Home Blog Page 5

অবহেলিত সৌন্দর্যের নিঃশব্দ গল্প :

ঘেটো ফুল কি?

ঘেটো ফুল বলতে সাধারণত এমন সব বুনো,অবহেলিত ও নিজে থেকে জন্ম নেওয়া ফুলকে বোঝায় যেগুলো মানুষের যত্ন ছাড়াই প্রকৃতির কোলে বড় হয়ে ওঠে। এই গাছগুলো কোন নির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক নাম না হলেও অনেকগুলোর বৈজ্ঞানিক নাম রয়েছে। এটি একটি লোকজ বা আঞ্চলিক নাম, যা গ্রাম বাংলা ও সিলেট অঞ্চলে বেশি ব্যবহৃত হয়। ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন রাজ্য যেমন আসাম ত্রিপুরায় ঘেটো ফুল দেখা যায়। বিশেষ করে ফাল্গুন মাস থেকে এই ফুলগুলো ফুটতে শুরু করে। খালি জায়গা রাস্তার পাশ ঝোপজার বা পতিত জমিতে অথবা কোন নদীর ধারে বা বনাঞ্চলে এই  ফুলগুলো দেখা যায়। ঘেটু ফুলকে অনেকে ভাট ফুল হিসাবে চিনে থাকে। যেহেতু ফাল্গুন মাসে বিভিন্ন চর্ম রোগের উপদ্রব দেখা যায় তাই গ্রাম বাংলায় লোকেরা সেই রোগ থেকে নিরাময়ের জন্য ঘেঁটু ফুল দিয়ে ঘেটু ঠাকুরের পূজা অর্চনা করে থাকেন। আচ্ছা সে গল্পে পড়ে যাচ্ছি। আগে পরিচয় করিনি ঘৃত ফুল নিয়ে। আজ আমরা যে ঘেটু ফুলের গল্প বলছি তার নাম ভন্টাকি বা ভাট চৈতঘাড়া ফুল।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

আচ্ছা আগেই বলিনেই ভাট ফুলের আদি নিবাস ভারত বর্ষ, বাংলাদেশ ও মায়ানমার অঞ্চলে। আর্য যুগ থেকে এই ফুল অবহেলায় বড় হলেও পূজায় ব্যবহৃত হয়। এটি একটি গুল্ম জাতীয় বহু বর্ষজীবী সপুষ্পক উদ্ভিদ যার বৈজ্ঞানিক নাম  “Clerodendrum viscosum.”

ভাটগাছের প্রধান কান্ড সোজাভাবে দন্ডায়মান। সাধারণত দুই থেকে ৪ মিটার লম্বা হয়। পাতাগুলো দেখতে কিছুটা পান পাতার আকৃতি খুব খসখসে। ডালের শীর্ষ দেশের পুষ্প দন্ডের ফুল ফোটে। সাদা আর বেগুনির রং এর মিশ্রিত এই ফুলের গন্ধ খুবই মিষ্টি। ফুল ফুটার পর মৌমাছিরা ঘাট ফুলের মধু সংগ্রহ করতে আসে। 

অবহেলিত এই ফুলের উল্লেখ পাওয়া যায় কবি জীবনানন্দ দাশের একটি কবিতায়ও। সেখানে তিনি লিখেছেন 

“ভাঁট আঁশ শ্যাওড়ার বন

বাতাসে কি কথা কয় বুঝি নাকো, বুঝি নাকো চিল কেন কাঁদে;

পৃথিবীর কোনো পথে দেখি নাই আমি, হায়, এমন বিজন। “

বোঝাই যাচ্ছে বাংলাদেশ তথা ভারতের বাঙালি লোকের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত এই ফুল। সেই  আর্য সময় থেকে এই ফুল  গ্রাম বাংলার খুব পরিচিত একটা অংশ। 

ফুলটি শুধু যে সৌন্দর্যের জন্য সবার কাছে প্রিয় তা কিন্তু নয়। এর ঔষধি গুনও রয়েছে। এতে প্রচুর পরিমাণে ফ্ল্যাভোনয়েড থাকে।ফ্ল্যাভোনয়েড ক্যান্সার দমনে সহায়ক। এছাড়া কৃমি চুলকানি কোলেস্টেরল ব্লাড সুগার সহ বিভিন্ন রোগের এক প্রাকৃতিক ঔষুধী।

ব্যবহার :

ভাটগাছ ঔষধি গুনসম্পন্ন উদ্ভিদ হওয়ায় এর পাতার রস শিশুর জ্বর দূর করে বলে গ্রাম বাংলার এটি খুব প্রচলিত। 

ঘেঁটুপূজা / সিলেটি দের ঘাট বাধা :

পশ্চিমবঙ্গের ২৪ পরগনা হাওড়া বাঁকুড়া জেলায় বাঙালি হিন্দু সমাজে সেতু পূজা হয়ে থাকে। প্রচলিত  আছে ঘেঁটু বা ঘন্টা কর্ণ হলেন শিবের এক অনুচর। বাংলার জনসমাজে কল্পিত ঘৃণার্হ নামের দেবতা হলেন চর্ম রোগের দেবতা। তিনি আবার শিবের অনুচর এবং তীব্র হরি বিদ্বেষী। মঙ্গল দেবতা বিষ্ণুর বিপরীতে এই দেবতার অবস্থান অনেকটা কার্তিকী অমাবস্যার অনুষ্ঠিত অলক্ষী পূজার মত। বসন্তকালে খোস পাঁচড়া বারবার অন্তত দেখা যায় আর সেজন্য এই কাল্পনিক অশুভ দেবতাকে মেরে  বিদায় জানানো হয়। পূজার অন্যতম উপকরণ ঘেঁটু ফুল বা ভাঁট ফুল থেকে দেবতার এরূপ নাম হয়েছে বলে যুগ যুগ ধরে মেনে আসছে। এই দেবতা বিষ্ণুবিদ্বেষ হেতু বিষ্ণুর নাম যেন তার কানে না যায় সেজন্য দোকানের পাশে সর্বদা ঘন্টা ঝুলিয়ে রাখেন তাই এর আরেক নাম “ঘন্টা কর্ণ “

আচ্ছা এবার বলি এই পূজন নিয়ম। প্রতিবছর ফাগুন মাসের সংক্রান্তিতে এই পুজো অনুষ্ঠিত হয়। এই পুজোর জন্য আলাদা করে কোন পুরোহিত প্রয়োজন হয় না। গৃহস্থ মহিলারা এ পূজা করতে পারে। ঘেটো পূজা পশ্চিমবাংলার বিভিন্ন জায়গায় প্রচলিত হলেও উত্তর পূর্বাঞ্চলে খুব একটা ঘেটু বুঝার প্রচলন নেই।উত্তর পূর্বাঞ্চলের ঘেটু ফুল একই দিনে অন্যভাবে ব্যবহৃত হয়। এবং পূজার বিধিও আলাদা। 

ঘেঁটু পূজা :

আগেই বলেছি ফাগুন মাসের সংক্রান্তি তিথিতে এই ঘেট পূজা অনুষ্ঠিত হয়। পূজার জন্য লাগে মুড়ি ভাজার পুরনো ঝোল কালি মাখা মাটির খোলা, তেল হলুদে ব্যবহার্য ছোট বস্ত্র খন্ড তিনটি করি ছোট ছোট তিনটি গোবর দিয়ে পাকালো পিণ্ড ঘেটুফুল সিঁদুর ধান ও দুর্বা ঘাস। 

প্রথমে ব্রতিনীরা এল চুলে বসে হাতে মাটির খোলা নি কোন জায়গায় বসিয়ে দেন। তার উপরে তিনটি গোবরের পিণ্ড লাগিয়ে সেগুলো কড়ি, সিঁদুর,ঘেটু ফুল দিয়ে  সাজানো হয় । খোলার উপর কাপড়ের টুকরোটি বিছিয়ে দেওয়া হয় বাড়ির সামনে উঠোনে বা একটু দূরে এই রাস্তার তিন মাথায় চার মাথার ধারে ভিড়ের মাঝে এটি সম্পূর্ণ হয়। সে সময় ঘেটু ফুলকে নিয়ে বিভিন্ন ছড়া বলা হয়। পূজার শেষে অল্প বয়সী ছেলেরা মোটা বাঁশের লাঠি দিয়ে খোলাটা ভেঙ্গে দিয়ে হরি বিদ্দেশি ঘেটো দেবতাকে অপমান করে। তারপর দৌড়ে পুকুরের জলে হাত পা ধুয়ে আসে যাতে কোন চর্মরোগ না হয়। এরপর মহিলারা ওই হলুদ ও তেল মাখানো পুজোতে ব্যবহৃত বাচ্চাদের চোখে বুলিয়ে দেয় ও খোলার ঝুলকাল কাজলের মতন পরিয়ে দেয় যেন। এরপর দেওয়া হয় ঘেটু ঢাকুর কে বিদায়। হরিনাম সংকীর্তন এর মাধ্যমে এই হেতু ঠাকুরকে বিদায় জানানো হয়। সন্ধ্যা বেলা ছোট ছেলেরা রঙিন কাগজ ও কঞ্চি দিয়ে ছোট্ট ডুলি বানিয়ে কুড়িয়ে পাওয়া ঘেটুফুল ও প্রদীপ দিয়ে ঘেটু ঠাকুরকে সাজিয়ে কাঁধে করে বাড়ি বাড়ি ঘুরে এবং ঘেটুর গান গেয়ে চাল পয়সা ভিক্ষা করে।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

এ তো গেল পশ্চিমবঙ্গের কথা। এবার আসি পূর্ববঙ্গ তথা উত্তর-পূর্ব ভারতের বাঙালি প্রধান এলাকাগুলিতে। যেহেতু ঘেটুফুল সিলেটের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত তাই ধরিয়ে নিতে পারেন উত্তর-পূর্ব ভারতের সিলেটি প্রধান বাঙালি যেখানে রয়েছে সেখানে ঘেটুফুল আজও পূজিত হয়। চৈত্র সংক্রান্তির দিন  গৃহস্থের বাড়ি ও গেইটে ঘেটু ফুলকে গোবরের দলার উপর দিয়ে অপ- শক্তিকে বাড়ি আসা থেকে রক্ষা করা হয়.।এছাড়াও দেবাদিদেব মহাদেব বনে জঙ্গলের কুড়িয়ে পাওয়া ফুল দিয়ে পূজিত হন বলে দেবাদিদেব মহাদেব কেও এই ফুল অর্পণ করা হয়। Raise Your Concern About this Content

এ তো গেল এক ঘেঁটু ফুলের গল্প। যে ফুল অবহেলিত যার সৌরভ চারিদিকে ছড়ালেও আজ ও সে বনে জঙ্গলে অবহেলায় জীবন কাটায়। আপনারা নিশ্চয়ই এ ঘেটুফুল দেখে থাকবেন যারা দেখেননি একবার তার গল্প গাথা পড়ে আর পরিচয় জেনে তাকে আপন করে ঘরের শোভা বাড়াতেও কাজে লাগাতে পারবেন। প্রকৃতির এই সৃষ্টি যেন বুঝিয়ে দেয়  সবাই অবহেলিত মানেই তার কোন দোষ যে থাকবে তা কিন্তু নয় সে অনেক সময় পরিস্থিতির শিকার কখনো বা পরিচিতির অভাবের কারণে সে অবহেলিত। 

যেহেতু চৈত্র মাস তাই এই ঘেঁটোফুলের নাম না নিলে বসন্ত যেন অপূর্ণই থেকে যাবে। যে ফুল প্রকৃতিকে সুন্দর করে তুলেছে মানুষের মনে তার গন্ধে আনন্দ ভরে দিয়েছে সে যেন সবার কাছে পরিচিত হয় যে উদ্দেশ্যেই আমার এই লেখা। গ্রাম বাংলার অনেক পরিচিত ফুল ফল রয়েছে যা সবাই জানেন না বা চেনেন না। আমাদের এই “বিশ্ববাংলা হাব ” এর মূল চেষ্টাই হল সেইসব অচেনা জিনিস যা বাংলা ও বাঙালির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত তাদের পরিচয় পরিয়ে দেওয়া। লেখাটি ভালো লাগলে নিশ্চয়ই জানাবেন। 

তথ্য সূএ:

উইকিপিডিয়া

হাজার বছর পরও শ্রীরামচন্দ্র কেনো এশিয়াবাসীর সর্বাধিক জনপ্ৰিয় চরিত্র?

হাজার বছর পেরিয়েও আজ ভারতবর্ষ তথা দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় তিনি প্রতি ভক্ত মনে পূজিত। শ্রীরামচন্দ্র যেন বিগ্রহে প্রতিষ্ঠিত কেবল পূজিত মূর্তি নন, ন্যায় পরায়ণ, সত্য প্রতিষ্ঠাতা, প্রজা বৎসল এক আদর্শ মর্যাদা পুরুষোত্তম। শ্রীরাম তাই আজও এশিয়াবাসীর এক মহাপ্ৰিয় চরিত্র – যার প্রতিচ্ছবি জয় শ্রীরাম ধ্বনির মাধ্যমে জন-সাধারণের মধ্যের আবেগ উচ্ছাসে প্রতিফলিত হয়। রামনবমী, দীপাবলি তে উচ্ছাসিত মানুষের উদযাপন সেই সত্যই যেন প্রকাশিত করে।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

জন্মবৃত্যান্ত -তিথি নক্ষত্র ও স্থান

খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতাব্দীতে চৈত্র মাসের শুক্লপক্ষে নবমী তিথিতে পুনর্বসু নক্ষত্রে  মাতা কৌশল্যার গর্ভে জন্ম নিলেন শ্রীরাম। ইক্ষাকু বংশের রাজা দশরথ এর জ্যেষ্ঠ পুত্র শ্রী রাম পৃথিবীর পাপ ও রাক্ষস কুলের বিনাশ করে ধর্ম রাজ্য স্থাপন করার জন্য জন্মগ্রহণ করেন। দেবতাদের প্রার্থনায় স্বয়ংবিষ্ণু রাম রূপে ধরে এসেছিলেন। কুলগুরু বশিষ্ঠ মুনী  যখন নামকরণের দায়িত্ব ভার নিলেন তখন রাম লক্ষণ ভরত ও শত্রুঘ্ন এই চার পুত্রের নামকরণের পর পিতা দশরথ বশিষ্ঠ মুনীর কাছে এর অর্থ জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, রাম শব্দ ক্ষুদ্র হলেও ব্যাপ্তি অসীম। রামের রা  শব্দটি এসেছে  নমো নারায়ণায় নমঃ মন্ত্র থেকে । রা বাদ  দিলে নমো নায়নায় অর্থাৎ রূপ রসাদী বিষয় কে নমস্কার করা হয়  যার অর্থ সম্পূর্ণ বিপরীত হয়ে যায়। তেমন ম শব্দ ওঁ নম শিবায় থেকে আসে যার থেকে ম বাদ দিলে ন শিবায় -মানে অকল্যাণকর বোঝায়। সুতরাং নমো নারায়ণায় নমোঃ ও ওঁ নমঃ শিবায় এই দুই মন্ত্র রাম নামের প্রাণ স্বরূপ। তাই রাম নাম  জপে জীব মুক্তি লাভ করে। 

রামচন্দ্র কে নিয়ে ভারতের সংকৃতি গড়ে উঠেছে। তাঁর চরিত্র শৌর্য বীর্য ক্ষমা পিতৃভক্তি ভাতৃপ্রেম প্রজানুরাগ ধর্মপালনে সদা ব্রতী থাকার কারণে তিনি আজও আমাদের এতো প্রিয়। 

ভারতবর্ষ নেপাল শ্রীলংকা থাইল্যান্ড কম্বোডিয়া ইন্দোনেশিয়া সহ গোটা দক্ষিন পূর্ব এশিয়ায় শ্রীরামের জনপ্রিয়তা লক্ষ্য করা যায়। শুধু তাই নয়- চৈনিক সিংহলী তিব্বতী খোটানি ব্রম্ভদেশ জাপানি ফিলিপিন লাওসের মঙ্গোলিয়া ও সাইবেরিয়া ভাষাতেও রামায়ণ প্রসঙ্গ আছে। তার কারণ রাম ও রামায়ণ কাহিনী এখানে সংস্কৃতির সাথে ওতো প্রোত ভাবে জড়িত। 

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

শ্রীলংকায় মাতা সীতাকে যখন রাবন অপহরণ করে নিয়ে যায়, তখন তাঁকে উদ্ধার করতে শ্রীরাম  হনূমান কুলের সাহায্যে সমুদ্রের ওপর একটি সেতু নির্মাণ করা হয়।ভারতের তামিলনাড়ুর রামেশ্বরম থেকে শ্রীলংকার মান্নার দ্বীপ পর্যন্ত সমুদ্রের ওপর চুনাপাথরের সেতুই সেই রামসেতু। শ্রীলংকায় বহু স্থান রামায়ণের বহু ঘটনার সাক্ষি।  তীরুকেতেশ্বরম – এর লোককথা অনুযায়ী রামচন্দ্র এখানে শিবলিঙ্গ স্থাপন করেছিলেন। রাবন হত্যার পর রামেশ্বরমেও  শিব মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন যা আজও পূজিত হয়।সীতা এলিয়া ও রামফলসে মনে করা হয় মাতা সীতা বন্দিনী ছিলেন। বর্তমানে সেখানেসীতা আম্মান মন্দির প্রতিষ্ঠিত। এখানে রামের চরণ চিহ্ন আছে বলে বিশ্বাস করা হয়। নীল-ওয়ারী স্থানে শ্রীরাম তীর মেরে জল বের করেছিলেন বলে জানা যায়।গায়ত্রী পিডুম এ রাবন পুত্রমেঘনাদ শিবের আরাধনা করে অতিপ্রাকৃত ক্ষমতার অধিকারী হয়েছিলেন বলে জানা যায়। 

থাইল্যান্ড এ রামায়নের স্থানীয় নাম রামকিয়েন যা জাতীয় মহাকাব্য হিসাবে পরিচিত। থাই রাজারা নিজেদের বিষ্ণুর অবতার শ্রীরামের বংশধর বলে মনে করেন তাই তাদের নামের সাথে রাম যুক্ত করা হয়। আয়ুধ্যা বলে থাইল্যান্ড এ একটি প্রাচীন শহর যা ভারোতের অযোধ্যার নাম এ নামাঙ্কিত। বৌদ্ধ প্রধান দেশ হলেও শ্রীরামের পূজা গভীর শ্রদ্ধার সাথে এখানে পালন করা হয়। Raise Your Concern About this Content

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

ইন্দোনেশিয়ায় তাদের সংস্কৃতির মূল অঙ্গ বলে পরিচিত রামায়ণ। যা ওয়ায়াং অরেঙ নাম পরিচিত। ইন্দোনেশিয়ার বিখ্যাত প্রামবানান হিন্দু মন্দিরে রামায়ণ উৎসব অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। এটি মূলত মুসলিম প্রধান দেশ হলেও রাম ও রামায়ণ সমান ভাবে জনপ্রিয়। সুতরাং ধর্মীয় সীমানা ছাড়িয়ে রামায়ণ এখানেও একাত্মতার প্রতীক হয়ে ওঠে। 

কম্বোডিয়ায় রামায়ণ রিয়ামকার নামে পরিচিত। যেখানে আঙ্কোরভাটের মতো সুপ্রসিদ্ধ এশিয়ার সব থেকে বড় হিন্দু মন্দির প্রতিষ্ঠিত আছে । 

শ্রীরামচন্দ্রের ধর্ম ছিল প্রজা পালন – যা আজকের সময়ে পৃথিবীর সব শাসকদের কাছে মূল্যবান শিক্ষা। তিনি সর্বস্ব ত্যাগ করে সর্বস্বার্থ বিসর্জন দিয়ে তা পালন করেছেন। মানব রূপে তিনি মর্ত্যে লীলা করেছেন মাত্র ঊনসত্তর বছর। কিন্তু এই সময় টুকুর মধ্যেই তিনি দেখিয়ে দিয়ে গেছেন কিভাবে এক রাজা কে সত্যনিষ্ঠ হতে হয়, ন্যায় ও ধর্ম রক্ষার  কেনো প্রয়োজন, অধর্ম কে কিভাবে নাশ করতে জানতে হয়, প্রজার মঙ্গলের জন্য এক রাজা কে কতটা নিঃস্বার্থ পরায়ণ হতে হয় এবং সর্বোপরি কিভাবে রাজ্যে সুশাসন ফিরিয়ে আনা যায়। বর্তমান সময়ে শ্রীরাম চরিত্র ও তার আদর্শ ভবিষ্যতের পাথেয় । হাজার হাজার বছর পরেও তাই শ্রীরামচন্দ্র এখনো এতো জনপ্রিয়।

হুইস্লিং ভিলেজ (মেঘালয়, উত্তর পূর্বাঞ্চল, ভারত)

হুইসলিং ভিলেজ এর পরিচিত 

হুইস্লিং ভিলেজ  বা শিস দেওয়া গ্রাম বলতে মূলত বিশ্বের কাছে একটি গ্রামে পরিচিত। এটি হল ভারতের মেঘালয় রাজ্যের পূর্ব খাসি হিল্স জেলার কংথং গ্রাম। ২০১১ জনগণনা অনুযায়ী এই গ্রামের লোকসংখ্যা ৫৬৭ জন।যার মধ্যে ২৭৫জন পুরুষ ও ২৯২জন মহিলা রয়েছেন।১০৯ টি পরিবার রয়েছে। ঘুরে দেখলে আপনারা বুঝতেই পারবেন এই জায়গার লোকের না সুরে সুরে কথা বলে। শিস এর আওয়াজ বের করে একে অপরকে মনের কথা বলে। এ যেন এক সুরেলা গ্রাম। 

চলুন আলোচনা করি এই গ্রামের বৈশিষ্ট্য নিয়ে 

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

জিঙরোয়াই ইয়াওবে(Jingrwai lawbei):

এখানে প্রতিটি শিশুরজন্মের পর তার মা তাকে একটি নির্দিষ্ট সুর বা শিস উপহার দেন,যা সারা জীবন সেই ব্যক্তির পরিচয় বা নাম হিসাবে ব্যবহৃত হয়। এই সুরটি মূলত একটি ঘুম পাড়ানি গান বা থেকে নেওয়া হয়। 

দুই ধরনের সুর:

এখানে প্রতিটি মানুষের জন্য দুটি সুর থাকে। একটি হলো বড় সুর যা ৩০ সেকেন্ডের হয় আরেকটি ছোট সুর যা ১০ সেকেন্ডের।সাধারণত বাড়ির ভেতরে ছোট সুর ব্যবহৃত হয় এবং পাহাড়ে  বা  বনে ডাকার জন্য বড় সুরটি ব্যবহৃত হয়। 

মাতৃতান্ত্রিক সংস্কৃতি :

এই ঐতিহ্যটি খাসি উপজাতির মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার অংশ। এখানে নাম বা সুর দেওয়ার সম্পূর্ণ অধিকার শুধুমাত্র মায়ের রয়েছে। তাই মায়েরাই বেছে নেবেন তাদের সন্তানের নামের সুর কি হবে। 

শিস দেওয়ার উদ্দেশ্য :

এই ঐতিহ্য  প্রকৃতির সাথে গভীর সংযোগের জন্য করা হয়েছে। ছেলেমেয়েরা কাজের জন্য ও নিত্যনৈমিত্ত কাজের জন্য বনে জঙ্গলে ঘোরাফেরা করে। আর তাই  উপত্যকা জুড়ে যোগাযোগের ব্যবস্থা এই ঐতিহ্যের অংশ । 

গ্রামের অবস্থান:

মেঘালয়ের কুয়াশাছন্ন পূর্বখাসি পাহাড়ে অবস্থিত এই গ্রামটির প্রকৃতি যেন সবাইকেই টানে। অপরূপ সবুজ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরা এই গ্রাম আজ পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়। এখানে মেঘ আর গাছ যেন একে অপরের কানে কানে নিরবে কিছু বলে যায়।

যোগাযোগের মাধ্যম :

মেঘালয়ের শিলং শহর থেকে ৫২.৪ কিলোমিটার দূরে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ঘেরা এই গ্রাম অবস্থিত।শিলং শহরের পুলিশ বাজার এলাকা থেকে গাড়ি ভাড়া করে কংথং যেতে হয়।রয়েছে সরকারি বাসের ব্যবস্থা ও।

থাকার ব্যবস্থা :

গ্রামটিতে পর্যটকদের টানার জন্য হোমস্টের ব্যবস্থা রয়েছে। যেখানে গ্রামবাসীর ঘর গুলোর মতন কুঁড়েঘর বানানো আছে। রয়েছে বেশ কয়টি হোমস্টের ব্যবস্থা। সেখানে থেকে ওই গ্রামকে উপভোগ করার জন্য গাইড ও পেয়ে যাবেন। পর্যটকরা যেন এই এলাকাটিতে ঘুরতে আসে সেজন্য গ্রামের মানুষ হিন্দি শিখছে। চেষ্টা করছেন নিজেদের গ্রামকে বিশ্বের দরবারে পৌঁছে দেওয়ার।অনলাইনেও কিছু টুরিস্ট গাইড পেয়ে যাবেন। 

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

কংথং গ্রামের খাবার

উত্তর পূর্বাঞ্চলের এ পাহাড়ি গ্রামে গেলে স্থানীয়ভাবে  উৎপাদিত  খাসি উপজাতিদের খাবারের স্বাদ নিতে পারেন। যার বৈশিষ্ট্য হলো ভাত, ধুয়াজাত মাংস, গাজানো উপাদান। স্থানীয় হোমস্টেতে পাওয়া যায় জাদোহ (শূকরের মাংস মশলা দিয়ে রান্না করা ভাত), দো-নেইয়ং(কালো তিল দিয়ে শুকরের মাংস) এবং টুংরিম্বাই।পর্যটকরা এখানে তাজা মধুর সাধও পেতে পারেন। এখানকার হোমস্টে গুলোতে নিজেরা রান্না করে খাওয়ারও ব্যবস্থা রয়েছে। অর্গানিক সবজি, ফল খেতে হলে মেঘালয়ের এইসব উপজাতি এলাকা না ঘুরলে সেটা মিস করবেন। 

পর্যটকদের কাছে এই গ্রাম পৌঁছে গেছে বেশ কয়েক বছর আগে ২০২১ সালে UNWTO-এর সেরা গ্রাম পুরস্কারে   জন্য এই গ্রাম মনোনীত হয়েছিল। ২০৩০ সালে জাতীয় পর্যটন এরা পর্যটন গ্রাম হিসাবে ব্রোঞ্জ পুরস্কারে ভূষিত হয় শিস গ্রাম। পর্যটকদের আকর্ষণ বাড়াতে স্থানীয় সংস্কৃতি, মনোরম ট্রাকিং, এবং রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ দ্বারা সমর্থিত হোমস্টে রয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকার এই গ্রামটি উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করেছে। বছরের সেপ্টেম্বর অক্টোবর মাসে মেঘালয় ঘুরতে আসলে অবশ্যই এই গ্রামটি ভুলবেন না।

ভ্রমনের খরচ 

যদি বিমানে করে গৌহাটি পৌছে যান তাহলে গাড়ি করে শিলং,সেখান থেকে চেরাপুঞ্জী হয়ে কংথং এ ঘুরে বেড়ানো।৫দিনের ট্রেকিং,হোম স্টে,খাওয়ার  খরচ মিলিয়ে  জন প্রতি ১০ থেকে ২০ হাজারের বেশী খরচ হবেনা।

কংথং গ্রামের ভবিষ্যৎ :

ভারত সরকার মেঘালয়ের এই কংথং গ্রামটিকে গণ পর্যটনের পরিবর্তে অনন্য সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা অর্জনকারী এক বিশেষ গ্রামগড়ে তোলার চেষ্টা চালাচ্ছে। তার অবকাঠামো ও সংযোগ ব্যবস্থাকে আরো উন্নত করার। সেখানকার জীবন্ত শেকড়ের সেতু বাঁশের পথ দেখার জন্য প্রতিবছর পর্যটকরা দেশ বিদেশ থেকে এই গ্রামে ভিড় জমায়। 

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

চ্যালেঞ্জ :

গ্রামের প্রবীণরা ঐতিহ্যের সম্ভাব্য ক্ষতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। বিশেষ করে শিক্ষার উন্নয়নের জন্য বর্তমানে গ্রামের ছেলে মেয়েরা বাইরে চলে যাচ্ছে। আর এটা গ্রামটিকে তার ঐতিহ্য নিয়ে টিকিয়ে রাখার এক বিশাল চ্যালেঞ্জ।গ্রামের ধারণ ক্ষমতা বজায় রাখতে বর্তমানে একবারে  ১৫-২০জন পর্যটক প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে যাতে স্থানীয় সংস্কৃতি পরিবেশ ক্ষতি না হয়। গ্রামবাসীরা এই ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে গ্রামে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত কোন স্থাপনের দাবি জানিয়েছে। 

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও সংরক্ষণ :

UNESCO  স্বীকৃতি :

গ্রামের অনন্য ‘জিংরওয়াই ইয়াবেই’ প্রথাকে ইউনেস্কোর অপরিমেয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মর্যাদা দেওয়ার জন্য আমি ধোন জানানো হয়েছে।

ভ্রমনের শ্রেষ্ঠ সময়:

অক্টোবর থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত এই গ্রামের আবহাওয়া মনোরম থাকে। পরিষ্কার আকাশ আরামদায়ক তাপমাত্রা থাকে যার ফলে ট্র্যাকিং করা এবং স্থানীয় এলাকা ঘুরে দেখার আনন্দ আস্বাদন করা আনন্দদায়ক হয়। অক্টোবর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত শীতের মাস হওয়ায় ঝরঝরে পরিবেশ, পরিষ্কার আকাশ ও আশপাশের উপত্যকা গুলি দেখার জন্য আদর্শ। অন্যদিকে বর্ষার পরবর্তী সময় সেপ্টেম্বর থেকে অক্টোবর মাসে ভারী বৃষ্টিপাতের পরে সবুজ পরিবেশ বিরাজ করে।তবে ভারী, অবিরাম বৃষ্টিপাত, ভূমিধস, বর্ষার সর্বোচ্চ মৌসুমজুন থেকে আগস্ট মাস  এড়িয়ে চলা উচিত। 

ভ্রমণের কিছু ছোট্ট টিপস আমার পক্ষ থেকে:

গ্রামটির অভিজ্ঞতা লাভের জন্য সাধারণত তিন ঘন্টার ভ্রমণ  যথেষ্ট। স্থানীয়দের সঙ্গে তাদের সঙ্গে কথা বলুন তাহলেই তারাও আপনার সঙ্গে মিশে সংগীতের সুর আপনার সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারে। যাওয়ার সময় গরম কাপড় এবং ড্রিঙ্ক কোট সাথে রাখুন। যেকোনো সময় আবহাওয়ার পরিবর্তন হতে পারে। 

দুদিনের কংথং গ্রাম উপভোগ করার একটা আমার মতো করে টুর প্লেন করে দিলাম।দেখুন তো ,এভাবেও ঘুরে আসা যায় কিনা।Raise Your Concern About this Content

প্রথম দিন: শিলং → কংথং গ্রাম

যাত্রা

  • ভোরে শিলং থেকে রওনা
  • রুট: মাওরিংখাং / সাইতসোহপেন হয়ে
  • পাহাড়, উপত্যকা ও বনভূমির মনোরম দৃশ্য

কংথং পৌঁছে

  • স্থানীয় হোমস্টে-তে চেক-ইন
  • গ্রামবাসীদের আন্তরিক অভ্যর্থনা

গ্রাম অভিজ্ঞতা

  • ‘জিংরওয়াই ইয়াবেই’ (শিস দিয়ে ডাকার নাম) সম্পর্কে জানা
  • খাসি পরিবারগুলোর সঙ্গে আলাপচারিতা
  • গ্রাম ভ্রমণ ও ছবি তোলা

খাবার

  • ঐতিহ্যবাহী খাসি খাবার
  • বাঁশকোরল, স্থানীয় ভাত ও জৈব সবজি

রাতের ব্যবস্থা

  • ক্যাম্পফায়ার (যদি উপলব্ধ থাকে)
  • লোককথা ও গ্রামীণ জীবন উপভোগ

দ্বিতীয় দিন: ঘোরা ও ফেরা

সকাল

  • গ্রামের পাহাড় থেকে সূর্যোদয় দেখা
  • প্রকৃতির মাঝে হাঁটা / হালকা ট্রেকিং
  • পাখি পর্যবেক্ষণ

স্থানীয় সংস্কৃতি

  • গ্রামের হস্তশিল্প দেখা
  • খাসি সংস্কৃতি ও জীবনযাপন সম্পর্কে জানা

ফিরে আসা

  • কাছাকাছি গ্রাম বা শিলংয়ে মধ্যাহ্নভোজ
  • সন্ধ্যার মধ্যে শিলং ফেরা

ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলি নিয়ে গল্প করতে করতে আজ তুলে ধরলাম মেঘালয়ের এক গ্রামের গল্প। যে গ্রামে কথা বলে না অনুভূতি প্রকাশ হয় সুরে সুরে। আবার কখনো কথা হবে অন্য কোন জায়গা নিয়ে। উত্তর পূর্বাঞ্চলের কোন কোন জায়গা নিয়ে আপনারা জানতে আগ্রহী তা কিন্তু আমাদের  জানাবেন। আজ তাহলে এতটুকুই।

তথ্যসূত্র :

১. অফিশিয়াল পেজ : মেঘালয় সরকার
২. উইকিপিডিয়া

অর্গানিক ফুড  কি পশ্চিমবঙ্গের আগামী সোনালী সম্পদ ? কেনো বাঙালির কাছে আধুনিক কৃষি পর্যটন(এগ্রো-ট্যুরিজম) অভিনব বিকল্প ?

কৃষি-পর্যটন (এগ্রোট্যুরিজম) কি ও কেন ?

কৃষি ও পর্যটন যখন একই সাথে একই জায়গায় সম্মিলিত ভাবে গড়ে ওঠে স্বাভাবিক ভাবে তাকেই কৃষি পর্যটন বলা হয়ে থাকে। কিন্তু এক্ষেত্রে কোনোরকম কীটনাশক প্রয়োগ ছাড়া, বিজ্ঞানের সহায়তায় আধুনিকীকরণ দ্বারা  যখন সেই একই জমিতে অনেক বেশি  বিভিন্ন প্রকারের অর্গানিক ফুড বা জৈব সবজি ফল দানা শস্য উৎপাদন করে একই সাথে পর্যটন ব্যাবসাও গড়ে তোলা যায় তবে তাকে বলা যায় কৃষি-পর্যটন কেন্দ্র বা এগরোটুরিস্ট স্পট – । বর্তমান যুগে খাবার গ্রহণের ব্যাপারে মানুষের সচেতনতা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে।  তার প্রমান  জিম এবং হেলথি ড্রিঙ্কস কোম্পানি গুলোর রমরমা বাজার। একই সাথে বাজার চলতি সবজি ফলের প্রতি ভয় ও অনীহা থেকে অর্গানিক তথা জৈব খাদ্যের প্রতি মানুষের আস্থা বিশ্বাস বৃদ্ধি হচ্ছে কারণ সাধারণ মানুষ এখন নিজের স্বাস্থ্য সম্পর্কে অনেক বেশি সচেতন। তাই কৃষি ভিত্তিক সম্পূর্ণ জৈব সার দ্বারা তৈরী ক্ষেতের সবজি ও ফল এখনসোনার মতোই দামি সম্পদ। সম্পদের সাথে তার পরিচিতি ও বিকাশ ঘটানো অপরিহার্য্য।  এ ক্ষেত্রে পর্যটন শিল্প যখন যুক্ত হয় তখন তাকে বলা যায় হাতির দাঁতে বাঁধানো সোনা। ছুটিতে ঘুরতে আসা পর্যটক গ্রামীণ থাকা খাওয়ার পরিষেবাও পায়। ক্ষেতের সতেজ সবজি ফল পুকুরের মাছ পোল্ট্রির মুরগি ডিম্ সরাসরি লাঞ্চ ও ডিনার থালি সমৃদ্ধ করে। সাথে আছে থাকার ব্যাবস্থাও।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কৃষি-পর্যটন -বিশ্বের বাজারে এই চাহিদা এখন উর্ধমুখী। মার্কেট ডাটা ফোরকাস্ট এর তথ্য অনুযায়ী ২০২৫-২০৩০ সালের মধ্যে ২৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বাজার, ১২% হারে বেড়ে উঠে প্রায়  ৫৬৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে আশা করা যায়। 

 ফিলিপিন, আমেরিকা, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স, ইতালির সাথে ভারতবর্ষ ও এগ্রটুরিজম এ প্রথমসারিতে – বলাবাহুল্য কৃষি ভিত্তিক অর্থনীতি ও একই সাথে পর্যটন বিশ্বব্যাপী আরো জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। খামারে থাকা (ফার্ম স্টে), মধু , ফল সবজি ক্ষেত থেকে সরাসরি সংগ্রহ, স্থানীয় সংস্কৃতির সাথে পরিচয় সব মিলিয়ে বিশ্বব্যাপী পর্যটকদের মধ্যে আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠছে এই এগ্রো টুরিজম। 

ভারতবর্ষ কৃষিভিত্তিক দেশ। তাই আর্থসামাজিক সাফল্যের সাথে সাথে ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রদেশে মহারাষ্ট্র, পাঞ্জাব, কেরালা, উত্তরাখন্ড, কর্ণাটক, তামিলনাড়ু, গোয়া কৃষি-পর্যটন- এগ্রো ট্যুরিজম ক্রমশ বিকশিত হয়ে উঠছে। ভারতে কৃষির অবদান  জিডিপিতে  প্রায় ১৮.২% (২০২৩-২৪)

পশ্চিমবঙ্গে কৃষি-পর্যটন:

পশ্চিমবঙ্গে কৃষি-পর্যটনের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ এই  কৃষি পর্যটনে পশ্চিমবঙ্গ দ্রুত এক উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কান্ডারি হয়ে উঠছে। এই বঙ্গের মাটি আবহাওয়া বৃষ্টি নদী  সবই অনুকূল হওয়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি নিশ্চিত ভাবে জনপ্রিয় করে তুলছে আধুনিক কৃষি বাজারকে। 

জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির কারণ –

জৈব খাদ্য (অর্গানিক ফুড) এর চাহিদা বৃদ্ধি

কারণ রাসায়নিক ফরমালিনের ব্যবহারে  ক্যান্সার, মধুমেহ, হৃদ রোগ আরো অন্যান্য উপসর্গ ডেকে আনে।  জৈব খাদ্য (অর্গানিক ফুড) হলো হরমোনবিহীন অথবা বিনা কীটনাশকে কৃত্তিম সারে তৈরী সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক  স্বাদ বিশিষ্ট ও পুষ্টি গুন্ সমৃদ্ধ। এতে  পরিবেশ মাটি বা জলের কোনো ক্ষতি হতে পারেনা।  

কিভাবে এগ্রোটুরিজম শুরু করা যায় ?

 কৃষি পর্যটন মূলত জমি নির্ভর যেখানে পুকুর, গবাদি পশু, পর্যটকদের জন্য থাকার ব্যবস্থা করা যায়। তবে কন্ট্রাক্চুওয়াল ফার্মিং বিকল্প করা যেতে পারে। ফার্ম বা খামার প্রতিষ্টার পর দরকার সোশ্যাল মিডিয়া প্রচার। এরপর থাকে বিভিন্ন খাতে ইনকাম বা আয়ের সুযোগ । গ্রাম্য পরিবেশের সাথে আধুনিক পরিষেবা, অফ সিজন এ জেলি, সস, আচার তৈরী করে তা অনলাইন অফলাইন বিক্রয়, রুমস্টে, প্রবেশ টিকিট, সামাজিক ও বিবাহ অনুষ্ঠান হিসাবে ভাড়া দেওয়া, ক্যাটারিং এমনকি পরবর্তীতে স্থায়ী ফার্ম প্রতিষ্ঠার পর স্পা, পার্লার, আয়ুর্বেদ চিকিৎসা এমন অনেক কিছু উন্মুক্ত করা যেতে পারে। 

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google
  • এগ্রোটুরিজম উল্লেখযোগ্য কিছু  সামাজিক দায়িত্ব বহন করে। যেহেতু এটি কৃষি ভিত্তিক তাই বেশ অনেক জায়গা জুড়ে এর অবস্থিতি হলে সবথেকে বেশি লাভবান হতে পারে সেই গ্রাম। ব্যাবসার শ্রম ও কারিগর এখানে মূলত এলাকাবাসী। উন্নত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তৈরী অনেক বেশি পরিমান  অথচ নির্ভেজাল এই সবজির বাজার মূল্য বেশি থাকায় কৃষক এখানে তার শ্রমের প্রকৃত মূল্য পেয়ে থাকে। কৃষি চাষের পাশাপাশি মাছ হাঁস মুরগি ছাগল প্রতিপালনে গ্রামের মহিলারাও যুক্ত থাকে। এভাবে একটি স্থানের আর্থ সামাজিক মূল্য অনেকগুন বেড়ে যায়। 
  • লার্নিং উইথ নেচার -বর্তমানে শিক্ষা ব্যাবস্থার মধ্যে একটি নতুন অপরিহার্য্য শর্ত যুক্ত হয়েছে – আর তা হলো প্রকৃতির সাথে শেখা। পর্যটন শিল্পে যখন গ্রামীণ পরিষেবায় প্রকৃতির থেকে স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীরা বীজ বপন থেকে একটি গাছের বেড়ে ওঠা ,ফলফুল আসা প্রত্যখ্য করতে পারে তখন জীবনের প্রতি এক নতুন মূল্যবোধের দৃষ্টি তৈরী হয় যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য মূল্যবান সম্পদ। 
  • শহুরে জীবনে হাজারো ব্যাস্ততার মাঝে  নির্মল পরিবেশে দুদিনের ফার্ম স্টেইং বাকি দিন গুলোতে এক্সট্রা অক্সিজেন দিতে পারে। গ্রামীণ সংস্কৃতির সাথে পরিচয় ঘটার পাশাপাশি চাষির কষ্টলব্ধ ফসল ফলানোর প্রক্রিয়া এক অন্যরকম মূল্যায়ণ এনে দিতে পারে। 
  • যেহেতু জৈব সার ও কীটনাশকবিহীন খাবার তা ফল সবজি ডিম্ মাছ বা মাংস হোক – তাতে জমি বা পরিবেশের কোনোরকম ক্ষতি হতে পারেনা। কৃষিতে ব্যবহৃত রাসায়নিক কি পরিমান পরিবেশ দূষণের জন্য তা বলাবাহুল্য। সুতরাং পরিবেশগত দিক ও এখানে সমান গুরুত্বপূর্ণ। 

সরকারী অনুদান 

ভারত ও পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বিভিন্ন সরকারি অনুদান ও প্রকল্প – কৃষক বন্ধু, পিএম কিষান, বাংলা শস্য বিমা, কৃষি যান্ত্রিকীকরণ, কিষান ক্রেডিট কার্ড এইরকম সরকারি অনুদান এক্ষেত্রে সাহায্য করে থাকে। 

পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে একটি  এগ্রো-ট্যুরিজমের আলোচনা, ঠিকানা, ফোন নম্বর 

সৃজনী এগ্রো ফাউন্ডেশন  :-

মেদিনীপুরে লাল পাথুরে মাটির দেশে ২০২৪ সালে অধ্যাপক ডক্টর প্রশান্ত কুমার দাস শুরু করেন সৃজনী এগ্রোফার্ম যা আজ কয়েকশ গ্রামবাসীর রোজগারের পথ। এই ইন্টিগ্রেটেড ফার্ম ৪০ বিঘা জমির ওপর  এক রিসোর্ট প্রজেক্ট ও বলা যায়। কারণ এখানে কৃষি শিক্ষার সাথে কৃষি পর্যটনও অঙ্গাঙ্গী ভাবে যুক্ত। শুরুতে  অন্নুনত জায়গা, রুক্ষ মাটি ছিল সবথেকে বড় চ্যালেঞ্জ। তাই পরিবেশ অনুকূল বিভিন্ন প্রকার মশলা, মেডিসিনাল প্লান্ট, বিভিন্ন ফল-সবজি অর্থাৎহর্টি কালচার দিয়ে ফাউন্ডেশনের শুভারম্ভ হয় । ক্রমশ আম, কুল, মুসম্বি, পেয়ারা, পেঁপে, ড্রাগন ফল এর চাষ এর মাধ্যমে ব্যাপক হারে বিস্তার লাভ করে। উদাহরণ স্বরূপ ৫বিঘা কুল চাষে  ৪০০০০ টাকা এবং কেজি প্রতি ৭০-৮০ টাকা পাওয়া যায়। মেদিনীপুর অঞ্চলে ফলের চাষ কম হওয়ায় মূল্য স্বভাবতই বেশি পাওয়া যায়। জমিতে আম গাছ রোপনের পর তার ফলন সময় তিন বছর ধরে নিলে সেখানেইন্টিগ্রেটেড ক্রপিং এর মাধ্যমে পেঁপে-গাছ লাগিয়ে তিন-ছয় মাসের মধ্যে গাছ প্রতি ২৫-৩০কেজি পেঁপে পাওয়া যায়। যার পাইকারি বাজার দাম  ৪৫-৫০ টাকা। তেমনি ওল এর ইন্টারক্রপিং লেবু চাষ।  এইভাবে ইন্টিগ্রেটেড ফার্মিং দ্বারা বিভিন্ন সবজি দিয়ে একই জমিকে সর্বাধিক ব্যবহার করে মুনাফা করা যায়। এছাড়া টুরিস্টদেড় জন্য এখানে বাগানের টাটকা সবজি ভুড়িভোজে অন্তর্ভুক্ত করা হয় । তাছাড়াও নার্সারী ম্যানেজমেন্ট এর ক্ষেত্রে ভিসিটরদের জন্য অর্গানিক গাছ তৈরী থাকে যারা বাড়িতে নিয়ে যেতে চান। কারণ অর্গানিক ফার্মিং এ ফল ও সবজির স্বাদ, চেহারা ও রং বাজার চলতি সবজির থেকে ভিন্ন হয়। Raise Your Concern About this Content

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

বাঙালির বিশেষ বিশেষ দিন গুলোতে যেমন বসন্ত উৎসব, পয়লা বৈশাখ, দোল, পুজোর মতো সামাজিক অনুষ্ঠানে পর্যটকরা এখানে সদলবলে অথবা পরিবারের সাথে অংশগ্রহণ করে থাকে। প্রকৃতির সান্নিধ্য, গ্রাম্য সংস্কৃতি, মাড হাউস এর মতো  হারিয়ে যাওয়া শিল্প, চালের রুটি, ব্যাম্বো চিকেন, পান্তা, ট্রাইবাল ফুড, সরুচাকলি, ব্ল্যাক রাইস সব মিলিয়ে টুরিস্ট এখানে শহুরে ব্যাস্ত জীবন ভুলে এক লাইফ টাইম এক্সপেরিয়েন্স এর স্বাদ নিয়ে যেতে পারে। সমৃদ্ধ কৃষি সুখী জীবন এদের মূল বক্তব্য যা আধুনিক কৃষি ও  জৈবিক কৃষিকে বাস্তবায়িত করে জীবন ও জীবিকার মাধ্যমে কয়েক গুন্ বেশি উন্নত জীবন লাভ করা সম্ভব। 

সৃজনী আগ্রো ফাউন্ডেশন এ কোনো ইচ্ছুক ব্যাক্তির জমি বা প্রশিক্ষয়ন বা ম্যান পাওয়ার না থাকলেও কন্টাক্ট ফার্মিং সুবিধা দান করে। এছাড়াও ১৫দিন – এক মাস এখানে থেকে অভিজ্ঞতা  সঞ্চয় করে এই ফার্মিং এ সিদ্ধান্ত নেবার পর  সৃজনী গাইড লাইন হিসাবে কাজ করে থাকে। সাথে আছে ইন্টার্নশীপ, ক্যাম্পিং, স্টেইং, ডেস্টিনেশন ওয়েডিং ইত্যাদি। 

ঠিকানা : সৃজনী এগ্রো ফাউন্ডেশন 
দেলুয়া, মেদিনীপুর সদর, পশ্চিমবঙ্গ 
ফোন – ৯১২৬৫৮৩৬৭০

তথ্য সূত্র :

১) পশ্চিমবঙ্গে এগ্রোটোরিসম 
২) ইন্টিগ্রেটেড ফার্মিং 
৩) এগ্রিকালচার ডায়েরি 
৪) পশ্চিমবঙ্গের ভবিষ্যৎ এগ্রটুরিজম  
৫) এইসময় 
৬) উত্তরণ কৃষি 

মোদের গরব মোদের আশা আ মরি বাংলা ভাষা

একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। তাই আজ আমার মাতৃভাষা,পিতৃ ভাষা সিলেটি ভাষা নিয়ে কথা বলতে চাই। কাজের ক্ষেত্রে  বলা চলে ত্রিপুরায় বিভিন্ন জায়গার লোক বসবাস করে বলে এখন আমাদের এই ভাষা সব জায়গায় প্রয়োগ হয় না।সুমধুর এই ভাষা নিয়ে আজ কথা বলব। 

এই যে উপরে লিখলাম বালা নি আফনে?এর মানে কি জানেন? ভালো আছেন কি? আপনি ভালো আছেন? সঙ্গে সঙ্গে উত্তরএল ” অয় বালা আসি”মানে হ্যাঁ ভালো আছি.।বাকি আরো কয়েকটা লাইন তুলে ধরলাম যদি আমার এই লেখা আর এই ভাষা ভালো লাগে তাহলে অনুগ্রহ করে একটু শুনে নেবেন। লেখার চেয়ে শুনতে বড় মধুর এই ভাষা। 

এখন আসা যাক মূল স্রোতে। সিলেটি ভাষা মূলত বাংলাদেশের সিলেট বিভাগ ও ভারতের আশপাশে অঞ্চল যেমন আসাম, ত্রিপুরা, মেঘালয়,মনিপুর নাগাল্যান্ড এবং বিশ্বজুড়ে প্রবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে ব্রিটেন ও উত্তর আমেরিকা থেকে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অংশে সিলেটি ভাষাভাষীর লোক রয়েছে।  ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন রাজ্যে  মূলত এখানকার বাঙালিরা সিলেটের এই ভাষাকে যথাযোগ্য মর্যাদায় এখনো সসম্মানে বলেন। সিলেটি একটি ইন্দো – আর্য ভাষা.উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী প্রায় ২ কোটি  লোকের কথা বলার বা মনের ভাব প্রকাশ করার মাধ্যম এই ভাষা।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

প্রশ্ন জাগছে নিশ্চয়ইএই সিলেটি ভাষার উৎপত্তি নিয়ে?আগেই বলে দেই এটি বাংলার একটি উপভাষা। মানে নিজস্ব ভাষা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। যদিও বেশিরভাগ ভাষাবিদ এই ভাষাকে স্বাধীন ভাষা বলে মনে করেন। অনেক  স্থানীয় ভাষাভাষীর কাছে সিলেটি ভাষা দ্বিভাষিক আঞ্চলিক ভাষায় হিসেবে ব্যবহৃত হয় যেখানে প্রমিত বাংলা ভাষাটি কোডেড লেকচার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। অনেকে আবার এই ভাষাকে বাংলা ভাষার একটি দুর্নীতিগ্রস্ত রূপ হিসেবে বিবেচনা করেন। 

তবে যে যাই বলুক না কেন সিলেটি  ভাষাভাষী লোকেদের কাছে এটা অহংকারের ভাষা। এই ভাষার আলাদা লিপিও রয়েছে “সিলেটি নাগরী” লিপি নামে পরিচিত। 

ছোটবেলা থেকেই আমার ঘরে বাবা জেঠু সবাই এই ভাষায় কথা বলতেন। কিন্তু যেহেতু আমরা ত্রিপুরা তে  থাকতাম তাই কাজের খাতিরে পরিবেশগত পার্থক্যের কারণে এই ভাষা এখন প্রায় হারিয়ে যাচ্ছে। হারিয়ে যাচ্ছে বলা চলে না, আসলে কিছু সংখ্যক মানুষের মধ্যে অন্তত ত্রিপুরাতে সীমাবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। 

যেহেতু ত্রিপুরা ও উত্তর পূর্বাঞ্চলের অনেকেই পূর্ব বাংলা থেকে এসেছেন তাই উত্তর পূর্বাঞ্চলে বিভিন্ন ভাষার মেলবন্ধন দেখা যায়। সিলেটি ভাষা নাম থেকেই বোধ হয় বুঝতে পারছেন এই ভাষাটি মূলত বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চল থেকে। এর এক বিশাল ইতিহাস রয়েছে। চলুন কথা বলি সেই সব ইতিহাস নিয়ে। 

সিলেটি ভাষার উৎপত্তি :

সিলেটি ভাষা মূলত  পূর্ব ইন্দো আর্য ভাষাগুলির অন্তর্গত যা মাগোধী প্রাকৃত থেকে উদ্ভূত হয়েছিল।সিলেটের আশেপাশে নিচু জায়গাগুলিতে মূলত প্রাচীন খাসি জনগোষ্ঠীর লোক বসবাস করত এবং প্রাচীনতম ইন্দো আর্য বসতি স্থাপন করা হয়েছিল ষষ্ঠ শতাব্দীতে কামরূপ রাজার অধীনে। ষষ্ঠ শতাব্দীতে প্রাচীন সুরমা উপত্যকা ও বরাক উপত্যকা ভাষা হিসেবে পরিচিত হয় ই সিলেটি ভাষা। বলা চলে এই ভাষার বয়স ১৫ শতাব্দীর পুরানো। দশম শতাব্দীর পর সিলেট (শ্রীহট্ট) নিচু জায়গায় এবং পরে একাদশ শতাব্দীর শ্রীহট্ট রাজা কেশব দেব এবং ঈশান দেবের ভাতেরার  অনুদান সংস্কৃত ভাষায় রচিত হয়েছিল। বাংলাদেশের মৌলভীবাজারের রাজনগরের পশ্চিমভাগ গ্রামে আরেকটি উল্লেখযোগ্য তাম্রলিপি পাওয়া গেছে যা দশম শতাব্দীতে রাজা শ্রীচন্দ্র জারি ছিলেন। 

সিলেটি ভাষার ইতিহাস কিন্তু অনেকটা বিস্তৃত। ১৩০৩ খ্রিস্টাব্দে সিলেটের মুসলিম বিজয় পশ্চিমা দেশ থেকে আসা মুসলমানদের অভিবাসন কে প্রসারিত করে তাই সিলেটি ভাষায় আরবি ও ফার্সি প্রচুর সংখ্যক শব্দের উদ্ভব করে। স্থানীয় ভাষার উপর ফার্সি -আরবি প্রভাব দেখা গেছে।

আচ্ছা আগেই বললাম, এই ভাষার  আলাদা লিপিও রয়েছে যা “সিলেটি নাগরী “নামে পরিচিত। বিস্তৃত আলোচনায় আর নাইবা গেলাম। সময় পাল্টালো। ১৯০৩ সালে গ্রিয়ারসন রিপোর্ট যে সিলেটি ভাষা কেবল তৎকালীন সিলেট জেলারজেলা (বর্তমানে বাংলাদেশের সিলেট বিভাগ এবং আসামের করিমগন্জ জেলা)  মধ্যে সীমিত থাকবে।আমাদের পৈত্রিক বাড়ি যেহেতু আসামের করিমগঞ্জ জেলায় তাই এই ভাষা আমাদের  ও মাতৃভাষা। যাইহোক, জানা যায় ছেলেটি শব্দ ভান্ডারের সর্বপ্রথম একটি ডকুমেন্টেশন প্রকাশিত হয় ১৮৫৭ সালে। 

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

সিলেটি লিপি :

সিলেটিতে বর্তমানে কোন লেখার ব্যবস্থা নেই। ঐতিহাসিকভাবে সিলেট অঞ্চলে সিলেটি নাগরী বাংলা লিপির পাশাপাশি  ব্যবহৃত হতো। তবে সিলেটি নাগরী বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ধর্মীয় কবিতা লেখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল বলে জানা গেছে। ভারতবর্ষের কোথাও এই লিপি এখন আর ব্যবহৃত হয় না। 

সিলেটি ভাষাভাষীর বিস্তার :

ভারতের দক্ষিণ আসাম অঞ্চলের বড়া কুকুর তোকায় সিলেটি ভাষা ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয় যার মধ্যে কাছার হাইলাকান্দি এবং অন্তর্ভুক্ত। এটি ত্রিপুরার উত্তর অংশে এবং মনিপুরের বিদিব আমি ও প্রচলিত। মধ্য আসামের জেলা মেঘালয়ের শিলং এবং নাগাল্যান্ড রাজ্যে ভাষাভাষীর দের একটি উল্লেখযোগ্য জনসংখ্যা রয়েছে। শুধু উত্তর পূর্বাঞ্চলেই নয় কলকাতায় ও কিছু সংখ্যক লোক বাস করেন যাদের বেশিরভাগই আসাম থেকে আসা। প্রত্যেকের একটাই লক্ষ্য এই লুপ্ত প্রায় সিলেটি ভাষাকে আবার যেন তার পরিচয় মিলে। এখনো যারা অল্পস্বল্প এই ভাষায় কথা বলতে পারেন তাদেরকে নিয়ে একটা জমানোর এখনো চেষ্টা চলে। 

শুধু কি ভারত আর বাংলাদেশ না ভারতীয় উপমহাদেশের বাইরে সিলেটি ভাষাভাষীদের বৃহত্তম গোষ্ঠী যুক্তরাজ্যে বাস করে। যার মধ্যে ৯৫% ব্রিটিশ বাংলাদেশী সিলেট অঞ্চল থেকে এসেছেন। ধারণা করা হয় যে যুক্তরাজ্যে চার লাখেরও বেশি সিলেটি ভাষাভাষীর লোক বসবাস করেন। টাওয়ার হ্যামলেটসের মতোপূর্ব লন্ডনের সিলেটের লোকেরা বসবাস করেন। সাবলীল ভাবে অন্য কোন সিলেটি মানুষকে পেলে আঁকড়ে নেয় ভাষার টানে। 

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

সিলেটি আর বাংলা ভাষা প্রায় সমান সমান। শুধু উচ্চারণ গত কিছু তফাৎ ও বলার ভঙ্গির মধ্যে তফাৎ রয়েছে। নিজস্ব একটি অভিজ্ঞতা ব্যাখ্যা করছি। গত বছরই বাংলাদেশের অস্থির পরিবেশ শুরু হওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে আমার হঠাৎ ইচ্ছে হল বাংলাদেশে আমার ঠাকুর দাদার বাড়ি যেখানে ছিলেন সেখানকার জায়গা সম্পর্কে জানার। সে মত আমি আমার এক বন্ধুর কথায় ফেসবুকের একটি পেইজে আমার পরিবারের পুরনো ছবি আর শুধু গ্রামের নামটা জানতাম বলে বাংলাদেশ থেকে সেই জায়গাটা কোন একজন যেন আমাকে দেখায় সেটা আশা রেখে একটা লেখা লিখেছিলাম। আমি তো সাধারণ একটা লেখা লিখেছিলাম কিন্তু ওই যে সিলেটিদের টান। সে হাজার হাজার কমেন্ট হাজার হাজার ভিউ হাজার হাজার লাইক, শেয়ার।  আমি দেখলাম, ছেলেদের মধ্যে আন্তরিকতার সেই অদ্ভুত টান। চল্লিশের দশকে আমার ঠাকুর দাদা চাকরি শুদ্ধ পৈত্রিক ভিটে বিক্রি করে আসামি চলে এসেছিলেন। আত্মীয়-স্বজন বলতে কেউই নেই। কিন্তু সিলেটি মেয়ে বলে সুদূর বাংলাদেশ লন্ডন থেকে মানুষ ফোন করে সেই জায়গা দেখানোর চেষ্টা করে। সেদিন থেকে মনে হল এক ভাষার টান কতটা। সাত সমুদ্র তের নদী পার থেকেও মানুষকে কাছে টেনে আনে।Raise Your Concern About this Content

সিলেটি ভাষাকে বাঁচানোর জন্য অনেক গ্রুপ তৈরি হয়েছে যারা নিজেদের এই ভাষাকে টিকিয়ে রাখতে এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে চেষ্টা করছে। কলকাতায়ও এমন অ্যাসোসিয়েশন রয়েছে। আর্টিকেলে তথ্যসূচিতে আমি সেই এসোসিয়েশনগুলোর নাম উল্লেখ করে দেবো। কখনো সময় করে একটু সিলেটি ভাষার ভিডিও গুলো দেখবেন। সিলেটি ভাষায় রয়েছে সেটা ২ মিনিটের। দেখলে হাসতে হাসতে পেটে ব্যথা হয়ে যাবে।এটা নির্দ্বিধায় বলতে পারি, শুনতে পাবেন শুধু সিলেটি রান্না মাছ ও রাইসাক, বোয়াল মাছ, আঠালো ভাত, সরষে তরকারি, পাতলা ঝোলের গল্প। সিলেটি মানুষ মানেই রশিক। আর রশিকদের সঙ্গে একটু গল্প করে দেখবেন ওরা যেমন জ্ঞানী তেমনি হাসাতেও জানে।বুঝতেই তো পারছেন এখনো আশি উর্ধ সিলেটি ব্যক্তি চান সিলেটি ভাষাকে যেন সবাই শুনতে পারে ভালবাসতে পারে। মাতৃভাষা দিবসে এটাই আমার মাতৃভাষার প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য। 

তথ্যসূচি :

 শিব লিঙ্গ কী ? কি বলছে আধুনিক বিজ্ঞান ও সনাতনী হিন্দু পুরাণ

শিব লিঙ্গ কী ? 

শিবলিঙ্গ কি তা জানার আগে সৃষ্টি তত্ত্ব কি জানা যাক। এই যে চোখের সামনে অপরূপা প্রকৃতি আর তার আকাশ, সূর্য্য, সমুদ্র, বিভিন্ন রকম উদ্ভিদ, বিভিন্ন প্রকার প্রাণী আমরা দেখতে পাই – প্রশ্ন  আসে – এরা কোথা থেকে এলো ? কোন শক্তির আস্ফালনে এর উৎপত্তি আর বিনাশ সংঘটিত হয়ে থাকে ? জগৎ পরিবর্তনশীল তবে এই জগতের অস্থায়ী রূপের পেছনের স্থায়ী কারিগর কে ? এ প্রশ্ন শুধু আজকের নয়। বহুযুগ ধরে মুনি ঋষিরা ও আজকের বিজ্ঞান এর উত্তর খুঁজে চলেছেন।  অর্থাৎ জীবন নামক যে চলন্ত ট্রেনএর কম্পাটমেন্ট এ আমরা বসে আছি, তা কাজ করছে  ইঞ্জিন শক্তির জন্য। ইঞ্জিন এর ভূমিকা এখানে মুখ্য, ট্রেনের ভেতর বসে তা যেমন দেখা যায়না তেমনি এই অখিল জগতের স্রষ্টা যিনি তাকেও জানতে চাওয়া দুঃসাধ্য। মূলকথা  – জগতের চালিকা শক্তির চাবিকাঠি যিনি তিনিই নামরূপে পরমেশ্বর শিব। নিরাকারে আবার তিনিই পরম তত্ত্বের প্রতীক শিবলিঙ্গ রূপে বিরাজমান। 

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

লিঙ্গ শব্দটি সংস্কৃত লিঙ্গম শব্দ থেকে এসেছে। যার অর্থ পরম জ্ঞান। কিন্তু নিরাকার পরমতত্ত্বের মালিক যিনি তাকে আমরা সাধারণ মানুষ চিনবো কেমন করে ? তাই প্রতীক রূপে তিনি শিবলিঙ্গ রূপে বিরাজিত।  

শিবতত্ত্ব ও আধুনিক বিজ্ঞান 

হিন্দু দর্শন অনুযায়ী নটরাজ শিবের নৃত্যরত মূর্তি  হল সৃষ্টি স্থিতি এবং প্রলয়ের প্রতীক আর তার ডমরু – শব্দ-কম্পাঙ্কের, যার থেকে জগৎ সৃষ্টি হয়েছিল মনে করা হয়। । বিগ-ব্যাং তত্ত্ব অনুযায়ী মহাবিশ্ব সৃষ্টি হয়েছিল কম্পাঙ্ক থেকে যা আজও প্রসারিত। শিবতত্ত্বের সৃষ্টি স্থিতি প্রলয় – আর বিজ্ঞানের সাইক্লিক কসমোলজি (এক্সপানশন কলাপ্স রিবার্থ ) এক কথা বলে। ডমরুর শব্দ যাকে আদিনাদ বলা হয়, বিজ্ঞানের ভাষায় তাইই কোয়ান্টাম ফ্লাকচুয়েশন এন্ড ভাইব্রেশন। উপনিষদের ব্যাখ্যায়, শব্দই ব্রহ্ম, বিজ্ঞানের ভাষায় এভরিথিং ইজ এনার্জি ওয়েভ। শিবের প্রলয় কান্ড – বৈজ্ঞানিক ভাষায়সুপারনোভা এক্সপ্লোশন। আশ্চর্য্য বিষয় হলো আজকের আধুনিক বিজ্ঞানের প্রামাণ্য পরীক্ষিত সত্য যে কথা বলে, আমাদের ঋষি গণ সেই একই সত্য বলে গেছেন বহুযুগ আগে।

শিবপুরাণ

জ্যোতির্লিঙ্গ – পুরাকালে নারদ যখন শিবলিঙ্গ দর্শন করে শিবতত্ব জানবার জন্য উদগ্রীব হলেন ব্রম্হা তখন বলেন – স্বয়ং ব্রম্হা বা বিষ্ণুও শিব তত্ত্ব সম্পর্কে অবগত নয়। একদা ব্রম্হা বিষ্ণুর মাঝে হঠাৎ এক উদ্গত আলোক রশ্মি প্রকাশিত হয়। তার কোথায় আদি কোথায় অন্ত খুঁজে পাওয়া যায় না। ক্রমে সেই আলোকের মাঝে সৎচিদানন্দ দেবাদিদেব মহাদেব নিজ রূপ উদ্ঘাটন করে বলেন -এই বিশ্বরূপ তাঁর অর্থাৎ সৎচিদানন্দের পরম রূপ জ্যোতির্লিঙ্গ। তিনিই সত্য জ্ঞান ও অনন্ত স্বরূপ ঈশ্বর। উজ্জ্বল আলোক জ্যোতি শিব-লিঙ্গকে নির্দেশ করে। তাই শিবলিঙ্গকে জ্যোতির্লিঙ্গও বলা হয়। বাণলিঙ্গ হলো রাজা বলির পুত্র বাণাসুরের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত শিব লিঙ্গ। জীবের মঙ্গলের জন্য বানাসুর, মহাদেব প্রেরিত অসংখ্য শিব লিঙ্গ ভারতের পাহাড়ে নদীতে জমিতে ছড়িয়ে দেন। তাই আজ হিমালয়ে বা নর্মদা নদী তীরে এতো সংখক লিঙ্গের সন্ধান পাওয়া যায়। 

ভারতের পুন্য ভূমিতে আছে এমনই ১২ টি জ্যোতির্লিঙ্গ ও ৫ টি পঞ্চভূত লিঙ্গ। যেমন -১) হিমালয়ের কেদারনাথ ২)উত্তরপ্রদেশ বেনারসেরকাশী বিশ্বনাথ ৩) গুজরাটের সোমনাথ ৪) অন্ধ্রপ্রদেশ হায়দ্রাবাদের  শ্রী শৈল পর্বতের মল্লিকার্জুন ৫) মধ্যপ্রদেশ উজ্জ্বয়িনীর মহাকালেশ্বর ৬) মহারাষ্ট্রের ত্রম্বকেশ্বর ৭)মধ্যপ্রদেশের ওমকারেশ্বর ও অমলেশ্বর ৮) তামিলনাড়ু রামেশ্বরম ৯)  দ্বারকায় নাগেশ্বর ১০)মহারাষ্ট্রের পারলে মতান্তরে দেওঘরে বৈদ্যনাথ ১১)মহারাষ্ট্রের ভীমাশঙ্কর ও ১২)মহারাষ্ট্রের ঘৃষ্ণেশ্বর 

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

এছাড়া পঞ্চভূত লিঙ্গ গুলি হলো –

  • কালহস্তিশ্বর,
  • জম্বুকেশ্বর,
  • অরুনাচলেশ্বর,
  • একামবারেশ্বর ও 
  • চিদাম্বরম নটরাজ। 

সাকার শিব ও তাঁর প্রতীক – শিবের মাথায় অর্ধচন্দ্র সময়ের সাথে আত্ম বিকাশ,ত্রিশূল– সৃষ্টি স্থিতি ও প্রলয়,জটা – সৃষ্টির গঠনগত দিক, গঙ্গা– জ্ঞানের প্রবাহ,ত্রিনেত্র– অভ্যন্তরীণ শক্তিদৃষ্টি, নীলকণ্ঠ– জগতের বিষ হরণকারী যা তাঁর স্পর্শে সকল অমঙ্গল দূর হয়ে মঙ্গল সূচক কার্য্যে পরিণত হয়,বাসুকি নাগ- নির্ভীকতা,রুদ্রাক্ষ– জ্ঞান ও ধ্যান, ডমরু– মহাজাগতিক সৃষ্টির শব্দ, ব্যাঘ্র চর্ম পশুবৃত্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ ও  অর্ধনারীশ্বর রূপ ব্রহ্ম শক্তির প্রতীক। 

শিবপুজো বিধি – পুজোর পূর্বরাত্রে ভক্ত সাত্ত্বিক আহার গ্রহণ করে। চতুর্দশী তিথি তে উপবাসের সাথে স্নান পূর্বক পবিত্র হয়ে সাধক পুজো শুরু করে। প্রথম প্রহরে দুধ, দ্বিতীয় প্রহরে দই, তৃতীয় প্রহরে ঘি এবং চতুর্থ প্রহরে মধু দ্বারা শিবলিঙ্গের স্নানাদি সম্পন্ন করা হয়। ধুতরা ফুল ও বেলপাতা মহাদেবের পুজোর অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। শুদ্ধ পবিত্রতাই শিব পুজোর প্রকৃত বিধি। 

শিব মন্ত্র ও স্তোত্র

মহা মৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র    

ওঁ ত্র্যম্বকং  যজামহে সুগন্ধিম পুষ্টিবর্ধনম
উর্বারুকমিব  বান্ধোনান  মৃত্যুর-মুক্ষীয় মামৃতাৎ

মহা ঋষি মার্কন্ড দ্বারা রচিত শিব মন্ত্রটি একটি অতি শক্তিশালী মন্ত্র এবং মনে করা হয় এটি অকাল মৃত্যুও রোগ ভয় ও দুশ্চিন্তা বিনাশক। 

বিভিন্ন শিব স্তোত্র এর মধ্যে লঙ্কাধিরাজ রাবন রচিত শিব তান্ডব স্তোত্রটি বিখ্যাত। মনে করা হয় এটি পাঠ করলে ভক্ত মানসিক শান্তি লাভ ও যেকোনো সমস্যা থেকে মুক্ত  হতে পারে। 

“ওঁ নমঃ শিবায়” কি মহামন্ত্র?

এটা জেনে সবাই আশ্চর্য হবেন যে মন্ত্র  “ওঁ নমঃ শিবায়” কিন্তু মহামন্ত্র নয়। তবে এটি সর্বজনবিদিত মন্ত্র ও সকলের প্রিয়। তাই নিজের নিজের আধ্যাত্বিক স্তর নির্বিশেষে সকলেই এই মন্ত্রোচ্চারণ করতে পারেন, ও সুফল পেতে পারেন। 

এই মানবশরীরের সকল আধ্যাত্মীক ধ্যানের মধ্যে শিবধ্যান সবচেয়ে আদী ও অনন্ত। আর মহাধ্যানের বীজমন্ত্রও সবচেয়ে প্রাচীন। তবে এটি গুপ্ত বীজমন্ত্র, তাই বিনা পরম্পরায় এই মন্ত্র ধারণ, ধ্যান ও আধ্যাত্মীক উপলব্ধি অসম্বব। মন্ত্রগুপ্তির কারণে এই বিষয়ে এটুকুই আলোচনা করা হল।  

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

শিব পুজোর মাহাত্ম্য

শিব ও শক্তি বা পরম পুরুষ ও প্রকৃতির লীলা প্রত্যক্ষ করাই হলো সাধনের উদ্দেশ্য। শ্রী রামকৃষ্ণ বলেন -”শিব লিঙ্গের পুজো মানে মাতৃ স্থান ও পিতৃ স্থানের পূজা। ভক্ত এই বলে পুজো করে – ঠাকুর দেখো যেন আর জন্ম না হয়। শোনিত শুক্রের মধ্য দিয়ে মাতৃ স্থান দিয়ে আর যেন আসতে  না হয়।”

সুত সংহিতায় ভগবান সূত বলেন – লিঙ্গ হলো পরম জ্ঞান। চিদ্রূপে তিনিই পরিব্যাপ্ত। তাঁর প্রকৃত রূপ জেনে মানুষ নিজেকে জানতে পেরে মুক্তি লাভ করে। তাই মুক্তিলাভকামী মানুষ মহাশিবরাত্রিতে জগতের সেই এক চৈতন্যকেসৎ চিৎ ও আনন্দ রূপে অনুভবের প্রেরণায় মহাসমারোহেশিবচতুর্দশী পালন করে থাকে।  

মহাশিবরাত্রি ২০২৬

এই বছরের শিব চতুর্দশী শুরু হতে চলেছে ১৫ই ফেব্রুয়ারী রবিবার বিকেল ৫টা ৪ মিনিটে ও তিথি সমাপ্ত হবে ১৬ই ফেব্রুয়ারী সোমবার  বিকেল ৫টা বেজে ৩৪ মিনিটে। রাত্রি প্রথম প্রহরের পূজা সময় ১৫ই ফেব্রুয়ারী সন্ধ্যা ৬টা ১১ থেকে ৯ টা ২৩ অবধি। দ্বিতীয় প্রহর রাত্রি  ৯টা ২৩ থেকে ১২টা ৫৬ অবধি। তৃতীয় প্রহর ১২ টা  ৩৫ থেকে পরেরদিন ভোর ৩টা ৪৭ অবধি এবং চতুর্থ প্রহর ১৬ই ফেব্রুয়ারী ভোর ৩টা ৪৭ থেকে ৬টা ৫৯ পর্যন্ত। নিশ্চিত কাল পূজা সময় ১৬ তারিখ রাত্রি ১২টা ৯ থেকে ১টা ১ পর্যন্ত। 

শিবরাত্রি প্রহর কাল:

ইংরেজি ২০২৬ সালের শিবরাত্রি পড়েছে ১৫ ফেব্রুয়ারী রবিবার। আবার যাঁরা পরাহে ব্রত পালন করেন তাঁদের জন্য হবে ১৬ ই ফেব্রুয়ারী সোমবার।
যদিও সোমবার শিবরাত্রি শুনলে অনেকেই অত্যন্ত আনন্দ পান কিন্তু রবিবার শিবরাত্রির বিশেষ গুরুত্ব আছে।

আমরা সবাই জানি শিবরাত্রি রাত্রিকালীন পুজা এবং চার প্রহর ব্যাপী পুজা। কলকাতা এবং কাছাকাছি অঞ্চলে চার প্রহরের বিভাগ মোটামুটি নিম্নরূপ।Raise Your Concern About this Content

রাত্রী প্রথম প্রহর Time – 05:33 PM to 08:42 PM
রাত্রী দ্বিতীয় প্রহর Time – 08:42 PM to 11:50 AM
রাত্রী তৃতীয় প্রহর Time – 11:50 AM to 03:00 ( Feb 16 হয়ে যাচ্ছি ইংরেজি মতে )
রাত্রী চতুর্থ প্রহর Time – 03:00 AM to 06:08 AM, Feb 16
চতুর্দশী তিথি শুরু হবে – সন্ধ্যা 05:04 PM on Feb 15, 2026
চতুর্দশী তিথি শেষ হবে – 05:34 PM on Feb 16, 2026
শুধু নিশীথ কালে একবার পুজো করতে চাইলে ১৫ ই ফেব্রুয়ারী রাত্রী ১১:২৫ থেকে রাত্রী ১২:১৬ পর্যন্ত সময়ে করা যাবে।
সবটাই দৃকসিদ্ধান্ত মতের হিসেব।
ভগবান সদাশিব শুদ্ধ জ্ঞান প্রদায়ক হোন এই প্রার্থনা করি। তিঁনিই গুরু তিঁনিই ত্রাতা। তাঁর কৃপায় তাঁর নির্দেশিত তন্ত্রমার্গে ভগবতীর শ্রীচরণ প্রাপ্তি হয়। 

তথ্যপঞ্জি

১) উইকিপিডিয়া 
২) শ্রী শ্রী শিবলিঙ্গ বাণলিঙ্গ ও জ্যোতির্লিঙ্গ 
৩) শিবলিঙ্গের বাস্তবিক অর্থ
৪) শিবগীতা 

শীতকাল মানেই বাঙালীর পিকনিক: পিকনিকের ইতিকথা

পিকনিকের ইতিহাস 

পিকনিক শব্দটি এসেছে ফরাসি Pique-nique থেকে।১৭শ শতকে ফ্রান্সে এই শব্দের ব্যবহার দেখা যায়। যার অর্থ বন্ধুদের মিলন ভোজ। সেখানে সবাই নিজের মতো করে খাবার নিয়ে আসতো। এরপর ইংল্যান্ডের শিল্প বিপ্লবের সময় ব্যস্ত জীবন থেকে মুক্তি পেতে  মানুষ অবসর সময় বিনোদন হিসাবে পিকনিক কি বেছে নেয়। পার্ক,লেক গ্রামাঞ্চলে গিয়ে একটুক নিজের মত সময় কাটানো কে টিকটিকির রূপ পায়। পরে এর ছোঁয়া এসে পড়ে ভারত ও উপমহাদেশে। ব্রিটিশ শাসনামলে পিকনিকের ধারণা ভারতে এসে ভারতীয় স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে যায় সেই থেকে চলছে পিকনিকের প্রচলন। 

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

বাঙালি পিকনিকের ইতিহাস 

বাঙালি পিকনিকের ধারণা মূলত ব্রিটিশ শাসনামলে জনপ্রিয় হয়। ইংরেজ সাহেবদের আউটিং বা পিকনিক পার্টি দেখে কলকাতার শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজ এ ধারণাকে আপন করে নেয়। এই সময় শীতকালে গঙ্গার ধারে বাগানবাড়িতে বা একদিনের ভ্রমণ চলতো। সেই থেকে শুরু হয় বাঙ্গালীদের পিকনিক এর প্রথা।  

বাবু সংস্কৃতি ও নবজাগরণ 

আমাদের বাঙালী সংস্কৃতিতে এই পিকনিক ঢুকলো কবে থেকে।এটাতো প্রশ্ন এসেই যায়। তাই না? তাহলে বলি শোন ,নবজাগরণের সময় কলকাতার বাবুসমাজ পিকনিককে আড্ডা, সাহিত্যচর্চা, গান ও নাটকের সঙ্গে যুক্ত করে। পরিবারের পাশাপাশি বন্ধু ও সহকর্মীদের নিয়ে দলবদ্ধভাবে যাওয়ার রেওয়াজ গড়ে তুলে। 

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

বাঙালীর আধুনিক পিকনিক 

বর্তমানে পিকনিক শুধু খাবার নয় -ভ্রমণ, খেলাধুলা, গান বাজনা ও প্রকৃতির সঙ্গে সময় কাটানো সুযোগ।স্কুল, অফিস, পরিবার আধুনিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কৃতি। 

গ্রাম বাংলা ও বনভোজন 

গ্রাম বাংলায় পিকনিক বনভোজন নামে পরিচিত। শীতকালে ফসল কাটার পর খোলা মাঠে, নদীর চরে, আম বাগানে বনভোজন ছিল আনন্দের উপলক্ষ। 

আধুনিক সময় পিকনিক 

সময় পাল্টেছে।ব্যস্ততাও বেড়েছে।বর্তমান সময়ে পিকনিকের জন্য আর খোলা মাঠ খুঁজে পাওয়া কঠিন। তাই স্কুল অফিস, ক্লাব পিকনিক, রিসোর্ট, ইকোপার্ক, পাহাড়, সমুদ্র পর্যন্ত বিস্তৃত। পিকনিকের জায়গা কম তাই এখন সবাই মিলে দলবেঁধে কোথাও গিয়ে একটু নিজেদের মতন করে রান্নাবান্না খেলাধুলা আনন্দ করে দিন কাটাতে বেছে নেওয়া হচ্ছে বিভিন্ন জায়গা। 

  • আধুনিক জীবনে পিকনিকের অপরিহার্যতা
    • বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি 

বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে পিকনিক বা বনভোজনের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। এটি কেবল আনন্দদায়ক ভ্রমণ নয়, বরং মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর এর ইতিবাচক প্রভাব বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত।

  • মানসিক প্রয়োজনীয়তা 
    • শারীরিক প্রয়োজনীয়তা 

১. মানসিক চাপ হ্রাস (Reduction of Cortisol)

প্রকৃতির মাঝে সময় কাটালে মানবদেহে কর্টিসল (Cortisol) নামক স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা কমে যায়। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, সবুজের সান্নিধ্য মস্তিষ্কের ‘প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্স’কে বিশ্রাম দেয়, যা মানসিক ক্লান্তি দূর করে এবং দুশ্চিন্তা কমায়। 

২. ভিটামিন-ডি এর উৎস (Vitamin D Synthesis)

পিকনিক সাধারণত দিনের বেলা খোলা জায়গায় হয়। সূর্যালোকের সংস্পর্শে আসায় শরীরে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন-ডি তৈরি হয়। এটি হাড়ের গঠন মজবুত করে এবং শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা (Immune System) বৃদ্ধি করে। [২]

৩. মনোযোগ ও সৃজনশীলতা বৃদ্ধি (Attention Restoration Theory)

মনোবিজ্ঞানের ‘অ্যাটেনশন রিস্টোরেশন থিওরি’ (ART) অনুযায়ী, শহরের যান্ত্রিক কোলাহল থেকে দূরে প্রকৃতির শান্ত পরিবেশে থাকলে মানুষের মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতা এবং সৃজনশীল চিন্তা বৃদ্ধি পায়। এটি মস্তিষ্কের নিউরনগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করতে সাহায্য করে। [৩]

৪. সামাজিক বন্ধন ও অক্সিটোসিন নিঃসরণ (Social Bonding)

পিকনিকে বন্ধু-বান্ধব বা পরিবারের সাথে দলগত কাজ (যেমন: রান্না করা, খেলাধুলা) করলে শরীরে অক্সিটোসিন (Oxytocin) হরমোন নিঃসৃত হয়। একে ‘লাভ হরমোন’ বলা হয়, যা মানুষের মধ্যে সামাজিক বিশ্বাস, নিরাপত্তা এবং পারস্পরিক সম্পর্কের গভীরতা বাড়ায়। 

৫. শারীরিক ব্যায়াম (Physical Activity)

পিকনিকের সময় আমরা সাধারণত হাঁটাচলা, দৌড়াদৌড়ি বা আউটডোর গেমসে অংশ নিই। এই বাড়তি শারীরিক পরিশ্রম রক্ত সঞ্চালন স্বাভাবিক রাখে এবং হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়।

৬. সতেজ অক্সিজেন ও ফুসফুসের কার্যকারিতা

শহরের দূষিত বাতাসের তুলনায় বনাঞ্চল বা খোলা মাঠের বাতাস অনেক বেশি নির্মল ও অক্সিজেন সমৃদ্ধ। সতেজ অক্সিজেন গ্রহণের ফলে ফুসফুসের কার্যকারিতা বাড়ে এবং শরীরের প্রতিটি কোষে নতুন প্রাণের সঞ্চার হয়।

  • গ্রাম বাংলা ও বনভোজন / চড়ুইভাতি আধুনিক জীবনে পিকনিকের অপরিহার্যতা

গ্রাম বাংলা ও বনভোজন বা চড়ুইভাতি বাঙালির বারো মাসের তেরো পার্বণের মতোই আনন্দদায়ক এক উৎসব। বিশেষ করে শীতকাল এলেই গ্রামবাংলার প্রান্তরে প্রান্তরে চড়ুইভাতির আমেজ ছড়িয়ে পড়ে।

গ্রামের বনভোজন ও চড়ুইভাতির কিছু মূল বৈশিষ্ট্য ও নস্টালজিয়া নিচে তুলে ধরা হলো:

১. চড়ুইভাতি বনাম বনভোজন

  • চড়ুইভাতি: এটি সাধারণত ছোট পরিসরে, পাড়ার বন্ধু-বান্ধব বা শিশুদের নিয়ে হয়। “চড়ুই পাখির মতো অল্প ভাত খাওয়া” বা সামান্য আয়োজন থেকে এর নাম হয়েছে চড়ুইভাতি । এটি প্রায়ই বাড়ির আঙিনায়, কোনো বাগান বা বাগিচায় হয় ।
  • বনভোজন: এটি একটু বড় পরিসরে এবং সাধারণত কোনো মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশে যেমন নদীর তীর, পার্ক বা ঐতিহাসিক স্থানে আয়োজন করা হয় । 

২. গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী চিত্র

  • আয়োজন: গ্রামে অঘ্রাণ মাসে ধান কাটার পর ফাঁকা মাঠে চড়ুইভাতির ধুম পড়ে । আঞ্চলিক ভাষায় একে অনেক সময় ‘তুফাতি’ বা ‘ভুলকা ভাত’ ও বলা হয়।
  • রান্না ও সরঞ্জাম: মাটির উনুনে লাকড়ি বা শুকনো পাতা দিয়ে রান্না করার মজাই আলাদা । সবাই বাড়ি থেকে চাল, ডাল, লবণ বা সবজি সংগ্রহ করে এই প্রীতিভোজের আয়োজন করে ।
  • মেনু: সাধারণত খিচুড়ি, ডিমের কারি বা শীতকালীন সবজি দিয়ে সাধারণ মেনু থাকলেও খোলা আকাশের নিচে মাটির হাঁড়িতে রান্না করার কারণে সেই স্বাদ হয় অতুলনীয় ।

৩. আনন্দ ও নস্টালজিয়া

  • সামাজিক বন্ধন: পিকনিক বা চড়ুইভাতি কেবল খাওয়ার আয়োজন নয়, বরং এটি হাতে হাত রেখে কাজ করা এবং পারস্পরিক ঐক্য ও সম্প্রীতি বাড়াতে সাহায্য করে।
  • খেলাধুলা ও বিনোদন: রান্নার ফাঁকে চলে ব্যাডমিন্টন, লুডু বা তাস খেলা। কখনো কখনো গান-বাজনা বা বিচিত্রানুষ্ঠানও এই আনন্দকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয় ।

৪. আধুনিক রূপান্তর

সময়ের সাথে সাথে গ্রাম বাংলার সেই আদি চড়ুইভাতির রূপ অনেকটা বদলে গেছে। এখন অনেক ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক পিকনিক স্পট বা ক্যাটারিং সার্ভিসের মাধ্যমে পিকনিক হয় । তবুও শৈশবের সেই খেত থেকে পেঁয়াজ চুরি করে আনা বা বাড়ির বড়দের চোখ এড়িয়ে রান্নাবাটি খেলার মতো চড়ুইভাতি আজও বাঙালির হৃদয়ে চিরস্থায়ী স্মৃতি হয়ে আছে

পিকনিকের  ম্যানু

ভোজন প্রিয় বাঙালির পিকনিক মানে নানা রকম খাওয়া দাওয়া। যেখানে থাকতে হবে ফ্রাইড রাই, ভেজিটেবল পোলাও, চিলি চিকেন, মাটনকারী, ফিস ফ্রাই, কষা মাংস ইত্যাদি। পিকনিকে গানের তালে তালে বা খেলার সময় হাতে একটু বেগুনি, পিয়াজি, সিঙ্গারা এগুলো না হলে কি হয়? শেষ পাতে একটু কিন্তু পায়েস রসগোল্লা বা অন্যান্য মিষ্টির পদ একটা চাই চাই।মোটকথা পিকনিকে যাব খাওয়া-দাওয়া যেন ঠিকঠাক হয়। বাচ্চাদের জন্য চকলেট, চিপস পপকন এগুলো নিয়ে নিতে হয়।Raise Your Concern About this Content

জীবনের ব্যস্ততায় বদলে গিয়েছে বাঙালির পিকনিক 

সময়ের বড্ড অভাব তাই গেছে বাঙালির পিকনিক। পরিবারের স্ত্রী পুরুষ সবাই ছুটছে কাজে তাই এখন আর ভোট ঘর থেকে নিজেরা রান্না করে নিয়ে যাওয়াটা কষ্টকর হয়ে যায়। আমি যেখানে মা কাকিমারা বাড়ি থেকে খাবার তৈরি করে নিয়ে যেত সেখানে এখন ক্ষনিকের জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছে  ক্যাটারারদের। কি করা যাবে ব্যস্ত একটুক তো শান্তি দরকার। একটু নিজেদের মতন সময় কাটাতেই ই আয়োজন। তাই রান্নার ভারটা যদি ক্যাটারারদের হাতে চলে যায় তাহলে কিছুটা নিষ্কৃতি। 

 কলকাতায়  কিছু  পিকনিক স্পট

কলকাতার কয়েকটি উল্লেখযোগ্য পিকনিক স্পট হল 

১. ইকোপার্ক নিউ টাউন (কলকাতা) 

       সুন্দরভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা লন,লেক ও সাইক্লিং ট্রাক, 

       পরিবার ও স্কুল পিকনিকের জন্য আদর্শ। 

২.প্রিন্সেপ ঘাট (কলকাতা) 

    উপনিবেশিক সৌন্দর্য সহ নদীর ধারের পিকনিক 

   স্বল্প সময়ে ভ্রমণ ফটোগ্রাফি ও সন্ধ্যার পিকনিকের জন্য উপযুক্ত। 

৩.আলিপুর চিড়িয়াখানা : ছোটদের নিয়ে পিকনিকের জন্য এটি একটি চিরকালীন পছন্দের জায়গা।

৪.ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল (Victoria Memorial): শহরের হৃদকেন্দ্রে অবস্থিত এই ঐতিহাসিক স্থানের বিশাল চত্বর পারিবারিক ভ্রমণের জন্য আদর্শ।

উত্তরবঙ্গের আশেপাশের কিছু পিকনিক স্পট / আউটিং স্পট

১.রায়চক অন গঙ্গা (দক্ষিণ 24 পরগনা) 

     গঙ্গার মনোরম দৃশ্য 

     রিসোর্ট বাগান ও খোলা জায়গা 

     অফিস পিকনিকের জন্য জনপ্রিয় 

২.ডায়মন্ড হারবার 

   শান্তর নদীর তীরবর্তী গন্তব্য 

৩.শান্তিনিকেতন (বীরভূম) 

    সংস্কৃতিক ও প্রাকৃতিক পরিবেশ 

   শীতকালে ও পৌষ মেলার সময় সবচেয়ে ভালো 

    শিল্প ও ঐতিহ্য ঘেরা শান্ত পিকনিক 

৪.মন্দারমনি 

   সমুদ্রতটে পিকনিক স্পট 

    শীতকালই সেরা সময় 

৫.গাদিয়াড়া (হাওড়া) 

      দামোদর ও রূপনারায়ণ নদীর সঙ্গমস্থল 

     সবুজ খোলা জায়গা 

৬.সুশুনিয়া পাহাড় (বাঁকুড়া) 

    প্রকৃতি পাহাড় ও প্রাচীন শিলালিপি 

    অ্যাডভেঞ্চার প্রেমী ও পিকনিকের জন্য ভালো 

৭.মুকুটমণিপুর 

    বাঁধ, বনাঞ্চল ও বিস্তৃত প্রাকৃতিক দৃশ্য 

৮.বোটানিক্যাল গার্ডেন , শিবপুর

 প্রকৃতির মাঝে বড় বটগাছের নিচে বসে পিকনিক করার জন্য এটি সেরা জায়গা।

৯.বনবিতান বা সেন্ট্রাল পার্ক , সল্টলেক: শহরের ভেতরে এটি দ্বিতীয় বৃহত্তম খোলা জায়গা, যেখানে লেক এবং নানা রঙের বাগান রয়েছে।

একটু নিরিবিলি বাগানবাড়ি ও রিসোর্ট (বুকিং প্রয়োজন)

  • নীলদীপ গার্ডেন (Neeldeep Garden): আমতলা-বারুইপুর রোডে অবস্থিত এই বাগানবাড়িটি বড় দল বা ফ্যামিলি পিকনিকের জন্য জনপ্রিয়।
  • রায় কুঠির পিকনিক গার্ডেন (Roy Kuthir): রাজারহাটের কাছে অবস্থিত এই স্পটটি সুপারি গাছের বাগান এবং পরিচ্ছন্ন পরিবেশের জন্য পরিচিত ।
  • শান্তিনিকেতন পিকনিক স্পট, বোটানগর: গঙ্গার তীরে অবস্থিত এই স্পটটি নিরিবিলি পরিবেশের জন্য উপযুক্ত।

পিকনিকের পরিকল্পনা করার আগে বর্তমান ভিড় এবং প্রবেশ মূল্য জানতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করা বা Tripadvisor-এর মতো ওয়েবসাইট দেখে নেওয়া ভালো।

এই হল কিছু প্রসিদ্ধ পিকনিক স্পট। এছাড়াও বিভিন্ন জায়গায় পিকনিকের আয়োজন হয়ে থাকে। এককথায় বলা চলে পিকনিক মানুষের সামাজিকতা, অবসর ও প্রকৃতি প্রেমের ইতিহাস কে এক সূত্রে বেঁধে রেখেছে। বাঙালির কাছে পিকনিক মানে খাওয়া-দাওয়া নয় এটি একটি সামাজিক অনুষ্ঠান যা বন্ধুদের সাথে শীতের দিনে আনন্দ করার একটি ঐতিহ্যবাহী উপায়।একটু প্রেমুএকটু খেলা ধুলা,খাওয়া দাওয়া।আর একটু একটু মুহূর্তে গড়ে উঠে চীরস্মৃতির গল্প।কিছু বিশেষ মুহূর্ত যা মনের কোনে থেকে যায় সারাজীবন।

তথ্যসূত্র:

  • হার্ভার্ড হেলথ: প্রকৃতির স্বাস্থ্যের উপকারিতা
  • ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ হেলথ: ভিটামিন ডি এবং সূর্যালোক
  • KOLKATA TRAVEL GUIDE 2025
  • The Complete Kolkata Travel Guide 2026

 আমাদের ছোট বেলার সরস্বতী পুজো; কিছু স্মৃতিচারণ –

 মাঘ মাসের এই বিশেষ দিনটিতে কনকনে শীতের ভোর বেলা কুয়াশার চাদর সরিয়ে গায়ে কাঁচা হলুদের প্রলেপনে স্নান সেরে শুদ্ধ হয়ে শুরু হতো আমাদের পুজো। সাথে ছিল কিছু রীতি-নিয়ম। পোশাক পরিধানে হলুদ অথবা সাদা রংই বেছে নেওয়া হতো। শ্বেত শুভ্র অথবা বাসন্তী শাড়িতে মা সরস্বতীর প্রতিমার সামনে সাজানো পুষ্পপত্রে হলুদ কমলা গাঁদার মধ্যে উঁকি দিতো লাল উজ্জ্বল পলাশ ফুল। বাকদেবী মায়ের ভোগ হিসাবে উৎসর্গীকৃত থাকতো নৈবিদ্য, খইয়ের মুড়কি, নারকোলের নাড়ু সহযোগে লুচি মিষ্টি খিচুড়ি পায়েস ইত্যাদি। নিষেধের কুল ফল মান্যতা পেত। পুজো সমাপ্তে বেলপাতায় ওম শ্রী সরস্বত্যৈ নমঃ মন্ত্র দোয়াতে ডুবিয়ে খাগ দিয়ে লেখা ছিল এক অনিবার্য নিয়ম। ঠাকুরদার কোলে বসে নতুন শ্লেট এ হাতেখড়ির শুভ অনুষ্ঠান সম্পন্ন হতো সদ্য অ-আ-ক-খ-১-২-A-B-C-D শেখা ভাই-বোনদের। 

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

স্কুল কলেজের পুজোগুলির পাশাপাশি তখন পাড়ায় পাড়ায় অলিতে গলিতে ছোট মাঝারি বিভিন্ন আকারের পুজো দেখা যেত।কচিকাঁচারা মন্ডপ সাজাতো তাদের নিজস্ব শৈলীতে। তাতে থাকতো অপটু হাতে তৈরী নানা ডেকরেশন, সাদা কাগজের ওপর রঙিন কোলাজ বা পাট কাঠিতে সাজানো মণ্ডপের ছাঁদ। পাড়ার মধ্যেই কোনো  কোনো বাড়ি ঘেসে তৈরী হতো সরস্বতী পুজোর অস্থায়ী তাবু প্যান্ডেল, তাতে সারা রাত জেগে মন্ডপ তৈরির সাথে চলতো আড্ডা গল্প চা সিঙ্গারা মুড়িমাখার এক অনবদ্য সমন্বয়। কচিকাঁচাদের যে ব্যাস্ততায় রাত শেষ হয়ে যেত, হয়তো সময় ধরে এগোলে তা পূর্ণ হয়ে যেত সহজেই। তবুও শেষ রাতের পরে থাকা কাজ অতি দ্রুত ব্যাস্ত হাতে  নামানো যেন, ছোট হয়েও বিরাট কিছু করার দারুন অভিজ্ঞতা সঞ্চয়। পুজোর দুমাস আগে থেকেই চলতো চাঁদা তোলার পর্ব। আর তাতে পরিকল্পনার অভাব ছিলোনা। ঘরে ঘরে ঢুকে প্রতিবেশীদের থেকে চাঁদা তোলার ব্যাপারে বড়রা এগিয়ে দিতো ছোটদের, পাড়ার কোনো কাকু  চাঁদার বদলে বকা দিলে বড়দের মান সম্মানে লাগার ব্যাপারটা এড়ানো যেত, কিন্তু মুশকিল হতো চাঁদায় তাদের নাম লেখার সময় , সবে স্বরবর্ণ ব্যাঞ্জন বর্ণের পাঠ শিখে নামের যুক্তাক্ষর গুলো ভুল হয়ে যেত। Raise Your Concern About this Content

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

এরপর শুরু হতো রাত জাগা পরিকল্পনা – মন্ডপ প্রতিমা কেমন হবে ? কচিকাঁচাদের মাথা থেকে ধারণার ছবি স্পষ্ট হলে চলতো তা রূপায়ণের কাজ। শীতের সময়ের পুজো বলে তখন প্রায় সব বাড়িতেই ডালিয়া চন্দ্রমল্লিকা শোভা পেতো ,আর তা থেকেই এ বাড়ি ও বাড়ি থেকে বয়ে আনা ফুলের টবে চলতো মণ্ডপের শোভা বাড়ানোর কাজ। শেষে পুজো শুরুর মাহেন্দ্রক্ষণ পেরিয়ে গেলে চলতো এ পাড়া ও পাড়াতে পুজো শেষ করে ফেরা পুরোহিতের খোঁজ। 

জয় জয় দেবী চরাচর সারে কুচযুগ শোভিত মুক্ত হারে বীণা রঞ্জিত পুস্তক হস্তে ভগবতী ভারতী দেবী নমস্তে – এই মন্ত্রেই ছোট ছোট হাতে ধরে রাখা ফুল পুষ্পাঞ্জলি হয়ে ঝরে পড়তো মা সরস্বতীর পায়ে। পুজো নির্বিঘ্নে শেষ হওয়ার পর চলতো পরের কয়েকদিনের প্রস্তুতি। তাতে থাকতো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বাংলা ব্যান্ড এর জমজমাট রক আর পপ, বসে আঁকো প্রতিযোগিতা, কুইজ, শঙ্খ ধ্বনি, মিউজিক্যাল চেয়ার, হাড়িভাঙ্গা, একটি কাঠিতে কত মোমবাতি জ্বালানো যেতে পারে সেই সব মজাদার প্রতিযোগিতা। তাতে পুরস্কার থাকতো বলা বাহুল্য। শেষে খিচুড়ি বাঁধাকপি চাটনি পায়েস দিয়ে পরিপূর্ণ হতো আমাদের ছোটবেলার পাড়ার সরস্বতী পুজো। 

স্কুলের পুজোর আনন্দ ছিল আর এক রকম। সেখানে কয়েক সপ্তাহ আগে থেকে বসত আনন্দের হাট। যেমন সব বন্ধুরা মিলে বিভিন্ন স্কুলকে আমন্ত্রনের চিঠি দিয়ে আসা, পুজোর আগে ভোগ প্রসাদের নতুন আলুর খোসা, কড়াইশুঁটির দানা ছাড়ানো,একসাথে বসে প্রসাদ গ্রহণ ইত্যাদি। স্কুলের কাজ অথচ তা রুটিনের বাইরে -সে এক ভীষণ আনন্দের দিন ছিল। 

শাড়ি ও পাঞ্জাবির চিরকালীন যুগল বন্দি  – সরস্বতী পুজো আর সাথে শাড়ি ও পাঞ্জাবি পরিধান ও তার জনপ্রিয়তা  বহুদিনের। পুজোর দিন ছোট ছোট মেয়েদের জড়ানো হলুদ শাড়ি আর ছোট ছেলেদের পরিহিত পাঞ্জাবির দৃশ্য সত্যি মজাদার। ছোটবেলার সেই সব নয়নাভিরাম দিন গুলো আজও বর্তমান। বছরের অন্যান্য দিন হোক না হোক, এই পুজোর দিনটি বাঙালি কন্যার শাড়ি পরিধান চাইই । 

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

বর্তমান প্রজন্ম -হাতের কাছে স্মার্ট ফোনে হয়তো গোটা দুনিয়া আছে, কিন্তু স্মৃতির মনিকোঠায় রত্ন- উজ্জ্বল সেই সব আনন্দ গুলো এখন ফিকে। এখন “শো অফ” এর সেলফিতে প্রানোজ্জ্বল অনুভূতি আর নেই। হয়তো সময় যে আবহে চলছে তাতে এটাই স্বাভাবিক। এই অনুভূতি বেদনাদায়ক তো বটেই সাথে আছে এই প্রজন্মকে তা সেই ভাবে ফিরিয়ে দিতে না পারার এক ব্যর্থতা বোধ।  

পুজোর শ্বাশ্বত আধ্যাত্মিক দিক : সৃষ্টি তত্ত্বের রূপক প্রজাপতি ব্রহ্মহা। তাঁর দৈবী শক্তি হলেন মা সরস্বতী। মায়ের শ্বেত শুভ্র রং বিশুদ্ধতার প্রতীক। বিদ্যার্থী নিষ্কলঙ্ক চরিত্রের অধিকারী হবে- তারই রূপক হিসাবে শ্বেত বসন। দেবী সরস্বতীর বাহন রাজঁহাস – যে দুধে জলে মিশে গেলে তার থেকে শুদ্ধ দুধ টুকু আহরণ করে নিতে পারে। এক্ষেত্রে সমাজে অনেক কলুষতা থাকলেও ছাত্র ছাত্রীরা শুধু ভালো দিকটিকে আদর্শ করে নেবে। 

Reference : 

১) আনন্দবাজার

২) সংবাদ প্রতিদিন 

৩) উইকিপিডিয়া 

৪) ব্রিটানিকা 

৫) টাইমস অফ ইন্ডিয়া 

বাংলার কল্পতরু উৎসব : ১৮৮৬ থেকে ২০২৬ : ইতিহাস থেকে আধ্যাত্ম্য

“যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত।
অভ্যুত্থানম অধর্মস্য তদাত্মানং সৃজাম্যহম্॥

 পয়লা জানুয়ারী দিনটি ঠিক চলছিল অন্যান্য সালের ইংরেজি নববর্ষ এর মতোই। তবে ওই দিনই ঘটে গেলএক অভূতপূর্ব ঘটনা, সাক্ষী হয়ে রইল উত্তর কলকাতার কাশীপুর উদ্যানবাটী, আর একদল ভক্ত-বৃন্দ। মানব দেহে কর্কট রোগে আক্রান্ত, অসুস্থ শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংস  ঠাকুর কল্পতরু রূপে এদিন তাঁর ভক্তদের অকাতরে কৃপা বর্ষণ দ্বারা আশীর্বাদ করে বলেছেন – তোমাদের চৈতন্য হোক। আর তার পর থেকেই প্রত্যেক নতুন ইংরেজী বছরের প্রথম দিনটি কল্পতরু দিবস হিসাবে উদযাপিত হয়ে আসছে। সকল ভক্ত মাঝে ওই দিন ঠাকুর এই কল্পতরু রূপে ধরা দিয়েছিলেন বলেই দিনটি অঘোষিত কল্পতরু দিবস হয়ে উঠেছিল। সমগ্র মানব জাতির মঙ্গলের উদ্দেশ্যে এবং তাদের শুভ মনোবাঞ্ছা পূরণের আশীর্বাদ হেতু শ্রী শ্রী ঠাকুরের মর্ত্যলোকে আবির্ভাব ও কল্পতরু দিবসের স্মরণীয় উদযাপনের প্রাসঙ্গিকতা বর্তমান। 

সেদিন হঠাৎই অকল্পনীয় ভাবে পরম প্রিয় ঠাকুর তাঁর ভক্ত হৃদয় ছুঁয়ে দিয়েছিলেন, জাগিয়ে দিয়েছিলেন চেতনাকে, তার সাথে সব পাওয়ার শেষ পাওয়া – এক পরম আনন্দকে। সেই ছোঁয়া আধ্যাত্মীক নব জাগরণের স্রোত রূপে, সময় কাল নির্বিশেষে  চেতনা উন্মেষের লক্ষ্যে যেন এক ব্যাপ্তময় জ্যোতিরও জ্যোতি ভাবে বিরাজমান।   

কল্পতরু কি ?

শ্রী রামকৃষ্ণদেবের কল্পতরু রূপ ও কল্পতরু দিবসের কথা প্রায় সকলেই অবগত। কিন্তু এই কল্পতরু ঠিক কি এবং এর উৎপত্তিই বা কোথায় ?  

পৌরাণিক কাহিনী থেকে জানা যায় যে সমুদ্র মন্থনের সময় অমৃতের সন্ধান হেতু দেবতা ও অসুরগণ মন্দার পর্বত কে দণ্ড হিসাবে ব্যবহার করেছিলেন। আর এই মন্থনের সময়, সমুদ্রতল থেকে অমৃত এবং গরলের সাথে উঠে আসতে শুরু করেন –  শ্রী লক্ষ্মী, ঐরাবত নামক হস্তী, কামধেনু, উচ্চৈঃশ্রবা নামক অশ্ব, শঙ্খ আর সাথে পারিজাত নামক এক আশ্চর্য্য বৃক্ষ ( ইন্দ্রের উদ্যান এর নন্দন কানন স্থানের পারিজাত বৃক্ষ  যা’র কাছে যা চাওয়া যায় তাই পাওয়া যায়)। হরিবংশ পুরাণ  থেকে আরও জানা যায় যে স্বর্গের সেই পারিজাতের একটি মর্ত্যলোকে বর্তমান উত্তরপ্রদেশের বারাবাঙ্কি  জেলার কিন্টুর গ্রামে অবস্থিত। মহাভারতে মাতা কুন্তীর নামানুসারে গ্রামের নামকরণ এবং তাঁর চিতাভস্ম থেকে পারিজাত কল্পবৃক্ষ রূপান্তরিত হয়, এমনটি জানা যায়। অন্যদিকে শ্রীকৃষ্ণ, তাঁর পত্মীদ্বয় সত্যভামা ও রুক্মিণী কে স্বর্গ থেকে কল্পতরু পারিজাত  উপহার করেন বলে কথিত আছে। Raise Your Concern About this Content

শ্রী শ্রী ঠাকুর রামকৃষ্ণ ও কল্পতরু 

শ্রী শ্রী ঠাকুর রামকৃষ্ণ দেবের কথায় –ঈশ্বর কল্পতরু, তাঁর কাছে যেমনটি চাওয়া যায় তেমনটি পাওয়া যায়। কেউ সুখী সংসার, মোটা মাইনের চাকরি, সন্তানের মঙ্গল কামনা, নিজ নিজ ক্ষেত্রে সফলতা, খ্যাতি  আবার কেউ চায় ভক্তি মুক্তি জ্ঞান। যার যেমন ইচ্ছে – সে তাই পায়। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের মানসপুত্র স্বামী ব্রম্ভানন্দের কথায় – দেবত্ব চাইলে দেবত্ব, পশুত্ব চাইলে পশুত্ব।

নেপথ্য কাহিনী 

১৮৮৫, ১১ই ডিসেম্বর শ্যামপুকুর বাটী থেকে ঠাকুর পা রাখলেন কাশীপুর উদ্যানবাটীতে। ভগ্ন স্বাস্থ্য, প্রতিকূল পরিবেশ কারণ হিসাবে ধরে নিলে ডাক্তার মহেন্দ্রলালের পরামর্শে ও ভক্তগণের উদ্যোগে খোলামেলা উন্মুক্ত কাশীপুরের উদ্যানবাটীটি তাঁর সেবার জন্য নির্ধারণ করা হয়। গলরোগে শায়িত ঠাকুরের শ্রীদেহটি দেখলে ভক্ত হৃদয় যে হতাশা দুঃখের ঢেউ উদ্বেলিত হতো তা ব্যথিত চিত্তে তিনি অবগত ছিলেন। আর তার জন্যই হয়তো আগামী দিনের সূর্য্য উঠেছিল আশার আলোর প্রতীক হয়ে, এক দিব্য জ্যোতিকে উদ্ভাসিত করে। অবশেষে এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। 

১৮৮৬ র ঠাকুরের কল্পতরু হওয়ার বিবরণ 

 স্বামী সারদানন্দ জী‘র কথায়- “ ক্রমে পৌষ মাসের অর্দ্ধেক অতীত হইয়া ১৮৮৬ খ্রীষ্টাব্দের ১ লা জানুয়ারী উপস্থিত হইলো। ঠাকুর ওই দিন বিশেষ সুস্থ বোধ করায় কিছুক্ষণ উদ্যানে বেড়াইবার অভিপ্রায় প্রকাশ করিলেন। …ঐরূপে অপরাহ্ন ৩টার সময় ঠাকুর  যখন উদ্যানে বেড়াইবার জন্য উপর থেকে নিচে নামিলেন তখন ত্রিশজনেরও অধিক ব্যক্তি গৃহমধ্যে অথবা উদ্যানস্থ বৃক্ষসকালের তলে বসিয়া পরস্পরের সহিত বাক্যালাপে নিযুক্ত ছিল। তাঁহাকে দেখিয়াই সকলে সসম্ভ্রমে উত্থিত হইয়া প্রণাম করিল … কেহ কোন কথা কহিবার পূর্বেই ঠাকুর সহসা গিরিশ্চন্দ্রকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন, “গিরিশ, তুমি যে সকলকে এত কথা ( আমার অবতারত্ব সম্বন্ধে ) বলিয়া বেড়াও, তুমি ( আমার সম্বন্ধে ) কি দেখিয়াছ ও বুঝিয়াছ ?” গিরিশ উহাতে বিন্দুমাত্র বিচলিত না হইয়া তাঁহার পদপ্রান্তে ভূমিতে জানু সংলগ্ন করিয়া উপবিষ্ট হইয়া উর্দ্ধমুখে করজোড়ে গদগদ স্বরে বলিয়া উঠিল, “ ব্যাস-বাল্মীকি যাঁহার ইয়ত্তা করিতে পারেন নাই, আমি তাঁহার সম্বন্ধে অধিক কি আর বলিতে পারি।” গিরিশের অন্তরের সরল বিশ্বাস প্রতি কথায় ব্যক্ত হওয়ায় ঠাকুর মুগ্ধ হইলেন এবং তাহাকে উপলক্ষ্য করিয়া সমবেত ভক্তগণকে বলিলেন, “তোমাদের কি আর বলিব, আশীর্বাদ করি তোমাদের চৈতন্য হউক। “

কল্পতরু পরবর্তী আধ্যাত্মীক নবজাগরণ 

ঠাকুরের চিকিৎসক সনামধন্য ডঃ মহেন্দ্রলাল সরকার মহাশয়ের কথায়- “ভবিষ্যৎ জগৎ বুঝিতে পারিল যে কাশীপুরের বাগানে কী এক অভূতপূর্ব ভাবের উৎস্য উঠিয়াছিল, যাহাতে সমস্ত জগৎ স্তম্ভিত হইয়া যাইলো। … ভিতরকার যত ভালোবাসা উচ্চভাব ও মহতীশক্তি একসঙ্গে প্লাবন স্বরূপ অল্পদিনের মধ্যে এই স্থানে বিকাশ করিয়া ছিলেন।” 

স্বামী প্রভানন্দ জী‘র কথায়– “কখন কখনও এই অপার্থিব ভালোবাসা উচ্ছলিত হয়ে উঠেছিল। এইরূপ বিশেষ একটি দিন ১৮৮৬ সালের ১ লা জানুয়ারি। সেদিন ভগবান শ্রী রামকৃষ্ণ সর্বজনসমক্ষে তাঁর ‘নিষ্কারণ ভকত-শরণ’ স্বরূপটি অপাবৃত করেছিলেন, তাঁর প্রেমভাণ্ডখানি ভেঙে দিয়েছিলেন।’”

বাস্তবিকই মানব কল্যাণ এর কারণ হেতু ঠাকুর শ্রী রামকৃষ্ণ যেন স্বর্গের সেই কল্পতরু পারিজাতের মতো উদ্যানবাটির গাছের তলায় দাঁড়িয়ে ভক্তবাঞ্ছা কল্পতরু রূপে আত্ম প্রকাশে অভয় দান করেছিলেন। 

১৮৮৬ থেকে শুরু হওয়া আধ্যাত্মীক জাগরণের সেই ঢেউ আরও  বিস্তর আকারে সামুদ্রিক তুফান ঝড়ের মতো  সিক্ত করে চলেছে অবিরাম। প্রত্যেক ইংরেজি নববর্ষে, ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে, ক্রমবর্ধমান রামকৃষ্ণ ভাবানুরাগী অনুরাগের অশ্রু দ্বারা কল্পতরু দিবসে যোগদান ও উদযাপন করে চলেছেন। দিনটিতে বৈদিক শান্তি মন্ত্র পাঠ, ঠাকুরের বিশেষ পূজা, ভজন-সঙ্গীত, ভোগারতি, ভক্ত সম্মেলন, কীর্তনাদি সম্পন্ন হয়ে থাকে। ধ্যান ভজন গান কীর্তন সব মিলিয়ে এক অপূর্ব আনন্দের বাতাবরণে রামকৃষ্ণ আশ্রমগুলি যেন স্বর্গভুমিতে রূপান্তরিত হয়। আধ্যাত্মীক আকাঙ্খিত হৃদয় এই বিশেষ দিনে রামকৃষ্ণ ভাবধারায় যেন বিন্দু রূপে ভাব সমুদ্রে মিশে যায়। আগামী ২০২৬ সালের ১লা জানুয়ারী কল্পতরু দিবস, অন্যান্য বছরের মতোই  অনুষ্ঠিত হতে চলেছে পশ্চিমবঙ্গ, ভারত বর্ষ সহ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে। 

বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে কল্পতরু উৎসব পালন 

কাশিপুর উদ্যানবাটি তো বটেই দক্ষিণেশ্বর মা ভবতারিনীর মন্দিরে, ঠাকুরের ঘর এ  মহা সমারোহে,পূজা ও উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়াও কাশীপুর মহা শ্মশান, কাঁকুড়গাছি যোগোদ্যান মঠ, সারদা পীঠ,বেলুড় শ্রী রামকৃষ্ণ মঠসহ সারা ভারতবর্ষ ও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে অবস্থিত রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন, বেদান্ত সোসাইট , বাংলাদেশ, আমেরিকা, কানাডা, রাশিয়া, সাউথ আফ্রিকা, ফ্রান্স, জার্মানি, আয়ারল্যান্ড, মালয়েশিয়া, নেদারল্যান্ডস, নিউজিল্যান্ড, ইউনাইটেড কিংডম এ কল্পতরু উৎসব উদযাপিত হয়ে থাকে।

References:
১. শ্রী রামকৃষ্ণের অন্ত্যলীলা / স্বামী প্রভানন্দ
২. শ্রী রামকৃষ্ণ লীলাপ্রসঙ্গ / স্বামী সারদানান্দ
৩. কথামৃত /শ্রী ম
৪. গুরুপ্রন রামচন্দ্রের অনুধ্যান

ছবি – কৃতজ্ঞতাস্বীকার:
১. বেলুড় মঠ, Photo credit:পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন
২. Birthplace By Alan Perry
৩. দ্য টাইমস
৪ . Printest India


রাধা অষ্টমী: প্রেম ও ভক্তির উৎসব

কৃষ্ণপ্রেমের অপর নাম রাধা

ভূমিকা

মূল পয়েন্টসমূহ

  • রাধা রাণীর জন্মতিথি পালনের দিন
  • মথুরা, বৃন্দাবন ও বরসানায় বিশেষ পূজা ও মেলা
  • রাধা–কৃষ্ণ প্রেমের আধ্যাত্মিক তাৎপর্য
  • পঞ্চমৃত দিয়ে মূর্তি অভিষেক ও ভোগ–আরতি
  • বরসানার রাধা রাণী মন্দিরে মহোৎসব

প্রতিটি পয়েন্টের ব্যাখ্যা

রাধার জন্মতিথি
রাধা দেবীর জন্ম হয়েছিল বরসানায়, বৃশভানু মহারাজ ও কীর্তিদা মাতার ঘরে। জন্ম থেকেই তিনি আধ্যাত্মিক শক্তির প্রতীক হিসেবে পূজিত। শাস্ত্র বলে, রাধা দেবী ছিলেন ভক্তি ও প্রেমের অবতার।

বিশেষ পূজা ও মেলা
রাধা অষ্টমীর দিন ভোর থেকে মন্দিরগুলোতে ভক্তদের ভিড় জমে। মঙ্গল আরতির মাধ্যমে দিন শুরু হয়। ভজন–কীর্তন, ধর্মীয় আলোচনা ও শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। বৃন্দাবন ও বরসানায় এই দিনটিতে ভক্তদের ঢল নামে, যেন সারা শহর ভক্তিমূলক আবহে মোড়ানো।Raise Your Concern About this Content

রাধা–কৃষ্ণ প্রেমের তাৎপর্য
রাধা–কৃষ্ণের প্রেম আমাদের শেখায় কীভাবে ভক্তি এবং আত্মার মিলন হয়। এই প্রেম নিছক মানবিক প্রেম নয়, এটি পরমাত্মার সাথে আত্মার বন্ধন। তাই রাধার নাম উচ্চারণে ভক্তরা মনে শান্তি ও আনন্দ খুঁজে পান।

রাধা-কৃষ্ণ – প্রেম, ভক্তি ও ঐশ্বর্যের মহাজাগতিক মিলন।

আবিষেক ও ভোগ
পঞ্চমৃত দিয়ে রাধার মূর্তির স্নান করানো হয়। নতুন পোশাক, গহনা ও ফুল দিয়ে সাজানো হয়। প্রসাদ হিসেবে খিচুড়ি, মিষ্টি ও ফল বিতরণ করা হয়। ভক্তরা বিশ্বাস করেন, এই প্রসাদ গ্রহণ করলে জীবনে সুখ ও শান্তি আসে।

বরসানার রাধা রাণী মন্দির
বরসানার বাঙ্হুগড় পাহাড়ের উপর অবস্থিত রাধা রাণী মন্দিরে মূল উৎসব হয়। এই মন্দিরে অষ্টমীর দিন ভক্তরা গঙ্গাজল ও দুধ দিয়ে রাধার পূজা করেন। সন্ধ্যায় পলকিতে করে রাধা রাণীর শোভাযাত্রা হয়, যা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না।

উপসংহার

রাধা-মাধবের রূপময় শ্রীবিগ্রহ – ভক্তির আঙ্গিনায় প্রেম ও ঐশ্বর্যের চিরন্তন প্রতীক।

রাধা অষ্টমী আমাদের শেখায় যে প্রেম কেবল পার্থিব নয়, এটি আত্মিকও হতে পারে। রাধা হলেন ভক্তির প্রতীক, যিনি কৃষ্ণকে নিজের সর্বস্ব উৎসর্গ করেছিলেন। তাঁর জন্মতিথি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে সত্যিকার ভালোবাসা মানে আত্মসমর্পণ, নিঃস্বার্থ ভক্তি আর হৃদয়ের পবিত্রতা।

উপকারিতা

  • মানসিক শান্তি ও ভক্তি বৃদ্ধি করে
  • পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় হয়
  • আধ্যাত্মিক জাগরণে সহায়তা করে
  • ব্রজভূমি ভ্রমণ পর্যটনের দিক থেকেও আকর্ষণীয়
  • সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সাথে প্রজন্মের যোগসূত্র গড়ে তোলে।

রেফারেন্স

তথ্যসূত্র

Iskcon.Org

Wikipedia: International Society for Krishna Consciousness

Radha Ashtami 2025

Wikipedia: Radha Ashtami

Radha Ashtami: Everything You Need to Know About It

Radhashtami Celebration: Revering Divine Love of Radha: Donate

Radhastami – Auspicious Occasion On Appearance Of Srimati Radharani

Radha Ashtami 2025: Date, Puja Muhurat, Vrat & Significance