মহিষাসুর-নির্ণাশী
ভক্তানাং সুখদে নমঃ
রূপং দেহি, জয়ং দেহি,
যশো দেহি, দ্বিষো জহি……………..
আর মাত্র কিছুদিনের অপেক্ষা, তারপরই আশ্বীনের শারদপ্রাতে ধরাধামে অবতীর্ণ হবেন মা দুর্গা, কাশফুলে ভরে উঠবে বিঘের পর বিঘে মাঠ। অশুভ শক্তির বিনাশকারীর আরাধনা করবে আট থেকে আশি।মণ্ডপে মণ্ডপে শুরু হবে দেবী দুর্গার আবাহন। ঢাকের আওয়াজে সব কষ্ট-দুঃখকে বিসর্জন দিয়ে আনন্দে মেতে উঠবে গোটা বাংলা।
জানেন কি, সারা বাংলার এই আনন্দ ঝলমলে আলোর মাঝেও উত্তরবঙ্গের কয়েকটি গ্রামে নেমে আসে বিষন্নতার আঁধার, কোনও প্রিয় মানুষকে হারানোর যন্ত্রণা। ঢাকের আওয়াজে যখন গোটা বাংলা মুখরিত, তখন উত্তরবঙ্গের এক কোণে নেমে আসে স্থবিরতা। যাদের কাছে এই দিনগুলো আনন্দের নয় বরং শোকের, হেরে যাওয়ার, অপমানের।
‘আশ্বিনের মাঝামাঝি উঠিল বাজনা বাজি’- এই বাজনার আওয়াজ, সীমাহীন আনন্দ আদৌ কি অসুর সম্প্রদায়ের মানুষের দুঃখ আড়াল করতে পারে? যুগ যুগ ধরে কোন ইতিহাস বয়ে বেরাচ্ছে এনারা। কেন দুর্গাপুজোর আনন্দের মাঝে বিষাদের সুর বেছে ওঠে এই সম্প্রদায়ের মানুষের মনে।
আজ অসুর সম্প্রদায়ের মানুষের গল্প বলব। উত্তরবঙ্গের জলপাইগুড়ি -আলিপুরদুয়ার ও ডুয়ার্সের কিছু চা-বাগানে আজও বাস করেন এই আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মানুষ। তাঁদের বিশ্বাস, তাঁরা মহিষাসুরের বংশধর। হিন্দু পুরাণে যে মহিষাসুর অসুররাজ, দেবী দুর্গা যাকে বধ করেছেন, সেই মহিষাসুরই তাঁদের কাছে একজন বীর যোদ্ধা। পুরাণ অনুসার, এক প্রবল যুদ্ধের পর দশভুজা দেবী দুর্গার হাতে যিনি পরাজিত হয়েছিলেন তিনি এই সম্প্রদায়ের আরাধ্য পূর্বপুরুষ।
দুর্গাপুজোর সময় তাঁদের মৃত রাজা মহিষাসুরের মৃত্যুকে স্মরণ করেন তাঁরা। অসুর সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে প্রচলিত বিশ্বাস রয়েছে, আর্য দেবী দূর্গা ছলনা করে অসুররাজ মহিষাসুরের বধ করেছিলেন। সেই পরাজয়ের যন্ত্রণা আজও ভুলতে পারেনি তাঁরা।

শরতের সকালে যখন ‘মহিষাসুরমর্দিনী’-র স্তোত্র ছড়িয়ে পড়ে, অশুভের প্রতীক মহিষাসুরের বিনাশ উদ্যাপন করতে বাঙালিদের মধ্যে পালিত হয় দুর্গোৎসব । তখন অসুর সম্প্রদায়ের এই মানুষগুলোর ঘরে ঘরে ফিরে আসে শোকের স্মৃতি। আর এই বৈপরীত্যই অসুর সমাজের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের মূল ভিত্তি।
কারা এই অসুর সম্প্রদায়?
আমাদের দেশে ৭০০-রও বেশি আদিবাসী রয়েছে । তাদের মধ্যে সাঁওতাল, কোল, মুণ্ডা, ওরাওঁ, ভীল অন্তর্ভুক্ত। এদের মধ্যে একটি সম্প্রদায় হল অসুর। ভারতের অন্যতম প্রাচীন উপজাতি।
ভারতবর্ষের ঝাড়খণ্ড, পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, ছত্তিশগড়ের কিছু এলাকায় বসবাস করেন এই অসুর সম্প্রদায়ের মানুষ। এইসব রাজ্যের তপশিলি উপজাতিদের তালিকার প্রথমদিকে অসুর উপজাতিদের নাম রয়েছে।
মূলত ঝাড়খণ্ডের গুমলা, পালামু, লোহারদাগা এলাকায় বসবাস করে অসুর সম্প্রদায়ের মানুষ।
মনে করা হয়, ঝাড়খণ্ডের অসুর সম্প্রদায়ের মানুষ মহাভারতের যুগের অসুরদের বংশধর।
বর্তমানে উত্তরবঙ্গের অধিকাংশ অসুর পরিবার আলিপুরদুয়ারের মাঝেরডাবরি চা-বাগানসহ বিভিন্ন চা-বাগানের শ্রমিক কোয়ার্টারে বসবাস করে। লোহা গলানোর কারিগর থেকে তাঁরা হয়ে উঠেছেন চা-বাগানের শ্রমিক। এই সম্প্রদায়ের কেউ কেউ চাষাবাদের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। অনেকে আবার কাঠ, গাছের পাতা সংগ্রহ করেন।
অসুর সমাজের ইতিহাস-
একসময় এনারা ছিলেন ভারতের অন্যতম দক্ষ লোহা গলানোর কারিগর। পাহাড়ি পাথর থেকে লোহা গলিয়ে অস্ত্র, কৃষি সরঞ্জাম এবং দৈনন্দিন ব্যবহার্য জিনিস তৈরি করতেন তাঁরা। কিন্তু ব্রিটিশ শাসনকালে বন আইন কঠোর হওয়ার পর তাদের কাঠকয়লা তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি কাঠ সংগ্রহের উপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যায় তাঁদের শতাব্দী প্রাচীন পেশা। এই সময়ে ব্রিটিশরা উত্তরবঙ্গের ডুয়ার্স অঞ্চলে চা-বাগান গড়ে তুলছিল। বন পরিষ্কার করা এবং চা-বাগানে কাজ করার জন্য স্বল্প মজুরির শ্রমিকের প্রয়োজন ছিল। সেই কারণে ছোটনাগপুর মালভূমি থেকে বহু অসুর জনগোষ্ঠীর পরিবারকে জলপাইগুড়ি অঞ্চলে নিয়ে আসা হয়।

ধর্মীয় বিশ্বাস
অ্যানিমিজম, প্রকৃতিপুজো, পূর্বপুরুষদের উপাসনা এগুলি মূলত অসুর সমাজের ধর্মবিশ্বাসের মূল ভিত্তি। অসুর সমাজের প্রধান দেবতা সিংবঙ্গা। তারা মূলত প্রকৃতির উপাসক।
হুদুড় দুর্গাপুজো
দুর্গাপুজোর সময় মহিষাসুরকে পুজো করা হয় যা হুদুড় দুর্গাপুজো নামে খ্যাত। হুদুড় শব্দের অর্থ ঝঞ্ঝা, বিদ্যুৎ বা বজ্রের ধ্বনি। মহিষাসুরের অসীম শক্তির কথাই হুদুড় শব্দ দ্বারা বর্ণনা করা হয়।
ঝাড়গ্রামের সোনাকুন্দরা, পুরুলিয়ার ভালাগোড়া গ্রামে এই পুজো বিশেষভাবে পরিচিত। সাঁওতাল ও খেরওয়াল জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রচলিত এই পুজো। পুরুলিয়ায় এই পুজো বহু প্রজন্ম ধরে হয়ে আসছে। আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষরা মনে করেন মহিষাসুর তাঁদের জীবনের নানা সংগ্রামের প্রতীক। মূর্তির মাধ্যমেই তারা পুজো করেন, তারা মনে এই পুজোর তাদের আত্মশক্তির প্রতীক। এই অনুষ্ঠনে তাঁরা নিজেরা মূর্তি তৈরি করেন, পুজো করেন। নিজেদের ইতিহাসকেও এক প্রজন্ম থেকে অপর প্রজন্মে পৌঁছে দিচ্ছে।
আলিপুরদুয়ারের মাঝেরডাবরি চা-বাগান, বক্সার জঙ্গলের কালকূট বস্তির অসুরগ্রামেও অসুর পুজোর প্রচলন ছিল। হিন্দু পুরাণ অনুযায়ী মা দুর্গার হাতে পরাজিত হতে হয়েছিল অসুররাজকে। অন্যদিকে আদিবাসী সমাজের মতে দুর্গা আসলে মহিষাসুরের নাম। দুর্গের রক্ষক থেকে এসেছে দুর্গা নামটি। অসুর সমাজের মতে, দুর্গের রক্ষক ছিলেন মহিষাসুর।
দুর্গাপুজোর সময় কারও বাড়িতে পালিত হয় অরন্ধন, কারও কারও বাড়িতে পুজোর মন্ত্র, ঢাক-ঢোলের আওয়াজ যাতে কানে পৌঁছায় তাই দরজা-জানলা বন্ধ করে রাখা হয়। মা দুর্গার মুখ পর্যন্ত দেখেন না। মূলত এই সময় অশৌচ পালন করেন তাঁরা।

মহিষাসুরের পুজো হয় বুন্দেলখণ্ড, গোখর পাাহাড়ের বেশ কিছু অঞ্চলে। কোথাও তাঁকে পুজো করা ভৈঁসাসুর, মাইকাসুর বা মহিষাসুর রূপে। দলীত শ্রেণির যাদব ও পাল বংশের লোকজন তাকে ভক্তি ভরে পুজো করেন।
ভাষা
অসুর সম্প্রদায়ের মাতৃভাষা অস্ট্রো-এশিয়াটিক ভাষা পরিবারের অন্তর্গত। তাদের মধ্যে এই ভাষা আসুরি ভাষা হিসেবেই পরিচিত। তারা এই ভাষা ছাড়াও নাগপুরি ও হিন্দি ভাষার ব্যবহার করে। ইউনেস্কো এই ভাষাকে ‘‘অ্যাটলাস অফ দ্য ওয়ার্ল্ডস ল্যাঙ্গুয়েজ ইন ডেঞ্জার’’ অর্থাৎ “নিশ্চিতভাবে বিপন্ন” ভাষা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। Raise Your Concern About this Content
জীবন-সংগ্রাম
পশ্চিমবঙ্গের অসুর সম্প্রদায়ের জনসংখ্যা অত্যন্ত কম। আনুমানিক কয়েকশো মানুষ। চা-বাগানে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের অধিকাংশ ছেলেমেয়ে হিন্দি বা অন্যান্য আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলছে। তাঁদের মধ্যে নিজেদের ভাষায় কথা বলার ঝোঁক কমছে। স্থানীয়ভাবে আসুরি ভাষা শেখানোর কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল কিন্তু তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।
ঝাড়খণ্ডে অসুর সম্প্রদায় বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ আদিবাসী গোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃত। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘ আন্দোলনের পর প্রায় ২০১৪ সালের দিকে জলপাইগুড়ি অঞ্চলে তারা তফশিলি উপজাতির মর্যাদা লাভ করে। তবে এখনও পশ্চিমবঙ্গে তারা বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ আদিবাসী জনগোষ্ঠীর স্বীকৃতি পায়নি। ফলে সরকারি কল্যাণমূলক প্রকল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অন্যান্য মৌলিক সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে তারা এখনও নানা সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে।

পুরাণে “অসুর” পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে দীর্ঘদিন ধরে এই সম্প্রদায়ের মানুষ সামাজিক অবহেলা, বৈষম্য এবং অপমানের শিকার হয়েছে। এই কলঙ্ক থেকে মুক্তি পেতে এবং নতুন সামাজিক পরিচয় অর্জনের লক্ষ্যে উত্তরবঙ্গের চা-বাগান এলাকায় বসবাসকারী অসুর জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ গত কয়েক দশকে খ্রিস্টধর্মে ধর্মান্তরিত হয়েছে। এর ফলে তাদের বহু প্রাচীন প্রকৃতিপূজাভিত্তিক ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ তাদের ভাষা, সংস্কৃৃতি ও সর্বোপরি পরিচয় বর্তমানে নানা সংকটের সম্মুখীন। আজ তাঁদের ভাষা বিপন্ন। তাঁদের সংস্কৃতি হারিয়ে যাওয়ার পথে। সামাজিক বৈষম্য, দারিদ্র্য এবং দীর্ঘদিনের অবহেলা তাঁদের অস্তিত্বকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
এখনও আশ্বিন মাসে মা দুর্গার আগমনের চার দিন লোকচক্ষুর আড়ালে ঘরের চার দেওয়ালের মধ্যে নিজেদের বন্ধ রেখেই দিন কাটান তাঁরা । ঢাকের আওয়াজ, শঙ্খধ্বনি, আলোর রোশনাইকে ছাপিয়ে তাঁদের মনে ফিরে আসে হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস, পূর্বপুরুষের স্মৃতি আর দীর্ঘদিনের সামাজিক বঞ্চনার যন্ত্রণা। এই কাহিনী ভারতের বহুত্ববাদী সংস্কৃতির এক অনুচ্চারিত অধ্যায়। গোটা দেশ উৎসবের মধ্যে রয়েছে ভিন্নতা ও বৈচিত্র্য। সেই এতিহ্য ও সংস্কৃতি রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব।
তথ্যসূত্র :
১. পুরুলিয়ায় দুর্গাপুজোয় অসুর সম্প্রদায়ের বিশেষ ঐতিহ্য ও অসুর বন্দনার কারণ
২. অসুর জনজাতির ইতিহাস, সংস্কৃতি জীবনযাপন ও ধর্মীয় বিশ্বাস
৩. ঝাড়খণ্ডের অসুর জনজাতি: পরিচিতি, সমাজ, পেশা ও ঐতিহ্য



