেটে যে কতবার আমার ব্যবহার হয়েছে, ছবিটি দেখলে যা বারবার চোখে পড়ে। ‘শ্বশুরাল গেন্দা ফুল’ এই কথাটা প্রায়ই শোনা যায়। সেখানেও কিন্তু এই বিশেষ ফুলটির নাম এসেছে। Raise Your Concern About this Content

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

আমার জন্য অর্থনৈতিক সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে।খুলে গিয়েছে কর্মসংস্থান ও গ্রামীণ অর্থনৈতিক উন্নতির পথ। ভারতের বিভিন্ন জায়গা তথা বিদেশেও অনুকূল পরিবেশে গাঁদা ফুলের চাষ করে বহু লোকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে। তার ফলে বেড়েছে অর্থনৈতিক উন্নতি। এই ফুল চাষ করা খুব সহজ। তাই চাষিরা খুব অল্প খরচে এই ফুল চাষ করে ওটা বাণিজ্যিকরণ করে আর্থিকভাবে সচ্ছল হতে সমর্থ্য হচ্ছে। 

আয়ুর্বেদ ও লোকচিকিৎসায় প্রাচীন কাল থেকে আমাকে ব্যবহার হয়।কাটা ছেঁড়া, পোড়া, ক্ষত  সহ বিভিন্ন ত্বক জনিত সমস্যায় এই ফুলের গুন অপরিসীম। তাছাড়া আমার মধ্যে থাকা লুটিন  চোখের দৃষ্টিশক্তি ভালো রাখে, চোখের ক্লান্তি কমায় তার কারনে এটি কে তো সাপ্লিমেন্ট হিসেবে ব্যবহার করা হয়। গাঁদা ফুলের নানা রকম ঔষধি গুন থাকার কারণে বিশ্বজুড়া আজ এই ফুলের জয়জয়কার। তৈরি হচ্ছে নানা রকম রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর ঔষধ কীটনাশক ওষুধ ও।এই ফুলকে তাই প্রাকৃতিক ওষুধের ভান্ডার বলা হয়। 

গাছের পাতা ফুল কুড়ি সবকিছুই উপযোগী হওয়ার আমি {গাঁদা ফুল}  জীবন থেকে মৃত্যু পর্যন্ত প্রকৃতি ও মানুষের কাছে আশীর্বাদস্বরূপ। আমার জীবনগাঁথা তো শুনলে,এখন থেকে আমাকে ছিড়ে ফেলে দিতে একটু অন্তত আমার কথা ভেবে দেখো।তোমরা মানুষরা তো আমাকে ছাড়া পারবে না,তবে কেনো এতো কষ্ট দাও আমায়? 

  1. এনসাইক্লোপেডিয়া
  2. গাঁদা ফুল চাষ
  3. Types of Ganda Phool