FIFA WORLD CUP 2026
ফুটবল উন্মাদনা আকাশ-ছোঁয়া| কিন্তু কেন? একটা বল নিয়ে কাড়াকাড়ি করেযায় দুই দলের এগারো জন করে বাইশ জন ফুটবলার, বিপক্ষ দলের গোলপোস্টে গোল করার জন্য আর তাই দেখতে স্টেডিয়ামে উপচে পড়া ভিড়, পাড়াতে বড়ো পর্দা টাঙিয়ে হৈ-হুল্লোড় করতে করতে খেলা দেখা, অফিস-এ সিক-লিভ নিয়ে বা সেদিনের মতন পড়তে যাওয়া টা স্কিপ করে বা রান্না বন্ধ করে টিভি-র সামনে সবাই বসে খেলা দেখা, অথবা বাস, ট্রেন বা মেট্রো তে ফোন এ লাইভ টেলিকাস্ট দেখতে দেখতে গন্তব্যে পৌঁছানো – সবই ফুটবল প্রেম, আর সবাই ফুটবল প্রেমিক বা প্রেমিকা|
ফুটবলকে ঘিরে এত উন্মাদনা কেন?
ফুটবলের ফলাফল অপ্রত্যাশিত. সেই টান-টান উত্তেজনা, তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ফুটবল ক্লাব গুলির সাথে দর্শকদের আবেগময় সম্পর্ক, সব মিলিয়ে ফুটবল দর্শকদের কাছে শুধু খেলা নয় বরং তার চেয়ে অনেক বড় কিছু| ফুটবলের তীব্র জনপ্রিয়তার অন্য আর এক কারণ হলো খোদ খেলোয়াড়রাই| তাঁদের অনুশাসন, খেলার কৌশল, পারদর্শিতা, আবার কখনো তাঁদের জীবন এর ইতিহাস মানুষকে এতটাই অনুপ্রাণিত করে যে ফুটবল খেলা ও তাঁরা সমর্থক হয়ে ওঠেন|
পৃথিবী জুড়ে ফুটবলের জনপ্রিয়তা আজ আকাশ-ছোঁয়া| ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, মেক্সিকো, পর্তুগাল, এর পাশে মরক্কো সুন্দর ভাবে নিজের জায়গা তৈরি করে নিয়েছে| বিশ্বের ফুটবল দরবারে মরক্কো যেই স্থানে আজ বিরাজমান, তার নেপথ্যে অনেকের মধ্যে এক বিশেষ নাম হলো আশরাফ হাকিমী|

কে এই আশরাফ হাকিমী? তাঁর শিকড়ের গল্প
মাদ্রিদ এ জন্ম, এক অতি সাধারণ পরিবারের ছেলে এই ফুটবল তারকা। তাঁর বাবা ও মা নানান রকমের প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে তাঁকে মানুষ করেছেন। পেশায়, তাঁর বাবা ছিলেন একজন ফেরিওয়ালা আর তাঁর মা মরক্কোর খেমিসসেত এলাকার মানুষ, গৃহপরিচারিকার কাজ করে সংসার চালাতেন। তাঁর সাফল্যের জন্য তাঁর বাবা ও মায়ের আত্মত্যাগের ভূমিকা অনবদ্য, এই কথা হাকিমী নিজেও বহুবার গণমাধ্যমে বলেছেন।
ছোটোবেলা থেকেই ফুটবলের প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ ও আবেগ আর সেটাই তাঁকে ফুটবল খেলোয়াড় হতে অনুপ্রাণিত করে। মাত্র আট বছর বয়সে রিয়াল মাদ্রিদের তরুণ প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে যোগ দিয়েছিলেন আর সেখান থেকেই শুরু হয় ফুটবলের আশরাফ হাকিমী হয়ে ওঠার পথ চলা।
রোজের প্রচেষ্টা, অদম্য আগ্রহ আর পাশে বাবা-মায়ের অবিরাম সমর্থন হাকিমী-কে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে। হাকিমীকে এগিয়ে দেওয়ার জন্য, তাঁর বাবা-মা শুধু নিজেদের স্বাচ্ছন্দ্য নয় বরং হাকিমী-র ভাইবোনের চাহিদাকেও মাঝে-মাঝে এড়িয়ে গিয়েছেন। সমস্ত পরিবার এর আত্মত্যাগ হাকিমী-র এগিয়ে যাওয়ার রাস্তা তৈরি করেছে।

এক ফুটবল তারকার উত্থান
রিয়াল মাদ্রিদের তরুণ প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে যোগ দেয়ার পর কঠোর প্রশিক্ষণ ও প্রচেষ্টাতে একভাবে এগিয়ে গেলেন এবং ২০১৭-তে কোচ জিনেদিন জিদান-এর অধীনে রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে প্রথম ম্যাচটি খেলেন। ক্লাবে সীমিত সুযোগ থাকার সত্ত্বেও, উনি প্রতি খেলায় নিজের গতি, বহুমুখিতা, আক্রমণাত্মক ক্ষমতার প্রদর্শন করে তাঁর দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছিলেন।
২০১৮ থেকে ২০২০, বরুসিয়া ডর্টমুন্ড-এর হয়ে খেলার সময় তাঁর ফুটবল এর প্রতিভা পরিস্ফুট হয়। আশরাফ হাকিমী হয়ে ওঠেন বরুসিয়া ডর্টমুন্ড-এর সবথেকে বেশি আলোচিত তরুণ ডিফেন্ডার, আর তারপরে আর ঘুরে তাকানোর অবকাশ পাননি তিনি।
২০২০-তে তিনি ইন্টার মিলানে যোগ দেন আর ক্লাব কে ‘২০২০–২১ সেরি আ’ ফুটবল লীগ জেতান। এইটি ছিল ইতালির শীর্ষ স্তরের ফুটবল লিগ ‘সেরি আ’-র ৮৯তম আসর আর ক্লাবের জন্য সেটা ছিল ১১ বছরের মধ্যে প্রথম লিগ চ্যাম্পিয়ানশিপ।
এক দশক এর পরে ক্লাবের এই প্রাপ্তি আর হাকিমী-র পারদর্শিতা শুধু তাঁকে তাঁর ক্লাব নয় বরং গোটা পৃথিবীতে জনপ্রিয় করে তুলেছিল। ২০২১-এ হাকিমী প্যারিস সেন্ট-জার্মাইন-এ যোগ দেন ও সেই ক্লাবের হয়ে খেলার সময় তিনি বিশ্বের অন্যতম সেরা রাইট-ব্যাক হিসেবে বিবেচিত হন। এই দুই ক্লাব ছাড়াও তিনি মরক্কো-র জাতীয় ফুটবল দল এর জন্যও খেলেন, ২০২২ ফিফা বিশ্বকাপে মরক্কোর ঐতিহাসিক সেমিফাইনালে ওঠার পথে আশরাফ হাকিমির পারফরম্যান্স বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়।
২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে মরক্কো দলের অন্যতম ভরসাযোগ্য ফুটবলার হিসেবে খেলছেন আশরাফ হাকিমি। মনের জোর আর দৃঢ় প্রচেষ্টার কাছে সমস্ত প্রতিবন্ধকতা হার মানে; আশরাফ হাকিমী তার জীবন্ত উদাহরণ।
বিশ্বের নজরে মা ও ছেলের অনন্য বন্ধন
হাকিমী-র বহু সাক্ষাৎকার ও আলাপ-আলোচনা তে ওনার মা – সাদিয়া-র কথা উঠে এসেছে বারংবার। অভাব-অনটনের সংসারে ওনার মায়ের আত্মত্যাগ, ও বলিদান কে হাকিমী তাঁর সাফল্যের কারণও বলেন।
কেনই বা বলবেননা?
আশরাফ হাকিমী-র বাবা ছিলেন একজন সামান্য ফেরিওয়ালা আর সংসারে ওনার বাবা-মা আর ভাই-বোনকে নিয়ে পাঁচজন। তাই সংসার চালাতে ওনার মা লোকের বাড়ি-ঘর পরিষ্কার করে অর্থ উপার্জন করতে। সংসারে অভাব থাকার সত্ত্বেও হাকিমী-কে তাঁর ফুটবলের প্রতি টানকে উপেক্ষা করতে বলেননি, বরং উৎসাহ আর সমর্থন করে গেছেন। প্রশিক্ষণ, সফর, সাফল্য-পরাজয় সবকিছুতেই উনি ওনার মা এর সমর্থন পেয়ে আরও দৃঢ় ভাবে নিজের খেলাকে উন্নত করেছেন।
২০২২-এর ফিফা বিশ্বকাপের এর প্রতি জয় এর পরে ওনার মায়ের কাছে এসে তাঁকে আলিঙ্গন করে কপালে চুমু খাওয়া, গোটা বিশ্বের নজর করেছিল ও মন ছুঁয়েছিল। সফলতার আগের অন্ধকারে ওনার মা-এর হাত ধরে উনি এগিয়েছিলেন আর তাই সাফল্যের আলোয় তাঁর সাথেই জয়-এর আনন্দে আনন্দিত হওয়ার স্বাদ নেয়া – দর্শক ও গোটা বিশ্বের কাছে মা ও ছেলের বন্ধনের এক অতুলনীয় দৃশ্য। Raise Your Concern About this Content
‘মোর সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে’

জরপ্রিয়তার শীর্ষে থাকলে হাকিমী-কে অপ্রিয় পরিস্থিতিতে পড়তে হবে বা আরও গভীর সংকট দেখা দিতে পারে, তাই তাঁর মা সব রকম বিপদ এর জন্যও প্রস্তুত ছিলেন। ২০২৩ সালে স্প্যানিশ অভিনেত্রী হিবা অবৌক-এর সাথে তাঁর বিচ্ছেদের সময় সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয় যে হাকিমি তাঁর সম্পদের অধিকাংশ মায়ের নামে রেখেছিলেন। তবে এই দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি।
লালন-পালন, পরিচর্যা ও সমস্ত বিপদ থেকে সুরক্ষিত রাখা মায়ের কর্তব্য, আশরাফ হাকিমী-র মা সাদিয়া আজীবন তা করে এসেছেন। হাকিমী বিশ্বের কাছে ফুটবল তারকা হলেও তাঁর মায়ের কাছে তাঁর আদরের বালক যে আনন্দ-উল্লাসে, চিন্তা বা ভয়, সব-সময়ই মা এর ছায়ায় নিস্তার খুঁজে নেয়। এক বিশ্ব-খ্যাত ফুটবল তারকা তাঁর মায়ের কাছে তাঁর ছেলে।
আশরাফ হাকিমি আজ বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার। কিন্তু তাঁর সাফল্যের গল্প কেবল একজন তারকার উত্থানের ইতিহাস নয়; এটি একজন মায়ের অদম্য ত্যাগ, বিশ্বাস ও নিঃস্বার্থ ভালোবাসারও কাহিনি। স্টেডিয়ামের উচ্ছ্বাসের আড়ালে তাই লুকিয়ে থাকে এক মায়ের নীরব সংগ্রাম—যার হাত ধরেই গড়ে ওঠে একজন বিশ্বতারকা।
তথ্যসূত্র:
১. ফিফা বিশ্বকাপে মরক্কো
২. ফিফা বিশ্বকাপে মরক্কোর সাফল্য আশরাফ হাকিমির উত্তরাধিকারকে সংজ্ঞায়িত করতে পারে।
৩. আল-মামলাকা (ইনস্টাগ্রাম)
৪. হাইতির বিপক্ষে পিছিয়ে পড়েও জয় তুলে নিয়ে গ্রুপ রানার্স-আপ হিসেবে শেষ ৩২-এ জায়গা করে নিল মরক্কো।
৫. আক্রমণভাগে পরিবর্তনের ফলে মরক্কো চার বছর আগের তুলনায় আরও শক্তিশালী দলে পরিণত হয়েছে।
৬. আশরাফ হাকিমি: বুন্দেসলিগায় গড়ে ওঠা মরক্কোর বিদ্যুৎ-গতির ফুল-ব্যাক।
৭. ফুটবলার আশরাফ হাকিমির সম্পদ তাঁর মায়ের মালিকানাধীন—এমন খবর মিথ্যা হতে পারে।
৮.



