Homeভ্রমণঘুরে আসুন ‘ঈশ্বরের আপন দেশ’

ঘুরে আসুন ‘ঈশ্বরের আপন দেশ’

কেরালা যেখানে প্রকৃতি তার সমস্ত সৌন্দর্য উজাড় করে দিয়েছে। সবুজে মোড়া পাহাড়, বিস্তীর্ণ চা-বাগান, নারকেল গাছে ঘেরা সমুদ্রসৈকত, ঘন অরণ্য এবং ঝর্না সব মিলিয়ে কেরালা যেন প্রাকৃতিক স্বর্গ। এখানকার প্রতিটি দৃশ্য যেন শিল্পীর তুলিতে আঁকা এক জীবন্ত ক্যানভাস।

ভোরের কুয়াশায় মোড়া মুন্নারের পাহাড়, আলাপ্পুঝার শান্ত হাউসবোট ভ্রমণ, ওয়েনাড়ের অরণ্য, থেক্কাডির বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য কিংবা ভারকালার নীল সমুদ্র,  প্রতিটি স্থানই ভ্রমণপিপাসুদের মনে গভীর ছাপ ফেলে। প্রকৃতির পাশাপাশি কেরালার ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি, কথাকলি ও মোহিনীয়াট্টম নৃত্য, আয়ুর্বেদ চিকিৎসা এবং সুস্বাদু খাবার এই রাজ্যের সৌন্দর্যকে আরও দ্বিগুণ করে তুলেছে।

ভৌগোলিক অবস্থান

দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমে প্রান্তে মালাবার উপকূলে অবস্থিত দক্ষিণ ভারতের এই রাজ্য। ১৯৫৬ সালের ১ নভেম্বর স্টেটস রিঅর্গানাইজেশন অ্যাক্ট-এর মাধ্যমে মালয়ালম ভাষাভাষী অঞ্চলগুলিকে একত্রিত করে কেরালা রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করা হয়। এই রাজ্যের একদিকে রয়েছে পশ্চিমঘাট পর্বতমালা, অন্যদিকে লাক্ষাদ্বীপ সাগর। উত্তর-পূর্বে কর্ণাটক, পূর্বে তামিলনাড়ু এবং পশ্চিমে লাক্ষাদ্বীপ দ্বীপপুঞ্জ কেরালার ভৌগোলিক সীমানা নির্ধারণ করে। কেরালার প্রধান ভাষা মালয়ালম। ইংরেজির সঙ্গে মালয়ালমও রাজ্যের সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃত।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

ইতিহাস

প্রায় খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০ সাল থেকেই কেরালার মশলার বাণিজ্যের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত ছিল। গোলমরিচ, দারুচিনি, এলাচ ও অন্যান্য সুগন্ধি মশলার টানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ব্যবসায়ীরা এই অঞ্চলে আসতেন। 

পনেরো-শ শতকে মশলার বাণিজ্যের আকর্ষণে পর্তুগিজরা কেরালায় আসে এবং এর মধ্য দিয়েই ভারতে ইউরোপীয় উপনিবেশ স্থাপনের সূচনা ঘটে। ১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতার পর ত্রিবাঙ্কুর ও কোচিন রাজ্য ভারতীয় প্রজাতন্ত্রে অন্তর্ভুক্ত হয় এবং ১৯৪৯ সালে একত্রিত হয়ে ত্রিবাঙ্কুর-কোচিন রাজ্য গঠিত হয়।

পরবর্তীতে ১৯৫৬ সালে ভাষাভিত্তিক রাজ্য পুনর্গঠনের সময় মালাবার জেলা এবং দক্ষিণ কানারা জেলার কাসারগোড় অঞ্চল ত্রিবাঙ্কুর-কোচিনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বর্তমান কেরালা রাজ্যের জন্ম হয়। অন্যদিকে কন্যাকুমারী জেলা ও শেংকোট্টাই তালুকের কিছু অংশ তৎকালীন মাদ্রাজ রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। বর্তমানে কেরালা ১৪টি জেলা নিয়ে গঠিত।

কীভাবে যাবেন কেরালা?

ভারতের প্রায় সব বড় শহর থেকেই কেরালা খুব সহজেই পৌঁছানো যায়। কলকাতা, দিল্লি, মুম্বই, বেঙ্গালুরু, চেন্নাইসহ ভারতের বিভিন্ন শহর থেকে বিমানে যেতে পারেন কোচি বা তিরুবনন্তপুরম

কলকাতা, দিল্লি, মুম্বই, চেন্নাই, বেঙ্গালুরুসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সরাসরি বা সংযোগকারী ট্রেনে কোচি, তিরুবনন্তপুরম, আলাপ্পুঝা, কোঝিকোড়, কোত্তায়াম ও এর্নাকুলামে পৌঁছানো যায়। সেখান থেকে গাড়ি বুক করে ঘুরে নিতে পারেন কেরালার আশপাশের এলাকা। গাড়ির জন্য যোগাযোগ করতে পারেন-  ৯৬২৯২৪৪৪০১ এই নম্বরে। 

কেরালার দর্শনীয় স্থান 

মুন্নার

দক্ষিণ ভারতের পশ্চিমঘাট পর্বতমালার কোলে অবস্থিত মুন্নার কেরালার অন্যতম জনপ্রিয় পাহাড়ি পর্যটনকেন্দ্র। বিস্তীর্ণ চা ও মশলার বাগান, মনোরম হ্রদ এবং ঢেউখেলানো পাহাড়ের সৌন্দর্য একে কেরালার সবচেয়ে রোম্যান্টিক স্থানগুলির অন্যতম করে তুলেছে। এখানে দর্শনীয় স্থানগুলির মধ্যে রয়েছে আনামুড়ি শৃঙ্গ, কুথুমকাল জলপ্রপাত এবং ইকো পয়েন্ট। গ্রীষ্ম, বর্ষা, শীত কিংবা বসন্ত, বছরের একেক সময়ে মুন্নার একেকরকমভাবে ধরা দেয়। 

আলাপ্পুঝা

প্রকৃতির মধ্যে শান্তির খুঁজতে চাইলে কেরালার পশ্চিম উপকূলে অবস্থিত আলাপ্পুঝা আদর্শ গন্তব্য। শান্ত ভেম্বানাদ হ্রদ এবং বিস্তীর্ণ খাল-নদীর জালের জন্য এই শহরকে ‘প্রাচ্যের ভেনিস’ বলেও ডাকা হয়। হাউসবোটে ভ্রমণ, গ্রামের নিরিবিলি পথ ধরে হাঁটা এবং আয়ুর্বেদিক চিকিৎসার জন্য সারা বিশ্বে আলাপ্পুঝা র নাম রয়েছে। ঐতিহ্যবাহী হাউসবোটে ভেসে বেড়ানোর সময় উপভোগ করা যায়। এখানকার উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থানগুলির মধ্যে রয়েছে সেন্ট অ্যান্ড্রুজ চার্চ, চেট্টিকুলাঙ্গারা ভগবতী মন্দির এবং পুন্নামাদা হ্রদ। 

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

ওয়েনাড় 

পশ্চিমঘাটের সবুজ পাহাড়ে ঘেরা ওয়েনাড় প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে স্বর্গের মতো।  এই এলাকা কুয়াশায় মোড়া পাহাড়, চা-বাগান এবং মশলার বাগানের জন্য পরিচিত। ট্রেকিং, জঙ্গল সাফারি এবং প্রকৃতি ভ্রমণের জন্য অত্যন্ত জনপ্রিয় এলাকা ওয়েনাড়।  এখানে রয়েছে পুকোড হ্রদ, মুথাঙ্গা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য, যেখানে চিত্রা হরিণ, গাউর ও বাইসনের দেখা মেলে। এছাড়া বানাসুরা বাঁধ, লাক্কিডি, তুষারগিরি জলপ্রপাত এবং ঐতিহাসিক এডাক্কাল গুহাও ঘুরে আসা যায়।

ভারকালা 

আরব সাগরের তীরে অবস্থিত ভারকালা কেরালার অন্যতম সুন্দর সমুদ্রতীরবর্তী শহর। প্রাচীন জনার্দন স্বামী মন্দির এই শহরের অন্যতম ধর্মীয় আকর্ষণ। লালচে পাহাড়ের খাড়া ঢালের নিচে ছড়িয়ে থাকা ভারকালা সমুদ্রসৈকত সকলের কাছেই সমান জনপ্রিয়। নারকেল গাছে ঘেরা সৈকত, আয়ুর্বেদিক ম্যাসাজ এবং শান্ত পরিবেশ এই স্থানকে বিশ্রামের জন্য আদর্শ করে তুলেছে। পাপনাশম বিচ, কাদুভাইল থাঙ্গাল দরগাহ এবং আঞ্জেঙ্গো দুর্গ এখানকার অন্যতম আকর্ষণ।

থেক্কাডি

থেক্কাডি কেরালার ‘মশলার রাজধানী’ নামে পরিচিত। এখানকার প্রধান আকর্ষণ বিখ্যাত পেরিয়ার বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য, যেখানে নৌকায় সাফারির মাধ্যমে হাতি, বাঘ, সাম্বার হরিণ, গাউর, সিংহ-লেজওয়ালা বানর এবং নীলগিরি লাঙ্গুরসহ নানা বন্যপ্রাণী দেখা যায়। চা, কফি ও বিভিন্ন মশলার বাগানে ঘেরা থেক্কাডির সবুজ পাহাড় এবং মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক পরিবেশ একদিনের ভ্রমণের জন্যও আদর্শ।

ভাগামন 

ভাগামন কেরালার এক শান্ত ও মনোরম পাহাড়ি শহর। পাথুরে পাহাড়, পাইন বন এবং ঝরনায় ঘেরা এই অঞ্চল শহরের কোলাহল থেকে দূরে নিরিবিলি সময় কাটানোর জন্য আদর্শ। পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাতে হলে ভাগামন একটি জনপ্রিয় গন্তব্য, যেখানে প্রকৃতির নীরবতা মনকে প্রশান্ত করে।

আথিরাপ্পিল্লি জলপ্রপাত 

আথিরাপ্পিল্লি জলপ্রপাতকে অনেকেই ‘ভারতের নায়াগ্রা’ বলে থাকেন। ত্রিশূর শহর থেকে প্রায় ৬৩ কিলোমিটার দূরে শোলায়ার অরণ্যের মধ্যে অবস্থিত এই প্রায় ৮০ ফুট উঁচু জলপ্রপাত প্রকৃতির এক অসাধারণ সৃষ্টি। আশপাশের ভাঝাচাল জলপ্রপাত এবং থুম্বুরমুঝি বাঁধও ঘুরে দেখতে পারেন।

কুমারাকোম 

ভেম্বানাদ হ্রদের তীরে অবস্থিত কুমারাকোম কেরালার অন্যতম শান্ত ও সুন্দর গ্রাম। জলপথ, ছোট ছোট গ্রাম এবং আয়ুর্বেদিক রিসর্টে ঘেরা এই স্থানটি প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে বিশেষ জনপ্রিয়। 

কোঝিকোড় 

একসময়ের ক্যালিকট, বর্তমান কোঝিকোড়, ইতিহাস ও সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ কেরালার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শহর। ‘মশলার শহর’ নামে পরিচিত এই শহর বহু শতাব্দী ধরে আন্তর্জাতিক মশলা বাণিজ্যের কেন্দ্র ছিল। ১৪৯৮ সালে ভাস্কো দা গামা প্রথম ভারতীয় উপকূলে এখানেই অবতরণ করেন। ঐতিহাসিক স্থাপত্য, ডলফিনস পয়েন্ট, মালাবার অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী খাবার এবং ভাদাক্কান পাট্টুকাল লোকগানের জন্য কোঝিকোড় বিশেষভাবে পরিচিত। ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সুস্বাদু খাদ্যের এক অনন্য মেলবন্ধন এই শহরকে কেরালার অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত করেছে।

কেরালার রাজধানী তিরুবন্তপুরম

কেরালার রাজধানী তিরুবনন্তপুরম, যা ত্রিভানদ্রম। এটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক, সাংস্কৃতিক ও পর্যটন কেন্দ্র। কন্যাকুমারী থেকেও অনেকে একদিনের জন্য তিরুবন্তপুরম ঘুরে আসেন। তিরুবন্তপুরম থেকে একদিনে পদ্মনাভস্বামী মন্দির, কোভালাম, আজিমালা মন্দির, পুভর ব্যাকওয়াটার ঘুরে আসতে পারেন। 

বিশ্বের সবচেয়ে ধনী মন্দির-পদ্মনাভস্বামী মন্দির

কেরলের রাজধানী তিরুবনন্তপুরমে অবস্থিত শ্রী পদ্মনাভস্বামী মন্দির হিন্দুধর্মের অন্যতম প্রাচীন ও পবিত্র তীর্থস্থান। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী এই মন্দিরের প্রধান দেবতা অনন্ত পদ্মনাভস্বামী, যিনি ভগবান বিষ্ণুর এক বিশেষ রূপ। এখানে তাঁকে শেষনাগের ওপর যোগনিদ্রার ভঙ্গিতে শায়িত অবস্থায় দেখা যায়। এই অনন্য মূর্তি দর্শনের জন্য গর্ভগৃহের তিনটি পৃথক দরজা দিয়ে ভগবানের মুখ, মধ্যাংশ এবং পদযুগল দর্শন করা যায়।

শ্রী পদ্মনাভস্বামী মন্দিরকে শুধু ভারতের নয়, বিশ্বের সবচেয়ে ধনী মন্দির হিসেবেও গণ্য করা হয়। মন্দিরের গোপন ভাণ্ডার থেকে উদ্ধার হওয়া অমূল্য সোনা, হীরা, রত্ন এবং প্রাচীন অলঙ্কারের মূল্য কয়েক লক্ষ কোটি টাকা বলে অনুমান করা হয়। লোকমুখে জানা যায়, এখানেই ভগবান বিষ্ণুর বিগ্রহ আবিষ্কৃত হয়েছিল। বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ৫০ হাজারেরও বেশি ভক্ত ও পর্যটক এই মন্দিরে দর্শনের জন্য আসেন বলে অনুমান।Raise Your Concern About this Content

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

কোভালাম

তিরুবনন্তপুরম থেকে মাত্র ১৬ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত কোভালাম কেরালার মায়াবী সমুদ্রসৈকত। ‘কোভালাম’ শব্দের অর্থ ‘নারকেল গাছের বন’, আর সেই নামের যথার্থ প্রমাণ মেলে নারকেল গাছে ঘেরা বালুকাবেলায়। আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা, বিলাসবহুল রিসর্ট এবং স্পা-এর জন্য কোভালাম বিখ্যাত। হাওয়া বিচ, লাইটহাউস বিচ এবং সমুদ্রা বিচ এখানকার প্রধান আকর্ষণ। সমুদ্রের ধারে হাঁটা, বিভিন্ন ওয়াটার আক্টিভিটি এবং সুস্বাদু সামুদ্রিক খাবারের স্বাদ নিতে পর্যটকদের কাছে এটি অত্যন্ত জনপ্রিয়।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

উপসংহার 

মুন্নার, ওয়েনাড় কিংবা তিরুবনন্তপুরম, কেরালার প্রতিটি স্থানই ভিন্ন ভিন্ন সৌন্দর্যের পরিচয় বহন করে।

এখানকার আরও একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে কেরালার মানুষের আন্তরিক আতিথেয়তা। প্রকৃতির সান্নিধ্যে কিছুটা শান্তি খুঁজে নিতে কিংবা নতুন জায়গা ও সেখানকার মানুষদের সঙ্গে কথা বলতে, তাদের জীবনযাত্রাকে খুব কাছ থেকে দেখতে যাঁরা ভালোবাসেন, তাদের জন্য কেরালা নিঃসন্দেহে ভ্রমণের জন্য অন্যতম জনপ্রিয় স্থানগুলির মধ্যে একটি। 

তথ্যসূত্র

১. উইকিপিডিয়া
২. কেনিয়ান ম্যাগাজিন

বিশ্বয়নী দত্ত
বিশ্বয়নী দত্ত
কলকাতা বিশ্ববিদ্য়ালয় থেকে জার্নালিজম এবং মাস কমিউনিকেশনে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন। গত কয়েক বছর ধরে জাতীয় প্রতিষ্ঠানে সাংবাদিকতা ও কন্টেট রাইটিং-এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। লেখালেখির প্রতি তাঁর বিশেষ অনুরাগ রয়েছে । ব্যস্ত জীবনের একঘেয়েমি কাটাতে মাঝেমধ্যে পাহাড়ে ঘুরতে যেতে ভালবাসেন।
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

বাংলা ক্যালেন্ডার

- বিজ্ঞাপন -spot_img

Most Popular

Recent Comments