Home Blog

জন্মাষ্টমীতে গোপাল সাজানোর হিড়িক! ছোট্ট শিশুর মধ্যেই কৃষ্ণকে খোঁজেন বাঙালি-সহ ভারতীয় পরিবার

সাম্প্রতিক সময়ে জন্মাষ্টমীতে ‘বাল গোপাল লুক’ যেন আরও বেশি জনপ্রিয় হয়েছে। স্কুলের ফ্যান্সি ড্রেস, আবাসনের অনুষ্ঠান, পাড়ার জন্মাষ্টমী কিংবা পরিবারের নিজস্ব পুজো—সব জায়গাতেই ছোটদের কৃষ্ণ সাজানোর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। সামাজিক মাধ্যমেও জন্মাষ্টমীর আগে ‘কৃষ্ণ বেবি ’, ‘বাল গোপাল লুক ’, ‘লাড্ডু গোপাল শৃঙ্গার’ নিয়ে ছবি ও ভিডিওর হিড়িক চোখে পড়ে যায়। কার চেয়ে কে বেশি ছবি মোবাইলে আপলোড করতে পারে তা নিয়ে চলে প্রতিযোগিতা। কিন্তু এই সাজসজ্জা কি শুধুই আধুনিক ফ্যাশন? একেবারেই নয়। এর পিছনে রয়েছে কৃষ্ণকে শিশু বা বাল গোপাল রূপে ভালোবাসার দীর্ঘ ভক্তি-পরম্পরা।যা যুগ যুগ ধরে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে চলে আসছে।

ফটো : সঙ্ঘমিত্রা ভট্টাচার্য

কেন জন্মাষ্টমীতে কৃষ্ণকে শিশু রূপে সাজানো হয়?

প্রশ্ন উঠতে পারে কেন জন্মাষ্টমীতে শিশুদের এভাবে সাজানো হয়। আসলে জন্মাষ্টমী মূলত ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জন্মতিথি। পুরাণকথায় কৃষ্ণের জন্ম মথুরার কারাগারে দেবকী ও বসুদেবের সন্তান হিসেবে। পরে তাঁকে গোকুলে নন্দ-যশোদার কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেই তাঁর শৈশব কাটে নানা দুষ্টুমি, আনন্দ ও অলৌকিক ঘটনার মধ্যে।যা প্রায় প্রত্যেকেই জানে। কিভাবে বকাসুর বধ হয়, কিভাবে পুতনা বধ  হয় এইসব গল্প কারোর কাছে অজানা নয়। তাই কৃষ্ণের আরাধনায় তাঁর ‘বালরূপ’ বা ‘বাল গোপাল’ বিশেষভাবে জনপ্রিয়। ভক্তের কাছে তিনি তখন শুধু দূরের দেবতা নন—তিনি ঘরের ছোট্ট সন্তান।

এই ভাবনা থেকেই লাড্ডু গোপালকে শিশুর মতো স্নান করানো, নতুন পোশাক পরানো, অলংকার পরানো, খাবার খাওয়ানো এবং দোলনায় শোয়ানোর রীতি গড়ে উঠেছে। জন্মাষ্টমীর দিনে নতুন পোশাক ও বিশেষ শৃঙ্গারকে কৃষ্ণের জন্মের আনন্দের প্রকাশ হিসেবেই দেখা হয়।

লাড্ডু গোপালকে বিশেষ পুজো— জনেন কি কীভাবে হয়?

জন্মাষ্টমীর দিন সকাল থেকেই অনেক বাড়িতে শুরু হয় গোপালের বিশেষ সেবা। প্রথমে পুজোর জায়গা পরিষ্কার করে ফুল, আলো, আলপনা এবং নানা সাজে মন্দির সাজানো হয়।

অনেক পরিবারে লাড্ডু গোপালকে স্নান করিয়ে নতুন পোশাক পরানো হয়। তারপর দেওয়া হয়—

  • ছোট ধুতি বা পোশাক 
  • মুকুট ও ময়ূরের পালক
  • হার ও অন্যান্য ছোট অলংকার
  • চন্দনের তিলক
  • বাঁশি
  • ফুলের মালা
ফটো : সঙ্ঘমিত্রা ভট্টাচার্য

এরপর গোপালকে ছোট্ট দোলনায় বসানো হয়। মধ্যরাতে কৃষ্ণের জন্মমুহূর্ত স্মরণ করে আরতি, ঘণ্টা, শঙ্খধ্বনি ও নামসংকীর্তনের মাধ্যমে জন্মোৎসব পালন করা হয়। অনেক পরিবারে পঞ্চামৃত, দুধ, মাখন-মিছরি, ফল, মিষ্টি ও অন্যান্য ভোগ নিবেদন করা হয়।

শিশুকে কৃষ্ণ সাজানো কেন এত জনপ্রিয়?

জন্মাষ্টমীর সঙ্গে জুড়ে যায় আবেগের আরেকটি গল্প।যেহেতু গোপাল ঠাকুর ঘরের সন্তান তাই তার জন্মদিনে পরিবারের আনন্দ উদযাপন করা হয়।প্রত্যেক পরিবারের কাছে তার নিজের সন্তান যেমন আদরের, তেমনই কৃষ্ণও ‘ঘরের সন্তান’’লাডলা’. ‘তাই ঘরের ছোট্ট শিশুকে কৃষ্ণ সাজানোর মধ্যে অনেক বাবা-মা দেখতে পান ভক্তি, আনন্দ ও আশীর্বাদের প্রতীকী প্রকাশ।

আবার শিশুদের কাছে এটি নিছক পুজো নয়—এ এক আনন্দের খেলা। কেউ কৃষ্ণের মতো বাঁশি হাতে নেয়, কেউ মাখনের হাঁড়ি নিয়ে ছবি তোলে, কেউ আবার ‘নটখট কানহা’ সেজে অনুষ্ঠানের মঞ্চ মাতিয়ে দেয়।

বর্তমানে স্কুল ও পাড়ার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পাশাপাশি সোশ্যাল মিডিয়াও এই প্রবণতাকে আরও জনপ্রিয় করেছে। জন্মাষ্টমীর দিন বাবা-মায়ের সঙ্গে ছোট্ট কৃষ্ণের ছবি এখন অনেক পরিবারের উৎসবের স্মৃতির অংশ হয়ে উঠেছে।প্রত্যেক ঘরেই দেখা যায় তার শিশু সন্তানের ছোটবেলায় কৃষ্ণ সাজার একটি হলেও ছবি। শুধু যে এখনকার সময়ে এর প্রচলন রয়েছে তা কিন্তু নয় এই প্রচলন যুগ যুগ ধরে।

শুধু সাজ নয়, এর মধ্যে রয়েছে কৃষ্ণভাবনা

শিশুকে কৃষ্ণ সাজানোর আসল সৌন্দর্য পোশাকে নয়, তার ভাবনায়।কৃষ্ণের শৈশবের গল্পে রয়েছে দুষ্টুমি, বন্ধুত্ব, সাহস, ভালোবাসা ও আনন্দ। তাই ছোটদের কৃষ্ণ সাজানোর সঙ্গে যদি তাঁর গল্পও বলা হয়, তাহলে উৎসবটি শুধুমাত্র ‘ফ্যান্সি ড্রেস’ হয়ে থাকে না—শিশুর কাছে হয়ে ওঠে ভারতীয় সংস্কৃতি ও লোককথার সঙ্গে পরিচয়ের একটি সহজ পথ।তাই দেখা যায় জন্মাষ্টমী দিনে বিভিন্ন জায়গায় কৃষ্ণের মন্ত্র, গল্প প্রতিযোগিতা হয়। আজকের প্রজন্মের কাছে জন্মাষ্টমী তাই একদিকে ঐতিহ্য, অন্যদিকে সৃজনশীলতার উৎসব।

জানেন কি কোন কোন রাজ্যে গোপাল সাজানো ও কৃষ্ণের বালরূপের এই সংস্কৃতি দেখা যায়?

ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে জন্মাষ্টমীর রীতিতে যথেষ্ট বৈচিত্র্য রয়েছে। তবে কৃষ্ণের বালরূপের আরাধনা বিশেষভাবে জনপ্রিয় উত্তর ও পশ্চিম ভারতের বৈষ্ণব পরম্পরায়।

ফটো : সঙ্ঘমিত্রা ভট্টাচার্য

উত্তরপ্রদেশ: মথুরা-বৃন্দাবনের কৃষ্ণভাবনা

মথুরা ও বৃন্দাবনকে কৃষ্ণের জন্ম ও শৈশবের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত বলে মনে করা হয়। জন্মাষ্টমীর রাতে এখানে মন্দিরে বিশেষ জন্মোৎসব, কীর্তন, শৃঙ্গার এবং কৃষ্ণলীলা অনুষ্ঠিত হয়। বালকৃষ্ণের দোলনা ও শৃঙ্গার এখানকার উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ।মথুরায় শ্রীকৃষ্ণের জন্ম আর বৃন্দাবনের সঙ্গে জড়িয়ে রাধা কৃষ্ণের লীলা গাথা। আর তাই বৃন্দাবন ও মথুরাতে এই বিশেষ দিনে মন্দিরে মন্দিরে চলে বিশেষ পূজার আয়োজন। দেশ-বিদেশ থেকে কৃষ্ণ ভক্তরা এখানে ভিড় জমায় এই বিশেষ পূজার দিনে।

মহারাষ্ট্র: কৃষ্ণ মানেই দই-হাঁড়ি

মহারাষ্ট্রে জন্মাষ্টমী আবার অন্যভাবে পালন করা হয়। সেখানে জন্মাষ্টমী মানেই অনেকের কাছে ‘দহি হান্ডি’। কৃষ্ণের মাখনপ্রিয় শৈশবের গল্পকে কেন্দ্র করে তৈরি হয় হাঁড়ি ভাঙার উৎসব। এই উৎসবে দল বেঁধে মানুষ উঁচুতে ঝোলানো দইয়ের হাঁড়ি ভাঙার চেষ্টা করেন। কৃষ্ণের নটখট বালরূপ এখানে উৎসবের প্রাণ।

গুজরাট: দ্বারকার কৃষ্ণ

গুজরাটের দ্বারকা কৃষ্ণভক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। জন্মাষ্টমীতে মন্দিরসজ্জা, ভজন, কীর্তন এবং বিশেষ পুজোর আয়োজন হয়। কৃষ্ণের রাজকীয় রূপের পাশাপাশি বালকৃষ্ণের প্রতিও রয়েছে গভীর ভক্তি।

পশ্চিমবঙ্গ: ঘরের পুজোয় গোপাল

বাঙালিদের কাছে এই জন্মাষ্টমী আবার অন্যরকম। বাঙালি পরিবারে জন্মাষ্টমী ঘিরে কৃষ্ণপুজোর দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। অনেক বাড়িতে ছোট গোপাল বা কৃষ্ণমূর্তিকে নতুন পোশাক পরিয়ে, ফুল দিয়ে সাজিয়ে ভোগ নিবেদন করা হয়। কোথাও আবার শিশুকে গোপাল সাজিয়ে পারিবারিক অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ানো হয়।বাঙালি মানেই ভোজন প্রিয়। তাই এই বিশেষ দিনে তালের পিঠে, তালের ক্ষীর, পায়েস, নানা রকম মিষ্টি, ননি ইত্যাদি জিনিস তৈরি করে ভোগ দেওয়ার প্রচলন রয়েছে।

বাঙালির কাছে গোপাল সেজে বাচ্চাদের পূজা করার মধ্যে ভক্তির সঙ্গে মিশে থাকে পারিবারিক আবেগ জড়িয়ে রয়েছে —‘আমাদের ঘরের গোপাল’।

ওড়িশা ও মণিপুরেও কৃষ্ণভক্তির নিজস্ব ধারা :

ওড়িশায় বৈষ্ণব সংস্কৃতি ও কৃষ্ণভক্তির নানা রীতি জন্মাষ্টমীর সঙ্গে যুক্ত। মণিপুরেও বৈষ্ণব সংস্কৃতির প্রভাব অত্যন্ত গভীর এবং কৃষ্ণ-রাধাকে কেন্দ্র করে ভক্তিগীতি, নৃত্য ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। ভারতের বহু রাজ্যেই জন্মাষ্টমী নানা স্থানীয় রীতির সঙ্গে পালিত হয়।উত্তর পূর্বাঞ্চলের প্রায় সবকয়টি রাজ্যেই জন্মাষ্টমী পালিত হতে দেখা যায়।

মুকুট, বাঁশি আর ময়ূরের পালক—কেন এত জনপ্রিয়?

ছোট্ট কৃষ্ণের সাজ বলতেই প্রথমে চোখে ভাসে ময়ূরের পালক লাগানো মুকুট, হলুদ পোশাক ও বাঁশি। আধুনিক শিশুদের জন্মাষ্টমীর পোশাকেও এই তিনটি উপাদান সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।

ময়ূরের পালক কৃষ্ণের চেহারার অন্যতম পরিচিত প্রতীক। আর বাঁশি তাঁর বৃন্দাবনের আনন্দময় জীবনের সঙ্গে জড়িত। হলুদ পোশাকও কৃষ্ণের প্রচলিত বালরূপের সাজে বহুল ব্যবহৃত।

তাই আজকের ‘কৃষ্ণ লুক’ আসলে বহু পুরনো সাংস্কৃতিক প্রতীকেরই আধুনিক উপস্থাপনা।Raise Your Concern About this Content

গোপালের ভোগে মাখন-মিছরি কেন দেওয়া হয় জানেন ?

ফটো : সঙ্ঘমিত্রা ভট্টাচার্য

কৃষ্ণের শৈশবের গল্পে মাখনের উপস্থিতি এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে জন্মাষ্টমীর ভোগেও মাখন-মিছরি বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে। প্রচলিত কাহিনিতে কৃষ্ণকে মাখনপ্রিয়, দুষ্টু ও চঞ্চল শিশু হিসেবে বর্ণনা করা হয়। তাই মাখন নিবেদন হয়ে উঠেছে তাঁর প্রতি ভালোবাসার এক মিষ্টি প্রকাশ।

ট্রেন্ড বদলেছে, অনুভূতি বদলায়নি :

আজকাল জন্মাষ্টমীর আগেই অনলাইন বাজারে ছোট্ট গোপালের পোশাক, মুকুট, বাঁশি, দোলনা ও ক্ষুদ্র অলংকারের নানা আয়োজন দেখা যায়। সামাজিক মাধ্যমও সেই সাজকে মুহূর্তে ছড়িয়ে দেওয়া হয়।কিন্তু ট্রেন্ড যতই বদলাক, মূল অনুভূতিটা কিন্তু একই থেকে যায়—ভগবানকে দূরে নয়, নিজের ঘরের আপনজন করে পাওয়া। আদরের আমার ছোট্ট গোপাল।যাকে যখন খুশি আদর করা যায়। যাকে নিজের সন্তানের মতন প্রাণভরে আদর করা যায়।

একটি ছোট্ট শিশুকে কৃষ্ণ সাজিয়ে যখন মা-বাবা তার কপালে তিলক এঁকে দেন, মাথায় ময়ূরের পালক পরিয়ে দেন, তখন সেখানে শুধু ছবি তোলার আনন্দ থাকে না। থাকে এক ধরনের বিশ্বাস—এই শিশুর হাসির মধ্যেও যেন নন্দলালের সেই চঞ্চল হাসি লুকিয়ে আছে।

এই কারণেই জন্মাষ্টমীতে ‘গোপাল সাজানোর হিড়িক’ শুধুমাত্র নতুন কোনও সোশ্যাল মিডিয়া ট্রেন্ড নয়। এটি পুরনো ভক্তি, পারিবারিক আবেগ এবং নতুন প্রজন্মের উৎসব-উচ্ছ্বাস—তিনের সুন্দর মেলবন্ধন।

আজকের ছোট্ট গোপাল হয়তো কাল বড় হয়ে যাবে। কিন্তু জন্মাষ্টমীর সেই ময়ূরের পালক, হাতে বাঁশি আর মাখনের হাঁড়ি নিয়ে তোলা ছবিটা থেকে যাবে পরিবারের অ্যালবামে—একটি উৎসবের স্মৃতি হয়ে, এক টুকরো শৈশব হয়ে।

তথ্যসূচি :

১. ভ্রমণ কাহিনী
২. নিজস্ব চিন্তা

পুজো মানেই দুর্গা পুজো, পুজো মানেই….

আর মাত্র কিছুুদিনের অপেক্ষা, তারপরই দেবী দুর্গার আবাহনে মেতে উঠবে গোটা বাংলা। পাড়ায় পাড়ায় চলবে পুজোর মহাপ্রস্তুতি। চারদিন ধরে শুধু আনন্দ, মজা, উচ্ছ্বাস,  কাটবে জরা অবসান হবে দুঃখ-কষ্টের। চাকরি বা কাজের জন্য যাদের অন্য শহর বা  অন্য দেশে যেতে হয়েছে, তারাও ফিরবে ঘরে ।পরিবার আর বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো, প্যান্ডেল হপিং সবকিছু চলবে জোরকদমে। বাঙালি আসলে ‘পুজো আসছে’-র অপেক্ষায় একটা গোটা বছর কাটিয়ে ফেলে।

ওয়ার্ক আউট ও খাওয়া-দাওয়া

সুন্দর সাজপোশাকের আগে খেয়াল রাখতে হবে শারীরিক সুস্থতার দিকে। যদি আপনি সুস্থ থাকবেন তবে তো আপনাকে সুন্দর দেখতে লাগবে। পুজোর আগে নিজেকে ফিট ও  মেইনটেন রাখতে প্রস্তুতি নিতে হবে এখন থেকেই। ওয়ার্ক আউট করতে যোগব্যায়াম বা জিম বা সাঁতারে  ভর্তি হয়ে যান। 

দুর্গাপুজোর আর দু’মাস মতো বাকি অর্থাৎ ৬০দিন মতো সময় আছে আপনার হাতে। এই সময়ের মধ্যে অতিরিক্ত মেদ ঝরাতে ওয়ার্ক আউট একমাত্র অপশন। তার সঙ্গে বদলাতে হবে আপনার খাদ্যাভাস। সকালে ঘুম থেকে উঠে লেবু আর মধু দিয়ে চিয়া সিড ভেজানো জল থেতে পারেন। প্রি ওয়ার্কআউটে একটা কলা আর সঙ্গে দুটো খেজুর খান। 

ওয়ার্ক আউট থেকে ফিরে ব্রেকফাস্টে রুটি বা ওটসের সঙ্গে টক দই এবং একটা করে ডিম সেদ্ধ খান। দুপুরের খাবারের মেনুতে ভাত খেতে পারেন। ভাতে সঙ্গে চিকেন বা পনির কিছু শাকসবজি রাখুন। যদি ভাত না খেতে চান সেক্ষেত্রে ভাতের বদলে রুটি রাখতে পারেন। 

৩টের দিকে ফল খান। ফলের মধ্য়ে আপেল, পেয়ারা, মৌসাম্বি লেবু রাখতে পারেন।

বিকেলে একটু ছোলা সেদ্ধ খেতে পারেন। চেষ্টা  করবেন ডিনার রাত ৮টার মধ্যে সেরে ফেলতে। খাওয়া আর ওয়ার্ক আউট যদি ঠিকঠাক চালিয়ে যেতে পারেন তাহলে পুজোর আগেই খুব সহজে আপনিও কমিয়ে ফেলতে পারবেন অতিরিক্ত মেদ। 

কেনাকাটা  

সপ্তমী থেকে দশমী পর্যন্ত সুন্দর সুন্দর আউটফিটের জন্য শপিং ডেস্টিনেশন হতে পারে গড়িয়াহাট, হাতিবাগান বা নিউ মার্কেট। বড়বাজার থেকে শাড়ি বা চুরিদারের জন্য কাপড়ও নিয়ে নিতে পারেন।

কবে কী পরবেন?

সপ্তমী থেকে দশমী পর্যন্ত আড্ডা,খাওয়া-দাওয়া পুজোর মেন অ্যাট্রাকশন শুরু হলেও চতুর্থী, পঞ্চমী ষষ্ঠীতেও স্টাইল বাদ দিলে চলবে না। কলেজ বা অফিসেও হালকা সাজে গেলে মন্দ হবে না। কারণ তখন অলরেডি পুজো ভাইবস শুরু হয়ে যাবে চারিদিকে। 

চতুর্থী 

পুজোর মজার কাউন্টডাউন শুরু প্রায় চতুর্থী থেকে। অফিসে যেতেও তখন আর ভালো লাগেনা। তাই পোশাকের রঙের ক্ষেত্রে মনোক্রম একেবারেই বাদ দিন। তার বদলে একটু ব্রাইট আর কালারফুল পোশাক বেছে নিন। অনেক সময় রঙীন জামাকাপড় পরলে মনও আনন্দে থাকে। 

ওয়াইড লেগ জিনস আর লেমন ইয়েলোর শার্ট আর ভিতরে একটা সাদা ইনার পরুন, শার্টের বটনগুলো খোলা রাখবেন তাতে ফ্রেশ একটা লুক ক্রিয়েট হবে। একটা স্লিঙ ব্যাগ নিন। হাতে একটা ঘড়ি, গলায় একটা সরু চেন আর কানে একটা ছোট্ট ইয়ারিং। অফিসের ডেস্কে বসেই আপনার পুজো লুক হিট। 

অফিসে তাক লাগাতে এরকম ব্রাইট লুক একদম পারফেক্ট । কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

পুরুষরা কলার টিশার্ট পরতে পারেন সঙ্গে ব্ল্যাক জিনস। টিশার্টের রঙ ব্রিক রেড বা কপার ব্লু কালারের হতে পারে। হাতে একটা স্পোর্টস ওয়াচ। এই লুকের সঙ্গে ব্যাকপ্যাক কমপালসারি।

পঞ্চমী 

 প্রিন্টেড স্কার্টের সঙ্গে হোয়াইট টপ এক্কেবারে পারফেক্ট ফর পঞ্চমী। সঙ্গে এটা বোহো ব্যাগ ক্যারি করতে পারেন। জাঙ্ক জুয়েলারির সঙ্গে এই লুকে আপনাকে অসাধারণ লাগবে তা হলফ করে বলতে পারি। 

ছেলেরা যে কোনও ডার্ক কালারের কুর্তার সঙ্গে ফরম্যাল প্যান্ট দিয়ে পরতে পারেন। ল্যাপটপ ব্যাগ নিন। হাতে পরুন স্টেনলেস স্টিলের ওয়াচ। রাস্তা থেকে অফিস পর্যন্ত সবাই আপনার ঘাড় ঘুরিয়ে দেখতে বাধ্য।

ষষ্ঠী 

অফিসে গেলে হালকা ইক্কত প্রিন্টের শাড়ি তার সঙ্গে কলার নেক ব্লাউস পরতে পারেন। তাতে কর্পোরেট একটা লুকও থাকবে আর শাড়ির মধ্যে ট্র্যাডিশনাল ব্যাপার তো রয়েছেই। 

বাঁ হাতে পরুন একটা ঘড়ি। ডান হাতে একটা ব্যাঙ্গেল চলতে পারে। কানে ছোট্ট একটা অক্সিডাইজড জুয়েলারি ব্যস লুক কমপ্লিট। তার সঙ্গে ক্যারি করুন টোটে ব্যাগ।

পুরুষরা মেরুন বা সাদা রঙের চাইনিজ কালারের শার্টের সঙ্গে পরতে পারেন বেইজ কালারের প্যান্ট।  এই লুকের সঙ্গে যে কোনও অফিস ব্যাগই মানানসই, ব্যাগপ্যাক নেবেন না তাতে এই লুকের বৈশিষ্ট্যটাই নষ্ট হয়ে যাবে। 

মহাসপ্তমী 

এমন একটি ধনেখালি শাড়ি দিয়ে সপ্তমীর স্টাইলিং করতে পারেন আপনি । কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

মহাসপ্তমীর সকাল মানেই নবপত্রিকা স্নান ও স্থাপন। তাই সেইদিন সকালে গায়ে হালকা সি গ্রিন কালারের সরু হলুদ পাড় দেওয়া ধনেখালি শাড়ি পরতে পারেন। সঙ্গে কলার দেওয়া ডিজাইনার হলুদ ব্লাউজ। যেহেতু ধনেখালি শাড়ি খুবই সিম্পল, তাই স্টাইলিস ব্লাউজ লুকটাকে ব্যালান্স করবে। দেখতেও খুব সুন্দর লাগবে এবং তার সঙ্গে খুব কমফর্টেবলও। যেহেতু গলা দেখা যাবে না তাই কানে পরতে পারেন রুপোর  কানপাশা, তার সঙ্গে নাকে নোসপিন আর চুলে আলগা খোঁপা। 

রাত জেগে প্যান্ডেল হপিং-এর জন্য পরতে পারেন নি লেন্থ জিন্সের স্কার্ট সঙ্গে অফ শোল্ডার টপ। হাতে ডিজিটাল ওয়াচ আর কানে হুপ ইয়াররিং। 

ছেলেদের সপ্তমীর সকাল শুরু হোক পাঞ্জাবি আর জিন্স দিয়ে। হাতে থাকুক একটা লেদারের ঘড়ি। রাতে ব্ল্যাক জিন্সের সঙ্গে পরুন হোয়াইট টি-শার্ট। সারারাত ঠাকুর দেখার জন্য একেবারে পারফেক্ট।

মহাঅষ্টমী

মহাঅষ্টমী মানেই সন্ধিপুজো আর অঞ্জলি। এই দিন সাজে থাকে সবথেকে বড় চমক। অন্যান্য সময়ের থেকে পুজোয় শাড়ি বেশি পরা হয়। স্লিভলেস ব্লাউজের সঙ্গে পরে নিন লাল রঙের কোনও শাড়ি । গলায় সোনার চোকার আর কানে বড় সোনার দুল। চোখে গাঢ় কাজল লাগিয়ে নিন। একদম পারফেক্ট বাঙালি রূপ। শাড়ির ক্ষেত্রে  দুএকটা অপশন রয়েছে। এই বছর কারদানা ও মিরর ওয়ার্কের জামদানি শাড়ি খুব ট্রেন্ডিং। লাল ,মেরুণ,  রঙের এরকম কোনও শাড়িও বেছে নিতে পারেন অষ্টমীর অঞ্জলির জন্য। 

অষ্টমীর রাতে ফ্যামেলি আউটিং-এ পড়ে নিন সারারা সেট। প্যাস্টেল সেডের সারারার সঙ্গে হালকা সাজে রাতের সাজ জমজমাট।

ছেলেদর ক্ষেত্রেও অষ্টমীর দিন বাঙালি সাজ মাস্ট। ওই দিন ধুতি-পাঞ্জাবি ছাড়া অন্য কোনও বিকল্প নেই। লাল বা হলুদের উপর আর্টওয়ার্কের ডিজাইন করা কোনও পাঞ্জাবির সঙ্গে সাদা ধুতি একেবারে  দারুন লাগবে। অষ্টমীর রাতে কো-অর্ড সেট পরে নিন, স্টাইলের সঙ্গে আরাম একদম ফ্রি। 

মহানবমী

নবমী মানেই জমকালো ওয়েস্টার্ন আউটফুট । কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

মহানবমী মানেই একটু জাঁকজমক ব্যাপার। রাত পোহালেই মায়ের বিদায়। তাই নবমীতে নারীদের জন্য জমকালো শাড়ি বা ওয়ান পিস  হবে পারফেক্ট ফর ফ্যাশন, ব্ল্যাক হলে তো কথাই নেই সঙ্গে গ্ল্যাম মেক আপ। ম্যাজেন্টা, গোল্ড টোনড, এমিরেলড গ্রিন রঙের সিল্ক, টিস্যু বা ওরগ্যানজা বেছে নিতে পারেন। শাড়ির সঙ্গে পরতে হবে মানানসই স্টেটমেন্ট জুয়েলারি। সকালে শাড়ি পরলে রাতের জন্য বেছে নিতে পারেন ওয়েস্টার্ন আউটফিট। 

পুরুষ 

পুরুষরা কুর্তার সঙ্গে পরতে পারেন স্ট্রেট ফিট ট্রাউজার। সঙ্গে থাকতে পারে ক্লাসিক ওয়াচ আর ব্রেসলেট।Raise Your Concern About this Content

মহাদশমী

এরকম গুজরাটি স্টিচের শাড়ি দশমীর জন্য একদম পারফেক্ট । কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

দশমীর সাজে থাকবে ট্রাডিশনাল আর ঐতিহ্যের ছোঁয়া। এই দিনের কালার প্যালেটে থাকবে অবশ্যই লাল সাদা। সাদার উপর লাল সুতোর কাজের কাঁথাস্টিচ বা গুজরাটি স্টিচের শাড়ি পরতে পারেন। হাতে চুড়ি, কপালে টিপ, হাত খোঁপা আর বিবাহিতদের শাখাঁ-সিঁদুরের এই রুপে ফুটে উঠবে এফোর্টলেস এলিগ্যান্স আর বাঙালি ট্র্যাডিশন। 

পুরুষের সাজে থাকতে পারে সাদার উপর লাল ফেব্রিকের কাজের পাঞ্জাবি সঙ্গে লাল চুড়ি প্যান্ট। তার সঙ্গে পায়ে কোলহাপুরী জুতো। দশমীতে ট্র্যাডিশনাল বেঙ্গলি অ্যাসথেটিককেই প্রাধান্য দেওয়া উচিত।

দুর্গাপুজোর ফ্যাশন মানেই ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সুন্দর মেলবন্ধন। ষষ্ঠী থেকে দশমী প্রতিটি সাজে ফুটে ওঠাতে হবে আলাদা মুড, কালার আর ভিন্ন স্টাইল। 

ভিডিও কলে রাখি, অনলাইনে উপহার—নতুন দুনিয়ায় নতুন রূপে রাখি বন্ধন  

বিশেষ করে একই পরিবারের ভাই-বোন যখন ভিন্ন শহর বা দেশে থাকেন, তখন ডিজিটাল মাধ্যমই হয়ে উঠছে তাঁদের উৎসবের অন্যতম ভরসা। ভিডিও কলে মুখোমুখি হয়ে রাখি বাঁধার মুহূর্ত ভাগ করে নেওয়া থেকে শুরু করে আগে থেকেই ডাকযোগে রাখি পাঠানো—সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন ধরনের উৎসব উদযাপনের রীতি। প্রযুক্তি বদলেছে পদ্ধতি, কিন্তু সম্পর্কের আবেগটা থেকে গিয়েছে একই।

দূরত্ব কমিয়েছে প্রযুক্তি, বদলে দিয়েছে রাখির সংজ্ঞা

প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে সহজ করেছে—এ কথা নতুন নয়। কিন্তু উৎসবের আবেগের সঙ্গে প্রযুক্তির এই মেলবন্ধন নিঃসন্দেহে নতুন এক অভিজ্ঞতা। বিশেষ করে যে পরিবারগুলির সদস্যরা বিভিন্ন শহর বা দেশে ছড়িয়ে রয়েছেন, তাঁদের কাছে ভার্চুয়াল রাখি এখন অনেকটাই বাস্তবতার অংশ।

ভাবুন, সকাল ১০টা। এক প্রান্তে মুম্বইয়ে বসে বোন হাতে নতুন রাখি তুলে ধরেছেন। অন্য প্রান্তে নিউ ইয়র্কে বসে ভাই অপেক্ষা করছেন ভিডিও কলের জন্য। সময়ের পার্থক্য, হাজার হাজার কিলোমিটারের দূরত্ব—কিছুই তাঁদের উৎসবের মুহূর্তটিকে থামাতে পারছে না। একই পর্দায় দু’জনের মুখ, হাতে রাখা রাখি আর কথার মধ্যে দিয়ে তৈরি হচ্ছে এক অদৃশ্য সেতু।

আগে দূরে থাকা মানে ছিল চিঠি, ফোন বা বহু দিন অপেক্ষা করে দেখা হওয়ার সুযোগ। এখন একটি ভিডিও কলেই মুখোমুখি কথা বলা সম্ভব। রাখির মতো আবেগঘন উৎসবেও সেই প্রযুক্তি জায়গা করে নিয়েছে। 

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

হোয়াটসঅ্যাপ–এ রাখির প্রস্তুতি

রাখির উৎসব এখন শুধু রাখির দিনটিতেই সীমাবদ্ধ থাকে না। অনেক পরিবারের প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায় কয়েক দিন আগে। হোয়াটসঅ্যাপ- গ্রুপে শুরু হয় পরিকল্পনা—কে কখন ফোন করবেন, কোন সময়ে সবাই অনলাইনে থাকবেন, কে কোন রাখি পছন্দ করছেন, কী উপহার পাঠানো হবে, কখন ডেলিভারি পৌঁছবে—সবকিছুই ঠিক হয়ে যায় মোবাইলের পর্দায়।

ভাই-বোনের পাশাপাশি পরিবারের অন্যান্য সদস্যরাও যুক্ত হয়ে পড়েন সেই পরিকল্পনায়। বিভিন্ন রাখির ছবি শেয়ার করা, উপহারের তালিকা তৈরি করা, মিষ্টি পাঠানোর ব্যবস্থা করা কিংবা ভিডিও কলের সময় ঠিক করা—সবকিছুই এখন কয়েকটি বার্তার মধ্যেই সম্ভব। ফলে উৎসবের প্রস্তুতিও পেয়েছে নতুন গতি।

শুধু হোয়াটসঅ্যাপ– নয়, Zoom বা Google Meet-এর মতো ভিডিও যোগাযোগের মাধ্যমও অনেক পরিবারের কাছে উৎসব পালনের জায়গা হয়ে উঠেছে। দূরে থাকা পরিবারের সদস্যরা একই সময়ে অনলাইনে এসে প্রার্থনা, শুভেচ্ছা, গল্প কিংবা রাখি বাঁধার মুহূর্ত ভাগ করে নিতে পারেন। 

হাতে রাখি না থাকলেও উৎসব থেমে নেই

রাখির মূল প্রতীক অবশ্যই সেই পবিত্র সুতো। তাই ভার্চুয়াল উৎসব হলেও বাস্তব রাখির গুরুত্ব একেবারে হারিয়ে যায়নি। বরং প্রযুক্তি সেই রাখিকেই পৌঁছে দিচ্ছে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে। বোন অনলাইনে পছন্দের রাখি বেছে নিয়ে ভাইয়ের ঠিকানায় পাঠিয়ে দিতে পারেন। সঙ্গে থাকতে পারে মিষ্টি, শুকনো ফল, চকোলেট কিংবা ব্যক্তিগত বার্তা। ভাইও একই ভাবে বোনের জন্য উপহার অর্ডার করে সরাসরি তাঁর বাড়িতে পাঠাতে পারেন।

একসময় দূরে থাকা ভাই-বোনের জন্য উপহার পাঠানো মানে ছিল ডাক বা কুরিয়ারের দীর্ঘ অপেক্ষা। এখন অনলাইন কেনাকাটার কারণে সেই প্রক্রিয়া অনেক সহজ। এমনকি দেশের সীমানা পেরিয়েও রাখি, উপহার ও মিষ্টি পৌঁছে যাচ্ছে। অনলাইন ব্যবসার প্রসারের ফলে রাখিকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে নতুন ধরনের ‘ভার্চুয়াল সেলিব্রেশন প্যাকেজ’ও। সেখানে রাখি, মিষ্টি, উপহার থেকে শুরু করে শুভেচ্ছা বার্তা—সবকিছুকে একসঙ্গে সাজিয়ে দেওয়া হচ্ছে। 

রাখির উপহারে এসেছে ব্যক্তিগত ছোঁয়া

ডিজিটাল যুগে উপহার দেওয়ার ধরনও বদলে গিয়েছে। আগে হয়তো ঘড়ি, জামাকাপড়, মানিব্যাগ বা মিষ্টির বাক্সই ছিল চেনা উপহার। এখন সেই তালিকায় যুক্ত হয়েছে ব্যক্তিগত পছন্দের নানা জিনিস।

ছোটবেলার ছবি দিয়ে তৈরি ফটোফ্রেম, নাম বা বিশেষ বার্তা লেখা মগ, ব্যক্তিগত স্মৃতির অ্যালবাম, সাজানো রাখি বক্স, চকোলেট কম্বো কিংবা বিশেষ উপহার—সবকিছুর মধ্যেই থাকছে ব্যক্তিগত সম্পর্কের ছাপ। কেউ আবার ভাই বা বোনের পছন্দের গান দিয়ে তৈরি করছেন একটি ডিজিটাল প্লেলিস্ট। কেউ বানাচ্ছেন ছোটবেলার ছবি ও ভিডিও দিয়ে স্মৃতির কোলাজ।

ফলে উপহারের দাম নয়, তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা আবেগটাই হয়ে উঠছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। প্রযুক্তি এখানে শুধু কেনাকাটার মাধ্যম নয়, স্মৃতি তৈরি এবং সংরক্ষণেরও একটি হাতিয়ার। \

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

ভিডিও কলে রাখি, স্ক্রিনে হাসি

ভার্চুয়াল রাখির সবচেয়ে আবেগঘন অংশ সম্ভবত ভিডিও কল। একে অপরকে শুধু ফোনে শোনা নয়, চোখের সামনে দেখার সুযোগটাই তৈরি করে অন্যরকম অনুভূতি।

অনেক পরিবার আগে থেকেই ঠিক করে নেন একটি নির্দিষ্ট সময়। ভাই-বোন দু’জনেই সাজগোজ করেন, বাড়িতে প্রদীপ বা অন্য সাজসজ্জা করেন। তারপর ভিডিও কল শুরু হলে একে অপরকে শুভেচ্ছা জানান। কেউ স্ক্রিনের সামনে বসে রাখি পরানোর ভঙ্গি করেন, কেউ আবার একই সময়ে নিজের হাতে থাকা রাখি দেখান। প্রার্থনা, শুভেচ্ছা, মিষ্টি খাওয়ার অভিনয়—সব মিলিয়ে তৈরি হয় এক অভিনব উৎসব।

কেউ কেউ সেই মুহূর্তের ছবি তুলে রাখেন। কেউ আবার পুরো অনুষ্ঠান রেকর্ড করেন। পরবর্তী সময়ে সেই ভিডিওই হয়ে ওঠে নতুন স্মৃতি। অর্থাৎ প্রযুক্তি শুধু দূরত্বের সমস্যা মেটাচ্ছে না, উৎসবের মুহূর্তকে ভবিষ্যতের জন্য ধরে রাখার সুযোগও করে দিচ্ছে। 

সোশ্যাল মিডিয়ায় রাখি, স্মৃতিতে ভাই-বোন

আজকের দিনে কোনও উৎসব সোশ্যাল মিডিয়ার বাইরে থাকবে, এমনটা ভাবাই কঠিন। রাখিও তার ব্যতিক্রম নয়। Instagram, YouTube, Facebook কিংবা অন্যান্য সামাজিক মাধ্যমে রাখির ছবি, ভিডিও, শুভেচ্ছাবার্তা ছড়িয়ে পড়ে মুহূর্তেই।

ছোটবেলার ছবি দিয়ে তৈরি ভিডিও, ভাই-বোনের মজার মুহূর্ত, একে অপরকে দেওয়া উপহার, সাজসজ্জা কিংবা রাখির ছবি—সবই হয়ে ওঠে সোশ্যাল মিডিয়ার কনটেন্ট। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের কাছে উৎসব উদযাপন আর তা সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাগ করে নেওয়া যেন একই অভিজ্ঞতার দুই অংশ।

জেন জি-র রাখি উদযাপনে তাই দেখা যাচ্ছে আরও নতুন কিছু প্রবণতা। ডিজিটাল শুভেচ্ছা, ই-রাখি, ভার্চুয়াল রাখি বাঁধা, ছোট ভিডিও, স্মৃতির মন্টাজ—সবই জায়গা করে নিয়েছে। কেউ পরিবেশবান্ধব রাখি নিয়ে পোস্ট করছেন, কেউ আবার বন্ধুত্ব, ভাই-বোন, কাজিন কিংবা অন্য ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককেও রাখির মাধ্যমে উদযাপন করছেন। 

শুধু ভাই-বোন নয়, বদলাচ্ছে সম্পর্কের পরিসরও

রাখির ঐতিহ্যগত ধারণায় ভাইয়ের হাতে বোন রাখি বাঁধবেন এবং ভাই তাঁর সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি দেবেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই ধারণাতেও পরিবর্তন এসেছে। এখন রাখি অনেকের কাছেই শুধুমাত্র ভাই-বোনের সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

দুই বোন একে অপরকে রাখি বাঁধছেন, বন্ধুরা রাখি বিনিময় করছেন, কাজিনদের মধ্যে তৈরি হচ্ছে নতুন রীতি। এমনকি পোষ্যকেও রাখি পরানোর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। অর্থাৎ রাখি ধীরে ধীরে একটি বৃহত্তর ভালোবাসা ও পারস্পরিক বন্ধনের উৎসবে পরিণত হচ্ছে। 

ডিজিটাল মাধ্যম এই পরিবর্তনকে আরও সহজ করেছে। কারণ সম্পর্কের সংজ্ঞা যতই বদলাক, যোগাযোগের প্রয়োজন থেকেই যায়। আর সেই যোগাযোগের সবচেয়ে সহজ মাধ্যম এখন মোবাইলের পর্দা।

প্রযুক্তি কি কমিয়ে দিচ্ছে উৎসবের উষ্ণতা?

তবে প্রশ্ন থেকেই যায়—ভার্চুয়াল রাখি কি সত্যিই সেই পুরনো আবেগের জায়গা নিতে পারে?

উত্তরটা হয়তো পুরোপুরি ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ নয়। প্রযুক্তি দূরত্ব কমাতে পারে, কিন্তু আলিঙ্গনের বিকল্প হতে পারে না। ভাইয়ের হাতে সত্যি সত্যি রাখি বাঁধার অনুভূতি, বোনের মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করা, একসঙ্গে বসে মিষ্টি খাওয়া—এই অভিজ্ঞতাগুলি এখনও বাস্তব সাক্ষাতের সঙ্গেই জড়িয়ে।

ভার্চুয়াল উৎসবের সবচেয়ে বড় সমস্যা এখানেই। ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হতে পারে, ভিডিও কল আটকে যেতে পারে, শব্দ না আসতে পারে। আর সবচেয়ে বড় কথা, স্ক্রিনের ওপার থেকে কাউকে দেখা গেলেও তাঁকে ছুঁয়ে দেখা যায় না। উৎসবের আনন্দের পাশাপাশি কোথাও একটা অপূর্ণতাও থেকে যায়। 

তবু মানুষ থেমে থাকেনি। প্রযুক্তিগত সমস্যা এড়াতে অনেক পরিবার একাধিক যোগাযোগের মাধ্যম প্রস্তুত রাখেন। কেউ গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত আগে থেকে রেকর্ড করে রাখেন। কারও সময়ের সঙ্গে মিল না হলে একাধিক দিনে উৎসব করেন। ফলে এক দিনের রাখি কখনও কখনও পরিণত হচ্ছে এক সপ্তাহের যোগাযোগের উৎসবে। 

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

বদলে যাচ্ছে রাখির অর্থনীতি

প্রযুক্তির প্রভাব শুধু পারিবারিক সম্পর্ক বা উদযাপনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। বদলে যাচ্ছে রাখিকে ঘিরে ব্যবসার ধরনও।

অনলাইন রাখির দোকান, উপহার পরিষেবা, মিষ্টির দোকান, কুরিয়ার এবং আন্তর্জাতিক ডেলিভারি পরিষেবা—সবাই এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেদের ব্যবসাকে নতুনভাবে সাজিয়েছে। স্থানীয় মিষ্টির দোকানও এখন ডেলিভারি পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত হয়ে অন্য শহরে বা দূরবর্তী দেশে মিষ্টি পাঠাচ্ছে।

অর্থাৎ একদিকে যেমন পুরনো রীতি বদলাচ্ছে, অন্যদিকে সেই রীতিকে ঘিরে তৈরি হচ্ছে নতুন অর্থনীতি। অনলাইন কেনাকাটা রাখিকে আরও সহজলভ্য করেছে। একই সঙ্গে ব্যক্তিগতকৃত উপহারের চাহিদা বাড়িয়েছে। 

শিশুদের কাছে রাখির নতুন অভিজ্ঞতা

আজকের প্রজন্মের অনেক শিশু এমন পরিবারে বড় হচ্ছে, যেখানে ভাই-বোন বা আত্মীয়রা নিয়মিত বিভিন্ন শহর কিংবা দেশে থাকেন। তাঁদের কাছে প্রযুক্তি এবং পারিবারিক উৎসব তাই আলাদা দুটি বিষয় নয়।

ভিডিও কলে মামা, পিসি, দিদি বা ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলা, বিভিন্ন সময় অঞ্চলের সঙ্গে তাল মিলিয়ে উৎসবের সময় ঠিক করা কিংবা অনলাইনে পরিবারের সবাইকে একসঙ্গে যুক্ত করা—এসবই তাঁদের কাছে স্বাভাবিক।

এই প্রজন্মের কাছে প্রযুক্তি হয়তো উৎসবের বিকল্প নয়, বরং উৎসবেরই একটি অংশ। দূরত্ব যে ভালোবাসার পথে বাধা নয়, সেই ধারণাটিও তাঁরা প্রযুক্তির মাধ্যমেই শিখছেন। 

আগামী দিনের রাখি আরও কতটা ডিজিটাল হবে?

আগামী দিনে রাখির সঙ্গে প্রযুক্তির সম্পর্ক আরও গভীর হতে পারে। ইতিমধ্যেই কিউআর কোড যুক্ত রাখি, ডিজিটাল বার্তা, অনলাইন প্লেলিস্ট কিংবা বিশেষ স্মৃতি সংরক্ষণের মতো নতুন ধারণা সামনে এসেছে। কোথাও কোথাও পরিবেশবান্ধব রাখি, বীজযুক্ত রাখি কিংবা প্রযুক্তি-নির্ভর বিশেষ রাখিও জনপ্রিয় হচ্ছে। Raise Your Concern About this Content

ভার্চুয়াল বাস্তবতার মতো প্রযুক্তিও ভবিষ্যতে দূরে থাকা ভাই-বোনকে আরও কাছাকাছি আনার চেষ্টা করতে পারে। তবে প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক, রাখির আসল শক্তি থেকে যাবে সেই সম্পর্কেই।

কারণ রাখি আসলে একটি সুতো নয়। এটি অপেক্ষার গল্প, অভিমানের গল্প, ছোটবেলার ঝগড়ার গল্প, আবার সেই ঝগড়ার পরেই একসঙ্গে বসে হাসার গল্প। এটি এমন একটি সম্পর্কের প্রতীক, যেখানে দূরত্ব থাকলেও যোগাযোগের ইচ্ছা থেকে যায়।

আজ হয়তো সেই যোগাযোগের মাধ্যম বদলে গেছে। হাতে লেখা চিঠির জায়গায় এসেছে WhatsApp-এর বার্তা, ফোনের জায়গায় এসেছে ভিডিও কল, দোকানে গিয়ে উপহার কেনার জায়গায় এসেছে অনলাইন অর্ডার। কিন্তু অনুভূতিটা এখনও একই।

একটা সময় বোনকে রাখি বাঁধাতে হলে হয়তো ট্রেন ধরতে হত। এখন একটি ভিডিও কলেই সেই মুহূর্ত ভাগ করে নেওয়া যায়। একটা সময় উপহার পাঠাতে দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হত। এখন কয়েকটি ক্লিকেই তা পৌঁছে যায় প্রিয়জনের দরজায়। একটা সময় ছোটবেলার ছবি অ্যালবামে আটকে থাকত, এখন সেই ছবিই কয়েক সেকেন্ডে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাই-বোনের হাজারো স্মৃতির অংশ হয়ে যায়।

তাই ডিজিটাল যুগে রাখি বদলেছে ঠিকই, কিন্তু রাখির ভালোবাসা বদলায়নি। বরং প্রযুক্তি তাকে নতুন ঠিকানা দিয়েছে—কখনও হোয়াটসঅ্যাপ-এর বার্তায়, কখনও ভিডিও কলের পর্দায়, কখনও অনলাইন উপহারের বাক্সে, আবার কখনও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে থাকা একটি পুরনো ছবিতে।

দূরত্ব হয়তো মানুষকে আলাদা করেছে, কিন্তু প্রযুক্তি সেই দূরত্ব পেরিয়ে সম্পর্ককে বারবার এক জায়গায় ফিরিয়ে আনছে। আর সেই কারণেই আজকের রাখিতে হাতে বাঁধা সুতো যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই গুরুত্বপূর্ণ সেই অদৃশ্য সংযোগ—যা কোনও শহর, দেশ কিংবা সমুদ্রের দূরত্বও ছিন্ন করতে পারে না।

তথ্যসূত্র

১. ভার্চুয়ালি মাধ্যমে রাখি সেলিব্রেশন 
২. দূরে ভাই-বোনদের জন্য ভার্চুয়াল রাখি বন্ধন উদযাপন
৩. রাখি কিভাবে অর্থনীতির বদল করছে
৪. জেন-জি দের রাখি উদযাপন 

ইনফ্লুয়েন্সার হওয়ার স্বপ্ন! জেন জি-র কাছে কি বদলে যাচ্ছে চাকরির সংজ্ঞা

পরিসংখ্যান বলছে, এই পরিবর্তন নিছক কল্পনা নয়। ২০২৪ সালের YouTube India–SmithGeiger Report অনুযায়ী, ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সি ভারতীয় জেন জি-র প্রায় ৮৩ শতাংশ নিজেদের ‘ক্রিয়েটর’ বলে মনে করেন। অর্থাৎ তাঁরা শুধু ডিজিটাল কনটেন্টের দর্শক নন, নিজেরাও কোনও না কোনও ভাবে সেই দুনিয়ায় কনটেন্ট তৈরি করছেন। আরও তাৎপর্যপূর্ণ, প্রায় ৭৫ শতাংশ তরুণ ক্রিয়েটর কনটেন্ট তৈরিকে ভবিষ্যতের কেরিয়ার হিসেবে দেখছেন। অর্থাৎ ‘শখ’ আর ‘পেশা’র মাঝের সীমারেখাটা ক্রমশ ঝাপসা হচ্ছে।

শুধু মুম্বই-দিল্লি নয়, গল্পটা এখন ছোট শহরেরও

এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় দিক সম্ভবত এখানেই। কনটেন্ট ক্রিয়েটর হওয়ার জন্য আর মুম্বই, দিল্লি কিংবা বেঙ্গালুরুর মতো বড় শহরে থাকা বাধ্যতামূলক নয়। ইন্দোর, জয়পুর, নাগপুর, পাটনা কিংবা দেশের বিভিন্ন ছোট শহরের তরুণরা নিজেদের ভাষা, সংস্কৃতি, খাবার, স্থানীয় জীবনযাপন, ভ্রমণ, শিক্ষা কিংবা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নিয়ে ভিডিয়ো বানিয়ে দর্শক তৈরি করছেন। স্মার্টফোন আর সহজলভ্য ইন্টারনেট সেই সুযোগটাকে আরও বড় করেছে। একসময় নিজের এলাকার গল্প হয়তো আটকে থাকত পাড়ার মধ্যে। এখন সেই গল্প কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পৌঁছে যেতে পারে দেশের অন্য প্রান্তে, এমনকী বিদেশেও। ফলে ডিজিটাল দুনিয়া শুধু নতুন পেশা তৈরি করছে না, ভৌগোলিক বৈষম্যের সংজ্ঞাটাও বদলে দিচ্ছে।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

ইউটিউব শুধু বিনোদন নয়, আয়ের মঞ্চও

কনটেন্ট ক্রিয়েশনের এই উত্থানের কেন্দ্রে রয়েছে ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম, শর্ট ভিডিয়ো প্ল্যাটফর্মসহ একাধিক মাধ্যম। বিশেষ করে ইউটিউব এখনও তরুণ ক্রিয়েটরদের কাছে অন্যতম বড় মঞ্চ।প্রতিভা, জ্ঞান কিংবা নিজের ভাবনা প্রকাশের পাশাপাশি এখন কনটেন্ট থেকে তৈরি হচ্ছে বিজ্ঞাপন, ব্র্যান্ড সহযোগিতা, স্পনসরশিপ এবং অন্যান্য আয়ের সুযোগ। একটি সফল চ্যানেল বা অ্যাকাউন্ট অনেকের কাছে কার্যত ছোট ব্যবসার মতো কাজ করছে। ভারতের ক্ষেত্রেও সেই পরিবর্তন স্পষ্ট। রিপোর্ট অনুযায়ী, ৫৫ শতাংশ ক্রিয়েটর মনে করেন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তাঁদের আর্থিক স্বাধীনতা অর্জনে সাহায্য করেছে। অর্থাৎ, তরুণ প্রজন্মের কাছে প্রশ্নটা আর শুধু ‘কী নিয়ে ভিডিয়ো বানাব?’ নয়। বরং, ‘এই কাজটাকেই কি পেশা হিসেবে নেওয়া যায়?’

‘ভাইরাল’ হওয়া আর পেশা তৈরি—এক জিনিস নয়

তবে এখানেই রয়েছে সবচেয়ে বড় ভুল বোঝাবুঝি। সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি ভিডিয়ো ভাইরাল হয়ে যাওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি কেরিয়ার তৈরি করা—দুটো এক বিষয় নয়। আজ যে ভিডিয়োতে লাখ লাখ ভিউ, কাল সেই একই অ্যাকাউন্ট হয়তো দর্শকের নজরেই নেই।কনটেন্ট ক্রিয়েশনের ক্ষেত্রে তাই শুধু জনপ্রিয়তা নয়, প্রয়োজন নিয়মিত কাজ, মৌলিক ভাবনা, দর্শকের আস্থা, বিষয় সম্পর্কে জ্ঞান এবং পরিবর্তনশীল প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা।আর রয়েছে অ্যালগরিদমের চাপ। কোন ভিডিয়ো বেশি মানুষ দেখবে, কোনটি হঠাৎ হারিয়ে যাবে—তার অনেকটাই নির্ভর করে এমন একটি ব্যবস্থার উপর, যা ক্রিয়েটরের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নেই।ফলে বাইরে থেকে যতটা স্বাধীন পেশা মনে হয়, বাস্তবে তার চাপও কম নয়।

‘সকাল থেকে রাত, ইন্টারনেট অন মানেই কাজ অন’

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

আন্তর্জাতিক একটি সমীক্ষায় ৫৭ শতাংশ জেন জি জানিয়েছেন, সুযোগ পেলে তাঁরা ইনফ্লুয়েন্সার হতে চান। কিন্তু পেশা হিসেবে এই কাজের কঠিন দিকটিও সামনে এসেছে।মার্কিন ক্রিয়েটর হান্না উইলিয়ামসের অভিজ্ঞতা সেই বাস্তবতারই উদাহরণ। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কনটেন্ট তৈরির কাজ সপ্তাহে পাঁচ দিন বা নির্দিষ্ট অফিস-সময় মেনে চলে না। ঘুম থেকে ওঠা থেকে ঘুমোতে যাওয়া পর্যন্ত ইন্টারনেটের সঙ্গে যুক্ত থাকাটাই যেন কাজের অংশ। অর্থাৎ, যে স্বাধীনতাকে এই পেশার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ মনে হয়, সেটিই কখনও কখনও হয়ে উঠতে পারে সবচেয়ে বড় চাপ।অফিসে কাজের সময় শেষ হয়। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ায় কাজের সময় শেষ হওয়ার কোনও নির্দিষ্ট ঘড়ি নেই।

মহিলাদের অংশগ্রহণও বাড়ছে

ডিজিটাল কনটেন্টের দুনিয়ায় মেয়েদের অংশগ্রহণও দ্রুত বাড়ছে। গত দু’বছরে ইউটিউবে মহিলা ক্রিয়েটরের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য ভাবে বেড়েছে বলে রিপোর্টে উঠে এসেছে। আর বিষয়ও বদলেছে। শুধু ফ্যাশন বা বিউটি নয়—শিক্ষা, রান্না, ভ্রমণ, বই, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, সংবাদ বিশ্লেষণ থেকে শুরু করে উদ্যোক্তা হওয়ার গল্প—বিভিন্ন ক্ষেত্রেই মহিলারা নিজেদের জায়গা তৈরি করছেন।ফলে ইনফ্লুয়েন্সার অর্থ শুধু বিনোদন নয়; এটি হয়ে উঠছে নিজের জ্ঞান, দক্ষতা এবং পরিচয়কে তুলে ধরার একটি মাধ্যম।

স্কুল-কলেজেও ঢুকছে ‘ক্রিয়েটর’ হওয়ার প্রস্তুতি

কনটেন্ট ক্রিয়েশনের এই সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকারও। কেন্দ্রীয় বাজেটে অ্যানিমেশন, ভিজ্যুয়াল এফেক্টস, গেমিং এবং কমিক্স—অর্থাৎ AVGC ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মুম্বইয়ের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজিসের সহযোগিতায় ১৫ হাজার মাধ্যমিক স্কুল এবং ৫০০ কলেজে কনটেন্ট ক্রিয়েটর ল্যাব তৈরির ঘোষণা করা হয়েছে। এই খাতে প্রতিভা তৈরির জন্য বাজেটে ২৫০ কোটি টাকা বরাদ্দের কথাও জানানো হয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে এই শিল্পে প্রায় ২০ লক্ষ পেশাদারের প্রয়োজন হতে পারে বলেও অনুমান করা হচ্ছে।অর্থাৎ, কনটেন্ট তৈরি আর শুধু মোবাইল হাতে ব্যক্তিগত উদ্যোগের জায়গায় আটকে নেই। ধীরে ধীরে এটি শিক্ষা, দক্ষতা এবং শিল্পের পরিকাঠামোর সঙ্গেও যুক্ত হচ্ছে।

শিক্ষাবিদরা কী বলছেন?

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

এই প্রসঙ্গে শিক্ষাবিদ পবিত্র সরকার জানান, ‘ কেরিয়ারের এই পরিবর্তনকে অবহেলা করার সুযোগ নেই। কারণ নতুন প্রজন্ম যে পৃথিবীতে বড় হচ্ছে, সেখানে ডিজিটাল দক্ষতা, যোগাযোগ ক্ষমতা, সৃজনশীলতা এবং ব্যক্তিগত ব্র্যান্ডিংও কর্মদক্ষতার অংশ হয়ে উঠছে।’ তবে তিনি আরো জানান, ‘ইনফ্লুয়েন্সার হব’ আর ‘কেরিয়ার তৈরি করব’—দুটিকে এক করে দেখা ঠিক নয়। ভাইরাল হওয়ার নেশা যাতে শিক্ষার বিকল্প না হয়ে ওঠে, সেদিকেও নজর দিতে হবে।Raise Your Concern About this Content

চাকরি বদলাচ্ছে, নাকি চাকরির সংজ্ঞাই বদলাচ্ছে?

আসলে পরিবর্তনটা শুধু ইনফ্লুয়েন্সার পেশার উত্থানে নয়। বদলে যাচ্ছে কাজ সম্পর্কে তরুণ প্রজন্মের ধারণাও। আগের প্রজন্মের কাছে চাকরির অর্থ ছিল স্থায়িত্ব। নতুন প্রজন্মের কাছে তার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে স্বাধীনতা, নিজের মতো কাজ করার সুযোগ, সৃজনশীলতা এবং নিজের পরিচয় তৈরি করার আকাঙ্ক্ষা।তাই হয়তো ভবিষ্যতের কর্মজগতে ‘চাকরি’ এবং ‘নিজের কাজ’-এর মধ্যেকার সীমারেখা আরও ক্ষীণ হবে। কেউ অফিসে বসে কাজ করবেন, কেউ বাড়ি থেকে, কেউ ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে, আবার কেউ একসঙ্গে একাধিক পেশার সঙ্গে যুক্ত থাকবেন।

তবে শেষ পর্যন্ত সাফল্যের মাপকাঠি শুধু কত ফলোয়ার, কত লাইক কিংবা কত ভিউ—সেটা হবে না। যে কনটেন্ট মানুষের আস্থা অর্জন করবে, নতুন কিছু শেখাবে, বিনোদন দেবে কিংবা কোনও সমস্যার সমাধান করবে, তারই দীর্ঘমেয়াদি মূল্য থাকবে। আজকের জেন জি তাই হয়তো চাকরির সংজ্ঞা মুছে দিচ্ছে না, বরং সেটাকে আরও বড় করে লিখছে। অফিসের ডেস্ক থেকে মোবাইলের ক্যামেরা—কর্মজগতের মানচিত্র বদলাচ্ছে। আর সেই নতুন মানচিত্রে ‘কনটেন্ট ক্রিয়েটর’ হয়তো আর বিকল্প পেশা নয়, আগামী দিনের মূলধারার কেরিয়ারেরই একটি নাম।

তথ্যসূত্র :

১. ইনফ্লুয়েন্সার পেশা
২. জেন জি-দের মধ্যে ইনফ্লুয়েন্সার প্রবণতা 
৩. কেন্দ্রীয় বাজেটে কনটেন্ট ক্রিয়েশন

উত্তর-পূর্ব ভারতের বর্ষার সেরা ক্যাফে: মেঘ, কফি আর অসাধারণ ভিউয়ের খোঁজে

এক কাপ কফি, জানালার ওপারে বৃষ্টি—বর্ষার সেরা অনুভূতি

আজকের প্রজন্মের কাছে ক্যাফেশুধু  খাওয়া-দাওয়ার জায়গা নয় । এটি এখন একটি লাইফস্টাইল। কেউ এখানে ল্যাপটপ খুলে কাজ করেন, তো কেউ বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেন, কেউ আবার ক্যামেরায় বন্দি করে রাখেন বৃষ্টির মনোরম দৃশ্য। অনেকে ভ্রমণের পরিকল্পনাই করেন এমন ক্যাফেকে কেন্দ্র করে যেখানে ভালো মেনুর পাশাপাশি থাকে অসাধারণ দৃশ্য দেখার সুযোগ, শান্ত পরিবেশ এবং সুন্দর ছবি তোলার সুযোগ।

বিশেষ করে বর্ষাকালে কলকাতা ও উত্তর-পূর্ব ভারতের পাহাড়ি শহরগুলোর ক্যাফেগুলো যেন নতুন প্রাণ ফিরে পায়।  তাই নয় কি? শিলং, গ্যাংটক, তাওয়াং কিংবা আইজলের ক্যাফেগুলোর কাচের জানালা দিয়ে মেঘের চলাচল দেখেছেন কখনো? বৃষ্টির শব্দ শুনতে শুনতে কফির কাপে চুমুক দেওয়া কিংবা স্থানীয় খাবারের স্বাদ নেওয়া— আহা এসব অভিজ্ঞতা সহজে ভোলার নয়।

আপনি যদি এই বর্ষায় এমন কিছু ক্যাফের খোঁজ করেন,যেখানে প্রকৃতি, খাবার আর পরিবেশ একসঙ্গে মন জয় করে নেয়, তাহলে আমার মতো করে  দেওয়া এই হোটেল  তালিকাটি  আপনাদের  ভ্রমণ পরিকল্পনায় অবশ্যই যোগ করতে পারেন।

১. চেরাপুঞ্জি (সোহরা), মেঘালয় — পোলো রিসোর্ট চেরাপুঞ্জি

আপনার বর্ষা-কেন্দ্রিক প্রবন্ধের জন্য পোলো রিসোর্ট চেরাপুঞ্জি একটি ভালো পছন্দ। এটি মাওসমাই এলাকায় অবস্থিত এবং পাহাড়, উপত্যকা ও সবুজ প্রকৃতির মনোরম পরিবেশের জন্য বিশেষভাবে আকর্ষণীয়।

পোলো রিসোর্ট চেরাপুঞ্জি |কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

ঠিকানা: মাওসমাই, নংথিমাই, সোহরা (চেরাপুঞ্জি), মেঘালয় – ৭৯৩১০৮
ফোন: +৯১ ৯৯৮৬৭ ০২৮৮৯
বিশেষত্ব: পাহাড়ি পরিবেশ, উপত্যকার দৃশ্যযুক্ত থাকার ব্যবস্থা, বিনামূল্যে প্রাতরাশ, Wi-Fi, রুম সার্ভিস এবং আধুনিক সুযোগ-সুবিধা রয়েছে।
কেন যাবেন: বর্ষায় সোহরার কুয়াশা, বৃষ্টি, সবুজ পাহাড় ও জলপ্রপাতের সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য এটি একটি দারুণ থাকার জায়গা। এখান থেকে নোহকালিকাই জলপ্রপাত ও মাওসমাই গুহা-র মতো দর্শনীয় স্থানেও সহজে যেতে পারবেন ।
কী বিশেষ: নতুন উইং-সহ রিসোর্টটিতে বর্তমানে মোট ৫৮টি কক্ষ রয়েছে। উপত্যকার মনোরম দৃশ্য, ইনফিনিটি পুল এবং চেরাপুঞ্জি হাউস রেস্তোরাঁ এখানকার উল্লেখযোগ্য আকর্ষণ।

২. শিলং (মেঘালয়) — হোটেল গ্রিন হ্যাভেন

হোটেল গ্রিন হ্যাভেন | কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

ঠিকানা: কিটিং রোড, পুলিশ বাজার, শিলং, মেঘালয় – ৭৯৩০০১
ফোন: +৯১ ৭০৮৫৩ ২৬৩৫০
ই-মেইল: অফিসিয়াল সাইটে info@hotelgreenhaven.com হিসেবে যোগাযোগের তথ্য দেওয়া আছে।
বিশেষত্ব: আধুনিক ও আরামদায়ক কক্ষ, বিনামূল্যে Wi-Fi, complimentary breakfast এবং কেন্দ্রীয় অবস্থান। Police Bazar-এর কাছাকাছি হওয়ায় শহরের বিভিন্ন জায়গায় যাতায়াত সহজ।
কেন যাবেন: শিলং পিক, ওয়ার্ডস লেক, এলিফ্যান্ট ফলস, ডন বস্কো মিউজিয়াম এবং পুলিশ বাজারের মতো জনপ্রিয় পর্যটনস্থলে যাওয়ার জন্য হোটেলটির অবস্থান বেশ সুবিধাজনক। বর্ষায় শিলং ঘুরে ফিরে আরাম করে থাকার জন্যও এটি ভালো বিকল্প।
কী বিশেষ: হোটেলটির website অনুযায়ী এখানে ২৮টি luxury room ও suite, complimentary breakfast এবং high-speed Wi-Fi রয়েছে। Cherrapunji, Dawki ও Mawlynnong-এর মতো জায়গায় day trip-এর ব্যবস্থাও front desk থেকে করা যায়।

৩. অরেঞ্জ ক্যাফে, তাওয়াং (অরুণাচল প্রদেশ)

অরেঞ্জ ক্যাফে, তাওয়াং (অরুণাচল প্রদেশ)| কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

ঠিকানা: Near market, Tawang 790104 Arunachal Pradesh India
Phone/WhatsApp: +91 88760 59059
তাওয়াংয়ের পাহাড়ি সৌন্দর্যের মাঝে ছোট্ট এই ক্যাফেটি যেন এক শান্ত আশ্রয়। বাইরে কুয়াশা, দূরে পাহাড় আর হাতে গরম কফির কাপ—এই অভিজ্ঞতা সহজে ভুলে যাওয়ার নয়।
এখানে স্থানীয় তিব্বতি খাবার, মোমো, থুকপা এবং গরম কফি পর্যটকদের খুবই পছন্দের।
বিশেষ আকর্ষণ : পাহাড় ও মেঘের অপূর্ব দৃশ্য, স্থানীয় খাবারের স্বাদ, নিরিবিলি পরিবেশ|

৪. দ্য গোল্ডেন ক্রেস্ট হোটেল, গ্যাংটক (সিকিম) 

ঠিকানা: NH-10, ইন্দিরা ট্রাফিক টার্নিংয়ের কাছে, আমদো গোলাই, গ্যাংটক, সিকিম – ৭৩৭১০২
ফোন: +৯১ ৯৮০০৫ ৩৩৯১১
বিকল্প/রিজার্ভেশন: +৯১ ৭৫০১০ ৫০০৬৬
ই-মেইল: info@thegoldencrest.com
বিশেষত্ব: হোটেলটিতে পাহাড়ের মনোরম দৃশ্যসহ কক্ষ, বিনামূল্যে Wi-Fi, বিনামূল্যে সকালের খাবার, রেস্তোরাঁ, বিনামূল্যে পার্কিং, ট্রাভেল ডেস্ক এবং প্রিমিয়াম রুমের সুবিধা রয়েছে।
কেন যাবেন: হোটেলটি এমজি মার্গ থেকে প্রায় ২ কিলোমিটার দূরে। বর্ষায় মেঘে ঢাকা পাহাড়, সবুজ প্রকৃতি এবং আরামদায়ক পরিবেশ উপভোগ করতে চাইলে এটি ভালো থাকার ঠিকানা।
কী বিশেষ: প্রিমিয়াম ও এক্সিকিউটিভ রুম থেকে পাহাড়ের সুন্দর দৃশ্য দেখা যায়। রেস্তোরাঁয় ভারতীয়, কন্টিনেন্টাল ও স্থানীয় খাবার পাওয়া যায়। এছাড়া পারিবারিক অনুষ্ঠান বা জমায়েতের জন্য ব্যাঙ্কোয়েট সুবিধাও রয়েছে।

দ্য গোল্ডেন ক্রেস্ট হোটেল, গ্যাংটক (সিকিম) | কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google
হোটেল ফ্লোরিয়া, আইজল (মিজোরাম) | কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

৫.হোটেল ফ্লোরিয়া, আইজল (মিজোরাম) 

ঠিকানা: বড় বাজার, দাওরপুই, আইজল, মিজোরাম – ৭৯৬০০১
ফোন: +৯১ ৯৩৬৬৭ ৪০২৬০
টেলিফোন: ০৩৮৯-২৩২৯৫৫৫
হোয়াটসঅ্যাপ: +৯১ ৬৯০৯৩ ১৭১৪৬
ই-মেইল: hotelfloria.aizawl@gmail.com 
বিশেষত্ব: হোটেল ফ্লোরিয়ায় বিনামূল্যে Wi-Fi, রুম সার্ভিস, হাউসকিপিং, বিনামূল্যে পার্কিং, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষ, রেস্তোরাঁ, স্পা ও বিউটি পরিষেবা এবং মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশ রয়েছে।
কেন যাবেন: আইজলের বড় বাজার এলাকায় কেন্দ্রীয় অবস্থানের কারণে এখান থেকে বাজার, স্থানীয় খাবারের দোকান এবং শহরের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে সহজেই পৌঁছানো যায়। বর্ষায় পাহাড়ি শহরের মেঘলা ও মনোরম পরিবেশ উপভোগ করার জন্যও এটি ভালো পছন্দ।
কী বিশেষ: হোটেল ফ্লোরিয়ার বিশেষ আকর্ষণের মধ্যে রয়েছে স্পা ও বিউটি পরিষেবা, রেস্তোরাঁ, জিম এবং মনোরম পরিবেশ। এছাড়াও ইন-রুম ডাইনিংয়ের সুবিধা রয়েছে এবং রাতের সময় সীমিত খাবারের মেনুও পাওয়া যায়।

৬. ডি ওরিয়েন্টাল গ্র্যান্ড, কোহিমা (নাগাল্যান্ড)

ডি ওরিয়েন্টাল গ্র্যান্ড, কোহিমা (নাগাল্যান্ড) | কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

ঠিকানা: থেমেজি, হাই স্কুল রোড, কোহিমা, নাগাল্যান্ড – ৭৯৭০০১
ফোন: +৯১-৩৭০-২২৬-০০৫২ / +৯১-৩৭০-২২৬-০০৫৭
ফ্রন্ট অফিস: +৯১-৮৭৯৪৭-২৯৩৯৯
ই-মেইল: info@deorientalgrand.com / frontoffice@deorientalgrand.com
বিশেষত্ব: সবুজে ঘেরা পরিবেশে অবস্থিত এই হোটেলে রয়েছে আরামদায়ক রুম, রেস্তোরাঁ, শান্ত ও মনোরম পরিবেশ এবং আধুনিক আতিথেয়তার সঙ্গে নাগাল্যান্ডের স্থানীয় সংস্কৃতির ছোঁয়া পাবেন সেখানে।
কেন যাবেন: কোহিমা শহরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় অবস্থানের কারণে শহরের দর্শনীয় স্থানগুলো ঘুরে দেখার পর  বিশ্রাম নেওয়ার জন্য এটি উপযোগী । ভালো খাবার ও শান্ত পরিবেশ তো বাড়তি আকর্ষণ রয়েছেই।
কী বিশেষ: হোটেলটির নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, অতিথি আপ্যায়ন, সুস্বাদু খাবার এবং শান্ত-আরামদায়ক পরিবেশের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। বর্ষায় কোহিমার মনোরম আবহ উপভোগের জন্যও এটি ভালো বিকল্প।

৭. হোটেল পোলো টাওয়ার্স আগরতলা ( ত্রিপুরা)

হোটেল পোলো টাওয়ার্স আগরতলা ত্রিপুরা | কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

এটি আগরতলার একটি বিলাসবহুল হোটেল এবং সরকারি NIDHI+ তালিকায় ৫-তারকা হোটেল হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ।

ঠিকানা: ভিআইপি রোড, কুঞ্জবন, আগরতলা, ত্রিপুরা – ৭৯৯০০৬
ফোন: +৯১ ৩৮১ ২৩১ ০১১০–১৪
ই-মেইল: reservations.agartala@hotelpolotowers.com
বিশেষত্ব: আধুনিক ও বিলাসবহুল রুম, রেস্তোরাঁ, সুইমিং পুল, ফিটনেস সেন্টার, Tattva Spa, ইন-রুম ডাইনিং, বিনামূল্যে Wi-Fi এবং বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য উন্নত ব্যাঙ্কোয়েট সুবিধা রয়েছে।
কেন যাবেন: আগরতলার কুঞ্জবন এলাকায় অবস্থিত হওয়ায় শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সহজেই যাওয়া যায়। বর্ষায় আরামদায়ক পরিবেশে থাকা, ভালো  রাজ্যে সহ বিভিন্ন জায়গার খাবার  এবং স্পা-সহ বিভিন্ন বিনোদনমূলক সুবিধা উপভোগ করতে হলে এটি  খুব ভালো পছন্দ।
কী বিশেষ: হোটেলটির উল্লেখযোগ্য আকর্ষণের মধ্যে রয়েছে Tattva Spa, সুইমিং পুল, Three81 All Day Dining Restaurant, Sky Grill, ফিটনেস সেন্টার এবং প্রশস্ত ব্যাঙ্কোয়েট হল। ফলে অবসর যাপন থেকে পারিবারিক অনুষ্ঠান—বিভিন্ন ধরনের প্রয়োজনেই এটি উপযোগী।

৮. দ্য ক্লাসিক হোটেল, ইম্ফল (মণিপুর)

দ্য ক্লাসিক হোটেল, ইম্ফল (মণিপুর) | কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

ঠিকানা: নর্থ এওসি, ইম্ফল পশ্চিম, মণিপুর – ৭৯৫০০১
ফোন: +৯১-৮১৩১৯৮০৪২০ / ০৩৮৫-২৪৪৩৯৬৭ / ২৪৪৩৯৬৯ / ২৪৪৫১৬২
ই-মেইল: reservation@theclassichotel.in
বিশেষত্ব: স্ট্যান্ডার্ড বাজেট রুম থেকে প্রেসিডেনশিয়াল স্যুট পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। এছাড়া বিনামূল্যে Wi-Fi, ২৪ ঘণ্টা ইন-রুম ডাইনিং এবং আধুনিক কক্ষসুবিধা পাওয়া যায়।
কেন যাবেন: ইম্ফল শহরের কেন্দ্রে অবস্থান এবং কাংলা ফোর্টের দিকে দৃশ্য থাকার কারণে শহরের দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখার জন্য হোটেলটি সুবিধাজনক। ভ্রমণের পর আরামদায়ক পরিবেশে থাকার জন্যও এটি অন্যতম বিকল্প।
কী বিশেষ: হোটেলটির নিজস্ব ওয়েবসাইটে এটিকে মণিপুরের প্রথম ৩-তারকা হোটেল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রেসিডেনশিয়াল স্যুট, ২৪ ঘণ্টা ইন-রুম ডাইনিং এবং কাংলা ফোর্টের মনোরম দৃশ্য এর উল্লেখযোগ্য আকর্ষণ।


৯. হোটেল শান্তি রিজেন্সি, কামাখ্যা, গুয়াহাটি (আসাম)

হোটেল শান্তি রিজেন্সি, কামাখ্যা, গুয়াহাটি (আসাম) | কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

ঠিকানা: আসাম ট্রাঙ্ক রোড, কামাখ্যা মন্দিরের প্রবেশদ্বারের কাছে, নার্সারি, গুয়াহাটি, আসাম – ৭৮১০০৯
ফোন: +৯১ ৯২৮৭১ ০১৮৯৬
বিশেষত্ব: কামাখ্যা মন্দিরের খুব কাছে অবস্থিত এই হোটেলের প্রধান সুবিধা হলো আরামদায়ক থাকার ব্যবস্থা এবং মন্দিরে সহজে যাতায়াতের সুযোগ।
কেন যাবেন: যারা মূলত কামাখ্যা মন্দির দর্শনের উদ্দেশ্যে গুয়াহাটি যান, তাঁদের জন্য মন্দিরের কাছাকাছি এই হোটেলে থাকা সময় ও যাতায়াত—দুই দিক থেকেই সুবিধাজনক।
কী বিশেষ: মন্দিরের কাছাকাছি অবস্থানের কারণে ভোরের দর্শন বা বিশেষ পূজা-অনুষ্ঠানের সময় যাতায়াত সহজ হয়। বর্ষায় পাহাড়ি পরিবেশে কামাখ্যা মন্দির দর্শনের ক্ষেত্রেও হোটেলটির অবস্থান বেশ সুবিধাজনক।

১০. রাইনো অ্যান্ড রিভার ওয়াইল্ডলাইফ রিট্রিট অ্যান্ড স্পা, পবিতরা

ঠিকানা: গাশবাড়ি লোয়ার প্রাইমারি স্কুলের কাছে, কাশাসিলা, মায়ং, আসাম – ৭৮২৪১১
ফোন: +৯১ ৭০৯৯০ ৬৭৬৯৪
বিশেষত্ব: ব্রহ্মপুত্র নদীর তীরে অবস্থিত এই বিলাসবহুল রিট্রিটে নদী ও আকাশের বিস্তৃত দৃশ্য, স্টিল্টেড কক্ষ, ব্যক্তিগত বারান্দা এবং প্রকৃতির খুব কাছাকাছি থাকার সুযোগ রয়েছে।
কেন যাবেন: বর্ষায় নদী, সবুজ মাঠ, মেঘলা আকাশ এবং চারপাশের প্রকৃতি আরও মনোরম হয়ে ওঠে। পবিতরা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের কাছাকাছি হওয়ায় প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য এটি বিশেষ আকর্ষণীয়।
কী বিশেষ: নদীর ধারে অবস্থান, প্রকৃতির মাঝে থাকার অভিজ্ঞতা এবং ব্যক্তিগত বারান্দা থেকে জল ও আকাশের দৃশ্য—বর্ষাকালে এই রিট্রিটের অন্যতম বড় আকর্ষণ।

বর্ষায় ক্যাফে ভ্রমণের আগে যা মনে রাখবেন আগে থেকেই ক্যাফের খোলা থাকার সময় জেনে নিন। পাহাড়ি এপূর্বাভাস দেখে রওনা লাকায় আবহাওয়ার দিন। ছাতা বা রেইনকোট সঙ্গে রাখুন। মোবাইল ও ক্যামেরার জন্য জলরোধী কভার ব্যবহার করুন। সপ্তাহান্তে গেলে আগে থেকে টেবিল বুকিং করলে সুবিধা হবে। স্থানীয় খাবার ও কফির স্বাদ নিতে ভুলবেন না।Raise Your Concern About this Content

কেন ক্যাফে হপিং এখন নতুন প্রজন্মের ট্রেন্ড?

আজকের তরুণদের কাছে ভ্রমণ মানেই শুধু দর্শনীয় স্থান দেখা নয়, বরং সেই জায়গার স্বাদ, সংস্কৃতি ও পরিবেশকে অনুভব করা। তাই ক্যাফে হপিং এখন একটি জনপ্রিয় ভ্রমণধারা। নতুন ক্যাফে ঘোরা, স্থানীয় খাবার চেখে দেখা, সুন্দর ছবি তোলা, ছোট ভিডিও তৈরি করা এবং বন্ধুদের সঙ্গে স্মৃতি ভাগ করে নেওয়া—এসবই এখন ভ্রমণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

উপসংহার

কলকাতার ঐতিহ্যবাহী ক্যাফে থেকে শুরু করে উত্তর-পূর্ব ভারতের পাহাড়ঘেরা ছোট্ট কফিশপ—প্রতিটি জায়গার নিজস্ব গল্প, স্বাদ ও সৌন্দর্য রয়েছে। কোথাও মেঘ ছুঁয়ে যায় জানালার কাচ, কোথাও পাহাড়ের বুক চিরে নেমে আসে বৃষ্টি, আবার কোথাও এক কাপ গরম কফি ক্লান্ত ভ্রমণকে করে তোলে আরও আনন্দময়।

তাই এই বর্ষায় যদি শহরের ব্যস্ততা থেকে একটু দূরে গিয়ে প্রকৃতির কাছাকাছি কিছু সময় কাটাতে চান, তাহলে এই ক্যাফেগুলোর যেকোনো একটি হতে পারে আপনার পরবর্তী গন্তব্য। হয়তো সেখানেই তৈরি হবে এমন কিছু স্মৃতি, যা অনেক দিন পর্যন্ত আপনার মনে বৃষ্টির মতোই সতেজ হয়ে থাকবে।

তথ্যসূত্র

১. অফিসিয়াল ওয়েবসাইট
২. অন্যান্য ক্যাফের গুগল বিজনেস প্রোফাইল ও অফিসিয়াল সোশ্যাল মিডিয়া
৩. গুগল ম্যাপস
৪. ট্রিপ অ্যাডভাইজার
৫. ট্রিপোটো

জাতীয় গ্রন্থাগার – শব্দের জাদুঘর

ভাষার মাধ্যমে আমরা মনের ভাব প্রকাশ করি। এই ভাষার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আবেগ। পৃথিবীর যোগাযোগব্যবস্থার প্রধান ভিত্তিও কিন্তু ভাষা। দুই মানুষের মধ্যে অনুভূতির আদান-প্রদানের জন্য তো ভাষার প্রয়োজন রয়েছে, তবেই না আজ এই আধুনিক পৃথিবীর বিস্ময়গুলো  আবিস্কার করা সম্ভব হয়েছে। প্রথম এবং প্রাচীনতম ধ্বনি থেকে ভাষা এবং বর্তমানে আধুনিক যোগাযোগ তৈরি হওয়ার ইতিহাস পৃথিবী সৃষ্টির ইতিহাসের মতোই রোমাঞ্চকর। ভাষা আসলে মানবসভ্যতার উত্তরাধিকার যা আমরা বংশানুক্রমে পূর্বপুরুষদের কাছে পেয়ে আসছি।

ভাষার ইতিহাস আমরা কম-বেশি সকলেই জানি, তবে পাঠ্যপুস্তকের বাইরে ভাষা ও ধ্বনির উৎপত্তি, বিবর্তন, লিপির আবিস্কার ছাড়াও রয়েছে অনেক জানা ও অজানা কাহিনি। ভাষা শুধু ব্যাকরণ দিয়ে জানা যায় না, ভাষার সম্যক জ্ঞান লাভ করতে আমাদের ফিরতে হবে আমাদের শিকড়ের কাছে, খোঁজ নিতে হবে কেমন ছিল আমাদের পূর্বপুরুষের জীবনযাত্রা, জানতে হবে তাঁদের জীবনদর্শন।

শব্দের জাদুঘর বা ওয়ার্ড অফ মিউজিয়াম কী?

কলকাতার জাতীয় গ্রন্থাগারে বেলভেডিয়ার হাউসে চলছে শব্দের জাদু | ছবি: বিশ্বয়নী দত্ত

ভাষার পৃথিবীকে জানতে, আবিস্কার করতে এই জাদুঘরে একবার যেতেই হবে। যদি আপনার দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ভাষা নিয়ে আগ্রহ রয়েছে তাহলে তো মেঘ না চাইতেই জল। কারণ কন্নড়, তামিল, গুজরাতি ভাষা জানতে আর যেতে হবে না মুম্বই, তামিলনাড়ু কিংবা গুজরাত। এই শহরে থেকেই জানতে পারবেন বিভিন্ন ভাষার উৎপত্তি, ওই ভাষার বৈশিষ্ট্য। এই জাদুঘরে ভারতবর্ষের কমপক্ষে ৩৮০টি ভাষা নিয়ে ডিজিটাল প্রদর্শনী করা হয়েছে। শুধু তাই নয় এর মধ্যে ২০১১ সালে জনগণনায় নথিভুক্ত ১২১টি ভাষার উপস্থিতি রয়েছে।

 নিঃশব্দ থেকে শব্দের পথে

পৃথিবীর সূচনালগ্নে ছিল না কোনও শব্দ, ছিল না কোনও ভাষা। কোনও শব্দ লেখার মাধ্যমে প্রকাশের আগে সেই শব্দকে শুনতে হবে, অন্তর্নিহিত অর্থ অনুধাবন ও অনুভব করতে হয়। এটি একটি ধারাবাহিক পদ্ধতি যার মাধ্যমে নীরবতা থেকে শব্দের দিকে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব। ধ্বনি থেকে অর্থপূর্ণভাবে মনের ভাব প্রকাশ করা সম্ভব। মানুষের মধ্যে এইভাবে তৈরি হয়েছে যোগাযোগ। 

কোন কোন অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করবেন?

জানতে পারবেন নীরবতা, ধ্বনি ও ভাষার জন্মলগ্ন 
ভারতবর্ষের বৈচিত্র্যপূর্ণ লিপিসমূহের বিবরণ 
দেশের বিভিন্ন ভাষার উৎপত্তি, বিস্তার ও বিবর্তন
শিশুদের জন্য রয়েছে বিভিন্ন ইন্টারেক্টিভ গেম

বিশাল গ্যালারিতে ধ্বনি থেকে শব্দ তৈরির ইতিহাসের প্রদর্শন করা হয়েছে | ছবি: বিশ্বয়নী দত্ত

প্রায় ৩০০,০০০ বছর আগে ভাষার উৎপত্তি

প্রায় ৩০০,০০০ বছর আগে ভাষার উৎপত্তি হয়েছে।ভাষা শেখা এবং সেই ভাষায় কথা বলা মানবজাতির সহজাত ক্ষমতা। মানবদেহ, স্বর ও অভিব্যক্তির বহিঃপ্রকাশ ও একজনের সঙ্গে অপরজনের যোগাযোগের চাহিদা এই তিনটি বিষয়ের পারস্পরিক যোগসূত্র রয়েছে যা  জাদুঘরের ‘প্রথম শব্দ’ গ্যালারিতে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। 

গুহাচিত্র, বিভিন্ন চিহ্ন অঙ্কন থেকে অনুভূতি কথ্য ভাষায় রূপান্তর এই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াই আসলে যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরও উন্নত করে। এই বিভাগে প্রদর্শিত হয় ভাষা ও ধ্বনি আবিস্কারের আগে আদিম যুগে কীভাবে মানবজাতি নিজস্ব অভিজ্ঞতা, স্মৃতি, মনের ভাব, আবেগ, আচার-অনুষ্ঠান এবং কল্পনাকে প্রকাশ করত। সেগুলি কীভাবে সংরক্ষণ ও নথিবদ্ধ করা হত। 

‘প্রথম শব্দ’ গ্যালারিতে বৈজ্ঞানিক ব্যখ্যার সঙ্গে স্থান পেয়েছে সাংস্কৃতিক ব্যাখ্যাও। স্মৃতিকে ধরে রাখা, একে অপরের সঙ্গে অনুভূতির আদানপ্রদান, মনের আবেগ প্রকাশ করার মতো একাধিক বিষয়গুলি কীভাবে মানবসমাজের বিকাশে ও পরিকাঠামো নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। 

মাতৃভাষা

‘মা বলিতে প্রাণ করে আনচান, চোখে আসে জল ভরে’
-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 

মা আর মাতৃভাষা দুটোর সঙ্গে মানুষের নারীর টান। মা আমাদের দুনিয়া দেখায়, মাতৃভাষা আমাদের সেই দুনিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে শেখায়। মাতৃভাষা প্রত্যেক মানুষের প্রথম সাংস্কৃতির জগৎ তৈরি করে। এই ভাষার মাধ্যমে শিশুরা সুখ,দুঃখ, ব্যাথা বেদনার বহিঃপ্রকাশ করে। জন্মের পর জীবনের ছন্দের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ভবিষ্যতের পথচলা শুরু হয়। তাই মাতৃভাষার সঙ্গে আমাদের আত্মার সংযোগ রয়েছে।

মাতৃভাষা গ্যালারিতে ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলের ভাষার সঙ্গে দর্শকদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিশ্লেষণ করা হয়েছে কীভাবে প্রত্যেকটি ভাষার সঙ্গে অপর একটি ভাষার সংযোগ রয়েছে, কীভাবে আঞ্চলিক ভাষাগুলো পরস্পরের উপর প্রভাব ফেলে। ভৌগোলিক অঞ্চলভেদে কীভাবে ভাষার বিবর্তন হয়েছে। কীভাবে গোটা দেশে সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। জেনে রাখবেন ভাষার বৈচিত্র্যের জন্য জগৎসভায় ভারতবর্ষ আরও ব্যতিক্রমী হয়ে উঠেছে।

এই বিভাগে কুইজের আয়োজন করা হয়েছে যার মাধ্যমে ভাষার বৃহত্তর পরিসরে আপনি নিজের ভাষার অবস্থানের সন্ধান পেতে পারেন এবং অনুভব করতে পারেন প্রত্যেক মাতৃভাষার মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানের অমূল্য ভাণ্ডার। 

ভারতবর্ষে সাহিত্য সৃষ্টির কেন্দ্রসমূহ | ছবি: বিশ্বয়নী দত্ত

ভাষার সময়কাল

প্রচীন চিহ্ন-প্রতীক, লিপি থেকে শিলালিপির বিকাশ এবং পরবর্তীকালে সুসংগঠিত সাহিত্যচর্চার উত্থানের এই দীর্ঘ যাত্রাপথ তুলে ধরা হয়েছে এই গ্যালারিতে। প্রদর্শনীর মাধ্যমে দেখানো হয়েছে কীভাবে ধর্ম, রাজনীতি, বাণিজ্য প্রভাব ফেলেছে ভাষার বিস্তার ও প্রসারে। বিশ্লেষণ করা হয়েছে একই জনপরিসরে একাধিক ভাষার সহবস্থানের প্রমাণ মিলেছে বহু ভাষায় লেখা শিলালিপিগুলিতে।  

ওরাল ট্র্যাডিশন 

বিভিন্ন ভাষায় জ্ঞান বইয়ের পাতায় সংরক্ষিত হওয়ার বহু বছর আগে শুধুমাত্র মৌখিকভাবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে জ্ঞান ও স্মৃতির সঞ্চার করা হত। ওরাল ট্যাডিশন আসলে মানবজাতির ইতিহাস, সংস্কৃতি, আচার-রীতিনীতি, ভাবনা, প্রকৃতি সম্পর্কে জ্ঞান, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের বৈচিত্র্যকে সংরক্ষণ করে এসেছে। লোকগাথা, গল্প বলা, ঘুমপাড়ানি গান মৌথিকভাবে জ্ঞান, নিজের ইতিহাসকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার অন্যতম মাধ্যম। মজার বিষয় এই প্রত্যেকটি মাধ্যমই শুধুমাত্র বক্তা ও শ্রোতার সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল। বক্তা যেভাবে ইতিহাস বলছে শ্রোতা তা শুনে সেইভাবে সেই ইতিহাস মনে রাখছে, তার কাছ থেকে অপরজনের কাছে সেই ইতিহাস ছড়িয়ে পড়ছে। 

পারফর্মিং ট্র্যাডিশন 

বিশ শতাব্দীর মুদ্রণযন্ত্র | ছবি: বিশ্বয়নী দত্ত

ভাষাকে রূপ দেয় পরিবেশনা, যদি ভাষা আত্মা হয় তাহলে পরিবেশনা শরীর। কখনও শব্দের সঙ্গে ছন্দ যুক্ত হয়ে তৈরি হয় আবৃতি, সুর যুক্ত হয়ে তৈরি হয় সংগীত। পারফর্মিং ট্যাডিশন গ্যালারিতে নাটক, সংগীত, পুতুলনাচ, ছৌনৃত্য, ভক্তিগীতি বিভিন্ন শিল্পরূপের কথা তুলে ধরা হয়। বিভিন্ন ছবি প্রদর্শনীর মাধ্যমে পরিবেশন করা হয় কীভাবে বিভিন্ন শিল্পীরা উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া নিজেদের ইতিহাস, স্মৃতি ও সংস্কৃতিকে  নিজস্ব ব্যাখ্যার মাধ্যমে নতুন রূপ দেন। পারফর্মিং ট্যাডিশন হয়ে ওঠে শিল্পীর সত্ত্বা ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম। 

বসুধৈব কুটুম্বকম্

গোটা পৃথিবীটা আসলে একটাই পরিবার, তার সবথেকে বড় প্রমাণ হচ্ছে ভাষা। ভারতের বিভিন্ন ভাষা, এতিহ্য, সংস্কৃতি ভৌগোলিক ও আঞ্চলিক গণ্ডি ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়েছে সারা বিশ্বে। কূটনৈতিক সম্পর্ক, তীর্থযাত্রা, পারস্পরিক সংস্কৃতির আদান-প্রদানের মাধ্যমে উৎসস্থলের সীমানা পেরিয়ে গোটার বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে গেছে ভারতীয় শব্দ, ছড়িয়ে পড়েছে ভারতীয় দর্শন। ‘গ্লোবাল ডায়লগ’ গ্যালারিতে যত্ন সহকারে তুলে ধরা হয়েছে পারস্পরিক আদান-প্রদানের ইতিহাস। ভারতের সংস্কৃতি যেমন গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে একইভাবে অন্যান্য দেশের সংস্কৃতি ও বিভিন্ন শব্দ ও ধর্মীয় চিন্তাধারা ভারতবর্ষে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে। যুগ যুগ ধরে এইভাবেই ভাষা ও ভাবনার বিশ্বব্যাপী বিস্তার ও আদান-প্রদান হচ্ছে। Raise Your Concern About this Content

কীভাবে যাবেন?

হাওড়া থেকে বাসে চলে যেতে পারেন রবীন্দ্র সদন, মেট্রোতেও রবীন্দ্র সদন যেতে পারেন। রবীন্দ্র সদন থেকে ২৩০ নং বাস ধরবেন, ন্যাশনাল লাইব্রেরির প্রধান গেটে নামিয়ে দেবে বাস। সেখানে আই-কার্ড বা আধার কার্ড দেখালে জাতীয় গ্রন্থাগারের বেলভেডিয়ার হাউসে আপনারা প্রবেশ করতে পারবেন। জাদুঘরের পাশেই রয়েছে টিকিট কাউন্টার, সেখান থেকে সংগ্রহ করতে হবে টিকিট যা ১৫ অগাস্ট পর্যন্ত আপনারা বিনামূল্যে পেয়ে যাবেন। 

কবে ও কখন খোলা থাকে?

মঙ্গলবার থেকে রবিবার সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যে ৬টা পর্যন্ত খোলা থাকে বিকেল ৫.৩০টায় বন্ধ হয়ে যায় টিকিট কাউন্টার 
সপ্তাহে সোমবার সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে
সরকারি ছুটিগুলিতেও বন্ধ থাকে এই সংগ্রহশালা  
ভাষা যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম।  এই ভাষার মাধ্যমে ইতিহাস, সংস্কৃতি, শিক্ষা, স্মৃতি, এতিহ্য এক প্রজন্ম থেকে পরের প্রজন্মের কাছে পৌঁছে যায়। ধ্বনি থেকে শব্দ, তারপর লিপি এবং পরবর্তীকালে সাহিত্য,জ্ঞান, শিল্প, প্রযুক্তির দীর্ঘ যাত্রায় ভাষা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। সেই যাত্রাপথকে খুব নিঁখুতভাবে তুলে ধরা হয়েছে কলকাতার মিউজিয়াম অফ ওয়ার্ডসের মঞ্চে। 

তথ্যসূত্র

১. শব্দের জাদুঘর : অফিশিয়াল ওয়েবসাইট
২. কলকাতার নতুন Museum of Words – ThePrint প্রতিবেদন

রেলস্টেশন নয়, স্বাধীনতার স্মৃতিস্তম্ভ! নেতাজির নামে দুই স্টেশনের ইতিহাস

নেতাজির নাম কেন রেলস্টেশনের সঙ্গে যুক্ত?

ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর অবদান অনন্য। তাঁর নেতৃত্ব, সাহস, আত্মত্যাগ এবং স্বাধীন ভারতের স্বপ্ন আজও কোটি মানুষের অনুপ্রেরণা। তাই দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান, বিমানবন্দর, বিশ্ববিদ্যালয়, সড়ক এবং রেলস্টেশনের সঙ্গে তাঁর নাম যুক্ত করা হয়েছে।রেলস্টেশনের নামকরণ কেবল একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়। এটি ইতিহাসকে জনজীবনের সঙ্গে যুক্ত রাখার এক কার্যকর উপায়। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ যখন কোনও স্টেশনের নাম উচ্চারণ করেন, তখন অজান্তেই ইতিহাসের একটি অধ্যায়ের সঙ্গে তাঁদের পরিচয় ঘটে।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

নেতাজির নামে ভারতের দুটি রেলস্টেশন

১. নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু গোমো জংশন (ঝাড়খণ্ড)

ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জংশনগুলির একটি হল ঝাড়খণ্ডের ধানবাদ জেলার নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু গোমো জংশন। বহু বছর ধরে এটি শুধু “গোমো জংশন” নামেই পরিচিত ছিল। ২০০৯ সালে নেতাজির ঐতিহাসিক পলায়নের স্মৃতিকে সম্মান জানিয়ে স্টেশনটির নাম পরিবর্তন করা হয়। এই স্টেশনটির সঙ্গে নেতাজির জীবনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় জড়িয়ে রয়েছে। ১৯৪১ সালের জানুয়ারিতে ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের চোখ এড়িয়ে কলকাতার এলগিন রোডের বাড়ি থেকে ছদ্মবেশে বেরিয়ে তিনি গাড়িতে করে গোমো পৌঁছন। সেখান থেকেই তিনি কালকা মেলে চেপে উত্তর-পশ্চিম ভারতের উদ্দেশে রওনা দেন। সেই যাত্রাই পরবর্তীতে তাঁকে আফগানিস্তান, জার্মানি এবং পরে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পৌঁছে দেয়, যেখানে তিনি আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠন করেন। আজও গোমো স্টেশনে নেতাজির স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষিত রয়েছে। ইতিহাসপ্রেমীদের কাছে এটি এক বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্র।

২. ইতওয়ারি রেলওয়ে স্টেশন

নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ইতওয়ারি রেলওয়ে স্টেশন হল ইতওয়ারি রেলওয়ে স্টেশনের সরকারি নাম। ২০২৩ সালের ১৬ জুন মহারাষ্ট্র সরকারের স্বরাষ্ট্র বিভাগ গেজেট বিজ্ঞপ্তি জারি করে স্টেশনটির নামের পূর্বে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর নাম সংযোজনের ঘোষণা দেয়। ইতওয়ারি রেলওয়ে স্টেশনটি দক্ষিণ পূর্ব মধ্য রেলওয়ের (South East Central Railway) নাগপুর ডিভিশনের অধীন পরিচালিত হয়। ভারতীয় রেলের এনএসজি-৪ (NSG-4) শ্রেণিভুক্ত এই স্টেশনে মোট ছয়টি প্ল্যাটফর্ম রয়েছে। নাগপুর রেলওয়ে স্টেশনের পাশাপাশি এটি নাগপুর শহরের একটি গুরুত্বপূর্ণ রেলস্টেশন। হাওড়া–মুম্বাই রেলপথে অবস্থিত এই স্টেশন থেকে প্রায় ১৪টি ট্রেন যাত্রা শুরু করে বা যাত্রা শেষ করে।ভারতের বিভিন্ন রেলওয়ে স্টেশনের নাম দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব ও স্বাধীনতা সংগ্রামীদের স্মরণে রাখা হয়েছে। এর মাধ্যমে তাঁদের অবদান ও আদর্শ নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা হয় এবং তাঁদের স্মৃতি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকে। এসব নামকরণ দেশপ্রেম, ত্যাগ, সেবা ও নৈতিক মূল্যবোধের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা প্রকাশের পাশাপাশি জাতির ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

এছাড়াও, কলকাতার উপনগর রেল ব্যবস্থায় নেতাজি ভবন মেট্রো স্টেশন এবং আন্দামানে নেতাজির নামে পুনর্নামকরণ হওয়া দ্বীপসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো তাঁর স্মৃতিকে বহন করছে। এছাড়া কলকাতা মেট্রোর “নেতাজি” স্টেশন (কবী সুভাষ–দক্ষিণেশ্বর করিডরের অংশ) এবং “নেতাজি ভবন” মেট্রো স্টেশন নেতাজির স্মৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। যদিও এগুলি ভারতীয় রেলের মূল নেটওয়ার্কের স্টেশন নয়, তবুও প্রতিদিন লক্ষাধিক যাত্রীর কাছে নেতাজির স্মৃতিকে জীবন্ত রাখছে।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

নেতাজি ও ভারতীয় রেলের ঐতিহাসিক সম্পর্ক

নেতাজির জীবনের বহু গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত রেলপথের সঙ্গে যুক্ত।কলকাতা থেকে তাঁর ঐতিহাসিক পলায়ন যেমন রেলের মাধ্যমে সম্পূর্ণ হয়েছিল, তেমনই স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় ভারতীয় রেল ছিল বিপ্লবীদের অন্যতম যোগাযোগের মাধ্যম। রেলপথ শুধু যাতায়াত নয়, সংবাদ আদান-প্রদান, সংগঠন বিস্তার এবং গোপন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। নেতাজির গোমো যাত্রা ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম নাটকীয় অধ্যায় হিসেবে ইতিহাসে স্থান পেয়েছে।

১৯৪১ সালের সেই ঐতিহাসিক পলায়ন

১৯৪১ সালের ১৬ জানুয়ারি গভীর রাতে কলকাতার এলগিন রোডের বাড়ি থেকে ‘মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিন’ নামে ছদ্মবেশে বেরিয়ে পড়েন নেতাজি। তাঁর ভাইপো শিশির কুমার বসু গাড়ি চালিয়ে তাঁকে গোমো স্টেশনে পৌঁছে দেন। সেখান থেকে কালকা মেলে উঠে তিনি দিল্লি হয়ে পেশোয়ার পৌঁছন। এরপর আফগানিস্তান, সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং জার্মানিতে পৌঁছে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করেন। পরবর্তীতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় গিয়ে আজাদ হিন্দ সরকার ও আজাদ হিন্দ ফৌজের নেতৃত্ব দেন। গোমো স্টেশন তাই শুধু একটি রেলস্টেশন নয়, ভারতের স্বাধীনতার ইতিহাসে এক স্মরণীয় অধ্যায়ের সূচনাস্থল।

রেলস্টেশনের নামকরণ: ইতিহাস সংরক্ষণের কার্যকর মাধ্যম

শুধু বই বা জাদুঘর নয়, জনজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই ইতিহাসকে বাঁচিয়ে রাখার প্রয়োজন রয়েছে। সেই জায়গা থেকেই গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বদের নামে স্টেশন, বিমানবন্দর বা রাস্তার নামকরণ করা হয়। এর ফলে নতুন প্রজন্ম কৌতূহলী হয়, ইতিহাস জানতে আগ্রহী হয় এবং জাতীয় ব্যক্তিত্বদের অবদান সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি হয়।

নাম পরিবর্তনের সামাজিক ও রাজনৈতিক তাৎপর্য

স্টেশনের নাম পরিবর্তন অনেক সময় শুধুই প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে সাংস্কৃতিক পরিচয়, আঞ্চলিক আবেগ এবং জাতীয় স্মৃতিচর্চা। গোমো স্টেশনের সঙ্গে নেতাজির নাম যুক্ত হওয়ায় স্বাধীনতা সংগ্রামের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় নতুন করে মানুষের সামনে এসেছে। একই সঙ্গে স্থানীয় মানুষের মধ্যেও ঐতিহাসিক গর্বের অনুভূতি তৈরি হয়েছে।

সাধারণ মানুষের কাছে নেতাজির জনপ্রিয়তা

আজও “জয় হিন্দ” উচ্চারণে যেমন নেতাজির কথা মনে পড়ে, তেমনই তাঁর জন্মদিন, আজাদ হিন্দ ফৌজ বা স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রসঙ্গ উঠলেই সুভাষচন্দ্র বসুর নাম সবার আগে আসে।এই জনপ্রিয়তাই তাঁর নামে থাকা অবকাঠামোগুলিকে সাধারণ মানুষের কাছে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

রেলস্টেশন: শুধু যাতায়াতের জায়গা নয়, ইতিহাসের সাক্ষী

অনেক ঐতিহাসিক ঘটনা কোনও প্রাসাদে নয়, সাধারণ রেলস্টেশনেই ঘটেছে। স্বাধীনতা সংগ্রাম, দেশভাগ, উদ্বাস্তুদের যাত্রা কিংবা বিপ্লবীদের গোপন অভিযান—সব কিছুরই নীরব সাক্ষী ভারতের রেল। গোমো স্টেশন সেই ইতিহাসের অন্যতম উজ্জ্বল উদাহরণ।

ভারতের রেল মানচিত্রে ইতিহাসের ছাপ

ভারতের বিভিন্ন রেলস্টেশনের নামের মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে ইতিহাসের নানা অধ্যায়। ছত্রপতি শিবাজি মহারাজ, ড. বি. আর. আম্বেদকর, দীনদয়াল উপাধ্যায় কিংবা নেতাজি—বিভিন্ন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের নামে নামাঙ্কিত স্টেশনগুলি দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও অংশ।

নেতাজির স্মৃতিকে ঘিরে পর্যটনের সম্ভাবনা

গোমো স্টেশনকে কেন্দ্র করে স্বাধীনতা সংগ্রামভিত্তিক পর্যটনের সম্ভাবনা যথেষ্ট। স্টেশনের সঙ্গে নেতাজির পলায়নের রুট, স্মারক, তথ্যকেন্দ্র এবং ঐতিহাসিক প্রদর্শনী আরও সমৃদ্ধ করা গেলে দেশ-বিদেশের পর্যটকদের আকৃষ্ট করা সম্ভব। ইতিহাসভিত্তিক পর্যটন যেমন স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে পারে, তেমনই স্বাধীনতা সংগ্রামের স্মৃতিকেও নতুন প্রজন্মের সামনে জীবন্ত করে তুলতে পারে।Raise Your Concern About this Content

পরিশেষে বলা যায়, স্টেশনের নাম শুধু একটি পরিচয় নয়, তা একটি জাতির স্মৃতি, আবেগ এবং ইতিহাসের ধারকও বটে। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর নামে থাকা এই দুটি রেলস্টেশন প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রীর কাছে স্বাধীনতার ইতিহাসকে নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়। সময়ের সঙ্গে প্রযুক্তি যেমন এগিয়েছে, তেমনই ইতিহাসকেও জীবন্ত রাখার দায়িত্ব আমাদের সবার। নেতাজির নামে এই স্টেশনগুলি সেই দায়িত্বই পালন করছে নীরবে। তাই পরের বার যদি এই স্টেশনগুলির কোনও একটিতে আপনার ট্রেন থামে, একটু থেমে মনে করুন—এই প্ল্যাটফর্ম শুধু যাত্রার সূচনা বা সমাপ্তির স্থান নয়, এটি এমন এক বীরের স্মৃতিবিজড়িত ঠিকানা, যাঁর স্বপ্ন, সাহস ও আত্মত্যাগ আজও ভারতবাসীকে অনুপ্রাণিত করে। সেইসঙ্গে বলা যায়, একটি রেলস্টেশন কেবল ট্রেনের ওঠানামার জায়গা নয়, কখনও কখনও তা হয়ে ওঠে একটি জাতির স্মৃতির ভাণ্ডার। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর নামে থাকা রেলস্টেশনগুলি সেই ঐতিহ্যেরই অংশ। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ সেখানে যাতায়াত করেন, কিন্তু সেই নামের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে স্বাধীনতার জন্য এক অসাধারণ সংগ্রামের ইতিহাস। নেতাজির জীবন আমাদের শিখিয়েছে—অসম্ভবকে সম্ভব করার সাহসই ইতিহাস তৈরি করে। তাই তাঁর নামে থাকা রেলস্টেশনগুলি শুধু একটি নামফলক নয়, বরং স্বাধীন ভারতের আত্মমর্যাদা, আত্মত্যাগ এবং অদম্য দেশপ্রেমের চিরন্তন প্রতীক। 

তথ্যসূত্র

১. গোমো স্টেশনের নামকরণ, ইতিহাস ও নেতাজির ঐতিহাসিক যাত্রার তথ্য।
২. নেতাজির জীবন ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
৩. নেতাজির নামের রেলস্টেশন
৪. ইতওয়ারি রেলওয়ে স্টেশন

বন্ধুত্ব দিবস-এর জন্ম কোথায়? যে ইতিহাসটা বেশিরভাগ মানুষই জানেন না

মজার বিষয় হলো, এই প্রশ্নগুলোর উত্তর অনেকেরই জানা নেই। কেউ বলেন এটি একটি আমেরিকান উৎসব, কেউ বলেন জাতিসংঘ শুরু করেছে, আবার অনেকে মনে করেন এটি শুধুই Greeting Card কোম্পানির মার্কেটিং কৌশল। কিন্তু ইতিহাস অন্য কথা বলছে। 

আজ এই ব্লগে, আমরা সেই ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করব, এবং জেনে নেব, ফ্রেন্ডশিপ ডের সম্পর্কে অজানা তথ্য। 

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

Friendship Day নিয়ে এত বিভ্রান্তি কেন?

আপনি যদি ইন্টারনেটে “Friendship Day History” লিখে সার্চ করেন, তাহলে একাধিক ভিন্ন তথ্য দেখতে পাবেন। কোথাও বলা হয় ১৯৩৫ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এই দিবসের সূচনা, কোথাও বলা হয় ১৯৫৮ সালে প্যারাগুয়েতে এর জন্ম, আবার জাতিসংঘের ওয়েবসাইটে দেখা যায় ৩০ জুলাই International Day of Friendship হিসেবে স্বীকৃত।

তাহলে কোন তথ্যটি সত্য?

আসলে তিনটিই আংশিক ভাবে সত্য, তবে এগুলো কোনোটি একই ঘটনার অংশ নয়।

বন্ধুত্ব দিবসের ইতিহাসকে বুঝতে হলে তিনটি আলাদা বিষয় জানতে হবে—

  • প্রথমত, ব্যবসায়িক উদ্যোগ হিসেবে Friendship Day-এর ধারণা।
  • দ্বিতীয়ত, প্যারাগুয়ের সামাজিক আন্দোলন, যা বন্ধুত্বকে বৈশ্বিক মূল্যবোধে পরিণত করতে চেয়েছিল।
  • তৃতীয়ত, জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, যা বন্ধুত্বকে শান্তি ও সহযোগিতার প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে।

এই তিনটি ঘটনাকে একসঙ্গে মিশিয়ে দেওয়ার কারণেই আজও Friendship Day নিয়ে বিভ্রান্তি রয়ে গেছে।

Friendship Day-এর আগে: মানুষ কবে থেকে বন্ধুত্বকে এত গুরুত্ব দিতে শুরু করল?

Friendship Day আধুনিক সময়ের একটি দিবস হলেও বন্ধুত্বের ধারণা মানবসভ্যতার মতোই প্রাচীন।

মানববিজ্ঞানীরা মনে করেন, আদিম যুগে মানুষ একা বেঁচে থাকতে পারত না। শিকার করা, খাদ্য সংগ্রহ, সন্তান লালন-পালন কিংবা বন্য প্রাণীর আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য সহযোগিতা ছিল অপরিহার্য। এই সহযোগিতা থেকেই ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে পারস্পরিক বিশ্বাস ও বন্ধুত্ব।

বন্ধুত্বকে দার্শনিকভাবে ব্যাখ্যা করেছিলেন প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ Nicomachean Ethics-এ তিনি বন্ধুত্বকে তিন ভাগে ভাগ করেন—

  • উপকারের জন্য বন্ধুত্ব (Friendship of Utility)
  • আনন্দের জন্য বন্ধুত্ব (Friendship of Pleasure)
  • নৈতিকতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে বন্ধুত্ব (Friendship of Virtue)

অ্যারিস্টটলের মতে, তৃতীয় ধরনের বন্ধুত্বই সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী ও মূল্যবান, কারণ এটি স্বার্থের উপর নয়, চরিত্র ও বিশ্বাসের উপর দাঁড়িয়ে থাকে।

আজকের মনোবিজ্ঞানও অনেকাংশে এই ধারণাকে সমর্থন করে। গবেষণায় দেখা গেছে, ভালো বন্ধু মানসিক চাপ কমায়, একাকীত্ব দূর করে এবং জীবনের কঠিন সময়ে মানুষকে মানসিকভাবে শক্ত থাকতে সাহায্য করে। অর্থাৎ Friendship Day তৈরি হওয়ার বহু আগে থেকেই বন্ধুত্ব মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে জায়গা গড়ে তুলে ছিল। 

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

১৯৩০-এর দশক: একটি Greeting Card কোম্পানি কীভাবে Friendship Day-কে জনপ্রিয় করার চেষ্টা করেছিল?

Friendship Day-এর ইতিহাসে প্রথম বড় মোড় আসে যুক্তরাষ্ট্রে।

১৯৩০-এর দশকে Hallmark Cards নামের একটি জনপ্রিয় Greeting Card কোম্পানি বন্ধুদের জন্য বিশেষ শুভেচ্ছা কার্ড বিক্রির উদ্দেশ্যে Friendship Day উদযাপনের ধারণাকে জনপ্রিয় করার চেষ্টা করে।

তখনকার সময়ে Mother’s Day এবং Father’s Day-এর মতো বিশেষ দিবসগুলো বাণিজ্যিকভাবে সফল হয়ে উঠছিল। Hallmark বুঝতে পারে, বন্ধুত্বকে কেন্দ্র করেও একটি বিশেষ দিন তৈরি করা গেলে মানুষ বন্ধুদের কার্ড, উপহার ও শুভেচ্ছা পাঠাবে। 

এই উদ্যোগের ফলে যুক্তরাষ্ট্রে কিছু মানুষের মধ্যে Friendship Day নিয়ে আগ্রহ তৈরি হলেও এটি খুব বেশি জনপ্রিয় হতে পারেনি।

এর অন্যতম কারণ ছিল সাধারণ মানুষের ধারণা, এটি কোনও সামাজিক উদ্যোগ নয়, বরং একটি বাণিজ্যিক প্রচারণা।

এরপর ইতিহাসে আসে আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়।

কেন Paraguay-কে Friendship Day-এর জন্মস্থান বলা হয়?

যদি প্রশ্ন করা হয়, Friendship Day-কে সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করার কৃতিত্ব কোন দেশের? তাহলে উত্তর হবে প্যারাগুয়ে।

১৯৫৮ সালের ২০ জুলাই প্যারাগুয়ের চিকিৎসক ও সমাজকর্মী Dr. Ramón Artemio Bracho এবং তাঁর কয়েকজন সহকর্মী একটি নৈশভোজের আয়োজন করেন। সেখানে তারা এমন একটি আন্তর্জাতিক উদ্যোগের প্রস্তাব দেন, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল, মানুষে মানুষে বন্ধুত্বের মাধ্যমে শান্তি, সম্প্রীতি এবং পারস্পরিক সম্মান গড়ে তোলা।

এই সভা থেকেই জন্ম নেয় World Friendship Crusade নামের একটি সংগঠন। তাদের লক্ষ্য ছিল, তারা বন্ধুত্বকে শুধু ব্যক্তিগত সম্পর্ক হিসেবে দেখেননি; বরং জাতি, ভাষা, ধর্ম ও দেশের সীমানা অতিক্রম করে মানবিক সংযোগের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন।

World Friendship Crusade বিভিন্ন দেশে প্রচার চালায় এবং ধীরে ধীরে Friendship Day-এর ধারণা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিচিত হতে শুরু করে।

এই কারণেই অনেক ইতিহাসবিদ এবং আন্তর্জাতিক গবেষক প্যারাগুয়েকেই Friendship Day-এর প্রকৃত জন্মস্থান হিসেবে উল্লেখ করেন। কারণ এখানে Friendship Day প্রথমবারের মতো একটি সামাজিক ও মানবিক আন্দোলনের রূপ পায়, যা পরে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির ভিত্তি তৈরি করে।

তবে এখানেই ইতিহাস শেষ নয়। Friendship Day-কে বিশ্বব্যাপী সরকারি স্বীকৃতি পেতে আরও কয়েক দশক অপেক্ষা করতে হয়েছে। সেই স্বীকৃতি আসে জাতিসংঘের হাত ধরে।

জাতিসংঘের স্বীকৃতি: ৩০ জুলাই কীভাবে International Day of Friendship হলো?

প্যারাগুয়ের World Friendship Crusade-এর উদ্যোগ ধীরে ধীরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নজর কেড়েছিল। কয়েক দশক ধরে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও সামাজিক সংগঠন বন্ধুত্বকে কেবল ব্যক্তিগত সম্পর্ক নয়, বরং বিশ্বশান্তি ও সাংস্কৃতিক সম্প্রীতির অন্যতম ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরতে শুরু করে।

অবশেষে, ২০১১ সালের ২৭ এপ্রিল জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ (United Nations General Assembly) একটি প্রস্তাব গ্রহণ করে ৩০ জুলাইকে “International Day of Friendship” হিসেবে ঘোষণা করে।

তবে একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে বুঝে নেওয়া জরুরি যে জাতিসংঘ Friendship Day-এর সূচনা করেনি; বরং ইতিমধ্যে প্রচলিত একটি ধারণাকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দিয়েছে।

জাতিসংঘের ঘোষণায় বলা হয়, বিভিন্ন সংস্কৃতি, জাতি, ধর্ম ও দেশের মানুষের মধ্যে বন্ধুত্ব, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং সংলাপ বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার অন্যতম কার্যকর উপায় হতে পারে। তাই এই দিনটি শুধুমাত্র বন্ধুদের শুভেচ্ছা জানানোর জন্য নয়, বরং মানবিক সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করার একটি বৈশ্বিক আহ্বান ছিল।

এই ঘোষণার পর থেকে বহু দেশ ৩০ জুলাই আন্তর্জাতিক বন্ধুত্ব দিবস হিসেবে পালন করলেও, সব দেশ একই তারিখ অনুসরণ করেনি।

তাহলে ভারতে Friendship Day আগস্টের প্রথম রবিবার কেন?

ভারত, বাংলাদেশ, নেপালসহ দক্ষিণ এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশে Friendship Day সাধারণত আগস্ট মাসের প্রথম রবিবার পালিত হয়। ফলে অনেকের মধ্যেই একটা প্রশ্ন থাকে, যদি জাতিসংঘ ৩০ জুলাইকে স্বীকৃতি দিয়ে থাকে, তাহলে এই ভিন্নতা কেন?

এর উত্তর লুকিয়ে আছে নব্বইয়ের দশকের ভারতীয় সমাজে।

১৯৯১ সালের অর্থনৈতিক উদারীকরণের পর ভারতীয় বাজারে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড, Greeting Card কোম্পানি, টেলিভিশন চ্যানেল এবং নতুন ধরনের যুব সংস্কৃতির দ্রুত বিস্তার ঘটে। সেই সময় Archies, Hallmark, বিভিন্ন FM Radio Station এবং MTV India Friendship Day-কে তরুণদের উৎসব হিসেবে জনপ্রিয় করে তোলে।

স্কুল-কলেজে রঙিন Friendship Band পরানো, বন্ধুদের হাতে হাতে শুভেচ্ছা কার্ড দেওয়া, ছোট উপহার বিনিময়, এসবই ধীরে ধীরে শহুরে সংস্কৃতির অংশ হয়ে ওঠে।

মজার বিষয় হলো, আগস্টের প্রথম রবিবার হওয়ায় স্কুল ও কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণও বেড়ে যায়। সপ্তাহান্ত হওয়ায় বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে যাওয়া, সিনেমা দেখা কিংবা ছোটখাটো বিনোদন মূলক আয়োজন করাও সহজ ছিল।

অর্থাৎ ভারতে Friendship Day-এর জনপ্রিয়তা মূলত যুব সংস্কৃতি, মিডিয়া এবং বাজারব্যবস্থার সম্মিলিত প্রভাবের ফল।

সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে Friendship Day-এর নতুন পরিচয়

যদি ২০০৫ সালের Friendship Day আর ২০২৬ সালের Friendship Day-কে পাশাপাশি রাখা যায়, তাহলে দুটির চেহারা একেবারেই আলাদা।

এক সময় বন্ধুর বাড়িতে গিয়ে শুভেচ্ছা জানানো বা হাতে Friendship Band বাঁধাই ছিল সবচেয়ে বড় আকর্ষণ। এখন সেই জায়গা দখল করেছে Instagram Story, WhatsApp Status, Spotify Playlist, Shared Memories, Facebook Memories এবং Reels।

Gen Z-এর কাছে Friendship Day শুধুমাত্র একটি দিন নয়; এটি নিজের বন্ধুত্বকে ডিজিটালভাবে উদযাপন করারও একটি উপলক্ষ।

শুধু তাই নয়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বন্ধুত্বের ধারণাও বদলেছে। এতে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে, ডিজিটাল যুগে বন্ধুত্বের সংজ্ঞা কি বদলে যাচ্ছে?

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, প্রযুক্তি যোগাযোগ সহজ করলেও প্রকৃত বন্ধুত্বের মূল ভিত্তি এখনও একই, বিশ্বাস, নির্ভরযোগ্যতা এবং পারস্পরিক সম্মান।

অর্থাৎ মাধ্যম বদলেছে, কিন্তু বন্ধুত্বের মৌলিক মূল্যবোধ অতীতে যা ছিল এখনও তাই আছে। 

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

Friendship Day নিয়ে প্রচলিত ৫টি ভুল ধারণা

ইন্টারনেটে Friendship Day নিয়ে অসংখ্য তথ্য থাকলেও, তার সবই যে সঠিক সেটা ভেবে নেওয়া একদম ভুল হবে। চলুন দেখে নেওয়া যাক সবচেয়ে প্রচলিত কয়েকটি ভুল ধারণা।

১. Friendship Day সম্পূর্ণ আমেরিকান উৎসব

কিছুটা সত্য হলেও, সম্পূর্ণ বিষয়টি সত্যি নয়। ধারণাটি যুক্তরাষ্ট্রে জনপ্রিয় করার চেষ্টা করা হলেও, আন্তর্জাতিক সামাজিক আন্দোলনের রূপ পায় প্যারাগুয়েতে।

২. জাতিসংঘ Friendship Day শুরু করেছে

না। জাতিসংঘ ২০১১ সালে দিবসটিকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেয়। এর ইতিহাস তারও কয়েক দশক পুরোনো।

৩. সব দেশে একই দিনে Friendship Day পালিত হয়।

একেবারেই নয়। কিছু দেশ ৩০ জুলাই পালন করে, আবার ভারতসহ অনেক দেশে আগস্টের প্রথম রবিবার Friendship Day উদযাপিত হয়।

৪. Friendship Band দিয়েই Friendship Day- উদযাপন শুরু।

না। Friendship Band অনেক পরে আসে, বিশেষ করে নব্বইয়ের দশকে জনপ্রিয় হয়। তার আগে বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করা, ফুল দেওয়া বা অন্য কোন উপহার দেওয়া বা গ্রিটিংস কার্ড দেওয়ার প্রচলন ছিল।

৫. Friendship Day শুধুই ব্যবসায়িক প্রচারণা

কিছু ক্ষেত্রে এটা সত্য। শুরুর দিকে ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য থাকলেও পরে এটি সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং আন্তর্জাতিক গুরুত্ব লাভ করে। আজ এটি বন্ধুত্ব, সহমর্মিতা এবং বিশ্বসম্প্রীতির প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হয়।Raise Your Concern About this Content

Friendship Day-এর ইতিহাস  জানা কেন গুরুত্বপূর্ণ ? 

Friendship Day-এর ইতিহাস আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শেখায়, প্রতিটি জনপ্রিয় উৎসবের পেছনে থাকে একাধিক গল্প।

এই দিবসের যাত্রা শুরু হয়েছিল বাণিজ্যিক প্রচারণার মাধ্যমে। পরে প্যারাগুয়ের একটি সামাজিক উদ্যোগ এটিকে মানবিক মূল্যবোধের আন্দোলনে রূপ দেয়। শেষ পর্যন্ত জাতিসংঘ সেটিকে আন্তর্জাতিক শান্তি ও সম্প্রীতির প্রতীক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

অর্থাৎ Friendship Day-এর ইতিহাস কেবল একটি তারিখের ইতিহাস নয়; এটি মানুষের সম্পর্ক, সংস্কৃতি, অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতারও ইতিহাস।

আজকের দিনে যখন পৃথিবী নানা বিভাজনের মুখোমুখি, তখন Friendship Day আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বন্ধুত্ব শুধু ব্যক্তিগত আবেগ নয়, এটি পারস্পরিক বিশ্বাস, সহানুভূতি এবং সামাজিক সংযোগের শক্তিশালী ভিত্তি।

তাই Friendship Day-কে শুধুমাত্র সোশ্যাল মিডিয়ার পোস্ট, একটি Friendship Band বা একটি শুভেচ্ছা বার্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে, বরং প্রকৃত বন্ধুত্বের মূল্য উপলব্ধি করার দিন হিসেবেও দেখা যেতে পারে।

তথ্যসূত্র

১. রবিন ডানবার, ফ্রেন্ডস: আন্ডারস্ট্যান্ডিং দ্য পাওয়ার অফ আওয়ার মোস্ট ইম্পর্ট্যান্ট রিলেশনশিপ।
২. আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (APA)- বন্ধুত্ব, সামাজিক সম্পর্ক এবং মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে একাধিক গবেষণা।
৩. এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা।
৪. ব্রিটিশ কাউন্সিল, ফ্রেন্ডশিপ ডে- এর উৎপত্তি, Paraguay-এর ভূমিকা এবং UN-এর স্বীকৃতির সহজ ব্যাখ্যা রয়েছে।
৫. জাতিসংঘের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে আন্তর্জাতিক বন্ধুত্ব দিবস -এর উদ্দেশ্য, ইতিহাস এবং ৩০ জুলাইকে আন্তর্জাতিক বন্ধুত্ব দিবস হিসেবে ঘোষণার তথ্য।

নেতাজি ও কার্শিয়ং-এর বোস হাউস

দার্জিলিং -এর কার্শিয়ং-এর সবুজ পাহাড়ের কোলে অবস্থিত এক ঐতিহাসিক বাড়ি আজও বহন করে চলেছে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক গৌরবময় অধ্যায়। এই বাড়ির প্রতিটি ইট, প্রতিটি কোণ যেন সাক্ষী নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর সংগ্রামী জীবন, তাঁর অদম্য দেশপ্রেম এবং স্বাধীনতার স্বপ্নের। ব্রিটিশ শাসনের সময় গৃহবন্দি অবস্থায় নেতাজি এই বাড়িতেই কাটিয়েছিলেন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি মাস। এখান থেকেই তিনি লিখেছিলেন বহু ঐতিহাসিক চিঠি, রাজনৈতিক বার্তা এবং হরিপুরা কংগ্রেসের ঐতিহাসিক সভাপতির ভাষণের খসড়া। শুধু নেতাজিই নন, তাঁর দাদা স্বাধীনতা সংগ্রামী শরৎচন্দ্র বসুর স্মৃতিও জড়িয়ে রয়েছে এই বাড়ির সঙ্গে। বর্তমানে জাদুঘরে রূপান্তরিত এই ঐতিহ্যবাহী ভবনটি নেতাজির ব্যবহৃত নানা সামগ্রী, দুর্লভ আলোকচিত্র এবং ঐতিহাসিক দলিল সংরক্ষণ করে নতুন প্রজন্মের কাছে স্বাধীনতা আন্দোলনের এক মূল্যবান ইতিহাস তুলে ধরছে।

ইতিহাস 

১৯২২ সালে শরৎচন্দ্র বসু  তৎকালীন অসমের ডেপুটি সুপারিনটেনডেন্ট অব পুলিশ পিটার রাউলি লাসেলস ওয়ার্ড-এর কাছ থেকে এই বাড়িটি ক্রয় করেন।

১৯৩৩ থেকে ১৯৩৫ সাল পর্যন্ত শরৎচন্দ্র বসু ব্রিটিশ সরকারের নির্দেশে এই বাড়িতে অন্তরীণ অবস্থায় ছিলেন। পরে ১৯৩৬ সালে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকেও টানা ৭ মাস এই বাড়িতে গৃহবন্দি করে রাখা হয়। 

গৃহবন্দি অবস্থায় এখান থেকেই তিনি চৌকিদারদের মাধ্যমে গোপনে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের কাছে নানা নির্দেশ পাঠাতেন। ১৯৩৭ সালের অক্টোবর মাসে তিনি আবার কয়েক দিনের জন্য এই বাড়িতে আসেন।

এই বাড়ি থেকেই নেতাজি তাঁর স্ত্রী এমিলি শেঙ্কেল, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ বহু বিশিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে পত্র মাধ্যমে যোগাযোগ করেছিলেন। এছাড়াও এখানেই বসে তিনি হরিপুরা কংগ্রেসে সভাপতির ভাষণের খসড়া রচনা করেন। এখান থেকেই তিনি মহাত্মা গান্ধী ও জওহরলাল নেহরুর উদ্দেশে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ চিঠিও লিখেছিলেন।নেতাজির ব্যবহৃত বহু ব্যক্তিগত সামগ্রী আজও এই বাড়িতে সযত্নে সংরক্ষিত রয়েছে।

১৯৯৬ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের উচ্চশিক্ষা দপ্তর বাড়িটি অধিগ্রহণের উদ্যোগ গ্রহণ করে। পরবর্তীতে রাজ্য সরকার বাড়িটি অধিগ্রহণ করে সংস্কার করে এবং এর দায়িত্ব নেতাজি ইনস্টিটিউট ফর এশিয়ান স্টাডিজ-এর হাতে তুলে দেওয়া হয়। 

২০০৫ সালে কলকাতা মিউজিয়ামের উদ্যোগে বাড়িটিকে জাদুঘরে রূপান্তরিত করা হয়। নেতাজির লেখা সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ চিঠি আজও এখানে অত্যন্ত যত্ন সহকারে সংরক্ষিত রয়েছে এবং হিমালয় অঞ্চলের ভাষা, সমাজ ও সংস্কৃতি বিষয়ক গবেষণা কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হয়।

২০১৭ সালে বাড়িটির মেরামত ও পুনরুদ্ধারের জন্য পশ্চিমবঙ্গ সরকার ১০ লক্ষ টাকা বরাদ্দ করে। বর্তমানে এই ঐতিহাসিক বাড়িটি পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃত।

হরিপুরা কংগ্রেস ও বোস বাড়ির গুরুত্ব

১৯৩৮ সালে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় রচিত হয় গুজরাটের হরিপুরায় অনুষ্ঠিত ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের বার্ষিক অধিবেশনে, যা ‘হরিপুরা অধিবেশন’ নামে পরিচিত। গুজরাটের হরিপুরায় অনুষ্ঠিত এই অধিবেশনে সর্বসম্মতিক্রমে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হন। সভাপতির ভাষণে তিনি স্পষ্টভাবে জানান যে, বিভিন্ন প্রদেশে কংগ্রেসের গঠিত মন্ত্রিসভাগুলির মধ্যে বিপুল বৈপ্লবিক সম্ভাবনা রয়েছে এবং সেই সম্ভাবনাকে দেশের কল্যাণে কাজে লাগানো উচিত। আর কার্শিিয়ং-এর বোস বাড়িতে বসেই হরিপুরা কংগ্রেসের সভাপতি ভাষণের খসড়া লিখেছিলেন সুভাষচন্দ্র বোস।

শরৎচন্দ্র বোসের লাগানো ক্যামেলিয়া গাছ

বাড়িটির বাইরের অংশে রয়েছে এক মনোরম ও শান্ত বাগান, যেখানে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর একটি ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়েছে। চারপাশজুড়ে রয়েছে নানা প্রজাতির গাছপালা ও সবুজের সমারোহ। এছাড়াও এখানে রয়েছে একটি ঐতিহাসিক ক্যামেলিয়া গাছ, যা ১৯৩৪ সালে নেতাজির দাদা শরৎচন্দ্র বসু নিজ হাতে রোপণ করেছিলেন। আজও সেই গাছটি এই ঐতিহ্যবাহী বাড়ির ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। এই বাড়িতেই নেতাজি তাঁর ভাইপোদের সঙ্গে লুকোচুরি খেলতেন, দোলনায় দোল খেতেন এবং পরিবারের সঙ্গে আনন্দঘন সময় কাটাতেন।

নেতাজির দাদা শরৎচন্দ্র বোসের লাগানো ক্যামেলিয়া গাছ । ফটো : বিশ্বয়নী দত্ত

বোস হাউস ও দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস

ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম মহান নেতা দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসও এই ঐতিহাসিক বাড়িতে কিছু সপ্তাহ অবস্থান করেছিলেন। পরবর্তীকালে ১৯২৫ সালের ১৬ জুন দার্জিলিংয়ে তাঁর মৃত্যু হয়। ফলে এই বাড়িটি শুধু নেতাজি ও শরৎচন্দ্র বসুর স্মৃতিবিজড়িত নয়, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের উপস্থিতির কারণেও ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।

বোস বাড়ি ও পদ্মবাহাদুর ছেত্রী

১৯৭৩ সালে বসু পরিবারের সদস্য শিশির বসু ও কৃষ্ণা বসুর কাছ থেকে প্রতিদিন মাত্র ২ টাকা মজুরিতে এই বাড়ির রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পান পদ্মবাহাদুর ছেত্রী। এরপর থেকেই তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে এই ঐতিহাসিক স্মৃতিবিজড়িত বাড়ির দেখভাল করে আসছেন।

বাড়িতে কী কী সংগ্রহ করে রাখা হয়েছে?

কাঠ ও কাঁচের তৈরি ঐতিহ্যবাহী দরজা পেরিয়ে জাদুঘরে প্রবেশ করতেই চোখে পড়বে নস্টালজিয়া ভরা পুরনো দিনের পরিবেশ। বাড়িটি চারটি প্রশস্ত ঘর এবং একটি বড় খোলা বারান্দা রয়েছে । একসময় এই বারান্দাটিই বসার ঘর ও খাবার ঘর হিসেবে ব্যবহৃত হতো।

প্রতিটি ঘরের দেওয়ালজুড়ে সযত্নে সাজানো রয়েছে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর জীবনের নানা পর্যায়ের বিরল আলোকচিত্র। ছবিগুলির মাধ্যমে ধাপে ধাপে ফুটে উঠেছে তাঁর শৈশব, শিক্ষাজীবন, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, স্বাধীনতা সংগ্রামে তাঁর ভূমিকা, দেশি-বিদেশি নেতাদের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ, আজাদ হিন্দ ফৌজের নেতৃত্ব, স্ত্রী এমিলি শেঙ্কেলের সঙ্গে কাটানো মুহূর্ত এবং তাঁর জীবনের শেষ যাত্রার স্মৃতিচিহ্ন।

জাদুঘরের একটি কক্ষ এবং খোলা বারান্দার একটি অংশে সংরক্ষণ করা হয়েছে কার্শিয়াংয়ের গিদ্দা পাহাড়ের এই বাড়িতে অবস্থানকালে নেতাজির ব্যবহৃত আসবাবপত্র। তাঁর ব্যবহৃত খাট, টেবিল, চেয়ারসহ বিভিন্ন ঐতিহাসিক সামগ্রীর পাশাপাশি আজাদ হিন্দ ফৌজের পোশাক, জুতো এবং আরও অনেক ব্যক্তিগত ব্যবহার্য বস্তু অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে সংরক্ষণ করা হয়েছে।

বোস পরিবারের ব্যবহৃত আসবাবপত্র । ফটো : বিশ্বয়নী দত্ত

এমিলি শেঙ্কেলকে লেখা সুভাষের চিঠি 

গিদ্দাপাহাড়ের এই বাড়ির একটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় দিক হল এমিলি শেঙ্কেলের সঙ্গে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর যোগাযোগ। ১৯৩৬ সালে গিদ্দাপাহাড়ে থাকাকালীন সুভাষচন্দ্র বসু যে ২৬টি চিঠি লিখেছিলেন, তার মধ্যে ১১টি ছিল এমিলি শেঙ্কেলকে উদ্দেশ্য করে। একই সময়ে নেতাজি এমিলির কাছ থেকেও ১০টি চিঠি পেয়েছিলেন। সুভাষচন্দ্র বসু ও এমিলি শেঙ্কলের এই পত্রালাপ তাঁদের গভীর ব্যক্তিগত সম্পর্কের এক গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য বহন করে।Raise Your Concern About this Content

এমিলি শেঙ্কেলকে লেখা সুভাষ চন্দ্র বোসের চিঠি । ফটো : বিশ্বয়নী দত্ত

কার্শিয়ং-এর বোস হাউসে কীভাবে যাবেন?

কার্শিয়ং-এর রেলওয়ে স্টেশনের খুব কাছেই অবস্থিত এই ঐতিহাসিক বাড়িতে খুব সহজেই পৌঁছানো যায়। আপনি যদি কার্শিয়ং-এ যান, তাহলে একটি গাড়ি ভাড়া করে সরাসরি এই জাদুঘরটি ঘুরে দেখতে পারেন।

এছাড়া, কার্শিয়ং-এর বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখতে গোটা দিনের জন্য সাইটসিয়িং ট্যুর বুক করলেও এই জাদুঘরটি সাধারণত সেই ভ্রমণসূচির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আকর্ষণ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত থাকে। অধিকাংশ স্থানীয় ট্যুর অপারেটর তাঁদের দিনব্যাপী ভ্রমণ পরিকল্পনায় এই ঐতিহাসিক স্থানটি রাখেন।

নিকটতম রেলস্টেশন: নিউ জলপাইগুড়ি

নিউ জলপাইগুড়ি থেকে শেয়ার গাড়ি, বাস বা ভাড়া গাড়ি করে পৌঁছে যাবেন কার্শিয়ং।  সময় লাগবে ২ থেকে ২.৫ ঘণ্টা। শেয়ার গাড়িতে খরচ পড়বে জনপ্রতি ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা। নিউ জলপাইগুড়ি থেকে  কার্শিয়ং যাওয়ার জন্য গাড়ি ভাড়া ৩৫০০-৪০০০টাকা।  সরকারি বাসের সুবিধাও রয়েছে। তবে সেক্ষেত্রে আপনাকে অটো বা গাড়ি করে নিউ জলপাইগুড়ি থেকে শিলিগুড়ি বাসস্ট্যান্ড যেতে হবে।

নিকটতম বিমানবন্দর: বাগডোগরা বিমানবন্দর 

বাগডোগরা থেকে গাড়ি করে কার্শিয়ং যাওয়া যায়। খরচ পড়বে ৪০০০ থেকে ৪৫০০ টাকা।

কোথায় থাকবেন?

থাকার জন্য কার্শিয়ং-এর বোস হাউসের খুব কাছেই রয়েছে অতিথি গৃহ হোমস্টেকে বেছে নিতে পারেন। রুমভাড়া ১৫০০ থেকে  ২০০০ টাকা। তাছাড়াও কার্শিয়ং স্টেশনের কাছাকাছি বেশ কিছু হোটেল রয়েছে। রুমভাড়া ৮০০-২০০০, সেক্ষেত্রে সেখান থেকে নেতাজি মিউজিয়াম যেতে গেলে আপনাকে গাড়ি ভাড়া করতে হবে। ভ্রমণের আগে সর্বশেষ তথ্য যাচাই করে নেওয়া ভালো।

কন্ট্যাক্ট নম্বর- অতিথি গৃহ হোমস্টে (9851072749) 

উপসংহার 

এই বাড়ি ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের গৌরবময় ঐতিহ্যের এক উজ্জ্বল প্রতীক। এই জাদুঘর শুধু নেতাজির স্মৃতিকে জীবন্ত করে রাখেনি, বরং তাঁর অদম্য সাহস, দেশপ্রেম এবং আত্মত্যাগের চেতনাকেও আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার এক গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠেছে।

তথ্যসূত্র

১. বাংলা: নেতাজির কার্সিয়াংয়ের বাড়ি—যেখানে তিনি বেশ কিছু ঐতিহাসিক চিঠি লিখেছিলেন—তা জাদুঘরে রূপান্তরিত হলো।
২. কার্সিয়ংয়ে পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে নেতাজির পৈতৃক বাড়ি।
৩. নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু মিউজিয়াম, কার্সিয়ং
৪. হরিপুরা কংগ্রেস অধিবেশন (১৯৩৮) – আধুনিক ভারতের ইতিহাসের নোট

সারনাথ, গৌতম বুদ্ধ ও গুরু পূর্ণিমা

হিন্দু শাস্ত্র মতে প্রত্যের পূর্ণিমার বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। গুরু পূর্ণিমাও তার ব্যতিক্রম নয়। লোকমুখে প্রচলিত, গুরু পূর্ণিমার পুণ্য তিথিতে মুনি পরাশর এবং মাতা সত্যবতীর ঘরে জন্মগ্রহণ করেন মহর্ষি বেদব্যাস। পরবর্তীকালে যিনি রচনা করেন মহাভারত। ব্যাসদেবকে ১৮ টি মহাপুরাণ রচনার কৃতিত্বও দেওয়া হয়। পুরাণগুলি ভারতীয় সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ, যেখানে ধর্ম, দর্শন, সৃষ্টিতত্ত্ব, ইতিহাস, বংশপরম্পরা, দেব-দেবীর উপাখ্যান, নীতিশিক্ষা, তীর্থ, আচার-অনুষ্ঠান এবং মানবজীবনের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে গভীর আলোচনা রয়েছে। 

গুরু পূর্ণিমা কী?  

হিন্দু শাস্ত্রে মহর্ষি বেদব্যাস জন্মতিথি উপলক্ষে গুরু পূর্ণিমা পালন করা হয়। তাই এই পূর্ণিমাকে ব্যস পূর্ণিমাও বলা হয়। আষাঢ় মাসে এই তিথি পড়ে।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

গুরু পূর্ণিমার তাৎপর্য

গুরু পূর্ণিমার দিন শিষ্যরা তাঁদের গুরু বা শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন এবং জ্ঞান, শিক্ষা ও আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শনের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। ভারতীয় সংস্কৃতিতে এই উৎসব গুরু-শিষ্য পরম্পরার চিরন্তন মূল্যবোধ ও জ্ঞানের প্রতি শ্রদ্ধার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।

বৌদ্ধ ধর্মে গুরু পূর্ণিমা

বৌদ্ধধর্মে গুরু পূর্ণিমার বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে।  প্রচলিত রয়েছে, বোধগয়ায় বোধিলাভের প্রায় পাঁচ সপ্তাহ পরে গৌতম বুদ্ধ সারনাথে চলে আসেন। বোধিলাভের পূর্বে তিনি কঠোর তপস্যা পরিত্যাগ করেছিলেন। সেই সময় তাঁর পাঁচজন প্রাক্তন সঙ্গী যাঁদের পঞ্চবর্গীয় ভিক্ষু বলা হয়, গৌতম বুদ্ধকে ত্যাগ করে সারনাথের ঋষিপতনে চলে যান।

বোধিলাভের পর গৌতম বুদ্ধ উরুবিল্বা বর্তমান বোধগয়া থেকে সারনাথে শিষ্যদের কাছে যান। তাঁর আধ্যাত্মিক জ্ঞানের মাধ্যমে তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, এই পাঁচজন শিষ্য খুব দ্রুত ধর্মের প্রকৃত অর্থ উপলব্ধি করতে সক্ষম হবেন। সারনাথে যাওয়ার পথে তাঁকে গঙ্গা নদী পার হতে হয়। রাজা বিম্বিসার এই সংবাদ পেয়ে সন্ন্যাসী ও তপস্বীদের জন্য গঙ্গা পারাপারের কর বা শুল্ক তুলে দেন।

সারনাথে পৌঁছে গৌতম বুদ্ধ তাঁর পাঁচ প্রাক্তন সঙ্গীকে ধর্মচক্র প্রবর্তন সূত্রের উপদেশ দেন। ‘ধর্মচক্র প্রবর্তন সূত্র’ (ধম্মচক্কপবত্তন সুত্ত) নামে পরিচিত এই উপদেশের মাধ্যমে তিনি তাঁর প্রথম শিষ্যদের কাছে ধর্মের মূল শিক্ষা তুলে ধরেন।  এই ধর্মাদেশ শুনে তাঁরা ধর্ম উপলব্ধি করেন এবং জ্ঞানপ্রাপ্ত হন। আষাঢ় মাসের পূর্ণিমা তিথিতেই এই ঘটনার মাধ্যমে বৌদ্ধ ভিক্ষু সংঘ-এর আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠা হয়।এই ঘটনাকেই বৌদ্ধধর্মের আনুষ্ঠানিক সূচনা এবং বুদ্ধের বাণী বিশ্বজুড়ে বিস্তারের ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

এরপর গৌতম বুদ্ধ সারনাথের মূলগন্ধকুটি-তে তাঁর প্রথম বর্ষাবাস (বৃষ্টি ঋতুর সাধনাকাল) অতিবাহিত করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই ভিক্ষু সংঘের সদস্যসংখ্যা ৬০-এ পৌঁছে যায়। তখন বুদ্ধ তাঁদের নির্দেশ দেন, যেন তাঁরা বিভিন্ন দিকে একাকী ভ্রমণ করে ধর্ম প্রচার করেন এবং মানবকল্যাণে বুদ্ধের বাণী মানুষের কাছে পৌঁছে দেন।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

সারনাথ ও বৌদ্ধ ধর্মের গুরুত্ব

বৌদ্ধ ধর্মমতে সারনাথ হল বৌদ্ধ মহা তীর্থস্থানের অন্যতম। প্রথমটি লুম্বিনী, গৌতম বুদ্ধের জন্মস্থান। দ্বিতীয়টি হল বুদ্ধগয়া, প্রচলিত রয়েছে এখানে বুদ্ধের সম্যক জ্ঞানলাভ, তথা বুদ্ধত্ব প্রাপ্তি। তৃতীয় সারনাথ, বৌদ্ধধর্ম এবং বৌদ্ধসংঘের জন্মস্থান। চতুর্থ কুশিনগর, যেখানে ভগবান বুদ্ধ মহানির্বাণ লাভ করেন। সারনাথের মিউজিয়ামে রক্ষিত একটি পাথরে পর পর খোদিত এই চারটি তীর্থস্থানের উল্লেখ পাওয়া যায়। 

সারনাথকে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার জন্যও মনোনীত করা হয়েছে।

জানেন কি গৌতম বুদ্ধ প্রথম পাঁচ শিষ্যের নাম?

গৌতম বুদ্ধের প্রথম পাঁচ শিষ্য হলেন কৌণ্ডিন্য, অশ্বজি, ভদ্দিয়া, বাপ্পা এবং মহানাম। 

ইতিহাস

খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ৬০০ থেকে ২০০ অব্দের মধ্যে, অর্থাৎ ভারতের দ্বিতীয় নগরায়ণের যুগে, সারনাথে বৌদ্ধধর্ম দ্রুত বিকশিত হয়। মহাজনপদ যুগ, নন্দ সাম্রাজ্য এবং পরবর্তীকালে মৌর্য সাম্রাজ্যের সময় বারাণসীর রাজা ও ধনী বণিকদের পৃষ্ঠপোষকতায় সারনাথ বৌদ্ধ শিক্ষা ও ধর্মচর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে। মৌর্যযুগে অশোকের আমল থেকে সারনাথের বৈভব শুরু হয়। 

খ্রিস্টীয় তৃতীয় শতাব্দীতে সারনাথ সাম্মাতীয় নামে পরিচিত প্রাচীন বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে এটি বৌদ্ধ শিল্প, স্থাপত্য এবং ভাস্কর্যেরও একটি উল্লেখযোগ্য কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।

সারনাথে হেরুক ও তারা দেবতার মূর্তি আবিষ্কৃত হওয়ায় জানা যায় যে, পরবর্তী সময়ে এখানে বজ্রযান বৌদ্ধধর্মেরও চর্চা প্রচলিত ছিল। পাশাপাশি এখানে শিব ও ব্রহ্মা-র মূর্তিও পাওয়া গেছে, যা হিন্দুধর্মের উপস্থিতির প্রমাণ বহন করে। এছাড়া ধামেক স্তূপ-এর খুব কাছেই একটি জৈন মন্দির অবস্থিত ছিল, যা এই অঞ্চলে বিভিন্ন ধর্মের সহাবস্থানের নিদর্শন।

গুপ্ত সাম্রাজ্যের (চতুর্থ থেকে ষষ্ঠ শতাব্দী) সময়ে বৌদ্ধধর্ম রেশম পথ ধরে ভারতের সীমানা অতিক্রম করে এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। এই সময়ে চীনের জিন রাজবংশের বৌদ্ধ ভিক্ষু ফা-হিয়েন  ৪০০ থেকে ৪১১ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে উত্তর ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চল ভ্রমণ করেন। সারনাথ সম্পর্কে তাঁর বিবরণে তিনি উল্লেখ করেছেন যে, সেখানে তিনি চারটি বৃহৎ স্তম্ভসদৃশ স্থাপনা এবং দুটি বিহার দেখেছিলেন, যেখানে বহু বৌদ্ধ ভিক্ষু বসবাস ও ধর্মচর্চা করতেন।

দর্শনীয় স্থান

ধামেক স্তূপ 

ধামেক স্তূপকে সেই স্থান হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যেখানে গৌতম বুদ্ধ বোধিলাভের পর তাঁর প্রথম ধর্মদেশনা প্রদান করেছিলেন। গবেষকদের মতে, ‘ধামেক’ নামটি সম্ভবত ‘ধর্মচক্র’ শব্দ থেকে এসেছে, যার অর্থ ‘ধর্মচক্রের প্রবর্তন’ বা ‘ধর্মের চাকা ঘোরানো’।

বর্তমানে ধামেক স্তূপের উচ্চতা প্রায় ৩৯ মিটার (১২৮ ফুট) এবং ব্যাস প্রায় ২৮ মিটার (৯২ ফুট)। এটি সারনাথের অন্যতম দর্শনীয় স্থান।

ধর্মরাজিকা স্তূপ 

ধর্মরাজিকা স্তূপ সারনাথে অবস্থিত অশোক-পূর্ব যুগের অতি অল্প কয়েকটি স্তূপের অন্যতম। বর্তমানে এর কেবল ভিত্তিভাগই অবশিষ্ট রয়েছে। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে বিংশ শতাব্দীর প্রথমভাগ পর্যন্ত এই স্তূপ বহুবার ধ্বংস, লুণ্ঠন ও প্রত্নতাত্ত্বিক খননের সম্মুখীন হয়েছে।

অশোক স্তম্ভ

সম্রাট অশোক সারনাথে যে বিখ্যাত স্তম্ভ স্থাপন করেছিলেন, দ্বাদশ শতাব্দীর আক্রমণের সময় সেটি ভেঙে যায়। তবে স্তম্ভটির বহু অংশ এখনও মূল স্থানে সংরক্ষিত রয়েছে।

এই স্তম্ভের শীর্ষে ছিল বিখ্যাত অশোকের সিংহস্তম্ভ এবং তার উপর স্থাপিত ছিল ৩২টি আরাযুক্ত বেলেপাথরের ধর্মচক্র। বর্তমানে সিংহস্তম্ভ ও ধর্মচক্র সারনাথ প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে।

মূলগন্ধকুটি বিহার 

এই বিহারের ধ্বংসাবশেষ সেই স্থানকে চিহ্নিত করে, যেখানে গৌতম বুদ্ধ তাঁর প্রথম বর্ষাবাস (বৃষ্টি ঋতুর সাধনাকাল) কাটিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে এখানেই সারনাথের প্রধান মন্দির গড়ে ওঠে এবং এর সম্মুখেই অশোক স্তম্ভ স্থাপিত হয়েছিল।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

চৌখণ্ডী স্তূপ

ডিয়ার পার্ক বা মৃগদায় থেকে প্রায় ৮০০ মিটার দূরে অবস্থিত চৌখণ্ডী স্তূপ সেই স্থানকে স্মরণ করে, যেখানে বোধিলাভের পর গৌতম বুদ্ধ তাঁর প্রথম পাঁচ শিষ্যের সঙ্গে পুনরায় সাক্ষাৎ করেছিলেন। 

স্তূপটির শীর্ষে একটি অষ্টভুজাকার ইটের মিনার রয়েছে, যা মুঘল সম্রাট আকবর ১৫৮৮ সালে তাঁর পিতা সম্রাট হুমায়ূনের স্মৃতিতে নির্মাণ করেন।

সারনাথ প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘর 

সারনাথ প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে অশোকের বিখ্যাত সিংহস্তম্ভ, যা অশোক স্তম্ভের প্রায় ১৪ মিটার (৪৫ ফুট) উচ্চতা থেকে মাটিতে পড়েও অক্ষত অবস্থায় টিকে ছিল। পরবর্তীকালে এটিই ভারতের জাতীয় প্রতীক হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে।

এছাড়াও জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে পঞ্চম শতাব্দীর বেলেপাথরে নির্মিত ‘বুদ্ধের প্রথম ধর্মদেশনা’-র অসাধারণ ভাস্কর্য এবং কুমারদেবীর শিলালিপি, যা সারনাথের ইতিহাস ও বৌদ্ধ ঐতিহ্যের মূল্যবান নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত।Raise Your Concern About this Content

ধর্মচক্র জিন বিহার

এটি একটি বিশাল বৌদ্ধ বিহার ও ভিক্ষুদের আবাসস্থল। ধারণা করা হয়, দ্বাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে গোবিন্দচন্দ্রের পত্নী কুমারদেবীর উদ্যোগে এটি নির্মিত অথবা পুনর্নির্মিত হয়েছিল।

উপসংহার

বৌদ্ধধর্মের পাশাপাশি সারনাথে হিন্দু ও জৈন ধর্মের ঐতিহ্যেরও সুস্পষ্ট উপস্থিতি ভারতের বহুধর্মীয় ও বহুসাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের পরিচয় বহন করে। প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অসংখ্য ভক্ত, গবেষক ও পর্যটক এই পবিত্র তীর্থক্ষেত্রে আসেন শান্তি, জ্ঞান ও ইতিহাসের স্পর্শ অনুভব করতে। 

তথ্যসূত্র

১. গুরু পূর্ণিমা
২. সারনাথ
৩. গুরু পূর্ণিমা ২০২৬: তারিখ, সময়, ইতিহাস ও তাৎপর্য
৪. গুরু পূর্ণিমা ২০২৬-এর তারিখ ও সময়: এই শুভ উপলক্ষটির তিথি, ইতিহাস ও তাৎপর্য জেনে নিন।
৫. মহাতীর্থ সারনাথ – Maha Tirtha Saranath